The Silent Manor part 42
Dayna Imrose lucky
রাত এগারোটার দিকে আহির -চৌধুরী নিবাসন এর চৌহদ্দি পেরিয়ে অশ্ব নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।এত রাতে কেউ জেগে নেই বলেই ধারণা ছিল। কিন্তু তাঁর ধারণা ভুল।ঘরের ঠিক ন’দশ হাত পেরিয়ে পশ্চিম দিকটায় আমজাদ চৌধুরী ছড়ি ঢুকে ঢুকে পায়চারি করছেন।এক হাত তাঁর পেছনে। দৃষ্টি তাঁর মাটিতে। চোখের ছাউনী আড়ালে যেন তাঁর বিস্ময়ের ছাপ।আহির এর চোখে প্রথমেই সে আসল। এরপর অশ্বশালার দিকে এগিয়ে গেল।অশ্ব রেখে আমজাদ এর কাছে হাজির হয়। আমজাদ কে লক্ষ্য করে বলল “আপনি এত রাতে বাইরে! ঘুমাবেন না?” এটা গোয়েন্দাদের প্রশ্ন না,সন্দেহ ঠিক বলা যাচ্ছে না। আমজাদ আহির এর কন্ঠ পেল। তাঁর থেকে পিঠ ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকায়,পেছন ঘুরে দেখল আহির কে। তিনি ভীষণ গোঁয়ার্তুমির সাথে জবাব দিল “হাকিম বলেছে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর হাঁটাচলা করতে।এতে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়,রাতে ঘুম ভালো হয়।”
“আপনাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে!”
আমজাদ প্রথম প্রশ্নের সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে-ছিলেন।এখন পায়চারি শুরু করলেন। পায়চারি করতে করতে বললেন “আমার জীবনে কোন চিন্তা নেই।সুখ ব্যতীত আমার জীবনে কিছুই নেই।” থেমে আবার বললেন “তোমার আমাকে কেন মনে হল,আমি চিন্তিত?
আহির মুখে হাঁসির রেখা টেনে বলল “আমার তো আপনাকে দেখে এমনটি মনে হয়েছে,তাই জিজ্ঞেস করলাম। আপনি বিরক্ত হলে আমি দুঃখিত।”
আমজাদ প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল “তোমার তদন্ত কতদূর এগোলো?
আহির স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল “আসামি-কে শিগগিরই ধরে ফেলব।অনেক তথ্য ইতিমধ্যে সংগ্রহ করে ফেলেছি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“যাও, ভেতরে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করো, বিশ্রাম নাও।”
আহির আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গেলেই সামনে পড়ে বুলবুল।আহির বুলবুল কে বলল “ রাফিদ,মীর ঘরে আছে?
“আছে,তবে সাথে একজন লোক আছে, বৃদ্ধা। কেমন যেন চেহারা আজ এসেছে।” বুলবুল দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি পড়তে যিনি বলেছেন,নিশ্চয়ই তাঁর কথা বলেছে বলে আহির নিশ্চিত হল।গলা পরিষ্কার করে বলল “আমাদের জন্য চা পাঠাও”
“এত রাতে চা?’ বুলবুল যেন অতিরিক্ত প্রশ্ন করল।
“আমার কাজই হচ্ছে রাত জেগে তথ্য জোগাড় করা। ঘুমোলে হবে না,আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।” বলে আহির দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল।যেন গভীর ভাবনায় ডুবে গেল।
“আমি চা নিয়ে আসছি।আর রাতের খাবারটাও আপনারা খেয়ে নিয়েন।আমি টেবিলে রেখে দিচ্ছি।”
“আপনারা বলতে!আর কে খায়নি?
“সরদার,মীর বাবু, রাফিদ বাবু,আর ওই লোকটা”
আমজাদ খায়নি।কথাটা শুনে বিস্মিত হল আহির।কপাল কিঞ্চিত কুঁচকে ফেলল। আমজাদ, রাতে খায়নি,তবে বলল কেন খেয়েছে? রাতে খাওয়া দাওয়ার পর হাঁটাচলা করলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়। মিথ্যা বলেছে!আহির খানিকটা বিভ্রান্তী নিয়ে উপরে চলে গেল।
তাঁর ঘরের দরজা আগে থেকেই খোলা।ভেতর থেকে সিগারেট এর ধোঁয়া আসছিল। গন্ধ আসছিল।আহির ভেতরে প্রবেশ করল।মীর ও রাফিদ পাশের আড্ডা ঘরে বসে আছে।সাথে অচেনা সে-ই অশ্বধারী লোকটি।মীর এর হাতে সিগারেট।সিগারেট প্রায়ই শেষ পর্যায়ে।পরনে শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি সাদা রঙের। সাথে কালো প্যান্ট।যেন শীত পালিয়েছে তাঁর থেকে।অশ্বধারী লোকটি গম্ভীর মুখে বসে আছেন। রাফিদ কিছু বলছিল।
মীর আহির এর দিকে তাকিয়ে বলল “অবশেষে আমাদের গোয়েন্দা বাবু,প্রেম গোয়েন্দা সেরে এসেছে।”
আহির ক্লান্তি নিয়ে সোফাতে বসল। লম্বা নিঃশ্বাস এর সাথে বলল “প্রেম গোয়েন্দা করেছি, তবে সেটা সুফিয়ান এবং ফারদিনার। গৌরীদের বাড়ি গিয়ে ভালোই হয়েছে। ওঁর মা দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির লেখক সুফিয়ান হায়দার এর সম্পর্কে জানে। তাঁদের শেষ পরিণতি, তালুকদার বংশের পতন কিভাবে হয়েছিল? একজন আছেন, যিনি আমাদের সমস্ত ঘটনা বলতে পারবে বলে ওনার ধারনা।
মীর এবং রাফিদ এ কথা শুনে একে অপরের সাথে চোখ আলাপ করল। অচেনা লোকটি চোখ তুলে এবার আহির এর দিকে তাকালেন।আহির এতক্ষণ পড়ে তাঁর দিকে চাইল। শ্যামবর্ণের গোলাকার মুখমণ্ডলের চামড়া প্রায়ই অনেকটা কুঁচকে গেছে তাঁর। আগে কখনো তাঁকে দেখেছে বলে নিশ্চিত হতে পারল না।তিনি বললেন “তাহলে দেরি কেন, এখুনি বেরিয়ে পরো।”
মীর বলল “কে সে? কোথায় থাকে? কোথায় গেলে পাব তাকে?
আহির বলল “ওনার নাম সেলিম।বনজুরী এলাকায় তাঁর বসবাস।এখান থেকে উত্তরে প্রায়ই ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বনজুরী।গৌরীর মা একজন হাকিম এর উদ্দেশ্যে কিছু বছর আগে গেলে তাঁর হদিস পান। এবং উনি সব জানেন বলে সে নিশ্চিত।”
“তাহলে আমরা কবে যাব বনজুরীতে?রাফিদ জিজ্ঞেস করল।
“আগামীকাল।দেরি করে লাভ নেই।” বলল আহির।
মীর বলল “সেটাই ভালো হবে। অবশেষে হয়ত জানতে পারব তাঁদের শেষ পরিণতি। ভাবলেই আমার শরীর কেন যেন ঝিম মেরে উঠছে। তবে কোন কারণে আনন্দিতও হই।”
“কোন কারণে?” লোকটি জিজ্ঞেস করল।
“হয়ত, ভালো কিছুও ঘটেছিল। আমার মন বলছে।”
“মন তো অনেক কিছুই বলে,তাই কি হয়?” বলে লোকটি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বারান্দায় গিয়ে আকাশপথে চেয়ে রইল।
আহির তাঁকে লক্ষ্য করে বলল “আপনার নামটা বললে ভালো হতো,নয় আপনাকে কি বলে ডাকব!”
“পড়ে জানবে। আপাতত চাঁচা ডাকতে পারো।”
আহির আর কিছু বলল না। রাফিদ বলল “যত দ্রুত সম্ভব সুফিয়ান এবং ফারদিনার খোঁজ, এরপর মিলনকে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে খু’ন করেছে, ওঁর খোঁজ।এই সমস্যা গুলো সমাধান হওয়ার পর,মায়ার বিয়ের আয়োজন করতে হবে। একজন মাওলানা আসবেন আগামীকাল।বাবা তাঁকে সাথে নিয়ে ছেলে পক্ষের সাথে কথা বলবেন। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করবেন।”
আহির বলল “তোরা হয়ত সংস্কার খুব ভালো মানিস।”
“বাবা সংস্কার মেনে চলেন।” রাফিদ কথাটি বলার পরক্ষনেই অচেনা লোকটি হালকা ঘাড় তাঁদের দিকে ঘুরিয়ে নিচু স্বরে রহস্যময় হাঁসি দিল।
সকালটা আজ নিস্তব্ধ, অথচ চৌধুরী বাড়ির নিস্তব্ধতায় আজ যেন এক ধরণের অস্থিরতা লুকিয়ে আছে। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। কড়িকাঠের ফাঁক দিয়ে সোনালি রেখা এসে উঠোনের মাটিতে পড়ছে। পাকা তিনতলা বাড়ির বারান্দা জুড়ে শিশিরভেজা বাতাসের গন্ধ,মাটির সঙ্গে মিলেমিশে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা তৈরি করেছে।
এই শান্ত সকালের মধ্যেও আজ যেন কিছু একটা অভাব, কিছু একটা ভার। উঠোনের মাঝ-খানের পুরনো গাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে, আর সেই ছায়াতেই নীরবে বসে আছেন আমজাদ। তাঁর গায়ে সাদামাটা পাঞ্জাবি, চোখ দুটি অন্যমনস্ক। সকালবেলা সাধারণত অনুচারীদের হাঁকডাক, রান্নাঘর থেকে হাঁড়ির শব্দ, গৃহস্থালির নিত্যচঞ্চলতা সবই থাকে। কিন্তু আজ সবকিছুই যেন বিষণ্ন সুরে ঢেকে গেছে।
আমজাদের মুখে কথা নেই। দৃষ্টি দূরের ফাঁকা আকাশে স্থির ছিল। যেন বহুদিনের কোনো গোপন যন্ত্রণা এই স্নিগ্ধ সকালে চেপে বসেছে।অনুচারীরা পাশ দিয়ে গেলেও কেউ সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারে না কি কারণে এমন উদাসী আজ সরদার?
হালকা বাতাস একবার বইতেই উঠোনের শামিয়ানা দুলে ওঠে, আর আমজাদের পাতা-নড়া দৃষ্টি যেন একটি দীর্ঘশ্বাস হয়ে ভেসে যায়। বাড়ির প্রতিটি প্রান্তে আজ তাঁর এই অজানা উদ্বেগের ছায়া পড়েছে,তা কেউ না জানলেও শালুকও অনুভব করছে, এই সকাল অন্য দিনের মতো নয়।
গতকাল নাম না জানা অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা হয়েছিল আমজাদ এর।মীর এবং রাফিদ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাঁর সাথে। বলেছিল,দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির সে-ই ঘটনা ঘিরে তাঁর সাথে পরিচয়। আমজাদ আগে থেকেই গল্প, উপন্যাসের কাহিনী বিশ্বাস করেন না। গতকাল এ বিষয়ে এড়িয়ে গিয়ে বলেন “তোরা বাঁচ্চামি করছিস কর,এসবে আমায় জরাস না।” এরপর লোকটির সাথে আর কথা হয়নি।লোকটি দাঁড়িয়ে আছেন বাগানের একটি ফল গাছের সামনে। লক্ষ্য গাছের দিকে থাকলেও ভাবনা অন্যকিছু। আমজাদ এমনটি ভাবছেন।
আমজাদ এর সামনে বেতের চেয়ার।এক কাপ চা রাখা। খাচ্ছেন না।শালুক দরজার সামনে এসে ক’বার করে দেখে গেছেন আমজাদ কে। তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখে শালুক চিন্তিত হল। তিনি পুনরায় এসে দাড়িয়ে আছে সদর দরজার সামনে। দরজার চাপ থেকে দেখছেন আমজাদ কে।কেউ হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে গেলে অবশ্যই তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত,কি হয়েছে? শালুক জিজ্ঞেস করবেন ভেবে আমজাদ এর দিকে এগিয়ে আসেন। তাঁর বা পাশে দাঁড়িয়ে আদবের সাথে বললেন “শুনছেন!”
আমজাদ শালুক এর প্রথম ডাকেই দৃষ্টি ঘুরালেন। তাঁর দিকে তাকালেন। বললেন “কিছু বলবে?
“গতকাল থেকে দেখছি আপনি হঠাৎ চুপচাপ হয়ে আছেন। কিছু হয়েছে?মিলন কে নিয়ে ভাবছেন না তো?‘যা হওয়ার হয়েছে,মিলন এর মৃ’ত্যু হয়ত ওভাবে লেখা ছিল,অন্যর হাতে।তবে খু’নি যেই হোক,ওকে শিগগিরই আহির শনাক্ত করে ফেলবে।আমাদের কারখানার যতটুকু দুর্নাম ছড়িয়েছে,সুনাম আবার ফিরে আসবে।”
আমজাদ এর কোন জবাবের আশা যেন শালুক করলেন না।নিজে প্রশ্ন করে নিজেই জবাব দিলেন। আমজাদ শালুক এর দিকে কটমট চোখে তাকালেন।শালুক দৃষ্টি নত করে ফেলল।আমজাদ বললেন “মহিলাদের বুদ্ধি বেশি। অকাজের বুদ্ধি।আমি যা ভাবছি, সেসবের সাথে তোমার ভাবনার কোন অংশ মিলেনি।”
“তাহলে বলুন,কি হয়েছে আপনার? আপনাকে চিন্তিত দেখতে ভালো লাগে না, বলুন দয়াকরে” শালুক করুন কন্ঠে যেন অনুরোধ করল।
আমজাদ এবার বিপাকে পড়ল।শালুক তাঁর দিকে এগিয়ে এল। আমজাদ এর কাঁধে হাত রাখল। আমজাদ হঠাৎ শালুক এর স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠলেন। নিবিড় কন্ঠে বললেন “পাশে বসো” শালুক বসলেন বেশ আগ্রহ নিয়ে।সে আমজাদ এর চিন্তার কারণ জানার জন্য যেন ব্যাকুল হলেন।
আমজাদ বললেন “আমি গত ক’দিন ধরে বাজে স্বপ্ন দেখছি।” বলে মুখের অভিব্যক্তি অন্ধকার বানিয়ে ফেললেন।
“কি দেখেছেন?
“আমি দেখলাম,মায়া বিয়ের বেনারশির বদলে বিধবা শাড়ি পড়েছে।” আমজাদ এর মুখে কথাটি শুনে শালুক আতঙ্ক চোখে হকচকিয়ে উঠলেন। বললেন “তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না।আমিও গতরাতে একই স্বপ্ন দেখেছি। তখন থেকেই মনটা বিষিয়ে আছে।”
আমজাদ নিজের অভিব্যক্তি পুনরায় পাল্টালেন। শালুক কে চিন্তিত দেখতে তাঁরও ভাল লাগে না।তাকে শান্তনা দিয়ে বললেন “শোনো,আজ মায়ার বিয়ে নিয়ে মাওলানা গিয়াস উদ্দিন হাফিজ এর সাথে আলোচনা করব।তাঁকে স্বপ্নের বিষয়টি জানাব।উনি আশাকরি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিবেন।আর ভালো কিছু হবে।শালুক আর কিছু বললেন না।চোখ ক্লান্ত করে মাটিতে চাইলেন।
বনজুরি গ্রাম নিস্তব্ধ। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো নামতে শুরু করেছে, কিন্তু কোথাও কোনো হৈচৈ নেই। বাতাস যেন থমকে আছে, তালগাছের পাতা নড়ে না, দূরের বাঁশবাগানের ভেতরেও কোনো শব্দ নেই। মাঝে-সাজে বনের গভীর থেকে ভেসে আসে এক অচেনা পাখির ডাক।মাটির পথটা ফাঁকা, ধুলো চুপচাপ পড়ে আছে।মাটির ঘরগুলো দরজা আধখোলা রেখে যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে কিসের যেন। ছোট নদীর ধারে জলের উপর সোনালি আলো পড়ে আছে, পানির ঢেউও অদ্ভুতভাবে স্থির।গ্রামের মানুষ কেউ বাইরে নেই,কেউ মাঠে, কেউ উঠোনে, কিন্তু সবাই যেন এক অজানা নীরবতাকে সম্মান জানিয়ে গলা নামিয়ে রেখেছে।বাতাসের মধ্যে হালকা ভেজা গন্ধ, আর নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে মনে হয়, বনজুরি কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রেখেছে।আজ সে-ই গোপন খোলসা যেন, খুলে যাবে।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে,আহির,মীর এবং রাফিদ বনজুরি মরুভূমির মত পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছে।আজ যেন যেভাবে হোক তাঁদের তালুকদার বংশের পতনের মূল কারণ, সুফিয়ান ফারদিনার শেষ পরিণতি জানতেই হবে।
চারদিক বেশ নিস্তব্ধ,সুনসান।কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।আহির দূর দূরান্তে চোখ মেলাল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।মীর এদিক ওদিক তাকাল।রাফিদ তখন হঠাৎ পেছনের দিকে তাকাল। একজন আধ বয়সী মহিলা আসছেন।হাতে বাজারের ব্যাগ।খুব দ্রুত পায়ে হেঁটে বোধহয় বাড়ি ফিরছেন।
রাফিদ বলল “কেউ আসছে এইদিকে।” আহির অশ্বের পৃষ্ঠা থেকে নেমে দাঁড়াল।অচেনা মহিলাটির সম্মুখে দাঁড়ায়। প্রথম একটি শব্দে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিল। ‘খালা’
উনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনজন অশ্বধারীকে দেখে প্রথমত অদ্ভুত রকম ভয় পেলেন।বনজুরি গ্রামে অশ্বধারীদের দেখে অবাক হলেন।এ গ্রামে অশ্ব চালক কেউ নেই।উনি বললেন “তোমরা কারা,এই গ্রামে নতুন মনে হইতেছে”?
আহির এবং মীর একে অপরের দিকে তাকিয়ে আহির বলল “আচ্ছা খালা,এই গ্রামে সেলিম নামে কেউ আছেন?’
মহিলাটি ভাবলেন বেশ কিছুক্ষণ।এরপর নীরব কন্ঠে জবাব দিলেন “হুঁ,আছে একজন।ক্যান?
“ওনার সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে” বলল মীর।
মহিলাটি এবার ভাবলেশহীন ভাবে বললেন “তোমাদের কি কোন সমস্যা আছে?”
“সমস্যা মানে? রাফিদ ওনার দিকে একটু এগিয়ে গেল।
“কারণ, উনিতো একজন পন্ডিত আছিল।”
বাক্যটি শুনে পুনরায় তাঁরা চাওয়াচাওয়ি করল।আহির ওনার রেশ টেনে মিথ্যা বলল “হ্যাঁ,ঠিক ধরেছেন, সমস্যা আছে,আমার বন্ধুর।” বলে রাফিদ কে লক্ষ্য করে দেখাল। রাফিদ দু কোমরে হাত দিয়ে কিছু বলতে চাইল।আবার থেমে গেল।
“কোথায় পাওয়া যাবে তাঁকে? মীর জিজ্ঞেস করল।
“আমার লগে আহো” বলে হাঁটা শুরু করলেন তিনি।তাঁরা তিনজনও ওনাকে অনুসরণ করে অশ্ব নিয়ে ধীর গতিতে চলতে লাগল।
সেলিম এর বাড়িতে তাঁরা উপস্থিত হয়।মাটির স্যাঁতস্যাঁতে ঘর।দুটো গরু বাঁধা ঘরের সামনে।ঘরটির পেছনের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে।সিদ্ধ ভাতের গন্ধ ভেসে আসছে।সন্ধ্যার পরপর সময়টাতে রান্নার বিষয়টি অস্বাভাবিক হলেও কেউ সারাদিনের কাজে ব্যস্ত থাকলে সন্ধ্যা অথবা রাত তাঁর জন্য উপযুক্ত সময়।
অচেনা মহিলাটি সামনের দিকের ঘরটি দেখিয়ে বললেন “সেলিম ভাই ঘরেই আছেন।” বলে সরু কন্ঠে ডাকলেন “সেলিম ভাই, আপনার কাছে ভিনদেশ থেইকা লোক আইছে,বাইরে আহেন।”
সবাই অপেক্ষা করছে।ঘর থেকে সেলিম এর বের হওয়ার অপেক্ষায়। অচেনা মহিলাটি বললেন “তোমরা অপেক্ষা করো,উনি হয়ত কাম করতেছে,অহনি আইবো।” বলে তিনি চলে যান তাঁর পথে।
ঘর থেকে এখন পর্যন্ত কেউ বের হয়নি।অন্যদিকে সন্ধ্যার উল্ককিতর আঁধারে চারদিক কিছুটা ঝাপসা, খানিকটা কুয়াশায় পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।সাথে শৈত্যপ্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। বনজুরি গ্রামে শীত তান্ডব বরাবরই তীব্র। তাৎক্ষণিক গরুর গলা থেকে ঘন্টার টুংটাং শব্দ আসল। শব্দ পেয়ে ঘর থেকে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে আসলেন।লন্ঠনের আলোয় চোখ দুটো লাল টকটকে দেখাচ্ছে।চামড়া ঝুলে গেছে। মাথা সহ পুরো শরীর চাদরে ঢাকা। ওনার চোখ পড়ল মীর এর দিকে। তাঁর গলার রত্নখচিত পেনডেন্ট লকেটটি লন্ঠন এর আলোয় চিকচিক করছে।ঘুরেঘুরে তাঁদের তিনজন এর দিকে তাকালেন। এরপর লন্ঠন হাতে চলে গেলেন গরুর দিকে। কিছু খড়,জল, ওঁদের ঠিকঠাক করে খেতে দিল। বিড়বিড় করে কিছু বলছিল।যা আহির-তাদের কানে আসল না।সেলিম এর আচরণ অদ্ভুত মনে হল।
সেলিম গরুর ঘর থেকে বেরিয়ে আহির-দের ভ্রুক্ষেপ না করেই ঘরের ভেতরে চলে যেতে চাইল।আহির তাঁকে লক্ষ্য করে বলল “শুনুন চাঁচা, আপনার সাথেই দেখা করতে আসছিলাম। আমাদের দেখেও না দেখার ভান ধরে চলে যাচ্ছেন!”সেলিম থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল।চোখ তুলে শুধু ঘাড় ও মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন তাঁদের দিকে।তিনটি মুখ তাঁর কাছে যেন ভয়াবহ মনে হচ্ছে।
তাঁদের গ্রাহ্য না করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই আহির এগিয়ে গেল ওনার সদর দরজার সামনে। দরজায় হাত দিয়ে আহির কিছুটা রেগে বলল “আপনি কি আমাদের কথা শুনছেন না? না কি এড়িয়ে যাচ্ছেন?”
সেলিম বললেন “কি চাই তোমাদের?
“কি চাই,সেটা শুনতে হলে নিশ্চয়ই আপনাকে আমাদের সাথে স্থির হয়ে কথা বলা দরকার।” আহির বলল ক্ষিপ্ত কন্ঠে।সেলিম চোখ গুলো বড় বড় করে আহির এর দিকে চেয়ে বলল “বলো আমি শুনছি।” সেলিম উদ্ভ্রান্ত কন্ঠে বলল।
“আমরা রশীদ তালুকদার এর বংশ নিয়ে কথা বলতে চাই।সুফিয়ান ফারদিনার কি হয়েছিল, সে-ই নিয়ে কথা বলতে চাই।আমরা সংবাদ পেয়েই এসেছি, আপনি এই বিষয়ে সব জানেন।তাই কিছু না লুকিয়ে সবটা বলুন।” সেলিম এর হাতটি হঠাৎ করে কেঁপে উঠল।লন্ঠন নড়ছে অস্বাভাবিক ভাবে।সাথে চোখ দুটো মারবেল এর মত বড় হয়ে গেছে।
আহির দরজা থেকে হাত সরিয়ে ফেলল।মীর এবং রাফিদ ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সেলিম কে কাঁপতে দেখে মীর বলল “আপনি ঠিক আছেন?”
সেলিম কোন কথা না বলে শান্ত হল। নিজেকে সামলে বললেন “ভেতরে এসে বস।”
সেলিম এর চুলায় ভাত ছিল। প্রায়ই ভাত পরিপূর্ণ সিদ্ধ হয়েছে। ভাতটা তোলার কথা বলে রান্নাঘরে আসল।আহির আড়ালে নজর রাখল ওনার উপর। যদি পালিয়ে যায়? কাউকে প্রমাণ ব্যতীত কোন কিছুর জন্য মিথ্যা দোষ দেয়া, সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। কিন্তু একজন ডিটেকটিভ এর মন এখন সর্বদা সন্দেহে ভরপুর থাকে যে।
সেলিম ভাত তুলে কাঁপা কাঁপা শরীরে ঘরের ভেতরে এসে বসলেন।পিঁড়িতে।আহির,মীর,রাফিদ একটা পাটিতে বসে আছে।আহির বলল “এবার বলুন।কি হয়েছিল সেদিন? তালুকদার বংশের পতনের কারণ? সুফিয়ান কোথায়? তাঁর লেখা দ্য সাইলেন্ট ম্যানর’ বইটি অসম্পূর্ণ কেন?ফারদিনা সত্যটা যাচাই না করেই চলে গিয়েছিল কেন?” আহির সব প্রশ্নের ঝামেলা যেন একসাথে শেষ করতে চাইল।
সেলিম এর চোখে অজস্র জল ভেসে উঠেছে।লন্ঠন এর আলোয় চোখ গুলো চিকচিক করছে।স্পষ্ট ভাবে সেই জল ফুটে উঠেছে।মীর বলল “আপনি কাঁদছেন কেন?
“ওই কথা যার মনে পড়ে সে-ই কাঁদে।তোমরা জানলে তোমরাও কাঁদবে।”
“কি হয়েছিল বলুন? রাফিদ তাড়া দিল।
“ফারদিনা পালিয়ে যায়নি।” বললেন সেলিম।
“তাহলে কোথায় ছিল? বলল আহির।
লন্ঠনের সোনালী আলোয় অতিতের সে-ই ঘটনা যেন ভেসে উঠল সেলিমের কন্ঠের সাথে তাঁদের সামনে।
সুফিয়ান লেখা থামিয়ে সে-ই কখন থেকেই পা’গলের মতন সিগারেট টানছে বারান্দায় বসে।সোলেমান পাশে বসেই চোখের সামনে একজন সুস্থ সবল মানুষকে যেন পা’গল হতে দেখছে। ‘ফারদিনা আমার সত্যটা না জেনেই আমায় ছেড়ে চলে গেছে,এখন তোরাও আমাকে হারিয়ে ফেলবি।’ কথাটি সোলেমান এর আশেপাশে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।ওর ভেতরটা তখন কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। সুফিয়ান এর হাবভাব হঠাৎ করে যেন হিং’স্র পশু’র মত হয়ে গিয়েছে। শব্দে প্রকাশ না পেলেও তাঁর ভ’য়ংকর চোখ গুলো,পুরো শরীরের অভিব্যক্তি তা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। সোলেমান ঢোক গিলে শান্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল “এভাবে বসে থাকবেন?এত সিগারেট টানবেন না। আপনাকে পা’গল পা’গল লাগছে।”
“সুস্থ থেকে কি হবে? যাকে ভালোবেসেছি তাঁকেই পায়নি, ভালোবাসার মানুষ কে নিজের করে না পেলে মানুষ অর্ধেক পা’গল হয়।আর যদি ভুল বুঝে স্বপ্নের প্রেয়সী দূরে চলে যায়,তখন মানুষ পুরোপুরি পা’গল হয়ে যায়।” থেমে পা’গের মতন চোখের জল মিশ্রিত হাঁসি এনে আবার বলল “
জানিস সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস কি?যখন নিজের চিৎকারও নিজের কানে পৌঁছায় না, তখন মনে হয়,বহু আগেই মরে গেছি, শুধু দেহটা এখন পড়ে আছে।” বলে কেঁদে উঠল সুফিয়ান।
সোলেমান শান্তনা স্বরূপ বলল “এভাবে কাঁদবেন না, আপনার মত শক্তপোক্ত মানুষটা এভাবে দুর্বল হয়ে একজন নারীর জন্য কান্নাকাটি করছে,মানা যায় না। শান্ত হন।”
“শান্ত নদীর মতই শান্ত ছিলাম।আজ ফারদিনা আমাকে উত্তাল করে রেখে গেছে।”
“আপনি কি নিশ্চিত সে আপনাকে সামান্য কারণেই সন্দেহ করে চলে যেতে পারে?”
সুফিয়ান হঠাৎ করে মর্মা’ন্তিক চোখে সোলেমান এর দিকে দেখল। সোলেমান আবার বলল “জাহাজ বন্ধ, তাহলে আপনি তাঁর ভাইদের কথা মেনে নিয়ে, নিজেকে ঠুকরে ঠুকরে মারছেন কেন? সত্যটা আমরা যাচাই করতে পারি।”
“কোন সত্য? সুফিয়ান যেন অবুঝ এর মত প্রশ্ন করল।
“আমার মনে হয় সে অভিমান করে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে আছে। চলুন আমরা কৌশলে খুঁজে দেখি।”
সুফিয়ান সোলেমান এর কথাটা মেনে নিল।সে এবার গভীর ভাবনায় ডুবে গেল।আজ তালুকদার বাড়ি যাওয়ার পর থেকে কে কি বলেছে, সবকিছু শুরু থেকে ভাবতে শুরু করল।সেকেন্ড কয়েক পর চোখ মেলে তাকাল। সোলেমান কে বলল “তুই ঠিকই বলেছিস, তবে লুকিয়ে লুকিয়ে নয়,আজ ওদের সরাসরি সামনে যাব।” বলে সিগারেটটা ফেলে দিল। বারান্দা থেকে উঠে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।সদর দরজাটা বন্ধ করে দিল।
মিনিট দশেক পর লাল মিয়া সহ সবাই বদরু হাবলু সুফিয়ান এর বাড়িতে উপস্থিত হয়।ঠিক সেই মুহূর্তে সুফিয়ান দরজাটা খুলে ঘর থেকে বের হয়।তবে অন্য রুপে।তার গায়ে গাঢ় কালো কোট, কালো বোতামে সন্ধ্যার আলো চিকচিক করে উঠছে। বাঁ কাঁধে কালো পশমের শালটা ঝুলে আছে, আর কোমরে প্রাচীন স্টাইলে বাধা তলোয়ারখানা তাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলেছে। মুখে পাতলা দাড়ি,খুব যত্নে ছাঁটা, আর চোখ দুটো যেন ইস্পাতের মতো ধারালো হয়ে উঠেছে। সেই চোখে এমন ঠাণ্ডা আত্মবিশ্বাস, যেন পুরো আলিমনগর তার নোখে আটকে আছে।
কিন্তু আজ সোলেমান দেখল ভিন্ন কিছু।লালমিয়ার ঠোঁটের কোণে অচেনা এক হাসি, চোখে যেন তীব্র আশ্চর্যের ঝিলিক।এই মানুষটা কি সত্যিই শুধু একজন কৃষক? নাকি তার ভিতরে লুকিয়ে আছে আরেক রূপ?
সোলেমান থমকে গেল।মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে গেল।আজকে সে যে মানুষটিকে দেখছে, সে আগের সেই নম্র সুফিয়ান হায়দার নয়। তার ভেতর কিছু বদলে গেছে।আর সেই পরিবর্তিত রূপ দেখে সোলেমান অবাক হয়ে শুধু ফিসফিস করে বলল
The Silent Manor part 41
“এ এমন কেমন রূপ আপনার? শহরের বাবুদের মত লাগতেছে”!
সুফিয়ান ফিসফিসিয়ে বলা বাক্যটি শুনে ফেলল। তলোয়ারটা হাতে নিয়ে বলল “আমার আসল রুপ ওঁরা দেখবে।”
