কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৭
হামিদা আক্তার ইভা
রজনী বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েক মাস আগে।সেই শক্ত শরীরটা ভেঙে এসেছে প্রায়।শরীরটা চালানো বড্ড কষ্ট।আফিয়া ঘরে এলো ঔষুধ নিয়ে।রজনী বেগম ঔষুধ খেয়ে বসলেন বালিশে ভর করে।তিনি বিষণ্ণ গলায় বললেন,
“তোর দাদা শ্বশুরের ফাঁ*সি হইলো কেন?”
আফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।গত বছর ছোট চাচা শ্বশুর এবং দাদা শ্বশুরের ফাঁ*সির রায় এসেছিল।নারী পা*চার,নারী ধ*র্ষণ,নারীদের জোর করে দেহ*ব্যবসায় জড়ানো এবং স্বর্ণ পা*চারের মামলায় দুজনের ফাঁ*সি হয়।আফিয়া আলতো করে রজনী বেগমের চাদরটা টেনে দিতে দিতে ম্লান হাসল। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে শান্ত স্বরে বলল,
“দাদি, সব পাপের বিচার তো দুনিয়াতেই শুরু হয়। উনারা যে পথে হেঁটেছেন, সেখানে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু ছিল না। অসহায় মেয়েদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, পা*চার আর ওইসব নোংরা কারবার—আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার মতো কাজ ছিল ওগুলো। আইন তো আর এমনি এমনি সাজা দেয়নি, সব প্রমাণ হাতে নিয়েই রায় হয়েছে।”
রজনী বেগম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তার ঘোলাটে চোখে একরাশ শূন্যতা। যে মানুষগুলোর দাপটে একসময় এলাকা থরথর করে কাঁপত, আজ তাদেরই নামের পাশে ‘ফাঁ*সির আসামি’ তকমা লেগেছে।
আফিয়া একটু থেমে আবার বলল,
“এখন এসব ভেবে শরীর আরও খারাপ করবেন না। আপনি বরং চোখ বুজে একটু জিরিয়ে নিন। আমি পাশে আছি।”
রজনী বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“তাহসিন আইছে তাই না?ওর বউ,পুতুল ওরাও আইছে?”
আফিয়া বলল,
“ভাই এসেছে কাল রাতে।”
“ওরা এই বাড়ি আইব না?”
“জানি না দাদি।হয়তো পুরনো সেই অভিমান এখনও কোথাও না কোথাও পুষে রেখেছে।”
রজনী বেগমের চোখ ঝাঁপসা হয়ে এলো।গাল বেয়ে নোনা জল পড়তেই তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন,
“তাহসিনরে একবার আইতে ক আমার কাছে।মরার আগে ওর মুখটা দেইখা যাই আমি।”
“এসব বলবেন না।তাহসিন কী আসবে এবাড়ি?”
“তুই মাহতাবরে ডাক দে।”
আফিয়া গিয়ে মাহতাবকে ডেকে নিয়ে এলো।রজনী বেগম প্রস্তাব করলেন তাহসিনকে একবার এই বাড়ি নিয়ে আসার জন্য।মাহতাব সঙ্গে সঙ্গে রুহুলকে নিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।সন্ধ্যার আলো তখন ডুবুডুবু ভাব।ফরাজী বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে বাড়ির প্রত্যেকে গল্পে মেতে আছে।রান্না ঘরে চাচি আজ রান্না করছেন।ময়ূরী তাহসিনের পাশে বসে আছে চুপটি করে।বেহায়া লোকটা কানের কাছে একটু পর পর কী যেন ফিসফিস করছে।হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।ময়ূরী মাথায় কাপড় টেনে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে মাহতাবকে দেখে সালাম করে ভেতরে আসতে বলল।মাহতাবকে দেখে তাহসিন উঠে দাঁড়াল।বলল,
“কিছু হয়েছে?এই সময়ে এই বাড়ি এলে যে?”
ময়ূরী রুহুল আর মাহতাবকে বসতে দিল চেয়ারে।ওরা সবাই বসতেই মাহতাব বলল,
“দাদি ভীষণ অসুস্থ।বারবার তোদের দেখতে চাইছে একবার।”
তাহসিনের চোয়াল স্বাভাবিক তখনও।ময়ূরী ঠোঁট চেপে তাকাল তাহসিনের দিকে।লোকটা কী ভাবছে?
তাহসিনের সেই তিক্ত অতীত গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল।কী করে সেই বাড়ি পা রাখনে সে?সে বলল,
“ওই বাড়ি কোন মুখ নিয়ে যাব ভাইয়া?যে বাড়ি থেকে একদিন আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল?”
“দাদির অবস্থাটাও তো বুঝতে হবে তোকে।তুই তো বাচ্চা নোস।তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছে।”
ময়ূরী মন ছটফট করল একটবার ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য।খুব করে ইচ্ছে হলো দাদিকে দেখার জন্য।তাহসিনকে দেখে বড্ড শক্ত মনে হচ্ছে।ময়ূরী তাহসিনের শার্ট টেনে ধরে বলল,
“ছাড়ুন না ওসব রাগ-অভিমান।কেউ নিজের ভুল বুঝতে পারলে তাকে একটা সুযোগ দেয়া উচিত।”
তাহসিন আশ্চর্য হয়ে বলল,
“এই কথা তুমি বলছো ময়ূরী?একদিন ওই বাড়ি থেকে তুমি এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলে।”
“আগের সব অতীত ভুলে যান।কী হয়েছিল ওসব ভেবে জেদ ধরে রাখা বোকামি।তিনি অসুস্থ মানুষ,একটাবার আপনাকে দেখতে চাইছে।আপনি তাকে উপেক্ষা করে এখানে বসে থাকতে পারবেন?”
“কী করতে বলছো তাহলে?”
“চলুন না যাই?একটাবার উনাকে দেখে আসি?”
ময়ূরীর কথা তাহসিন ফেলতে পারল না।তা-ছাড়া তারও তো একটা টান আছে।তারও ইচ্ছে হয় একটাবার নিজের বাড়ি যেতে।কিন্তু ভাগ্য তো বড় নিষ্ঠুর!
ওরা তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বের হলো।ছোট্ট পুতুল চাচার হাত ধরে হাঁটছে ফাঁকা রাস্তায়।ময়ূরীর হাত তাহসিন চেপে ধরেছে নরম স্পর্শে।সওদাগর বাড়ির আমনে আসতে একটু সময় লাগল বটে।তাহসিন চোখ উঁচিয়ে বাড়ির দিকে তাকাল।বিশাল বড় বাড়িটা বড্ড শান্ত।এখন কী বাড়ির প্রত্যেকে সেই আগের মতোই আছে?নাকি অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে?তারা সদর দরজার সামনে আসতেই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত অরুণিমা বেগম,কুসুম এবং আফিয়া এগিয়ে এলো।আফিয়া জড়িয়ে ধরল ময়ূরীকে।মেয়েটার চোখ ভিজে এলো কান্নায়।কত গুলো বছর পর আবার সেই স্বামীর বাড়িতে পা রাখল সে।কুসুম বলল,
“ভাবি,ভালো আছো?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,
“খুব।তুমি ভালো আছো কুসুম?”
কুসুম মাথা নাড়ল।ওদের মধ্যে খানিকক্ষণ কথাও হলো।পুরোটা সময় তাহসিন গম্ভীর হয়ে ছিল।ছোট্ট পুতুল তখন ফুপুদের সাথে ব্যস্ত।ময়ূরী জানতে চাইল বাড়ির বাকিরা কোথায়!আফিয়া বলল কনক ওর শ্বশুর বাড়ি,আর ওর মা ঘরেই আছে।সিতারা বেগম রজনী বেগমের ঘরেই আছেন।ময়ূরী মাথা নাড়ল।গত বছর কনকের বিয়ে হয়েছে গ্রামের বাইরে।মেয়েটা একটা সময় ময়ূরীকে খুব জ্বালিয়েছে।ময়ূরী বাধ্য হয়ে তার গায়ে হাতও তুলেছে।দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।রজনী বেগমের ঘরের সামনে এলো ওরা।তাহসিন আর ময়ূরী তখন দরজার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।তাহসিনকে অমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ময়ূরী বলল,
“যাবেন না?”
তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে অনুমতি এলো।রজনী বেগম দেখলেন এক শ্যামবর্ণ ছেলের পাশে টুকটুকে রাঙা বউ।সেই কিশোরী বধূর রুপ আগের ন্যায় দ্বিগুণ হয়েছে।পাশেই তাহসিন।সে সালাম করল দাদিকে।গিয়ে বসল পাশে।রজনী বেগম খানিকক্ষণ তাহসিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“ভালো আছিস?”
তাহসিন বলল,
“আল্লাহ আমাকে খুব সুখ দিয়েছে দাদি।আলহামদুলিল্লাহ,ভালো আছি।”
তিনি হেসে বললেন,
“আরও সুখী হো।”
তারপর ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তাহসিন বউ,ভালো আছিস?”
ময়ূরী মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।তিনি বললেন,
“শুনলাম তুই নাকি ডাক্তার হবি?”
ময়ূরী বলল,
“আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে হব ইনশাআল্লাহ।দোয়া করবেন।আপনার শরীর এখন কেমন আছে?”
রজনী বেগম চুপ করে গেলেন এই পর্যায়।যাদের সাথে তিনি একটা সময় এত জঘন্য একটা কাজ করেছিলেন,তারা আজ এত সহজ গলায় কথা বলছে ভেবেই যেন অপরাধবোধ আরও বেড়ে যাচ্ছে। রজনী বেগম অপরাধবোধে কুঁকড়ে গেলেন। ময়ূরীর এই শান্ত কণ্ঠস্বর যেন তার কানে তপ্ত সীসার মতো বাজছে। তিনি করুণ চোখে একবার তাহসিনের দিকে, আরেকবার ময়ূরীর দিকে তাকালেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার শরীর আর কী ভালো থাকেরে? এই পাপিষ্ঠ শরীর নিয়া এহন শুধু আজরাইলের অপেক্ষা করতাছি।তোগো দিকে তাকাইলে নিজেরে খুব ছোট মনে হয়। ডাক্তার হবি—শুইনা কলিজাটা জুড়াইলো। তোগো লগে আমি যা করছি, তা তো জানোয়ারেও করে না।”
সিতারা বেগম ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখের জল মুছছিলেন। একটা সময় এই বাড়ির দাপট ছিল আকাশচুম্বী, কিন্তু আজ সব ধুলোয় মিশে গেছে। রজনী বেগম তাহসিনের হাতটা ধরার চেষ্টা করে হাপাতে হাপাতে বললেন,
“তাহসিন ভাই, আমারে মাফ করবি না? জানি মাফ চাওয়ার মুখ আমার নাই। তোরে আর তোর বউরে এক কাপড়ে বাড়ি থেইকা বাইর কইরা দিছিলাম। পুতুল তখন একদম বাচ্চা! ওরে একবার দেখতে পারুম না?”
তাহসিন শক্ত হয়ে বসে রইল। সে দেখতে পাচ্ছে এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই নারী আজ কতটা অসহায়। দাদির এই জীর্ণ অবস্থা দেখে তার মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“আমি তো আগেই বলেছি দাদি, আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন। পুরনো কথা আর মনে করতে চাই না। আমরা ওসব মাটি চাপা দিয়ে এসেছি। পুতুল বাইরে ওর ফুপুর সাথে খেলছে,ওকে নিয়ে আসছি।”
ময়ূরী এগিয়ে গিয়ে রজনী বেগমের পায়ের কাছে বসল। তার শুকনো খসখসে হাতটা নিজের হাতে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“দাদি, আমরা কারো উপর রাগ পুষে রাখিনি। আপনি নিজের খেয়াল রাখেন। আর এসব পাপ-পুণ্যের বিচার তো আল্লাহর হাতে। আপনি তওবা করেন, তিনি নিশ্চয়ই মেহেরবান।”
রজনী বেগম এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তার কান্নায় ঘরের গুমোট পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে সিতারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখ সিতারা, যাগো আমি মানুষ মনে করি নাই, তারাই আজ আমারে সান্ত্বনা দিতে আইছে। আর আমার নিজের পোলা আজ এই বংশের মুখে চুনকালি মাখাইয়া দিয়া গেল!”
ঠিক তখন বাইরে থেকে পুতুলের খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। শিশুটির নিষ্পাপ হাসি যেন এই অন্ধকার ঘরটায় এক চিলতে আলোর মতো প্রবেশ করল।পুতুলের মতোই ছোট্ট একটা বাচ্চা কুটুরকুটুর চোখ মেলে ময়ূরীকে দেখে গাল ভরে হেসে বলল,
“মা,আমায় ডাকছিলে?”
ময়ূরী হাত বাড়িয়ে বলল,
“কাছে এসো তো!”
পুতুল নিকটে যেতেই ময়ূরী রজনী বেগমকে দেখিয়ে বলল,
“তোমার বড় নানিকে সালাম করো।”
পুতুল সুন্দর করে সালাম দিয়ে বলল,
“তুমি ভালো আছো?”
রজনী বেগম হেসে বললেন,
“ভালো আছি সোনা।তুই ভালো আছিস?”
পুতুল ময়ূরীকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমিও ভালো আছি।”
রজনী বেগমের মনে হলো পুতুল একটা যোগ্য পরিবার পেয়েছে।নিজের আপন চাচা আর চাচি নিজের বাচ্চার মতো ভালোবাসে ছোট্ট বাচ্চাটাকে।ময়ূরীর মতো ছোট্ট একটা মেয়ে এক মায়ের কর্তব্য পালন করেছে এতদিন।নিঃসন্দেহে বোরহান সওদাগর একটা রত্ন নিয়ে এসেছিলেন এই বাড়িতে।সেই ছোট্ট “কিশোরী কন্যা” এখন এক আদর্শ স্ত্রী এবং মা।
তিনি শুকনো ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।বুকটা বড্ড ব্যথা করছে আজ।তিনি তাহসিনকে কাছে ডাকলেন।তাহসিন পাশে এসে বসতেই তিনি ওর হাত মুঠোয় নিয়ে কাতর কণ্ঠে বললেন,
“তোরে কিছু কথা কওয়ার আছে আমার।আমার শেষ ইচ্ছাটুকু সম্মান করবি?”
তাহসিন বলল,
“এভাবে বোলো না।তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।”
তিনি ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“সবাইরে এই ঘরে ডাক দে।সবাইরে একটু দেখি।”
ঘরে যখন সবাই উপস্থিত হলো,তখন রজনী বেগম তাহসিনের হাতটা কাঁপাকাঁপা আঙুলে খামচে ধরলেন। তার কণ্ঠস্বর এখন অনেক বেশি পরিষ্কার, তবে তাতে মেশানো ছিল আজন্মের হাহাকার। তিনি বললেন,
“শোন তাহসিন, এই বাড়ি খালি ইটের দেয়াল না, এইডা একটা বংশের অস্তিত্ব। তোরে যেদিন বাইর কইরা দিছিলাম, সেদিন এই বাড়ির বরকত চইলা গেছিল। আজ দেখ, বড় বড় কথা বলা মানুষগুলা ফাঁ*সির দড়ির নিচে। অন্ধকার নামছে এই বাড়িতে। তুই এই বাড়ির রক্ত, তুই না ফিরলে আমার আত্মা কবরে গিয়াও শান্তি পাইব না। তুই কথা দে, তুই তোর বউ আর পুতুলরে নিয়া এই ভিটায় ফিরবি। এই অন্ধকার ঘরটারে আবার আলো দিয়া ভইরা দিবি।”
তাহসিন ময়ূরীর দিকে তাকাল। ময়ূরী তখনও পুতুলকে আগলে ধরে আছে। তার চোখে পুরনো অপমানের কোনো ছিটেফোঁটা নেই। তাহসিন বুঝতে পারল, জীবনের হিসাব-নিকাশ সবসময় ঘৃণা দিয়ে চলে না। সে এক হাত দিয়ে দাদির লোলচর্ম হাতটা স্পর্শ করল। তার গম্ভীর গলায় এবার কিছুটা কোমলতা মিশল,
“দাদি, যে বাড়ি একসময় পর মনে হয়েছিল, আজ তোমার এই অবস্থার সামনে সব জেদ তুচ্ছ হয়ে গেছে। আমি কথা দিচ্ছি,আমি আবার আমার বাড়ি ফিরব।”
কথাটা শোনামাত্র রজনী বেগমের মুখটা যেন এক নিমেষে বদলে গেল। একটা পরম তৃপ্তি তার সমস্ত শরীরকে শিথিল করে দিল। তিনি ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“নাতবউ,কাছে আয়। তোরে অনেক কষ্ট দিছি। দয়া কইরা মাফ করিস আমারে। তোর মতো একটা সোনার টুকরা যে এই বংশে আইছে, সেইটা বুঝতেই আমার কতডি বছর পার হইয়া গেল।”
ময়ূরী এগিয়ে এসে দাদির পায়ের উপর হাত রাখল। তিনি সবার দিকে একে একে তাকালেন। সিতারা বেগমকে বললেন,
“তুই অনেক সহ্য করছস, তুইও দোয়া করিস।”
হাসিমুখে তিনি সবার সাথে ছোট ছোট কথা বলতে থাকলেন। কখনও পুতুলের সাথে খুনসুটি করলেন, কখনও মাহতাবকে নির্দেশ দিলেন বাড়ির জানালগুলো খুলে দিতে। ঘরের ভারী আবহাওয়াটা হুট করেই হালকা হয়ে এলো। সবাইকে হাসতে দেখে তিনি নিজেও একবার উচ্চস্বরে হাসার চেষ্টা করলেন।
হঠাৎ করেই তিনি থামলেন। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বুকটা ভরে বাতাস নিলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন,
“আল্লাহ… আল্লাহ…!”
পরক্ষণেই তার মাথাটা বালিশের একপাশে হেলে পড়ল। চোখের পাতা দুটো স্থির হয়ে এলো। এক অদ্ভুত হাসি তার মুখে তখনও লেপটে আছে। তাহসিন হাতের উপর দাদির আঙুলের চাপটা ঢিলে হতে দেখেই চমকে উঠল। সে ডাকল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৬
“দাদি? ও দাদি!”
ঘরের নীরবতা ভেঙে সিতারা বেগমের কান্নার শব্দ শোনা গেল। দীর্ঘ কয়েক বছরের গুমোট আর কলঙ্ক যেন এক বৃদ্ধার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শান্তিতে রূপ নিল। তাহসিন উপলব্ধি করল, দাদি মরে গিয়েও তাকে এক বিশাল কর্তব্যের দড়ি দিয়ে এই মাটির সাথে আবার বেঁধে দিয়ে গেলেন।
