Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ৪২

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪২

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪২
হামিদা আক্তার ইভা

ভালোবাসা আসলে কোনো শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে সাজানো সংজ্ঞা নয়, ভালোবাসা হলো বুকের বাঁ-পাশে জমে থাকা এক খণ্ড অখণ্ড নীরবতা। এটি সেই অবাধ্য চিনচিনে ব্যথা, যা নিশ্বাসের সাথে মিশে গিয়ে প্রতিটা রক্তবিন্দুতে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করে। যখন আপনি কাউকে ভালোবাসবেন, তখন দেখবেন আপনার নিজের জগতটা হঠাৎ করে ছোট হয়ে এসেছে, আর সেই মানুষটার অস্তিত্ব হয়ে উঠেছে আপনার পুরো মহাকাশ। ভালোবাসা মানে হলো কারোর রুক্ষ মেজাজ, গম্ভীর চাহনি আর একরাশ অবহেলার ভেতরেও এক চিলতে মায়া খুঁজে পাওয়া। এটি হলো সেই মায়াজাল, যেখানে আপনি স্বেচ্ছায় ধরা দেন, যেখানে হেরে যাওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি। আপনার নিজের হাজারটা দুঃখ থাকলেও, প্রিয় মানুষটার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল দেখলে যখন মনে হয় আপনার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, তখনই বুঝবেন আপনি ভালোবাসার অতল সমুদ্রে ডুব দিয়েছেন।

ভালোবাসা এক বিচিত্র দাসত্ব, যেখানে আপনি মুক্ত হয়েও পরাধীন। যখন আপনি জানবেন সেই মানুষটা আপনার কদর করছে না, হয়তো সে তার নিজের গাম্ভীর্যের আড়ালে আপনাকে আড়াল করে রাখছে, তবুও আপনার অবাধ্য মন কেবল তার ফেরার পথেই তাকিয়ে থাকবে।নারীর মন বড্ড বেঈমান।অন্তত একথা আফিয়ার পক্ষে এটাই হয়েছে।মেয়েটা এই কটা মাস কতই না যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার পরও যখন রাতে ক্লান্ত হয়ে তার সঙ্গ চাইতে আসত,তখন মনে হত শরীরটা টেনে ছিঁ ড়ে ফেলতে।তখন মনে হয়েছিল হয়তো শরীর’ই সব।আসলেই কী তাই?শরীর সব হলে সর্বপ্রথম মাহতাব শান্তার কাছেই যেত।সে তো ওই নারীকে কখনও ছুঁয়েও দেখেনি।এক বিছানায় থাকেনি,ভালোবাসার নজরে কখনও তাকায়নি।
হয়তো কাল’ই শান্তাকে তার ছোট খালার কাছে দিয়ে আসা হবে।আফিয়ার বড্ড খারাপ লাগল মেয়েটার জন্য।সেও তো এই বাড়ির বউ ছিল।কিন্তু সুখ যে তার কপালেও সইলো না।

মধ্যরাত ঘনিয়ে ভোর হবে হবে ভাব।আফিয়া চাইলেও স্বামীর প্রতি জেদ ধরে রাখতে পারেনি।কেমন হাত-পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইছিল,কাঁদছিল,ভয়ে কেমন কথা গুলিয়ে যাচ্ছিল।তাহসিন তো যাওয়ার আগে সব প্রমাণ দিয়ে গেল।কী নিয়েই বা আর জেদ করবে সে?আজ বহুদিন পর আফিয়া নিজ থেকে কাছে এসেছিল মাহতাবের।হালকা রঙের বিছানায় দুটো শরীর লেপ্টে আছে তখন।
জানালার ওপাশে ভোরের সেই অস্পষ্ট ধূসর আলো তখন ঘরের ভেতরের ঘনীভূত অন্ধকারকে আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে। ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, কেবল মাহতাবের অনিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ আফিয়ার কানের কাছে আছড়ে পড়ছে। আজ কত মাস পর এই পরিচিত উষ্ণতা সে ফিরে পেল! অথচ এই উষ্ণতাই এক সময় তার কাছে আগুনের মতো অসহ্য মনে হত।

আফিয়া অনুভব করল মাহতাবের বলিষ্ঠ হাত দুটো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। ঘুমের ঘোরেও মাহতাব যেন তাকে ছাড়তে চাইছে না, ঠিক যেন হারিয়ে ফেলার ভয়ে ভীত কোনো এক অবুঝ শিশু। আফিয়ার খুব ইচ্ছে হলো মাহতাবের কপালে জমে থাকা সেই অবিন্যস্ত চুলে হাত বুলাতে। সে আলতো করে নিজের হাতটা তুলল। মাহতাবের তামাটে শরীরের উপর ভোরের আলো পড়ে এক আশ্চর্য আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে।
আফিয়া মনে মনে হাসল—এটাই কী তবে সেই নারীর মন? যে মাহতাবকে সে ঘৃণা করতে চেয়েছিল, যার প্রতি ঘৃণায় তার শরীর রি রি করত, আজ সেই মাহতাবের বুকে মাথা রেখে সে এক আশ্চর্য প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে। শরীরের অধিকারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মনের টান। মাহতাবের সেই কান্নাভেজা চোখ আর ভাঙা গলার আকুতি আফিয়ার ভেতরের সব পাথর গলিয়ে জল করে দিয়েছে।
হঠাৎ মাহতাব একটু নড়ে উঠল। ঘুমের ঘোরেই ফিসফিস করে ডাকল,

“আফিয়া… চলে যাবে না তো?”
আফিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে মাহতাবের বুকের বাঁ-পাশে নিজের কান পাতল। সেখানে হৃদপিণ্ডের ধকধক শব্দটা তাকে এক নিদারুণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল—এই মানুষটার প্রতিটি স্পন্দন কেবল তাকেই ডাকছে। শান্তার কথা ভেবে তার বুকটা আবার একটু হাহাকার করে উঠল। আহারে মেয়েটা! মাহতাবের পাশে থেকেও সে কোনোদিন মাহতাবের হতে পারেনি। ভালোবাসা আসলে এক আশ্চর্য বেইনসাফি। কেউ সব পেয়েও তৃপ্ত নয়, আর কেউ এক ফোঁটা মায়ার জন্য সারা জীবন মরুভূমির তৃষ্ণা নিয়ে বাঁচে।

আফিয়া নিজের মুখটা মাহতাবের ঘাড়ে আরও একটু ডুবিয়ে দিল। ভোরের এই স্নিগ্ধ আলোয় মাহতাবের গায়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণ তাকে মাতাল করে দিচ্ছে।কাল থেকে জীবনটা অন্যরকম হবে। শান্তা চলে যাবে, প্রমাণের সত্যতা সামনে আসবে, সমাজ কথা বলবে—কিন্তু এই অন্দরমহলের চার দেয়ালের ভেতরে তারা আবার সেই পুরনো আফিয়া আর মাহতাব হয়ে উঠবে।
আফিয়া আলতো স্বরে মাহতাবের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“কোথাও যাব না।আপনার অবহেলা সয়েছি, এখন আপনার এই গভীর আসক্তিটুকুও সয়ে নেব।”
মাহতাবের শক্ত হাতের বাঁধন যেন আরও একটু দৃঢ় হলো। বিছানার সেই হালকা রঙের চাদরে দুটি শরীর লীন হয়ে গেল ভোরের আসন্ন আলোর অপেক্ষায়। বিরহ আর অপমানের দীর্ঘ রাতের পর আজ যেন এক নতুন ভোরের সূচনা হলো তাদের জীবনে, যেখানে জেদ নয়, ভালোবাসাই শেষ কথা বলছে।

আশ্বিনের শেষ বেলা। ঢাকার আকাশে সাদা মেঘের ভেলাগুলো নীলিমার গায়ে আলসেমি করে ভাসছে। শহরের যান্ত্রিক ধুলোবালি ভেদ করে তাহসিনের এই ফ্ল্যাটটিতে যখন বিকেলের নরম রোদ এসে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠল চারপাশ।
তাহসিনের এই ফ্ল্যাটটিতে এখনো রঙের হালকা গন্ধ লেগে আছে। ড্রয়িংরুমের কোণে কয়েকটা কার্টন এখনো খোলা হয়নি।ময়ূরী পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি জড়িয়ে জানালার পর্দাগুলো ঠিক করছিল। বয়স মাত্র ষোলো, কিন্তু এই অল্প বয়সেই তার কাঁধে চেপেছে এক বিশাল সংসারের দায়িত্ব। ময়ূরীর ডাগর চোখে এখনো কৈশোরের চপলতা লেগে আছে, কিন্তু আঁচলে চাবির গোছা আর কপালে ছোট্ট টিপ তাকে এক পূর্ণাঙ্গ ‘গৃহিণী’র রূপ দিয়েছে।
ফ্ল্যাটের অন্য পাশে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফাহাদ মেঝেতে বসে পুতুলের সাথে খেলায় মত্ত।

তাহসিন অফিস থেকে ফিরল একগুচ্ছ কদম আর কিছু মিষ্টি নিয়ে। অক্টোবর মাসের এই সময়ে কদম মেলা ভার, তবুও সে কোথা থেকে যেন জোগাড় করেছে। দরজা খুলেই সে থমকে দাঁড়াল। একদিকে তার আদরের ছোট শালা আর মেয়েটির খুনসুটি, আর অন্যদিকে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তার মায়াবী রূপসী স্ত্রী। তাহসিনের মনে হলো, এই ইটের দেয়ালের ফ্ল্যাটটি আজ আসলেও একটি ‘ঘর’ হয়ে উঠেছে।
তাহসিন ধীর পায়ে ময়ূরীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ময়ূরী চমকে ফিরে তাকাতেই তাহসিন হাসিমুখে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল। ময়ূরী লজ্জায় মাথা নিচু করল।আদনান তখনও ফেরেনি বাসায়।ময়ূরী ঘরে ঢুকলে তাহসিন পিছু যায়।ময়ূরী ফুলের তোড়াটা বিছানার এক কোনায় রেখে বলে,

“আপনার ভাই তো খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেবদাস হয়ে ঘুরছে।”
তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার কিছু করার নেই।হিমিকে আজ বাসায় ডেকেছি।দেখি একটাবার কথা বলে।”
ময়ূরী মাথা নেড়ে সায় দিল।রাতের জন্য ছুটল রান্নাঘরে।রান্না তেমন জানে না বলে তাহসিন ফ্রেশ হয়ে এসে দুজন মিলে যা পারল তাই করল।ড্রয়িংরুম থেকে তখন বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হাসার শব্দ শোনা যাচ্ছে।তাহসিন হাসল মনেমনে।রান্নার ফাঁকে ময়ূরীর কানের লতি ছুঁয়ে বলল,
“বেগম সাহেবা,আমায় বাবা ডাক শোনাবেন কবে?”
এমন সময় তাহসিনের এহেন কথায় মিইয়ে এলো মেয়েটা।চোখ পাকিয়ে বলল,
“বড্ড বেহায়া হয়ে যাচ্ছেন অফিসার।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।রাতে বাসায় হিমি এলো।আদনান চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল। সবার খাওয়া দাওয়া শেষে তাহসিন হিমির সাথে বসল ড্রয়িংরুমে।মেয়েটার মুখ ভার।লম্বা শ্বাস টানল তাহসিন।বলল,
“দেখ,জোর দিয়ে তো কিছু বলতে কিংবা করতে আমি পারব না।কিন্তু তুই তো জানিস আদনান তোকে ঠিক কতটা ভালোবাসে।”
হিমি বলল,

“এই ভালোবাসা আমি কবুল করি কিভাবে?তুই নিজেই একটাবার ভেবে বল?ওর আর আমার বয়স দেখেছিস?”
“বয়স দিয়ে ভালোবাসা হয় না।”
“মুখে বললেই এটা হয় না তাহসিন।আমার পরিবার আছে,ওর পরিবার আছে আর লোকেই বা কী বলবে?নিজের চেয়ে ছোট একটা ছেলেকে আমি বিয়ে করেছি?ছেলে পাইনি বলে ওকে ফাঁসিয়েছি?”
“আশ্চর্য!লোকে তোদের দুবেলা খাবার দিয়ে যাবে?আর ফ্যামিলিকে বুঝিয়ে বললেই বুঝবে।আমি আদনানের মা-বাবার সাথে কথা বলব।”
“আর আমার?”
তাহসিন শান্ত হলো।বলল,

“শুধু বল তুই কী চাস?আদনানের সাথে সংসার করতে পারবি?”
হিমি উত্তর দিল না।আদনান ওর ঘরের সামনে বুকে হাত গুঁজে দেয়ালে হ্যালান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।হিমির নীরবতা দেখে যেন উত্তর খুঁজে নিল নিজেই।হনহন করে এগিয়ে এসে হঠাৎ হিমির হাতটা খোঁপ করে ধরে ফেলল।ভড়কে গেল সবাই।হিমি আশ্চর্য হয়ে বলল,
“হাত ধরেছিস কেন?”
আদনান উত্তর না দিয়ে তাহসিনকে বলল,
“কাজী অফিসে চল।ওর এই বালের ঢঙ আর সহ্য হচ্ছে না আমার।”
তাহসিন কপাল কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তুই পাগল?ফ্যামিলিকে না জানিয়ে বিয়ে করবি?”
“তুই যাবি কিনা?”

হিমি চিৎকার করার জন্য মুখ খোলার আগেই আদনান হঠাৎ কোলে তুলে নিল হিমির শুকিয়ে যাওয়া পাতলা শরীরটা।আঁতকে উঠল মেয়েটা।ময়ূরী হতভম্ব হয়ে তাহসিনের শার্ট ঝাকিয়ে বলল,
“আপনার ভাই আপুকে নিয়ে চলে যাচ্ছে তো!”
তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে বের হলো বাসা থেকে।কী আর করার!
কাজী অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরা।হিমি কেঁদে-কুটে বেহাল অবস্থা বানিয়েছে নিজের।গালের মধ্যে আদনানের দানবীয় হাতের ছাপ বসে আছে।কী মারটাই না মারল।খানিকক্ষণ আগে যে আদনানের মুখ ছিল গম্ভীর,সেই আদনান এখন বাচ্চাদের মতো হইহুল্লোড় করছে একা একাই।মিষ্টি কিনে এনে খাওয়াচ্ছে রাস্তার বাচ্চাদের।ময়ূরীর মায়া হলো হিমির উপর।আহারে!তাকেও এভাবে জোর করা হয়েছিল,কিন্তু এখানে ব্যাপারটা ভিন্ন।হিমি আদনানকে ভালোবাসে,তবে ময়ূরী তখন তাহসিনকে ভালোবাসত না।সে ঘাড় উঁচু করে পাশে তাকাল।তাহসিন প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।বাচ্চা দুটো আদনানের সাথে।ময়ূরী একটু শরীর ঘেঁষে দাঁড়াল ওর।তাহসিন চোখ নামিয়ে ময়ূরীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালে ময়ূরী বলে,

“আমার ভালো লাগছে না।বাসায় যাব কখন?”
তাহসিন ময়ূরীর কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল,
“আদনানের ঘরে কাজ চলছে।শেষ হলেই যাব।”
বলতে বলতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হলো।আদনান ফাহাদ আর পুতুলকে নিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠল।খানিকক্ষণ পর এসে হিমিকে টানতে টানতে নিয়ে গেল।অথচ খোলা আকাশের নিচে তখন এক দম্পত্তি দাঁড়িয়ে।দুজনেই ভিজে একাকার হয়েছে তখন।রাস্তা ফাঁকা হয়ে এসেছে কয়েক মুহূর্তেই।রাত যে তখন অনেক হয়েছে।তাহসিন গলা বাড়িয়ে আদনানকে বলল বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় চলে যেতে।আদনান বিনাবাক্যে রওনা হলো।গাড়ি ঘুরতেই ময়ূরী বলল,
“হেঁটে যাই চলুন?”
তাহসিন মুচকি হেসে হাত ধরে ওর।পাশাপাশি হেঁটে যায় শহরের সেই পিচ ঢালা রাস্তায়।ময়ূরীর গায়ে সেই বাসন্তী রঙা শাড়ি লেপ্টে এসেছে গায়ে।তাহসিন যে বড্ড অধৈর্য পুরুষ।বউ বলতে যে লোকটা পাগল,সেই লোক এই বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় বউয়ের এই সৌন্দর্য প্রকৃতির সাথেও ভাগ করে নিতে নারাজ।বলিষ্ট হাত জোড়া হঠাৎ করেই কিশোরীর সর্বাঙ্গ তুলে নিল।ময়ূরী লাজে শিটিয়ে এলো তাহসিনের বুকে।নববধূর ন্যায় কোলে তুলে নিয়েছে তাহসিন।ঠোঁটের কোণে সেই মিষ্টি হাসিটুকু চওড়া হয়েছে বধূর লাজ দেখে।বিয়ের এত গুলো মাস পেরোলেও,সেই প্রথম দিনের মতো কাছে গেলে যেমন মুখ খানা লাল হত,ঠিক আজও তেমন রক্তজবার ন্যায় গাল লাল হয়ে এসেছে।ময়ূরী চোখ তুলে একবার তাকাল তাহসিনের মনোমুগ্ধকর সেই দৃষ্টির দিকে।নিচু স্বরে বলল,

“অমন করে তাকাবেন না।”
তাহসিন বলল,
“তাকালে কী হয় বেগম সাহেবা?”
“মৃত্যু হয়।আপনার ওই দৃষ্টি জোড়ায় হাজারবার খু’ন হয়েছি আমি।”
“তাহলে আজ আরেকবার একটু অন্যরকম ভাবে খু’ন করব তোমায়।ভালোবাসব আমার মতো করে।”
“ইশ!কী বাজে কথা।”
তাহসিন শব্দ করে হাসল।বলিষ্ট সেই দেহের এক কোণে এক কিশোরীর ছোট্ট দেহ লুকিয়ে আছে।লাজে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে।তাহসিন একবার বউকে দেখে হঠাৎ কণ্ঠে স্বর টানল নরম করে,

“হালকা হাওয়ার মতন চাইছি,এসো এখন
করছে তোমায় দেখে,অল্প বেইমানি মন..!!
বাঁধব তোমার সাথে আমি আমার জীবন..!
আমি তোমার কাছেই রাখব,
আজ মনের কথা হাজার।
দিয়ে তোমার কাজল আঁকব
আজ সারা দিনটা আমার..!!
তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে
আর কমলো চিন্তা আমার..!!
আমি তোমার কাছেই রাখব,
আজ মনের কথা হাজার।
দিয়ে তোমার কাজল আঁকব
আজ সারা দিনটা আমার..!!”

বৃষ্টির শব্দের ভেতর তাহসিনের কণ্ঠটা থেমে যেতেই ময়ূরী নিঃশ্বাস ফেলল ধীরে। শহরের আলো, ভেজা পিচঢালা রাস্তা আর ওই গানের রেশ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি কোথাও আঁটকে রইল।তাহসিন ময়ূরীর নাকে নাক ঘষে বলল,
“কদম ফুলের গন্ধে মেশা মাতাল করা হাওয়া,
তোমায় কোলে পাওয়ার মাঝে সবটুকু সুখ পাওয়া।
পায়ের তলায় কাদা হোক কী পিচ্ছিল ওই পথ,
তোমায় নিয়ে পাড়ি দেব আমার প্রেমের রথ।
বৃষ্টির জলে ধুইয়ে যাক সব মান-অভিমান যত,
আমি তোমায় আগলে রাখব ধ্রুবতারার মতো।
অঝোর ধারায় সিক্ত তুমি, আমার বুকে লীন,
শোধ হবে না কোনোদিনও এই মায়ার ঋন।
দুচোখে তোমার শ্রাবণ ধারা, অধরে লাজুক হাসি,
হাজার ভিড়েও আমি কেবল তোমাকেই ভালোবাসি।
বৃষ্টির এই ঝাপটায় আজ পৃথিবী হোক স্তব্ধ,
আমার বাহুর বন্ধনে তুমি থেকো শব্দহীন জব্দ।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪১

ময়ূরী তখন আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে।তাহসিন শেষবার ময়ূরীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো মেয়ে কিশোরী বধূ, এই মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির ঘ্রাণে, আজ তোমার মৃত্যু হবে আমার ছোঁয়ায়।আমার ছোঁয়া আমার দৃষ্টির মতোই নিষ্ঠুর।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৩