ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৩
জান্নাত চৌধুরী
বিকাল নাগাদ একদলের খেলা শেষ, খন্দকারের লোক বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আবারো নামানো হয়েছে। রাইসা গাছতলায় দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখছে , রেজা নেমেছে পুকুরে। অপর দলের লোকটা রাইসা চিনেনা। বেশ আগ্রহ নিয়ে পরবর্তী খেলা দেখতে বসা সে। মাইকে ঘোষণা হলো অতিক্রম হয়েছে ১২ মিনিট। অথচ ডুবন্ত হাসের হদিস নেই। রেজাও ডুব দিয়েছে অনেক্ষণ হবে হয়তো মিনিট পাঁচেক এর মতো। একবার একটু মাথার দেখা মিলছে। অপর দিকে খন্দকার বাড়ির প্রতিযোগি যেন বেহুঁশ আসলে সে খুঁজে চলেছে হাঁস আর রেজাকে। অথচ দুজনেই হাওয়া।
কাঁঠাল গাছের নিচে বাইক এসে থামলো। রাইসা সেখানেই বসে বসে খেলা দেখছে ,পাশে যুথি রয়েছে। বাইক এসে থামতেই ইফরাহ নেমে দাঁড়ালো। আরাধ্য স্টার্ট বন্ধ করে ডাকল –
-এই মাইই , মাই গে ;
রাইসা শুনলো কিনা কে জানে ? তবে যুথি ঠিক শুনলো, ঘুরে তাকাতেই নজর পড়লো ইফরাহ আর আরাধ্যের উপর। বসা থেকে উঠতে নিয়ে ভেজা মাটি স্লিপ কেটে পানিতে পড়তেই চমকে উঠলো রাইসা। খিল খিল করে হেসে উঠলো ইফরাহ- হাসির শব্দ শ্রবণ হতেই ঘুরে তাকায় রাইসা। ইফরাহ হাসছে , তার আপা এসেছে যুথিকে ছেড়েই রাইসা উঠে ছুটে এলো ইফরাহর কাছে। ইফরাহ বোনকে জড়িয়ে নিতে চাইলেই বাঁধ সাধে , আরাধ্য –
-”উহু উহু নো ঝাপটাঝাপটি!”
ইফরাহ বুঝলো না, কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“সমস্যা কি ?”
-“নেই সমস্যা।”
ইফরাহ কিছু বলল না। হাত বাড়িয়ে রাইসা কে জড়িয়ে নিয়ে কাপালে চুমু খেলো। যুথি পানি থেকে কোনোমতো গাছের শেকড় টেনে ডাঙ্গায় উঠে বসলো। বড় বড় কয়েকটা
নিঃশ্বাস টেনে দম নিলো।
দুইবোন তখনো আদুরে আরাধ্য কিছুটা ঝুঁকে বলল-
-“বোন বলেই এতো ভালোবাসা। কই আমায় তো কখনো চুমু খাওনা।”
ইফরাহ রাগান্বিত চোখে তাকাতেই আরাধ্য কাচুমাচু হলো। রাইসা মুসকি হাসলো। কিছুটা সরে গিয়ে বলল-
-“আপনার হিংসে হয় ছোট নবাব?”
আরাধ্য ধমকে উঠলো , “ভাগ ছেরি! ক্ষত জায়গায় লবণ দিবার আসছে, এ্যাহ। হিংসা কাভি নেহি;
-“সত্যি বলছেন ?”
-“তোর কি লাগে শালি , আমি মিথ্যা বলি ?”
রাইসার কেনো জানি ভীষণ হাসি পেলো , সাথে মজাও লাগলো আরাধ্য কে জ্বালাতে। জুথি এসে দাড়ালো , ভিজে একাকার সে। কাপড় হতে পানি ঝড়ছে , ইফরাহ তাকে দেখে বলল-
-“পানি কি ভীষণ মজা?”
জুথি ঠোঁট উল্টালো , “মশকরা করছিস ? কর কর তোর কাছে আসতে নিয়ে পানি আমারে তার বুকে জায়গা দিলো। তবুও তুই জায়গা দিলিনা ; ধিক্কার।
ইফরাহ অবাক হলো “ এমা পানির বুকে থেকেও স্বাদ মিটে নি। আবার আমার বুকেও আসতে চাইছিস? আয় তবে,
ইফরাহ এগিয়ে আসবে তখনি বাঁধ সাধলো রাইসা , “ উহু ; প্রয়োজন নেই। পরে হবে ক্ষণ, আপতত শীত লাগছে আমি আসছি !”
বলেই এক ছুটে বাড়ির দিকে গেলো জুথি। পুকুর পাড়ে হই হই শুরু হয়েছে। রেজা হাঁস নিয়ে ডাঙ্গায় উঠেছে , আরাধ্য একটা চেয়ার এনে রাখলো ইফরাহর পাশে। ইশারায় বসতে বললো তাকে ,নিজে দাঁড়িয়ে রইলো। রাইসার ভালো লাগলো। এদৃশ্যে যেন দু’চোখের তৃপ্তি মিললো তার। ছুটে গিয়ে মঞ্চের পাশ হতে আরো একটা চেয়ার এনে দিলো আরাধ্য কে। আরাধ্য হাসল –
-“বাপরে ক্ষাতির !”
রাইসা ভাষাহীন তার কি বলা উচিত জানা নেই। তবুও কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল –
-“আপনার ক্ষাতির করলেই না আমার আপার যত্ন লইবেন। তাই কিছুমিছু ক্ষাতির আপনার প্রাপ্য।”
রেজা এসে দাঁড়ালো , লুঙ্গি হাঁটুর উপরে গিট মারা। হাঁতের হাঁসটা আরাধ্যের দিকে দেখিয়ে বলল “
-“এইবারের জিত নিশ্চিত ছোট নবাব। আমি সমান কইরা দিছি।”
আরাধ্য চুলে হাত বুলিয়ে কিছুটা ভাব নিয়ে বসল। মুখে কিছু একটা বলবে তখনি ইরফাদ এসে দাড়ালো , কাপালে হাত রেখে সালাম ঠুকলো।
-আসসালামুয়ালাইকুম ছোট নবাব!
মাইকে ঘোষণা হলো , আবারো এক হাসঁ ছাড়া হলো। তৃতীয় দল নামানো হবে এবারে আরাধ্যের দল হতে বহিরাগত এক ছেলে নামানোর কথা। তবে অপর দিকে ঘোষণা হলো খন্দকারের ছোট ছেলে নামবে । রেজা বকে উঠলো-
-”এই মাতারির হাঁস ধরার শক হলো কেন?
ইফরাহ চিনে না লোকটাকে , তবে নাম জানে। সকলের মুখে ভঙ্গিতে সে বেশ খুশি হলো। আরাধ্য তখনো চিন্তা বিহীন বসা- ইরফাদ পানির দিকে তাকিয়ে বলল –
-“আমি নামি ছোট নবাব !”
আরাধ্য কথা বলল না। ইরফাদ প্রস্তুতি নিলো , ট্রাউজার ভাজ দিয়ে পানির দিকে যাবে তখনি ডাকল ইফরাহ –
-”থামুন ;
আরাধ্য চোখ মেললো ইফরাহ তার দিকে ঘুরে বলল-
-“উনি না আপনি যাবেন ?”
রেজা আর রাইসা চোখ বড় বড় করে একে অপরের দিকে তাকলো। আরাধ্য আর হাসঁ দুটো যেন মুদ্রার আকাশ আর জমিন। কখনো ধরেনি আরাধ্য হাসঁ, ধরতে জানে না কিনা তাঁও জানা নেই কারো। রেজা বলল-
-“মাফ করবেন বউরানী , ছোট নবাব কখনো এ খেলা খেলিনি।”
-“খেলিনি আজ খেলবে। এলাকার ছোট নবাব হয়ে সামন্য হাঁস ধরা এতো ভয়ংকর কোন কাজ নয়।”
-“কিন্তু…
আরাধ্য হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো রেজাকে। তারপর ইফরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল-
-“দহনরূপা! আপনি চাইছেন আমি খেলায় নামি?”
-“চাইছি!”
আরাধ্য চেয়ারে পিঠ ঠেকালো , অলস কন্ঠে বলল, “তাহলে তো অবশ্যই খেলবো , আর ধরে নিন আমরা জিতেছি। যতোই হোক আমার ঘরনীর চাওয়া বলে কথা।”
-“বলছেন ?”
-“পাক্কা ! তবে …
ইফরাহ ভ্রু কুচকালো , কেমন একটা দৃষ্টিতে যেন তাকালো আরাধ্যের দিকে। আরাধ্য বলল – “জিতলে কি দিবেন?”
-“কি চাই আপনার?”
আরাধ্য বদমাশের মতো হাসল “ যা চাইবো দেবে তো”?
-“সাধ্যের ঘরে রোপিত কিছু হলে নিশ্চয়ই দিবো!”
আরাধ্য উঠে দাড়ালো, সিগারেটের প্যাকেট সহ প্রয়োজনীয় সকল জিনিস বের করে ইফরাহর হাতে দিলো। দেরি করলো না , বাঁশি ফুঁ দিতে ইশারা করেই এই ঝাপে পুকুরে নামলো।
অপর পাশে উড়ান নেমেছে , সকলে অপেক্ষা করতে লাগলো। হাঁস , আরাধ্য , উড়ান, কারো হদিস নেই। ইফরাহ আগ্রহ নিয়ে বসে রইলো। পানির তলে কি হচ্ছে বুঝা যায়না।
একটু একটু করে কেটে গেলে অনেকক্ষণ, হাঁস ভেসে ওঠেছে। তবে বাকি দুজনের খবর নেই। সকলের কৌতুহল বাড়ছে , চেয়ারম্যান নিজেও অধীর আগ্রহের সহিত সময় দেখছে।
আরো কিছু সময় গেলো, এর মাঝে একবার উড়ানের মাথা দেখা গিয়েছিল।আপতত সেও নিখোঁজ , হাঁস আবারো ডুবছে। পানির উপরে ভেসে থাকা হাঁস মাথা ডুবাতেই
দুটি হাত এসে চেপে ধরে হাসের গলা।
আরাধ্য পানির তলেই তাকালো। মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁকা হাসল – ধরা হাঁস ছেড়েছে দুজনেই। আবারো ডুবন্ত হাঁস ভেসে উঠলো। এবার একসাথে পানির উপরে মাথা তুললো দুইজন। আরাধ্য নিজের ব্যালেন্স ঠিক রেখে সালাম ঠুকলো
-“সালাম উকিল সাহেব।”
উড়ান বেজায় বিরক্ত হলো।আরাধ্যের ঠাট্টা মশকরায় গাঁ না ভাসিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল-
-“শালার বিনা বাধায় যদি শ’ খানেক খুন করার হিসাব ধরা না হতো।আমি নিশ্চিত প্রথম খুনটা তোরেই করতাম।”
আরাধ্য হেসে উঠলো, তার ভীষণ মজা লাগলো। এতেই উড়ানের রাগ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। উড়ানে রাগান্বিত মুখ দেখে আরাধ্য বলল-
-“শুনেন সাহেব , চেলা’কাঠ পুড়িয়ে কয়লা হয়। আর সেই কয়লার আগুন হয় দীর্ঘস্থায়ী। আমি হলাম কয়লা , আমার মরণ নেই। আপনি ব্যর্থ হবেন উকিল সাহেব।”
-“বিশ্বাস ভালো , আত্মবিশ্বাসী হওয়া ভালো না।”
আরাধ্য হাসে , ধীরে ধীরে প্রসারিত হয় সেই হাসি। উড়ানের আরো কিছুটা কাছে এসে বলে –
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১ (৩)
-“এতবড় একখান ছ্যাঁকা দিলাম। শখের নারী ছিনিয়ে নিয়ে,আমার ঘরের বউ করলাম। তার পরেও আপনার কি যুক্তি মাইরি, সালাম সাহেব সালাম।
উড়ানের চোখ লাল হয়ে ওঠে। অগ্নি চোখে আরাধ্যের দিকে তাকলো। আরাধ্য চোখ টিপে আঙ্গুল দিয়ে গাছতলায় ইশারা দিতেই। উড়ানের চোখ আটকালো ইফরাহর দিকে। আরাধ্য বলল-
-“আপনার হৃদয়হরণী আমার ঘরের বউ সাহেব। দেখুন , দেখুন প্রাণ ভরে দেখুন, ওই নারী আমার ঘরওয়ালি।”
আরাধ্য ধীরস্তে সরে গিয়ে ডুবল , উড়ান তখনো তাকিয়ে আছে ইফরাহর দিকে। মিনিট দুইয়ের মাঝেই হাঁস নিয়ে ডাঙ্গায় উঠে বসল আরাধ্য।
