Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৪

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৪

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৪
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

“ঠাসস!”
চপেটাঘাতের তীব্র শব্দে থমকে গেল সবাই। চোখ বড় করে একযোগে তাকাল শুদ্ধ ও প্রিয়স্মিতার দিকে। প্রিয়স্মিতার চোখ ছলছল করে উঠলো, অটোমেটিকলি হাত চলে গেল গালে। সে পানি টলমলে চোখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে শুদ্ধর ক্রোধান্বিত মুখশ্রীর পানে। তার লাল টকটকে চোখ দুটো যেন জমাট বাঁধা রক্তের কুণ্ড।
অতচ প্রিয়স্মিতার চোখ দুটো নরম, সেথায় বাসা বেঁধেছে অভিমান, অবিশ্বাস। তার বিশ্বাস হচ্ছে নাহ্— তার ভালোবাসার মানুষটা তাকে মারল! রাগে ফোঁস ফোঁস করছে শুদ্ধর। তার দু’চোখে ঠিকরে যেন অগ্নি বর্ষিত হচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ক্রোধ কন্ট্রোল করতে অপারক সে। প্রিয়স্মিতাকে এক্ষুনি কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
প্রিয়স্মিতার গাল ভিজে উঠলো। কেঁপে ওঠা কণ্ঠে অবিশ্বাস ঢেলে বললো,

“তুমি আমাকে মারলে?”
শুদ্ধ দাঁত কিড়মিড় করে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। মাথা থেকে পা অবধি জ্বলে যায় রাগে। উপস্থিত সকলে হতবাক— যা কিছু হচ্ছে সব তাদের মাথার দশ হাত উপর দিয়ে যাচ্ছে।
শুদ্ধ হঠাৎ প্রিয়স্মিতার দুই বাহু চেপে ধরলো। প্রিয়তার মতো গলে যাওয়ার মত নরম না হলেও অতটাও শক্ত নয়। বেশ ব্যথা পেলো প্রিয়স্মিতা, তবু ও টু শব্দ করলো না। অপেক্ষা করলো শুদ্ধর পরবর্তী বয়ানের।
শুদ্ধ হাড়ের সমস্ত জোর লাগিয়ে গর্জন করে উঠলো ক্ষেপাটে বাঘের মতো। মুখ বিকৃত করে বললো,
“তোকে মারবো না? তোর মতো নাটকবাজ মহিলাকে আমি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারছি না। মন চাচ্ছে—”
বলতে বলতে থেমে গেলো শুদ্ধ। ধারালো চোয়ালের হাড়গুলো অভিন্নস্ত ইস্পাতের ন্যায় কঠিন।
প্রিয়স্মিতার বিস্ময়ঝরা কণ্ঠে শুধালো,

“আমি নাটকবাজ? এসব কি বলছেন আপনি, শুদ্ধ? কেনো বলছেন এমন?”
প্রিয়স্মিতার এই না-বোঝার ভান শুদ্ধর উত্তপ্ত মস্তিষ্কে পেট্রলের কাজ করলো। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো প্রিয়স্মিতাকে— যেনো সে পৃথিবী থেকে নিষ্কাশিত ঘৃণিত কেউ, যাকে ছুঁলেও অস্পৃশ্য হয়ে যাবে।
ভালোবাসার মানুষটার চোখমুখে নিজের জন্য স্পষ্ট ঘৃণা দেখে কলিজায় হাজার খানা বেত্রাঘাত পড়ার মতো অনুভূত হলো প্রিয়স্মিতার। সে কিছু বলতে নিলেই—
শুদ্ধ কণ্ঠে রাজ্যের অনীহা আর ঘৃণা মিশিয়ে বলল,
“ওরে বাপরে! তুই নাটকবাজ না? তুই জীবনে পুলিশ হতে পারবি কিনা জানি না, তবে অভিনেত্রী তুই জন্ম থেকেই। তোর মতো এত নিখুঁত অভিনয় কোনো অভিনেতার দ্বারা করা সম্ভব না। তোর ভাগ্য ভালো— তোর শুধু একটা চড় মেরেছি, নহলে তুই যা করেছিস!”

এতটুকু বলে পুনরায় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল শুদ্ধ। তিক্ত কণ্ঠে অবজ্ঞা মিশিয়ে বলল,
“ছিঃ! বাসায় একটা কুত্তা পাললে ও তো মানুষের তার প্রতি মায়া জন্মে যায়। চাইলে ও তখন আর তাকে তাড়িয়ে দিতে পারে না, মারা তো দূরের কথা। এখন ভাব— তুই ঠিক কতটা নীচ আর নিকৃষ্ট! সামান্য মহান সাজার লোভে তুই এই কাজটা করতে পারলি? আচ্ছা, এই কাজটা করার আগে তোর একবারও বুক কাঁপলো না? একবারও চোখের সামনে ভাসলো না ওই মেয়েটার মুখ? একবারও মনে পড়ল না ঐ মেয়েটার কথা? তুই তোর মিশনে সাকসেস পেলেই ওই মেয়েটাকে আমাদের ওর সাথেই দাফন করতে হতো। আচ্ছা, ওই মেয়েটা কি তোর পর ছিল? ভালোবাসার এতো নিখুঁত অভিনয় তুই কিভাবে করলি? কিভাবে পারলি ওই মেয়েটার জীবনটা উলটপালট করে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগতে? তুই সত্যি ওর বোন? বিশ্বাস হয় নাহ!”
অভিযোগগুলোর ধাঁচ দেখে ঘটনার সারাংশ আন্দাজ করতে পারল প্রিয়স্মিতা। প্রথমের কথাগুলো মাথার উপর দিয়ে গেল, তবে এবার সে বেশ বুঝতে পারছে।
কিন্তু ঘটনা যাই হোক, শুদ্ধর এই উগ্র আচরণ প্রিয়স্মিতার উগ্র প্রতিবাদী নারীসত্ত্বার মোটেও পছন্দ হলো না। ঝাড়া মেরে হাত সরিয়ে দিল। ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর সমস্ত কিছু সেক্রিফাইস করলে এই বিষয়ে একটুকুও সেক্রিফাইস করবে না প্রিয়স্মিতা।
তেজী কণ্ঠে বলল,

“আমি কোনো অভিনয় করিনি, ডক্টর চৌধুরী। আপনি বেশি বেশি বলছেন। যেটা আমার কাজ, আমি করেছি। তাছাড়া আমি কার সাথে অভিনয় করেছি দেখাতে পারবেন?”
শুদ্ধ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ছিঃ! এতো বড়ো গলায় কথা বলতে তোর লজ্জা করছে না? কার সাথে অভিনয় করেছিস জানিস না তাই নাহ্?”
“নাহ্।”
“দেখিয়ে দেবো কার সাথে করেছিস। এই দেখ— ওর সাথে করেছিস, যার সঙ্গে তুই সর্বক্ষণ মুখোশ পরে থাকিস। ভালোবাসার আদিখ্যেতা দেখাস!”
বলে হাতের তর্জনী তুলে প্রিয়তার দিকে তাক করলো শুদ্ধ।
প্রিয়তা চোয়াল ঝুলিয়ে হা করে তাকিয়ে ছিল দুজনের দিকে। কিন্তু প্রশ্নবোধক আঙুলটা নিজের দিকে ঘুরে যেতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বিস্ময় বাড়লো অনেকখানি।
এরা কি কথা বলছে, কি নিয়ে কথা বলছে, আর এতো রেগেই বা আছে কেন— কয়েকজন ব্যতীত কারণগুলো কেউ বুঝলো না। সকলে আগ্রহ নিয়ে তাকালো পরবর্তী বয়ান শোনার অপেক্ষায়।
আঙুলটা প্রিয়তার দিকে তুলতে দেখে রেগে গেল প্রিয়স্মিতা। সহ্যের বাঁধ ভাঙলো। চেঁচিয়ে ওঠে বলল,
“একদম ওর দিকে দেখাবেন নাহ্! ও আমার বোন! ওর সাথে আমি অভিনয় করবো? আমি ওর খারাপ চাইবো? যা হচ্ছিল একদম ঠিকই হচ্ছিল— সে ডিজার্ভ বেটার!”
প্রিয়স্মিতার কথা শুনে হুহু করে হেসে উঠলো শুদ্ধ। তাচ্ছিল্য খেলে গেল চোখে মুখে। হাসি থামিয়ে বিদ্রুপের স্বরে বললো,

“মন্দ বলিস নি। আচ্ছা এটা তোর বোনকে বুঝাতে পারবি যে সে ডিজার্ভ বেটার?”
থমকালো প্রিয়স্মিতা।
শুদ্ধ শান্ত হয়ে বললো,
“আচ্ছা তুই কি একবারও ভেবে দেখেছিস যে তুই আসলে কি কি করেছিস? তার জন্য আজ এই বাড়িতে কি কি হতে পারতো? পরিচিতিটা কি রকম হতো? বলবো সবাইকে তোর সেই মহান কর্মের ব্যাপারে? তুই না তোর বোনকে খুব ভালোবাসিস? যদিও সব নাটকের ভালোবাসা! তবুও বলবো প্রিয়তাকে যে তুই তার দুর্বলতায় একদম মেইন পয়েন্টে ঠিক কিভাবে আঘাত এনেছিলি, কি কি করতে চেয়েছিলি তার।”
শুদ্ধকে কথা সম্পন্ন করতে দিল না প্রিয়স্মিতা। চেঁচিয়ে বললো,
“চুপ করুন!”
মজা পেলো শুদ্ধ। থামলো না, ফের বললো,
“বলবো প্রিয়তাকে যে আজ তোর জন্য—”
বলে প্রিয়স্মিতার দিকে একটু ঝুঁকে গেলো শুদ্ধ। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আজ তোর জন্য সে বিধবা হতে যাচ্ছিলো। তুই ওর প্রণয় ভাইকে— বুঝতে পারছিস? ওর প্রণয় ভাইকে, যাকে ছাড়া ও নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না— সে প্রণয় ভাইকে খুন করতে যাচ্ছিলি। আচ্ছা তোর মনে হয় এখনো তোকে যতটা সম্মান করে, ভালোবাসে— সবটা জানার পরও ওর এই অনুভূতিগুলো একই থাকবে? বড্ড বোকা তুই। বিশ্বাস কর, সবটা জানতে পারলে তোর এই আলাভোলা বোকাসোকা বোনই তোর ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দেবে। বিশ্বাস কর, এই পৃথিবীতে ও প্রণয়কে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসে না। তুই যেমন নাটক, আজ ও তোর থেকে আরো দ্বিগুণ বেশি নাটকবাজ। প্রণয় ছাড়া বাকিদের সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে— এডজাস্টমেন্ট বলতে পারিস।”
শুদ্ধর শাসানিতে প্রিয়স্মিতার অন্তরে বেশি না হলেও হালকা ভয়ের উদয় হলো। ভেতরটা শিটিয়ে গেলো কেমন। চোরা চোখে ভয়ে একবার তাকালো প্রিয়তার দিকে।
প্রিয়তার চোখমুখে ঠিকরে পড়ছে সবটা জানার আগ্রহ। অদম্য কৌতূহল।
সরে এলো শুদ্ধ।
প্রিয়স্মিতা যে ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়েছে সেটা মোটেও প্রকাশ করলো না। সরাসরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো শুদ্ধর চোখের দিকে। নির্ভীক চোখ দুটো। কণ্ঠে কাটকাট দৃঢ়তা নিয়ে বলল,

“আমি কোনো অন্যায় করিনি। যা আমার ডিউটি, আমি তাই করেছি। আর আমার লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি থামবো না। সেই যাই হয়ে যাক, আর যাই ঘটে যাক। আই ডোন্ট কেয়ার।”
এতক্ষণ বোঝানোর পরেও প্রিয়স্মিতার ত্যাড়ামি কমেনি দেখে পুনরায় ধক করে মাথায় আগুন ধরে গেল শুদ্ধর। সে পরিষ্কার বুঝে গেল এই মেয়েটা সোজা কথার মেয়ে নয়। আসলে কুত্তার লেজ তো সারা জীবন ঘি-মাখন দিয়ে মাজলেও সোজা হবে না।
“আমি যখন মারবো বলে ঠিক করেছি, তখন মারবোই।”
শুদ্ধ উদ্যত হয়ে পুনরায় চড় মারার জন্য হাত উঠতেই বাহু চেপে ধরলো প্রণয়। ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল শুদ্ধকে। শীতল কণ্ঠে হুমকি দিয়ে বলল,

“একদম নয়।”
ক্রোধে ফেটে পড়লো শুদ্ধ। তেড়ে এসে চেপে ধরলো প্রণয়ের কলার। প্রণয়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে বলল,
“এই ব্যাপারে একদম হস্তক্ষেপ করবি না। যত দূরে থাকবি, তোর জন্য ততই মঙ্গল। না হলে দেখছিস তো— তোর সত্যিটা ওর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে আমার সময় লাগবে না। তাই বলছি, ধৈর্যের পরীক্ষা নিবি না। দূরে থাক।”
প্রিয়তা আতঙ্কে দুই হাতে মুখ চেপে ধরলো। দৌড়ে এসে শুদ্ধর হাত থেকে প্রণয়কে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু পুরুষালী শক্তির নিকট সে তো নবজাতক।
প্রণয় কলার থেকে শুদ্ধর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কণ্ঠে গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলল,
“একদম বাড়াবাড়ি করবি না। এটা আমাদের বিষয়, আমরাই দেখে নেবো।”
শুদ্ধ ওর কথা কানেই তুললো না। প্রিয়স্মিতার হাতের কবজি চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির বাইরে।
প্রহেলিকা গার্ডেন এরিয়াতে দাঁড়িয়ে ফোনে কোনো একটা বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করছিল। চোখ-মুখ ভীষণ সিরিয়াস। কিন্তু আলোচনার এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি কানে আসতেই থেমে গেল প্রহেলিকা।
কুচকুচে ভ্রুদয়ে ভাঁজ পড়লো দুই একটা। কান থেকে ফোন নামিয়ে চাইলো আশেপাশে। তার থেকে সামান্য কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে তুলকালাম চেঁচামেচি করছে শুদ্ধ আর প্রিয়স্মিতা। শুদ্ধকে এই পরিমাণ রেগে যেতে দেখে বেশ অবাকই হলো প্রহেলিকা।
কপাল চুলকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো, কিন্তু নাহ্— পরিষ্কার বুঝতে পারলো না। ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দগুচ্ছ কানে আসছে। ফোন কেটে কৌতূহল নিয়ে সেদিকে পা বাড়ালো। প্রিয়স্মিতার যত কাছে এগোচ্ছে, ততই অস্পষ্ট শব্দগুলো স্পষ্ট হয়ে কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে।

কয়েকটা কথা কানে যেতেই মাঝপথে পা থেমে গেল প্রহেলিকার। শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। নিজেদের ঝামেলায় এতটাই মত্ত ছিল তারা যে প্রহেলিকার উপস্থিতি লক্ষ্যই করলো না।
তাদের কথোপকথন শুনে বুকের ভেতরের রক্তচাপ বেড়ে গেলে প্রহেলিকার হৃদপিণ্ড ছ্যাত করে উঠলো। বর্ণনাগুলো শুনে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো আপনা আপনি। ফর্সা চামড়ার উপর দিয়ে ঘাড় আর কপালের সবুজ শিরাগুলো ভয়ানক আকারে ভেসে উঠলো। সে রক্তিম চোখে তাকিয়ে রইলো প্রিয়স্মিতার দিকে— যেমন লক্ষ্য স্থির করে শিকারি তার শিকারের প্রতি।
শরীরের উত্তপ্ত রক্তের দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল। শিরা বেয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগলো এদিক-সেদিক।
কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে পৌঁছে গেল।
প্রিয়স্মিতা চিৎকার করে বললো,

“আমি যা করেছি বেশ করেছি। আমার সাথে তুমি এমন জঘন্য আচরণ করতে পারো না। আমি তোমার বউ।”
দাবি শুনে ক্ষণিকের জন্য রাগ উবে গেল শুদ্ধর। প্রিয়স্মিতার সিরিয়াস চোখ-মুখ দেখে হাসি চাপতে পারলো না। হা হুঁ করে হেসে দিল শুদ্ধ। হাসতে হাসতে তার গড়িয়ে পড়ার উপক্রম।
প্রিয়স্মিতা ভরকালো। অজানা কারণে খুব ভয় জাগলো মনে। চিত্তে কৌতূহল চেপে তাকিয়ে রইলো শুভ্রকায় পুরুষের পানে।
আচমকা অট্টহাসি থামিয়ে দিল শুদ্ধ। মুখের আদলে গম্ভীরতা ঝেঁকে বসলো পড়বে ন্যায়। ধীরে তাচ্ছিল্য হাসলো। মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই— তুই আমার বউ। তবে—”
ভ্রু কুঁচকে গেল প্রিয়স্মিতার।
“তবে?”
শুদ্ধর ভাবলেশহীন জবাব,
“তবে নকল বউ।”
“হোয়াটটট!”
শুদ্ধর উত্তরে যেনো পায়ের নিচের জমিন সরে গেল প্রিয়স্মিতার। মাথার উপর ভেঙে পড়লো মস্ত আকাশ। হাত-পা সহ সমগ্র শরীর কেঁপে উঠলো ঝাঁকি মেরে। আত্মবিশ্বাসী চোখগুলো ঘোলাটে বর্ণ ধারণ করলো অজানা আশঙ্কায়।
কাঁপা গলায় বললো,

“ক-ক-কি বলছেন ডক্টর সাহেব? নকল বউ?”
শুদ্ধ ধূর্ত হেসে রয়ে সয়ে জবাব দিল,
“একদম নকল বউ। বিশ্বাস করো, বউ পুরোটাই বেজাইল্লা— এতোটুকুও আসল নেই। আসলে তুমি হয়তো ভাবছো তুমি দুধে জল মিশিয়েছো, আসলে জলে দুধ মেশানো হয়েছে।”
ঠোঁট দিয়ে চুকচুক শব্দ বের করলো শুদ্ধ।
প্রিয়স্মিতার সব আত্মবিশ্বাস যেন গুঁড়িয়ে গেল মুহূর্তেই। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল,
“আমাকে ভালোবাসো নাহ্?”
শুদ্ধ বাঁকা হেসে ভীষণ অপমানজনকভাবে প্রত্যুত্তর করলো,
“হ্যাঁ? তুই কি আশা করেছিলিস মিথ্যে বলে ফাঁসিয়ে পরিচয় গোপন করে আমার বউ হয়ে যাবি? আমাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবি— এতই সোজা? ডক্টর অবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধকে কেউ ব্যবহার করতে পারে না, যদি না সে চায়। আর ভাবছিস আমি তোকে ভালোবাসবো? তোকে ভালোবাসার মতো কোনো কোয়ালিটি অবশিষ্ট আছে তোর মধ্যে? মূর্খ মেয়ে মানুষ! আচ্ছা ভাববো? তুই নিজে ভাব— তুই কি ভালোবাসার মতো মেয়ে? মনে জায়গা দেওয়া যায় তোকে? তোকে কি সত্যি ভালোবাসা যায়? তুই কি ভালোবাসার যোগ্য?”

“আচ্ছা, আমার কথা ছাড়। তোর মতো ছলনাময়ী নারী কারো কি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য? তুই ভালোবাসার মূল্যায়ন করতে জানিস? দেখ, পেছন ফিরে— তোকে যে ভালোবেসেছে, সত্যি ভালোবেসেছে, তার অন্তত তুই জ্বালিয়ে দিয়েছিস। যে তোকে সত্যি ভালোবেসেছে, সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে তুই আসলে কী চিজ। আর স্বপ্ন দেখিস আমি তোকে ভালোবাসবো? আমার স্ট্যান্ডারের কোথাও নেই তুই। আসলে কিছু মেয়েকে ধ*ন দিতে হয়, মন নয়— জাস্ট লাইক ইউ। না, তুই নিজে কাউকে ভালোবাসতে পারিস। না, তুই কারো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখিস।”

“সাধারণ মেয়েদের মধ্যে কি থাকে— সহজাত কোমলতা, মিষ্টতা, নম্রতা, ভদ্রতা, লজ্জা, সহনশীলতা, নির্ভরশীলতা। ওগুলোর একটাও তোর মধ্যে আছে? তুই কি ওই সব মেয়েদের মধ্যে পড়িস, যাদের দেখলে ভালোবাসার জন্য বুক কাঁপে? ছুঁয়ে দিতে চাওয়ার অদম্য বাসনায় গায়ে জ্বর আসে? নিজের দিকে তাকা— তোর মধ্যে কি আছে? মিথ্যাচার, ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা, নাশকতামূলক স্বার্থপরতা, স্বেচ্ছাচারিতা?”
নিজের নামে, নিজের ভালোবাসার মানুষটার মুখ থেকে এত ভালো ভালো সার্টিফিকেট শুনে প্রিয়স্মিতার অনুভূতিগুলোই বোধহয় মরে গেল।
নিস্তেজ কণ্ঠে শেষবারের মতো জানতে চাইল,
“তুমি সত্যি আমাকে কোনোদিন ভালোবাসো নি?”
“ছিঃ! তোর মতো মেয়েকে ভালোবাসবো আমি?”
সেই একই উত্তর।
শুদ্ধ ওর ভালোবাসার পবিত্রতাটুকু পায়ের তলায় ফেলে পিষে ফেলল। সম্পর্কের আসল আয়নাটা প্রিয়স্মিতার মুখের সামনে ধরে বলল,

“শোন— তুই আমাকে ব্যবহার করেছিস তোর স্বার্থে। আমি তোকে ব্যবহার করেছি আমার স্বার্থে। তোর এই বাড়িতে ঢোকা লক্ষ্য ছিল, আর আমার তোর উপর নজর রাখা লক্ষ্য ছিল। তোর এই বাড়ির মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা লক্ষ্য ছিল, আর আমার তোর বিশ্বাস অর্জন করা লক্ষ্য ছিল। তুই চেয়েছিলি প্রণয়কে মারতে, আমি চেয়েছিলাম তোর কাছে থাকা ইনফরমেশনগুলো হাতাতে। তুই তোর লক্ষ্যে মুখ থুবড়ে পড়লেও, আমি কিন্তু পড়িনি। আমি আমার লক্ষ্যে ঠিকই সাকসেস। তোর হাতে থাকা সব ইনফরমেশন, পেপারস, পেনড্রাইভ— সবকিছু আমার হাতে। তুই অদৃশ্যভাবে আমার সাথে পাঙ্গা নিয়েছিলি।”
“তোর আর আমার মধ্যে একটা অদৃশ্য ডিল ছিল, বুঝলি? বুঝাপড়া ছিল— কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না। তোকে আমি বিয়ে করি নি। যা কিছু হয়েছে তার সবটাই মিথ্যে ছিল। সবচেয়ে সাজানো ছিল তোর গুটিগুলো— আমি নিজের মতো সাজিয়ে ছিলাম। আর হ্যাঁ— এই পুয়াতি সাজার নাটক বন্ধ কর। তোর পেটে যে বাচ্চা নেই, সেটা আমি খুব ভালো মতোই জানি। সবাইকে ঘোল খাওয়াতে পারলেও আমাকে পারবি না। আজ থেকে তুই তোর রাস্তায়, আমি আমার রাস্তায়।”

বলে হনহনিয়ে চলে গেল শুদ্ধ।
প্রিয়স্মিতার মাথায় যেনো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আছড়ে পড়ল। ঠোঁট কাঁপলো মেয়েটার। দুই ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করলো। সাথে সাথেই গড়িয়ে পড়লো অশ্রু।
এই দু ফোঁটা নোনা অশ্রু শুধু চোখের পানি নয়— বরং নিজের দুর্বলতার শেষ কারণটাও বিসর্জন দিলো প্রিয়স্মিতা।
বুকের উপর পাহাড় চেপে থাকলেও কেমন মুক্তির বাতাস দোলা দিয়ে গেলো। এখন থেকে সে মুক্ত— তার আর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
ঠিক দুই মিনিট পর চোখ খুললো প্রিয়স্মিতা। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ। চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা। লক্ষ্য এখন আগের থেকেও বেশি তীক্ষ্ণ আর পরিষ্কার। এখন আর লক্ষ্যে কেবল আবরার শিকদার প্রণয় নয়— অবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধও।
দেশের সাথে অন্যায়ের পাশাপাশি নিজের সাথে অন্যায়েরও কঠিন প্রতিশোধ নেবে প্রিয়স্মিতা। এক চুলও ছাড় দেবে না কাউকে। বিশ্বাসঘাতকদের জন্য চোখের পানি ফেলার মতো মেয়ে প্রিয়স্মিতা নয়। ডাক্তার অবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধকে ভুগতেই হবে।
সব শেষে প্রিয়স্মিতার মনে পড়ে গেল সেদিন নির্বাণের বলে যাওয়া কথাগুলো—
“কেউ কাউকে কষ্ট দিয়ে বিশ্বাস ভাঙে কোনোদিন সুখী হতে পারে না, প্রিয়স্মিতা। আজ তুমি আমার সাথে যেটা করলে, এমন না হয় সেটা একদিন তোমার সাথেও হয়। আমি তো সহ্য করে নিলাম, প্রিয়স্মিতা— কিন্তু তুমি পারবে না।”

বাড়ির সকলে অবাক চিত্তে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাদের বড় গলার চিৎকার বাইরের গার্ডেন এরিয়া পেরিয়ে ড্রয়িং রুম পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে, তবে আবছা—ইট পাথরের মোটা মোটা দেওয়ালের জন্য শব্দগুলো স্পষ্ট নয়।
হাজারটা প্রশ্নে মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে প্রিয়তার। শুদ্ধ ভাইয়ার ইঙ্গিতপূর্ণ কথাগুলো বড় রহস্যময় লেগেছে। সে বুঝতে পারে না শুদ্ধ ভাই আসলে কোন সত্যির কথা বারবার বলার চেষ্টা করছেন, আর তার নিজের বোনই বা কীভাবে তার জীবন নষ্ট করতে উঠে পড়তে লাগতে পারে। সব ঠিক আছে, কিন্তু এই কথাটা বিশ্বাস হলো না—প্রিয়তার বোন কি কখনো বোনের খারাপ চাইতে পারে?
তাহলে আসল ব্যাপারটা কী? কী নিয়ে এত ঝামেলা করছে দুজন, আর কেনই বা এভাবে কামড়াকামড়ি করছে?
নিচের দিকে তাকিয়ে প্রিয়তাকে ভাবনার অতলে হারাতে দেখে পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো প্রণয়। লুকোচক্ষুর আড়ালে কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিলো। সরু চিকন নাকটা টিপে দিয়ে নরম গলায় সুধালো,

“কী ভাবো, জান?”
ভাবনায় ছেদ পড়ায় চমকে ওঠে প্রিয়তা। উপরে চোখ উঠতেই দেখতে পায় গভীর দুটো চোখ, এক সমুদ্র মায়া মিশিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। প্রিয়তা চোখ নামিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“শুদ্ধ ভাইয়ার কথাগুলো আমাকে ভীষণ ভাবাচ্ছে, প্রণয় ভাই। উনি কিসের কথা বলে গেলেন? আমার আবার কিসের বিপদ?”
প্রিয়তমার উৎকণ্ঠা কোনটা পর্যবেক্ষণ করে নিরবে হাসলো প্রণয়। ঘাড় নিচু করে প্রিয়তার মাথায় চুমু একে বললো,
“ধুর পাগলি! যা-ই বলুক আর যে সমস্যাই থেকে থাকুক, এসব নিয়ে তুই এতো মাথা ঘামাচ্ছিস কেনো? আমি তো আছি—যে দুর্যোগই আসুক, আমি দুই হাতে সামলে নেব। সারা দুনিয়া ঝড়ের তাণ্ডবে উতাল-পাথাল হয়ে যাবে, কিন্তু তুই তখনও নিশ্চিন্তে তন্দ্রামগ্ন থাকবি এই বুকে। তোর ছোট্ট মাথা এসব হিজিবিজি ভাবার জন্য নয়। তুই সব সময় চঞ্চল থাকবি, বায়না করবি। আমি যতদিন আছি, তোর একটাই কাজ—আমার বুকে ঘাপটি মেরে থাকা। এসব দুনিয়ার জটিলতা সামলানোর জন্য আমি আছি।”

প্রণয়ের আশ্বাসবাণীতে ঝরঝরে হাসলো প্রিয়তা। সকল কৌতূহল মরে গেল মুহূর্তেই। অবুঝ মন সায় জানাল। সত্যি তো, সে এসব হিজিবিজি ভেবে তার কী কাজ?
তার কাছে তো তার প্রণয় ভাই আছে। তাকে ছায়া দেওয়ার জন্য কুটা একটা বিশাল বটবৃক্ষ খাড়া আছে, তাহলে সে কেন শুধু শুধু পাতি চিন্তা মাথায় নিয়ে সুখের ঘুম হারাম করবে? দুনিয়া জ্বলে যাক, পুড়ে যাক, জাহান্নামে যাক—কিছুতেই কিছু যায় আসে না প্রিয়তার। সে শুধু তার প্রণয় ভাইয়ের বুকে থাকতে পারলেই খুশি।
প্রণয় আর প্রিয়তা ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই ডেকে উঠলেন অনুশ্রী বেগম,
“বড় আব্বা!”
সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল প্রণয়। অনুশ্রী বেগম ছুটে এলেন ছেলের কাছে। ছেলের চোখ-মুখ-হাত বুলিয়ে ভাঙা গলায় বললেন,

“আমার বাপ, তুই এত শুকালি কেমনে? তুই কি একটুও খাওয়া-দাওয়া করিসনি? শুনলাম এক্সিডেন্ট করেছিস!”
মায়ের কথা শুনে কঠিন চোখে প্রেম আর প্রিথমের দিকে তাকাল প্রণয়। চোখ দেখে ঢোক গিলল দুই ভাই। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে সুরসুর করে কেটে পড়ল।
মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রণয় মৃদু হাসল। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করে বলল,
“আম্মু, আমি একদম ঠিক আছি। ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট, তেমন কিছু হয়নি। দেখো, এখন একদম ঠিক আছি।”
ছেলের নিষ্পাপ মুখটা দেখে অনুশ্রী বেগমের মাতৃমন কেঁদে উঠলো। এই একটা মাত্র ছেলেকে নিয়ে উনার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ওভারথিংকিং করতে করতে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেন মাঝে মধ্যেই। অনুশ্রী বেগম ছেলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললেন,

“তুই একদম ভাবিস না, বাবা। কয়েকটা দিন তোকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করাবো। দেখবি, আবার আগের মতো হয়ে যাবি।”
“আম্মু, আমি আগের মতোই আছি। স্টিল ৮৫।”
“চুপ কর, ছেলে! এতটাও বড় হয়ে যাসনি যে মায়ের চোখকে ফাঁকি দিবি। আমি তোর পেট থেকে আসিনি—তুই আমার পেট থেকে এসেছিস।”
“আম্মু…”
“আহারে, আমার বাচ্চাটা কেমন শুকিয়ে গেছে! গায়ের রংটাও কেমন চাপা হয়ে গেছে। চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে।”
পাশ থেকে তাল মেলাল প্রিয়তা। মাথা নেড়ে নেড়ে বললো,
“বড় আম্মু, উনি তো একদমই খেতে চান না। জানো, উনি খাওয়া নিয়ে কত ঝামেলা করেন আমার সাথে! একটু জোরাজুরি করতে গেলে উল্টো আমাকে ধমক খাইয়ে চুপ করিয়ে দেন।”
প্রণয় চোখ ছোট ছোট করে তাকাল বউয়ের দিকে। বউ তাকে সুযোগ বুঝে চিপায় ফেলার চেষ্টা করছে। বাকা হাসলো প্রণয়। মাথা ঝুঁকিয়ে কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ধীরলয়ে বলল,
“শাশুড়ির তালে তাল মেলানো হচ্ছে বুঝি? রোজ ৬-৭ করে যে তোমাকে খাই, সেটা বুঝি যথেষ্ট নয়? আচ্ছা, ব্যাপার নাহ্। রুমে চলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ডিনারের আগে ইভনিং স্ন্যাকস…”

প্রণয় কথা শেষ করতে পারল না। কনুই দিয়ে পেটে গুঁতো মারল প্রিয়তা। চাপা কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“চুপ করুন, অসভ্য লোক!”
নিঃশব্দে হাসল প্রণয়। আবারও উপরের দিকে যেতে নিলে বাগড়া দিলেন অনুশ্রী বেগম। কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন,
“ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস, দুজন?”
প্রণয়ের কণ্ঠস্বরে ক্লান্তি,
“নিজেদের ঘরে যাচ্ছি, আম্মু। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিতে হবে।”
“তো ওদিকে যাচ্ছিস কেন?”
ভ্রু কুচকালো প্রণয়।
“তাহলে কোথায় যাব? আমাদের ঘর তো উপরেই।”
অনুশ্রী বেগম দুই হাত বুকে গুঁজে তাকালেন ছেলের দিকে। মায়ের চাহনি দেখে ভরকাল প্রণয়। যত যা-ই হোক, মায়ের এমন চাহনি দেখলে এখনো ছোটবেলার মতো ভয় লাগে। মনে হয় সে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
“যাই, আম্মু,”
চোখ নামিয়ে বলল প্রণয়।
“তুই মাত্র কদিন আগে পায়ে ব্যথা পেয়ে হসপিটালে পড়েছিলি, আর এখনো এতগুলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে তুই তিন তলায় যাবি? তোদের জন্য ওদিকের ঘরটা আমি গুছিয়ে রেখেছি। চুপচাপ চলে যা। আর উপরের ঘরের দিকে পা বাড়াতে যেন না দেখি!”

মায়ের হুকুম শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল প্রণয়ের। দ্রুত অসম্মতি জানাতে নিলে কঠিন চোখে তাকালেন অনুশ্রী বেগম। প্রিয়তা ঢোক গিলল। প্রণয়কে আর তর্ক করতে না দিয়ে তার বাহু চেপে ধরে টেনে নিয়ে গেল উত্তর দিকের ঘরটাতে। বাড়ির সকলেও চলে গেলেন যার যার ঘরে।
প্রণয় গটগট পায়ে ঘরে ঢুকে ধরাম করে বিছানায় বসে পড়ল। রাগে নাকটা বারবার ফুলে ফুলে উঠছে। বিড়াল ছানার ন্যায় পেছন পেছন রুমে প্রবেশ করল প্রিয়তা। প্রণয়কে মুখ গুমরা করে বসে থাকতে দেখে মিটিমিটি হাসল। পায়ে পায়ে গিয়ে বসে পড়ল প্রণয়ের কোলে। দুই হাতে গলা জড়িয়ে ধরে টুকটুক করে সারা মুখে চুমু খেল। আহ্লাদী কণ্ঠে গদগদ হয়ে বলল,
“আহা! আমার বাবুটা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলায় মুখ ফুলায়। দেখলেই টুকুশ টুকুশ করে কামড়ে খেতে মন চায় পুরো হাওয়াই মিঠাই।”

প্রণয়ের ঠোটে হাসি ফুটলো। বলিষ্ঠ দুই হাতে পেঁচিয়ে ধরল মখমলে কোমর, নাকে নক ঘষে আহ্লাদ প্রকাশ করলো। রয়ে সয়ে কিছু বলার উদ্দেশ্যে মুখ খুলতেই আচমকা তার দুই গাল চেপে ধরল প্রিয়তা।
পুরুষালি পুরু ঠোঁট দুটো পাউট হতে দেখে বেশ আনন্দ পেল মনে হয়। প্রণয় চোখ বড় বড় করে দেখছে ওর কাণ্ডকারখানা।
প্রিয়তা পাউট করা ঠোঁট দুটোর দিকে লোলুপ চোখে তাকাল। ঠোঁট দুটোও যেন ধমক দিয়ে বলছে,
“গাঁধী মেয়ে বুদ্ধী কী হাঁটুতে, আমি কি দেখার জিনিস? আইসক্রিমের মতো টুপ করে মুখে পুরে নে।”
প্রিয়তা ঢোক গিলল। ঠোঁট আবার কথা বলে নাকি? নিজের ভাবনায় নিজেই বেকুব বনে গেলো প্রিয়তা, হেসে দিলো। আলতো করে ঠোটে ঠোট চাপলো।
সাথে সাথেই বোধয় গলার অ্যাডামস অ্যাপেলটা নড়ে উঠলো।
প্রিয়তার চোখ পড়ল গলায়। অ্যাডামস অ্যাপেলটা অনবরত উঠানামা করছে। প্রিয়তা ঠোঁট ছেড়ে বাঁ হাতে স্পর্শ করল অ্যাপেলটার ওপর। হাড়টা স্পর্শ করতেই প্রিয়তার বুকের ভেতর কেমন ধুকধুক করে উঠল। চোখ বন্ধ করে মোহগ্রস্তের ন্যায় সেটার ওপর ঠোঁট রাখতেই সুরুৎ করে হাড়টা ছুটে নিচে নেমে গেল।
অ্যাডামস অ্যাপেলের উপস্থিতি না পেয়ে বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়লো প্রিয়তার। চোখ খুলে দেখল হাড়টা ওপর-নিচে দৌড়াদৌড়ি করছে। ফিলিংস নষ্ট হওয়াতে রেগে গিয়ে হাড়টা চেপে ধরল প্রিয়তা। মধুর কণ্ঠে ধমকে দিয়ে বলল,

“এই এই! একদম ছুটাছুটি করবি না। আমি কি তোকে খেয়ে ফেলছি? একটা তো চুমুই দেবো চুপ চাপ দাঁড়া এক জায়গায়।”
প্রিয়তার বাচ্চামি দেখে শব্দ করে হেসে উঠল প্রণয়। প্রিয়তার মাথায় চাঁটি মেরে বলল,
“আহ! গাঁধা পিটিয়ে ঘোড়া করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তোকে পিটিয়ে মানুষ করা অসম্ভব।”
প্রিয়তা মাথা ডলে অসহায় চোখে তাকাল। হাসির তালে তালে পুরুষালি শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। প্রিয়তা মুগ্ধ হলো, পলকহীন চাহনিতে তাকিয়ে রইলো এক ধ্যানে। প্রণয় হাসলে গালে টোল পড়ে, আর ওই দৃশ্য দেখলে পাগল পাগল লাগে প্রিয়তার।
প্রিয়তার বোকাসোকা চাহুনি দেখে হাসি থামিয়ে দিয়ে তাকাল প্রণয়। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“হুম হুম, কী চাই?”
প্রিয়তা ঠোঁট উল্টালো, তার স্পষ্ট স্বীকারত্তি,

“আদর।”
“কোনটা? স্টার্টার নাকি মেইন কোর্স?”
“দুটোই।”
জবাব শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসল প্রণয়। চুলের খোঁপায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
“মাথা খারাপ! এই ঘরে তোকে ছুঁই আর তুই পুরো গুষ্টি সুদ্ধ মানুষ জড়ো কর।”
প্রিয়তা বোকা চোখে তাকিয়ে অবুঝ গলায় সুধালো,
“কেনো মানুষ আসবে কেনো?”
“তোরে জোরে জোরে অ আ স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ পড়ার তীব্রতা শুনে তারা ভাবতে পারে আমি হয়তো তাদের আদরের দুলালী কে চিবিয়ে খাচ্ছি, কোনো বর্ষা নেই।”
প্রিয়তা অবাক হলো। প্রণয়ের মুখের পানে তাকিয়ে বলল,
“এ্য্যহ্ কী স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ? কেন পড়ব? আমার কি ওসব শেখার বয়স আছে? ওগুলো তো আপনি স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই শিখিয়েছেন।”
ঠোঁট কামড়ে ধরলো প্রণয়। আচমকা “আহ!” করে চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়তা। সাথে সাথেই মুখ চেপে ধরল প্রণয়। চাপা কণ্ঠে ধমকে বলল,

“আস্তে! পাশের রুমে তোর শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। নিচতলার রুমগুলো সাউন্ডপ্রুফ নয়, এক্ষুনি ছুটে আসবে।”
প্রিয়তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল। আপনাআপনি মুখ হাঁ করে তাকাল প্রণয়ের পানে। লোকটার চোখ-মুখে শয়তানি খেলে করছে। প্রিয়তা অবাক না হয়ে পারে না। একটা মানুষ যে কী পরিমাণ নষ্ট হতে পারে, তা বোধ করি প্রিয়তার কল্পনার বাইরে।
প্রণয় সুরভিত ঘাড়ে হালকা আলতো চুমু একে নাক ঘষলো। কানের লতিতে ঠোঁট চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“চল জান, আমরা আমাদের ঘরে চলে যাই। কতদিন হলো রুমটা দেখিনি, বেডটা ও খুব মিস করছি।”
প্রিয়তা বোধ করল, সেও বেডটা খুব মিস করছে। আনমনে সম্মতি জানাল প্রিয়তা। মুখ লটকে বলল,
“কীভাবে যাব? বড় আম্মু তো আমাদের দেখলেই ধমকে আবার এখানেই পাঠিয়ে দেবে।”
“তাহলে চল চুপি চুপি যাই, যেন কেউ না দেখে। রুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দেবো।”
বুদ্ধিটা মন্দ লাগল না প্রিয়তার। ঘর থেকে বেরিয়ে সোফার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল জামাই-বউ। সতর্ক চোখে চুপি চুপি উঁকিঝুঁকি মারছে দুজন। দুজনকেই একটা সোফার আড়ালে লুকাতে বেগ পেতে হচ্ছে। প্রিয়তা সামনে থাকতে নিলেই কোমর ধরে হেঁচকা টান দিল প্রণয়। হুড়মুড়িয়ে বুকের ওপর আছড়ে পড়ল প্রিয়তা। মুখ ঠেকল গলার খাঁজে। সর্বশক্তি দিয়ে তাকে বুকের সাথে পিষে ফেলল প্রণয়।
কিছুটা দূরে ঊষা আর অনুশ্রী বেগম নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করতে করতে এদিকেই আসছেন। বড় আম্মুর কণ্ঠ শুনে চোখ খিঁচে প্রণয়ের বুকে পড়ে রইল প্রিয়তা। ঊষা উপরে চলে গেল আর অনুশ্রী বেগম চলে গেলেন রান্নাঘরে।
প্রিয়তা প্রণয়ের বুকে মুখ গুঁজে অবস্থাতেই ফুসুর ফুসুর করে বলল,

“উফ! আপনার গায়ের গন্ধটা এমন ঝাঁজালো কেন, প্রণয় ভাই? পাগল পাগল লাগে আমার। প্লিজ, আরেকটু আপনার সাথে মিশিয়ে নিন।”
“আরেকটু জোরে চাপলে তোর হাড্ডি আর মাংস আলাদা আলাদা হয়ে খুলে হাতে চলে আসবে, বেয়াদব! আরেকটু অপেক্ষা কর, কিছুক্ষণ পর দেখবো তুই।”
“চুপ চুপ! একদম পচা কথা বলবেন না, অসভ্য লোক।”
“ইসস! কতো ঢং! পেটে খিদে, মুখে লাজ মহারানীর। আমাকে পচা বানাচ্ছেটা কে? ওকে, পচা কথা বলব না। একদম ভালো হয়ে যাব, কাছে আসবি না আমার।”
প্রিয়তার মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে এল। দুই হাতে পেট জড়িয়ে ধরে দ্রুত অসম্মতি জানিয়ে বলল,
“নাহ নাহ, আমার এত ভালো জামাই লাগবে না।”
কিছুক্ষণ পর রাজহাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে ড্রয়িং রুম পর্যন্ত উঁকি দিল প্রিয়তা। কোথাও কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে, হাতে হাত চেপে চোখ বুজে সিঁড়ি দিয়ে দৌড় দিল জামাই-বউ।
অভীরাজ তাদের দৌড় দিতে দেখে আধো আধো গলায় চেঁচিয়ে ডাকল,
“পাপ্পা! পুপ্পি!”
কিন্তু ওসব মধুর সম্ভাষণ কান অবধি পৌঁছাল না তাদের। তারা নিজেদের বাড়িতেই পলাতক।

“জান।”
“হে জান, বলো।”
“আচ্ছা, আমি যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম, তাহলে তুমি কি আমাকে স্টিল ভালোবাসতা?”
“ওয়েইট, হোয়াট!”
“বলো না, ভালোবাসতা?”
“আচ্ছা, আমি কি গে (Gay)?”
“মেবি।”
“হোয়াট! আরে, আমার ছেলেদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নাই।”
“তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসো না?”
“আমি তো তোমাকে ভালো ঠিকই বাসি, জান।”
“তুমি আমার মনকে ভালোবাসো, নাকি বডিকে?”
“অবিভাসলি তোমার মনকে।”
“তাহলে আমার মন ছেলের ভেতরে থাকলে আমাকে ভালোবাসতা না কেন?”
“আরে, মনের সাথে যে একটা ধোন থাকবে, এই জন্য।”
“মানে?”

“মানে কিছু না, বাদ দাও তো আজাইরা প্যাঁচাল। নিচে কী পড়ে আছো, বেবি?”
“জুতা।”
“আবে, কী আনরোমান্টিক মাইয়া তুমি! আমাকে কি মিস করো না একটুও?”
“অনেক করি, জান। তোমাকে ছাড়া একটা ঘণ্টা ৬০ মিনিটের মতো মনে হয়।”
“রিয়েলি? ওয়েইট, হোয়াট! নাহ্, তোমার মধ্যে একটুও রোমান্স নেই? অন্য মেয়েরা কত ফ্লাটিং করে লুতুপুতু মার্কা কথা বলে!”
“আমিও করি। শুনবে একটা ফ্লাটিং লাইন?”
“বলো।”
“তুমি কি পাদ? আমি না তোমাকে কখনোই ছাড়তে চাই না।”
“ইয়াক ছি! এটা কেমন গন্ধযুক্ত ফ্লাট! আচ্ছা, বাদ দাও। জানো, কালকে না চুরি হয়েছে আমাদের বাসায়।”
“যে চুরি করে, সে কখনো শান্তিতে থাকতে পারে না।”
“আর তুমি যে আমার মন চুরি করছো, তার বেলায়?”
“তো তোকে কে বলল আমি শান্তিতে আছি?”
অরণ্য আরও কিছু টাইপ করতে নিচ্ছিল, এর আগেই ওর মাথায় সজোরে চাটি মারল নির্বাণ। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“শালার নষ্টের চেয়েও বেশি নষ্ট, তুই যেমন জাউরা তোর সাথে জুটে ও তেমন। লজ্জা করে না সব মেয়েদের সাথে দুচিয়ে বেড়াতে? শালা এইডস হয়ে মরবি!”
কাঁধ ঝাঁকালো অরণ্য। আধ শুয়া থেকে উঠে বসলো আসন পেতে। তাদের আড্ডা জমেছে আজ ৩ তলার ছাদে, প্রণয়ের ঘরের সামনে। রাদিফ, সাদিফ, অভ্র, শুভ্র, নির্বাণ, অয়ন—আরও তাদের কয়েকটা বন্ধু—পুরো চিল মুডে নেশা পানি করছে তারা, পুরো পার্টি ভাইব। কারণ তারা জানতে পেরেছে দাদান নিচের তলায়, উপরে আশা নিষেধ, তাই আজকের রাতটাই শেষ। এর পর থেকে মদ খেলে ঠ্যাঙানি ঝুটবে কপালে।
লাল লাল চোখে রীতিমতো টলছে ছেলেগুলো। কি কথা বলছে, তা সত্তর পার্সেন্টই অস্পষ্ট। মনে হচ্ছে ফুঁ দিলেই উল্টে পড়বে। সকলের হাতেই ওয়াইনের গ্লাস। তিনটে বোতল অলরেডি খালি করা শেষ, ৪ নাম্বারটা চলছে, আরও তিনটা আছে।
অরণ্য নির্বাণের পানে তাকিয়ে আচমকাই হুহু করে হেসে উঠল। কাঁধ চাপড়ে বলল,
“বেটে দয়াল না হইয়া যদি তোমার মতো লয়াল হইতাম, তবে কবেই বিচি কান্ধে উইঠা যাইতো, মারাটা খাইতে হইতো কঠিন ভাবে।”

“সর শালা, মাতাল!”
অরণ্যকে নিজের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলল নির্বাণ।
অরণ্য চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। পুনরায় নির্বাণের গলায় হাত ঝুলিয়ে বলল,
“আহ, চরিত্রে হাত দিলি কেন? তোকে কে বলল আমি দুচিয়ে বেড়াই? ইয়াক ছি! আমার ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড এতো দুর্বল নয় যে যেকোনো ডিভাইসে সাকসেসফুলি কানেক্ট হয়ে যাবে। জাস্ট মজা লাগে তাই করি। বাট ভাই, বিশ্বাস কর, আমার বডি কাউন্ট ০।”
“হেই, গাইজ!”
অরণ্যর বলতে দেরি, রাদিফ, সাদিফ, অভ্র, শুভ্র, অয়ন—৮-১০ টা মোবাইলের অডিও রেকর্ডার অন করে ধরল অরণ্যর মুখের কাছে।
অরণ্য মাতাল গলায় চেঁচিয়ে বললো,
“আই লাভ ইউ জান, গুড নাইট উম্মম্মম্মম্মম্মম্মম্মম্মম্মাহহহহহ।”
যথারীতি ভয়েস নোটটা সব গার্লফ্রেন্ডদের ইনবক্সে চলে গেল।
অয়ন মাতাল হয়ে ঢলে পড়ল অরণ্যর গায়। ফেঁচ ফেঁচ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ভাই, তিশা রে কত ভালোবেসেছিলাম! শালী চারটা বছর প্রেম করল আমার সাথে, আমার শরীর মন সব খেয়ে দিয়ে শেষে পেট মোটা টাকলা বুইড়া নানা মুস্তাক কে বিয়ে করে নিল। শালী আস্ত কাল সাপ, বেইমানি, সয়তানি! আমার ইজ্জত লুটে নিয়ে ও বিয়ে করেনি। আমার ভবিষ্যৎ বউ যখন জানবে আমি ভার্জিন না, তখন কী উত্তর দেবো!”

অরণ্য ধুম করে অয়নের পিঠে কিল বসিয়ে দিলো,
“খামোশ! এক্স কে এক্স বলতে শিখো, পিও। কাল সাপ, সয়তান, বেইমান—এসব কী? আমার এক্স তো মাকড়সা ছিল, মায়ার জাল বানিয়েছিল। আমি কিছু বলেছি?”
“গুরু দেব, আপনার এক্স জানি কয়টা ছিল?”
“কাউন্ট করি নি।”
“ওহ।”
“এই হ্যান্ডসাম, এদিকে শুন।”
হাতের ইশারায় ডাকলো অরণ্য। নির্বাণ কপাল কুঁচকে তাকাল।
অরণ্য খিল্লি উড়িয়ে বলল,
“কচি কার্তিক, সারাজীবন লয়াল থেকে কী পেয়েছো শুনি? ভার্সিটিতে থাকা কালীন কত রূপসী চঞ্চলা চপলা প্রপোজ করেছিল, তাদের দিকে ঘুরে ও তাকানি। সেদিন ওদের মধ্যে কাউকে ধ*ন মন সব উজার করে দিলে, আজ এমনে কেলিয়ে পড়ে থাকতে হতো না, আর ছ্যাঁকা খেয়ে ও বাকা হতে হত না।”
“চুপ কর, শালা!”

রাত্রি ১২টা। এদের হাউকাউয়ের জ্বালায় দুই চোখের পাতা এক করতে পারছে না প্রণয় প্রিয়তা। সাউন্ডপ্রুফ রুম—ভেতরের শব্দ বাহিরে না যায় না, কিন্তু বাহিরের শব্দের ভেতরে ঠেকা মুশকিল। তাদের কথার সবটাই পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে প্রণয় প্রিয়তা। অন্ধকার রুমের এক কোণে টিমটিম করে জ্বলছে হালকা হলুদ আলো। বিছানার চাদর এলোমেলো। মেঝের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শার্ট, প্যান্ট, ওড়না, কামিজ সব।
প্রণয়ের টিশার্টের ভেতর ছোট্ট বিড়াল ছানার ন্যায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে প্রিয়তা। দীঘল ভেজা চুলের গভীরে ধীরে ধীরে আঙুল চালিয়ে আদর দিচ্ছে প্রণয়। একটু পর পর হাঁচি দিচ্ছে প্রিয়তা। সন্ধ্যা থেকে পরপর তিনবার গোসল করার ফলস্বরূপ ঠান্ডা লেগে গেছে।
প্রণয় আষ্টেপৃষ্ঠে বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে তার প্রাণকে। প্রিয়তার শরীরে কাপড়ের একটা টুকরোও নেই। কেবল প্রণয়ের টিশার্টের ভিতরে ঢুকে শরীরের উষ্ণতায় লেপ্টে আছে। শরীরে পুরুষালি উষ্ণতা পেয়ে বড্ড আরাম বোধ করছে প্রিয়তা। সারাটা শরীর ব্যথায় যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে পড়ে আছে প্রিয়তা, উন্মুক্ত পিঠে পুরুষালি হাতের স্পর্শ অনুভব করছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে বারংবার। ঘাড়ের পাশে কানের লতিতে আছড়ে পড়ছে তপ্ত গরম শ্বাস-প্রশ্বাস।
চোখ বুজতেই শোনা গেল একটা গভীর, তবে অত্যন্ত কোমল কণ্ঠ—

“আমার বুকে ঘুমা, জান। আমার ময়না পাখি, নিশ্চিন্তে ঘুমা।”
প্রিয়তা সিক্ত বুকে নাক ঘষল। চোখ বুজে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমাতে নিলেই বাহির থেকে পুনরায় হট্টগোলের শব্দ ভেসে এল। এবার মেজাজ হারালো প্রণয়। রাগে দাঁতে দাঁত চাপলো।
প্রিয়তার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তুই ২টা মিনিট অপেক্ষা কর, জান। এক্ষুনি আসছি।”
বলে যত্নসহকারে প্রিয়তার ছোট্ট শরীরটা কমফোর্টারে মুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রণয়।
ছাদের কোণ থেকে বাঁশের একটা কঞ্চি তুলে এগিয়ে গেল উত্তর দিকে। নেশায় বুঁদ হয়ে উল্টোপাল্টা প্রলাপ বকছে এক একজন। রাদিফ নেতার মতো ভাষণ ভঙ্গিতে কিছু বলার প্রস্তুতি নিতেই কারো বজ্রধমক শুনে এক লাফে সাদিফের কোলে চলে গেল।
শব্দের তীব্রতায় কেঁপে উঠল উপস্থিত প্রত্যেকে। চোখ পিটপিট করে সামনে তাকাতেই অক্ষিপটে ভেসে উঠল গম্ভীর একখানা শক্তপোক্ত পুরুষালি অবয়ব।
অভ্র অরণ্যকে পেঁচিয়ে ধরে তোতলিয়ে বলল,

“ভাই, তুই না বলেছিলি দাদান নিচের তলায়?”
অরণ্য চোখ কচলে তাকাল। তার মনে হচ্ছে সে নেশার ঘোরে ভুলভাল দেখছে।
প্রণয় এই মাতালগুলোর সাথে কথা বলে মোটেও সময় নষ্ট করল না। তার নীতিতে আবার কথা কম, কাজ বেশি। তাই কাজে লেগে পড়লো। এগিয়ে এসে আচ্ছামতো ধোলাই দিতে লাগল সবগুলোকে। পিঠে কঞ্চির আঘাত পড়তেই চেং মাছের মতো লাফিয়ে উঠল একেকজন।
পরনের লুঙ্গি খুলে গেল রাদিফের। সে লুঙ্গি ফেলে যেদিকে চোখ যায়, ওদিকেই দৌড় দিল। বাকিদের অবস্থাও সেম।
সবগুলোকে বিদায় করে ছাদের দরজা লাগিয়ে ঘরে এল প্রণয়। প্রিয়তাকে পুনরায় বুকে নিয়ে কপালে তপ্ত চুমু আঁকল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এখন ঘুমা, বাচ্চা।”
প্রিয়তাও আরেকটু মিশে গেল বুকে। মিনিট গড়ানোর পূর্বেই পাড়ি জমালো তন্দ্রার রাজ্যে।

শিকদার বাড়ির উত্তর দিকের স্টোর রুমে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চেয়ারের সাথে লেগে আছে প্রিয়স্মিতা। কপালের ক্ষত বেয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে তাজা রক্ত।
মুখে টেপ, মাথাটা ঝুঁকে আছে নিচের দিকে—সম্ভবত জ্ঞান নেই।
ঘরটা ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। আশেপাশেই হয়তো ইঁদুর, টিকটিকি জাতীয় কিছু মরে পড়ে আছে। এদিক-সেদিক ছড়িয়ে থাকা আসবাবগুলোর ওপর ধুলো-বালির মোটা স্তর।
হঠাৎ চোখে-মুখে শীতল পানির ঝাপ্টা লাগতেই ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠল প্রিয়স্মিতা। তাকে পরিস্থিতি টাওর করার সময়টুকুও দিল না, বা হাতে লম্বা চুলের মুঠি খিঁচে ধরে টান দিল। সাথে সাথে ধাড়াম করে চেয়ারের সাথে লেগে মাথায় বাড়ি খেলো প্রিয়স্মিতার। ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকালো। তৎক্ষণাৎ পরিচিত নারী কণ্ঠে ভেসে এলো বিশ্রী কতকটা গালি—

“খাঙ্কি মা*গী চুত*মারানি, তোর শাউ*য়্যায় তেজ দেখে বাহবা না দিয়ে পারছি নাহ্। ২০ বছর পর আগাছার মত উড়ে এসে জুড়ে বসেছিস। একটাই আমার সমস্ত রক্ত চুষে নিয়েছে, আর বাকি আছিস তুই। শাউ*য়্যা ছিঁড়ে লরা লরা করে ফেলবো।
এসেছিস শাউ*য়্যার মিশন নিয়ে? মিশন তোমার নিচের দিকে ঠেলে ভরে দেবো। এখনো কার কলিজা ধরে টান দিয়েছিস আন্দাজ করতে পারিস নি।
তোকে কেটে কুচিকুচি করে কুত্তা দিয়ে খাইয়ে দিলেও আমার মনের জ্বালা জুরাবে না। তুই আমার প্রণয়কে মারতে এসেছিস! আমার প্রণয়কে—যে ভালোবাসার জন্য আমার জীবন-যৌবন সব শেষ করে দিয়েছি—তুই তার দিকে হাত বাড়িয়েছিস!”

অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে ঠাস করে গাল বরাবর থাপ্পড় বসিয়ে দিলো প্রহেলিকা। চুলের মুঠি চেপে ধরে হিংস্র চোখে তাকালো। তার চোখ দুটো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে আবারও শরীরের সর্বশক্তি উজার করে চড় বসালো।
তবে প্রিয়স্মিতা প্রিয়তার মতো মোটেও ননী-মাখনের নয়, যে অল্প আঘাতে মুষড়ে পড়বে।
প্রহেলিকা পরপর আরও তিন-চারটে থাপ্পড় মারলো। তবুও কেটে বা ফেটে গেল না প্রিয়স্মিতার। পরিষ্কার চোখে তাকালো। তার দৃষ্টিতে শীতলতা। নীলাভ চোখ দুটো যেন চোখে চোখ রেখে বিদ্রূপ করছে প্রহেলিকাকে।
প্রহেলিকার বাপ-মা তুলে গালি শুনে প্রিয়স্মিতার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। রাগে জ্বলে উঠছে মাথা থেকে পা পর্যন্ত।

প্রিয়স্মিতা স্থির থাকলো। অযথা রিঅ্যাক্ট না করে ইশারা করলো তার মুখের টেপ খুলে দিতে।
প্রহেলিকার রক্ত ফুটছে। এটাকে এক্ষুনি শেষ করে দেওয়ার জন্য হাত-পা নিশপিশ করছে। তবুও শান্ত থাকার চেষ্টা করল প্রহেলিকা। মুখের টেপ খুলে দিল।
মুখ খুলে দিতেই হুহু করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল প্রিয়স্মিতা। হাসতে হাসতে যেন চেয়ার থেকে উল্টে পড়ার উপক্রম। হাসির তালে তালে শরীর দুলছে।
হাসিটা বড্ড বিষাক্ত লাগলো প্রহেলিকার নিকট। পিত্তি জ্বলে গেলো মুহূর্তেই। হাসিটার মানে বুঝতে এতোটুকুও কষ্ট হলো না। সাথেসাথেই পুনরায় চপেটাঘাত পড়লো প্রিয়স্মিতার দন্তপাটিতে। এবার আর চুপ থাকলো না প্রিয়স্মিতা, ক্ষ্যাপা বাঘিনীর ন্যায় গর্জে উঠল—

“এই লুজার মহিলা, আরেকবার আমার গায়ে হাত তুলবি না! নাহলে এমন মার মারবো যে বাপের জন্মেও ভুলতে পারবি নাহ্। তুই শুধু চড়-থাপ্পর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, আর আমি ট্রেনিংপ্রাপ্ত। এক রান পায়ের নিচে আর এক রান হাতে রেখে শাউ*য়্যা ছিঁড়ে ফেলব। কোন শালার জন্য আমার গায়ে হাত তুলছিস আর চোটপাট করছিস?
ও মরলেই বা তোর কী, আর বাঁচলেই বা তোর কী? তোকে তো পাঁচ পয়সারও কোনো লাভ হচ্ছে না। তোকে তো দেখতেই পারে না, ধ*নও দিচ্ছে নাহ্, মনও দিচ্ছে নাহ্। তাহলে তোর এত কিসের জ্বালা?
তোকে তো থু দিয়ে কোনোদিনও দেখে না। বাসি পান্তা ভাত ভেবে ছুঁড়ে ফেলছে কবেই। আর তোরই চোখের সামনে হাঁটুর বয়সী একটা মেয়েকে নিয়ে বিছানা গরম করছে প্রতিনিয়ত, বিরিয়ানি ভেবে দিনে ১০ বার গিলে খাচ্ছে। আর তুই ৩১ বছর বয়সে এখনো ভার্জিন!”
পৈশাচিক বাঁকা হাসলো প্রিয়স্মিতা।
প্রহেলিকার অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে দুই পায়ের ফাঁকে পা ঢুকিয়ে ল্যাং মারতেই মুখ থুবড়ে উল্টে পড়ল প্রহেলিকা।

প্রহেলিকাকে ফেলে পুনরায় ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল প্রিয়স্মিতা। প্রহেলিকা প্রচণ্ড মাত্রায় ক্ষ্যাপলো। মেঝে থেকে উঠে সজোরে চেপে ধরলো প্রিয়স্মিতার গলা। চোখ লাল করে বলল—
“এখানেই তোর আর আমার পার্থক্য। তুই তো ধন পেয়ে খুশি। তুই কিভাবে বুঝবি ভালোবেসে কী পেয়েছি? ভালোবাসায় তোর তো একটাই চাহিদা—ধ*ন। খাস বাংলায় দুচে দিছে তোকে। শুন, পুরুষ মানুষ চাইলেই যার-তার সাথে শুইতে পারে—এটা কোনো বড় ব্যাপার নাহ্। তুই যদি ভাবিস ধ*ন পেয়ে জিতে গেছিস, বড্ড বোকা তুই। বিয়ের আগেই শরীর বিলিয়ে দিয়েছিস। তোর আর বাজারি মেয়েমানুষের মধ্যে কী পার্থক্য আছে?
আর কী বললি—আমাকে ধনও দেয়নি, মনও দেয়নি? তাহলে আমি কেন ওকে ভালোবাসি, এটা তোর ঘিলুতে কোনোদিনও ঢুকবে না।

কারণ তুই ভালোবাসা বুঝিস না। আসলে কী, ভালোবাসতে জানিস? তোর কাছে ভালোবাসা মানে মিষ্টি মিষ্টি দুটো কথা বলে দুচে দেওয়া। আর আমার কাছে ভালোবাসা—মনে অনুভব করা, তার মুখটা দেখে পরান জুড়ানো। তুই এসব বুঝবি নাহ্। তোকে আর মারবো কী—দেখলে ও করুণা লাগে। বাট তোকে মারার জন্য এখানে বেঁধে রাখিনি।”
ভ্রু কুঁচকালো প্রিয়স্মিতা। সন্দেহান কণ্ঠে বলল—
“তাহলে কী?”
প্রহেলিকা কয়েক পল চুপ থাকলো। অতঃপর—
“সাদমান শিকদার, খালিদ শিকদার, সাজিদ শিকদার আর এই গোটা পরিবারের…”

সকাল সকাল হাই তুলতে তুলতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে প্রিয়তা। চোখ দুটো ঢুলু ঢুলু, অতিরিক্ত ঘুমের কারণে ফুলে উঠেছে চেহারা। গাল দুটো বাচ্চাদের মতো ফুলকো ফুলকো। পরনে একটা হোয়াইট ওয়ান পিস। এলোমেলো পদক্ষেপে নামছে প্রিয়তা।
পায়ের পুতুল বসানো উলের জুতা। গোড়ালি থেকে কিছুটা উপর পর্যন্ত ধবধবে ফর্সা পা উন্মুক্ত, যেন দুধের মধ্যে ভাসমান মালাই। হাঁটু ছড়ানো চুলগুলো এলোমেলো অবস্থায় মুখের উপর এসে পড়েছে কয়েকটা। দুই পাশে পুতুল বসানো, দুটো দুটো চারটে ক্লিপ।
প্রিয়তা ঢুলতে ঢুলতে নিচে নেমে এলো। ঘড়িতে সময় কয়টা ঠিক খেয়াল নেই। প্রিয়তা নিচে নেমে চেঁচিয়ে ডাকলো অনন্যা বেগমকে।

“আম্মু ও আম্মু খিদে পেয়েছে তো একদম দুধ কনফ্লেক্স দেবে না আমি লুচি খাবো!”
রান্নাঘর থেকে হাঁক ছাড়লেন অনন্যা বেগম,
“চুপ কর মাইয়া! বাসা ভর্তি মেহমান, এতো জোরে চিল্লাপাল্লা করো কেন? তোমারে কি শিক্ষা-দীক্ষা দেই নাই?”
সকাল সকাল মায়ের ঝাড়ি খেয়ে সুন্দর মুখটা ভোঁতা হয়ে গেল প্রিয়তার। কিছুদিন শাড়ি-টারি পরে ঘোমটা-ঘামটা দিয়ে সখ মিটে গেছে। কিছুদিন বউ বউ ফিল নিয়ে এখন আবার আগের ফর্মে ফিরে আসছে প্রিয়তা। শাড়ি-টারি পরতে এখন আর একদম ভালো লাগে না এদিকে ওদিকে পেঁচিয়ে যায় বিরক্ত লাগে, সে এই বাড়ির মেয়ে হয়েই ঠিক আছে।
প্রিয়তা বড় করে একটা হাই তুললো। হা করার বিশালতায় গলার ভেতর অব্ধি দৃশ্যমান হলো। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে “বাসা ভর্তি মেহমান” কথাটা।
তন্ময় পাশ থেকে ফুরণ কেটে বললো,

“হা বন্ধ করো প্রিয়পু মুখের মধ্যে হাঙ্গর লাফিয়ে ঢুকে যাবে।”
“চুপ কর বেয়াদব।”
চোখ কচলে বললো প্রিয়তা।
মেহমান খোঁজার উদ্দেশ্যে ভ্রু কুঁচকে ইতিউতি তাকাতেই ড্রয়িং রুমে চোখ আটকালো। গুটিকয়েক মানুষ হাঁ করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। লোক গুলোকে দেখেই হা বন্ধ করে ফেললো প্রিয়তা, ঠিক হয়ে দাঁড়ালো।
মানুষগুলোকে মোটেও চেনা চেনা লাগলো না প্রিয়তার। দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা।
লোক দুটোর মধ্যে একজনকে খুব চেনা চেনা লাগলো, কোথায় জানি দেখেছে। ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফেললো প্রিয়তা।

ভদ্রমহিলা হেসে ডাকলেন তাকে হাতের ইশারায়। অচেনা মানুষের সামনে যেতে বরাবরই বিব্রত বোধ করে প্রিয়তা, তবুও ভদ্রতার খাতিরে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল।
মিসেস অরিন জাওয়াদ মুগ্ধ চোখে তাকালেন প্রিয়তার দুধ সাদা মুখশ্রীতে। মেয়েটা তো উনার ছেলের বর্ণনার থেকেও বেশি মিষ্টি। এক ধ্যানে দেখতে থাকলে কেমন ঘোর লেগে যায়, চোখ ফেরাতেই ইচ্ছা করে না।
ভদ্রমহিলার চাউনি দেখে ইতস্তত করতে লাগলো প্রিয়তা।
“জ্জি আন্টি?”
মিসেস অরিন জাওয়াদ হেসে ফেললেন, প্রিয়তাকে নিজের পাশে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“কিসে পড়ো মা তুমি?”
“অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ।”
জবাব শুনে একটু অবাক হলেন মিসেস জাওয়াদ। ভ্রু কুঁচকে পুনোরায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বোঝার চেষ্টা করলেন। এই মেয়ে ১৮+ দেখে বুঝার তো কারো বাপের সাধ্য নেই!
তিনি মিষ্টি হেসে জানতে চাইলেন,

“২১+?”
প্রিয়তা দুই পাশে মাথা নাড়ালো।
“২০+।”
“কোন ইউনিভার্সিটি?”
“টরন্টো ইউনিভার্সিটি, কানাডা।”
“বাহ! নাম কি তোমার?”
“তনয়া শিকদার প্রিয়তা।”
“বাহ্ খুব মিষ্টি নামতো।”
প্রিয়তা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল।
মিসেস অরিন জাওয়াদ অনবরত এটা সেটা প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।
এতো এতো প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে আসছে প্রিয়তার। অস্বস্তিতে গাট হয়ে যাচ্ছে হাত পা। মনে হচ্ছে সে ঘুম থেকে উঠেই দাঁত মুখ না মেজেই কোনো ইন্টারভিউ দিতে বসেছে। প্রিয়তা বিড়বিড় করে বললো,

“এতো আচ্ছা গেরো হলো, কি মুসিবত!”
তুরান মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে সামনে বসা রমণীর পানে। রমণীর মুখের পরিবর্তনশীল অঙ্গভঙ্গির প্রতিটা পরত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে তুরান। তার অবাধ্য চোখ দুটো নির্নিমেষ ক্লান্তিহীন চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে তাকে, এ যেন চোখেরও শান্তি।
তুরান চোখ দুটো বারবার ঘুরে ফিরে আটকাচ্ছে ফর্সা পায়ের পাতায়, হাতের তালুতে, ফুলকো গালে, ভারী চোখের পল্লবে।
তবে দেখতে দেখতে কিছু অদ্ভুত মার্কের ওপর চোখ যাচ্ছে বারবার। সে গাঢ় দৃষ্টিতে আগ্রহ নিয়ে তাকালো। গলার পাশের লালচে দাগগুলোর দিকে—একটা নয়, বরং বেশ কয়েকটা। হয়তো ঘাড়ের দিকেও আছে, চুলের জন্য স্পষ্ট দেখা যায় না।
প্রিয়তার এবার মনে হচ্ছে সে বুঝি দম আটকেই মরে যাবে। তাকে এই অস্বস্তি থেকে উদ্ধার করতেই হয়তো এসে হাজির হলেন সোহেব শিকদার ও খালিদ শিকদার।
উনারা সামনের সোফায় বসে কুশল বিনিময় করতে শুরু করলেন।
তুরান আর তার পরিবার শিকদার বাড়ির মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, তবে তারা মেয়ের নাম জানে না। তাই শিকদার পরিবার ধরেই নিয়েছে তারা হয়তো থিরার জন্য সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে।
অরিন জাওয়াদ সন্তুষ্ট কন্ঠে বললেন,

“মেয়ে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে মিস্টার শিকদার। বলতেই হবে আপনার মেয়ে লাখে একটা খুব লক্ষ্মীমন্ত দেখতে।”
সোহেব শিকদার বুঝতে না পেরে বললেন,
“জি? কিন্তু মেয়ে তো এখনো আনাই হয়নি, কখন দেখলেন?”
অরিন জাওয়াদ কিছু বলবেন তার পূর্বেই হুট করে উদয় হলো প্রণয়। কোথা থেকে এসে গা ঘেঁষে বসলো প্রিয়তার। পরনের টি-শার্ট কুঁচকানো, সিল্কি চুলের কয়েকটা এসে আঁচড়ে পড়েছে কপালের উপর। পাশে বসতেই প্রণয়ের শরীরের মাতাল করা ঘ্রাণটা পেল প্রিয়তা, সকল অস্বস্তি যেনো দূর হয়ে গেল মুহূর্তেই।
তুরান শীতল চোখে তাকালো প্রণয় শিকদারের দিকে—তাদের ওয়ান অ্যান্ড অনলি টার্গেট যার জন্য বিগত কয়েকবছর রক্ত পানি করছে তারা।
প্রণয় ছোট আব্বুর দিকে তাকিয়ে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে বললো,

“কার বিয়ের দেখাশোনা চলে ছোট আব্বু?”
সোহেব শিকদার বলার পূর্বেই অরিন জাওয়াদ বললেন,
“এই তো আমার ছেলের জন্য আপনাদের মেয়ের হাতটা চাইতে এলাম। আপনাদের মেয়ে কে আমার ছেলে কোথায় জানি দেখেছে এরপর থেকে একদম পাগল হয়ে গেছে ছেলেটা। তাই ভাবলাম একটা মাত্র ছেলে কে এতো কষ্ট দিয়ে লাভ কী সে যাকে চায় তাকেই এনে দেই। কিন্তু এখানে এসে আপনাদের মেয়ে যে দেখার পর আমার অবস্থা ও আমার ছেলের মতই হলো।”
“কিন্তু মিসেস জাওয়াদ, আপনি আমার মেয়েকে দেখলেন কখন? আমার মেয়েকে তো এখনো রেডি করা হচ্ছে।”
প্রণয় সন্দিহান চোখে তাকালো প্রিয়তার দিকে।
মিসেস অরিন জাওয়াদ হাসি হাসি মুখে বললেন,
“অন্য মেয়েকে কেন দেখবো? আমার তো আপনার এই মেয়েটাকেই খুব পছন্দ হয়েছে। একদম ছোট্টখাট্ট একটা জীবন্ত পুতুল!”

বলে প্রসন্ন চিত্তে প্রিয়তার মাথায় হাত রাখলেন মিসেস অরিন জাওয়াদ।
উনার কথায় মনে হলো নিঃশব্দে ড্রয়িং রুমে বোমা পড়লো। আঁতকে উঠলো প্রিয়তা, চোখ বড় বড় করে ভয়ার্ত চোখে তাকালো পাশে বসা মানবের দিকে। তবে প্রণয় খুব স্বাভাবিক নির্বিকার।
সোহেব শিকদারও বিব্রত বোধ করলেন, সাথে ভয় পেলেনও কিছুটা।
প্রণয় ঠান্ডা হেসে বললো,
“ওহ! আপনাদের ওকে পছন্দ হয়েছে? কিন্তু মেয়ে যে ভার্জিন না জানেন তো একটা মাত্র ছেলে বিয়ে করবেন তাও।”
প্রণয়ের কথায় এবার পারমাণবিক বোম পড়লো যেনো লিভিং রুমে। সোহেব শিকদার সম্মান বাঁচিয়ে চুপচাপ উঠে চলে গেলেন।
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কথায় হতভম্ব হয়ে গেলেন উনারা। একে ওপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। অরিন জাওয়াদ আশ্চর্য হয়ে বললেন,

“কী এতো ছোট একটা মেয়ে ভার্জিন নাহ্?”
লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার অবস্থা প্রিয়তার।
প্রণয় ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কিরে, তুই যে আমাকে ছেড়ে আবার বিয়ে করতে চাস বলিস নি তো কখনো?”
বলতে বলতে প্রিয়তার কোমর টেনে ধরে সবার সামনেই উরুতে বসালো প্রণয়। ভয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলো প্রিয়তা। তার কলিজা লাফিয়ে মুখ দিয়ে উঠে আসার উপক্রম হলো।
প্রীতম এদিকেই আসতেই নিচ্ছিল কিন্তু লজ্জাজনক পরিস্থিতিটি দেখে পিছিয়ে গেল।
তুরানসহ মিস্টার অ্যান্ড মিসেস জাওয়াদ চরম মাত্রায় আশ্চর্য হয়ে তাকাচ্ছেন প্রিয়তার মুখ পানে।
সবার এমন বিস্ময়কর দৃষ্টি দেখে ভীষণ লজ্জায় ঘামতে শুরু করলো প্রিয়তা। ছটফট করতে করতে ফিসফিসিয়ে বললো,

“উফফ ছাড়ুন প্রণয় ভাই, সবাই দেখছে!”
নিজের সাথে আরেকটু পেঁচিয়ে ধরে ধমকে উঠলো প্রণয়,
“একদম চুপ করে বসে থাক! তোর বিয়ের প্রস্তাব এসেছে তো প্রথম সামির সম্মতি ছাড়াই বিয়ে করে নিবি? এতদিন আমি পেলে-পুষে বড় করলাম, আদর দিলাম বুকে রাখলাম আর এখন আমার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে নিবি?”
প্রণয়ের কথা শুনে যারপরনাই অবাক হলেন তুরানসহ মিস্টার অ্যান্ড মিসেস জাওয়াদ। একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।
অবাক হয়ে বললেন,

“ও! বিবাহিত?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো প্রণয়। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
“সি ইজ নট জাস্ট ম্যারিড। সি ইজ মাই লাইফ পার্টনার, মাই সোল পার্টনার, মাই বেড পার্টনার—এভরিথিং। উই ওয়ার ইন্টিমেট ফোর টাইমস লাস্ট নাইট, আর কিছু শুনতে চান?”
লজ্জায় অস্বস্তিতে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না প্রিয়তা। চোখ-মুখ খিঁচে প্রণয়ের বুকের সাথে লেপ্টে আছে। শিকদার বাড়ির সকলে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন লজ্জায় তাদেরও মাথা নিচু হয়ে গেলো।
প্রণয় এবার কণ্ঠের চাপা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললো,
“আল্লাহ্ র দুনিয়ায় এতো এতো মেয়ে থাকতে খুঁজে খুঁজে আমার বউটাই চোখে লাগলো ছেলে বউ বানানোর জন্য?”
লজ্জায় আর অপমানে চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল তুরানের। তার পছন্দের রাজকন্যা শেষ মেষ কিনা একটা ক্রিমিনালের বউ ভাবতেই কলিজায় আগুন লেগে গেলো। ওর কোনো যোগ্যতা আছে এমন রাজকন্যা পোষার? মন গহীনে প্রচণ্ড হিংসা ডানা বাঁধলো, ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবৃত্তি জাগলো মনে।
প্রণয় এবার সরাসরি তাকালো তুরানের দিকে। বাঁকা হেসে বললো,

“আমার দুর্বলতায় নজর দেওয়ার খুব বাজে মাশুল চুকাতে হবে সাব-ইন্সপেক্টর তুরান জাওয়াদ।”
“ওকে গাইজ টাটা! চল জান, বেডশিটটা সাদা না কালো ভুলে গেছি, চল একসাথে দেখে আসি।”
বলে প্রিয়তাকে কোলে তুলে ধপাধপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল প্রণয়।
বাড়ির সকলে চরম লজ্জায় তটস্থ। তাদের ছেলের মুখে কোনো কালেই কোনো ফিল্টার নেই। আর এরাও বা কেমন মানুষ? কার জন্য সম্বন্ধ নিয়ে যাচ্ছে একটু খোঁজ নিয়ে আসবে না?
প্রণয়ের শীতল হুমকিতে প্রচণ্ড রাগে লাল হয়ে গেল তুরান। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলো—যেটা সে নিজের করবে বলে ঠিক করেছে, সেটা সে নিজের করেই ছাড়বে। ওই রাজকন্যা একদিন তারই হবে, এটা তুরান জাওয়াদের প্রমিজ।

প্রণয় রুমে এসে প্রিয়তাকে বিছানায় ছুঁড়ে মারলো। রাগে গজ গজ করতে করতে চলে গেল বারান্দায়।
প্রিয়তার মনে হচ্ছে সে আর অন্তত এক বছর এই ঘর থেকেই বের হতে পারবে না, না পারবে কাউকে মুখ দেখাতে। লজ্জায় প্রিয়তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে—ইসস, একটা মানুষ এতটা নির্লজ্জ কেমনে হয়!
প্রণয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে কল লাগালো জাভেদের নাম্বারে। প্রথমবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই ধরে ফেললো জাভেদ। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললো,
“ইয়েস স্যার।”
“ঠিক ২০ মিনিটের মাথায় কালো রঙের ব্ল্যাক টয়োটা গাড়িটা রায়পুর সদর গলির মুখে ঢুকবে, তার দুই সেকেন্ডের মাথায় গাড়িটা বোম মেরে উড়িয়ে দেবে।”
জাভেদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ সক্রিয় নয়। সে আধা ঘুমে থাকা অবস্থায় কথা বলছিলো প্রণয়ের সাথে, কিন্তু অর্ডার কানে আসতেই বিছানা থেকে হুড়মুড়িয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়লো জাভেদ। সকাল সকাল কার মুখে আবার বোম মারতে বলে—এই তার ছেঁড়া লোকটা!
জাভেদ ঢোক গিলে বললো,

“ক্ককালো গাড়ি তো অনেক আছে সার, কার গাড়ি বললে ভালো হয়?”
“সাব ইন্সপেক্টর তুরান জাওয়াদ।”
নাম শুনে শুর শুর করে সম্মতি জানিয়ে বললো,
“ইয়েস স্যার।”
কী, কেন, কী জন্য—কিচ্ছু জিজ্ঞেস করলো না। প্রাণের মায়া আছে তো নাকি!
“জী স্যার, তাহলে রাখি।”
“দাঁড়াও।”
“জী স্যার।”
“তুরান জাওয়াদকে গাড়ি থেকে বের করে বোম মারবে, আর তার বাবা মাকে সহি সালামত তুরস্কে পৌঁছে দেবে।”
“আর তুরান জাওয়াদকে কী করবো স্যার?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো প্রণয়। স্পেশাল থেরাপি দেওয়া হবে, ভয় নেই প্রাণে মারবো না তবে…
কথার আগা গোড়ায় রহস্যের গন্ধ পেলো জাভেদ। ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিয়ে বললো,

“তবে?”
“তবে সময় হলেই দেখতে পাবে। তবে তোমাকে যে আমি কী করবো, আমি নিজেও জানি না। মন চাচ্ছে জামা কাপড় ছাড়িয়ে নেংটু করে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রাখি।”
ধমক শুনে কেঁপে উঠলো জাভেদ। কৌতূহল উড়ে গেলো, মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো নিমিষেই। কল্পনায় ভেসে উঠলো—জামা কাপড় ছাড়া সে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী ভয়ানক ব্যাপার স্যাপার!
কাঁপাকাঁপা গলায় শুধালো জাভেদ,
“কেনো স্যার?”
“কেনো মানে? তুমি থাকতে আমার বাসায় আমার বউয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে, আহম্মক!”
প্রণয়ের এই কথাটা শুনে সম্পূর্ণ ঘুম ছুটে গেলো জাভেদের। লাফিয়ে উঠে বসলো। মুখ ফস্কে বললো,

“ইন্নালিল্লাহি!”
“শাট আপ ইডিয়ট!”
“সরি স্যার।”
“জাবেদ!”
“জ্বী স্যার।”
“যেটা করে আসতে বলেছিলাম করেছো তো?”
“কী করতে বলেছিলেন স্যার?”
দাঁত কটমট করলো প্রণয়। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“হসপিটাল কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যতো হয় দিতে বলেছিলাম, দিয়েছো?”
“কিসের ক্ষতিপূরণ স্যার?”
“আহম্মক! আজকেই ২০ লক্ষ্য পে করে দেবে!”
“কিন্তু কেনো স্যার?”
“২৫ দিনে ওদের বারো খানা বেড নষ্ট হইছে, সেগুলোর মূল্য না দিয়েই চলে এলে! একবার শুধু নাগালে পাই, তোমার খবর করে ছাড়বো।”
বলেই খট করে ফোন কেটে দিলো প্রণয়।

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো জাভেদ। হাতে পায়ে ধরে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদে কোনোভাবেই লাভ হয় নি তার। হিটলার বস তাকে কোনোভাবেই তার বউয়ের কাছে যেতে দেয়নি, আটকে রেখেছে নিজের ফার্মহাউসে।
জল ছাড়া মাছের মতো বউ ছাড়া জাভেদ একলা বাড়িতে ছটফট করে মরছে। অন্যদিকে তার হিটলার বস বউ নিয়ে রোমান্স করছে—বলি এসব কী ধর্মে সইবে? সইবে নাহ্, সইবে নাহ্—আহ, সবই কপাল! আজকাল ভালো মানুষের ভাত নেই।
আফসোস করতে করতে নিজের কপাল দেওয়ালে ঠুকে দিলো জাভেদ। আবার ব্যথা পেয়ে কপাল ডলতে ডলতে বললো,
“আল্লাহ, এই নির্যাতন আর তো নেওয়া যায় না। কতবার বললাম কিসমতের দানা ফুরিয়ে গেলে তুলে নিতে, তবুও এই জালিম বসের হাতে নিপীড়িত অত্যাচারিত না করতে।”
ফোন কেটে বারান্দা থেকে ঘরে চলে গেলো প্রণয়। প্রিয়তা উল্টো হয়ে কমফোর্টার মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। লজ্জায় সে চোখও মেলতে পারছে না।
প্রণয় বাঁকা হাসলো। বেডসাইড টেবিলে ফোন রেখে কমফোর্টারের মধ্যে ঢুকে পড়লো। পেট চেপে ধরে একদম কাছে নিয়ে এলো নিজের প্রাণপাখিটাকে। সুগন্ধিত চুলে মুখ গুঁজে নেশা জড়ানো কণ্ঠে বললো,
“কাম অন বেব, আই উইল পানিশড ইউ।”
ফিচেল কণ্ঠটা শুনে পা থেকে মাথার তালু পর্যন্ত শির শির করে উঠলো প্রিয়তার। দূরে সরার চেষ্টা করতে করতে কাঁপা গলায় বললো—

“দ-দ-দেখুন!”
“হুম হুম, দেখতেই তো চাই জান, ফিরো এদিকে।”
প্রিয়তা আর তর্ক করলো না। নিঃশব্দে ফিরে মুখ গুঁজে দিলো প্রণয়ের গলায়। বিচরণ বাড়তেই শ্বাস আটকে এলো প্রিয়তার। সমগ্র সত্তায় পুরুষালি উত্তাপ সাগরের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগলো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পর পর চারটা সার্জারি শেষ করে প্রচণ্ড ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরে বাড়ি ফিরলো শুদ্ধ। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে দিলেন অর্থি বেগম। চোখ মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

সদর দরজা পেরিয়ে লিভিং রুমে পা রাখতেই পা থমকে গেলো শুদ্ধর। কপাল কুঁচকে গেলো আপনা আপনি। সবার আগে চোখ গেলো বাঁ দিকে বসা নারীমূর্তির দিকে, যার ঠোঁটে ঝুলছে ধূর্ত শয়তানি হাসি।
পুলিশ অফিসার শুদ্ধকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন। বাসার সবাই আরেক দফা সার্কাস দেখার অপেক্ষায়—বাড়ি তো নয় যেনো, চিড়িয়াখানা! উপস্থিত আছেন সকলেই, কেবল প্রণয় ছাড়া।
অফিসার শুদ্ধর দিকে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“আপনার বিরুদ্ধে রেপের চার্জ লাগানো হয়েছে ডাক্তার চৌধুরী। মিস মেহরিমা শিকদার প্রিয়স্মিতার অভিযোগ, আপনি তাকে জোর জবরদস্তি ফিজিক্যালি অ্যাসল্ট করেছেন।”
এমনিতেই মস্তিষ্ক ঘেঁটে খিচুড়ি হয়ে আছে, তার ওপর এসব গাঁজাখুরি অভিযোগ শুনে মেজাজ বিগড়ালো শুদ্ধর। তবে মোটেও চিৎকার করলো না। ঠোঁটে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে তুলে একবার তাকালো সবার দিকে। সকলের চোখ মুখেই বিব্রত ভাব স্পষ্ট। ঠোঁটের হাসি প্রসারিত হলো শুদ্ধর। কোনো লুকোচাপা ছাড়াই ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো—
“রেপ? সিরিয়াসলি অফিসার? আমি মিস মেহেরীমা শিকদার প্রিয়স্মিতার সাথে বহুবার ইন্টিমেট হয়েছি, কিন্তু সেটা রেপ নয়।”

“আমি তো জানতাম জোর জবরদস্তি সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট করাকে রেপ বলে। বাট মিস মেহরিমা শিকদার প্রিয়স্মিতার ব্যাপারটা বোধহয় কিঞ্চিৎ ভিন্ন ছিলো। উনি তো আমার সাথে এভরি মোমেন্ট এনজয় করেছেন। প্রতিবার ইনটিমেট হওয়ার সময় আমার থেকেও উনার এক্সাইটমেন্ট ছিলো দেখার মতো। এম আই রাইট, মিস প্রিয়স্মিতা?”
একটু থেমে সরাসরি প্রিয়স্মিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো শুদ্ধ। বাড়ি ভর্তি সকলে আরও বেশি অস্বস্তি বোধ করলেন। এই বাড়ির ছেলেগুলোর মুখে কোনো ফিল্টার নেই! বাড়ির বড়দের সামনে যখন তখন এমন লাগামছাড়া উত্তর দিয়ে দেবে, তা মোটেও আশা করেনি।
প্রিয়স্মিতা সবার দিকে তাকিয়ে সামান্য বিব্রত বোধ করলো।
অফিসার প্রিয়স্মিতার দিকে তাকিয়ে বললেন,

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৩

“এটা কী সত্যি, মিস প্রিয়স্মিতা? আপনি রেপ আর কনসেন্টের পার্থক্য বুঝেন না?”
শুদ্ধ বাঁকা হেসে ফের বললো,
“সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স যখন পারস্পরিক সম্মতিতে হয়, তখন সেটাকে আর যাই হোক রেপ বলা চলে না, অফিসার। আমার মনে হয় মিস প্রিয়স্মিতা আপনাদেরকে তার উত্তেজনাময় মুহূর্তগুলোর কথা বলতে ভুলে গেছেন। কোনো ব্যাপার না, আমার রুমে ডে ওয়ান থেকে একটা হিডেন ক্যামেরা আছে। ওটার ফুটেজ বের করলেই দুধ আর পানি আলাদা হয়ে যাবে। ওখানে উনার উন্মাদনার এভরি মোমেন্ট ক্যাপচার করা আছে। কী ঠিক বললাম তো, মিস প্রিয়স্মিতা শিকদার? দেখবেন নাকি সেই ভিডিও ফুটেজগুলো?”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৫

3 COMMENTS

Comments are closed.