The Silent Manor part 43
Dayna Imrose lucky
সোলেমান দাঁড়িয়ে গেল।বদরু ওঁরা নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করল। সুফিয়ান হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হতেই সোলেমান বলল “এভাবে কোথায় যান?আর আপনি এরকম পোশাক কোথায় পেলেন? আপনি সত্যিই কৃষক তো?”
সুফিয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল।রাঙার কাছে এগোল।কথা বলার ধরণ পাল্টে বলল “আমাকে দেখে তোদের কি মনে হয়?
“একেক সময় একেক রকম মনে হয়।আমরা বিভ্রান্ত।” বলল লাল মিয়া।
সুফিয়ান হঠাৎ করে মনোভাব নিয়ে লালমিয়ার দিকে এগিয়ে গেল।লাল মিয়া কিছুটা ঘাবড়ে গেল,সুফিয়ান এর অভিব্যক্তি দেখে। সুফিয়ান বলল “আমি আলিমনগর এর একজন সাধারণ বাসিন্দা। একজন কৃষক।কখনো রাখাল বাঁশিওয়ালা।”
“আপনার কন্ঠে কখনো বাঁশির সুর শুনিনি।” বলল সোলেমান। তাকিয়ে আছে সুফিয়ান এর র’ক্তে মাখা চোখ দুটির দিকে।
সুফিয়ান ওঁদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। পুনরায় হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে কাঁধের উপর থেকে অদ্ভুত এক ভয়াবহ চোখে তাকাল।বলল “যে শোনার সে-ই শুনেছে।”
“ফারদিনা!” বলল বদরু। নিশ্চিত কন্ঠ ওর।
“তোঁর বুদ্ধি আছে বদরু।” বলল সুফিয়ান।
“এখন আপনি কোথায় যাবেন? সোলেমান এর প্রশ্ন।
“তালুকদার বাড়ি।”
“ভালো হবে,জিজ্ঞেস করুন।ফারদিনা কোথায়?সে বিদেশ যায়নি।আমি নিশ্চিত, তাঁরা কিছু লুকাতে চাইছে। সবকিছু নিশ্চিয়ই তাঁরা জানে।” সোলেমান বলল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কি জানে ওঁরা?বিদেশ গেছে, এটাই তো” সুফিয়ান এর ভাবসাব হঠাৎ পরিবর্তন হল। আবার বলল “আজ ওদের বলতেই হবে,ফারদিনা কোথায়?যদি সত্যিই প্রমাণিত হয়,ফারদিনা আজমাত কে বিয়ে করে কিরগিজস্তান চলে গেছে, তবে আমিও কিরগিজস্তান যাব।আজমাত কোথায় থাকে?ওঁদের বলতে হবে।ফারদিনাকে শুধু কয়টা প্রশ্ন করার আছে।”
“তাহলে দেরি কেন,যান তাঁদের বাড়ি।” সোলেমান যেন বেশ তাড়া দিল। ঘুরে বদরুকে বলল “তোরা এই সময়ে এখানে কেন?
বদরু শুকনো গালে ভিজে ভিজে টান রেখে বলল “গত তিনদিন হয়,ছেলে বউকে খুঁজে পাচ্ছি না।ভাবছি,রাগে হয়ত বাপের বাড়ি চলে গেছে। ক’দিন আগে ঝগড়া হইছিল।আজ আমি ওর বাপের বাড়িতে গেলাম। কিন্তু, সেখানে গিয়ে দেখি ওর মা বাবা কেউ বাড়িতে নাই। একজন কে জিজ্ঞেস করলাম,উনি বললেন, তাঁরা বেশ ক’দিন হয় হাওয়া হয়ে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না।”
বদরুর উদাসী কন্ঠে সুফিয়ান চোখ ভাঁজ করল।ওর দিকে তাকিয়ে বলল “কি বলছিস”
“হুঁ,ঠিকই বলছি।আর এইটা বলতেই আপনার কাছে এসেছি। এখানে এসে দেখি আপনার এই অবস্থা।ফারদিনা কোথাও চলে গেছে।যান, আগে আপনি তাঁকে খু্ঁজেন।”
সোলেমান লুঙ্গিটা ভাঁজ করতে করতে বলল “তুই ঠিকই বলেছিস, গ্রামের কত কত মানুষ হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যাচ্ছে।আমিও বিষয়টি লক্ষ্য করেছি।গ্রামটা আর আগের মত নাই।কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে গ্রামটি।”
লালমিয়া বলল “গ্রামে ঠিক কি হচ্ছে,আমরা খুঁজে বের করব।তবে এখন না, আগে ফারদিনাকে খুঁজে বের করতে হবে।সে কোথায় গেছে জানতে হবে, বিদেশ নাকি ঘরেতেই আছে?”
সুফিয়ান ওঁদের চোখে তাঁকে ভেবে হতাশার ছায়া দেখল।যে মানুষগুলো কোনদিন পরিবর্তন হবে না ভেবেছিল, তাঁরা আজ পরিবর্তিত। তাঁর সাথে বেইমানি করবে বলেছিল অনেকে।আজ তাঁর জন্য ওঁরা চিন্তা করছে। ভেবে সুফিয়ান এর আনন্দ হচ্ছে খানিকটা। কিন্তু হৃদয়টা ভেঙ্গে যেন অর্ধেক ঝুলে আছে মাংস পেশীর সাথে। ফারদিনার সঠিক খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত হৃদয়টা ভাঙ্গা অবস্থায় থাকবে।ফারদিনা যদি তাঁকে ছেড়ে সত্যিই চলে গিয়ে থাকে,তবে যেন পুরোপুরি হৃদয়টা ভেঙ্গে পড়বে। সেইসাথে সেও ভেঙ্গে যাবে হয়ত।
সোলেমান সুফিয়ান এর দিকে এগোলো।বলল “আপনি দেরি করছেন কেন?যান ওই বাড়ি। আপনি আগে থাকুন।আমরা পেছনে পেছনে আসছি।আর তলোয়ারটা আমাদের কাছে দেন,আগেই ওটা নিয়ে ভেতরে যাওয়া লাগবে না।”
সুফিয়ান সোলেমান এর কথা রাখল। তলোয়ারটা ওর কাছে দিল। এরপর তালুকদার বাড়ির দিকে রওনা হল
আজ তীব্র শীত।মনে হচ্ছে শীতেরা সব আজ একই সঙ্গে আলিমনগর জড়িয়ে ধরেছে। আকাশে মেঘের হাতছানি। চাঁদ আছে।চাঁদকে মেঘ ঢেকে রেখেছিল।এখন মেঘ খন্ডে খন্ডে উড়ে গিয়ে চাঁদের আলো দিচ্ছে।কিন্তু সুফিয়ান এর শরীর থেকে যেন আগুন বের হচ্ছে। উপরের কোটটা খুলে ফেলল।খুলে ফেলতেই পেছন থেকে একজন কোটটা খুলে নিয়ে গেল। বিষয়টি লক্ষ্য করেছে সোলেমান সহ ওঁরা। ওঁরা বেশ কিছুটা দূরে ছিল।থ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সোলেমান বলল “কেউ একজন,সুফিয়ান এর গা থেকে কোট খুলে নিল।মনে হল অনুচর।” এরপর আর অনুচরকে দেখা গেল না।লালমিয়া বলল “আমিও দেখছি,এসব বাদ দে।পড়ে দেখা যাবে।”
সুফিয়ান এর পরনে শুধু গেঞ্জি।সে এখন তালুকদার বাড়ির সামনে।দু’জন পাহারাদার পায়চারি করছে। সুফিয়ান একটা সিগারেট ধরিয়েছে। একজন পাহারাদার তাঁর দিকে এগিয়ে এল।বলল “এত রাতে এইখানে?
“ভেতরে যাব, দরকার আছে।”
“কিন্তু, সরদার কাউকে ভেতরে যেতে বারণ করেছে।”
“আমাকেও?” সুফিয়ান ভ্রু কুঁচকে ফেলল। রশীদ তাঁকে ভেতরে যেতে বারণ করবে না বলে ধারণা করল। কিন্তু পাহারাদার এর পরবর্তী জবাব ধারণা পাল্টে দিল।বলল “হুঁ,আপনাকেও যেতে বারণ করেছে।” শুনে কিছুটা অবাক হল সুফিয়ান।সিগারেট এ শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল।বলল “আমাকে ভেতরে ঢুকতে না দেয়ার কারণ?”
“তা জানি না” সুফিয়ান ওঁদের কথা শুনল না। ভেতরে প্রবেশ করতে চাইল।তখন হঠাৎ একজন পাহারাদার তাঁর সামনে বাঁধা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।বলল “যাবেন না।” সুফিয়ান এর মেজাজ বিগড়ে গেল। ওঁদের সাথে রাগ দেখাতে মোটেই ইচ্ছা করছে না। কিন্তু এখন উপায় নেই।যে করেই হোক ভেতরে প্রবেশ করতেই হবে।সুফিয়ান পাহারাদার কে শান্ত কন্ঠে ক্রোধের আহভাস নিয়ে বলল “সর সামনে থেকে”
“না” পাহারাদার না বলতেই ওঁর নাক বরাবর এক ঘুষি মারল সুফিয়ান। পাহারাদার পাশে সরে গেল।নাক থেকে র’ক্ত বের হল।অন্যান্য পাহারাদার,অনুচর সুফিয়ান এর তেজ দেখে হকচকিয়ে উঠল। ওঁরা পাশে থেকেও আরো পাশে সরে গেল। সুফিয়ান আঙ্গুল এর ইশারায় হুমকি স্বরূপ বলল “আমি এক কথা,একবার বলতে পছন্দ করি। দ্বিতীয় বার বলতে গেলে আমার মস্তিষ্ক আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠে।” বলে সে ভেতরে প্রবেশ করল।ঘরের সদর দরজার সামনে যেতে যেতে মনে হল দোতলার বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সুফিয়ান স্থির দাঁড়িয়ে উপরে তাকাল। জেবুন্নেছা দাঁড়িয়ে আছেন।এত রাতে সে যেন সুফিয়ান এর আসার অপেক্ষায় ছিল। সুফিয়ান তাঁকে পাত্তা না দিয়ে সদর দরজার সামনে দাঁড়াল। সেখানে যে পাহারাদার ছিল,সে তাৎক্ষণিক দরজা খুলে দিল। আশ্চর্যের বিষয় হল, দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল।সুফিয়ান সেই নিয়ে কোন প্রশ্ন করার আগেই দরজা খুলে দিল।
ঘরের ভেতরের বেশিরভাগ আলো নেভানো।দু চারটে লন্ঠন জ্বলছে। কিছু মশাল দোতলার দেয়ালে জ্বলছে। সুফিয়ান আশেপাশে দেখল।কেউ নেই।চোখ তুলে দোতলার দিকে দেখতেই দেখল, জেবুন্নেছা সিঁড়ি বেয়ে নামছে।বলল “তুমি এখানে কেন?আজ তোমার সাজসজ্জা অন্যরকম। হঠাৎ রুপ পরিবর্তন এর কারণ?”
“আপনার কি মনে হয়,কি কারণ হতে পারে?
“তোমাকে বোঝার মত ক্ষমতা কারো নেই, আমারও না।তবে এতটুকু নিশ্চিত তুমি ছেলে সাধারণ কেউ নও।”
সুফিয়ান নিঃশব্দে হাসল।বলল “আপনি অবশেষে একটু হলেও আমাকে চিনতে পেরেছেন।”
“এখন বলো,কে তুমি? তোমার উদ্দেশ্যে কি?
“অপেক্ষা করুন। সবটা জানতে পারবেন। তবে আমার আসল রুপের খেল আপনাদের না দেখালেই ভালো হবে।কারণ আমার তাণ্ডব-লিলা সহ্য করতে পারবেন না।”
জেবুন্নেছা সোফায় বসলেন।বললেন “রুপ দেখালেই, তাণ্ডবের খেল দেখতে হবে?এর কারণ?”
সুফিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। জেবুন্নেছার অপর-প্রান্তের সোফায় পা তুলে বসল সুফিয়ান।বলল “তখন আপনারা আমার উপর ঝাপিয়ে পড়বেন।আর আমি তখন আঘা’ত করলে আপনারা সে আ’ঘাত সহ্য করতে পারবেন না।”
“তোমার এখন এই রাতে এ বাড়িতে আসার কারণ বলো।”
“ফারদিনা কোথায়?”
“ওহ্, তারমানে এই কারণ, তোমার আর ফারদিনার প্রেম চলে,আমি অনেক আগে থেকেই জানি। তোমাদের একসাথে অনেকবার দেখেছি।রাত বোরোতে এখানে ওখানে ঘুরেছো,সব দেখেছি।”
“আপনি আমাদের অনুসরণ করতেন।লন্ঠন হাতে। কখনো ক্ষেতের আড়ালে, কখনো গাছের আড়ালে,আমিও আপনাকে দেখেছি। কিন্তু আপনার দেখা না দেখা নিয়ে আমার কিছু যায় আসেনি।”
“আমাকে তুমি সহজ ভাবে নিতে কেন?আমি চাইলে তোমাদের অনেক ক্ষতি করতে পারতাম।”
“পারতেন,করেননি।সে সাহস আপনার জন্মায়নি।”
“কারণ, আমি তোমার সত্যটা যাচাই করতে চেয়েছিলাম। তোমাকে নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ ছিল। শুধু উপযুক্ত প্রমাণ ছিল না।”
“এখন আছে?” সুফিয়ান কঠিন চোখে প্রশ্ন করল।
“তোমার সাথে ফারদিনার সম্পর্ক ছিল।সেটি সবাই জেনে গেছে।”
“আমিই জানিয়েছি।”
“কিন্তু আফসোস, তোমাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পেল না।ফারদিনা বিদেশি ছেলের হাত ধরে চলে গেছে।তাও বিয়ে করে।”
“মিথ্যা কথা।” সুফিয়ান আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলল। থেমে আবার বলল “ও এই বাড়িতেই আছে।আপনারা ওকে লুকিয়ে রেখেছেন।বলুন ও কোথায়, কোথায় আটকে রেখেছেন?”
“আশ্চর্য, মিথ্যা কেন বলব আমরা?
“গত কিছুদিন ধরে জাহাজ চলাচল বন্ধ।তাহলে ওঁরা বিদেশ গিয়েছে কিভাবে?”
জেবুন্নেছা নড়েচড়ে বসলেন।চোখের চারপাশ কুঁচকে গেল খানিকটা। সুফিয়ান তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করল বিষয়টি।বলল “কি হল,ভয় পেলেন কেন? সত্য জায়গায় পা পড়েছে আমার,তাই মিথ্যের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না নিশ্চয়ই!”
“তুমি অনেক বেশি কথা বলো, ওঁরা.. ওঁরা হয়ত অন্য পথে গেছে।”কথাগুলো এলোমেলো ছিল।
সুফিয়ান হেসে ফেলল।বলল “তোতলাচ্ছেন কেন?যে সত্য কথা বলে সে কখনো তোতলায় না।”
“পান মুখে তাই,কথা আটকে গিয়েছিল।” এটাও মিথ্যা কথা।ওনার মুখ একদম পরিষ্কার। মুখে পান থাকলে ঠোঁট লাল থাকত,চিবোতো,সুফিয়ান স্পষ্ট দেখল,ওনার মুখে পান নেই।মুখে কিছু রেখে কথা বললে কথা ভার ভার শোনায়।
সুফিয়ান পা নামিয়ে ফেলল। দাঁত কিড়মিড় করে এদিক সেদিক দেখল।বলল “আপনি পান খাচ্ছেন না। আপনি নারী না হয়ে যদি পুরুষ হতেন, এতক্ষণে আপনার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলতাম।”
“তোমার সাহস তো কম নয়,আমার জিহ্বা ছেঁড়ার কথা বলছো!”
“ছেঁড়ার কথা বলেছি,ছিড়িনি। আপনার ভাগ্য ভালো। বেশিক্ষণ ভালো থাকবে না,যদি সঠিক তথ্য না দিন।”
“আমার কথা বিশ্বাস না হলে আদিব কে জিজ্ঞেস করো।”
আদিব সিঁড়ি দিয়ে নেমে সুফিয়ান এর পেছনে আসল।পায়চারি করতে করতে বলল “তুই এখানে!আবার এসেছিস কেন?”
সুফিয়ান দাঁড়িয়ে বলল “তোরা মিথ্যা বলেছিস কেন?ফারদিনা বিদেশ যায়নি।জাহাজ চলাচল বন্ধ। তাহলে ওঁরা নিশ্চয়ই উড়ে উড়ে যায়নি।”
“আমরা কখন বললাম, ওঁরা সমুদ্র পথে গিয়েছে!
উট চড়ে গিয়েছে। মরুভূমির পথে।”
সুফিয়ান হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে গেল।আদিব এর কন্ঠে মিথ্যার আশ্রয় দেখা যাচ্ছে না।সে খানিকক্ষণ এর জন্য বিশ্বাস করে ফেলল। উটে চড়ে দূরের পথ পাড়ি দেয়া যায়, বিষয়টি সুফিয়ান ভুলেই গিয়েছিল।এখন সে কি করবে? কিরগিজস্তান চলে যাবে?ফারদিনা সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। পুনরায় ভাবনা গুলো তাঁর ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।সে দুর্বল হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকধুক শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে।
আদিব সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়ে বলল “তোর রুপ পরিবর্তন!তুই নিশ্চয়ই কৃষক না?একজন কৃষক শিক্ষিত ছেলেদের মতন চলতে পারে না,শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না। চোরদের শুদ্ধ ভাষা শেখাতে পারে না।লিখতে পারে না, শহুরে ছেলেদের মতন পোশাক পড়তে পারে না, বিশেষ করে সে-ই পোশাক কেনার সামর্থ্য থাকতে পারে না।তোর এই সামর্থ্য কোথ থেকে আসলো? ইউরোপ থেকে আসা,সিগারেট খাওয়ার সামর্থ তোর কোথ থেকে আসলো?”
“আমি ইউরোপ এর সিগারেট খেয়েছি,তা তুই জানলি কিভাবে?
“আমার কাছে অনেক তথ্যই আসে।তুই যদি ভেবে থাকিস তুই একাই চালাক তাহলে ভুল।”
সুফিয়ান এর রাগ উঠল।কিন্তু রাগ বহিঃপ্রকাশ করল না।বলল “আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না,ফারদিনা বিদেশ চলে গেছে,তাও অন্য কারো হাত ধরে।”
“তুই খোঁজ নে দরকার হয়।”
“আমি ওঁর ঘরে একবার যেতে চাই।”
আদিব ভেবে বলল “চল।”
ফারদিনার ঘরে তাঁরা গেল।আদিব একপাশে দাঁড়ায়। জেবুন্নেছা সুফিয়ান এর দিকে একবার, একবার আদিব এর দিকে তাকাল। সুফিয়ান ঘরটির চারপাশ দেখল। বিছানা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখল।কি খুঁজছে নিজেও যেন বুঝতে পারছে না।মাথা থেকে সব কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ পর বোধহয় নিজের নামটাও ভুলে যাবে,সে-ই উপক্রম দেখা দিচ্ছে।
আদিব জেবুন্নেছা কে ইশারা করল।জেবুন্নেছা মাথা নাড়িয়ে বোঝাল,সে বুঝেছে। এরপর কোথাও গিয়ে একটা ভাঁজ করা কাগজ উদ্ভ্রান্ত সুফিয়ান এর দিকে এগিয়ে দিল। সুফিয়ান বিছানার বালিশ উল্টাচ্ছিল।হাত থামিয়ে কাগজটার দিকে তাকাল।আদিব বলল “ফারদিনা নিশ্চয়ই তোর জন্য চিঠি রেখে গেছে,এটাই ভেবেছিলিস তো, এতক্ষণ ধরে ওটাই খুঁজতে ছিলিস।নে,পড়ে দেখ কি লেখা আছে। সকালে তোকে দেব মনে ছিল না।
সুফিয়ান এর হাতটি কাঁপছে। তাঁর রুপের সাথে যেন ভেজা চোখ, কাঁপা হাত বেমানান লাগছে।চিঠিটা খুলল।
‘প্রিয়
বাঁশিওয়ালা
তোমার বাঁশির সুরে প্রথমবারের মত ছুটে গিয়েছিলাম অন্ধকার রাতে।ভয়,আতঙ্কের মাঝেও যেন তোমার বাঁশির সুরে এক রকম সাহস তৈরি হয়েছিল সেদিন।কি ছিল তোমার বাঁশির সুরে আমি জানি না, পা’গলের মতন ছুটে গিয়েছিলাম অচেনা বাঁশিওয়ালার কাছে। তোমাকে দেখা মাত্রই ভয়ে মরা জীবনটা হঠাৎ যেন আনন্দ আর সাহসে ভরে উঠেছিল। তোমার সুর আমাকে মুগ্ধ করে, তোমার ওই মায়াভরা দৃষ্টি আমাকে মুগ্ধ করে।প্রথম বারের মত সেদিন তুমি আমাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলে, সেদিনই ধরে নিয়েছিলাম এই মানুষটি আমাকে হয়ত সারাজীবন আগলে রাখার জন্য উপযুক্ত। নিখুঁত। ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমার সরলতাকে।একজন সাধারণ বাঁশিওয়ালার মায়ায় আটকে গিয়েছিলাম। জমিদার এর মেয়ে হয়ে একজন সাধারণ কৃষক কে ভালবাসাটা অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও আমার কাছে সেই তুমিই ছিলে সেরা। কিছুটা সময়ের ব্যবধানে আমার অনূভুতি আর চেপে রাখতে পারলাম না। প্রকাশ করেই দিলাম আমি তোমাকে ভালোবাসি।তুমিও বললে আমাকে ভালোবাসো। সেদিন আমি বলেছিলাম, আমার খুব ইচ্ছে তুমি আমাকে গোলাপ দিয়ে প্রেম নিবেদন করবে। তুমিও আমাকে আশা দিয়েছিলে,করবে। কিন্তু কতটা বোকা আমি দেখ,তোমার সব কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে,আমি বিশ্বাস করেছিলাম।আশায় থেকেছি। আমি বোকা ছিলাম সুফিয়ান। তুমি বলতে না,আমি বোকা, গর্ধুব, বুদ্ধিহীন,সত্যিই আমি তাই।নয়ত তোমাকে খুঁজতে পা’গলের মতন তোমার গ্রামে ছুটে যেতাম না।সেদিন বোধহয় তোমার গ্রামে যাওয়া উচিত হয়নি।তোমার আসল রুপ আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তুমি মিথ্যা বলেছো, তুমি সাধারণ কেও নও,তুমি আমাকে মিথ্যা আশা দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছো। তোমাকে অন্য কারো সাথে দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। ভেঙ্গে পড়েছিলাম সেদিন।পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার সবটুকু ভালোবাসা দিয়েও তোমাকে পাইনি।আমার সবকিছু বিলিয়ে দিয়েও তোমাকে ধরে রাখতে পারিনি। তুমি বলেছিলে না,যে সম্পর্কের সেতু বন্ধন মিথ্যে দিয়ে তৈরি হয়,সে সম্পর্ক কোনদিন পূর্ণতা পায় না, তুমি ঠিকই বলেছো,সেদিন তোমার কথাটাই আজ বাস্তব প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায়নি। কিভাবে পাবে, তুমিতো আমাকে ভালোই-বাসনি।আমি বোকার মত ভালোবেসে আজ সত্যিই হেরে গেছি। আমি তোমাকে অভিশা’প দেব না। সবসময় চাইবো তোমার ভাল হোক, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে ভালো থেকো। আফসোস তোমার বাঁশির সুর আর শোনা হল না,আর হয়ত কোনদিন হবেও না। আমি দূরে চলে যাচ্ছি।এখানে থাকলেই তোমার কথা বেশি বেশি মনে পড়বে,তোমার স্মৃতি গুলো নাড়া দিবে।সহ্য করতে পারব না। ভালো থেকো।
ইতি
বোকা ফারদিনা।
সুফিয়ান চিঠিটা পড়তে পড়তে চোখ দুটো একদম ভিজে গিয়েছে জলে।চিঠির উপরেও কয়েক ফোঁটা চোখের জল পড়েছে।ফারদিনা সেদিন কষ্ট পেয়েছে। অনেক কষ্ট হয়েছে তাঁর।এই মুহূর্তে সুফিয়ান এর কষ্ট হচ্ছে ফারদিনার কথা ভেবে, তাঁর জন্য ফারদিনা ভেঙ্গে পড়েছিল,অজস্রে কেঁদেছিল। না জানি কতটা পা’গলের মতন ছটফট করেছিল। সুফিয়ান এর সেই ভেবে ভেতরটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
আদিব বলল “যেটা খুঁজেছিস,পেয়েছিস। এখন চলে যা।”
সুফিয়ান নিজেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সামলে বলল “ও চলে গেছে দূরে,সেটি উল্লেখ আছে। কিন্তু আজমাত কে বিয়ে করেছে সেসব তো উল্লেখ নেই।আমি কিভাবে বিশ্বাস করব,ও সত্যিই বিয়ে করেছে?
আদিব স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল “আজমাত কে বিয়ে করতে চায়নি,আমরা জোর করেছি, এরপর রাজি হয়েছে।কেননা,বিদেশ যাবে, কোথায় যাবে?কার কাছে থাকবে,মেয়ে মানুষ, সেসব ভেবেই ওঁর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছি। চিঠিটা তোকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে লিখেছিল, কিন্তু সে-ই সুযোগ আর হয়নি।তাই আমরাই রেখে দিয়েছি।”
“আজমাত কোথায় থাকে কিরগিজস্তান এর?”
“তোকে কোনভাবেই বলব না,ওর সংসার ভেঙ্গে যাক,তা চাই না।তুই ওকে সত্যিই ভালোবাসলে ওকে ভুলে গিয়ে সুখে থাকতে দে।আর এখন চলে যা।আর একটা কথা,তুই তোর কারনেই ওকে হারিয়েছিস,তাই আমাদের,ফারদিনাকে দোষারোপ করিস না। ফিরে যা।”
সুফিয়ান ঠিক কি বলবে বুঝতে পারল না।কোন জবাব যেন খুঁজে পাচ্ছে না।জবাব দেয়ার জন্য হলেও শব্দ তৈরি করতে হয়, সে-ই শব্দই যেন ভুলে যাচ্ছে। চিঠিটা পকেটে রাখল। জেবুন্নেছা সুফিয়ান এর দিকে তাকালেন। বললেন “তোমাকে দেখে বেশ ধারাল মনে হয়, তোমাকে কাঁদলে একদম সুন্দর দেখায় না।আর কেঁদো না, তুমি যেহেতু কৃষক নও, সেহেতু অনেক সুন্দরী মেয়ে পাবে।” জেবুন্নেছা অপমান সূচক কন্ঠে বললেন।”
সুফিয়ান চোয়াল শক্ত করে ওনার দিকে তেড়েই যাচ্ছিল। এরপর হঠাৎ করে থেমে গেল। পুনরায় ঘরটির দিকে তাকাল। জেবুন্নেছা আবারও বললেন সুফিয়ান কে চলে যেতে। সুফিয়ান নির্বিঘ্নে ঘরটি থেকে বের হল। বাড়িটির আনাচে কানাচে অবধি তাকাচ্ছে। প্রতিটি দেয়াল যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিঃ ছিঃ করছে।
তালুকদার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে মনে পড়ল ফারদিনার গোলাপ গাছটার কথা। শেষবারের মত একবার গাছটা দেখবে।ফারদিনা চলে গেছে চিঠিতে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা।তবুও বিষাদ মন মানছে না। যদি সবকিছু কোনভাবে মিথ্যা হয়!
ছাদের এক পাশে মশাল জ্বলছে।সুফিয়ান একটা মশাল হাতে নিয়ে গাছটির নিকট গেল।মরে গেছে গাছটি। সুফিয়ান এর বুকটা ছ্যাত করে উঠল। চোখের জল সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে।ছাদটা দেখল। এখানে বসেই একদিন ফারদিনাকে জড়িয়ে ধরেছিল।ফারদিনা সেদিন কেঁদেছিল যেন ঠিক সুফিয়ান এর বুকের মাঝখানটায় বসে।ফারদিনার চোখের জল সুফিয়ান এর সহ্য হত না। তাঁকে না পেয়ে যখন গ্রামে যায়, তাঁকে অন্য একটি মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছে,তখন ফারদিনার ঠিক কেমন লেগেছে ভেবেই সুফিয়ান এর কান্না পাচ্ছে। প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে।
ছাদের পাশে গেল। সুফিয়ান খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে ঠিক এদিকেই তাকিয়ে থাকত।আর ফারদিনা রেলিঙ এর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখত। মুহুর্ত গুলো সুফিয়ান মনে করতে পারছে না।
আদিবের উপর রাগ উঠছে।জোর করে ফারদিনাকে বিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে করছে ওঁদের শেষ করে ফেলতে। কিন্তু কোন এক বাঁধা যেন তাঁকে আটকাচ্ছে।ও নিশ্চয়ই জানবে আজমাত কোথায় থাকে?নরম গলায় নয়, কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করতে হবে। সুফিয়ান এরও দোষ আছে বলে ওঁদের সাথেও খুব একটা রাগ দেখাচ্ছে না।সে ফারদিনার সাথে মিথ্যা বলেছে। ভেবে তাঁর নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।
সুফিয়ান নিচে গেল। বৈঠকখানায় আদিব,সায়েম,আরিব, রায়ান বসে আছে। ওঁরা বেশ চুপচাপ।যতটা চুপচাপ থাকার কথা নয়। সুফিয়ান এর কোন কারণে সন্দেহ হল।কোথাও রশীদ কে দেখা গেল না। কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল “চাঁচা কোথায়?”
“শহরে গেছেন।” বলল সায়েম।রায়ান দাঁড়িয়ে সুফিয়ান এর সামনে এল।বলল “তুই ছাদে গিয়েছিস,হয়ত কিছু খুঁজতে।পেয়ে থাকলে এখন চলে যা।”
সুফিয়ান রায়ান এর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল “যদি ফারদিনা বিদেশ গিয়ে থাকে তবে, আজমাত কোথায় আমার সে-ই ঠিকানা ঠিক আগামী বারো ঘন্টার মধ্যে চাই।আর যদি তোরা কোন মিথ্যা বলে থাকিস,সেটাও আগামী বারো থেকে চব্বিশ ঘন্টার ভেতরে স্বীকার করে ফেলিস।”
“চব্বিশ কেন,এর বেশি অপেক্ষা করলেও সত্য মিথ্যা হয়ে যাবে না।আর আজমাত এর ঠিকানা আমরা দেব না।তোর ইচ্ছে হলে নিজেই খুঁজে নে।” আদিব বলল।
সুফিয়ান বলল “খুঁজে তো আমি নেবই।আর তোরা মিথ্যা বলছিস না সত্যি বলছিস সেটাও যাচাই করছি। যদি ইচ্ছা করে ফারদিনাক আমার থেকে দূরে রাখিস না! তাহলে আমার থেকে খারা’প আর কেউ হবে না। তোদের বংশ নি’র্বংশ করে ফেলব।”
সুফিয়ান এর চোখে মুখে লাভার স্পর্শ। শেষবার এর মত সবার দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বের হতেই সায়েম পেছন থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। “তোর আসল পরিচয়টা দিয়ে যা” সুফিয়ান পিছপা হয়ে পুনরায় রায়ান এর কাছে আসল।বলল “খুঁজে বের কর।”
রায়ান এর হঠাৎ চোখ পড়ল সুফিয়ান এর বা হাতের পেছনের স্থানের দিকে।চামড়া খোদাই করে স্পষ্ট করে কিছু লেখা।রায়ান আ’ক্রমণ এর মত সুফিয়ান এর হাতটি ধরে লেখাটা দেখল। সেখানে ইংরেজিতে ছোট্ট করে লেখা -I hate British-
The Silent Manor part 42
সুফিয়ান হাতটি ছিটকে সরিয়ে নিল।রায়ান জিজ্ঞেস করল “তুই ব্রিটিশদের ঘৃণা করিস কেন?
সুফিয়ান আঙুল তুলে বলল “সে-ই জাস্টিফিকেশন আমি তোকে দেব না।” এরপর দ্রুত পায়ে চলে গেল।
রায়ান ঘুরে বাকি ভাইদের দিকে তাকাল।সায়েম বলল “ও আমাদের এত সহজে ছাড়বে না।কি করব এখন আমরা? ওকে বাঘের খাবার বানাব?
“আগে ওর সঠিক পরিচয় বের কর। তারপর দেখা যাক কি করা যায়”–
