কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৬
হামিদা আক্তার ইভা
সোনালি দুপুরটা আজ ভিন্ন রঙে রাঙিয়েছে ফরাজী বাড়ি।আজ পুরো বাড়ি পুরিপূর্ণ।ময়ূরী নিজ হাতে আজ সবার জন্য রান্না করেছে।তাহসিন বারান্দায় বসে মুগ্ধ হয়ে ছোট্ট বউটার কাজ পর্যবেক্ষণ করছে।সেই কিশোরী বধূ আজ বড্ড বেশি বড় হয়ে গেল।বড্ড ইচ্ছে করছে পুরনো সেই কিশোরীর শাড়ির আঁচলে ডুবে থাকতে।ইচ্ছে করছে বুকের ভেতর ঝাঁপটে ধরে আদুরে হাত মাথায় বুলিয়ে বলতে, “কেন এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলে বেগম সাহেবা?আমার জন্য কী আর একটু অপেক্ষা করা যেত না?বড্ড ইচ্ছে করছে তোমার কিশোরী লাজে রাঙা মুখটা দেখতে।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল নিজের ভাবনায়।সেই ছোট্ট বাচ্চা বউ আজ বড় হয়েছে।সংসার শিখে বাচ্চাও মানুষ করতে শিখে গেছে।সে দেখল,ময়ূরী কপালের ঘাম মুছে রান্না ঘর থেকে আড়চোখে লাজ মাখা চোখে বারে বারে এদিকে তাকাচ্ছে।তাহসিনের ঠোঁটের কোণের হাসি চওড়া হলো।কিছুটা গলা উঁচিয়ে বলল,
“অমন করে নজর দিয়ো না বেগম সাহেবা।রাত হলে লাজ পুষিয়ে দেব।”
ময়ূরী হঠাৎ এহেন কথা শুনে চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে বলল,
“বেহায়া লোক!লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে ফিরে এসেছেন?মুখ একদম সেলাই লাগিয়ে দিব।”
“তা দিয়ো।কাছে আসো,একটু কোলে নিয়ে ভালোবাসি।”
“ছি!অসভ্য লোক।”
দরজার সাথে তখন ফাহাদ দাঁড়িয়েছিল।তাহসিনের কথা বুঝতে না পেরে বলল,
“ও দুলাবাই,তুমি আপারে কী কও?”
তাহসিন পাশে তাকায়।ফাহাদের কথা স্পষ্ট হলেও সে সেই পুরো ‘দুলাবাই’ বলেই ডাকে।তাহসিন হেসে তাকে কাছে ডেকে বলল,
“আদর বোঝো শালা বাবু?”
“বুঝি।”
“তাহলে তোমায় বিয়ে করিয়ে দিই?তারপর বউকে আদর কোরো?”
ফাহাদ ঠোঁট ফুলিয়ে ময়ূরীর ভাঁজ পড়া কপালের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সুন্দর বউ এনে দেবে?”
“দেব।”
“তাহলে বিয়ে দিয়ে দাও।”
ময়ূরী দাঁত কটমট করে বলল,
“এসেই আপনার কাহিনি শুরু হয়ে গেছে না?একদম আমার ভোলা-ভালা ভাইকে ফাজিল বানাবেন না।”
তাহসিন বুক ফুলিয়ে বলল,
“তোমার ভাই এমনিতেই ফাজিল,আর কী ফাজিল বানাব?যখন তোমাকে বিয়ে করেছি তখন ওর বয়স কত?ওইটুকু ছেলে তখন আমার বোনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল,ভুলে গেছ?”
ময়ূরী বিরক্ত হয়ে বলল,
“তখন ও বাচ্চা ছিল।ও তখন কিছু বুঝত?”
“এখন তো বোঝে?ভাবছি আদনানের মতো একটা সিনিয়র খুঁজে বিয়েটা দিয়ে দেব।”
দুপুরে সওদাগর বাড়ি থেকে কিছু মানুষ এলেন।তাহসিন এত বছর পর সবাইকে দেখে একটু ব্যথিত হয়েছিল।আম্মা,ভাই,ভাবি—সবাই বদলে গেছে।সময় সত্যিই কারোর জন্য অপেক্ষা করে না।অরুণিমা বেগম ছেলের পাশে বসে ছিলেন।তাহসিনের শ্যামবর্ণের শরীর আর একটু চাপা হয়েছে।পাশে উজ্জ্বল রঙের ময়ূরী যেন বড্ড বেমানান।তিনি বললেন,
“তুমি কী ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করোনি সেখানে?নিজের এমন হাল করেছ কেন?”
তাহসিন বলল,
“কাজের চাপ ছিল আম্মা।এখন এসেছি আবার ঠিক হয়ে যাব।”
ময়ূরী নীরব চোখে তাকিয়ে ছিল তাহসিনের দিকে।তাহসিন ঘাড় বাঁকিয়ে ওকে দেখে হাত মুঠোয় চেপে ধরে মুচকি হেসে বলল,
“আর কোথাও যাচ্ছি না আমি।”
ময়ূরী হাসল।অরুণিমা বেগম লক্ষ্য করলেন ছেলের হাত ময়ূরীর হাতের উপর। তিনি মুচকি হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাতৃত্বের টান একপাশে থাকলেও, তিনি জানেন এই কয়েকটা বছর ময়ূরী একাই এই সংসার আগলে রেখেছে। তিনি আলতো করে তাহসিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “যাও বাবা, অনেকক্ষণ তো হলো। এবার ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও।”
তাহসিন হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। ময়ূরী ঝটপট গিয়ে ওর গামছা আর লুঙ্গিটা আলনা থেকে এগিয়ে দিল। তাহসিন ঘরে ঢোকার আগে একবার ফাহাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,
“কিরে শ্যালক, বিয়ের কথাটা তাহলে পাকা তো?”
ফাহাদ লাজুক হাসল, আর ময়ূরী ভান করে একটা কোলবালিশ তুলে নিতেই ও ভোঁ-দৌড় দিল উঠোনের দিকে। ময়ূরী বলল,
“আপনার এই বাঁদরামি কোনোদিন যাবে না।”
খাবার টেবিলে আজ উৎসবের আমেজ। খাওয়ার মাঝে মাহতাব হাসতে হাসতে বলল,
“তাহসিন, তুই তো আসলি। কিন্তু আমাদের ময়ূরীকে যে এবার একটু ছুটি দেওয়া দরকার। মেয়েটা তো গত কয়েক বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছে।”
তাহসিন খাওয়া থামিয়ে ময়ূরীর দিকে তাকাল। ময়ূরী তখন পরম যত্নে তাহসিনের পাতে মাছের বড় পেটিটা তুলে দিচ্ছে। তাহসিন ময়ূরীর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ছুটি তো দেবই। তবে ওকে একা নয়,ডাক্তারি শেষ হলে আগে ছাও পোনা দিয়ে ঘর ভরব আমি।”
কথাটা শুনে ময়ূরী লজ্জায় হতভম্ব হয়ে তাকাল।বড়দের সামনে এমন কথা সে আশা করেনি।উপস্থিত সবাই ঠোঁট টিপে হাসলেন।
বিকেলের দিকে যখন রোদ পড়ে এলো,বাড়ির সবাই যখন ভেতরে আড্ডায় ব্যস্ত, তাহসিন পা টিপে টিপে বারান্দায় এলো। ময়ূরী তখন একা দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। তাহসিন পেছন থেকে ওর কাঁধে হাত রাখতেই ময়ূরী শিউরে উঠল।
“ভয় পেয়েছ?”
তাহসিনের কণ্ঠস্বর এখন অনেক নরম।
ময়ূরী ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল,
“এত সুখ কপালে সইবে?”
তাহসিন ময়ূরীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। সূর্যাস্তের আলোয় ময়ূরীর মুখটা অপার্থিব সুন্দর লাগছে। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
” এই সুখটুকু আদায় করে নেওয়ার অধিকার আমার আছে।”
ময়ূরী তাহসিনের চোখের গভীরতায় ডুবে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনি বড্ড বদলে গেছেন। আগের সেই রাশভারী লোকটা আর নেই।”
তাহসিন মুচকি হাসল। ময়ূরীর কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“বদলে তো গিয়েছি তোমার জন্যই। শোনো বেগম সাহেবা, আজ রাতে কিন্তু কোনো বাহানা চলবে না। বাচ্চাদের দায়িত্ব আম্মা নিয়েছেন, আর আমার সবটুকু সময় আজ শুধু তোমার দখলে।”
ময়ূরী লজ্জায় লাল হয়ে তাহসিনের বুকে মৃদু এক কিল বসিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে সরে যেতে চাইল। কিন্তু তাহসিন চট করে ওর হাতটা ধরে টেনে আবার নিজের খুব কাছে নিয়ে এলো। ময়ূরীর কোমর জড়িয়ে ধরে গাঢ় স্বরে বলল,
“এখনই পালানোর পথ খুঁজছ? ঢাকায় নিজের বাড়িতে গেলে তো নিস্তার নেই। সেখানে তো শাসনের নাম করে শুধু ভালোবাসাই চলবে।”
ময়ূরী ধরা গলায় বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৫
“ঢাকায় আমাদের সেই সাজানো ফ্ল্যাটটা খুব মনে পড়ে।”
তাহসিন ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল, “আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর আমরা আমাদের সেই নীড়ে ফিরব। যেখানে কোনো দূরত্ব থাকবে না, থাকবে না কোনো হারানোর ভয়। শুধু আমি, তুমি আর আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো।”
সূর্যটা তখন দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। গোধূলির আলোয় দুজনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন সময় থমকে গেছে তাদের এই পরম পাওয়ার মুহূর্তে।
