Home The Silent Manor The Silent Manor part 44

The Silent Manor part 44

The Silent Manor part 44
Dayna Imrose lucky

ভোর ঠিক ছ’টা।কুয়াশায় দূর দূরান্তের পথ দেখাচ্ছে না।রাঙা সেই কখন থেকে চুপচাপ এক দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে।মনে হচ্ছে, সুফিয়ান এর ভেতরের চাপা কষ্ট ও টের পাচ্ছে।অথচ প্রকাশ করতে পারছে না।সুফিয়ান বারান্দায় বসে আছে।তাঁর সামনে সিগারেট এর শেষ নেই।সব অর্ধেক খাওয়ার অংশ। সোলেমান বদরু, হাবলু, লাল মিয়া সবাই উঠোনে ছিটিয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।একটু পর পর সুফিয়ান এর দিকে চোখ তুলে দেখছে। হাঁসিখুশি মানুষটি পরিপূর্ণ চুপ হয়ে গেছে।সারারাত পাগলের মতন এদিক সেদিক ছুঁটেছে।পা’গলের থেকেও বেশি এলোমেলো হয়ে গেছে সে।পা’গল না হয় খানিক সময়ের পর স্থির হয়।সুফিয়ান যেন স্থির হতে পারছে না।

ভোরের নিস্তব্ধতাকে এখনো যেন কেউ ছুঁয়ে দেখার সাহস পাচ্ছে না। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলো আলো পায়নি এখনও, ঠান্ডা হয়ে ঝিমিয়ে আছে। বারান্দার কোণায় বসে সুফিয়ান ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলছে।কিন্তু সেই নিঃশ্বাস যেন বুকের কোথাও আটকে যাচ্ছে। চোখের সামনে ফারদিনার মুখটি বারবার ভেসে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।ঠিক যেমন করে তার জীবনের ভরসাগুলো মিলিয়ে গেল গতরাতেই।সব যেন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সারারাত দৌড়ে বেড়ানো মানুষটার চোখে এখন কোনো দৌড় নেই,শুধু শূন্যতা।আঙুলের ফাঁকে এখনো একটা সিগারেট জ্বলছে, কিন্তু নিভে যাওয়ার আগে আগুনটা যেন তাকে জ্বালিয়ে শেষ করতে চাইছে। হাঁটুর উপর কনুই রেখে সে তাকিয়ে আছে,কোথাও নয়,কারো দিকে নয়,একটা অদৃশ্য দেয়ালের দিকে,যেটা হঠাৎ করেই তার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে।দেয়ালের অপরপ্রান্তে যেন ফারদিনা।সে এখনো নিশ্চিত নয়,ওপারে ফারদিনা অন্য কারো, না এখনো তাঁর হয়েই আছে!

সোলেমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বারান্দার পাটাতনে বসে পড়ল। কিছু বলতে চাইলেও গলা শুকিয়ে গেছে ওর। শুধু অনুভব করছে,সুফিয়ান আর আগের মানুষটা নেই।হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল, সবাইকে হাঁসিয়ে রাখার মানুষটা যেন রাতারাতি বয়স্ক হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। তার ভিতরের ভাঙচুরটা এতটাই নিঃশব্দে হয়েছে,যেন কেউ শুনতেই পায়নি।
উঠোনের ওপারে লাল মিয়া বদরুদের গলা আটকে আছে। কেউ কথা বলছে না।বাতাসে শুধু একটা অচেনা ভার,যা চাপা শব্দে বলে দিচ্ছে, এ বাড়ির কর্তা যেন আজ ভালো নেই।

হঠাৎ সুফিয়ান মুঠো শক্ত করে ধরে ফেলল। তার আঙুলের নখ নিজের তালুতে গেঁথে গেল, কিন্তু সে টের পেল না। চোখদুটো লাল হয়ে আছে।গতকাল এতটুকু ঘুমোয়নি যেন,ঘুম তার সাথে চিরদিনের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল,আর সেই মুহূর্তে মনে হলো, একজন মানুষ নয়,একটা পাহাড় ভেঙে পড়ছে নিঃশব্দে।আর সেই পাহাড়টা সে।কেউ কাছে যেতে পারছে না।কারণ তার নীরবতার চারপাশে তৈরি হয়েছে অদৃশ্য কাঁটা তারের বেড়া,যেখানে কোনো কথা পৌঁছায় না, কোনো সান্ত্বনা পৌঁছাচ্ছে না।
সুফিয়ান শুধু একবার চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল।মেঘে ঢাকা ভোর তার দিকে কোনো উত্তর ফেরত দিলো না।সেই মুহূর্তে মনে হলো,

যেন পৃথিবীটা একেবারে থেমে গেছে,কিন্তু তার ভেতরের ঝড়টা থামছে না।একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে মস্তিষ্কের ভাঁজে।ফারদিনা কোথায়?সে সত্যিই চলে গেছে?অন্যর হাত ধরে, তাঁর ভালোবাসা এতটা হালকা ছিল!যা কিনা অল্প বাতাসেই উড়ে গেল।
সুফিয়ান এর নাক চোখ লাল হয়ে উঠল আবারও।চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।হাত দিয়ে জল মুছে ফেলতে ফেলতে আবার পড়ছে।মনে হচ্ছে তাঁর কষ্ট যেন চোঁখের মনি অতিক্রম করে পৌঁছে গিয়েছে। সোলেমান বলল “আপনি আর এভাবে কান্না করবেন না, আপনার চোখে জল না,বরং তেজ দেখতে চাই। দরকার হয় আপনি কিরগিজস্তান চলে যান।আমরাও যাব।ফারদিনাকে যা বলার বলবেন।”

সুফিয়ান ভেজা গলায় বলল “ফারদিনা যদি সত্যিই বিয়ে করে থাকে, তাহলে ও আজমাত এর সাথে থাকছে,একসাথে খাচ্ছে-দাচ্ছে ঘুমাচ্ছে।আমি গেলে হয়ত ওঁদের দেখতে হবে, চোঁখের সামনে আমার না হওয়া রাজকুমারী অন্য কারো হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেসব আমি সহ্য করতে পারব না।ও এখন আজমাত এর সাথে আছে সেসবই ভাবতে পারছি না। অদৃশ্য কিছু দৃশ্য ভেসে উঠছে ওঁদের, ইচ্ছে করছে আমিই আমাকে শেষ করে দেই।নয়ত ওকে শেষ করে ফেলি।না ফারদিনাকে আমি পাব,না অন্য কাউকে পেতে দেব।”

“এরকম বলবেন না, নিজেকে কেন শেষ করবেন? নিজেকে নিজে কারা শেষ করে জানেন?যারা আল্লাহ কে ভয় পায় না,আল্লাহ কে ভয় না পেলে সে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।এহকাল, পরকাল কোন-কালেই সে শান্তি পাবে না।”
সুফিয়ান মৃদু শব্দে কেঁদে উঠল।বড্ড ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল “আমি এই দুনিয়াতে শান্তি পেলাম কোথায়!মা বাবা কে সে-ই কবেই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি। ভেবেছিলাম এই তো জীবনের বুঝি শেষ ধাপ। আর ঠিক সেই মুহুর্তেই যেন ফারদিনা এসে আমাকে বেঁচে থাকার আসা দিয়েছিল।কতটাই না ভালবাসতাম মানুষটিকে।কত স্বপ্ন ছিল ফারদিনা ঘিরে।আজ সবকিছু এভাবে শেষ হয়ে গেল?” সুফিয়ান এর অভিব্যক্তি রাঙা দেখছে।ওর চোখ থেকেও জল পড়ছে। বিষয়টি লক্ষ্য করল বদরু।

বদরু কিছু খড় এনে দিল রাঙার সামনে।দিল জল। রাঙা মুখ ঘুরিয়ে নিল।বদরু ওর শরীর আদর ভরা হাতে স্পর্শ করল।রাঙা এবার করুন কন্ঠে যেন হ্রেষাধ্বনি তুলল। আজকের কন্ঠে যেন ওর শক্তি নেই। সুফিয়ান গতকাল থেকে ওঁর যত্ন নিচ্ছে না।
রাঙার হঠাৎ চুপসে যাওয়া মুখটির দিকে তাকিয়ে সুফিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।ওঁর দিকে এগিয়ে গেল।বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওর কাছে দাঁড়াল। কাঁপা হাতে ওঁর শরীর স্পর্শ করতেই নেতিয়ে গেল রাঙা।সুফিয়ান খড় আর জল ওর দিকে এগিয়ে দিল।রাঙা এবার খেতে শুরু করল গোগ্রাসে।সোলেমান বলল “দেখলেন,আপনি আপনার সাথে সাথে ওকেও দুর্বল করে ফেলছেন।আর নিজেকে এরকম ভাবে শেষ না করে যা করতে চাচ্ছেন করেন,তবুও চুপচাপ বসে থাকবেন না।”

সুফিয়ান এখন কি করবে ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারছে না।কি করা উচিত তাঁর? কিরগিজস্তান যাওয়া উচিত?নাকি তালুকদার বাড়িতেই খোঁজ করা উচিত ফারদিনার! সেখানে বন্দি করে রেখেছে?কখনো ভাবছে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছে, কখনো ভাবছে দূরে চলেই গেছে।কখনো ভাবছে ফারদিনাকে ওঁর রাক্ষুসে ভাই গুলা মেরে ফেলেনি তো?
উত্তর মিলছে না একটিরও।চরম ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে সুফিয়ান।ফারদিনা যেন ছিল তাঁর এক শক্তি।আজ সে-ই শক্তি দূরে চলে যাওয়ায় সে নিষিক্ত হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে সব ঝাঁপসা হয়ে আসছে।ঢলে পড়ার আশঙ্কা। রাঙাকে শেষবারের মত আদর করে বারান্দার বসে।

ফারদিনার কন্ঠ ভেসে আসছে। সুফিয়ান তাকাল। তাঁর গোলাপের বিশাল বাগান থেকে কন্ঠটি এসেছে।ফারদিনা সাদা রঙের একটি শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে।একটি গোলাপ ছিঁড়ে হাতে তুলে নিয়ে গন্ধ শুঁকছে।চোখে আনন্দ,ঠোঁটে হাঁসি নিয়ে তাকিয়ে আছে সুফিয়ান এর দিকে। সুফিয়ান মুখে একরাশ হাঁসি আনল।বিষন্নতা কেটে গেল মুহূর্তে।সে ধীর পায়ে হেঁটে বাগানটির কাছে এগোলো।ফারদিনা বলল “গোলাপ ফুটেছে তো,প্রেম নিবেদন করবে না?”
সুফিয়ান হঠাৎ কি যেন কি ভেবে দৃষ্টি এলোমেলো করে দ্রুত কন্ঠে বলল “তুমি এই বাগানে কেন ঢুকেছো, বেরিয়ে আসো,এই বাগান পবিত্র নয়,জলদি বেরিয়ে আসো”

সোলেমান সহ সবাই হা করে তাকিয়ে আছে সুফিয়ান এর দিকে।কি বলছে একা একা? মানুষটি সত্যিই পাগ’ল হয়ে যায়নি তো? ওঁরা একে অপরের সাথে চাওয়াচাওয়ি করল। সোলেমান সুফিয়ান এর দিকে এগিয়ে গেল। গোলাপ বাগানের দিকে চাইল।কিছুই দেখা যাচ্ছে না গোলাপ ব্যতীত। গোলাপ বাগান অপবিত্র মানেও বুঝল না!বোঝার চেষ্টা করতে সুফিয়ান কে বলল “আপনি কার সাথে কথা বলছেন?

সুফিয়ান সোলেমান কে ফারদিনাকে দেখাতে চাইলেই ফারদিনা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সুফিয়ান পা’গলের মতন চারদিকে তাকাল।ফারদিনা ফারদিনা বলে চেঁচাতে লাগল। কিন্তু,আফসোস ফারদিনার কোন সাড়া পেল না। সোলেমান সাহস করে সুফিয়ান এর গায়ে হাত রেখে বলল “কেউ নেই, এভাবে ভেঙ্গে পড়বেন না, অতিরিক্ত ভাবছেন তাঁকে নিয়ে।তাই ভুল দেখছেন।”
হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সুফিয়ান বুঝতে পারল। আবার গিয়ে বসল বারান্দায়। সিগারেট বের করল।ম্যাচ ধরতে পারছে না ঠিক মত, হাঁত কাঁপার জন্য নিভে গেছে কয়েকবার ম্যাচ। শেষবার সফল হল।

রোদ উঠছে। সূর্য সবেই সমস্ত তাপমাত্রা ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির মাঝে। শীতের সময় এখন শেষের দিকে। ফুরিয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহর খেলা। শীতের কুয়াশামাখা দিন গুলো সুফিয়ান এর খুব মনে পড়বে।খুব করে মনে পড়বে।ফারদিনার সাথে শীতের রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, তাঁকে বাঁশির সুর শোনানো, ইচ্ছে করে সুফিয়ান কে রাগানো, বায়না ধরে তাঁর ঘরে থেকে যাওয়া, অভিমান করে চলে যাওয়া,মনে পড়বে।প্রতি মুহূর্তে মনে পড়বে।পড়ছে। স্মৃতিগুলো তাঁর শিরায় উপশিরায় গেঁথে আছে। হৃদয়ের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। কিভাবে ভুলে যাবে সে?
ধান ক্ষেতের পাশে বসে আছে সুফিয়ান।ক্ষেতে বীচ রোপণ করার দিন ফারদিনা দূর থেকে দেখছিল।আজমাত এর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সুফিয়ান তখন জল চাইলে ফারদিনা সবার চক্ষুরালে জল নিয়ে এসেছিল তাঁর কাছে।

যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু ফারদিনার স্মৃতি। চোখের পাতা খানিকটা ফুলে উঠেছে।পুরুষ কাঁদে না, কাঁদলেও কেউ দেখে না,কিন্তু আজ যে সুফিয়ান কে দেখবে,সে নিশ্চিত হবে, পুরুষেরা কাঁদে।
সোলেমান ওঁরা তখন চলে গিয়েছিল। বাজার থেকে টুকিটাকি কিছু খাবার কিনে এনেছে। শুকনো রুটি,কলা। ওঁরাও গতকাল থেকে না খেয়ে আছে। সুফিয়ানও। তাঁর চোখ মুখ ভেঙ্গে ঝুলে পড়েছে যেন।
সোলেমান তাঁর পাশে বসল।হাবলু একপাশে।বদরু তাঁর ঘরের দিকে গেল জল আনতে। মিনিট দুয়েক পর একটা মাটির পাত্রে জল নিয়ে হাজির হল। সুফিয়ান এর দিকে রুটি আর একটা কলা এগিয়ে দিয়ে বলল “খেয়ে নিন, কিছুত খাননি।”

“খিদে নেই।”
“না খেলে মরে যাবেন।” একটু রসিকতার ছাপ নিয়ে বলল লাল মিয়া।
সুফিয়ান ক্ষুদ্র হাঁসির সাথে বলল “মরে গেছি অনেক আগেই,এখন শুধু দেহটা পড়ে আছে।”
“আপনি না আমাদের ভরসাস্থল,সৎ কাজের উৎসাহ করেছিলেন, সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন,আজ সততা আর বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন?” সোলেমান বলল।

সুফিয়ান কিছু না বলে তাকাল দূরে।ক্ষেত ছাড়িয়ে। সেখানে সাদা শাড়ি পড়ে কেউ দৌড়াচ্ছে।খুব আনন্দে।হাতে গোলাপ ফুল।ফারদিনা সে।সুফিয়ান ভুল দেখছে।চোখের পাতা ফেলে সরিয়ে ফেলল দৃষ্টি।বারবার কেন ফারদিনাকে সাদা শাড়ি পরনে দেখছে,বুঝতে পারছে না। বুকটা বারবার ভার হয়ে যাচ্ছে।এই বুঝি নিঃশ্বাস আটকে যাবে।
সোলেমান তাঁকে খাওয়াতে ব্যর্থ হল।আরেকবার চেষ্টা চালিয়ে বলল “না খেলে নিস্তেজ হয়ে যাবেন,তখন ফারদিনাকে খুঁজে বের করবেন কিভাবে?” ফারদিনাকে খুঁজে বের করার কথাটা শুনে ঘুরে তাকাল ওঁর দিকে।বলল “তারমানে ফারদিনা লুকিয়ে আছে,নয়ত বন্দি করে রেখেছে ওঁরা,তোরা এটাই ভাবছিস?”
“হতেও পারে।” সোলেমান নিশ্চিত না হয়েও সুফিয়ান কে বোঝাতে চাইল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল “জানেন আজ কি ঘটেছে, চৌরঙ্গী হাট বাজারের পাশে একটা লা’শ মিলেছে।লোকটি সাধারণ যুবক।তবে দেখে মনে হয়েছে,ওকে কেউ টেনে হিচড়ে কোথাও নিচ্ছিল।নিতে নিতেই বোধহয় মা’রা গেছে।”
পাশ থেকে লাল মিয়া বলল “আমার তো মনে হয়,অশ্বের সাথে বেঁধে এরপর টেনে টেনে নিচ্ছিল।পড়েই মা’রা যায়।”

সোলেমান আবার বলল “অদ্ভুত মৃ’ত্যু। এরকম মৃ’ত্যু আমি আর দেখিনি।” থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল “বাজারটি আগের মত নাই,কত মানুষের হইহুল্লোড় ছিল আগে, মানুষের কো’লাহল এর শব্দে ঢোকা যেত না।আজ তা শুধুই নীরব।”
“ঠিক যেন জমিদার বাড়িটির মতন আজ নীরব হয়ে গেছে। জমিদার বাড়ি,জমিদার বাড়ি,বলে লোকে একসময় মাথায় তুলে রাখত যেন, দিনশেষে কত মানুষের আনাগোনা দেখা যেত,আজ আর সেই আনাগোনা নেই।” বলল লাল মিয়া।মুখের অভিব্যক্তিতে এক আকাশ পরিমাণ শিথিলতা।
“হুঁ,তুই ঠিক বলছিস,আমিও লক্ষ্য করেছি বিষয়টি।চৌরঙ্গী হাট যেতেই তো তালুকদার বাড়ি।আজও খেয়াল করেছি, কেমন এক নির্জন নিহারিকা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।মনে হচ্ছে বাড়িটিতে কেউ থাকেই না।” বলল বদরু। ওঁর চোখে জল নেমে এল।

আগামী বারো থেকে চব্বিশ ঘন্টা সুফিয়ান সময় দিয়েছে আদিব-দের।এই সময়ের মধ্যে সে নিজেও আশেপাশে সমস্ত জায়গায় খোঁজ নিবে, মরুভূমির পথে দূর দেশের উদ্দেশ্যে কেউ পাড়ি জমিয়েছে কিনা।কিন্তু তাঁর মনটা কোন কারনে সায় দিচ্ছে না দূর দূরে যেতে।ফারদিনা তাঁর আশেপাশেই আছে এমনটি মনে হচ্ছে,অথচ এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ যা তা থেকে বোঝা যাচ্ছে,ফারদিনা তাঁর উপর অভিমান করে দূরে চলে গেছে।ঠিকই তো,যাওয়ারই কথা।আজ সে যদি ফারদিনাকে নিজের চোখের সামনে অন্য কাউকে বিয়ে করতে দেখত, তখন সে ঠিক কি করত? প্রশ্নটা নিজের দিকেই ছুড়ে দিল। কিন্তু জবাব মিলল না।
সোলেমান সুফিয়ান এর ধ্যান কেড়ে নিতে আবার বলল “জানেন, কিছুদিন আগে মেলা থেকে বেশ অনেক বাচ্চাদের গা’য়েব করে নেয়া হয়েছে। দারোগা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ওঁদের পরিবারকেও পড়ে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অদ্ভুত না?”

সুফিয়ান ছোট্ট শব্দে বলল “হুঁ।” বাকি আর কিছু বলার মত শক্তি নেই যেন এই মুহূর্তে।
“আচ্ছা,কোথাও এমনটি নয়তো গ্রাম মানব শূন্য যেভাবে হচ্ছে, ঠিক সে-ই ভাবে ফারদিনাও গা’য়েব হয়ে গেছে?” সোলেমান প্রশ্নটা কাকে করল ঠিক বুঝতে পারল না। সুফিয়ান তাৎক্ষণিক বড় বড় চোখের জলক্রান্ত চাহনিতে ওঁর দিকে তাকাল।বলল “কি বলছিস, তাহলে ওঁর ভাইয়েরা সত্যটা লুকাবে কেন?আর ফারদিনা চিঠিতে তো স্পষ্ট লিখে গেছে,সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমাকে ও শেষ যে অবস্থায় দেখেছে,সেটাও উল্লেখ করা”
“আমার কোথাও একটা গড়মিল মনে হচ্ছে!” বলল সোলেমান।হাতে একটি কলা।
লালমিয়া বলল “চিঠিটা সে-ই লিখেছো তো?”
সুফিয়ান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে জবাব দিল “হুম, কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শুধু ফারদিনার সাথেই ঘটেছে, কিছু অস্বাভাবিক মুহূর্ত।ফারদিনা ব্যতীত সেসব অন্য কারো জানার কথা নয়!”

“অস্বাভাবিক মুহূর্ত বলতে?” প্রশ্নটা করে হাবলু সুফিয়ান এর সামনে গিয়ে ঘাসের উপর লুটিয়ে বসে।সুফিয়ান জবাব দিল না। সোলেমান হাবলুর দিকে চেয়ে বলল “কিছু প্রশ্ন না করে বুঝে নিতে হয়।” থেমে গেল সোলেমান। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল সুফিয়ান।সূর্য এখনো মাথার উপরে মাথার উপরে উঠেনি।সময় ধরা যায় বেলা এগারোটা।
সোলেমান কলাটা সুফিয়ান এর দিকে এগিয়ে দিল।বলল “এটা অন্তত খেয়ে নিন। আপনার শরীর টা নেতিয়ে যাচ্ছে দেখছেন”

সুফিয়ান নিজের দিকে তাকাল।এত দ্রুত তাঁর শরীর নেতিয়ে যাবে না। দুর্বলতা মনের, শরীরের না।বলা হয় হৃদয় ভেঙ্গে গেলে আপনাআপনি শরীর ভেঙ্গে যায়। দুর্বল হয়ে যায়।বলল “এত সহজে আমি ভেঙ্গে পড়ছি না,হয়ত হৃদয়টা ধীরে ধীরে ভেঙ্গে যাচ্ছে।জোরা লাগানোর চেষ্টাও আপাতত করছি না। যতদিন না ফারদিনাকে খুঁজে পাচ্ছি ততদিন পর্যন্ত অন্ন মুখে তুলব না।”
“তারমানে আপনিও নিশ্চিত,ফারদিনাকে আটকে রাখা হয়েছে,নয় কোন একটা গড়মিল নিশ্চয়ই আছে!” বলল সোলেমান।

সুফিয়ান ভ্রু-কুঞ্চিত করে ফেলল। বারেবারে একই কথা কেন বলে ফেলছে নিজেও আন্দাজ করতে যেন পারছে না।সিন্ধুতলি গ্রামে থাকাকালীন একরাতে ফারদিনাকে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে-ই রাতের শেষ প্রহরের দিকে একটা দু্ঃস্বপ্ন দেখেছিল।সে ফারদিনাকে বিয়ের জন্য তালুকদার বাড়িতে পৌঁছেছে। অপেক্ষা করছে,কখন ফারদিনা বউ সেজে নিচে নামবে।সে অনেক আগ্রহ নিয়ে তাঁকে বউ সাজে দেখার জন্য বসে আছে।ঠিক সেই সুন্দর মুহূর্তে হঠাৎ করে পাল্টে যায়।ফারদিনা তাঁর সামনে উপস্থিত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সাদা রঙের শাড়ি পড়ে।
স্বপ্নের কথা মনে করতে পারল না।ভয় ভয় হচ্ছে হঠাৎ তাঁর।কি যেন কি হবে আশঙ্কা পাচ্ছে। তাঁর মা মৃ’ত্যুর আগে একটা কথা বলে গিয়েছিল,যখন যাই হবে সর্বদা আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখবে।আজ সুফিয়ান সু-ধারণা রেখেও যেন রাখতে পারছে না।সবকিছু ঠিকঠাক নেই।লালমিয়া এদিক ওদিক দেখতেই চোখ পড়ে সুফিয়ান এর গোলাপ বাগানটির দিকে। ঘুরে সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়ে বলল “তখন আপনি বলছিলেন, আপনার গোলাপ বাগান অপবিত্র, গোলাপ বাগান অপবিত্র মানে কি?”
সুফিয়ান বলল “এমনটি বলেছিলাম?

“হুঁ,বলেছিলেন”
“বোধহয়, ভুলে বলে ফেলেছি।” বলে পকেট থেকে ফারদিনার চিঠিটা বের করল। চিঠিতে যেন ফারদিনার মুখটি ভেসে উঠছে।পড়ল না। পকেটে রেখে দিল। আবার বের করল।মনে হল কিছু একটা চোখে পড়েও পড়েনি যেন। শুরু থেকে চিঠির লেখা গুলো আবার দেখল। সোলেমান বলল “কি দেখছেন?
সুফিয়ান ভার গলায় বলল “চিঠির প্রথম লেখা গুলো একজনের। নিশ্চিয়ই ফারদিনার। শেষ এর দু লাইন অন্য কারো।আমি নিশ্চিত।”
“কি বলছেন, সত্যি?” ওঁরা সবাই একসাথে প্রশ্ন করল।সাথে নড়েচড়ে উঠল।
“হ্যাঁ, আমি অশিক্ষিত নই, এতটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার আছে,এর মানে ওঁরা আমার সাথে চালাকি করেছে। নিশ্চয়ই ফারদিনাকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে ওঁরা।”

সুফিয়ান এর কথা শুনে ওঁরা কিছু বলতে পারল না। কিছু বলার আগেই পেছন থেকে ভেসে এসেছে মজিদ মিয়ার হাঁসির শব্দ। লাঠিতে ভর দিয়ে কালো চাদর পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত ভাবে হাসছে। বারবার বলছে “পাপ বাপকেও ছাড়ে না,পাপ বাপকেও ছাড়ে না।”

The Silent Manor part 43

“ও পা’গল চাঁচা, আপনি কোন পাপের কথা বলছেন? জিজ্ঞেস করল সোলেমান। মজিদ মিয়া আঙুল তুলে সুফিয়ান এর দিকে দেখাল। এরপর লাল মিয়া, এরপর বদরু, হাবলু। ওঁরা বিভ্রান্তি নিয়ে বলল “আমরা কি করেছি? সুফিয়ান ভাই কি করেছে? চাঁচা মনে হয় পুরোপুরি পা’গল হয়ে গেছে।”

The Silent Manor part 45+46