কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৫
হামিদা আক্তার ইভা
“আম্মা,ময়ূরী এসেছে পুতুলকে নিয়ে।”
আফিয়ার কথায় সিতারা বেগম অবাক নয়নে মুখ ফেরালেন।বললেন,
“তাহসিনের বউ এসেছে?”
আফিয়া মাথা নাড়ায়।তিনি দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,
“অবশেষে বাড়িতে পা পড়ল তার?”
আফিয়া পিছু ডেকে বলল,
“সওদাগর বাড়ি আসেনি আম্মা।ফরাজী বাড়ি প্রবেশ করেছে তারা।”
সিতারা বেগমের পা থমকে গেল।ব্যথিত চোখে পিছু ফিরে বললেন,
“এই বাড়ি আসেনি?এখনও এত জেদ?”
“তাহসিন বারণ করেছে আম্মা।ময়ূরী ভাইকে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ করবে না।”
তিনি মাথা নাড়িয়ে ছুটলেন অরুণিমা বেগমের ঘরের দিকে।অরুণিমা বেগম সবে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।সিতারা বেগমকে দেখে থামলেন তিনি।সিতারা বেগম বললেন,
“হ্যা রে মেজ,ময়ূরী যে গ্রামে এসেছে জানিস?”
অরুণিমা বেগম জানতেন না এই সুসংবাদ।তিনি অবাক হতেও ভুলে গেলেন।সেই যে তাহসিন ওদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো,তারপর আর তাদের সাথে দেখা হয়নি।শাশুড়িকে রেখে ঢাকায়ও যাওয়া হয়নি।ফোনে কথা হয়েছে প্রত্যেকদিন,তবে নাতনিটাকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি।তিনি মাথায় ভালো করে কাপড় চেপে বললেন,
“আমি ফরাজী বাড়ি যাচ্ছি আপা।আম্মা আমাকে খুঁজলে বলে দিয়ো।”
“আম্মা যদি রেগে যান?”
অরুণিমা বেগম চোয়াল শক্ত করে বললেন,
“উনার যা ইচ্ছা তাই করুক।আমি আমার ছেলের বউ-বাচ্চার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।তিনি যদি ভাবেন,তার জন্য আমি আমার সন্তানদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব তাহলে ভুল ধারণা পুষে রেখেছেন তিনি।”
অরুণিমা বেগম একাই ছুটলেন বাড়ির বাইরে।কনকের মা রান্না ঘরের সামনেই ছিলেন।তিনি সব কথাই শুনেছেন।অরুণিমা বেগম বাড়ি থেকে বের হতেই সিতারা বেগমকে বললেন,
“রাস্তার মাইয়ার জন্যে কত দরদ তোমাগো।ওই কালনাগিনী কী করছে ভুইলা গেছো?”
সকাল সকাল বড্ড বিরক্ত হলেন সিতারা বেগম।দাঁত চাপলেন পরপর।বললেন,
“রাস্তার মেয়ে কাকে বলছিস?সে এই বাড়ির পুত্রবধূ।বংশ যে তোর খুব উচ্চপরিবারের তা তো নয়।তাহলে কীসের এত বড়াই?ছোটলোকি পোনা ছেড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চা।”
তিনি তেতে উঠলেন।হাতের থালা মেঝেতে সজোরে আছাড় মেরে বললেন,
“তোমাগো সবার চোখের কাটা হইছি এখন?দুইদিন আগে যখন কনকের আব্বা…”
সিতারা বেগম তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“অমন নোংরা নাম মুখে এনে আমার দিনটা নষ্ট করিস না।দূর হো চোখের সামনে থেকে।”
সিতারা বেগমের ধমক খেয়ে কনকের মা গজগজ করতে করতে থালাটা তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। তার চোখেমুখে তখনও বিষাক্ত আক্রোশ। সিতারা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে সদর দরজা ধরে দাঁড়ালেন। সওদাগর বাড়ির এই বিশাল অট্টালিকার ইটে ইটে যেন দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। মায়ূরী মেয়েটা আসার পর থেকেই অশান্তি দানা বেঁধেছিল, কিন্তু দোষ কী সত্যিই মেয়েটার? নাকি এই বাড়ির ভেতরের কুৎসিত অহংকারের?
অরুণিমা বেগম তখন প্রায় হন্তদন্ত হয়ে মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছেন। রোদের তেজ বাড়ছে, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। ফরাজী বাড়ির গেটের সামনে আসতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
তাহসিন যে বাড়িতে নেই, এই রূঢ় সত্যটা অরুণিমা বেগমের বুকেও পাথর হয়ে চেপে আছে। ফরাজী বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই তাঁর চোখজোড়া ভিজে এলো।এই মুহূর্তে তাঁর এসবি অফিসার ছেলেটা যদি পাশে থাকত, তবে আনন্দটা পূর্ণতা পেত।
অরুণিমা বেগমকে দেখে ময়ূরী দ্রুত বারান্দা থেকে নেমে এলো। পাশে তার ছোট্ট পুতুল। তিন বছর হতে চলল তাহসিন দেশের বাইরে মিশনে, এই দীর্ঘ সময়ে ময়ূরী একা হাতে সবটা সামলেছে।আগের চেয়ে কত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা।সৌন্দর্য যেন হাজার গুন বেড়ে গেছে।শ্বাশুড়িকে দেখে ময়ূরী মাথা নিচু করে সালাম জানাল। অরুণিমা বেগম ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“বড্ড একা করে দিলি আমায় মা। তাহসিন যাওয়ার আগে কত করে বলেছিলাম সওদাগর বাড়ি থেকে যেতে, কিন্তু তোরা জেদ করলি।ওই বাড়িতে একলা পড়ে আছিস, আমার কলিজাটা যে কী পরিমাণ পোড়ে তা কি জানিস?”
ময়ূরী ম্লান হেসে বলল,
“আম্মা,দাদির মনে যে জেদ, আমি সেখানে গেলে আপনাদের সম্মান আরও ধুলোয় মিশত।পুতুলের বাবা যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেছে, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে যেন কোথাও না যাই।”
অরুণিমা বেগম পুতুলকে জড়িয়ে নিলেন। দাদির গায়ের গন্ধ পেয়ে পুতুল ওর ছোট্ট হাতে অরুণিমা বেগমের আঁচল চেপে ধরল। অবিকল তাহসিনের মতো মুখ হয়েছে মেয়েটার। অরুণিমা বেগম পুতুলের কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“তাহসিনের সাথে শেষ কবে কথা হলো রে মা? ও কী জানে তোরা এই গ্রামে এসেছিস?”
ময়ূরী শুকনো মুখে আগে অরুণিমা বেগমকে নিয়ে ঘরে এলো।বিছানায় বসতে দিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে শাশুড়ির হাতে দিয়ে পাশে বসে কাতর গলায় বলল,
“আপনার ছেলে প্রায় বছর খানিক আগে আমার কাছে একটা চিঠি পাঠিয়েছিল।বলেছিল খুব শিগগিরই ফিরে আসবেন।আজ পুরো তিনটা বছর কেটে গেছে,তবুও তার দেখা নেই।”
বলতে বলতে কেঁদে উঠল মেয়েটা।অরুণিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।বাড়িতে বক্কার নেই।তিনি বাজারে গেছেন বাজার করতে।গত বছর শবনমের বিয়ে হয়েছে এই গ্রামেই।বাড়িতে চাচা,চাচি আর আব্বা ছাড়া কেউ থাকেন না।ময়ূরী নিশ্চিত শাশুড়ি না খেয়েই ছুটে এসেছে।সে রুটি আর ভাজি বানিয়েছিল।সেগুলোই এনে দিল।অরুণিমা বেগম খেলেন হালকা।তিনি পুতুলের সাথে ফাহাদকে দেখে চোখ বড় বড় করে বললেন,
“ওটা ফাহাদ?কত বড় হয়ে গেছে।”
ময়ূরী মুচকি হাসল।অরুণিমা বেগমের ভীষণ গর্ব হলো ছেলের বউকে নিয়ে।মেয়েটা আর কদিন পর ডাক্তার হবে।পড়াশোনার পাশাপাশি কী সুন্দর দুটো ছোট ছোট বাচ্চাকে একা মানুষ করছে।শরীরে এত ধকল আদৌ কুলোয়?ছেলেটা কবে আসবে আবার?কেমনই বা আছে তাহসিন?মায়ের মন কেঁদে উঠল সহসা।এক সন্তানকে হারিয়ে তিনি দিশেহারা।অন্যদিকে আরেকজনের কোনো খোঁজ খবর নেই।
দুপুরের আঁচ লাগতেই ফরাজী বাড়ির দুয়ারে এসে হাজির হলো মধু।উঁচু পেট নিয়ে কোমরে হাত রেখে কপাল কুঁচকে তাকাল বাড়ির দিকে।পেছনে ওয়াহিদ বড় ব্যাগ টেনে আনতেই মধু মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“বাড়িতে তো কেউ নেই।আপনি না বললেন ময়ূরী এসেছে?”
ওয়াহিদ করুণ চোখে বাড়ির দিকে তাকাল।ওইতো ঘরের দরজা খোলা দেখা যাচ্ছে।মধু ৭ মাসের গর্ভবতী।উঁচু পেট নিয়ে একটু চলা-ফেরা করা কষ্টই বটে।মেজাজটা সব সময় খিঁচে থাকে তার।ওয়াহিদ গলা ঝেড়ে চিৎকার করে বলল,
“এই বজ্জাত অফিসার বউ।এসেছিস নাকি?শালি সাহেবা,তাড়াতাড়ি আপনার মুখটা দেখান।”
ওয়াহিদের কণ্ঠস্বর শুনে ঘরের ভেতর থেকে দৌঁড়ে বেরিয়ে এলো ময়ূরী।মধু কেঁপে উঠল খানিক।কী রূপ মেয়েটার!চোখ ধাঁধিয়ে এলো তার।সেই ষোড়শী বধূ আজ কত বড় হয়েছে।গায়ের পাতলা গয়না গুলো চিকচিক করছে রোদের আলোয়।ময়ূরী মধুকে দেখে একগাল হেসে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল।মধু হেসে ফেলল ওর পাগলামি দেখে।ওয়াহিদ বলল,
“এই বেয়াদব,আমার বউকে ছাড়।দেখছিস না ওর পেটে বাচ্চা?”
ময়ূরী চোখ পাকিয়ে বলল,
“তুমি তো সেই আগের মতোই সতীন সতীন ভাব নিয়ে থাকো।আমার বোনকে কিন্তু দেব না তোমার কাছে।”
“তোর বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি?”
“তা আমি দিয়েছি?”
মধু লম্বা শ্বাস টেনে উঁচু পেট নিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“থামো তোমরা।”
ওরা ঘরের ভেতর এলো।অরুণিমা বেগম ও বক্কর ঘরেই ছিলেন।তারা মূলত খেতে বসেছেন বলে বাইরে বের হননি।খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই একত্রিত হয়ে এক জায়গায় বসলেন।মধু পুতুলকে দেখে কাছে ডেকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“পুতুল সোনা কত বড় হয়ে গেছে।”
পাশ থেকে ফাহাদ বলল,
“আর আমি বড় হইনি?”
হেসে ফেলল মধু।ফাহাদকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমার ছোট্ট ভাই আজীবন আমার কাছে ছোটই থাকবে।”
ময়ূরী মুচকি হাসল।চঞ্চল মেয়েটা এখন একটু ভার হয়েছে।গাম্ভীর্য বজায় রাখতে শিখেছে।অরুণিমা বেগম বাড়ি ফিরে গেলেন বিকেল দিকে।তাকে থাকতে বললেও তিনি থাকলেন না।বাড়ির সেই পুকুর পাড়ে আজ দুবোন বসল অনেক বছর পর।ময়ূরী মাথায় কাপড় টেনে দৃষ্টি নত করতেই মধু মুচকি হেসে বলল,
“অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
ময়ূরী বলল,
“মানুষ কী আজীবন ছোট থাকে আপা?”
“তা থাকে না,কিন্তু বড্ড বেশি বড় হয়ে গেছিস।”
ময়ূরী হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“আপা, ওয়াহিদ ভাই কী আগের মতোই আছে? নাকি একটু পরিবর্তন এসেছে?”
মধু একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,
“মানুষের স্বভাব কী আর বদলায় রে? সেই আগের মতোই খুঁতখুঁতে। এই যে পোয়াতি হলাম, এখন সারাক্ষণ এটা খাস না, সেটা করিস না— শাসন আর শাসন। তোর কথা বল। তাহসিন ভাই তো বিদেশে, টাকা-পয়সার কোনো টানাটানি হয় না তো?”
ময়ূরী মুচকি হেসে বলল,
“না আপা, কিন্তু সমস্যা তো টাকা না, সমস্যা হলো মানুষটা পাশে নেই। ফাহাদ আর পুতুলের পড়াশোনা, স্কুল—সব একা সামলাতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, উনি কী আসলেই মিশন শেষ করে ফিরবেন, নাকি ওখানেই থেকে যাবেন?”
“ফিরবে।ফিরতেই হবে।”
সোনালি বিকেল তখন একটু অন্যরকম।ময়ূরী চুলায় রান্না চাপিয়ে কপালের ঘাম মুছল।রাতের রান্না শেষ করতে করতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।চারপাশ অন্ধকারে তুলিয়ে গেছে।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে যে যার ঘরে চলে যেতেই ময়ূরী ঘরে এলো।পুতুল আজ খালার সাথে ঘুমাবে বলে বায়না ধরেছে।ময়ূরী ভাবল আজ একটু বেশি সময় নিয়ে পড়া যাবে।ঘরে ঢুকে চুল গুলো সুন্দর করে খোঁপা করে বসল বিছানায়।
ময়ূরী গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিল। টেবিলে রাখা হারিকেনের আলোটা অনেক আগেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ওর পড়ার বইগুলো। ঠিক সেই নিস্তব্ধ প্রহরে ও অনুভব করল, কেউ একজন পেছন থেকে খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরেছে।
প্রথমে ভয় পেলেও মুহূর্তেই সেই পরিচিত পুরুষালী শরীরের ঘ্রাণ ময়ূরীর নাকে এসে পৌঁছাল। এই ঘ্রাণ ওর অতি পরিচিত, হৃদস্পন্দনে গেঁথে থাকা এক অনুভুতি। তিন বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদও যে এই ঘ্রাণকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। ময়ূরী ঝট করে চোখ মেলল, ওর শরীরটা যেন পাথরের মতো জমে গেছে।
অন্ধকারে অবয়বটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু হাতের সেই শক্ত বাঁধন আর গলার কাছে কারো গরম নিঃশ্বাস বলে দিচ্ছে এটা স্বপ্ন নয়। ময়ূরী কাঁপা কাঁপা স্বরে অস্ফুট করে ডাকল,
“পুতুলের বাবা?”
পেছন থেকে লোকটা কোনো কথা বলল না, বাঁধনটা আরও জোরালো করল। ময়ূরী ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইতেই ওর কানের কাছে একদম ফিসফিসিয়ে এক গম্ভীর কিন্তু আবেগি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“চুপচাপ শুয়ে থাকো বেগম সাহেবা। তিন বছরের ক্লান্তি এই এক মুহূর্তেই মিটিয়ে দিতে চাই।”
ময়ূরীর দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার এসবি অফিসার স্বামী, যার কী-না সুদূর মিশনে থাকার কথা, সে এই গভীর রাতে হঠাৎ তার পাশে! ময়ূরী কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে তাকিয়ে অন্ধকারে প্রিয় মুখটা হাত দিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করল। তাহসিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর শক্ত চোয়ালের স্পর্শ পেতেই ও ডুকরে কেঁদে উঠল।
তাহসিন ওর মুখটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“আমার সোনা বউ কাঁদে না।”
ময়ূরী তাহসিনের বুকে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে উঠল।তাহসীনের বুকে কিল-ঘুষি মেরে জোরাল গলায় বলল,
“আপনি এত পাষাণ।এত গুলো বছর কোথায় ছিলেন?কেন আসেননি আমায় দেখতে?কেন ভাবেননি এই ছোট্ট মেয়েটা কিভাবে আপনাকে ছাড়া দুটো বাচ্চা মানুষ করবে?”
তাহসিন আলতো করে ময়ূরীর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। ময়ূরীর টলটলে চোখদুটো তখনও অভিমানে লাল হয়ে আছে। তাহসিন খুব নিচু স্বরে বলল,
“তিন বছরে তুমি দেখি একদম পাথর হয়ে গেছো! এই ১৯ বছর বয়সেই এত ভারিক্কি কথা শিখলে কোত্থেকে? একটুও কী মিস করোনি আমায়?”
ময়ূরী ঠোঁট উল্টে ধরা গলায় বলল,
“একদম না! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার কথা। যে মানুষটা তিন বছরে একবার ফিরে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি, তাকে মনে রেখে কী লাভ?”
তাহসিন মুচকি হাসল। ময়ূরীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তাই বুঝি? তাহলে এই যে বালিশের তলায় আমার একটা পুরনো শার্ট লুকিয়ে রেখেছো, সেটা কার জন্য?”
ময়ূরী চমকে উঠল। লজ্জায় আর অভিমানে ওর মুখটা লাল হয়ে গেল। ও তাহসিনের বুক থেকে সরে যেতে চাইল, তার আগেই তাহসিন ওকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
“ছাড়ুন আমায়! আপনি বড্ড বেশি পাষাণ। যখন পুতুলের খুব জ্বর হত, ও শুধু ‘বাবা ’ ‘বাবা’ করে কাঁদত, আমি একা ওকে নিয়ে অন্ধকার রাতে বসে থাকতাম—তখন কোথায় ছিল আপনার এই ভালোবাসা?”
তাহসিন এবার আর হাসল না। ওর মুখটা গম্ভীর হলো। ও ময়ূরীর দুই হাতের তালু নিজের গালে ঘষে বলল,
“তোমার প্রতিটি যন্ত্রণার কথা আমি জানি।কিন্তু আমি চাইলেও ফিরতে পারতাম না। বিশ্বাস করো, প্রতিটা সেকেন্ড তোমায় আর পুতুলকে বুকে আগলে রাখার জন্য ছটফট করেছি।”
ময়ূরীর অভিমানের বাঁধ এবার যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। সে তাহসিনের বুকের বোতামগুলো শক্ত করে মুচড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তাহসিন পরম মমতায় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। অনেকক্ষণ পর ময়ূরীর কান্না একটু থামলে তাহসিন ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। ময়ূরী শান্ত হয়ে তাহসিনের বুকের উত্তাপ অনুভব করতে লাগল। তিন বছরের সেই হাহাকার মেশানো শূন্যতা যেন আজ এক নিমিষেই মিলিয়ে যাচ্ছে।
তাহসিন ফিসফিস করে বলল,
“পুতুলকে কাল সকালে দেখব, এখন শুধু আমি আর তুমি।তোমার মুখখানা আমায় দেখাবে না?কত বছর হলো তোমায় দেখি না।”
ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে উঠে বসল।শাড়ি ঠিক করে ঘরের লাইট জ্বালাল।আলোর ঝলকানিতে ময়ূরীর চোখদুটো মুহূর্তের জন্য বুজে এলো। লাইটের হলদেটে আভায় তাহসিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার প্রিয়তমার দিকে। ১৯ বছরের ময়ূরী এখন আর সেই কিশোরী নেই, তার চোখেমুখে এখন এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা আর মাতৃত্বের ছায়া। কান্নায় ফোলা চোখ আর লাল হয়ে যাওয়া নাকটা তাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। পরনের শাড়িটা একটু অগোছালো, গলার পাতলা গয়নাগুলো আলোয় চিকচিক করছে। তাহসিনের মনে হলো, এই তিন বছরে সে অনেক কিছু হারিয়েছে, কিন্তু ময়ূরীকে না দেখাটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।
তাহসিন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করল,
“তুমি কী সত্যিই আমার সেই বেগম? নাকি কোনো মায়াবিনী?”
ময়ূরীও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে। তিন বছরে তাহসিন যেন আরও বেশি শক্তপোক্ত হয়েছে। রোদে পোড়া তামাটে চামড়া, চিবুকে ফুটে ওঠা ঘন কালো চাপ দাড়ি আর সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—সব মিলিয়ে তার শ্যামপুরুষকে আজ আরও বেশি গম্ভীর আর পুরুষালী লাগছে। তাহসিনের কাঁধে একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন ময়ূরীর নজরে পড়ল, যা দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল। এই মানুষটা তো শুধু দেশ পাহারা দেয়নি, মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছে।
ময়ূরী ধীর পায়ে তাহসিনের কাছে এগিয়ে এলো। কাঁপা কাঁপা হাতে তাহসিনের গালের দাড়িগুলো ছুঁয়ে দেখল সে। ধরা গলায় বলল,
“আপনি বড্ড বদলে গেছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি কালো হয়ে গেছেন, চোখের নিচে কালচে ছায়া পড়েছে। ঠিকমতো কী একবারও ঘুমাতেন না?”
তাহসিন ময়ূরীর হাতটা নিজের গালের উপর চেপে ধরে চোখ বুজল। প্রশান্তির এক লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
“ঘুমাতাম তো, কিন্তু স্বপ্নে শুধু তোমার এই মুখটাই দেখতাম। ময়ূরী, তুমি আগের চেয়ে অনেক বেশি বদলে গেছ। এই তিন বছর আমি যে কী যন্ত্রণায় কাটিয়েছি, তা শুধু আমার আল্লাহ জানেন।”
তাহসিন এবার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ময়ূরীর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার কাঁধে দুহাত রাখল। ময়ূরী লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে চোখ নামিয়ে নিল। লাইটের আলোয় ওর ফর্সা গাল দুটো এখন টকটকে লাল। তাহসিন ফিসফিস করে বলল,
“লাইটটা কী এখন নিভিয়ে দেব? তোমার এই রূপ দেখে আমার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে বেগম সাহেবা। আমি চাই না কাল সকালে কেউ আমাদের দেখে ভাবুক আমি কোনো ডাকাত।”
ময়ূরী মুচকি হাসল, সেই হাসিতে ঝরে পড়ল হাজার বছরের তৃপ্তি। সে আলতো করে তাহসিনের বুক থেকে বোতাম ছেঁড়া শার্টটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “আপনার উপর আমার অনেক রাগ ছিল, কিন্তু এখন কেন জানি সব রাগ জল হয়ে যাচ্ছে।”
তাহসিন ময়ূরীকে পাঁজাডোলা করে কোলে তুলে নিল। ময়ূরী অস্ফুট স্বরে একটা চিৎকার দিয়ে তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরল। তাহসিন ওর কানে কানে বলল,
“অভিমান তো অনেক হলো, এবার না হয় একটু ভালোবাসা হোক?”
ভোরের আলো ফুটতেই ফরাজী বাড়িতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। তাহসিন সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি; পাশে ঘুমন্ত ময়ূরীর শান্ত মুখচ্ছবি আর তিন বছরের অপেক্ষার অবসান তাকে এক অন্যরকম ঘোরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
সকাল সাতটা নাগাদ বাইরে মধুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে পুতুলকে নিয়ে এসেছে। ময়ূরী তড়িঘড়ি করে উঠে শাড়ি ঠিক করে দরজা খুলতেই পুতুল দৌঁড়ে ভেতরে এলো। কিন্তু ঘরে দীর্ঘদেহী পুরুষকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। তাহসিন খাটের এক কোণে বসে ছিল, পরনে কেবল একটা লুঙ্গি আর কাঁধে গামছা।খানিকক্ষণ আগেই গোসল সেরে এসেছে।তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এখন কেবলই পিতৃত্বের মমতায় ভিজে উঠেছে।
পুতুল বড় বড় চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে ময়ূরীর আঁচল চেপে ধরল।তার বিশ্বাস হচ্ছে না বাবা এসেছে। তাহসিন দুই হাত বাড়িয়ে ভাঙা গলায় ডাকল,
“আম্মা,আমার কাছে আসবেন না?”
পুতুল অবাক হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকাল। ময়ূরী চোখের জল মুছতে মুছতে পুতুলের কানে কানে বলল,
“পুতুল সোনা, দেখো কে এসেছে?”
পুতুল প্রথমে কথা বলতে পারছিল না, কিন্তু তাহসিনের গায়ের সেই চিরচেনা ঘ্রাণটা পেতেই সে তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে তাহসিনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“বাবা, তুমি কেন আসোনি এতদিন? আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে বলেছি তোমাকে পাঠিয়ে দিতে।মা খুব কাঁদে তোমার জন্য,জানো?তুমি খুব পঁচা।”
তাহসিন পুতুলের পিঠে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় ওকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। পুতুলের প্রতিটি অভিযোগ যেন তীরের মতো ওর বুকে বিঁধছে। সে ময়ূরীর দিকে তাকাল; ময়ূরী তখন দরজার পাল্লা ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, চোখের জল সামলানোর বৃথা চেষ্টা করছে সে।
তাহসিন পুতুলের ভেজা গাল দুটো মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“বাবা খুব পঁচা, তাই না আম্মা? কিন্তু এই পঁচা বাবাটা এবার অনেক অনেক চকলেট আর পুতুল নিয়ে এসেছে। আর কোনোদিন আপনাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না। এবার বাবাকে মাফ করে দিন তো দেখি।”
পুতুল ঝট করে বাবার কোল থেকে নেমে ময়ূরীর কাছে দৌঁড়ে গেল। ময়ূরীর শাড়ির আঁচল ধরে টেনে ওকে তাহসিনের কাছে নিয়ে এসে বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৪
“মা, তুমি কেন দাঁড়িয়ে আছো? দেখো বাবা চলে এসেছে! এখন থেকে তুমি আর রাতে লুকিয়ে কাঁদবে না, কেমন?”
পুতুলের এই নিষ্পাপ কথায় ময়ূরী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে বসে পুতুলকে জড়িয়ে ধরল। তাহসিনও এগিয়ে এসে দুজনের উপর নিজের আগলে রাখা হাত রাখল। তিন বছর পর পূর্ণাঙ্গ এক পারিবারিক বৃত্ত তৈরি হলো ফরাজী বাড়ির নিভৃত ঘরে।
