চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৯
ইশরাত জাহান জেরিন
পালোয়ান বাড়িতে মানুষের ভিড়। মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। এই খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সোহান লঞ্চ ঘুরিয়ে দিতে বলে। যত দ্রুত সম্ভব সে বাড়ির পথে রওনা হয়। তার কাছে মায়ের আগে আর কিছুই নয়। বিয়ে, সংসার, ভালোবাসা কোনো কিছুরই মূল্য নেই মায়ের চেয়ে বেশি। সোহানের দুনিয়ায় মায়ের ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই। লঞ্চটি নতুন ঘাটে ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। লঞ্চের একটি কেবিনে চিত্রা বন্দী। আপাতত সোহানের একটাই চিন্তা, মা আগে সুস্থ হোক, তারপর বাকিসব দেখা যাবে। চিত্রাকে পাহারা দেওয়ার জন্য লঞ্চে লোক রাখা আছে।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই সোহান বুঝে গেল বাড়িটা আজ অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ। অথচ সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেও একটা অস্থির শব্দ আছে। চাপা কান্না আছে। ফোঁপানোর আওয়াজও বিরাজ করছে। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সে দেখল তার ছোট ভাইয়ের বউ মাহমুদা মেঝেতে বসে কান্নাকাটি করছে। চোখ ফুলে লাল হয়ে উঠেছে, মাথার ওড়না মেঝের সঙ্গে মিশে আছে। পাশে দু-একজন আত্মীয় তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
“মাহমুদা, কী হইছে?” সোহানের গলা কেঁপে উঠল।
মাহমুদা মাথা তুলেও ঠিকমতো তাকাতে পারল না। শুধু বলল, “ভাইয়া… আম্মা… আম্মার অবস্থা ভালো না…”
আর কিছু শুনতে চাইল না সোহান। সবাইকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে সে মায়ের রুমের দিকে এগোল। দরজার সামনে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। ভেতরে ডাক্তার। সে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই দরজা খুলে ডাক্তার বের হলেন। ডাক্তার সোহানকে দেখে একটু থামলেন।
“ সোহান ভাই।” ডাক্তার ধীরে নাম উচ্চারণ করলেন।
“আমার আম্মার কী হইছে? আম্মা ঠিক আছে তো?” এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল সে। ডাক্তার সরাসরি জবাব দিলেন না। বরং বললেন, “আপনি একটু সাইডে আসেন।” সোহানের বুক ধক করে উঠল। তবু সে ডাক্তারকে অনুসরণ করে করিডরের এক পাশে দাঁড়াল।
“ডাক্তার, কিছু বলেন! আমার আম্মার কী হইছে?” —তার গলা এখন স্পষ্ট কাঁপছে। ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। মুখে দ্বিধা। তারপর বললেন, “উনি হঠাৎ করেই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। আমরা ধারণা করছি এটা হার্ট অ্যাটাক ছিল।”
“হার্ট অ্যাটাক?” সোহানের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। “কিন্তু… কিন্তু এখন কেমন আছে? ঠিক তো?”
ডাক্তার গভীর শ্বাস নিলেন। “আমরা চেষ্টা করছি। তবে উনার অবস্থা খুব ক্রিটিক্যাল। প্রেসার বারবার ড্রপ করছে। উনাকে এখনই হাসপাতালে শিফট করতে হবে।”
সোহান কিছুক্ষণ শব্দহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের সব আওয়াজ দূরে সরে গেল। শুধু নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছে। “না… না, এমন হইতে পারে না। সকালে তো কথা বলছিলাম। একদম ঠিক ছিল…” সে নিজের সাথেই যেন কথা বলছে। ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, “অনেক সময় আগাম কোনো লক্ষণ থাকে না। আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
“প্রস্তুত?” সোহান হঠাৎ ডাক্তারের দিকে তাকাল। “আপনি কী বলতে চান? আমার আম্মা… উনি… উনি কি…” কথা শেষ করতে পারল না। ডাক্তার চোখ নামিয়ে নিলেন। “এই মুহূর্তে কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু সময় খুব কম।” সোহানের চোখ লাল হয়ে উঠল। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বলল,
“অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। যেই হাসপাতালে নেওয়া লাগুক, নিব। আমার আম্মার কিছু হইতে পারবে না। উনি আমারে ছাড়া কোথাও যাইতে পারবে না।”সোহান আর অপেক্ষা করল না। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
বিছানায় তার মা শুয়ে আছেন। চোখ আধখোলা। ঠোঁট ফ্যাকাসে। বুক খুব কষ্টে উঠানামা করছে।
“আম্মা…” সোহান বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। “আম্মা, আমি আইছি।” মায়ের চোখ একটু নড়ল। যেন চিনতে পারলেন। ঠোঁট কাঁপল।
“সো… হান…” খুব ক্ষীণ শব্দ হলো। সোহানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। “আম্মা, কথা কইও না। আমরা হাসপাতালে যামু। তুমি ঠিক হইয়া যাইবা। আমি আছি।”
মা কষ্ট করে তার হাত চেপে ধরলেন। হাতটা ঠান্ডা।
বাইরে মাহমুদার কান্না আবার জোরে শোনা গেল। করিডরে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। সোহান মাথা নিচু করে মায়ের হাত নিজের কপালে ঠেকাল।
“আম্মা,দেখো চাইয়া আমি তোমার পাশেই আছি। আমার চুলে হাত বুলাইয়া একবার বাজান কইয়া ডাকো। ওই আম্মা..”
সোহানের মা এবার চোখ খোলার চেষ্টা করল। রুমে সোহানের সৎ ভাই সুমনও ছিল। সুমনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট ছেলে-মেয়ে দু’টো। সোহানের মা মৃদু কণ্ঠে ঠোঁট নাড়ালো, “বাজান তোর সাথে একটু কথা কইবার চাই।” সোহান মুহূর্তেই তার ভাইয়ের দিকে তাকাতেই সুমন ছেলে-মেয়ে দু’টোকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। ছোট ছেলেটা যাওয়ার আগে সোহানের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “বড় আব্বু দাদুর কি হইছে?” সোহানের চোখের কোণে জল। সে ভাতিজার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “কিছু না আব্বা, দাদুর কিছু হয়নাই। তুমি বাইরে গিয়া খেলাও।”
আস্তে আস্তে রুম ফাঁকা হওয়ার পরে সোহান তার মায়ের শীতল, কুচকে যাওয়া দুই হাত শক্ত করে ধরল। এই হাতগুলো, এই স্পর্শ এগুলোই তার জীবনের একমাত্র স্বস্তি। যদি মা না থাকতেন, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়াতেন না, সে কখনই এই আরামের জীবন পেত না। মা জীবনের প্রতিটি অন্ধকারে উদাহরণ হয়ে বলেছে, কালো রঙে কিছু আসে যায় না। সেই কালো মেয়েটা, যাকে গায়ের রঙ, দরিদ্রতা, বাবা-মায়ের অভাব, সমাজের অবহেলা সবই বঞ্চিত করেছে সেই মেয়েটাই শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে, হাল ছেড়ে দেয়নি, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়নি। কিন্তু সোহান? সে কি করল? তার মা তাকে যেই বিশ্বাস দিয়ে বড় করেছেন সেই বিশ্বাসকে বিক্রি করল? মা জানেন, তার ছেলের মতো ভালো কেউ নেই অথচ এই দুনিয়ার নিকৃষ্ট বান্দাদের মধ্যে তার ছেলে একা খোদার দরবারে অন্যতম। খোদা তাকে সবই দিয়েছে শক্তি, সুযোগ, জীবন তবু হেদায়েত দেয়নি। হয়তো এটাই খোদার এক অদ্ভুত শাস্তির প্রন্থা। তবে কি শাস্তি এমনভাবেও দেওয়া যায়?
সোহানের মনে আরেকটা ভয়ানক অনুভূতি ঘুরপাক খাচ্ছে যদি সত্য কথা বলা যেত, সত্য বলে মায়ের সঙ্গে দু’টো কথা বলা যেত, মিথ্যার আশ্রয় না নিতে পারত। কিন্তু কীভাবে বলবে, যে ছেলেকে মা এত ভালোবাসে, সে আর সেই ছেলে নয়? মায়ের চোখে সেই কালো রতন, যাকে সমাজ, দরিদ্রতা, অভাব, পিতৃপরিবার, গায়ের রঙ, সৌন্দর্যহীনতা সবই মেরে দিয়েছে। সেই রতনের ক্ষতচিহ্ন এখনও জীবনের প্রতিটি কোণে লেগে আছে। সোহানের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু সে জানে, এই সত্যের বোঝা মায়ের কাছে কখনো তুলে ধরতে পারবে না। মিথ্যার আশ্রয় না নিলে মা কীভাবে এই ছেলের দিকে তাকাবেন? এই ভেতরের দ্বন্দ্ব, এই অপরাধবোধ সব মিলিয়ে জীবনের রং যেন আরও কালো হয়ে যাচ্ছে। সোহানের মা কথা বলার চেষ্টা করলেন। তিনি কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন, চোখে অদ্ভুত এক নরম ভাব। “কি চাই, আম্মা? পানি খাবা?”
মা মৃদু হেসে বললেন, “বাজান, তুই বাম পাশে আইসা বস, ডানে তোর নানা-নানি আইসা বসব।”
“আম্মা, এসব কি কইতাছো? ভালা হইব না কিন্তু…” সোহানের চোখ ভিজে উঠল। মা চেষ্টা করলেন হেসে বলতে, “কান্দোস কেন, সোহান? তোরে আমি শক্ত থাকবার কইছি না। আমি চাই না আমার সোহান দুইলা পড়ুক।” সোহানের মা তাকে কাছে ডেকে ঝুঁকে এগিয়ে আসতে বললেন। সোহান এগিয়ে আসতেই তিনি তার চুলে, মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, “আজকে সরিষার তেল দেসনাই বাজান? মুখ কেমন শুকিয়ে গেছে! চুলগুলো দেখ, খসখসা হয়ে গেছে।” মায়ের কথায় সোহানের অন্তর ভেঙে যাচ্ছিল। এই কঠিন অবস্থায়ও নিজের কষ্ট ভুলে তিনি শুধুই নিজের ছেলের কথা ভাবছিলেন। আফসোসের সঙ্গে তিনি বললেন, “আমার জীবনে একটা দুঃখ জানোস, বাজান তোর বাবা আমাকে ভালোবাসে নাই। খোদা আমাকে বাপ-মায়ের ভালোবাসা দেয়নাই, স্বামীর ভালোবাসা দেয় নাই। দুঃখ আর দুঃখই পাইছি। কিন্তু জানোস, খোদা আমারে কী দিছে?
তোরে দিছে। তুই আমার জীবনে আইসা, বাঁচার কারণ হইয়া গেলি। যার বাঁচার কোনো কারণ ছিল না, খোদা তারও জন্য একটা গতি তৈরি করলো। তোর জন্মের পর যখন তোর দাইমা তোর মুখখানা দেখালো আমার চোখে জল চইলা আসব। আমার অনেক মাইয়ার শখ ছিল জানোস, মাইয়া মানুষ নাকি মায়ের দুঃখ বুঝে। কত রাইত তোরে পেটে নিয়া তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ছি, খোদার কাছে একখান মাইয়া ছাইছিলাম যেন আমার দুঃখ বুঝে। খোদায় তোরে দিলো। তোরে মানুষ করার পর বুঝলাম, মায়ের দুঃখ তার পেটে ধরা পোলাও কেমন কইরা বুঝবার পারে।” সোহানের মায়ের চোখের কোণে জল। সোহান তার মায়ের চোখের জল মুছে দেয়। “আরো কত কথা ছিল, শরীরটা ভালো লাগতাছে না আজকে আর। আমার না ঘুম আসতাছে। তুই বাবা আমার পাশে একটু বইসা থাক। হাত ছাড়িস না।”
“আম্মা আমি আপনার হাত ছাড়ুম না। কিন্তু আপনি হাত ছাইড়া দিয়েন না আম্মা।” সোহানের মা পুনরায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আল্লাহ বড় মানুষ করুক তোরে বাপ। আমার মাথায় যতগুলা চুল আছে তার দ্বিগুন সুখ হোক তোর।” সোহান ফুঁপিয়ে উঠল। কথায় আছে না যাদের হাত খুন করতে কাঁপে না, তাদেরও এই দুনিয়ায় একটা দূর্বলতা থাকে। আল্লাহ ছাড় দেন, তবে ছেড়ে দেন না। সোহানের মা আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করলেন। নিঃশ্বাস যেন থেমে যাওয়ার আগে শেষবার বাতাসের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। সোহান তার পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আম্মা… আম্মা…!” সে ডাকছে, হাত বাড়াচ্ছে কিন্তু মা আর চোখ খুললেন না। “আম্মা আমার আর কেউ নাই আম্মা, আম্মা যাইও না আম্মা।”
জীবন এমনই এখানে কোনো মুহূর্তের স্থায়ী ভরসা নেই। তাই সময় থাকতেই যেগুলো বলা উচিত, সেগুলো বলে ফেলা জরুরি। এই যেমন মা বেঁচে থাকা কালীন সময়ে তাকে সত্যটি বলা উচিত ছিল। কারণ মা মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে যে সোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দিয়েছিলেন, সে সোহান ছিল নিষ্পাপ, কোনো পাপাচারে লিপ্ত নয়। আর আজ, মায়ের মৃতদেহের সামনে বসে থাকা সোহান সে সেই পাপের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া মানুষ। সোহানের চোখের জল মাটিতে পড়ছে। হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল, আর সেই শূন্যতার মধ্যে শুধু একটাই সত্য মায়ের জন্য আর কিছু করা যাবে না।
লঞ্চের দোতলার ভিআইপি কেবিনের সামনে কয়েকজন তরুণ বসে পাহারা দিচ্ছে। তাদের মাঝখানে বসে থাকা মাঝারি বয়সের এক ব্যক্তি মতলব আলাী, সে সোহানের দলে সদ্য যোগ দেওয়া। চোখে মুখে অস্বস্তি আর কুটিল ভাবের মিশেল নিয়ে চারদিকে তাকাল একবার সে। যে কেবিনে চিত্রাকে আটকে রাখা হয়েছে, সেটিই লঞ্চের সবচেয়ে নির্জন ও বিলাসবহুল কক্ষ। দরজার সামনে বসা ছেলেগুলো দায়িত্ব পালন করছে বটে, কিন্তু তাদের ভঙ্গিমায় শৃঙ্খলার চেয়ে উচ্ছৃঙ্খলতার ছাপই বেশি। হঠাৎ নতুন আসা সেই মতলব নিচু গলায় বলল, “আমার কি মনে হয় জানোস? আমাগো ভাই এই মাইয়ারে বিয়া কইরা ধ্বংস ডাকতাছে। আমি চাই না ভাইয়ের এই সামান্য মাইয়ার জন্য সমস্যা হোক। ফারাজ এলাহী এতদিন সোহানরে কিছু কয় নাই, কারন সোহান তারে খোঁচায় নাই। কিন্তু এখন সোহান তার জায়গা মতো হাত দিছে, আমার তো মনে হয় ফারাজ এলাহী যেই সেয়ানা মানুষ নির্গাত এতক্ষণে বউয়ের খবর পাইয়া গেছে। তাই আমরা দুইটা কথা শুনলেও আমাগো উচিত ভাইয়ের ভালো করা।”
তার কথায় বাকিরাও ধীরে ধীরে সম্মতি জানাল। কেউ সরাসরি বিরোধ করল না। বরং তাদের চোখে দ্বিধাগ্রস্ত আগ্রহ ফুটে উঠল। এখন কী করা যায়, সেই সমাধানই তারা খুঁজছে। মতলব কিছুক্ষণ নীরব থেকে গাঢ় স্বরে বলল, “ওই মাইয়ার লগে প্রথমে মজা নেই চল, তারপর রাস্তা থাইকা সরাইয়া দিমুনে।” পাশ থেকে আরেকজন বলল, “কোনো সমস্যা হইব না তো? মানে ভাই কিন্তু এই মাইয়ার জন্য অনেক গুলা খুন করছে।”
“ভাই জানতেই পারব না। আমরা, আমরাই তো। ঠিক বুঝাইয়া ম্যানেজ দিমু। আর দরকার হইলে কইমু ফারাজ এলাহী আইসা জোর কইরা তার বউ নিয়া গেছে। যদিও তার লাইগা আমাগোরে কথা শুনতে হইব কিন্তু তাতেও সমস্যা নাই। সবার আগে আমাগো ভাই।”
তার কথায় বাকিরা একসঙ্গে সম্মতি জানাল। অন্ধ সমর্থনের গুঞ্জন করিডরে ছড়িয়ে পড়ল। মতলব যখন চিত্রার কেবিনের দিকে এগোতে উদ্যত, ঠিক তখনই এতক্ষণ নীরবে সব শুনতে থাকা মুইন বলে উঠল, “সবই মানলাম কিন্তু ওই রুমে আগে আমি যামু। যেহেতু সিফাতের পর ভাইয়ের কাছের লোক আমি, তাই ভাই আমার কথা বেশি বিশ্বাস করব আর তোমরা বিপদে পড়লে আমিই তোমাগো বাঁচাইতে পারুম।” মতলব ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “না কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু তোমারে ভালা পোলা মনে করছিলাম।”
মুইন ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দিল, “খুনের পেশায় জড়িত, আমার আর ভালো হওয়া।”
মতলব শান্ত গলায় বলল,”খুনের পেশা, আর চরিত্রে দোষ দুইটা আলাদা।”
মুইন আর কোনো কথা বলল না। হাতে ধরা বাংলা মদের বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরে কেবিনের চাবি তুলে নিল। তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই বাইরে থেকে মতলব সতর্ক স্বরে বলল, “১০ মিনিটের বেশি সময় লাগাইও না৷ বাইরে আমরা আরো মানুষ আছি কইলাম। ভাই আসার আগে কাম শেষ দিবার হইব।”
“আইচ্ছা।”
কেবিনের দরজা বন্ধ হতেই ভেতরের নীরবতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। খাটের কোণে চিত্রা পড়ে আছে, একটি নেতিয়ে পড়া ফুলের মতো। মুইন ঘরে ঢুকতেই সে কষ্টে ঘাড় তুলে তাকানোর চেষ্টা করল। চোখভরা জল, নিঃশেষিত দৃষ্টি। তারপর আবার মাথা এলিয়ে দিল বিছানায়। তার চোখে বাঁচার আকাঙ্ক্ষার কোনো আলো নেই। এত সহজে কি চিত্রাঙ্গনা হার মানল? চিত্রার সেই নিস্তেজ আত্মসমর্পণ দেখে মুইনের ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসির অন্তরালে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে, খোদাই ভালো জানেন। কিন্তু দশ মিনিটও পেরোল না। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুরু হলো। মুহূর্তেই দরজা খুলে গেল, এই কেবিনের আরেকটি চাবি মতলবের কাছেই ছিল। সে জোর করে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, মুইন বারান্দা দিক থেকে ভেতরে আসছে। মতলবকে দেখে মুইনের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। সে চেঁচিয়ে বলল, “ভাই, ১০ মিনিটে কিছু হয়? আমি তো শুরুই করতে পারলাম না! বাথরুম থেকে বের হইয়া বারান্দায় গেছি একটা সিগারেট ধরানোর জন্য। সিগারেট ধরাইলে আমার এনার্জি বারে। ওমা, সিগারেটটা শেষ করার আগেই চইলা আসছেন!”
মতলব কঠোর স্বরে বলল, “এতকিছু বুঝি না। অনেক সময় দিয়া ফেলছি। পরিকল্পনা যেহেতু আমাগো ছিল, তো এখন যা কাজ আমরা করমু। তুমি বাইরে যাও এখন।”
মুইন প্রতিবাদ করল,“আরে বললেই হলো নাকি?”
তার কণ্ঠের ঔদ্ধত্যে মতলবসহ বাকিদের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তারা মুইনকে উপেক্ষা করে সরাসরি চিত্রার দিকে তাকাল। এইবার চিত্রার চোখে সত্যিকারের ভয় খেলে উঠল। সে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে টেবিলের নিচে রাখা কেরোসিনের বোতলের দিকে দৃষ্টি ফেলল। কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে, খোদার কসম আগুন লাগিয়ে সবটাকে চিতায় তুলব।”
চিত্রার সতর্ক উচ্চারণে ঘরের বাতাস মুহূর্তে থমকে গেল। কিন্তু মতলব থামল না বরং হো হো করে হেসে উঠল।
সে এগিয়ে এসে বলল,“বেশি তেজ, তাই না? মাইয়া মানুষের এত তেজ কিসের? আবার গলা ফাইরা চেঁচায়! দেখি তাইলে, কে কারে পুড়ায়?” কথা শেষ করে সে টেবিলের নিচে হাত বাড়িয়ে কেরোসিনের বোতলটা টেনে বের করল। চিত্রা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু দেয়াল তাকে আর সরে যাওয়ার সুযোগ দিল না। মতলব নির্মম ভঙ্গিতে বোতলের মুখ খুলে তরলটি ছিটিয়ে দিতে শুরু করল। প্রথমে চিত্রার গায়ের দিকে, তারপর বিক্ষিপ্তভাবে ঘরের মেঝে, পর্দা, বিছানার চাদর। কেরোসিনের তীব্র গন্ধে ঘর ভরে উঠল। ছেলেগুলো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এমন পরিণতি হয়তো তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল না। মতলব বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে পাশের এক ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “একটা দেশলাই দে তো।”
ছেলেটি দ্বিধায় পড়লেও কাঁপা হাতে দেশলাই বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই মুইন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
“পাগল আপনি? এখানে এসব কি করতাছেন?”
তার কণ্ঠে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট আতঙ্ক। সে দ্রুত এগিয়ে এসে মতলবের হাত চেপে ধরতে চাইলো। মুইনের বাধা উপেক্ষা করে মতলব হাত ঝাঁকিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। মুইন আবারও এগিয়ে এসে বলল,
“এইটা ঠিক হইতেছে না! আগুন লাগলে আমরা সবাই ঝামেলায় পড়মু।”
মতলব কটমট করে তাকাল। “তুমি চুপ করো মিয়া। ভয় পাইতাছো? এতক্ষণ তো বড় বড় কথা কইতাছিলি!”
মুইন এবার সত্যিই তার হাত চেপে ধরতে গেল। কিন্তু মতলব পেছন ফিরে বাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “ধর ওরে। বাইরে নিয়া যা। বেশি বুদ্ধি দেখাইতেছে।” দু’জন ছেলেই মুহূর্তে মুইনকে জাপটে ধরল। মুইন ধস্তাধস্তি করতে লাগল, কণ্ঠ ফেটে চিৎকার করল, “ছাড়! পাগলামি কইরো না! ভাই জানলে তোদের কেউ বাঁচবো না!” কিন্তু তার কথা কেউ শুনল না। জোর করে তাকে টেনে কেবিনের বাইরে এনে দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে থেকে সে ধাক্কা দিতে লাগল। মতলব ধীরে ধীরে চিত্রার দিকে ফিরল। তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ঘরে কেরোসিনের তীব্র গন্ধ ভাসছে।
চিত্রা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখে ভয় থাকলেও কণ্ঠে দৃঢ়তা। সে ধীরে বলল, “যত হাসি হেসে নে… কারণ ফারাজ এলে এটাই তোদের শেষ হাসি হবে।”
মতলব আবার হেসে উঠল,“ওই ফারাজ? সে আসলে কী হইব? নায়ক আইসা বাঁচাইবো? সিনেমা বেশি দেখছস নাকি?”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৮
চিত্রা আর কিছু বলল না। তার দৃষ্টি স্থির। মতলব দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে থামল। ফিরে তাকিয়ে বিদ্রূপভরা কণ্ঠে বলল, “নে এবার পুড়ে ছাই হ। তোর সাজানো চিতায় তোকেই শুইয়ে দিলাম।” কথা শেষ করেই সে দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন ধরাল। ক্ষণিকের লেলিহান শিখা তার চোখে প্রতিফলিত হলো। তারপর সে জ্বলন্ত কাঠিটি ছুড়ে দিল ভেজা মেঝের দিকে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। মতলব দরজা বন্ধ করে দিলো, নিয়তির সঙ্গে চিত্রাকে একা ফেলে।

next part