কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৪
হামিদা আক্তার ইভা
শহরে নভেম্বর আসে একটু আয়েশ নিয়ে। দুপুরের কড়া রোদটা যখন মিষ্টি হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে শীত দরজায় কড়া নাড়ছে। শহরের মানুষেরা তখন আলমারি থেকে প্রিয় ফুলহাতা জামা বা পাতলা চাদর বের করতে শুরু করেন।
বিকেলের দিকে পার্কের বেঞ্চে বা কফিশপে আড্ডাটা জমে ওঠে বেশি। যারা ব্যস্ত জীবন থেকে একটু হাঁফ ছাড়তে চান, তারা এই সময়েই কক্সবাজার বা সাজেক ভ্যালির ট্রিপ প্ল্যান করেন। রাতে হালকা ঠান্ডা বাতাসে যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দেয়া হয়, সেই তৃপ্তিটাই আলাদা।এই তৃপ্তি কী আর অষ্টাদশীর আছে?দুপুরে আজ কড়া রোদ উঠেছে।বিশাল ছাদের এক কোণায় দড়িতে জামা-কাপড় নাড়িয়ে দিচ্ছে এক অষ্টাদশী।গায়ে বাসন্তী রঙের এক খানা শাড়ি জড়ানো।হাতে চিকন স্বর্ণের বালা দুটো রোদের প্রখরতায় চিকচিক করছিল সাদা বালির মতো।সাদা টুকটুকে খালি পায়ে উকি দিচ্ছিল হালকা কাটা দাগটা।কোমরে গোঁজা শাড়ির আঁচল খুলে মাথায় চাপল কাপড় নাড়িয়ে।ছাদের দরজার সামনে তখন ফাহাদ আর পুতুল দাঁড়িয়ে আছে চুপটি করে।তারা এখন বড় হয়েছে একটু।পুতুল ক্লাস ২ তে ভর্তি হবে জানুয়ারিতে।আর ফাহাদকে প্লে-তে ভর্তি করানো হবে।দুই দুষ্টু মিলে তাহসিনের রেখে যাওয়া সেই ষোড়শী বধূকে বড্ড জ্বালায়।ষোড়শী এখন অষ্টাদশী হয়েছে।মায়াবী মুখখানা কেমন অদ্ভুত দ্বিগুণ সৌন্দর্যে ঢেকে গেছে।ময়ূরী বাচ্চাদের ফিসফিস শুনে পিছু ঘুরে দাঁড়াল।ফাহাদ আর পুতুলকে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“কী হচ্ছে এখানে?বলেছি না নিচে অপেক্ষা করতে?”
পুতুল ঠোঁট উল্টে বলল,
“একটা আঙ্কেল এসেছিল মা।”
ময়ূরীর কপালে ভাঁজ পড়ল।
“কে এসেছিল?”
“বাবার অফিস থেকে।”
ময়ূরীর স্থির মন অস্থির হলো।চঞ্চল হলো শান্ত হৃদয়।ময়ূরী দৌঁড়ে নিচে নামল ছাদ থেকে।দুতলার একটা বিশাল বড় বাড়ি এটা।তাহসিন আদনানের উপর সকল দায়িত্ব দিয়ে দেশের মাটি ত্যাগ করেছিল।সে যাওয়ার প্রায় মাস খানিক পর আদনান এই বাড়িটা কিনেছিল ময়ূরীর নামে।ময়ূরীর বুকের ভেতরটা তখন দপাদপ করছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শাড়ির আঁচলটা কখন কাঁধ থেকে পড়ে গেছে, সেদিকে খেয়াল নেই। বসার ঘরের সদর দরজাটা আধখোলা। বাইরের ঝকঝকে রোদেলা উঠোনের দিকে তাকিয়ে সে থমকে দাঁড়াল। কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না!
“পুতুল! কোথায় সে? আঙ্কেল কোথায়?” ময়ূরীর কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা।
পুতুল আর ফাহাদ ততক্ষণে হাপাতে হাপাতে নিচে নেমে এসেছে।পুতুল দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা বড় খাম দেখিয়ে বলল,
“ওই যে মা, সোফায় রেখে গেছে। তোমাকে ডাকতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে বলল তার খুব তাড়া আছে।”
ময়ূরী ধীর পায়ে সোফার দিকে এগিয়ে গেল। সাদা রঙের একটা খাম, উপরে নীল কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা— ‘আমার স্ত্রী,ময়ূরীর জন্য’। হাতের লেখাটা দেখার সাথে সাথেই তার চোখের কোণে অজান্তেই পানি জমে উঠল। এই টান, এই বাঁকগুলো তো তার অতি পরিচিত। তাহসিনের হাতের লেখা!
কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা খুলল সে।একটা ছোট চিঠি। তাতে লেখা—
“শুনছো পুতুলের মা? আমি তোমার স্বামী, মিসবাহ তাহসিন সওদাগর বলছি। তোমাকে আজ থেকে ঠিক ২ বছর আগে নিকাহ করেছিলাম আমি। আজ গত দুবছর ধরে দেশের বাইরে আছি কাজের জন্য। রেগে আছো বেগম সাহেবা?
জানি, তোমার এই অষ্টাদশী হওয়ার বসন্তগুলো আমি পাশে থেকে বরণ করতে পারিনি। বিদেশের এই যান্ত্রিক শহরে বসে যখনই ক্যালেন্ডারের পাতায় নভেম্বর দেখি, তখনই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। মনে পড়ে যায় তোমার ওই মায়াবী মুখখানা, কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে ছাদের দড়িতে কাপড় নাড়ানো, আর তোমার ওই চঞ্চল হরিণীর মতো চলাফেরা।
রেগে থেকো না বেগম সাহেবা। পুতুল আর ফাহাদকে বড় করার যে সংগ্রাম তুমি করছো, তার প্রতিটি মুহূর্ত আমি দূর থেকে অনুভব করি।অফিসে বলেছি তোমাদের সবটুকু আগলে রাখতে, কিন্তু আমি জানি, আমি পাশে না থাকলে তোমার ওই পূর্ণিমার মতো হাসিটা অধরাই থেকে যায়। এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, হয়তো আমি তোমার কাছে নেই, কিন্তু আমার পাঠানো নবান্নের নতুন সুগন্ধটা তোমার চারপাশ ঘিরে থাকবে। খুব শীঘ্রই সব কাজ গুছিয়ে ফিরছি আমি। সেদিন তোমার ওই চিকচিক করা সোনার বালার শব্দ শুনব আর তোমার ওই মায়াবী চোখ দুটোর কাছে দুবছরের হিসেব দেবো।আমার জন্য অপেক্ষায় থেকো।ইতি— তোমার অফিসার।”
চিঠিটা পড়া শেষ করে ময়ূরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দুপুরের কড়া রোদটা এখন আর গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে না। পুতুল আর ফাহাদ তখন এক কোণায় লুকোচুরি খেলছে, তাদের হাসির শব্দে বাড়িটা ম ম করছে। ময়ূরী চিঠিটা বুকের উপর চেপে ধরে চোখ বুজলো। আদনান হয়তো বাড়িটা তার নামে কিনে দিয়েছে, কিন্তু তার আসল ‘বাড়ি’ তো এখনো সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ে।
অষ্টাদশীর দুচোখ বেয়ে দুফোঁটা নোনা জল চিঠির পাতায় পড়ে তাহসিনের নামটা ভিজিয়ে দিল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“ফিরে আসুন অফিসার, নবান্ন শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসুন।”
তাহসিনের পাঠানো সেই চিঠির নবান্নের সুঘ্রাণ তখনো ময়ূরীর মনে টাটকা, কিন্তু বাস্তবটা ছিল ভীষণ কঠিন। কয়েক মাস পর যখন মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিল, ময়ূরী দেখল তার নামটা মেধা তালিকায় উপরের দিকে। খুশিতে তার চোখে জল চলে এসেছিল,কিন্তু সেই আনন্দ ভাগ করে নেয়ার মতো মানুষটা তখনো সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ে।
মেডিক্যালের প্রথম বর্ষের দিনগুলো ছিল এক অগ্নিনৈবদ্য। একদিকে অ্যানাটমি-ফিজিওলজির হাড়কাঁপানো পড়া, অন্যদিকে পুতুল আর ফাহাদের শৈশব। ভোরে উঠে বাচ্চাদের নাস্তা বানানো, তাদের স্কুলে পাঠানো, তারপর কোনোমতে নাকে-মুখে দুটো গুঁজে সাদা অ্যাপ্রনটা গায়ে জড়িয়ে মেডিকেলের করিডোরে ছুটে চলা—এটাই হয়ে উঠেছিল ময়ূরীর প্রতিদিনের রুটিন।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হত রাত জেগে পড়ার সময়। একদিকে ফাহাদ হয়তো জ্বরে কাতরাচ্ছে, আর অন্য হাতে ময়ূরীকে ধরত হত মোটা বই। ঘুমের ঘোরে পুতুল যখন ‘মা মা’ বলে জড়িয়ে ধরত, ময়ূরী এক হাতে ওকে চাপটে ধরে অন্য হাতে টর্চ জ্বালিয়ে নোট পড়ত। কলেজে যখন তার বান্ধবীরা সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, ময়ূরী তখন ক্যান্টিনে বসে দ্রুত পড়ার ফাঁকে বাড়িতে ফোন করে খোঁজ নিত বাচ্চারা ঠিকমতো খেয়েছে কি-না।
আদনান তাকে সাহায্য করত ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে বাচ্চাদের স্কুলের ফি দেওয়া থেকে শুরু করে হাড়ভাঙা খাটুনি—সবটাই এই ১৮ বছরের মেয়েটিকে একাই সামলাতে হত। তাহসিনের বস্তা ভর্তি টাকা হয়তো অভাব মেটাত, কিন্তু ময়ূরীর সেই ক্লান্তিতে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার ছিল না।
অক্টোবরের এক বৃষ্টির রাতে ময়ূরী নিজের একটা ডায়েরি বের করল।বসল পড়ার টেবিলে।হাতে কলম নিয়ে সেখানে হাত চালাল ধীরে।
“অফিসার, আপনি বলেছিলেন আমি আপনার বাড়ি। কিন্তু এই বাড়িতে এখন বড্ড ঝড়। আপনি ছাড়া মেডিকেলের এই কঠিন পড়া আর দুই বাচ্চার দায়িত্ব—সবটাই পাহাড়ের মতো ভারী মনে হয়। কিন্তু আমি হার মানব না। যেদিন আপনি ফিরবেন, সেদিন আপনার সামনে শুধু আপনার স্ত্রী হয়ে নয়, একজন ডাক্তার হয়ে দাঁড়িয়ে দেখাব।তবে আপনি কী ফিরবেন না?মাস গিয়ে বছর কেটে যাচ্ছে,তবু আপনার কোনো খোঁজ নেই।কবে আপনার বুকে আবার মাথা রাখব আমি?কবে জড়িয়ে ধরে বলব, ‘আপনার বেগম সাহেবা আজও সেই শ্যামবর্ণের এক অসভ্য পুরুষের ভালোবাসায় মগ্ন।’
নিজের স্বপ্ন আর মাতৃত্বের এই টানাপোড়েনে ময়ূরী ধীরে ধীরে ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে উঠছিল।
দ্বিতীয় বর্ষের সেই হাড়কাঁপানো শীতের রাত। ময়ূরী তখন কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের উপর প্রিপারেশন নিচ্ছিল। সামনেই কঠিন কার্ড পরীক্ষা। একদিকে পড়া শেষ করা, অন্যদিকে দুই বাচ্চার কম্বল ঠিক করে দেয়া—সবই সে একা হাতে সামলাচ্ছে।
তাহসিনের সেই ‘গোপন মিশন’ ময়ূরীর জীবনকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে দিয়েছিল। এসবি অফিসার হওয়ার কারণে তার কোনো হদিস নেই, কোনো ফোন নেই। ওই একটা পুরোনো চিঠিই ময়ূরীর একমাত্র অক্সিজেন।
বাচ্চারা এখন আর আগের মতো কান্নাকাটি করে না; ওরাও বুঝে গেছে মায়ের পড়ার সময় ডিস্টার্ব করতে নেই। ১৯ বছর বয়সে যেখানে মেয়েদের জীবন থাকে রঙিন ফিতায় বাঁধা, সেখানে ময়ূরীর জীবন বাঁধা পড়েছে মেডিকেলের সাদা পৃষ্ঠা আর মাতৃত্বের কঠিন শৃঙ্খলে।
সময়ের সাথে সাথে ময়ূরীর পরীক্ষা শেষ হলো।লম্বা একটা ছুটি পেয়েছে সে।দিনটা ছিল শুক্রবার।আদনান যেহেতু এই বাড়িতেই থাকে,তাই তাকে কষ্ট করে আর বাজার করতে হয় না।তা ছাড়া আদনান না থাকলেও তাহসিনের অফিস থেকে কোনো না কোনো অফিসার এসে সব কাজ করে দিয়ে যায়।আজ ঘুম ভাঙল তার ভোর বেলায়।নামাজ শেষে বের হলো ঘর থেকে।হিমির ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে মাস চারেক আগে।নাম রেখেছে আরাফ।বড্ড মিষ্টি বাচ্চাটা।ময়ূরী ভাবল আজ সবার জন্য নিজের হাতে রান্না করবে।যেই ভাবা সেই কাজ।রান্না শেষ করতে করতে উপর থেকে আরাফের কান্নার শব্দ ভেসে এলো কানে।মুচকি হাসল সে।এখন নিশ্চয়ই হিমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলবে, “শুনছো পুতুলের মা?তাড়াতাড়ি এই বিচ্ছুর কান্না থামিয়ে যাও।”
হলোও তাই।হিমির ডাক পড়েছে।ময়ূরী হাত মুছে তাড়াতাড়ি ছুটল উপরে।আদনান বাড়িতে নেই।তাই ময়ূরী নক করল না দরজা।হিমির কোলে চার মাসের বাচ্চাটা হাউমাউ করে কাঁদছে।ময়ূরী নিকটে এসে ওকে কোলে নিতে নিতে বলল,
“আমি বাড়িতে না থাকলে করো কী তুমি?নাজমা আপা বাচ্চাকে সামলে রাখতে পারে?”
হিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোমার দেবরকে এই কথা কী করে বুঝাই বলো?সে কী বলে জানো?”
ময়ূরী ঠোঁট টিপে বলে,
“কী বলে?”
“এই মুহূর্তে আরও একটা বাচ্চা নেয়া সম্ভব?সবে আরাফের চার মাস।”
ময়ূরী চোখ বড় বড় করে বলল,
“ভাইয়া কী আরও বেবি চাইছে?”
“তাহলে আর বলছি কী?”
মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল ময়ূরী।আরাফ কান্না থামিয়ে ময়ূরীর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।বড্ড মায়া তার এই বাচ্চাটার প্রতি।হঠাৎ শুষ্ক ঠোঁট ভেজাল।কণ্ঠে কেমন বিষণ্ণতা তার।
“তোমার বন্ধুর ইচ্ছে তারও একটা মেয়ে হবে।পুতুল তো ভাই চাই,ভাই চাই বলে মাঝে মধ্যে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে।”
হিমির খারাপ লাগল।ময়ূরীর এই এক কথা সে প্রায় বছর খানিক ধরে শুনছে।ময়ূরী আরাফের কপালে চুমু এঁকে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তোমার চাচ্চু এলে খুব বকবে,কেমন?পাষাণ লোক তোমার চাচি আম্মাকে ছাড়া কত গুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছে।দেখেছ আব্বু?”
আরাফ গাল ভরে হাসল।সে কী কিছু বুঝেছে?ময়ূরী মুচকি হেসে ওকে শুইয়ে দিয়ে বলল,
“আজ পুতুলের চাচা আর বড় আম্মা আসবেন।কী রান্না করব বুঝতে পারছি না।”
এসব নিয়েই আলাপ-আলোচনা হলো খানিকক্ষণ।আজ মাহতাব আর আফিয়া আসবে ঢাকায়।
দুপুরের খানিক আগ দিয়ে এলো তারা।পুতুল চাচা আর বড় আম্মাকে পেয়ে সব ভুলে বসেছে।খাবার দিয়েছে ময়ূরী মাত্রই।আজ বাড়ি জুড়ে মানুষ।আনন্দের শেষ নেই বললেই চলে।মাহতাব আগের চেয়ে বেশ গম্ভীর হয়েছে।ভার ভার একটা ভাব আছে মুখশ্রী জুড়ে।আফিয়ার মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই।সেই আগের মতোই আছে এখনও।খাওয়া দাওয়া শেষে ওরা বসল ড্রয়িংরুমে।মাহতাবের কোলে পুতুল বসে আছে।ফাহাদ আরাফকে নিয়ে ব্যস্ত হিমির সাথে।ময়ূরী নীরবে শাড়ির আঁচল টেনে বসল আফিয়ার পাশে।মাহতাব খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“মেজ আম্মা তোমাদের একবার দেখতে চাইছেন।নাতনির জন্য বড্ড খারাপ লাগে তার।”
ময়ূরী মাথা নিচু করে আঁচল কোঁচলে নিভু স্বরে বলল,
“আমি আমার স্বামীর আদেশ অমান্য করতে পারব না ভাইয়া।উনি আমায় বারবার বলেছেন জীবন থাকতে যেন ওই বাড়ির নাম মুখেও না আনি।আমারও ইচ্ছে হয় আম্মার সাথে দেখা করার,কিন্তু যেখানে পুতুলের বাবা নিজ মুখে এই কথা বলে গেছে,সেখানে আমি কী করে যাই বলুন?”
মাহতাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তবে আজ তোমায় আমাদের সাথে বগুড়া যেতেই হবে।তুমি নাহয় ফরাজী বাড়ি থেকো?মেজ আম্মাকে আমি তোমাদের বাড়ি নিয়ে আসব।”
এই প্রস্তাবে রাজী হলো ময়ূরী।শুনেছে আব্বার শরীর তেমন একটা ভালো নয়।তাহসিন যাওয়ার পর তো সে গ্রামে যায়নি।প্রত্যেকবার বক্কর নিজে এসে দেখা করে গেছেন তাদের সাথে।ময়ূরী কত করে বলেছে তাদের সাথে থাকতে,কিন্তু বক্কর নারাজ মেয়ের সংসারে এসে বসে থাকতে।যদিও ময়ূরী জোর করে আব্বার জন্য কিছু হাত খরচ পাঠায়।
বিকেলেই রওনা হলো সে ভাই আর মেয়েকে নিয়ে।নাজমাকে রেখে গেল হিমির কাছে।মেয়েটা একা একা বাচ্চা সামলাতে পারে না।খুব সম্ভবত আদনানের মা আসবেন এই সপ্তায়।
পুরো রাত জার্নি শেষে গাড়ি যখন গ্রামের মেঠোপথে এসে থামল, তখন পুব আকাশে সবেমাত্র ভোরের রাঙা আলো ফুটতে শুরু করেছে। শিশিরভেজা ঘাসের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করছে। গাড়িটা বাড়ির ফটকে থামতেই দেখা গেল বক্কর দাঁড়িয়ে আছেন। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা ক্ষীণ হলেও ব্যক্তিত্বে এক চুলও ভাটা পড়েনি। কোমরে হাত দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি; চোখে সেই চিরচেনা প্রখর দৃষ্টি। কোনো লাঠি বা কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই তার, একাই যেন একশ।
ময়ূরী গাড়ি থেকে নামতেই বক্কর গম্ভীর কিন্তু স্নেহাস্পদ গলায় ডাকলেন,
“এলি তবে? তোর স্বামীর আদেশের চেয়ে কী জন্মদাতা বাপের টানটা বড় হয়ে গেল?”
ময়ূরী দৌঁড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আব্বাকে।বক্কর নিজেও মেয়ের সাথে কেঁদে উঠলেন আজ।ছোট্ট ফাহাদ ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি থেকে নেমে আব্বাকে দেখেই চিৎকার করে দৌঁড়ে এলো।সোজা উঠে এলো আব্বার কোলে।বক্কর হাসি চেপে চোখের পানি মুছে বললেন,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৩
“আমার ঘরের শান্তি আবার ফিরে এসেছে।আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া।”
ময়ূরী বাড়ির ভেতর ঢুকে ডুকরে উঠল মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে।আম্মা আজ নেই গোটা তিন বছর হয়েছে।অথচ পুরো বাড়িটা সেই আগের মতোই চকচক করছিল।বক্কর অযত্ন হতে দেননি বাড়ির।ঠিক আগের মতোই ভালোবাসায় মুড়িয়ে রেখেছেন।
