গোধূলি লগ্নের সেই তুমি পর্ব ১৩

গোধূলি লগ্নের সেই তুমি পর্ব ১৩
লেখনীতে জেনিফা চৌধুরী

এত সিকিউরিটির মাঝেও ফারদিন’কে মা/রার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মুখের থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিয়েছিলো কেউ। হসপিটালের প্রত্যেকজন নার্স, সার্ভেন্ট, এমন’কি ডাক্তার’রা অব্দি নিরবের সামনে মাথা নিঁচু করে দাড়িয়ে আছে। সায়মা খানম ও আজ বেশ সুস্থ বোধ করেছেন। কিন্তু ফাইজার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। সেন্স ফিরলে’ই পা’গ’লের মতো আচরণ করছে। তাই বাধ্য হয়ে ও’কে ঘুমের ইঞ্জেকশন পুশ করে দিয়েছে নিরব। সকাল থেকে এখন অব্দি মেয়ে’টার হাতে স্যালাইন চলছে। ফারদিনের পাশের কেবিনে ই ফাইজা’কে রাখা হয়েছে।

ফারদিনে’র জন্য বরাদ্দ ৭২ ঘন্টার মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ২৫ ঘন্টা। বাইরে সবার চেঁচামেচি শুনে সায়মা খানম আর ফাইজা’র মা হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে এসে দেখে। নিরব সবার সাথে রাগারাগি করছে। সিকিউরিটি গার্ড মাথা নিঁচু করে কিছু বলতে’ই নিরব রেগে চেঁচিয়ে বললো…..
–আপনারা এত দায়িত্ব জ্ঞানহীন কি করে হতে পারেন? আপনাদের বার বার করে বলেছিলাম এদিক’টায় সারাদিন রাত নজর রাখতে। আপনারা সবাই কি ঘুমাচ্ছিলেন? ঘুমানোর জন্য আপনাদের রাখা হয়েছে…..
সায়মা খানম কিছু বুঝতে না পেরে নিরবের সামনে এগিয়ে গিয়ে কি হয়েছে জানতে চাইলে? নিরব জানালো কেউ ফারদিনের কেবিনে ঢুকে ও’কে মা/রার চেষ্টা করেছে? কথা’টা শুনেই ফাইজার মা আর সায়মা খানম দুজনেই ভয়ে কেঁপে উঠলো। ভয়ার্ত কন্ঠে বললো….

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

–ফারদিন ঠিক আছে তো নিরব? ওর কোনো ক্ষতি হয়নি তো।
প্রতিউওরে নিরবের থেকে অভয় বানী পেয়ে তারা দুজন শান্ত হলো। পরক্ষনেই সায়মা খানম হতাশ ভঙ্গী’তে বলে উঠলো….
—কিন্তু, এত সিকিউরিটির মাঝেও কে এত বড় একটা স্পর্ধা দেখালো? তাকে খুঁজে বের করে প্রাপ্য শাস্তি দিবে। দায়িত্ব’টা তোমাকে দিলাম…..

বলেই সে ফাইজা’র কেবিনের দিকে পা বাড়ালো। সাথে ফাইজা’র মা ও গেলো।
–সিসি টিভির ফ্রুটেজ গুলো চেক করুন দ্রুত। অনলি টেন মিনিট টাইম দিলাম আপনাদের কে বা কারা এসেছিলো ওই কেবিনে সব ডিটেইলস আমার চাই???
নিরব সবাই’কে আরো বেশি এলার্ট থাকতে বলে চলে গেলো। সিসি টিভি ফ্রুটেজ’টা পাঠিয়ে দিতে বললো ওর কেবিনে। নিরব চলে যেতেই ওদের মাঝে একজন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। যে করেই হোক সিসি টিভির ফ্রুটেজ ওর হাতে পৌঁছাতে দেওয়া যাবেনা। ভেবে নিলো। ফোন’টা বের করে কারোর নাম্বারে একটা নেক্সট করে দিয়ে আড়ালে সরে এলো……

–একদম কাঁদবে না। চোখের পানি তাড়াতাড়ি মুঁছে নাও। নয়তো কিন্তু…..
ফারদিনের কথা শুনে ফাইজা কাঁদতে কাঁদতে বললো…..
–কাঁদব। একশো বার কাঁদব। আপনার কি? আপনি আমার উপর অভিমান করে কেনো জোরে গাড়ি চালিয়েছিলেন? যদি আমার উপর অভিমান করে ওইভাবে গাড়ি না চালাতেন তাহলে আজ আপনার এই অবস্থা হতো না। এইসব কিছুর জন্য আমি দায়ী। আমার জন্যই আজ আপনার এই অবস্থা……

বলেই আবারো কেঁদে দিলো। ফারদিন আর সহ্য করতে না পেরে স’পাটে একটা থা’প্প’ড় বসিয়ে দিলো ফাইজার গালে। তারপর নিজেই আবার ওর চোখের পানি গুলো মুছিয়ে দিয়ে ও’কে বুকের সাথে চে’পে ধরলো। থা’প্প’ড় খেয়ে অটোমেটিক ফাইজার কান্না থেমে গেলো। ঘটনা’টা বুঝতে ওর কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো। যখন বুঝলো তখন ফারদিনের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য হাত-পা ছু’ড়তে লাগলো। ফারদিন ও’কে আরো জোরে চে’পে ধরে বলে উঠলো …..
–থা’প্প’ড়’টা কি কম হয়ে গেছে। আরেক’টা থা’প্প’ড় খেতে না চাইলে চুপচাপ শান্ত হয়ে যাও। কতবার বলছি তোমার কান্না আমার সহ্য হয়না। নেক্সট টাইম যদি দেখছি বিনা কারনে চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছো তাহলে……
ফাইজা কান্না মাখা কন্ঠে বলে উঠলো….

–তাহলে আবার একটা থা’প্প’ড় মা/রবেন তাইতো। কথা নাই আপনার সাথে আমার। হুউউ রাগ করছি……
ফাইজার বাচ্চা বাচ্চা কথা শুনে ফারদিন একটু মুচকি হেসে ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। তারপর পরম যত্নে গালের মধ্যে লেপ্টে থাকা চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিতে দিতে বললো……
–নাহ তো কে বললো আমি থা’প্প’ড় মা/রব। আমি তো তোমার থেকে বহু দূরে চলে যাব। যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেনা। তুমি চাইলেও আমাকে ছুঁতে পারবে না……..
ফারদিনের এহেতুক কথায় ভয়ে কেঁপে উঠলো ফাইজা। শক্ত করে দুই হাতে ফারদিনের শার্ট খামচে ধরে ফারদিনের বুকের সাথে মিশে যেতে নিলো। ভয়ার্ত কন্ঠে বলতে লাগলো……

–নাহ আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিব না। আপনি কোথাও যাবেন না প্লিজ। আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না। থাকতে পারব না আমি…….
বলেই জোরে চিৎকার করে উঠে বসলো ফাইজা। এত ক্ষন স্বপ্ন দেখছিলো ও। ফাইজা’র বেডেই মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলো ওর মা আর একটু দূরের চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিলো সায়মা খানম। ফাইজার চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে তারা দুজন। ফাইজা উঠে বসতেই ওর চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। শরীর বেগতিক ভাবে কাঁপছে।

ফাইজার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে তারা দুজনেই দৌড়ে আসলো। তাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে মেয়ে’টা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। ফাইজার মা মেয়ে’কে পরম আবেশে বুকে জড়িয়ে নিলো। মায়ের স্নেহ পেয়েই মেয়েটা হুহু করে কেঁদে উঠলো। সায়মা খানম দাড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মেয়ের এই অবস্থা কিছু’তেই সহ্য করতে পারছেন না নাদিয়া বেগম। হাসনাত সাহেব রাতে বাড়ি চলে গিয়েছে। হসপিটালে ওরা তিনজনেই ছিলো৷ মেয়ের পা’গ’ল পা’গল অবস্থা দেখে নাদিয়া বেগম মনে প্রানে সবস্র দিয়ে আল্লাহ’র কাছে চাইছে যেনো ফারদিন সুস্থ হয়ে যায়। নয়তো যে তার মেয়ে’টা পা’গল হয়ে যাবে। ফাইজা একনাগাড়ে কেঁদেই চলেছে। ফাইজার মা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত কন্ঠে বলতে লাগলো……

–সব ঠিক হয়ে যাবে মা। এভাবে ভেঙে পড়িস না। উপর ওয়ালা কাউকে নিরাশ করেন না। ও ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে……
মায়ের কথা শুনে ফাইজা কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো……
–পুরো একটা দিনের বেশি চলে গেলো মা। কেনো এখনো উনি ঠিক হলো না? আমি উনা’কে এইভাবে নিতে পারছিনা মা? খুব কষ্ট হচ্ছে আমার…….
বলেই আবার কেঁদে দিলো। তারপর নিজেকে ওর মায়ের থেকে ছাড়িয়ে ওদের বাধা অতিক্রম করেই দৌড়ে চলে এলো ফারদিনের রুমে। ফারদিনের দিকে নির্বাক, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন। কত’টা স্নিগ্ধ লাগছে চেহারা’টা। বুকের মধ্যে কতগুলো যন্ত্র লাগানো। ফাইজার ইচ্ছে করছে এক্ষুনি সব ছিড়ে ফেলে দিতে আর চিৎকার করে বলতে….

–আপনাকে খুব বাজে লাগছে। আপনি আর কখনো সাদা ড্রেস পড়বেন না। খুব বাজে লাগে……
কথা গুলো ভাবতেই ফাইজা আলতো হাতে ফারদিনের হাত’টা নিজের গালের সাথে চে’পে ধরে কেঁদে দিলো। আর অস্পষ্ট স্বরে বলতে লাগলো…..
–এই হাতের ছোয়া গুলো আমি বড্ড মিস করছি।
আরো কিছু ক্ষন একা একা ফারদিনের দিকে তাঁকিয়ে থেকে কিছু বলতে বলতে ফারদিনের বেডেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে ফাইজা।

বিপদের সময় গুলো খুব দীর্ঘ হয়। বিপদের রাত’ বড্ড পাষান হয় কিছুতেই কা’টতে চায়না। সময় গড়িয়ে যেতে চায়না কিছু’তেই। তিন দিন যেনো ফাইজার কাছে তিন বছর মনে হচ্ছে। ৭২ ঘন্টা হতে আর মাত্র কিছুক্ষন বাকি। ফাইজা হসপিটালের থেকে এক পাও নড়ে’নি। ফাইজার মা ও মেয়ে’কে রেখে যেতে ভরসা পাচ্ছেনা। সায়মা খানম আজ সকাল সকাল একটু বাড়ি গিয়েছে জরুরী কাজে। ফারদিনের কেবিনে ওর বেডের সামনে চেয়ারে বসে আছে ফাইজা। উদাসীন ভঙ্গী’তে চেয়ে আছে ফারদিনের দিকে। মনের মধ্যে কত শত আশা’রা ঘর বেঁঁধেছে। ফারদিনের হাত’টা দুই হাতে শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে। এই তিন’দিনেই ফাইজার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। চেহারা’টা শুকিয়ে গেছে। চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। চেহারার মধ্যে এক’টা দুঃখ এসে ভর করেছে। এই ছেলে’টাকে ছাড়া ও কত’টা অসহায় এই তিন দিনে বুঝতে পারছে ও? ফাইজা বসে বসে এইসবি ভাবছিলো। তখনি কেউ একজন অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে…….

—চোখ গুলো বড্ড বেশি ফুলে গেছে। আর কত কাঁদবে?
চেনা একটা কন্ঠস্বর পেতেই ফাইজা’র হার্টবিট বেড়ে গেলো। ও কি ভুল শুনেছে? নাকি স্বপ্ন দেখছে আবার। ভাবতে ভাবতে ভয় ভয় চোখে সামনে তাঁকাতেই দেখে ফারদিন ওর দিকে চেয়ে আছে এক নজরে। ফারদিনের জ্ঞান ফিরেছে? ভাবতেই ফাইজা’র অবাধ্য চোখে শ্রাবন ধারা নেমে আসলো। ফাইজা খুশিতে ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। ফারদিন হাত’টা উঠাতে নিয়েও পারলো না। ব্যাথায় নামিয়ে নিলো। কথা বলতে কষ্ট হলেও আস্তে করে বললো……
–আর কেঁদোনা প্লিজ।
ফাইজার কেনো যেনো কান্না থামছেই না। এই কন্ঠস্বর শোনার জন্যই তো তিন দিন ধরে ব্যাকুল হয়ে ছিলো। ওর তো এখন কাঁদার কথা না খুশি’তে হাসার কথা। তাহলেও কেনো কাদছে। ফাইজার কান্না থামার নাম নেই। ফারদিন আবারো বলে উঠলো……

গোধূলি লগ্নের সেই তুমি পর্ব ১২

—তোমার কান্না আমার সহ্য হয়না। প্লিজ ডোন্ট ক্রাই…..
বলেই অসহায় চাহনী নিক্ষেপ করলো ফাইজার দিকে। ফাইজা দুই হাতে চোখের জল টুকু মুছে নিয়ে। মুখে হাসির রেখা টানার চেষ্টা করলো। তা দেখে ফারদিন ও একটু মলিন হাসার চেষ্টা করলো। দুজনের মুখেই আজ হাসি ফুটেছে……..

গোধূলি লগ্নের সেই তুমি পর্ব ১৪