ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১ (২)
জান্নাত চৌধুরী
দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ব্যস্ত জীবন। সময়কে হাতে ধরে রাখার উপায়ন্তর নেই মনুষ্য জাতীর। সকালের লাল অভা কাটিয়ে দিনের আলো ধরনীর বুকে পড়তেই যেন। ব্যস্ত জীবনের আরেকটি দিনের সূচনা হয় –
রোজকার মতো আজও ফরমাল গেটাপে তৈরি হয়েছে কাব্য।
ঘড়িতে সময় তখন সকাল ১০টা ,
কোঁকড়ানো চুলগুলো চিরনিতে বেক ব্রাশ করে সুন্দর করে সেট করে নিলো ছেলেটা। কাজের চাপ বেড়েছে।
চুল সেট করা হতেই কাব্য এসে দাড়ালো ঘরের কর্ণারে পড়ে থাকা টেবিলের কাছে। নীল রঙের তিনটা ফাইল পড়ে আছে এতে। দুটো খুনের একটা ধর্ষণের কাব্য এক এক করে তিন ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ কেসের ফাইল হাতে ধরে কিছু একটা ভাবলো। কাব্য ভাবে উহু ভাবে না তার মন বলে, হাতে আসা তিনটা কেস যেন কোনো এক বিনিসুতার মালা- যার অর্থ একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। কাব্য ক্যালেন্ডারে তাকালো, আজ ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৯৮
কাব্য বেড়িয়ে গেলো ঘর ছেড়ে , ভিকটিমের বাড়ি যেতে হবে তার। পুলিশ কোয়াটার হতে বের হতেই এক অপরিচিত মহিলার দেখা মিললো তার। মহিলার গায়ে সস্তার এক ছাপা শাড়ি। পায়ে জুতো নেই , ধূলোবালিতে কালো রং ধারণ করেছে। নাক অবদ্ধি লম্বা শাড়ির আঁচলে মুখ লুকানো। কাব্য গেটের কাছে পা রাখতেই মহিলা হুরমুর করে এসে পা জরালো তার। এসবে প্রস্তুত ছিলো না কাব্য , কিছুটা ঝুঁকে মহিলা গায়ে হাত না দিয়ে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– এ একি কে আপনি ?
মহিলা মাথা নিচে রেখে কাদুনি গাইছে “ সাহেব আমার সওয়ামির লাশ খান নিবার চাই। আমার সওয়ামির লাশ খান মোরে দেন। “
কাব্য অসহায় মুখ করে বলল -” আপনি পা ছাড়ুন উঠুন!
-না স্যার মোর সওয়ামির লাশ মোরে দেন। মুই হের দাফন করবার চাই , আমার সওয়ামিরে শেষবার দেখবার চাই। মোর দারে খবর আইছে মোর সওয়ামির লাশ ত..তদন্ত করবার আনছেন ?
কাব্য মহিলার থেকে পা সরিয়ে নিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাড়ালো। মহিলা গলা ছেড়ে কান্না করতে করতে বলল-
-ওও গো তালেব মিয়া, তুমি মোরে এমনে এতিম করবার পারলা। এহন মুই কই যামু ? মোরে থুই কেমনে মইরা গেলা। ও তালেব মিয়া।
কাব্যের বিরক্তি সাথে হাসিও পেলো বটে , তবে নিজেকে সামলে চেহারায় গাম্ভীর্য ভাব এনে ডাকল –
-“তিতাস সাহেব , তিতাস সাহেব ! ”
কনস্টেবল তিতাস দ্রুত কদমে এসে প্রথমেই এক পা উঁচু করে কপালে হাত ঠেকিয়ে সালাম ঠুকে বলল -, “কনস্টেবল তিতাস উপস্থিত স্যার”
উপস্থিত গণনা তিতাসের এক অভ্যাস , কাব্যের মাঝে মাঝে মনে হয় সে নিশ্চয়ই কোনো স্কুলের শিক্ষক। আর এই তিতাস হলো তার ছাত্র। মনে না হবার কারণ নেই তিতাসের ব্যবহার ঠিক এমনি। কাব্য হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে কান্নারত মহিলার দিকে ইশারা করল!
-”ওনি কি বলছেন শুনে আমাকে ইনফর্ম করবেন। আমি বের হবো।
তিতাস লম্বা একটা টান টেনে জবাব করল – “অবশ্যইইইই স্যার!”
কাব্য বেড়িয়ে গেলো , সরকারি গাড়িতে চড়ে রওনা হলো মেঘার বাড়ির উদ্দেশ্যে। গাড়ি চলছে , মাথায় ঝটলা পেকেছে , প্রতিটি রহস্যের। কাব্য সিটে গা এলিয়ে কিছু একটা ভাবল। মাথায় একাধিক প্রশ্ন , উত্তর খোঁজা বাকি হঠাৎ আগপাছ কিছু না ভেবেই , ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল-
-আচ্ছা আব্দুল ভাই এই গ্রামের মূল কাহিনী কি বলেন তো?
আব্দুলাহ গাড়ির স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে বলল- “ এই গ্রামের কাহিনী পুরো জন্ডিস সাহেব। এর মূল কাহিনী আদতেও কারো জানা নেই। সবাই শুধু জানে খন্দকার বাড়ি আর মীর বাড়ির এক শত্রুতার কাহিনী। তবে সঠিক তথ্যের হদিস নেই কেউ জানলেও মুখ খুলেনা।
কাব্য হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো। দু চোখ বুজে নিয়ে বলল-
বুঝলেন ভাই , মামলায় ভীষণ রকমের ঘাবলা রয়েছে।
এই মামলার নিষ্পত্তি মেটাতে ভীষণ খাটুনি হবে।
মেঘার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাড় করালো আব্দুলাহ।
কাব্য নেমে গেলো। হাতে সেই নীল রঙ্গের ফাইল , টিনে ছোট ছোট দুখানা ঘর , কাব্য দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল-
-কেউ আছেন ?
জাহানারা বেগম বেরিয়ে এলো , কাব্যের দিকে প্রশ্নবোধক চাহনিতে তাকিয়ে থাকতেই কাব্য বলল-
পুলিশ স্টেশন থেকে আসছি ; মেঘার সাথে দেখা করতে চাইছি!
জাহানারা বেগম কাব্যের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটাকে বয়স কম। কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল-
মেঘা অসুস্থ সাহেব , কথা কইবার পারবো না। আমি তার মা লাগি আমারে বলেন!
-”বেশি সময় নিবো না ।”
জাহানারা কথা বাড়াতে চাইলো না পুলিশ লোক তর্ক করা মানেই ঘাড়ে বিপদ ডেকে আনা কাব্য কে নিয়ে ঘরে এলো সে। মেঘা খাটের উপর বসা। ক্ষত স্থান শুকিয়ে উঠেছে মেয়েটার। কালো রঙের কেশ গুচ্ছে ঝটলা পড়েছে।
জাহানারা বেগম একটা মোড়া এনে বলল-
বসেন সাহেব !
কাব্য বসল , কিছু সময় চুপ থেকে ফাইলের সাথে মেঘার বিবরণ দেখে ডাকল –
-“মেঘা! ”
মেঘা চুলের উকুন তুলছে। কাব্যের ডাক শুনলো কিনা বুঝা গেলো না। কাব্য মোড়া আরো কিছুটা টেনে বসে আবারো ডাকলো – “মেঘা।”
এবারের ডাক কিছুটা জোড়েই ছিলো। মেঘা ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলো। জাহানারা বেগম দ্রুত এসে মেয়ের কাছে দাড়াতেই মেঘা ঝাপটে ধরলো তাকে –
কাব্য নিজেকে শান্ত করে বড় বড় নিঃশ্বাস টানলো। মেঘার পুরুষে ভয় কাব্য ব্যাপারটা মাথায় রেখেই প্রশ্ন করল –
-মেঘা শুনছো ?
মেঘা মুখে আঙ্গুল রেখে চুপ থাকতে চাইলো। কাব্যের মনে হলো কোনো এক অবুঝের সামনে বসেছে সে। মেয়েটাকে দেখে নিয়ে বলল-
আমায় একটু সাহায্য করো মেঘা। ওরা কে বা কারা ছিলো অনুরোধ রইলো বলো ! তাদের শাস্তির প্রয়োজন-
“ শাস্তি “ শাস্তি শব্দটা শ্রবণে আসতেই হাত তালি দিলো মেঘা। খুশি খুশি হয়ে বলতে লাগলো – পাপির শাস্তি হয়েছে , সে শাস্তি দিয়েছে। সে মহান , সে মহান-
কাব্য ভ্রু কুঁচকে তাকালো , জাহানারা বেগম দ্রুত চেপে ধরলেন মেয়ের মুখ শুষ্ক ঢোক গিলে ফেললেন কয়েকবার। কাব্য সব দেখে নিয়ে বলল-
কার কথা বলছে সে ?
জাহানারা আমতা আমতা করল – ইয়ে মানে স্যার, মাইয়ার আমার মাথায় গন্ডগোল হইছে। ওই মেন্টাল না কি কয় হেইডা।সব উল্টাপাল্টা বকে।
কাব্যের খটকা লাগল “ কিছু লুকাচ্ছেন ?
জ্বে না সাহেব !
কাব্য বুঝতে পারছে না এই ভিকটিমের পরিবারের সমস্যা কোথায় ! এরা মুখ কেনো খুলতে চাইছেন না , তাদের মুখ খুলার প্রয়োজন অথচ এরা নিশ্চুপ। কাব্য হতাশ – তদন্ত সুত্রপাত মিলাতে হবে তাকে।
কাব্য বসা ছেড়ে উঠল। তবে যাওয়ার আগে বললো –
শাকে মাছ ঢাকবেন না , লস বই লাভ হবে না। আসছি ;
ঘড়ির কাটায় বেলা বারোটা ছুঁই ছুঁই ইফরাহ ঘুম ভাঙতেই দেখলো আরাধ্য চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বই পড়ছে।
বই পড়ছে বলতে সে কবি সাহেবের ভুল ধরছে-
মোটা স্বরে , কবিতা আবৃত্তি করছে –
কাজী নজরুল ,
করছে ভুল
দাড়ি না রেখে রেখেছে চুল ।
ইফরাহর দিকে নজর পড়তেই বেশ বড় এক সালাম ঠুকে বলল- শুভ রাত , সকাল, দুপুর বউ।
ইফরাহ নাক সিঁটকায় , আরাধ্য মুসকি হেসে এসে বসে বিছানার উপর। কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে ধপ করে শুয়ে পড়ে ইফরাহর কোলে , মুখ লুকায় শাড়ির ফাঁকে নরম পেটে। বিশ্রি এক অভ্যাস , ইফরাহ প্রতিবার বিরক্ত হতে চেয়েও পারে না। আরাধ্য নেশাগ্রস্তের মতো বলে –
-ঘুম হয়েছে তোমার ?
ইফরাহ খাটের পাসিতে হেলান দিয়ে ঘড়ি দেখলো ঘড়ির কাটা বারোটার ঘরে।নিজেই নিজের শরীরের একবার চিমটি কেটে আবারো তাকলো। সে একদম ঠিক দেখছে , এতো সময় ঘুমিয়েছে সে? আরাধ্য আবার বলল –
-“ইরা”
ইফরাহ উত্তর করেনা, দুহাতে মাথা চিপে ধরে। ঝিমঝিম করেছে মাথাটা , আরাধ্য ইফরাহর নরম পেটে আলতো ঠোঁটের স্পর্শ দিলো। তবে আজ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ইফরাহ। আরাধ্য পিট পিট করে ইফরাহর মুখের দিকে দেখে জিজ্ঞেস করল –
-”কি সমস্যা মেয়ে?
-আপনি মানেই সমস্যা সরুন।
আরাধ্য মনে হলো ইফরাহর কথাটুকু শুনতে পাইনি।একদম গা ছাড়া ভাবে শরীর ছেড়ে শুয়ে রইলো ইফরাহ কোলে ইফরাহ প্রশ্ন করল –
-“সরছেন না কেন?”
-“ইচ্ছে নেই !”
ইফরাহ চুপ রইল, আরাধ্য উবুর থেকে চিত হয়ে শুয়ে বলল-
“বেলা ১২ অবদ্ধি পড়ে পড়ে ঘুমালে মেয়ে। বলি স্বামীর সেবা কি তোমার পাঠ্য বইয়ে লেখা নেই ?”
-কথায় কথায় পাঠ্য বই টেনে কি বুঝুতে চান?
-সরবেন ?
-আমার ঘর ,আমার বিছানা , আমার বউ , বউয়ের কোল , সব আমার তো তুমি কে হে চেংড়ি, দূর দূর করছো?
ইফরাহ ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকবে তখনি কিছুটা ব্যথা অনুভব হয় তার। কিসের ব্যথা বুঝতে পারছেন- মস্তিষ্কে জমাট বেঁধে হব। রাতে কি ঘটেছে , এতো বেলা অবদ্ধি ঘুমানো সব কেমন ধোঁয়াশা লাগছে তার কাছে।
আরাধ্য বলল- গোসল দিবে ?
-কেনো ?
-মুখ দেখে মনে হচ্ছে মাথা ধরেছে , গোসলের প্রয়োজন তোমার।
-”এতো বেলা অবদ্ধি ঘুমে ছিলাম ডাকতে পারতেন ?
আরাধ্য উঠে বসলো পড়েন গেঞ্জি টা টেনে টুনে নিয়ে বলল-
কাল যেভাবে কলে চড়েছিলো মেয়ে। আজ সকালে ডেকে দিলে তো ঘাড় মুচড়ে রক্ত নিতে।
ইফরাহ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল , আরাধ্য বলল-
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১
-এই তোমারের জ্বিনে ,ভুতে , নিতে চায় নাকি গো?
-না;
-তবে কাল কেনে হামলে পড়লে আমার উপর !
ইফরাহর কিছু মনে পড়ছেনে না। মাথার ব্যথা বারতি হচ্ছে , দুহাতে মাথা চেপে রাতের কথা মাথায় আনতে চাইছে সে।
আরাধ্য এক হাত বাড়িয়ে ইফরাহকে টেনে বুকে এনে ফেলো। আলগা হলো খোঁপার বাঁধন , ছুটে যাওয়া চুলগুলো সযত্নে কানের পাশে গুজে দিয়ে বলল-
-”তৈরি থেকো খানিক বাদে আমি নিতে আসবো !”
