Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৩

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৩

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৩
হামিদা আক্তার ইভা

আদনানের ঘরটা আজ ফুল দিয়ে মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।তাহসিন অফিসের লোক দিয়ে কাজ করিয়েছে যতটুকু সময় পেয়েছে এর মধ্যে।হতচ্ছাড়া দুটো ফ্যামিলির অনুমতি না নিয়েই আকাম করে বসে আছে।ময়ূরী হাজার চাইলেও হিমিকে নতুন শাড়ি পরাতে পারেনি।মেয়েটা কাঁদছে এখনও।খারাপ লাগল মেয়েটার।ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তৎক্ষণাৎ।অন্যদিকে আদনান ফিসফিস করছে ড্রয়িংরুমে তাহসিনের সাথে।ময়ূরী রান্না ঘরে ঢুকতেই আদনান ভীষণ নার্ভাস হয়ে বলল,

“প্রথম বিয়ে আমার,একটু আইডিয়া দে কিভাবে বাসর করব।”
তাহসিন একগাল হেসে সোজা ভাষায় বলল,
“এখন ঘরে যাবি,গিয়ে দু’চারটে ভালো মন্দ কথা বলে তোর প্যান্ট খ..”
বাকিটুকু বলার আগে আদনান ওর মুখ চেপে ধরল।
“শালা,তোকে আমি ডিটেইলস বলতে বলেছি?”
“তুই’ই তো বললি বাসর কিভাবে করবি।তাই তো বলে দিচ্ছি এর উত্তর।”
আদনান দাঁত কটমট করে উঠে দাঁড়াল।ময়ূরী তখন চা নিয়ে এসেছে দুজনের জন্য।আদনানকে চলে যেতে দেখে বলল,

“ভাইয়া,চা খাবেন না?”
আদনান নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
“আপনার জামাইকে খাওয়ান।হতচ্ছাড়ার মুখে কোনো লাগাম নেই।”
সে হনহন করে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল।ময়ূরী কপাল কুঁচকে এগিয়ে এসে চা দিল তাহসিনকে।পাশে বসে বলল,
“আপনি আবার নিশ্চয়ই কোনো বাজে কথা বলেছেন তাই না?আপনার মুখে কী কিছু আঁটকায় না?”
তাহসিন নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“আশ্চর্য!আমাকে জিজ্ঞেস করেছে বাসর কিভাবে করবে।এখন আমি যেভাবে বাসর করেছি সেইটাই তো বলব,তাই না?”
কটমট করে তাকাল ময়ূরী।হাত বাড়িয়ে তাহসিনের কান চেপে ধরে বলল,

“আপনার মুখ আমি সেলাই করে দেব,অসভ্য লোক।”
তাহসিন ব্যথায় খানিকটা কুঁকড়ে যাওয়ার ভান করে ময়ূরীর কোমর জড়িয়ে ধরল। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় ময়ূরীর রাগী মুখটা দেখে সে মুচকি হাসল। তাহসিন ধীর স্বরে বলল,
“কান ছিঁড়ে ফেললে অফিসার কিন্তু আর কোনোদিন বেগম সাহেবার মিষ্টি কথা শুনতে পাবে না। তখন ভালো লাগবে তো?”
ময়ূরী কান ছেড়ে দিয়ে ঝাড়ি মেরে হাত সরিয়ে নিল। গাল ফুলিয়ে বলল,
“আপনাকে মিষ্টি কথা শোনানোর জন্য আমার বড্ড বয়েই গেছে। আমি ভাবি আপনি বুঝি অনেক বড় অফিসার, অনেক গাম্ভীর্য আপনার। কিন্তু ঘরের ভেতর আপনি তো আস্ত একটা পাগল!”
তাহসিন চায়ের কাপে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে ময়ূরীর দিকে ঝুকে এলো। তার চোখে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক। ফিসফিস করে বলল,

“পাগল তো তোমার ওই মায়াবী চোখের চাউনিই করেছে বেগম সাহেবা। আর আদনানকে আমি যা বলেছি, সেটা তো চিরন্তন সত্য। বাসরের রাতে কোনো পুরুষ কী আর সাহেবি পোশাক পরে ভাব ধরে বসে থাকে? তুমিই বলো?আমি কী চুপচাপ বসে ছিলাম?”
ময়ূরী লজ্জায় এবার লাল হয়ে এলো। তাহসিনের এই সোজাসাপ্টা আর বেহায়া কথাগুলো সামলানো তার সাধ্যের বাইরে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু তাহসিন তার আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে টেনে ধরল।
“কোথায় যাচ্ছ? চা তো এখনও শেষ হয়নি।”
ময়ূরী আড়চোখে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ছাড়ুন! ফাহাদ বা পুতুল যে কেউ চলে আসতে পারে। লজ্জা করে না আপনার?”
তাহসিন আঁচলটা আরও একটু টেনে ময়ূরীকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তার তামাটে চেহারায় এক অদ্ভুত নেশা মেশানো হাসি। সে বলল, “নিজের ঘরে নিজের বউকে কাছে টানতে আবার লজ্জা কিসের? ফাহাদ তো পুতুলকে নিয়ে ওঘরে গল্প করছে। আজ এই বৃষ্টিভেজা রাতে আদনান আর হিমির কথা বাদ দাও তো। নিজের নতুন সংসারের কথা ভাবো।”

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে।তাহসিনের এই লাগাম ছাড়া কথা আর কাজ সারারাত চলবে।মেয়েটা বিরক্ত হয়ে ঘরে ছুটল পুতুলদের দেখতে।ওদিকে হিমি বসেছিল আদনানের বিছানায়।আদনান কপাল কুঁচকে ওর সামনা-সামনি বসে হিমির নাক টানা দেখছে।এক পর্যায় বিরক্ত হয়ে বলল,
“বাসর রাতে স্বামীকে সোহাগ না করে নাক টানছিস কেন?মে রে ফেলছি তোকে?”
হিমি রেগে চোখ তুলল।দাঁত চেপে বলল,
“তুই কথা বলবি না শয়তান।দুনিয়ায় মেয়ের অভাব পড়েছিল?আমার পেছনেই কেন লাগতে হলো তোর?”
“দুনিয়ায় মেয়ের অভাব ছিল না,তবে তোর অভাব তো ছিল।”
হিমি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

“এই বিয়ে আমি মানি না।তালাক দিবি আমাকে।”
আদনান ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে গলা ঝেড়ে বলল,
“শোন,এটা আমার প্রথম বাসর।ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করে দিস।”
হিমি হতভম্ব হয়ে কিছু বলার আগেই আদনান সে উপায় বন্ধ করে দিল।বেচারা বাইরে ভাব নিয়ে থাকলেও ভেতরে ঠিকই হারিয়ে ফেলার ভয় পেয়েছে।সে উপায় সে রাখবে?আজই বন্ধ করবে ওই রাস্তা।শক্ত-পোক্ত পুরুষের সাথে হিমি পেরে উঠল না।কবুল করা স্বামীর কাছে শেষে ধরা দিল বৃষ্টিস্নাত রাতে।

সোনালি রঙে রঙিন পুরো গ্রাম।হাট-বাজারের দিন বলে বাড়ির মেঠো পথ ধরে শত মানুষের যাতায়াত।মধু কাল শ্বশুর বাড়ি যাবে ওয়াহিদের হাত ধরে।বাড়ির বড় দেয়াল ভাঙা হয়েছে ফরাজী বাড়ির।চাচার বাড়ি আর তাদের বাড়ি একত্রিত করা হয়েছে।চাচি দেখ-ভাল করবেন বক্করের।এখন মধু চিন্তা মুক্ত।আব্বার কারণে বিয়ের এতদিন পরও তার শ্বশুর বাড়ি পা রাখা হয়নি।বাড়ির বড় উঠোনে সোনালি বিকেলে চেয়ার পেতে বসেছিল ওয়াহিদ।শবনম এসে তাকে মুড়ি মাখা দিল।বসল ঠিক তার পাশের চেয়ারে।রান্না ঘরে মধু ব্যস্ত।আব্বা দোকানে গেছেন।তিনি আজ-কাল বাজারেই বেশি সময় কাটান।
ওয়াহিদ শবনমকে দেখে বলল,
“শালি হলো আধি ঘরওয়ালী।ভাবছি তোমার বোনের সাথে সাথে তোমাকেও আমার বাড়ি নিয়ে যাব।”
শবনম খিলখিল করে হেসে উঠল।মধু রান্না ঘর থেকে কপাল কুঁচকে বলল,
“শুধু দুটো করলে হবে?একসাথে চার বউ নিয়ে সংসার করুন,তাহলেই না নিজেকে পুরুষ মনে হবে।”
ওয়াহিদ চোখ বড় বড় করে বলল,

“সত্যি চার বিয়ে করব?”
“কেন নয়?বিয়ের পর আপনার বাড়িতে চারটে কবর খুঁড়ে রাখবেন।”
“কবর খুঁড়ব কেন?”
“ওমাহ!আপনার তিন বউয়ের সাথে আপনি কবরে যাবেন না?একা একা গেলে তো তারা কষ্ট পাবে,তাই না?”
শুকনো হাসল ওয়াহিদ।বলদ বউটাও বেশ চালাক হয়ে গেছে।জামাইকে ভালোই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়।বিকেল শেষে রাত হলো।বক্কর ফিরলেন বাড়িতে।কথা হলো মেয়ের বিদায় নিয়ে।ভদ্রলোকের মনটা আজ বড্ড খারাপ।তিন সন্তানের এক সন্তানও তার কাছে থাকে না।ফাহাদকে তিনি রাখতে চেয়েও রাখতে পারেননি।ওইটুকু বাচ্চাকে তিনি কিভাবে সামলাবেন?আজ আছে তো কাল নেই।এর চেয়ে বরং নিরাপদ জায়গায়ই থাক।

কাল রাতে বৃষ্টি হলেও আজ আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ।
বক্কর কবরের শিয়রে রাখা আগরবাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো যেন অতীতে ফিরে যাওয়ার এক একটি সিঁড়ি। পূর্ণিমার রুপোলি আলোয় ফিরোজা বেগমের কবরের চারপাশটা এক অপার্থিব শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। বক্কর গাছের সাথে হ্যালান দিয়ে ধীরস্থিরভাবে বসলেন। আজ তার কণ্ঠস্বর খুব নিচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন কলিজার ভেতর থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে।
“ফিরোজা, প্রকৃতির কী বিচিত্র নিয়ম দেখেছ? আমি তো এই বাড়ির বিশাল দেয়াল তুলেছিলাম তোমাকে আগলে রাখব বলে। কিন্তু আজ সেই দেয়ালও ভাঙল, আর আমার সাজানো বাগান থেকেও একে একে সব ফুল ঝরে পড়ছে। তুমি তো জানো, আমি কোনোদিন পরাজয় স্বীকার করতে শিখিনি। কিন্তু আজ পরাজয়টা যেন বড্ড বেশি আপন মনে হচ্ছে।”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন। চাঁদের আলো তার ললাটের ভাঁজগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“কাল মধু চলে যাবে। যে মেয়েটার পায়ের শব্দের অপেক্ষায় আমি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর জানালার ধারে বসতাম, কাল থেকে সেই জানালাটা শুধুই শূন্যতা বয়ে আনবে। লোকে আমাকে ‘কঠিন বক্কর ফরাজী’ বলে চেনে, তারা কী জানে—পাথরের গায়েও শ্যাওলা জমে মায়ার টানে? ফাহাদকে নিজের কাছে রাখার কত তীব্র ইচ্ছা ছিল আমার, অথচ নিয়তির কাছে আমি কতখানি অসহায়! নিজের রক্তকে নিজের কাছে রাখার অধিকারটুকুও আজ আমি বিসর্জন দিয়েছি শুধু ওদের ভালোর জন্য। মানুষ আসলে কত বড় একা, তা নিজের আপনজনদের বিদায়েই সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়।”

বক্কর কবরের মাটির উপর আলতো করে হাত রাখলেন। যেন ওপার থেকে ফিরোজা বেগম তার হাতের স্পর্শ অনুভব করছেন। তিনি অশ্রুভারাক্রান্ত কণ্ঠে কিছু জীবনবোধের উক্তি আওড়ালেন,
“জীবন বড় অদ্ভুত ফিরোজা! যে ঘরকে আমরা পূর্ণতা দিয়ে সাজাই, সময়ের স্রোতে সেই ঘরই একদিন শূন্যতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। আমরা আসলে কেউ কাউকে আগলে রাখতে পারি না, শুধু মায়ার একটা অদৃশ্য শেকলে নিজেকে বেঁধে রাখি।”
তিনি আরও বললেন,
“মানুষের অহংকার কেবল তখনই চূর্ণ হয়, যখন সে বুঝতে পারে—বিশাল রাজপ্রাসাদে থাকলেও দিনশেষে তাকে একা একাই নক্ষত্র গনার মিছিলে সামিল হতে হয়।”

বক্কর একটু থামলেন। তারপর ধরা গলায় শেষবারের মতো বললেন,
“মধু যখন কাল ওয়াহিদের হাত ধরে মেঠো পথটা মাড়িয়ে যাবে, আমি হয়তো দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকব। ফিরোজা, তুমি উপর থেকে ওর উপর নজর রেখো। তোমার মা-হীন এই মেয়েটা বড় অভিমানী। ওয়াহিদ হয়তো ওকে আগলে রাখবে, কিন্তু বাবার হাতের সেই নির্ভরতা কী ও খুঁজে পাবে? আজ রাতে এই পূর্ণিমার চাঁদের সাক্ষী রেখে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। সন্তানদের কাছে থাকতে পারলাম না, হয়তো এটাই আমার বড় শাস্তি।বক্কর ফরাজী আজ রাজা হয়েও এক পরম নিঃস্ব ভিখারি।”
পরেরদিন ঠিক সকাল সকাল বাড়ি হতে বের হলো ওরা।বক্কর ওয়াহিদের হাত মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“আমার মেয়েকে বড় আশা নিয়ে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি বাবা।ওকে কখনও কষ্ট দিয়ো না।”
মধু ডুকরে উঠল।বক্কর তবুও মেয়েকে ধরলেন না।শুধু মাথায় আলতো হাত স্পর্শ করে বললেন,
“খুব খুশি হও।স্বামী-সংসার যত্নে রেখো মায়ের মতন।মাঝে মধ্যে আব্বাকে একপলক দেখতে এসো।”
এই ছিল তার শেষ বাক্য।মধু বিদায় নিতেই পুরো ফরাজী বাড়িটা খাঁ খাঁ লাগছিল।মধু,ময়ূরী,ফিরোজা বেগম কিংবা ফাহাদ—কেউ নেই সেই মরুভূমিতে।এক বাবার ভাঙা মন পড়ে রইল সেখানে।তিনি ভেজা চোখে বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,
“মৃ’ত্যুর আগে একটাবার আমার সন্তানদের দেখবার সুযোগ দিয়ো আল্লাহ।”

তখন প্রায় মধ্যরাত।একা ঘরে বাচ্চারা ঘুমাতে পারবে না বলে তাহসিন বাচ্চাদের নিজের কাছেই রেখেছে।আদনান হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই নিজের ফ্ল্যাটে শিফট হবে।তার একটা বড় ফ্ল্যাট কেনা উচিত।মেয়েটাও বড় হচ্ছে,কদিনই আর বাবা-মায়ের সাথে থাকবে?আবার ফাহাদও বড় হচ্ছে।ময়ূরী পুতুলকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমাচ্ছে।অন্যদিকে ফাহাদ তাহসিনের গলা যেভাবে পেরেছে অভাবেই পেঁচিয়ে ধরে ঘুমে ডুবে আছে।তাহসিনের চোখে ঘুম নেই।তার কাজ হাতে এসেছে এবার।খুব সম্ভবত বাংলাদেশের বাইরে যাবে তার টিম।কয়েক মাস কিংবা বছরও লাগতে পারে মিশন শেষ হতে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশে ময়ূরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।এইটুকু মেয়ে দুটো বাচ্চার সাথে পড়াশোনা সামলাবে কী করে?সওদাগর বাড়ি যাওয়ারও তো উপায় নেই কোনো।যদিও এখানে আদনান আছে,তবুও তার এখন সংসার হয়েছে।সেই সংসার রেখে তাহসিনের সংসার দেখবেই বা কেন?

ফরজের সময় ময়ূরী উঠেছিল।তাহসিন মসজিদ থেকে ফিরতেই তাকে গরম গরম চা দিয়ে সকালের নাস্তা বানাল।বেশ সময় লাগল তাতে।সকাল ৯টার দিকে তাহসিন ডাকল তাকে ফ্ল্যাটের বড় বারান্দায়।বাচ্চারা আজ এখনও ওঠেনি।ময়ূরী আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে গেল।তাহসিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তাহসিন কোমর সমান রেলিং-এ হ্যালান দিয়ে ময়ূরীকে জড়িয়ে ধরে আবদ্ধ করল শক্ত বুকে।ময়ূরী পিছু ঘুরে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল তাকে।
“আজ আপনার মন এত ভার কেন?”
তাহসিন ময়ূরীর মুখের সামনে চলে আসা চুল কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,
“তোমার সাথে আমার কথা আছে।”
“বলুন।”
“মন খারাপ করবে না একদম।”
মেয়েটা আতঙ্কে শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়ল।
তাহসিন ময়ূরীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখের গভীরে একরাশ অনিশ্চয়তা আর মায়া খেলে যাচ্ছে। শান্ত স্বরে সে বলতে শুরু করল,

“আমার পেশা সম্পর্কে অবশ্যই তোমার ধারণা আছে? আমার হাতে কাজ এসেছে ময়ূরী। কাজটা খুব একটা সহজ নয়, আর তার চেয়েও বড় কথা এটার গন্তব্য দেশের বাইরে। আমাকে কাল রাতেই বের হতে হবে। কাজ শেষ হতে কতদিন লাগবে, আমি নিজেও জানি না। কয়েক মাস হতে পারে, এমনকি বছরও পার হয়ে যেতে পারে।”
ময়ূরীর চোখের মণি স্থির হলো। সে কম্পিত গলায় বলল,
“বছর? আমি… আমি পুতুল আর ফাহাদকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে একা কী করে থাকব? অন্তত কোথায় যাচ্ছেন সেটাতো বলবেন?”
তাহসিন ময়ূরীকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। রেলিংয়ের ওপাশে ঢাকার ব্যস্ত শহরটা তখন সজাগ হতে শুরু করেছে, কিন্তু তাদের বারান্দায় এক থমথমে নীরবতা। তাহসিন গম্ভীর গলায় বলল,
“শোনো ময়ূরী,এসবি অফিসার হিসেবে আমাদের কিছু শপথ নিতে হয়। আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি এটা এই মুহূর্তে পৃথিবীর কাউকে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি তুমি যদি আমাকে কসমও দাও, তবুও আমি মুখ খুলতে পারব না। এটাই আমার ডিউটি।”

তাহসিনের কথাগুলো ময়ূরীর কানে বিষের মতো লাগল। “বছরখানেক সময়” আর “যোগাযোগহীনতা”—এই শব্দগুলো ষোড়শী মেয়েটার সাজানো দুনিয়াটাকে এক মুহূর্তে তছনছ করে দিল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তাহসিনের শার্টের কলারটা দুহাতে খামচে ধরে তার বুকের মাঝে আছড়ে পড়ল সে। অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“না! আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না। আপনার ওই চাকরি, ওই ডিউটি দিয়ে আমার কী হবে? আমি পুতুল আর ফাহাদকে নিয়ে এই জনশূন্য ফ্ল্যাটে কীভাবে কাটাব? আমাকেও সাথে নিয়ে চলুন, নয়তো চাকরি ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচব না।”

তাহসিনের বুকের উপর ময়ূরীর কান্নার প্রতিটি ফোঁটা যেন তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিল। সে ময়ূরীর পিঠে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরে মাথাটা নিজের চিবুকের সাথে ঠেকিয়ে রাখল। ময়ূরী তখন ডুকরে ডুকরে কাঁদছে আর বলছে,
“আদনান ভাইয়া চলে যাবে, আপনিও যদি না থাকেন তবে অন্ধকার রাতে আমার ভয় করবে না? আপনি তো জানেন আমি একা ঘরে ঘুমাতেও পারি না। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাদের এভাবে ফেলে যাবেন না।”
তাহসিন ময়ূরীকে একটু আলাদা করে দুহাতে তার মুখটা আঁকড়ে ধরল। নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলল,
“ময়ূরী, শান্ত হও। তুমি কাঁদলে আমি পা বাড়াব কী করে? এসবি অফিসার হিসেবে আমার ঘাড়ে দেশের দায়ভার দেওয়া হয়েছে। আজ আমি যদি আমার কর্তব্যে অবহেলা করি, তবে হাজারও পরিবার বিপদে পড়বে। আমি তোমার স্বামী, কিন্তু তার আগে আমি এই দেশের একজন অতন্দ্র প্রহরী। তুমি কী চাও তোমার স্বামী একজন কাপুরুষ হয়ে ঘরে বসে থাকুক?”

ময়ূরী মাথা নেড়ে বারণ করল, কিন্তু তার কান্না থামল না। সে হেঁচকি তুলে বলল,
“আমি অত দেশ বুঝি না, আমি শুধু আপনাকে বুঝি। আপনি ছাড়া এই ফ্ল্যাটটা তো আমার কাছে জেলখানা হয়ে যাবে। অন্তত বলুন কোথায় যাচ্ছেন? আমি কী একটু কল বা চিঠিও পাব না আপনার?”
তাহসিন ময়ূরীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে বলল,
“না বউ। আমাকে এমন এক মিশনে যেতে হচ্ছে যেখানে আমার কোনো পরিচয় থাকবে না। আমি সেখানে তাহসিন নই, স্রেফ একজন সাধারণ মানুষ। হয়তো চাইলেও তোমার গলার আওয়াজ শুনতে পাব না। কিন্তু মনে রেখো, আমার প্রতিটি নিশ্বাসে শুধু তোমার নাম থাকবে। তুমি যদি ভেঙে পড়ো, তবে ফাহাদ আর পুতুলকে কে দেখবে? ফাহাদ তো তোমারই ভাই, ও কার মুখ চেয়ে থাকবে?”

ময়ূরী এবার তাহসিনের কোমর জড়িয়ে ধরে অবুঝের মতো তার পেটে মুখ লুকিয়ে কান্না করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, এই অফিসারের সিদ্ধান্ত অটল। তাহসিন ময়ূরীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে ফিসফিস করে বলল,
“আমার উপর বিশ্বাস রাখো ময়ূরী। তোমার দোয়া থাকলে আমি ঠিক ফিরে আসব।কোনো এক এমন ভোরে আবার তোমার জন্য একগুচ্ছ কদম নিয়ে বারান্দায় ফিরে আসব। শুধু ততদিন নিজের আর বাচ্চাদের খেয়াল রেখো।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪২

ঢাকার সেই ব্যস্ত সকালে, এক যান্ত্রিক শহরের কোলাহলের মাঝে বারান্দার ওই নিভৃত কোণে এক কিশোরী বধূ তার স্বামীকে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে রইল, আর এক অফিসার তার কর্তব্যের টানে নিজের কলিজার টুকরোটাকে ছিঁ’ড়ে রেখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
তাহসিনের এই প্রস্থান কী ময়ূরীর জীবনে নতুন কোনো সাহসের জন্ম দেবে, নাকি একাকীত্বের এই দীর্ঘ রাত তাকে মানসিকভাবে তছনছ করে দেবে?

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৪