কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৭
হামিদা আক্তার ইভা
উত্তর পাড়া একটু শান্ত-শিষ্ঠ বললে ভুল হবে না।সওদাগর বাড়ির চারপাশটা বরাবরের মতো আজও ভীষণ শান্ত।আজ ষোড়শী বধূর মনটা একটু খারাপ।তাহসিন বের হয়েছে কাজে।খানিকক্ষণ আগেই লোকটার সাথে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল।কথায় কথায় বেশ অনেক কথাই হয়েছে।সে দাদি শাশুড়ির ঘরে বসে আছে চুপ করে।পাশে আফিয়া দাদির জন্য পান বানাচ্ছে যত্ন করে।রজনী বেগম দুই নাতবউকে ডেকেছিলেন কাজে।কাজ শেষ করে সবে বসেছেন তারা।ময়ূরী ভাবল পুতুলকে এখনও দুপুরের খাবার খাওয়ানো হয়নি।সে তাড়া দিয়ে বলল,
“পুতুলকে এখনও খাওয়ানো হয়নি দাদি।আপনার আর কোনো কাজ থাকলে বলুন,আমি এখনই করে দিচ্ছি।”
রজনী বেগম পান মুখে নিয়ে বিছানায় পা মেলে দিয়ে বসলেন।বললেন,
“ওর চিন্তা কইরো না।ওর দাদি ওরে খাওয়ায় দিছে।”
ময়ূরী জানত না একথা।সে আড়চোখে আফিয়াকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু কী বলতে চাচ্ছেন?”
“কমু তো!এহন দিন-কাল ভালো না।বউ মানুষ দেহি অন্য বেডার হাত ধইরা যায়গা।তোমাগো বিয়া হইছে তো অনেকদিন।কী ভাবলা তোমরা?”
ময়ূরীর কপালে ভাঁজ পড়ল এবার।সে দাদির কথা বুঝতে না পেরে বলল,
“বুঝিনি দাদি।”
“কইতাছি পুতুল তো বড় হইছেই।ওরে নিয়া তো আর চিন্তা নাই।”
“তা বটে।”
“তোমরা কী বাচ্চা-কাচ্চা নিবা না?”
ময়ূরী শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“সব তো আল্লাহর হাতে।”
রজনী বেগম চোখ কুঁচকে তাকালেন।মুখের পান চিবোতে চিবোতে বললেন,
“এইসব কথা কইয়া কাম নাই।মেয়েমানুষের দায়িত্ব সংসার ভরানো।ঘর ভরাইতে গেলে সন্তান লাগে।”
ময়ূরী শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করল,
“আমি চেষ্টা করছি দাদি।”
রজনী বেগম হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
“চেষ্টা কইরা কী হয়?দোয়া লাগে।নিয়ত লাগে।”
ময়ূরীর মনে পড়ে গেল খানিকক্ষণ আগের সেই কথা কাটাকাটির কথা।তাহসিনের বিরক্ত মুখ,সংক্ষিপ্ত উত্তর,আর শেষে দরজার শব্দ।সব মিলিয়ে আজকের দিনটা তার জন্য ভারীই বটে।
ময়ূরী কোনরকম দাদির সাথে কথা বলে বের হলো আফিয়ার সাথে।আফিয়া ছোট বোনের মতো ভালোবাসে তাকে।সে ময়ূরীর চিন্তিত মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করলি কেন?সকালে তো না খেয়েই বের হলো।”
ময়ূরী বলল,
“উনি কথায় কথায় এমন রেগে যাচ্ছে।ছোট চাচার কথা যেন শুনতেই পারছেন না তিনি।”
“এটা স্বাভাবিক।পুতুলের দিকটাও তো দেখতে হবে বল?”
“তা নাহয় ঠিক আছে,কিন্তু কীই বা করার আছে বলো?ওই মহিলা চাচার স্ত্রী হন।উনি গিয়ে এখন চোয়ালে দু’ঘা বসাতে পারবেন?রাগ সব আমার উপরেই ঝাড়ে।”
“এত বানিয়ে কথা বলিস কেন?আমার দেবর তোর সাথে গলা তুলে কথা বলে না।”
ময়ূরী বিরক্ত হলো।রেগে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“গলা তুলে কথা বলতে হয় না ভাবি।সামান্য একটু কথা গায়ে হাত তোলার থেকেও বেশি হয়।”
আফিয়াও পেছন থেকে গলা ছেড়ে বলল,
“পাপ হবে মেয়ে।জামাইকে নিয়ে এত মিথ্যে কথা বলিস না।”
ময়ূরী ঠোঁট টিপে হাসল।তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে।মেঘাচ্ছন্ন আকাশ খানা বড্ড আদুরে।ময়ূরী বারান্দা থেকে তাহসিনের শুকনো কাপড় গুলো এনে সুন্দর করে ভাঁজ করে রেখে দিল।পুতুল ঘরে আসার পর তাকে নিয়ে বিছানায় শুলো ঘুম পারাবে বলে।পুতুল মায়ের বুকের আঁচল টেনে আঁকু-বাঁকু করছে বলে ময়ূরী বলল,
“আমার মায়ের আজ চোখে ঘুম নেই?”
পুতুল চোখ তুলে ঘাড় উঁচু করে মায়ের দিকে তাকাল।পলক পিটপিট করে বলল,
“মা,আমার কবে একটা ভাই হবে?”
ময়ূরী হতভম্ব হয়ে বলল,
“কীসের ভাই?”
“আমার ভাই।”
“এসব কে বলেছে সোনা?”
পুতুল মিনমিন করে বলল,
“বাবা বলেছে আমার একটা বোন হবে।কিন্তু আমার একটা ভাই চাই।”
“আচ্ছা।”
“আমায় ভাই এনে দিবে?”
“দিব।”
“কবে?”
“সময় হলে।”
“আচ্ছা।”
সে খুশিতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ময়ূরীকে।খানিকক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়ল।ময়ূরী হাত বুলিয়ে দিল মাথায়।বাবা-মেয়ে দুজনেই পাগল।একজন বউয়ের জন্য,আরেকজন মায়ের জন্য।
বলা চলে আজ হলিহাট টা বেশ জমজমাট।নতুন নতুন মেয়ে আসবে বে*শ্যালয়ে।সখী নিজের ঘরে বসে নিজেকে আজ সাজিয়েছে সুন্দর করে।আজ যে পুলিশ বাবু আসবেন এখানে।কিছুতেই যেন সেই অফিসারকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না সে।ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক দেয়ায় বেশ লাগছে দেখতে।ফরসা গায়ে গাঢ় নীল রঙের একখানা শাড়ি।হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।সে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই গাল ভরে হাসল।দরজা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“এতদিন পর শালির কথা মনে হলো বুঝি?”
সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক মধ্যবয়স্ক শ্যামবর্ণের লোক।তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ভেতরে ঢুকে বললেন,
“শালিকে খুব মিস করছিলাম।”
সখী দরজা বন্ধ করে ধীরে হেঁটে এসে খাটের ধারে দাঁড়াল।চোখে তার হাসি থাকলেও ভেতরের অস্থিরতা লুকোতে পারল না।লোকটার দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বলল,
“মিস করলে এতদিন আসোনি কেন?নাকি নতুন শালিদের বেশি মিষ্টি লাগে?”
লোকটা চেয়ারে বসে পা ছড়িয়ে দিল।চোখ বুলিয়ে নিল ঘরটা,তারপর সখীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাজের চাপ রে।চাইলেই আসা যায় নাকি?”
সখী ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে কাছে এসে দাঁড়াল।তার গলার স্বরটা হঠাৎই নরম হয়ে গেল,
“তুমি আছো বলেই তো বেশি ভরসা করি।এইখানে টিকতে গেলে একটু ছাঁয়া লাগে দুলাভাই।”
লোকটা টেবিলের উপর রাখা পানদানিটা ছুঁয়ে বলল,
“ছাঁয়া দিতে পারি,কিন্তু বদলে কী দিবি?”
সখী খানিকক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীরে খাটে বসে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল,
“যা এতদিন দিইনি,আজ সেটা দেব।”
লোকটার চোখে হঠাৎ লোভের ঝিলিক দেখা দিল।সে এগিয়ে এসে সখীর হাত ধরতেই সখী হালকা টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল।চোখে এবার কেমন একরাশ অভিমান,
“তাড়াহুড়ো কোরো না।আজকের রাতটা লম্বা।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে হৈচৈ ভেসে এলো।নতুন মেয়েরা এসেছে।হাসি,কথা,খিলখিল শব্দে হলিহাট আরও জীবন্ত হয়ে উঠল।সখী জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল।মনের ভেতর কোথাও একটা কেমন চাপা কষ্ট জমে উঠল—এই ভিড়ের মাঝেও সে একা।এমন করেই একদিন তাকে এখানে আনা হয়েছিল।জোর করে।
লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“কারা আবার?”
সখী মুখ ঘুরিয়ে হেসে বলল,
“নতুন মেয়েরা এসেছে।তোমার তো আজ ভাগ্য ভালো।”
“দেখ সোনা,আজ আমি কাজে এসেছি আর তোকে দেখে সব ভুলেও গেছি।”
লোকটা হাসল।কিন্তু সখীর চোখের কোণে তখন অন্য ছবি ভাসছে—একটা শান্ত বাড়ি,একটা মেয়ের নিঃশব্দ কান্না,আর এক পুরুষের কঠিন মুখ।দুই আলাদা জগৎ,দুই আলাদা জীবন,
তবু কোথাও যেন অদৃশ্য সুতোয় তারা জড়িয়ে যাচ্ছে।হলিহাটের আলো আরও উজ্জ্বল হলো।আর সেই আলোর নিচেই সখী বুঝে গেল,আজকের রাতটা শুধু তার নয়,অনেক গোপন সত্যেরও।
বিছানায় বসা মধ্যবয়স্ক লোকটা সখীর বড় বোনের স্বামী।লোকটা কে?রমজান সওদাগরের ছোট বউ,অর্থাৎ চম্পার ছোট বোন হচ্ছে সখী।চম্পা এবং সখীকে হলিহাটে নিয়ে আসা হয়েছিল বেশ অনেক বছর আগে।তাদের সাথে খারাপ কিছু না হলেও ভালোটা হলো কোথায়?সখী দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল।পিছু ঘুরে রমজান সওদাগরের দিকে তাকাল।
“তুমি আমার কাছে এসেছ,এটা তোমার বউ জানে?”
রমজান সওদাগর বললেন,
“অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন আছে?”
রমজান সওদাগরের কথায় সখীর চোখে তীব্র ঘৃণার ঝিলিক জ্বলে উঠল।সে এক পা এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বলল,
“কেন নেই?তুমি আমার বোনকে বিয়ে করে আবার আমার কাছে কোন মুখ নিয়ে এসেছ?লজ্জা থাকলে আসতে পারতে না।”
রমজান সওদাগর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে নিলেন।হাসিটা ঠান্ডা,নির্লিপ্ত।
“সবাই নিজেরটা বোঝে।”
সখী দাঁত চেপে বলল,
“নিজেরটা বোঝা আর অন্যের জীবন নষ্ট করা এক না।চম্পা আপা কী দোষ করেছিল?আমরা দু’বোন কী দোষ করেছিলাম?”
“বেশি দূর যাস না।যা হয়েছে,তা অনেক আগের কথা।”
“আমাদের জীবনে আগের কথা বলে কিছু নেই,” সখীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “প্রতিটা দিনই নতুন করে শুরু হয় সেই আগের কষ্ট দিয়ে।”
বাইরে তখনও হলিহাটের কোলাহল।ভেতরের ঘরটায় বাতাস যেন থমকে গেছে।রমজান ধীরে খাটের ধারে এসে বসে বললেন,
“এইসব কথা বাদ দে।আমি এসেছি অন্য কারণে।”
সখী তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল।
“কোন কারণে?নিজের বউ রেখে শালির কাছে আসার কারণটা কী?”
রমজান চোখ নামিয়ে নিলেন।
“সব কথা মুখে বলতে হয় না।”
সখী হেসে উঠল।হাসিটা ভাঙা।
“ঠিক।কিছু কথা কাজে করে দেখাতে হয়।”
রমজান সওদাগর উঠে দাঁড়ালেন।গলার স্বরে হুমকির ছাঁয়া,
“মুখ সামলে কথা বল।ভুলে যাস না,চম্পা এখনও আমার ঘরের বউ।”
এই নামটা শুনে সখী থমকে গেল।তারপর খুব ধীরে বলল,
“ঘরের বউ হয়েও সে একা।আর আমি?এই আলো-ঝলমলে নরকে বন্দি।”
সখীর কথাটা শেষ হতেই ঘরটার ভেতর যেন একটা চাপা নীরবতা নেমে এলো।বাইরের হাসি-হুল্লোড়,খিলখিল শব্দ সবকিছু হঠাৎ খুব দূরের মনে হতে লাগল।রমজান সওদাগর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।তার চোখে বিরক্তি আর অস্বস্তির মিশেল।
“নরক বলিস কেন?এইখানেই তো তোর থাকা-খাওয়া,সব চলছে।”
“থাকা-খাওয়া আর জীবন এক জিনিস না।আমরা মানুষ ছিলাম,আজ পণ্য।”
রমজান মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
“এইসব বড় বড় কথা আমার সামনে বলে লাভ নেই।আমি যা বলি,তা করলেই তোর ভালো।”
“ভালো?” সখী তিক্ত হেসে উঠল।
“ভালোটা কই?চম্পা আপার জীবনে ভালো কই?”
রমজান এক পা এগিয়ে এসে বললেন,
“চম্পার ব্যাপারে তুই মাথা ঘামাবি না।ও আমার ঘরের মানুষ।”
সখীর চোখ ছলছল করে উঠল,তবু কাঁদল না।
“ঘরের মানুষ হলে এমন করে ভাঙতে পারতে না।আর আমাকে?” সে নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলল,
“আমাকে তো অনেক আগেই ঘরছাড়া করেছ।”
রমজান সওদাগর গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।কণ্ঠস্বরটা এবার একটু নরম,
“সবকিছু আমার হাতে ছিল না সখী।পরিস্থিতি…”
“পরিস্থিতি মানুষকে অমানুষ বানায় না।” সখী থামিয়ে দিল।
“বানায় তোমাদের মতো লোকেরা।”
এই কথায় রমজান সওদাগরের চোখে ক্ষণিকের রাগ ঝিলিক দিয়ে উঠল।
“বেশি বাড়াবাড়ি করিস না।”
সখী চোখের পানি মুছে ঠোঁট চেপে বলল,
“শান্তাকেও তো বাদ দিলে না।ওই নেতাকে ফাঁসিয়ে বিয়েটা না দিলেই পারতে।”
ওয়াহিদ কপাল কুঁচকে গোয়েন্দা টিমের কাণ্ড কারখানা দেখছে।শ্যাম বর্ণের তাহসিন তখন সাহেব সেজে ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট ধরিয়েছে।ওয়াহিদ তাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।তাহসিন নিজের দিকে ওয়াহিদকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনার যে চরিত্রে সমস্যা আছে,এটা মধুমিতা জানে?”
ওয়াহিদ হতভম্ব হয়ে বলল,
“বাজে কথা বলবেন না।”
“তাহলে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কী?”
“আমাকে কী আপনার গে মনে হয়?আমার বউ আছে,ভুলে যাচ্ছেন বোধহয়।”
তাহসিন মাথার চুল পেছনে ঠেলে দিতে দিতে বলল,
“বউ তো আমারও আছে।আমি কিন্তু আমার বউ ব্যতীত অন্য কারোর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকি না।”
ওয়াহিদ চোখ সরিয়ে নিয়ে গলা খাঁকারি দিল।
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৬
“আপনি নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই সিরিয়াস মনে হয়।”
তাহসিন ভ্রু নাচিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল।
“আপনি তো আবার আমাকে দেখে এমন ভাবে তাকাচ্ছিলেন, মনে হলো প্রেমে পড়ে গেছেন।”
ওয়াহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি শুধু ভাবছিলাম, আপনি সাহেব সেজে দাঁড়িয়ে আছেন অথচ আপনার জুতোর ফিতা খোলা।”
