ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৯
জান্নাত চৌধুরী
মানহা ঘরে এসেছে। বিছানায় উবুর হয়ে শুয়ে কাঁদছে। আর ঠিক কতটা ভাঙ্গতে হবে তাকে? এসবের হিসাব মিলাতে গিয়ে ব্যর্থ সে। এতো বছরের লুকানো সত্যটা আজ কয়েক মিনিটে কিভাবে উন্মুক্ত করে দিলো সে। ভীষণ অপরাধ বোধ কাজ করছে তার। সে কি পাপ করেছে?
দরজায় শব্দ হয়! ভাজানো দরজা খট করে খুলে যায়। দরজা খোলার শব্দ টুকু কানে আসতেই দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসে সে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে, চোখের উপচে পড়া পানিটুকু হাতের তালুতে মুছে নেয়। তবে গালে তার পানি এক রেখা রয়েছে!
অরুনিমা এসেছে মানহা নিজকে সামলে ডাকে – “ গিন্নি মা”
অরুনিমা বিছানারর দিকে এগিয়ে আসে! মানহার কাঁপা কণ্ঠে ফোস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করে –
-”কাঁদছিস?”
-“উঁহু! একদম কাঁদছি না। ”
-“তবে চোখে পানি কেনো?”
মানহা দুই একবার গালে হাত বুলিয়ে বলল-
-“কই পানি ? ধুর ছুটে আসতে গিয়ে উড়ন্ত চুল চোখ ঢুকে জ্বালা করছিল, তাই চোখে পানি এসেছে।”
অরুনিমা হাত বাড়িয়ে ডাকলেন “ আয় দেখি বুকে আয়”
মানহা কিছু সময় তাকিয়ে থাকলো। তার চোখ আবার ভরে উঠছে , এসময় তার সত্যি একটু আদুরে হাতের প্রয়োজন ছিলো। আর দেরি করে না দ্রুত গিয়ে জড়িয়ে ধরে অরুনিমা কে। মুখ লুকায় অরুনিমার বুকের মাঝে। অরুনিমা মানহার মাথায় আদুরে হাত রেখে বলে-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“পুরুষের মন ইট- পাথরের তৈরি দালান ঘর।
এ মনে হাজার আঘাতেও ক্ষয় নেই।
তীব্র বৃষ্টিতে ও এদের ভাঙ্গন নেই।
ভাঙ্গন তো হয় মাটির ঘরে,
অনাবৃষ্টিতেই নিজেকে কেমন গলিয়ে দেয়।
আমরা নারীরা হলাম সেই মাটির ঘর!”
অরুনিমা থামে ,মানহা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে। থেকে থেকে ফুঁপিয়ে উঠছে। অরুনিমা আবার বলে-
-“নারী লোকের বিবাহের আগেই ঠকা ভালো, বিবাহের পর ঠকিলেই মরণ! ”
মানহা মুখ তুলে তাকালো, অরুনিমার চোখে তাকাতেই থমকে যায় সে। অরুনিমার চোখে পানি ,চোখ জোড়া হালকা লাল। মানহা আস্তে ডাকল , “ গিন্নি মা”!
অরুনিমা চোখে পাতা বুজে বড়সড় এক নিঃশ্বাস টেনে নিলো! মানহা নিজের ব্যাথা ভুলে বলল , “আপনি কাঁদছেন গিন্নি মা”!
-“খুশিতে কাঁদছি, এই অভিশপ্ত বংশের নির্মম পরিহাস হতে কেউ অন্তত রক্ষা পেয়েছে।”
-“কি বলছেন এসব গিন্নি মা ?”
অরুনিমা কিছু সময় মানহার মুখ পানে তাকিয়ে থেকে বলল-
-“রক্ত চোষা দেখেছিস ? চিনিস ? ”
মানহা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো! কি উত্তর করা উচিত বুঝে নেই তার। অরুনিমা আবার বলল, “ এই বংশের প্রতিটি পুরুষ রক্ত চোষা” নারী দেহের লোভী।
মানহার অবাকে চোখ দুটো বেশ বড় বড় হয়ে উঠলো। অরুনিমার প্রতিটি কথাই যেন কিছু একটার ইঙ্গিত। মানহা বলল – “ কি হয়েছে গিন্নি মা ? আপনার এতো কড়া কথার মানে আমার মস্তিষ্ক নিতে পারছে না। দয়া করে খোলাসা করুন।
অরুনিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাচ্ছিল্য হাসল ; -“পুরুষের তীব্র ভালোবাসা সইবার ক্ষমতা নেই ! এরা যেথায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য পাইবে সেথায় থাকার জেদ ধরে। ঠিক এমন হয় এই বংশের ধারায় –
আমার শ্বশুরের পূর্ব পুরুষের থেকেই হয়ে আসছে এসব , ঘরে বউ রেখে দিনের পর দিন বাইজি গৃহে রাত কাটিয়েছে তারা। আমার শশুর বাবাও ছিলেন মেয়েবাজ ! ক্ষমতা খাতিরে তিন বিবাহ করিয়াছে , তবুও সেই লোকের কুঠুরি গৃহে নারী লোকের আনাগোনা ছিলো।
অরুনিমা থামে, মানহার কৌতূহলী মস্তিষ্ক সজাগ হতেই প্রশ্ন করে- “খালুজান তো এমন নয় গিন্নি মা” তিনি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কেনো ব্যথা নিচ্ছেন ?
-“মরা মানুষে কি আর আত্মীয়ের কান্না শুনে! শুনে না নিশ্চয়ই “ আমার ভিতর টাও মৃত। সব জানি ,বুঝিই , দুচোখ মেলিয়া দেখি তবে, আমার বলার কিছুই নেই। বহুবছর আগেই আমার ভিতরের হাস্যোজ্জ্বল মানুষটার মৃত্যু ঘটেছে!”
মানহা স্তব্ধ সে যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। অরুনিমা উঠে দাড়ায় একটু একটু করে এগিয়ে গিয়ে থামে জানালার কাছে-
-“যার লাগি আমি ঘরে লোকের দুশমন সাজছি। সব ছাইড়া, সেই সুদূর ঢাকা হইতে এই অচেনা শহরে আসি ঘর বাঁধছি।
এই মানুষটাই আমারে সব চেয়ে বড় ধোকা দিছে।
আমারে ঠকাইছে , আমার ভালোবাসার ফায়দা লুটে আমারি কাছের বান্ধবীর লগে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে!
মানহা বাকরুদ্ধ হয়ে যায় ; ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে শুধু দেখছে অরুনিমা কে। অরুনিমা বলে –
-“শোন মেয়ে , আবেগ আর অনুভুতি দুটির মিশ্রণ না করে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। এই দুই মিশ্রণেই হয় কলঙ্ক। সাদা কাপড়ের কালি আর নামে লাগা কলঙ্ক দুটোই ভয়ংকর। যত ঘষিবে ততই বাড়িবে –
মানহার হাত পা কাঁপছে , এতো কঠিন সত্যগুলো গিন্নি মা কত অনায়াসে বলে দিলো। এখন যেনো দম বন্ধ লাগছে , আরাধ্য কে সে বরাবরই ঘৃণা করতে দেখেছে এ বংশ কে। বলতে শুনেছে এই বংশের ধ্বংস সে করবেই। ধূলিসাৎ করবে এই মীরের রাজত্ব। আরাধ্য একরোখা , একবার বলেছিলো এই বংশের অস্তিত্ব বিলীনের আগে তার মৃত্যু নেই- যদি মৃত্যু হয় তবে স্বেচ্ছায় মৃত্যু। যা আরাধ্য কখনোই
মানবেনা। তবে কি এই মীরের রাজত্ব …
ভাবতে পারেনা মানহা , দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে রয়। অরুনিমার ডাক পড়ে – রেণুর মা এসেছে ডাকতে। অরুনিমা জানালা থেকে সরে দরজার দিকে আসতেই রেণুর মা বলল-
-“ গিন্নি মা নিচে বউরানী আইছে। রুইসুল যাইয়া লইয়া আইছে। আপনার অপেক্ষায় রইছে নিচে – জলদি আসেন।
-“ছোট নবাব ঘরে আছে? “
রেণুর মা মাথা নিচে নামিয়ে মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বলল “নেই”।
অরুনিমা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। উল্টো ঘুরে একবার মানহার দিকে তাকিয়ে পা বাড়ায় অন্দরমহলে দিকে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছে , পাখিরা একে একে ঘরে ফিরছে। অবাধ্য পাখি সারাদিন পুরো আকাশ উড়ে দিন শেষেও ছুটে এসে বাসায় আশ্রয় নেই। একটা টিয়া রঙ্গের পাখি এসে মীর বাড়ির পুরনো আম গাছে পাতার আড়ালে ঢুকে গেলো, ইফরাহ তাকিয়ে দেখলো।
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পড়ন্ত বিকেলে লাল আভা , মাগরিবের ওয়াক্ত চলছে! চারপাশে আযানের হিরিক পড়েছে। ইফরাহ মাথার ওড়না টেনে ছাদ থেকে ঘরের দিকে পা পাড়াবে তখনি চোখ আটকে যায় দূরে ওই স্টিলের ঘরের দিকে। দুটো লোক এগিয়ে যাচ্ছে সেইদিকে- একজনের মাথায় কালো কাপড়ে ঢাকা , হাত দুটো পিছনে বাঁধা, অপরজন সেই লোককে ধরে নিয়ে চলেছে। ঠিক যেন জেলের কোনো কয়েদি কে কালো টুপি পড়িয়ে হাত বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কিছু ক্ষণের মাঝেই লোক দুটো ঘরে ঢুকে যায়। ইফরাহ তাকিয়ে থাকে- মিনিট দুয়েক এর মাঝেই আরাধ্য কে দেখতে পায় সে। মনে প্রশ্ন জাগে , ঘর টা আগেও দেখেছে ইফরাহ। তবে কৌতুহলী নয় সে..
এ বাড়ির কিছুতেই আকর্ষণ করে না তাকে । কখনো তেমন সন্দেহ ভাজক কিছু চোখেও পড়ে নি তার। আরাধ্য দৃষ্টি নাগালের বাহিরে যায়। ইফরাহ ধ্যান মগ্ন, কিছু খোঁজার আশায় তাকিয়েই থাকে।
অতিক্রম হয় কিছুটা সময়। আঁধার ঘনিয়ে আসছে নামাজের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই চতুর মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে ওঠে। ভীত হয় ইফরাহ , মনে পরে সেই রাতে কথা। কাঁধে কোনো পুরুষের হাত ভেবেই দ্রুত ঘুরে তাকাতেই নজর পরে আরাধ্যের উপর।
চমকে কিছু সরে গিয়ে রেলিংয়ে পিট ঠেকায় ইফরাহ। লোকটাকে মাত্র কিছু সময় আগেই দেখেছে সে ঘরের দিকে ….. উল্টো ঘুরে ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে সে।
একের পর এক বিস্ময়কর সব ঘটনা। আরাধ্য ডাকে –
-”ইরা”
ইফরাহ শুনলো কিনা জানা নেই। এক ঘোরের মাঝে বসবাস চলছে তার। আরাধ্য কিছুটা ঝাঁকিয়ে আবার ডাকে,
-এই মেয়ে , “ইরা” – কখন এসেছো তুমি ? আজ ফিরলে যে,
ইফরাহ হুস হীন এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকলো আরাধ্যের মুখ পানে। আরাধ্য ঘটনা বুঝলো না। রাত বাড়তে থাকলো,
ছাদের এক কোণে থাকা সন্ধ্যা মালতীর গাছ থেকে কুড়ি গুলো উঁকি ঝুকি দিচ্ছে। এসব কোনোটাই আরাধ্যের লাগনো নয়, ছেলেটা এতো শৌখিন নয়। এ গাছের মালিক মানহা- বাগানের প্রতিটি কোণায় কোণায় থাকা প্রতিটি গাছ মানহার অস্তিত্বের জানান দেয়। আরাধ্য কোলে তুলে নিলো ইফরাহর ছোট খাটো শরীর টাহ। কি হয়েছে সেসবে মাথা ঘামাতে চাইছে না।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ঘরের দিকে। আরাধ্যের কাটা হাতে ব্যান্ডেজ না করার কারণে আবার রক্ত ঝড়ছে। ইফরাহর পড়নের শাড়িতে রক্ত লেগেছে, এসবে ভ্রু ক্ষেপ নেই লোকটার। ইফরাহ মুখ লুকিয়েছে আরাধ্যের বুকে। আরাধ্যের ভালো লাগছে , মেয়েটা কাছে থাকলেই তার ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে ! এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ঘরে এসেছে খেয়াল নেই দুজনের।
আরাধ্য এগিয়ে যায়। বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দেয় ইফরাকে। মেঝেতে হাঁটু ভাজ করে বসে, মুখে আসা বাচ্চা চুলগুলো সরিয়ে দেয় ইফরাহর। ইফরাহ চোখের পাতা ফেলে না। আরাধ্য ইফরাহর হাত তার মুষ্টিবদ্ধ করে ডাকল
-” ইরা!
ইফরাহ তাকিয়ে থাকলো আরাধ্য তার গালে আলতো হাত ছুঁইয়ে বলল ;
-কখন এসেছো ? কে নিয়ে এসেছে!
ইফরাহর চোখের কোণ গরিয়ে পানি পড়ছে। আরাধ্যের অস্থির লাগে। কান্না করার কোণো কারণ খুঁজে পায় না সে। না সে তো বকে নি! আরাধ্য অস্থির হয়ে শুধালো –
-কি হয়েছে ইরা ? বলো আমায় ..
ইফরাহ কথা বলে না। আরাধ্যে হাত টেনে নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় তাতে। আরাধ্য চমকিত হলো , অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকলো। ইফরাহ তার হাতটা গালে নিয়ে আদুরে স্পর্শ অনুভব করতে চোখ বুঝে নিলো।
আরাধ্য অপর হাতে ইফরাহর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৮
-খেয়েছো কিছু ?
ইফরাহ নিশ্চুপ আরাধ্য হাফ ছাড়লো। আপতত ইফরাহ কে না ঘাটিয়ে উঠতে যাবে তখনি বুঝলি ইফরাহ তার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরেছে গালে।
-‘ইরা
ইফরাহ নড়লো না , এবারেও প্রতিউত্তর করলো না। আরাধ্য আবারো হাত বুলিয়ে দেয় তার মাথায়। কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুমে পাড়ি জমায় ইফরাহ।
