Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩০

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩০

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩০
জান্নাত চৌধুরী

গভীর রাত ! ইফরাহ জড়িয়ে শাড়ির ফাঁকে নরম পেটে হাত রেখে ঘুমানো টা আরাধ্যের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দিনেই এই মেয়েকে জড়িয়ে ঘুমানোটা তার মনের সুখ বলে অনুভব হয় । মুখ গুঁজেছে ইফরাহর কেশে।
রাত বাড়ছে , দেয়ালের ঝুলতে থাকা ঘড়ির কাঁটা জানান দিলো রাত তিনটে। ধীরে ধীরে ইফরাহর শরীর হতে সরে যায় আরাধ্যের হাত। নিঃশব্দে উঠে বসে আরাধ্য, বিছানার এদিক ওদিক তাকিয়ে তার কালো রঙ্গের মোবাইল খানা খোঁজে বের করে চোখ বুলায়। ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে রেজার তিনটা মেসেজ । আরাধ্য মেসেজ গুলো দেখে নিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে যায়। গোসলখানায় গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা মেরে এসে আয়ানায় নিজেকে দেখে কিছু সময়। চুলে হালকা পানি , আরাধ্য চুলগুলো ঝেড়ে নিয়েই ড্রেসিং টেবিলের গ্লাস উল্টো ঘুরিয়ে দিলো। অদ্ভুত এক ডেকোরেশন। আয়না ঘুরে যেতেই , সামনে উদয় হলো ধারালো সব অস্ত্রের সাম্রাজ্য। আরাধ্যর চোখ-মুখ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। কে বলবে এতো সুন্দর পরিপাটি ঘরের ডেকোরেশনের আনাচে কানাচে কত কি রয়েছে , চোখের আড়ালে।

আরাধ্য তাকিয়ে রইল কিছু সময়। এরপর মাথা চুলকে ছোট এক মাল্টি কুরাল হাতে তুলে নিলো। কুরাল টা উল্টে পাল্টে দেখেই আবারো আয়না ঘুরিয়ে স্বাভাবিক করে।
আয়নায় প্রতিবিম্ব পড়ে ঘুমন্ত ইফরাহর। আরাধ্য এক দৃষ্টিতে ঘুমপরিকে দেখে নিয়ে আলমারি হতে এক কালো শাল গায়ে জড়িয়ে বেড়িয়ে যায় ঘর হতে।
আরাধ্য দরজা পার হয়।ঠিক তখনি ঘুম থেকে উঠে বসে ইফরাহ। ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক সময়। আরাধ্যের উষ্ণতা সরে যেতেই ঘুম পালিয়েছে চোখ থেকে। দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে আয়নার কাছে যায় সে। তবে তেমন কিছুই নজরে আসে না। ছুটে যায় বেলকনির দিকে – এদিক থেকে কিছুটা মীর বাড়ির প্রবেশ দ্বার দেখা যায়। ইফরাহ প্রবেশ দ্বারের দিকে তাকাতেই খেয়াল করে আরাধ্য বাগানের পথ ধরে হেটে যাচ্ছে। কৌতূহলী চোখে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে ইফরাহ ! সময়ে সাথে পা মিলিয়ে আরাধ্য সেই স্টিলের ঘরে পথে চলে যায়।
ইফরাহ দেরি করে না। শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে , ছুটে বেড়িয়ে যায় ঘর হতে‌। পিছু নেয় আরাধ্যের – চুপি সারে এগিয়ে যায় সেই ঘরের দিকে। মনটা খোচ খোচ করছে তার,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হ্যালোসোলেশন হবার কোনো কারণ নেই। তবুও হয়েছে , এক‌ই সময় দুই জায়গায় লোকটাকে দেখেছে সে। এটা কি করে সম্ভব হয়েছে? পাখা নেই , উড়ে নিশ্চয়ই আসে নি লোক টা! ভাবনার মাঝেই ঘরের একদম কাছাকাছি এসে পড়ে ইফরাহ। দরজায় পাহারা বসানো। দুজন লোক পাহারায় রয়েছে। এ ঘরে পাহারা রাখার মানে কি ? কি আছে এর ভিতরে ? মনে কত কত প্রশ্ন ইফরাহর। উত্তর খোঁজা বাকি..!!
মন দোনোমনো করছে ! লোক দুটোর নজর পেরিয়ে ঘরে প্রবেশ যে খুব একটা সহজ নয়। সে কি করবে ? ভেতরে কি করে যাবে ? একা একা মনে মনে বিরবির করে ইফরাহ।
আশপাশ তাকিয়ে পথ খুঁজে সে ! তবে তেমন কোনো উপায় নেই- মাঝেই এক বিপত্তি ঘটে পাহারাদার একজনের নজর পড়ে যায় তার উপর।

-“কে … কে ওখানে ?”
পাহারা দারের গম্ভীর কন্ঠ শ্রবণ হতেই , দ্রুত উল্টো ঘুরে ইফরাহ। ভীত হয়, হাত -পায়ের আঙ্গুল কাঁপছে তার , উল্টো ঘুরে বাড়ির পথে পা বাড়াবে তখনি এক তীরের ফলা পাশ কেটে তার সামনের মাটিতে গেথে পড়ে। থমকে যায় ইফরাহর পা , পাহারা দাড় দুজন এগিয়ে এসে পথ আটকায় তার। ইফরাহকে শাড়ির আঁচলে মুখ লুকাতে দেখেই গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে !
-“কে আপনি এইখানে কি করছেন?”
ইফরাহ কথা বলে না। লোক দুটো একে অপরের মুখ দেখাদেখি করে আবারো বলে –
-“কী হলো বলুন কে আপনি ?”

এবারের নিশ্চুপ ইফরাহর। পাহারাদাড়ের শোরগোল শুনে ঘর হতে বেড়িয়ে আসে রেজা। এগিয়ে এসে দাঁড়ায় লোক দুটোর পাশে। রেজাকে দেখে মাথা নিচে নামিয়ে পাশে সরে গিয়ে দাড়ায় লোক দুটো। রেজা চমকিত , ইফরাহর বেশ ভূষণে সে চিনে ফেলেছে এই নারী কে ,রেজা তোতলানো কন্ঠে বলল –
-ব …ব‌উরানি আ. আপনি এইখানে?
ইফরাহ মুখ হতে আঁচল সরিয়ে রাশ ভারি কন্ঠে বলে –
“-চিনার জন্য ধন্যবাদ!”
রেজা মাথা নিচু করে বলল- “ শুকরিয়া ব‌উরানী ! তবে..
রেজা কথা শেষ করতে পারলো না, তার আগেই ইফরাহ বলল – “আমি ভেতরে যাবো , নিয়ে চলুন !”
ইফরাহ যতটা ঘুরে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিলো ততটাই ঘুরে যায় রহস্যময় ঘরের দিকে। দরজার দিকে পা বাড়াবে তার আগে পথ আটকায় রেজা। দৃষ্টি মাটির দিকে রেখে বলল-
“ইয়ে মানে ব‌উরানী ; ভেতরে যাবার অনুমতি নেই !”
ইফরাহ চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল –

-“অনুমতি নেই মানে ? “
-“ছোট নবাব ব্যতিত এ ঘরে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ ব‌উরানী!”
-”কারণ কি ?”
রেজা উত্তর করেনা, তবে ইফরাহ অধীর আগ্রহে থাকে রেজার উত্তরের অপেক্ষায় । রেজা শুষ্ক ঢোক গিলে বলল-
-“আপনি ফিরে যান ব‌উরানী ?”
-“আমি ভিতরে যাবো পথ ছাড়ুন ..!!”
ইফরাহ পাশ কাটাতে চাইলে আবারো পথ আটায় রেজা। দুই হাত জোড় করে বলে –
-“দয়া করুন ভেতরে অস্বাভাবিক কিছু নেই ! আপনি ফিরে যান ব‌উরানী!”
ইফরাহ বিরক্ত হয় গলায় এক তেজি ভাব এনে বলে –
-ভুলে যাচ্ছেন আপনি মীর বাড়ির ব‌উরানীর সামনে দাঁড়িয়ে;
ছোট নবাব নিশ্চয়ই আপনার এই বেয়াদবি মানবেনা।
রেজা মাথা একদম নুইয়ে নেয় , ইফরাহ আবার বলল –
-”আমায় যেতে দিন বিপদ বাড়াবেন না ! “

এবার আর রেজার অনুমতির প্রয়োজন মনে করে না ইফরাহ! রেজাকে রেখেই এগিয়ে যায় ঘরের দিকে। রেজা একহাতে কপাল চেপে পে কিছু সময় গাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গলা শুকিয়ে আসছে তার- পরবর্তী কি হবে ভেবেও দম ফুরিয়ে আসছে।সে অপেক্ষা করেনা দ্রুত পিছু নেয় ইফরাহর।
ঘরে প্রবেশ করেছে ইফরাহ , পুরো ঘর জুরেই অন্ধকার। কোথাও কিছুর দেখা মিলছে না। ইফরাহর নিঃশ্বাস আটকে আসছে , অন্ধকারের বড্ড ভয় তার। রেজা পেছেন এসে দাড়াতেই সে আদেশ করল –
-বিদ্যুৎ আছে , আলো জ্বালান !

রেজা সরে গিয়ে লাইট জ্বালাতেই পুরো ঘর দিনের মতো পরিষ্কার হলো ..!! পুরো ঘর ফাঁকা , কোথাও একটা ফার্নিচার অবদ্ধি নেই ! আরাধ্যের খোঁজ পেতেই পুরো ঘরে চোখ বুলায় ইফরাহ। কোথাও কিছুই নেই – ইফরাহ এগিয়ে গিয়ে ঘরের আনাচে কানচে দেখছে। পুরো ঘর পরিষ্কার ,
ইফরাহর অসহ্য লাগছে সব। ঘাড় ঘুরিয়ে রেজার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল – “ ছোট নবাব কোথায় ?”
রেজা মুখে কুলুপ এঁটেছে সে উত্তর করেনা। ইফরাহ ঘাটায় না তাকে। হয়তো সে ভুলে বুঝেছে ? ছোট নবাব নেই , রেজা বলেছে ভেতরে সব স্বাভাবিক তবে , এই ফাঁকা ঘরে আসতে অনুমতির কি প্রয়োজন? মস্তিষ্কে একের পর এক প্রশ্নের তাল গোল পাকিয়ে চলেছে তার।
সে ঘর হতে বেড়িয়ে যাবে এই ব্যাপারটা মস্তিষ্কে প্রসেসিং হ‌ওয়ার আগেই , ফুটন্ত কিছুর শব্দ কানে আসে তার। শব্দটা ঠিক চুলায় ফুটন্ত গরম পানি যেমন বলক তুললে এক বুদ বুদ শব্দ হয় তেমন। ফাঁকা ঘরে শব্দটা প্রখর হয়।, ইফরাহ দিক শুন্য, খুঁজে পায় না শব্দের উৎস। স্টিলের ঘরটির ছোট এক রুম। এ রুমের যেহেতু মানুষ নেই তবে শব্দ আসার কথা নয়। সন্দিহান চোখে রেজা দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করে –

-ছোট নবাব কোথায় ?
রেজা নিশ্চুপ ইফরাহ রাগী কন্ঠে বলল – “-মুখ খুলুন আপনার জন্যই মঙ্গল হবে! ছোট নবাব কোথায় বলুন ? “
ইফরাহর সরে রেজার দিকে এগিয়ে যাবে তখনি তার মনে হলো। কেউ চিৎকার করছে, তবে কোথায় করছে ?
সব কেমন ধোঁয়াশা , এ কেমন চক্র। ইফরাহর রছোট মস্তিষ্ক প্রতিমূহুর্তে ধোকা দিচ্ছে তাকে।
ভাবতে পারেনা , আরো একবার এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে ইফরাহর নজর পড়ে রেজার পায়ের দিকে..!! পুরো ফ্লোরের রং এক রকম হলেও রেজার দাড়ানো জায়গার রং ভিন্নতা। ইফরাহ তাকিয়ে থাকলো অধিক সময় , রেজার অস্বস্তি লাগে। গা ঘেমে উঠেছে তার, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
ইফরাহর তার অস্বস্তি আরো একগুন বাড়িয়ে দিয়ে তার চারপাশে একবার চক্কর কাটে। এতে যেন প্রাণ যাই যাই করছে রেজার। ইফরাহ ঘুরা থামিয়ে হঠাৎ বলল-

“সরে দাড়ান “
রেজা বুঝলো না! ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকলো ইফরাহ দিকে। ইফরাহ এবার নমনীয় হয়ে বলল-
-”সরে দাঁড়ান”
-মানে ব‌উ রানী হয়েছে .. কি ?
ইফরাহ হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো – ”শুনতে আগ্রহী ন‌ই , শুধু বলুন ! পাকা মেঝেতে কাঁচা মাটি কি করে এলো ?”
-“মানে ?
-★পুরো ঘরের মাঝে এই জায়গায় মেঝের রং ভিন্ন কেনো !
-“রেজা কথা বলে না ইফরাহ আবার বলল- উত্তর করছেন না! নিরবতা সম্মতির লক্ষণ , তবে নিশ্চিত ঝামেলা রয়েছে?”
-কোনো ঝামেলা নেই ব‌উরানী !
-আপনি সরে আসুন?
কথা বলতে দেরি রেজাকে টেনে সরিয়ে দিতে দেরি নেই ইফরাহর।রেজা হতবম্ব, ইফরাহ মুসকি হেসে বলল-
“ধন্যবাদ “

রেজা বাকরুদ্ধ , আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে। কিসব ঘটছে তার সাথে ! ইফরাহ হাটু গেড়ে বসলো মাটিতে, আলতো হাতে মাটি তুলে নাকের কাছে এনে শুকলো।
ভেজা মাটির গন্ধ। মেঝের অংশ আঙ্গুলে টোকা দিতেই অদ্ভুত এক শব্দ অনুভব করলো।
রেজা ভয়ে জমে উঠেছে , কি করবে বুঝে আসে না তার। উপায়ান্তর না পেয়ে ইফরাহর মনোযোগ সরাতে ডাকে –
-ব‌উরানী! ভোর হয়ে এলো ফিরবেন না ?
-এদিকে আসুন !
রেজা চমকালো , ইফরাহর মনোযোগ টানতে পারেনি সে বুঝেছে এটা । কাঁপা গলায় বলল-
-ওখানে কি করছেন ব‌উরানী , মেঝে ঠান্ডা আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন!
-ওটা পড়ে ভাববেন ? আগে এদিকে আসুন !
রেজা এগিয়ে গেলো। ইফরাহ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-

ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৯

-সরিয়ে দিন !
-জ্বি.. কি !
-অভিনয় করবেন না ! যদিও আপনার অভিনয় দেখতে আমি আর্কষিত ন‌ই- তাই হয় আপনি সরিয়ে দিন এই কার্পেট, নয়তো আমি সরিয়ে নিবো ?
রেজা থ মেরে যায় , ১০ নম্বর বিপদ সংকেত তার মাথার উপর। ইফরাহ পাত্তা দিলো না এসবে। বসা থেকে সরে গিয়ে, মেঝেতে রাখা কার্পেট সরাতেই বড় এক বিদ্যুৎ শক খায় সে। ছিটকে পড়তে গেলেই রেজা ধরে নেয় তাকে ,
-ব‌উরানী সামলে !
ইফরাহ থমকায় , ঘরের মাঝে এক গর্ত দেখে রেজার চোখে চোখে তাকিয়ে নিজেকে সামলে এগিয়ে আসে সে –

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১