কিশোরী কন্যা পর্ব ৪১
হামিদা আক্তার ইভা
চারপাশটা স্বর্ণের মতো চিকচিক করছে তখন।এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে।দুপুরে ঢাকায় পৌঁছেই ময়ূরী বিছানায় লেপ্টে গিয়েছিল কিছু না খেয়ে।সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠতেই পাশ থেকে ঝাঁপটে ধরল তাহসিন।ময়ূরী ভয়ে বুকে থুথু দিয়ে বলল,
“আপনি এখনও শুয়ে আছেন কেন?গোসল করেছেন?”
তাহসিনের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।সে ময়ূরীর নাকে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,
“চলো একসাথে যাই।”
ময়ূরী ধরফড়িয়ে উঠে বসল।তাহসিনের সাথে যাওয়া মানে মহাবিপদ।সে বিছানা থেকে নেমে কোমরে আঁচল গুঁজল।পাক্কা গিন্নির মতো কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলল,
“বাচ্চারা কিছু খায়নি।বাজারে যাবেন কখন?”
তাহসিন বলল,
“বেগম সাহেবা,অফিসের লোক বাজার করে দিয়ে গিয়েছিল সকালেই।আর আপনার কষ্ট করে এখন রান্নাও করতে হবে না।”
“তাহলে খাব কী আমরা?”
“আমি করেছি ওসব।”
ময়ূরী স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল।ছোট্ট একটা জীবনে কত সুখ তার।লোকটার মনের অবস্থা ভালো নয়,তবুও তার কষ্ট হবে বলে নিজেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে রান্না করেছে।মায়া হলো তার।দুহাত সামনে বাড়িয়ে দিতেই তাহসিন গাল ভরে হাসল।এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ছোট্ট বউকে।ময়ূরী বলল,
“আমরা কী ঠিক করেছি?”
তাহসিনের উত্তর আসে বেশ কিছুক্ষণ পর।
“ওসব তুচ্ছ ব্যাপার।তোমার স্বামীর এই মুহূর্তে বউ-সন্তান ছাড়া আছেই বা কে?আম্মাকে নিয়ে আমার চিন্তা নেই,তিনি সওদাগর বাড়ি সব সময় মাথা উঁচু করে প্রতিবাদী নারী হয়েই থেকেছেন।”
ময়ূরী নিচু চোখে তাকিয়ে দুহাতের মুঠোয় তাহসিনের মুখ ধরে বলে,
“কষ্ট হচ্ছে না আপনার?পরিবার ছাড়া থাকতে কেমন লাগে সেটা আমি জানি।”
তাহসিন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। বিকেলের সেই সোনালি আলো তার তামাটে মুখে এসে পড়েছে। ময়ূরীর নরম হাতের স্পর্শে তার চোখের কোণে জমে থাকা অদৃশ্য এক চিলতে জল যেন মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। সে আলতো করে ময়ূরীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“কষ্ট হয় ময়ূরী, খুব কষ্ট হয়। শেকড় ছেঁড়ার ব্যথা তো আর মিথ্যে নয়। কিন্তু সেই শেকড়ে যদি কেবল বিষই থেকে থাকে, তবে তা আঁকড়ে ধরে মরে থাকার চেয়ে তপ্ত রোদে নিজের এক চিলতে জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বেশি শান্তির। সওদাগর বাড়িতে আমার প্রাচুর্য ছিল, কিন্তু প্রশান্তি ছিল না।”
“প্রার্থনা যখন এক চিলতে প্রাপ্তি খুঁজে মরে, পৃথিবী তখন শূন্য থালা বাড়িয়ে দিয়ে বলে—ধৈর্য ধরাই শ্রেয়!”
তাহসিন ময়ূরীর কোমরে দুহাত বেষ্টন করে তাকে আরও একটু নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক অমোঘ সত্যের মতো করে বলল,
“শোনো গিন্নি, পরিবার মানে কেবল একই ছাদের নিচে থাকা কিছু রক্তের সম্পর্ক নয়; পরিবার মানে হলো এমন এক নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে পৌঁছালে সারাদিনের সব ক্ষত আর ক্লান্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। একগুচ্ছ হাহাকার মাখা রাজপ্রাসাদের চেয়ে, একমুঠো ভালোবাসা মাখা এই ছোট ঘরটাই আমার কাছে অনেক দামী। কারণ আমার সেই আশ্রয়ের নাম হলো তুমি আর আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবী।”
ময়ূরী আর কিছু বলতে পারল না। ময়ূরীর বুকে মাথা রাখল তাহসিন। বাইরে চড়ুই পাখিরা তখনও কিচিরমিচির করছে। ময়ূরীর মনে হলো, এই মানুষটা হয়তো অনেক বড় এক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে এসেছে, কিন্তু বিনিময়ে সে খুঁজে পেয়েছে এক প্রকৃত ঠিকানা।
তাহসিন গেছে ফ্রেশ হতে।ময়ূরী ফাহাদের হাতে-পায়ে তেল দিয়ে চিপচিপে বানিয়ে ফেলেছে প্রায়।পুতুল পাশেই বসে আছে।ফ্যালফ্যাল করে কাণ্ড দেখছে মামা আর মায়ের।তাহসিন তখন ভেজা চুলে বের হলো ঘর থেকে।ড্রয়িংরুমে এমন কাণ্ড দেখে নাক ছিঁটকে এলো তার।শালাকে বাঁচাতেই যেন তার আগমন।চটজলদি এগিয়ে এসে বসল বউয়ের পাশে।ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে কাজে মগ্ন ছিল।তাহসিন এসেই একদমে বলল,
“বেগম সাহেবা,তাড়াতাড়ি মাথাটা মুছে দাও।আদনানরা আসবে খানিক্ষণ পরেই।”
ময়ূরী ফাহাদকে ছাড়তেই ভাগ্নির সাথে দৌঁড়ে পালাল সেখান থেকে।তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।ময়ূরী শাড়ির আঁচল টেনে তাহসিনের মাথায় রেখে বলল,
“অনেক তো হলো,এবার ভাইয়ার বিয়ে করা উচিত নয় কী?হিমি আপুর সাথে আপনি একবার কথা বলে দেখুন না।”
তাহসিন যেন সব সময় বউয়ের সাথে লেপ্টে থাকতে বড্ড পছন্দ করে।একটাবার শুধু সুযোগ পেলেই হয়।ময়ূরী তাহসিনের আক্রমণে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁত চেপে বলল,
“বেহায়া পুরুষ,বাসায় বাচ্চারা আছে।”
তাহসিন ওসবে মন দিলে তো?বউ থাকলে দিন-দুনিয়া ভুলে বসে এই বান্দা।
তাহসিন বউয়ের কথায় মোটেও থামল না। বরং আরও কাছে টেনে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল,
“বাচ্চারা থাকলেই বা কী?পুতুল তো জানেই, তার আব্বু আম্মুকে একটু বেশিই ভালোবাসে।”
ময়ূরী লজ্জায় লাল হয়ে এলো। আঁচল টেনে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে ফিসফিস করে বলল,
“একদম নির্লজ্জ! এই বাড়িতে এসে আপনার সাহস বেড়ে গেছে।”
তাহসিন হেসে তার কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে দিল।সন্ধ্যার আগ দিয়ে আদনান এলো হাত ভর্তি বাচ্চাদের খাবার নিয়ে।পুতুল “চাচ্চু” বলেই দৌঁড়ে গিয়ে কোলে উঠে এলো।আদনান শব্দ করে হেসে উঠল।বলল,
“আমার পুতুল সোনা কেমন আছে?”
পুতুল ওর গলা জড়িয়ে ধরে গালে ছোট্ট করে চুমু খেল।হাত নাড়িয়ে বলল,
“খুব ভালো আছি।”
ছোট্ট ফাহাদ তখন দুইহাত পেছনে দিয়ে ভোলা-ভালা বাচ্চার মতো চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।আদনান ওকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁট টিপে বলল,
“শালা বাবু,কোলে আসবে নাকি?”
ফাহাদ আশ্চর্য হলো যেন।এইটুকু বাচ্চা চোখ বড় বড় করে বলল,
“আমি তুমার ছালা কিমনে হুই?”
আদনান পুতুলকে নামিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল ওর সামনে।তারপর বলল,
“তোমার বড় আপু হলো আমার বড় ভাইয়ের বউ। সেই হিসেবে তুমি তো আমারও শ্যালক হও। শ্যালক মানে চেনো? শ্যালক মানে হলো ‘শালা বাবু’।”
ফাহাদ চোখ কপালে তুলে বেশ কিছুক্ষণ ভাবল। ছোট মানুষ, এত প্যাঁচ তার মাথায় ঢুকছে না। সে আদনানের শার্টের বোতাম টেনে ধরে গম্ভীর মুখে বলল,
“না! আমি তু পুতুলের মামা। আমার তু অনেক খমতা (ক্ষমতা)! আমি কেন শ্যালা হুমু? আমি বড়ু মামা!”
আদনান হাসতে হাসতে ওর কাঁধে হাত রেখে টেনে নিজের কাছে আনল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“তোমার ক্ষমতা আছে ঠিকই, তবে তুমি হলে ‘পকেট সাইজ’ মামা। এখন বলো, এই যে এত খাবার আনলাম—চিপস, লজেন্স—এগুলো কী শ্যালক হিসেবে খাবে নাকি মামা হিসেবে? শ্যালক হলে সব তোমার, আর মামা হলে অর্ধেক পুতুলকে দিতে হবে।”
ফাহাদ এবার বেশ বিপদে পড়ে গেল। খাবারের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে একবার ঢোক গিলল। তারপর খুব বুদ্ধিমানের মতো মুখ করে বলল,
“এখুন পকেত ছাইজের শ্যালা হুইয়া খাই। খায়া নিয়া বড়ু হুমু, তারপর আমি তুমারে দিখা নিমু!”
আদনান হো হো করে হেসে উঠল। ফাহাদের এমন বাস্তবিক আর লোভী উত্তর শুনে ময়ূরীও আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। আদনান ফাহাদকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে বাঘের বাচ্চা! বড় হয়ে কী করবে সেটা তখন দেখা যাবে, এখন আগে চিপসটা সাবাড় করো।”
ময়ূরী মুচকি হেসে বলল,
“ফ্রেশ হয়ে আসুন ভাইয়া,খাবার দিচ্ছি আমি।”
আদনান বলল,
“অফিসেই খেয়েছিলাম ভাবি।রাতে একসাথে সবাই মিলে খাব।”
“তাহলে আপনি আপনার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন।”
আদনান মাথা নাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকল।মনটা বড্ড খারাপ।অফিসে হিমির সাথে একচোট ঝগড়া হয়েছে তার।তাকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে আজ।একই বাড়িতে থেকেও কিছু করতে পারছে না বেচারা।
দোতলার সেই একলা বারান্দাটা এখন আফিয়ার একমাত্র আশ্রয়। এখান থেকে বাইরের আকাশ দেখা যায়, কিন্তু নিজের জীবনের অন্ধকার দেখা যায় না। মা-বাবা হীন এই মেয়েটির জীবনে মাহতাব ছিল বটবৃক্ষের মতো। ১৬ বছর বয়সে যখন এই বাড়িতে পা রেখেছিল, মাহতাবের চোখের সেই মুগ্ধতা আফিয়াকে পূর্ণতা দিয়েছিল। মাহতাব তাকে অনেক ভালোবাসে, এ কথা আফিয়া জানে; কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষটিই যখন শান্তাকে ঘরে আনল, তখন তেইশ বছর বয়সী আফিয়ার পৃথিবীটা চুরমার হয়ে গেল। তবে সবই যে একটা ষড়যন্ত্র ছিল।মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কালকে ময়ূরীরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর বাড়ির কেউ স্বাভাবিক হতে পারেনি।আফিয়া এটাও জানতে পেরেছে,মাহতাব আর শান্তার বিবাহ ভেঙেছে কিছুদিন আগে।রাগের মাথায় মাহতাব তিন তালাক দিয়েছিল শান্তাকে।আলোচনা হচ্ছে ডিভোর্স পেপার নিয়ে।এত কিছুর মাঝেও তার কোনো অনুভূতি কাজ করছে না আজ।
“আমার সংসার তো খেয়েই ছাড়লে বড় বউ।”
হঠাৎ পেছন থেকে শান্তার কণ্ঠস্বর শুনে পিছু ফিরল আফিয়া। আফিয়া শান্ত চোখে শান্তাকে পর্যবেক্ষণ করল। শান্তার উসকোখুসকো চুল আর আগুনের মতো জ্বলতে থাকা চোখগুলো তাকে একটুও বিচলিত করল না। সে খুব ধীরস্থিরভাবে মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে বলল,
“সংসার কী আর অন্য কেউ খেতে পারে ছোট বউ? মানুষ নিজের সংসার নিজেই তিলে তিলে পোড়ায়। কারো উপর দায় চাপিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া যায়, কিন্তু মুক্তি পাওয়া যায় না।”
শান্তা দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে এলো, “ন্যকামি করিস না বড় বউ! মাহতাব আজ যে আমাকে ডিভোর্স পেপার পাঠাচ্ছে, এর পেছনে তোর কোনো হাত নেই বলতে চাস? তুই জানতিস মাহতাব তোকে এখনও পাগলের মতো ভালোবাসে, আর সেই সুযোগটাই তুই নিলি!”
আফিয়া একটা ম্লান হাসি হাসল। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে সে অত্যন্ত ভারী গলায় বলল,
“ভালোবাসা তো কাঁচের মতো ছোট বউ, একবার ভেঙে গেলে শত জোড়া দিলেও ফাটলটা রয়েই যায়। যে হৃদয়ে এতদিন আমার নাম লেখা ছিল, সেখানে তুমি জবরদস্তি করে বসতে চেয়েছিলে। মনে রেখো, শরীরের অধিকার জবরদস্তি করে পাওয়া যায়, কিন্তু মনের সিংহাসনটা কেবল ভাগ্যে থাকতে হয়।”
শান্তা চিৎকার করে উঠল,
“ভাগ্য? তুই ভাগ্য দেখাস আমাকে? তুই তো একটা এতিম মেয়ে, মাহতাবের দয়ায় এই বাড়িতে পড়ে আছিস!”
আফিয়া এবার শান্তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার সেই শান্ত চাউনিতে এমন এক তেজ ছিল যে শান্তা কিছুটা থমকে গেল। আফিয়া বলল,
“মানুষ যখন হেরে যায়, তখন সে অন্যের পরিচয় নিয়ে আঘাত করে। তুমি তো সব পেয়েছিলে—ঘর, বর, প্রতিপত্তি। তাও কেন মাহতাবকে ধরে রাখতে পারলে না? কারণ তুমি ঘর গড়তে চেয়েছিলে প্রতিহিংসা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নয়।যে ঘর মিথ্যের উপর দাঁড়ায়, ঝড়ের ঝাপটায় তার অস্তিত্ব সবার আগে বিলীন হয়।”
শান্তা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চলে যাচ্ছিল, যাওয়ার আগে বলে গেল,
“দেখে নিস আফিয়া, তুইও সুখে থাকবি না!”
আফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “সুখ তো আমি অনেক আগেই বিসর্জন দিয়েছি।”
রাতে আফিয়া গুটি গুটি পায়ে অরুণিমা বেগমের ঘরে এলো।ভদ্রমহিলা চুপটি করে বসে ছিলেন।আফিয়াকে দেখেই সোজা হয়ে বসলেন।আফিয়া এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“মেজ আম্মা,ভাই কী কল করেছিল?”
অরুণিমা বেগম বললেন,
“হ্যা!কথা হয়েছে একটু আগেই।”
“ময়ূরীর সাথে হয়েছে?”
“হ্যা।”
“আমায় একটাবার ময়ূরী ফোন করেনি।একদিনেই ভুলে বসেছে আমাকে।”
অরুণিমা বেগম আফিয়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ওদের মনের অবস্থাটাও তো ভালো না মা।কটা দিন যাক,সব স্বাভাবিক হোক,তারপর নাহয় মন খুলে কথা বলবে?”
আফিয়া মাথা নাড়ল,
“আপনাকে কিছু এনে দেব মেজ আম্মা?খাবেন কিছু?”
“না,তুমি ঘরে যাও।মাহতাব সেই কখন থেকে ডাকছে তোমায়,শুনতে পাওনি?”
আফিয়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো।নিজের ঘরের দিকে যেতে চাইলেও চোখ আঁটকে এলো মাহতাবের ঘরে।সে নিজের ঘরেই গেল।পুরো বাড়িটা আজ বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।চুপটি করে বসল বিছানায়।হাঁটু জড়িয়ে ধরে উপরে স্থির হয়ে থাকা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল।তার কী ফ্যানের সাথে এখন ঝু লে যাওয়া উচিত?নাকি বি ষ খেয়ে ঘরের এক কোনায় পড়ে থাকা উচিত?কিংবা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহ ত্যা করা উচিত?জীবন নিয়ে কতই না স্বপ্ন ছিল তার।স্বামী,সংসার,সন্তান—কিছুই আজ নেই।মাহতাব তাকে একটাবার সত্যি কথাটা বলেনি।দিনের পর দিন তাকে কষ্ট দিয়ে এসেছে।
মাহতাব নিজের ঘরে পায়চারী করছিল।আফিয়া তার ঘরে আসেনি,তার মানে নিজের ঘরে ঘাঁপটি মেরে আছে।সব ভুলে সে পা বাড়াল বাইরে।আজ বুক কাঁপছে বড্ড।আফিয়ার মুখো-মুখী হয়ে সে বলবেটা কী?ক্ষমাই বা চাইবে কী করে?সে আফিয়ার ঘরের সামনে এসে লম্বা করে শ্বাস টেনে ভিড়িয়ে রাখা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।আফিয়া কপাল কুঁচকে তাকাল।মাহতাব দরজা আঁটকে এগিয়ে এসে আজ নিজ ইচ্ছায় দূরুত্ব রেখে বিছানায় উঠে বসল আরাম করে।আফিয়া চুপ করে রইল।মাহতাবের মনটা উসখুস করছে যন্ত্রণায়।কথা গুলিয়ে যাচ্ছে বারবার।শেষে নীরবতা ভেঙে বলল,
“ভালো আছো আফি?”
আফিয়া মুচকি হেসে নিভু স্বরে বলল,
“আজ বোধহয় অনেকদিন পর এই প্রশ্নটা করলেন।এমপি সাহেব বউকে ভোলেননি তাহলে!”
অপরাধীর ন্যায় মাথা নোয়াল মাহতাব।আর একটু এগিয়ে এসে বলল,
“ক্ষমা করে দাও না আফি।আমার যে কিচ্ছুটি করার ছিল না।”
আফিয়া ছলছল চোখে বলল,
“মাহতাব,আপনি আমায় একটাবার সব সত্য কেন বলতে পারলেন না?কেন সত্যি ঢাকতে আপনি অন্য এক নারীকে কবুল করেছিলেন?”
মাহতাব দিশেহারা হয়ে আফিয়ার পা জড়িয়ে ধরল।আফিয়া হতভম্ব হয়ে সরে যেতে গিয়েও পারল না।
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪০
“কী হচ্ছে মাহতাব,পা ছাড়ুন আমার।”
“তুমি আমার কথা কেন শুনতে চাইছো না?”
“যা শোনার সবই তো শুনেছি।আর কিছু বাকি আছে?”
“আছে।খুব বাকি আছে।এই মাহতাব সওদাগর তার স্ত্রী আফিয়াকে ছাড়া কখনও অন্য নারীকে ভালোবাসেনি।তাকে ছাড়া অন্য নারীকে কখনও স্পর্শও করেনি।আমি পাপ করেছি আফি,এটা সত্য।তবে আমার ভালোবাসায় কোনো কমতি কখনও ছিল না।”
