চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৮
আয়াত বিনতে নূর
ঢাকা শহরের কোলাহল ছেড়ে অনেক দূরে অবস্থিত সেই নিরিবিলি বাগানবাড়িটা যেন প্রকৃতির নিজের মতো করে সাজানো এক স্বর্গ। চারপাশে উঁচু উঁচু গাছ, সবুজ পাতার ফাঁক গলে সূর্যের সোনালি আলো এসে পড়ছে বাগানবাড়ির কাঁচের জানালায়। আলোটা যেন ঘরের ভেতর ঢুকে সবকিছু ছুঁয়ে দিচ্ছে মমতায়।
লোকজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
শুধু পাখির ডাক আর বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ।
নিশিতা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো চারদিকে।
ঘুম জড়ানো চোখে নতুন সকালটা যেন একটু অন্যরকম লাগছে তার।
হঠাৎই অনুভব করলো—
তার শরীরের উপর ভারী কোনো কিছুর চাপ।
চমকে উঠে নিচের দিকে তাকাতেই নিশিতার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
ফারিস তার বুকের উপর মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ঘুমের মধ্যে মুখটা অদ্ভুত রকম শান্ত, নিরীহ।
নিশিতা ফিসফিস করে বলল—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ঘুমের মধ্যে আপনাকে আস্ত একটা বাচ্চার মতো লাগে জানেন? এতো কিউট কেন আপনি?”
গত রাতের ক্লান্তি এখনো শরীর জুড়ে রয়ে গেছে।
নিশিতার ছোট্ট শরীরটা ব্যথায় কুঁকড়ে আছে।
সে ধীরে ধীরে ফারিসকে নিজের উপর থেকে সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
বরং ফারিস আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো। নিশিতার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
আবার চেষ্টা করলো নিজেকে ছাড়াতে।
এবার ফারিস বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে মুখ তুললো।
“শান্তিতে ঘুমাতেও দিবি না আমাকে, নিশি?”
“সকাল সকাল এত নড়াচড়া কেন?”
নিশিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল—
“আমি নড়াচড়া করছি?”
“আপনি পুরোটা আমার উপর পড়ে আছেন, সেটা দেখছেন না?”
শরীরের ব্যথায় নিশিতার মুখটা কুঁচকে গেল।
ফারিস এবার পুরোপুরি উঠে বসে এক ঝটকায় নিশিতাকে নিজের কোলে তুলে নিলো।
চোখেমুখে হঠাৎ অপরাধবোধ।
নরম স্বরে বলল—
“বেশি ব্যথা পাচ্ছিস?” “আমার কারণে তুই কষ্ট পাস আমি চাইনি, পাখি।”
ফারিসের এমন আদর মাখা কন্ঠ যেনো নিশিতা সব ভুলে গগেলো নিশিতা বুঝতে পারলো—
ফারিস সত্যিই নিজেকে দোষ দিচ্ছে। বিষয়টা নিশিতার ভালো লাগলো না।
সে মাথা নেড়ে বলল—
“না… আমি ঠিক আছি।” “একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
ফারিস গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
“তাও সাবধান থাকা দরকার।” “চল, ফ্রেশ হয়ে রেডি হ। বাড়ি ফিরতে হবে।”
নিশিতা ফারিসের গলা জরিয়ে দেখলো ,কালরাতের জামা কাপড় গুলো নেইতাই
নিশিতা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া এক প্রশ্ন করলো—
“কালকে রাতে আমি যে জামাগুলো পরেছিলাম… সেগুলো কোথায়?”
নিশিতার কথা শুনে ফারিস হালকা হাসি দিয়ে বলল—
“আমি ধুয়ে দিয়েছি।”“এতো চিন্তা করার দরকার নেই।” “যা, ফ্রেশ হয়ে আয়।”
ফারিসের কথা শুনে
নিশিতা টাওয়াল আর একটা থ্রি-পিস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর সাওয়ার নিয়ে ভেজা চুলে থ্রি-পিস জড়িয়ে বের হলো সে। চুল থেকে পানি ঝরছে, শরীরেও জলের ছোঁয়া রয়ে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে লাগলো নিশিতা।
ঠিক তখনই ফারিস এসে পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
নরম গলায় বলল—
“টাওয়ালটা আমাকে দে।”
নিশিতা কিছু বলার আগেই ফারিস নিজ হাতে তার ভেজা চুলগুলো মুছতে শুরু করলো।
তারপর ড্রয়ার খুলে হেয়ার ড্রায়ার বের করে খুব যত্নে চুল শুকাতে লাগলো।নিশিতা আয়নার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে দেখলো—ফারিসের চোখে শুধু যত্ন, শুধু আদর।সে অবাক হয়ে মনে মনে ভাবলো— এই মানুষটার রাগ আছে, কঠোরতা আছে… কিন্তু যত্নটা কতো গভীর।
আগে কখনো ফারিস নিশিতার প্রতি এতো যত্নশীল হয়নি—এটা নিশিতার কাছেই সবচেয়ে বেশি অবাক লাগছিল।আজ যেন ফারিস অন্য একজন মানুষ।কঠিন চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটা আজ অদ্ভুতভাবে নরম।নিশিতার ভেজা চুলগুলো ফারিস নিজ হাতে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিলো।তারপর খুব ধীরে, খুব যত্ন করে চুলগুলো শুকিয়ে নিলো।
নিশিতা আয়নার সামনে বসে আছে, আর আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—ফারিস একমনে তার কাজ করছে।কোনো রুক্ষতা নেই, নেই জোর।
শুধু নিঃশব্দ যত্ন। চুল শুকিয়ে ফারিস নিশিতার লম্বা চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে দিলো। নিশিতা বুঝতেই পারলো না—কখন সে এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এই মানুষটার ওপর।
ফারিস এরপর নিজের ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। ঠিক তখনই পিছন থেকে নিশিতা একটু দ্বিধা নিয়ে ডাকলো—
—আচ্ছা ফারিস ভাই… এই বাড়িটা কার?
ফারিস দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সামান্য ফিরে তাকালো।
ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠলো।
খুব স্বাভাবিকভাবে বলল—
—”তোর জান।”
এইটুকু বলেই সে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। নিশিতা একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“তোর জান”—এই কথাটার মানে সে বোঝার চেষ্টা করছে।
“বাড়িটা কি সত্যিই তার?”
নাকি ফারিসের ভাষার ভেতরের কোনো অন্য অর্থ?
হঠাৎ করেই তার মনে হলো—এই বাড়িটা তো সে ভালো করে দেখেইনি। যেই ভাবা, সেই কাজ।
একদৌড়ে সে রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছাদের দিকে চলে গেলো।ছাদে পা রাখতেই নিশিতার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
বাড়িটা বাইরে থেকে যতটা সুন্দর, ছাদটা তার থেকেও বেশি।
ছাদজুড়ে দেশি–বিদেশি নানা রকম ফুল আর গাছ।
রঙিন ফুলের ভিড়ের মাঝেও গোলাপ ফুলের আধিক্য চোখে পড়ার মতো।
লাল, গোলাপি, সাদা—সব রঙের গোলাপ।
ছাদের এক পাশে বড় একটা দোলনা টাঙানো।
নিশিতা ধীরে ধীরে গিয়ে দোলনাটায় বসলো।
হালকা বাতাসে দোলনাটা নড়ছে।
চারদিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা আর প্রশান্তি একসাথে ভর করলো।
এই বাড়িটার আশেপাশে আর কোনো বাড়ি নেই।
দূরে দূরে যতদূর চোখ যায়—শুধু গাছ আর গাছ।
মনে হচ্ছে গভীর কোনো জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই রাজকীয় বাড়িটা।
বাড়িটার চারপাশে ফুল গাছ আর বড় বড় গাছে ভরা।অনেকটা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃসঙ্গ কিন্তু নিরাপদ।
এদিকে ফারিস ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে এসে নিশিতাকে দেখতে না পেয়ে থমকে গেলো।
এক মুহূর্তেই বুকের ভেতর অজানা ভয় ঢুকে পড়লো।
—নিশিতা কোথায়?
পুরো রুম খুঁজলো।
তারপর নিচতলা, ডাইনিং, লিভিং—সব জায়গা।
কোথাও নেই। ফারিসের বুক ধক করে উঠলো।
এই প্রথম সে বুঝলো—নিশিতাকে হারানোর ভয়টা কতটা গভীর। পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন পেলো না, তখন যেন হার্ট অ্যাটাক করার উপক্রম।
হঠাৎ মাথায় একটা কথা এলো—
—ছাদ?
সময় নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে ছাদের দিকে দৌড় দিলো। ছাদে উঠেই সে যেটা দেখলো, তাতে এক মুহূর্তে প্রাণ ফিরে এলো। নিশিতা দোলনাতে বসে আছে। চুপচাপ।চারদিকে তাকাচ্ছে।এক সেকেন্ডও দেরি করলো না ফারিস।
দৌড়ে গিয়ে নিশিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
নিশিতা পুরোটা সময় কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না।হঠাৎ এই জড়িয়ে ধরাটা তাকে স্থির করে দিলো।
কিছুক্ষণ পর ফারিস নিজেকে সামলে নিয়ে তাকে ছেড়ে দিলো।
চোখে রাগ, গলায় ভয়—
—”মার খাওয়া শখ হয়েছে না তোর?”আমাকে না বলে ছাদে এসেছিস কেন?”
নিশিতা ফারিসের আগের রুপ দেখে।বেশ অবাক হলো তারপরনিশিতা একটু নাক ফুলিয়ে বলল—
—”একা একা রুমে বসে কি করবো?
তাই একটু ছাদে এসেছিলাম।”
এইকথাটা শুনে ফারিসের রাগটা যেন মুহূর্তেই গলে গেলো ফারিস হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল—
“—আচ্ছা হয়েছে।”এবার চল।”
তোকে ড্রপ করে অফিসে যাবো আমি।”
ঠিক তখনই ফারিসের ফোনটা বেজে উঠলো।
ফোন বের করে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আমেনা চৌধুরীর চিন্তিত কণ্ঠ—
—”তোরা কোথায় বাবা?” কালকে রাতেও বাড়ি ফিরিসনি। আমাদের কি চিন্তা হয় না?কোথায় তোরা?”
ফারিস ছোট আম্মুর কথা শুনে শান্ত গলায় বলল—
—”আমরা একটু পর বাড়ি আসছি ছোট আম্মু।
তুমি চিন্তা করো না।”
এই বলে কল কেটে দিলো।
বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে নিশিতার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। খুশিতে সে প্রায় লাফিয়ে উঠলো।এরপর ফারিস নিশিতাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। চৌধুরী ভিলার উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দিলো।
গাড়ির ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার মনে হলো ফারিস কাল রাতে কি যে একটা খাইয়ে ছিলো। তারপর নিশিতা হঠাৎ বলল—
—”আচ্ছা… কালকে রাতে আপনি আমাকে পানির সাথে কি খাইয়েছিলেন?”
ফারিস নিশিতার কথা শুনে কি বলবে বুঝতে পারছিলো না তাই ফারিস চোখ না ঘুরিয়েই বলল—
—”ওটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই।পেইন কিলার ছিলো।”
সে ইচ্ছা করেই আসল কথাটা এড়িয়ে গেলো।
নিশিতাকে যে সে পিন খাইয়েছিলো—এই সত্যটা আপাতত চাপা থাকলো।টানা এক ঘণ্টা ড্রাইভ করার পর ফারিসের গাড়ি চৌধুরী ভিলার সামনে থামলো।
গাড়ি থেকে নেমে নিশিতা আর ফারিস একসাথে ভিলার দিকে তাকালো।
এদিকে চৌধুরী বাড়িতে তখনও সবার মাথার ভেতর শুধু চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
কালকের রাতটা যেন পুরো বাড়ির ওপর ভারী হয়ে ঝুলে আছে। ফারিস আর নিশিতা—দুজনেই রাতেও বাড়ি ফেরেনি। এটা এই বাড়িতে একদমই অস্বাভাবিক ঘটনা।
ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে আছে, কিন্তু খাবারের দিকে কারো মন নেই। প্লেট ভর্তি খাবার ঠান্ডা হয়ে আসছে, অথচ কারো হাত উঠছে না। ঘরে এক অদ্ভুত নিরবতা রাজ করছে—যে নিরবতার ভেতর চাপা উৎকণ্ঠা, ভয় আর লুকানো প্রশ্ন।
হঠাৎ সেই নিরবতা ভাঙলেন আফিয়া চৌধুরী।
কণ্ঠে বিরক্তি আর দুশ্চিন্তা একসাথে—
—”এখনও বাড়িতে ফেরেনি ওরা।”
একটু থেমে আবার বললেন—
—”লোকজন কি বলবে বলো তো?” রাত করে বাড়ির ছেলে-মেয়ে বাড়ি ফেরে না—এসব ভালো দেখায় না।”
আমেনা চৌধুরী কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আফিয়া চৌধুরী থামলেন না।
—”তাড়াতাড়ি কল দাও ফারিসকে।”
নিশিকে নিয়ে আসতে বলো।
তারপর হঠাৎ গলার স্বর একটু নরম হলেও চোখে চিন্তার ছাপ—
—”কালকের বিষয়টা নিয়ে রিয়া এখনও ঘোরে আছে।” রিয়া চুপচাপ বসে ছিল।
মাথা নিচু। চোখে জমে থাকা অজানা ভয়।
সে কিছু বলছে না, কিন্তু তার মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে।
“নিশিতার কি অবস্থা এখন?”
“ফারিস ভাই কি আবারও মারলো ওকে?”
“আর যদি মারেই থাকে… তাহলে রাতে বাড়ি ফিরলো না কেন?”
এই প্রশ্নগুলো বারবার রিয়ার মনে উঁকি দিচ্ছে।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।
রিয়া ভালো করেই বুঝতে পারছে— এসব কথা লুকানো তাদের উচিত হয়নি। সবাইকে বলে দিলেই ভালো হতো। নিশিতাকে এমনভাবে একা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। এদিকে রাজীবও আজ অস্বাভাবিকভাবে গম্ভীর।
চোখে ক্লান্তি আর চিন্তার রেখা। কারো সাথে কোনো কথা বলছে না।
চুপচাপ বসে শুধু টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই— চৌধুরী ভিলার মূল দরজার দিকে শব্দ হলো। সবাই একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।
ভিলার ভেতরে প্রবেশ করলো—
ফারিস আর নিশিতা।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো।
নিশিতাকে দেখামাত্রই আমেনা চৌধুরী আর আফিয়া চৌধুরী দুজনেই একসাথে উঠে দাঁড়ালেন।
আমেনা চৌধুরী দেরি না করে এগিয়ে এসে নিশিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
চোখে পানি, কণ্ঠ কাঁপছে—
—”কোথায় ছিলি মা?”আমাদের কি চিন্তা হয় না?
নিশিতা কিছু বলতে পারলো না।
শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
আমেনা চৌধুরী আবার বললেন—
—”তোরা এভাবে কিছু না বলে চলে গেলি!
কাল সারারাত আমি আর ভাবি ঘুমাতে পারিনি।”
এই সময় আফিয়া চৌধুরী ফারিসের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন।
—”কোথায় ছিলি তোরা?
আমার কথা কি ভাবার প্রয়োজন মনে করিস না?”
ঘরের ভেতর চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো।
ফারিস খুব শান্তভাবে কথা বলল।
তার কণ্ঠে না রাগ, না ভয়—শুধু দৃঢ়তা।
—”কালকে রাতে বৃষ্টি হচ্ছিলো।”
তাই আমি গাড়ি ড্রাইভ করা সেফ মনে করিনি।
একটু থেমে আবার বলল—
—”তাই কাল রাতে বাড়ি ফিরিনি।
আমি তো তোমাদের বলেই ছিলাম—চিন্তা না করতে।আমি আর নিশি চলে আসবো।”
তারপর একটু দৃঢ় গলায়—
—”কিন্তু তোমরা তো কোনো কথা শোনো না আমার।
ফারিসের কথার পর কেউ আর কিছু বলতে পারলো না। ”
ঘরে আবার নিরবতা নেমে এলো।
নিশিতা তখন টেবিলের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—
—আম্মু…আব্বু আর বড় আব্বু কোথায়?
আমেনা চৌধুরি কে কিছু বলতে না দিয়ে আফিয়া চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—”তোর আব্বু আর বড় আব্বু সকাল সকাল অফিসে চলে গেছে।”
একটু বিরতি দিয়ে যোগ করলেন—
—”ফারিস নেই দেখে কাজের চাপ বেশি তাই।”
আমেনা চৌধুরী তখন ফারিস আর নিশিতার দিকে তাকিয়ে বললেন—
—”দেখে তো মনে হচ্ছে তোরা কিছু খাসনি।
আয়, খেতে বস তোরা।”
ফারিস আর নিশিতা ধীরে ধীরে ডাইনিং টেবিলে বসল।
আমেনা চৌধুরী আর আফিয়া চৌধুরী নিজের হাতে তাদের প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন।
যেন সব রাগ, সব অভিমান ওই মুহূর্তে খাবারের সাথে মিশে গেলো।
ফারিস খেতে খেতে মাঝেমাঝেই নিশিতার দিকে তাকাচ্ছে।
নিশিতাও চুপচাপ খাচ্ছে।
কথা নেই—কিন্তু চোখে চোখে অনেক কথা চলছে।
ডাইনিং টেবিলে আবারও নীরবতা।
নিশিতা অল্প কিছু খেয়েই থেমে গেল। প্লেটের দিকে তাকিয়েই বোঝা যাচ্ছিল, তার খিদে পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু আজ যেন খাওয়ার চেয়ে তার মাথার ভেতরের ভাবনাগুলোই বেশি ভারী। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সে সিঁড়ির দিকে এগোলো।
সিঁড়িতে পা দেওয়ার আগমুহূর্তে হঠাৎ করেই থেমে গেল নিশিতা।
সে একবার পিছনে ফিরে তাকালো।
ড্রয়িংরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিস তখনো তাকিয়েই ছিল। সেই তাকানোটা ছিল একেবারে আলাদা—না কঠিন, না রাগী, না কর্তৃত্বপূর্ণ। বরং সেখানে ছিল অদ্ভুত এক মায়া, যেন অনেক কথা না বলেই বলা হয়ে যাচ্ছে।
দুজনের চোখের সেই নীরব মিলন মুহূর্তটুকু নিশিতার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি তুলে দিল।
হঠাৎ করেই নিজের অজান্তেই লজ্জায় গাল দুটো গরম হয়ে উঠলো তার। সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল।
রিয়ার সবকিছুই যেন খেলাচ্ছলে হয়। সে সব দেখলো ঠিকই, কিন্তু ভেতরের অনুভূতিগুলো ধরতে পারলো না।
ফারিস আর নিশিতার চোখের ভাষা তার কাছে ধাঁধার মতোই থেকে গেল।
নিশিতা রুমে ঢুকেই বেডের উপর বসে পড়লো। বুকের ভেতর তখনো সেই তাকিয়ে থাকার অনুভূতিটা আটকে আছে। ঠিক তখনই হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠলো।
নিশিতা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো—
অহনা কল দিচ্ছে।
একটু দেরি করেই কল রিসিভ করলো সে।
ওপাশ থেকে অহনার চেনা উৎফুল্ল কিন্তু কৌতূহলী কণ্ঠ—
“কি রে নিশি? কী খবর তোর?
বল তো, তোর ওই জল্লাদ ভাইটা কিছু করেছে নাকি? আমি তোকে কতবার কল দিলাম, ফোনই ধরলি না কেন?”
অহনার মুখে ‘জল্লাদ’ শব্দটা শুনেই নিশিতার বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ করে উঠলো। কেন জানি না, কথাটা একদম ভালো লাগলো না তার। নিজেও বুঝতে পারলো না—কখন থেকে ফারিসকে নিয়ে এই অদ্ভুত অনুভূতি জন্মেছে।
নিশি একটু বিরক্ত গলায় বলল—
“ওনি কিছু করেনি।
আর ফোনটা আমার কাছে ছিলো না।
পরে কথা বলবো।ওনার বিষয়ে কিছু বলিস না তো।”
এই বলেই নিশিতা কল কেটে দিল। বেচারি অহনা আহাম্মক বনে গেল।
ফোনটা বিছানার উপর রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো সে। নিজের আচরণেই একটু অবাক হলো। আগে তো অহনা এমন কথা বললে সে হেসেই উড়িয়ে দিত। অথচ আজ কেন যেন ফারিসকে নিয়ে কারো নেতিবাচক কথা সহ্য হচ্ছে না। ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা দিয়ে রিয়া ঢুকে পড়লো।
রিয়া এসে বলল—
“কি রে নিশি?কালকে কোথায় ছিলি তোরা?
আর ভাইয়া কি কিছু বলেছে নাকি তোকে?”
নিশিতা চোখ নামিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
“কিছু বলেনি।
তুই এখন যা, আমি পড়তে বসবো।”
রিয়া একটু থমকে গেল। নিশিতার কণ্ঠে আজ যেন আলাদা একটা দৃঢ়তা। হালকা একটা ধাক্কা খেলেও সে আর কিছু বললো না। চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেল।
নিশিতা টেবিলে বসে বই খুললো। কয়েকদিন ধরেই পড়াশোনায় অনিয়ম হয়ে গিয়েছিল। আজ তাই মন লাগিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতই চোখ বইয়ের লাইনে থাকুক, মনটা বারবার অন্যখানে চলে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝেই ফারিসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তার।
বিশ্বাসই হচ্ছে না—ফারিস তাকে ভালোবাসে।
যে মানুষটাকে সে এতদিন শুধু কঠোর, রূঢ় আর ভয়ংকর ভেবেছে, আজ সেই মানুষটাই তার জন্য এতটা নরম!এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ দরজা খুলে গেল। ফারিস।
নিশিতা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
ফারিস ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কোনো কথা না বলেই নিশিতার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। সেই স্পর্শে নিশিতার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
ফারিস নিচু গলায় বলল—
“আমার টাইটা বেঁধে দে।”
নিশিতা কোনো প্রশ্ন না করে, লক্ষ্মী মেয়ের মতোই টাইটা হাতে নিয়ে বেঁধে দিল। বাঁধতে বাঁধতে নরম স্বরে বলল—
“আপনি তো নিজেও বাঁধতে পারেন টাই।”
ফারিস হেসে নিশিতার মুখে হাত রাখলো—
“বউ থাকতে আমি কেনো করবো?”
এই একটা কথায় নিশিতার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে নিল।
ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতার দুই গাল আর কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। তারপর বলল—
“আমি অফিসে যাচ্ছি।সাবধানে থাকবি।আর একটা পেইন কিলার খেয়ে নিবি, ঠিক আছে?”
নিশিতা মাথা নেড়ে আচ্ছা বলল।
কিছুক্ষণ পর ফারিস বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ি করে অফিসে চলে গেল। নিশিতা আবার পড়তে বসলো। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো—এত ভাবলে চলবে না।
অন্যদিকে অফিসে পৌঁছেও ফারিসের মন পড়ে রইলো বাড়িতে। কাজের ফাইলের ভেতরেও বারবার ভেসে উঠছে নিশিতার মায়া মাখা মুখ। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে কাজে মনোযোগ দিল সে। সময় গড়িয়ে গেল।
সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা… আর শেষে রাত।
আজ সারাদিন নিশিতা রুমেই ছিল। দুপুরের পর একটু ঘুমিয়েছিল, সন্ধ্যাবেলা ঘুম থেকে উঠে আবার একা বসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারটা দেখছিল।
তার মনে হচ্ছিল—জীবনের কিছু পরিবর্তন হয়তো নীরবেই এসে গেছে… যার শুরুটা সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
এদিকে ফারিসের দিনটা আজ শুরু থেকেই অস্বাভাবিক রকমের ব্যস্ততায় ভরা। সকাল থেকে একের পর এক ফোন, ইমেইল, মিটিং—সব মিলিয়ে যেন দম নেওয়ারও ফুরসত নেই। আজ তার সামনে কয়েকটা বড় ডিল সাইন করার কথা, যেগুলো সরাসরি কোম্পানির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
একদিকে নিজের অফিস, অন্যদিকে চৌধুরী ফ্যামিলি বিজনেস—দুটো সামলাতে গিয়েই পুরো দিনটা কেটে গেল ফারিসের। তিনটা বড় মিটিং, প্রত্যেকটাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বোর্ড মেম্বারদের প্রশ্ন, পার্টনারদের শর্ত, কাগজপত্রের খুঁটিনাটি—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। এই ব্যস্ততার মাঝেই কয়েকবার নিশিতার কথা মনে পড়েছিল তার।
মনে হয়েছিল, একবার কল করবে…
একবার জিজ্ঞেস করবে—খেয়েছে কি না, পেইন কিলারটা খেয়েছে কি না।
কিন্তু সময়টা আর হয়ে ওঠেনি।
শেষ বিকেলের দিকে ফারিস একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল চেক করছিল। চোখ কাগজে থাকলেও মনটা ছিল ক্লান্ত।
ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠলো।
Unknown Number.
ফারিস একটু বিরক্তি নিয়েই কল রিসিভ করলো—
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে পরিচিত অথচ অনেকদিন শোনা হয়নি এমন এক কণ্ঠ ভেসে এলো—
“কেমন আছো ফারিস?”
ফারিস কপাল কুঁচকে গেল।
এই কণ্ঠ…
চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছে না।
ফারিস ঠান্ডা গলায় বলল—
“কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের একচিলতে হাসি—
“এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে আমাকে, ফারিস?
আমি আরিশা।”
এই নামটা কানে যেতেই ফারিসের ভেতরটা মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তি যেন এক লাফে মাথায় উঠে এলো।
চোখ বন্ধ করে সে গভীর শ্বাস নিল।
বিরক্ত গলায় বলল—
“কল দিয়েছিস কেনো?”
ওপাশ থেকে হঠাৎ কান্নার শব্দ—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি ফারিস… খুব ভালোবাসি। তুমি কেনো আমাদের বিয়েটা এভাবে ভেঙে দিলে?
আমি সহ্য করতে পারছি না ফারিস।
তুমি এটা কেনো করলে?”
এই কথাগুলো শুনেই ফারিসের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। চিৎকার দিয়ে বলল—
“আমি তোকে ভালোবাসি না! আর না আমি তোকে বিয়ে করতে চাই! তুই আমার জাস্ট ফ্রেন্ড ছিলি, এর বেশি কিছু না। তোকে আমি কখনোই ওই চোখে দেখিনি।”
একটু থেমে আরও কঠিন গলায় বলল—
“তাই ফারদার আমার কাছে কল করবি না।”
এই বলেই কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই কল কেটে দিল ফারিস।
ফোনটা টেবিলের উপর রাখতেই সে নিজের কপালে হাত বুলিয়ে নিল।
রাগ, বিরক্তি আর অতীতের এক ঝামেলা—সব মিলিয়ে বুকটা ভারী লাগছিল।
ঠিক তখনই সে ঘড়ির দিকে তাকালো।
রাত ১১টা। এই সময়টা দেখতেই হঠাৎ করেই নিশিতার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সেই লাজুক হাসি, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা, “আচ্ছা” বলা শান্ত গলাটা।
অজান্তেই ফারিসের ঠোঁটে একটা নরম হাসি ফুটে উঠলো। বিড়বিড় করে বলল—
“আমি আসছি, বউ…”
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। যে শেষ মিটিংটা বাকি ছিল, সেটা নিহানকে কল দিয়ে ক্যানসেল করে দিতে বলল।
তারপর দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলো। গাড়ি চলতে শুরু করতেই শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। ফারিসের মনটা তখন পুরোপুরি বাড়িতে, নিশিতার কাছে। আজ সারাদিন কথা হয়নি—এই ভাবনাটাই তাকে অস্থির করে তুলছিল।
এদিকে চৌধুরী বাড়িতে সবকিছু নিস্তব্ধ।
ডাইনিং রুমের লাইট নিভে গেছে।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৭
সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজের নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশিতা নিজের রুমে ফারিসের অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না। চোখের কোণে ক্লান্তি, বালিশে আধখানা মুখ লুকানো।
কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দে চৌধুরী ভিলার সামনে এসে দাঁড়ালো ফারিস।
গাড়ি থেকে নামতেই সে একবার উপরের দিকে তাকালো—নিশিতার রুমের জানালার দিকে। ঘরের আলো নিভু নিভু। ফারিসের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক মায়া ছড়িয়ে পড়লো। ধীরে পায়ে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
