কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৯
হামিদা আক্তার ইভা
সওদাগর বাড়ির বিশাল অট্টালিকা। যে বাড়ির প্রতিটি ইটে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের আস্ফালন। এই অতিকায় রাজপ্রাসাদের ছোট বউ হয়ে যেদিন ময়ূরী পা রাখল, সেদিন অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল। অঢেল প্রাচুর্যের এই ভিড়ে ময়ূরী ছিল এক চিলতে সাদামাটা রোদ্দুরের মতো। যেখানে দামি ঝাড়লণ্ঠনের নিচে হিরের গয়নার ঝিলিক চলে, সেখানে ময়ূরী কেবল এক জোড়া কাঁচের চুড়ি আর সুতির শাড়িতেই নিজের স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে নেয়।
বাড়ির বড় কর্ত্রী যখন আভিজাত্যের পাল্লায় সম্পর্কের ওজন মাপেন, ময়ূরী তখন রান্নাঘরে কাজের মানুষের সাথে হাসিমুখে গল্প জুড়তে ব্যস্ত। তার কাছে সংসার মানে কর্তৃত্ব নয়, বরং সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখা।
বেশ কয়েকদিন আগে একদিন সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে যখন সম্পত্তি আর বিষয়-আশয় নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছিল, তখন ময়ূরী আলতো পায়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে ছিল বাড়ির সবার জন্য নিজের হাতে বানানো গরম চা। বড় জা শান্তা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “এত বড় পরিবারের মান-সম্মান কী এসব সাধারণ চা-নাস্তায় থাকে ময়ূরী? একটু রাজকীয় চাল-চলন শিখতে পারো না?”
ময়ূরী মৃদু হেসে ধীরকণ্ঠে উত্তর দিল, ” সোনা তো তপ্ত আগুনে পুড়লেই তবে চেনা যায়। এই বিশাল অট্টালিকা আর সম্পত্তি হয়তো আমাদের ক্ষমতা দেখায়, কিন্তু একে কী সংসার বলা যায়? সংসার তো সেই জায়গা যেখানে বড়-ছোট ভেদাভেদ ভুলে এক থালায় ভাত খাওয়া যায়। যেখানে প্রাচুর্যের অহংকার নেই, আছে শুধু একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।”
তার স্বামী তাহসিন দূর থেকে ময়ূরীর এই স্নিগ্ধ রূপ দেখছিল। সে জানে, এই হাজার কোটি টাকার ভিড়ে ময়ূরীই হলো একমাত্র ‘শুদ্ধ সোনা’। যে বাড়ির মানুষগুলো যন্ত্রের মতো ছুটছে, সেখানে ময়ূরীই হলো সেই শীতল ছাঁয়া, যে মায়ার প্রলেপ দিয়ে ভাঙা সম্পর্কগুলো জুড়তে জানে।
বড়দের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ময়ূরী তার সাধারণত্বের মহিমায় পুরো বাড়িকে এক অদ্ভুত মায়ার জালে জড়িয়ে ফেলেছিল। সে বুঝেছিল, বড় পরিবারে বউ হওয়া মানে কেবল শাসন করা নয়, বরং পরম মমতায় সবাইকে আগলে রাখা। তার কাছে সেই ভাঙা চালার স্বপ্ন আর এই সওদাগর বাড়ির বাস্তবতা—সবই এক হয়ে যায় যখন সে দিনশেষে তাহসিনের চোখে নিজের জন্য এক ফালি নিশ্চিন্ত আশ্রয় দেখতে পায়।
ষোড়শীর কাঁধে এই বিশাল পরিবারের ভার হয়তো ভারী ছিল, কিন্তু তার হৃদয়ের সরলতা সেই ভারকে ভালোবাসার পালকে রূপান্তর করেছিল।
তাহসিনের জীবনে ময়ূরীর আগমন সহজ ছিল না।
কারণ, সে শুধু একজন স্বামী নয়—একটি চার বছরের শিশুর বাবা।পুতুল সওদাগর।
নামটার মতোই ছোট্ট, গোলগাল, চোখ দুটো বিস্ময়ে ভরা একটা ছোট্ট বাচ্চা।ময়ূরী যখন এই বাড়িতে বউ হয়ে আসে, তখন পুতুলের পৃথিবীটা ছিল অদ্ভুতভাবে নিঃসঙ্গ। মায়ের শূন্যতা সে বোঝে না, শুধু অনুভব করে। মাঝেমধ্যে হঠাৎ চুপ করে যায়, আবার হঠাৎই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না, শুধু বাবার গলা খুঁজে বেড়ায়।প্রথম দিন পুতুল ময়ূরীকে দেখেছিল দূর থেকে।নতুন মানুষ। নতুন গন্ধ।সে ভয় পেয়েছিল বাবার পাশে এক অচেনা নারীকে দেখে।ময়ূরী সেটা বুঝেছিল এক নজরেই।
সে কাছে যায়নি। জোর করে আদর করতে চায়নি।
শুধু নিচু হয়ে পুতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
পরের দিন সে পুতুলের জন্য নিজের হাতে রুটি বানিয়েছিল ছোট ছোট গোল করে।
আরেকদিন চুলে বেণী করে দিতে চেয়েছিল, যদিও ঠিকঠাক পারছিল না।কয়েকদিন পর এক সকালে, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা ময়ূরীর আঁচল ধরে টান দিয়েছিল পুতুল।খুব ছোট্ট গলায় বলেছিল,
“মা।”
শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ময়ূরীর বুকটা কেঁপে উঠেছিল।সন্তান গর্ভে ধারণ না করেও এক শিশুর জননী পদবি গ্রহণ করেছিল আল্লাহকে সাক্ষী রেখে।তাহসিন দূর থেকে দেখেছিল দৃশ্যটা।
বড় বাড়ির মানুষগুলো তখনও ফিসফাস করত,
“নিজের সন্তান নয়, কতদিন টানবে?”
“ষোড়শী বউ,এত দায় সামলাতে পারবে?”
কিন্তু ময়ূরী জানত,মা হওয়ার জন্য রক্ত লাগে না, লাগে বুকভরা মমতা।সে পুতুলকে কোলে নিয়েছিল যেমন করে,তাতে কোনো হিসাব ছিল না—নিজের, পরের।রাতে পুতুল ঘুমিয়ে পড়লে ময়ূরী তার কপালে হাত বুলিয়ে দিত।এই বাড়ির আভিজাত্য, সম্পত্তি, ক্ষমতার বাইরে এই ছোট্ট শিশুটাই ছিল তার সংসারের প্রথম শিকড়।
ষোড়শী বয়সে যে দায় অনেকের কাছে বোঝা,
ময়ূরীর কাছে সেটাই হয়ে উঠেছিল দোয়া।আজ তার সেই কন্যা সন্তান তাকে “মা” বলে ডাকে।বুকের মাঝে শিটিয়ে থাকে সারাক্ষণ।কিযে সুখ সুখ অনুভূতি জেঁকে বসে হৃদ গহীনে—তা সে মুখে বলে বোঝাতে পারবে না।পারবে না এই ছোট্ট মেয়েকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে।
ভোর সকাল তখন।বাইরে অদ্ভুত বিস্ময় ছড়িয়ে আছে।খানিকক্ষণ আগে নামাজ শেষ করে ময়ূরী পুতুলকে নিয়ে শুয়েছে বিছানায়।পুতুলকে ভোরে দিয়ে গেছেন তার দাদি।তাহসিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে।ময়ূরী বাঁকা চোখে তাকাল তার দিকে।শ্যামলা গায়ে আজ ধূসর রঙের একটা শার্ট আর প্যান্ট পরনে।শার্টের হাতা কনুই অব্দি ভাঁজ করতে করতে একবার তাকাল ময়ূরীর দিকে।নিকটে এগিয়ে এসে ঝুঁকে সময় নিয়ে চুমু খেল কপালে।ঘুমন্ত পুতুলের কপালেও আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল।ময়ূরীর ভেজা মাথায় হাত বুলিয়ে নিচু গলায় বলল,
“পুতুলের খেয়াল রেখো।”
খানিকক্ষণ পর তাহসিন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।আলো ফুটতে শুরু করল চারপাশে।পুতুলের ঘুম ভাঙতেই ময়ূরী তাকে পরিষ্কার করে দিয়ে নিচে নিয়ে এলো খাওয়াবে বলে।নিচে তখন বাড়ির প্রত্যেক মহিলাই উপস্থিত।ময়ূরী চুপচাপ চেয়ার টেনে পুতুলকে বসাল।পাশে নিজে বসে প্লেটে ভাত নিল।মেয়েরা সবাই তখন খেতে বসেছে সেখানে।কনক আজ-কাল ময়ূরীর সামনে খুব কম আসে।যত পারে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।আজ অদ্ভুত ব্যবহার করছে মেয়েটা।অযথা ময়ূরীর সাথে মেজাজ দেখাচ্ছে সে।অরুণিমা বেগম এক পর্যায় বিরক্ত হয়ে বললেন,
“খাওয়ার সময় হচ্ছে কী এসব?”
তিনি ধমক দিতেই কনকের মা চওড়া গলায় বললেন,
“একদিনেই এই অবস্থা বড় আপা?আমার মেয়েরে এমনে বকো কেন?”
অরুণিমা বেগম বললেন,
“সে বেয়াদবি করছে কেন?”
“বেয়াদবি কই করল?ওয় তো খালি তরকারির বাটিই চাইল।তোমার বউ যদি না দেয় তাইলে কী করব?”
ময়ূরী এবার তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল,
“অযথা ঝগড়া কেন করছেন ছোট আম্মা?সব তো তার সামনেই আছে।এখন কী ভাত মাখিয়ে তার মুখে তুলে দিতে হবে?”
কনক চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“এত নাটক করছো কেন?দেবে না বললেই তো হলো নাকি?”
“নাটক টা করছে কে?তুমি বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছো বলে মনে হচ্ছে না?”
এক পর্যায় কনক রেগে ভাতের প্লেট দূরে ঠেলে দিয়ে চওড়া কণ্ঠে বলল,
“ছোটলোক তো ছোটলোকই হয়।কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না?তাহসিন কেন এই রাস্তার মেয়েকে তুলে এন…”
বাকিটুকু বলার আগে তার গালে ঠাস করে চড় পড়ল একটা।সবাই হতভম্ব হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকাল।বাম হাত দিয়ে কনকের ডান গালে কষিয়ে একটা চড় মেরেছে সে।কনকের মা কিছু বলার আগেই ময়ূরী ধারাল গলায় বলল,
“একবার বারণ করেছিলাম না আমার সাথে না লাগতে?শিক্ষা হয়নি তোমার?নোংরা আচরণ করে ছোটলোকের পরিচয় তুমি দিচ্ছ আমি নই।আমার বাবা গরিব হতে পারে,তাই বলে ছোটলোক নয়।তাহসিন তোমার বড় ভাই হয়,নাম ধরে ডাকার সাহস পেলে কোত্থেকে?”
ময়ূরীর কণ্ঠে তখন কোনো কাঁপুনি নেই। চোখে ভয় নয়,আছে স্পষ্ট দৃঢ়তা। চারপাশের নিস্তব্ধতাটা ভারী হয়ে ঝুলে রইল ডাইনিং ঘরে। কনক হতভম্ব, গালে হাত চেপে বসে আছে; অপমান আর বিস্ময় একসাথে জমে উঠেছে চোখে।কনকের মা রেগে উঠে চেয়ার ঠেসে দাঁড়াল।
“তুমি হাত তুললা কেন? আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস পাইলা কই?”
ময়ূরী শান্ত কঠিন গলায় বলল,
“যে ভাষায় কথা বলা হয়, সেই ভাষাতেই জবাব দিতে হয় ছোট আম্মা। অপমান সহ্য করাকে ভদ্রতা বলে না।আপনার মেয়েকে মানুষ করুন।সে হয়তো সম্পর্ক ভুলে যাচ্ছে।মনে করিয়ে দিন আমি তার ভাবি হই।”
কনক ঠোঁট কামড়ে চোখ নামাল। মুখে কিছু বলার সাহস হলো না। ডাইনিং ঘরের অন্য নারীরাও নীরব। কারও চোখে লজ্জা, কারও চোখে বিস্ময়!ষোড়শী বউ যে এমন দৃঢ় হতে পারে, তারা ভাবেনি।
ময়ূরী পুতুলের দিকে ঝুঁকে নরম গলায় বলল,
“খাও, মা।”
তারপর নিজের হাতে ভাত মেখে মেয়েটার মুখে তুলে দিল। পুতুল মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন পুরো ঘরের ভার হালকা হয়ে গেল।কনক হনহন করে উপরে উঠে গেল হাত ধুইয়ে।কনকের মাও যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।কী এক বিশ্রী কান্ড!
খবর আছে আজ হলিহাট থেকে দেড়’শত এর বেশি মেয়ে পা’চার হবে।অবৈধ স্বর্ণের সাথেই তাদের একসাথে পাঠানো হবে দূর দেশে।সারাদিন কেটে গেছে বাইরেই।বে’শ্যালয়ের বিশাল বড় আঙিনায় সাতটা গাড়ি এসেছে আজ।মেয়ে’দের তৈরি করা হচ্ছে নিলামে ওঠানোর জন্য।যার যত দাম,ততবেশি লাভ।
বে’শ্যালয়ের ভেতরের বাতাসটা আজ ভীষণ ভারী। কেবল গরমে নয়—ভারি মানুষের আর্তশ্বাসে, ভয় আর অসহায়তার গন্ধে। বিশাল আঙিনার একপাশে লোহার গেট বন্ধ, অন্যপাশে বিশাল বড় মহলের মধ্যে সারি সারি ঘর। প্রতিটা ঘরের ভেতর বসে আছে ভাঙা চোখের মেয়েরা। কেউ কিশোরী, কেউ সদ্য যৌবনে পা দেয়া, আবার কেউ কারও মা হওয়ার বয়সে পৌঁছে গেছে।তবু এখানে সবার পরিচয় একটাই: পণ্য।
আজকের দিনটা আলাদা।হলিহাট থেকে আনা দেড় শতাধিক মেয়েকে সাজানো হচ্ছে। রঙিন কাপড়, ভারী মেকআপ, ঠোঁটে জোর করে লেপে দেওয়া হাসি—সবই মুখোশ। ভেতরে যে কান্না জমে আছে, সেটা দেখার মতো কেউ নেই। দালালদের চোখে শুধু হিসাব!কে কত দাম তুলবে।
এক কোণে বসে আছে একটি মেয়ে। বয়স ষোলো কী সতেরো,ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। শরীরটা কাঁপছে। নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল,
“শুভা।”
নামটার ভেতরে আলো থাকার কথা ছিল। অথচ তার চোখে এখন শুধু অন্ধকার। গ্রাম থেকে আনার সময় বলেছিল কাজ দেবে, শহরে ভালো জীবন। সেই ভালো জীবনের প্রথম সকালেই তাকে এখানে এনে ফেলা হয়েছে। কাপড় বদলাতে গিয়ে সে বারবার আঁচল টেনে বুক ঢাকছে,যেন লজ্জা এখনও তাকে ছাড়েনি।
এক দালাল এসে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“এই মেয়ে, এত কাঁপছিস কেন? হাস! নিলামে গেলে হাসতে হয়।”
প্রভা ঠোঁট কাঁপিয়ে হাসার চেষ্টা করল। সঙ্গে সঙ্গে চোখের কোণ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কেউ সেটা মুছিয়ে দেয়নি। এখানে কান্নার দাম নেই।
আঙিনার মাঝখানে কাঠের মঞ্চ তৈরি। একে একে মেয়েদের দাঁড় করানো হচ্ছে। নাম, বয়স, “গুণ”সব উচ্চস্বরে বলা হচ্ছে। যেন তারা মানুষ নয়, গরু-ছাগল।
“এইটা নতুন। গ্রামের। শরীর টানটান। দাম শুরু!”
দাম হাঁকা শুরু হয়। হাত ওঠে। শব্দ ওঠে। টাকার হিসাব বাড়ে।শুভার কানে সব শব্দ ঝাপসা লাগছে।
অদ্ভুত হলেও সেখানে আজ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই উপস্থিত।লীলাখেলায় মেতেছে সব।ভালো মুখোশের আড়ালে এক আস্ত নরপশু লুকিয়ে আছে।
বিশাল বাড়ির তিন তলার এক আলিশান ঘরের বিশাল জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখছেন একজন লোক।বয়স হয়েছে,মুখের চামড়াও ঝুলে গেছে প্রায়।
বিশাল ঘরের ভেতর আলো-আঁধারির খেলায় লোকটার মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত;অথচ ভেতরে জমে থাকা কোনো এক পুরনো হিংস্রতার ছাঁয়া স্পষ্ট। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি নিচের আঙিনার দৃশ্য দেখছেন, ঠিক যেমন কেউ পোকা-পতঙ্গের লড়াই দেখে আনন্দ পায়।
বাইরে থেকে একটা লোক এলো ঘরের ভেতর।জানাল মেয়েদের তৈরি করা হয়েছে।এবং স্বর্ণের চালা’নও!তিনি মাথা নেড়ে প্রস্থান করতে বললেন লোকটাকে।
সবকিছু তখনও আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। নিলামের মঞ্চে আলো ঝলমল করছিল, দালালদের ব্যস্ত পায়ের শব্দে আঙিনা মুখর। হিসাবের খাতা খুলে বসেছে কেউ কেউ, কেউ আবার স্বর্ণের চালা’ন ঠিকঠাক আছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত। চারপাশে এক ধরনের আত্মতৃপ্ত নির্লজ্জতা ভাসছিল,যেন এখানে যা হচ্ছে, সেটাই নিয়ম,সেটাই নিয়তি।
ঠিক সেই মুহূর্তে পরিবেশের ছন্দটা আচমকা ভেঙে পড়ল।লোহার গেটের বাইরে হঠাৎ ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যেই আঙিনার চারদিক থেকে ঘিরে ধরল একদল সশস্ত্র লোক। কারও পরনে সাধারণ পোশাক, কারও চোখে কঠিন পেশাদার সতর্কতা। এতক্ষণ যারা দর্শক সেজে ছিল, তারাই এবার নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করল। গোয়েন্দা টিমের নিখুঁত পরিকল্পনায় পুরো এলাকা এক নিমিষেই নিয়ন্ত্রণে চলে এলো।
হৈচৈ শুরু হলো তৎক্ষণাৎ।দালালদের মুখের রং বদলে গেল। কেউ পালানোর চেষ্টা করল, কেউ গলির ভেতর ঢুকে পড়তে চাইল, কিন্তু প্রতিটি পথ আগেই আটকানো ছিল। আঙিনার মাঝখানে তৈরি হওয়া মঞ্চটা হঠাৎই পরিণত হলো অপরাধের সাক্ষ্যস্থলে। দাম হাঁকার শব্দ থেমে গিয়ে জায়গা নিল আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খল চিৎকার।
মেয়েরা ভয়ে জড়সড় হয়ে একত্রিত হয়েছে।এতদিন যে গেট তাদের বন্দিত্বের প্রতীক ছিল, সেই গেটটাই এবার মুক্তির সম্ভাবনায় কেঁপে উঠছিল।
উপরতলার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার অস্বাভাবিক শান্ত মুখে প্রথমবারের মতো ফাটল ধরল। চোখের স্থিরতা ভেঙে গিয়ে সেখানে জমে উঠল অস্থিরতা। এতদিনের সাজানো পরিকল্পনা, ক্ষমতার অহংকার সবকিছু এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে হয়ে উঠল।
গোয়েন্দা দলের তৎপরতায় পুরো বাগান, ঘর, গোপন কক্ষ একে একে তল্লাশি হতে লাগল। অবৈধ স্বর্ণের চালা’ন, কাগজপত্র, হিসাবের খাতা সবকিছুই আলোর নিচে আসতে শুরু করল। এতদিন যে অন্ধকার নির্ভয়ে বেড়ে উঠেছিল, সেই অন্ধকার আজ প্রথমবার আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
আঙিনার বাতাস তখনও ভারী, তবে সেই ভারের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক ধরনের কাঁপা কাঁপা স্বস্তি। কান্না, ভয় আর অবিশ্বাসের মাঝখানেই জন্ম নিচ্ছিল মুক্তির ক্ষীণ আশা। যে জায়গাটা এতক্ষণ ছিল মানুষের বাজার, সেই জায়গাটাই ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছিল অপরাধের শেষ অধ্যায়ে।
পুরো মহল যখন গোয়েন্দা টিম ঘিরে ধরেছে,তখন গোয়েন্দা অফিসার নওমান তাহির তিন তলার সেই বিশাল আলিশান ঘরের সামনে হাতে বন্দু’ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অস্থির মন নিয়ে।শুকনো ঢোক গিলে দরজা ধাক্কা দিতেই সামনে দুজন লোককে দেখতে পেল সে।যে দুজন দরজা ধাক্কার শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে পিছু ফিরে দাঁড়িয়েছে।নওমান অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল সেই দুই লোকের দিকে।ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন লোকও যেন তাকে দেখে হতভম্ব।ভেতরে সেই লোকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রমজান সওদাগর।তিনি দরজার দিকে তাকিয়েই কাঁপা গলায় বললেন,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৮
“তাহসিন!”
হ্যা!এতদিন যারা নওমান তাহির কে জানতে চেয়েছিল!সেই নওমান তাহির রহমান সওদাগরের ছোট পুত্র “মিসবাহ তাহসিন সওদাগর”।এই বিশাল কেস তার ঘাড়ে এসেছিল বলেই নিজ গ্রামে এসেছিল পরিচয় গোপন করে।নিজে গোয়েন্দা অফিসার হয়েও গোনাক্ষরেও টের পায়নি নিজের পরিবার এর সাথে জড়িত।সে বুঝতে পেরেছিল এর সাথে চাচা জড়িত আছেন,কিন্তু পাশে দাঁড়ানো লোকটা?তিনি কী করে?
তাহসিনের অবিশ্বাস্য চোখে আজ পানি চিকচিক করছে লজ্জায়।সে কম্পিত গলায় উচ্চারণ করল,
“দাদা!”
