ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৭ (২)
জান্নাত চৌধুরী
বেলা ১১ টায় পুলিশ এলো মীর বাড়িতে। তবে এবারে অভিযোগ কারী চেয়ারম্যান নিজে। আরাধ্য ইফরাহ দুজনেই তখন গভীর ঘুমে , কাব্য এসে আরাম করে সোফায় বসেছে। দুজন কনস্টেবল এসেছে , অরুনিমার শরীর ভালো নেই। আজ সে অন্দরে আসে নি। চেয়ারম্যান রইসুল কে পাঠালো ছোট নবাব কে ডাকতে। কাব্য কিছুক্ষণ নীরব থেকে জিজ্ঞেস করল , “ আপনার অভিযোগ কার বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান সাহেব ?”
চেয়ারম্যান খানিক চুপ থেকে বলল , “ আমার ছেলের বউ!”
কাব্য খানিক অবাক হলো , “ তার অপরাধ?”
চেয়ারম্যান চোখের সামনে বারবার দেখতে পাচ্ছে খন্দকারের তরতাজা কলিজা ছিরে খাবার দৃশ্য। শরীর ঘেমে উঠছে , সে মূলত নিজেকে বাঁচানোর পন্থা হিসেবে ইফরাহ কে সরাতে চাইছে।
রইসুল এসে দরজায় কড়া নাড়তেই ঘুম ছেড়ে উঠলো আরাধ্য। ইফরাহ কে সযত্নে নিজের বুক থেকে সরিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুললো। রইসুল বলল , “ নিচে পুলিশ আইছে ছোট নবাব , বউরানী সহ আপনারে ডাকে।”
ইফরাহর ঘুম আলগা হয়েছিলো আরাধ্য উঠে যেতেই। পুলিশের কথা কান অব্দি পৌঁছাতেই ধপ করে উঠে বসল সে। আরাধ্য ছুটে এলো ইফরাহর কাছে বসল , “ ইরা!”
ইফরাহ সরল দৃষ্টি চেয়ে দেখলো আরাধ্যের মুখখানি। আরাধ্যের মুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। কাল রাতে রক্তাক্ত কাপড়ে ঘরে ফিরেছে ইফরাহ। তার বিধ্বস্ত দেহ দেখে যে কেউ বুঝবে ইফরাহ খুন করে ফিরেছে। তবে পুলিশ? ইফরাহ কেমন প্রশ্ন সূচক চোখে তাকিয়ে আরাধ্য বলল ,
“ চিন্তিত হচ্ছো কেনো আমি আছি তো।”
ইফরাহর হাত শক্ত মুষ্টিতে চেপে ধরে বেশ সাবধানে ইফরাহ কে বিছানা থেকে নামালো আরাধ্য। শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে দিলো যত্নে। ইফরাহ জড় পদার্থের ন্যায় শুধুই দাঁড়িয়ে থাকলো আরাধ্য আবারো বলল , “ চল ইরা !”
দুজনেই চললো অন্দরের দিকে। সিঁড়ি কাছে আসতেই শুনলো চেয়ারম্যান কাল রাতের কিছু কাহিনী বলছে কাব্যকে। কাব্য বেশ আরামে বসে সেসব কাহিনী শুনছে। আরাধ্য নামতেই লম্বা এক সালাম ঠুকলো কাব্য , “ আসসালামুয়ালাইকুম ছোট নবাব।”
সালামের জবাব আরাধ্য কেবলি হাসলো।কাব্য উঠে এসে ঘুরে ঘুরে ইফরাহ কে দেখে আরাধ্যের সম্মুখে স্থির হয়ে দাড়ালো , “ চেয়ারম্যান সাহেব কিন্তু আপনার স্ত্রী নামে অভিযোগ এনেছেন ছোট নবাব। এতে আপনার মতামত।”
ইফরাহর সরল এক দৃষ্টিতে চেয়ারম্যানের দিকে তাকালো তবে এই শান্ত চোখ জোড়াও যেন চেয়ারম্যানের আত্মা শুকিয়ে দিচ্ছে। আরাধ্য আড়চোখে চেয়ারম্যানের শুকনো মুখটা একবার দেখে নিয়ে আবারো কাব্যের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “ আমার স্ত্রীর অপরাধ?”
কাব্য নিশ্চুপে চমৎকার হাসল , “ খুন।”
আরাধ্য চোখে চোখ মিলিয়ে প্রশ্ন সূচক ভাবেই তাকিয়ে আছে কাব্য বলল , “ খন্দকার সাহেব নিখোঁজ গত রাত থেকে। ওনার দুই ছেলে এসেছিলছন থানায়। তবে ইতোমধ্যে চেয়ারম্যান সাহেব তথ্য দিয়েছেন আপনার স্ত্রী ইফরাহ জান্নাত তাকে নির্মমভাবে খুন করে কাঁচা কলিজা ফুসফুস চিবিয়ে খেয়েছে। ”
আরাধ্য তাচ্ছিল্য হাসল , “ আব্বাজান বলল আর আপনিও বিশ্বাস করে নিলেন?”
-“না করার কারণ ?”
-“ করার প্রমাণ কী অফিসার।”
-“চাক্ষুষ সাক্ষী।”
এবারে আরও গাঢ় হলো আরাধ্যের হাসি , “ ব্যস! এতো টুকু। এতেই কী প্রমাণিত হয় আমার স্ত্রী খুনি?”
কাব্য বোধহয় ভরকালো সাথে চেয়ারম্যান নিজেও। আরাধ্য চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে খানিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল ,
“ অভিযোগ কারী কে জিজ্ঞেস করুন অফিসার কাল রাতে তিনি কোথায় দেখেছেন আমার স্ত্রী কে খুন করতে?”
চেয়ারম্যান এগিয়ে এলো , “ খন্দকার বাড়ির সামনে বড় জঙ্গলে ওখানেই এই মেয়ে খন্দকার কে খুন করে খন্ডিত দেহ ফেলে এসেছে।”
আরাধ্য চেয়ারম্যানের মুখোমুখি হয়ে দাড়ালো , “ আপনি নিশ্চিত আব্বাজান লাশ ওখানেই ফেলে এসেছে।”
-“আমি নিজ চোখে দেখেছি , এই মেয়ে , এই মেয়ে ঠিক কতটা নির্মম ভাবে খুন করেছে খন্দকার কে সাথে কলিজা চিবিয়ে খেয়েছে।”
আরাধ্য একটু ভাবুক হয়ে বলল , “ রাত ঠিক কয়টা নাগাদ আব্বা?”
-“সঠিক মনে নেই। তবে রাতের শেষ প্রহর;
আরাধ্য আবার প্রশ্ন করলো , “ এতো রাত ওই জঙ্গলে আপনার কী কাজ ?”
চেয়ারম্যান একবার শুষ্ক ঢোক গিললো। আরাধ্য বুঝলো লোকটা কাবু হয়েছে। কাব্য জিজ্ঞেস করলো ,“ কি হলো বলুন চেয়ারম্যান সাহেব ওত রাতে আপনি জঙ্গলে কী করছিলেন ?”
চেয়ারম্যান একটু দম নিয়ে বলল , “ শেষ রাত্র পানির তৃষ্ণা পেয়েছিলো পানি খেতে উঠতেই নুপুরের শব্দ শুনি। তখন দেখি এই মেয়ে একটা মোমবাতি হাতে বাসা থেকে বের হচ্ছে। পিছু নিয়েছিলাম! “
এবারে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো আরাধ্য , “ খুন করলে নিশ্চয়ই কেউ নুপুর পড়ে হেঁটে হেঁটে জানিয়ে যাবে না তাই না অফিসার?”
-কাব্যের মনে হলো সে গোলকে পড়ছে। আরাধ্য আবারো বলল ,
“ আপনার সাক্ষী দুর্বল অফিসার।”
চেয়ারম্যান কড়া কন্ঠে প্রতিবাদ করলো ,“ কি বলতে চাইছো ফারহান , আমি পাগলের প্রলেপ বকছি ? আমি ভুল বলছি ?”
-“হতেই পারে !”
চেয়ারম্যান জিহ্ব দিয়ে মাড়ি আটকালেন ,“ এতে আমার লাভ ?”
-“আমার স্ত্রী কে অপছন্দ করা। ”
চেয়ারম্যানের বুকে ব্যথা অনুভব করলো খানিকা বুকে হাত দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে যেতে নিলে কাব্য ধরে ফেললো তাকে। সযত্নে নিয়ে গিয়ে সোফাতে বসালো , “ আপনি ঠিক আছে চেয়ারম্যান সাহেব? “
চেয়ারম্যান খানিক মায়া দৃষ্টিতে দেখলো কাব্য কে। এর মাঝেই আরাধ্য বলল , “ ফিরে যান অফিসার , তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তবেই আসুন আমার সহধর্মিণীকে ধরতে। নয়তো মীর বাড়ির বউরানীর সামান্যতম অসম্মান এই ফারহান ফাইয়াজ আরাধ্য সইবে না। মানহানীর মালমা করবো আমি।”
-“আগে নিজের পিঠ তো বাঁচান মিস্টার আরাধ্য , তারপর নাহয় স্ত্রীকে বাঁচাবেন!”
সদর দিয়ে প্রবেশ কৃত একটা গম্ভীর পুরুষ কন্ঠ ভেসে এলো। তবে কন্ঠটা আরাধ্যে ভীষণ চেনা আরাধ্য ঘাড় কাত করে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো ,” নুরুজ্জামান পুলিশের পোশাকে হাজির। তার পাশেই লেজ নাড়াতে নাড়াতে আসতে লেজ হীন হনুমান মাতব্বর। কাব্য অবাক চোখে। তাকিয়ে আছে নুরুজ্জামানের দিকে। নূরুজ্জামান এগিয়ে এলো , “ আপনাদের দুই ভাইয়ের এই লোক দেখানো চোর পুলিশ আর কতদিন চালাবেন আরাধ্য সাহেব?”
আরাধ্য নিশ্চুপ। কাব্য জিজ্ঞেস করলো , “কে আপনি ?”
নূরুজ্জামান ঘাড়টা একটু বাকিয়ে আরাধ্যের দিকে তাকালো , “ আমি কে ছোট নবাব? তাদের বলুন আমি আপনার কর্মী নূরুজ্জামান।”
নূরুজ্জামান হেসে উঠলো , “উঁহু উহু আমি আইনের লোক। স্পেশালে ব্রাঞ্চের অনাকাঙ্ক্ষিত একজন অফিসার নাহিদুল হাসান।”
সঙ্গে সঙ্গে সালাম ঠুকলো কাব্য কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে স্যার বলে উঠলো। নাহিদুল হাসল , “ হয়েছে হয়েছে কাব্য সাহেব। এতো ফর্মালিটিজ করার প্রয়োজন নেই। এখন প্রয়োজন আপনাদের দুজনের জেলে যাওয়া। “
নাহিদুল কালো রঙ্গের একটা ফাইল বের দেখিয়ে বলল , “মীর আরাধ্য, আপনাকে অ্যারেস্ট করার অনুমতি উপর মহল দিয়েছে। কালো ব্যবসা, ড্রাক স্মার্গলিং , এমনি কী মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেশে বিদেশে পাচারে অভিযোগ এসেছে আপনার নামে। ও হ্যাঁ খুনের অভিযোগ টাও আছে। আর বাকি রইলো খন্দকার খুনের মামলা ওটা পরবর্তীতে হবে ক্ষণ।”
ইফরাহ একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছে শুধুই তার মানুষ টিকে। এতো গুলো অভিযোগ উঠেছে লোকটার নামে অথচ কত ভাবলেশহীন ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে সে। চোখ থেকে দুই ফোটা নোনা পানি গড়িয়ে পড়লো বোধহয়। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে ডাকল , “ছোট নবাব!”
আরাধ্য ধমকে উঠলো , “ একদম কাঁদবে না ইরা!”
ইফরাহ শুনলো না এই প্রথম সে বিরোধ করলো আরাধ্যের, “আমার কষ্ট হচ্ছে ছোট নবাব। ভীষণ রকমের কষ্ট হচ্ছে!”
আরাধ্য ঘুরে তাকালো ইফরাহ দিকে। আলতো করে হাত রাখলো ইফরাহর দুটো গালে , “ আমি আমার রাগ কে ভীষণ ভাবেই ঘৃণা করি ইরা, আমি রাগলে অমানুষ হয়ে উঠি। তোমার চোখে যদি আর এক বিন্দু পানি ঝড়ে কসম খোদার আমি সব ধ্বংসের আগে নিজের ধ্বংসকেই প্রশ্রয় দিবো। তুমি নিশ্চয়ই এটা মানবে না?”
ইফরাহ চোখ বুজে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো। আবারো দুই ফোটা পানি গড়ালো। আরাধ্য কিছুটা ঝুঁকে পানিটুকু গাল বেয়ে পড়ার আগেই জিহ্ব দিয়ে চেঁটে নিলো। ইফরাহ আচমকাই মুখ লুকালো আরাধ্যের বুকে। তবে এবারে কাঁদলো না আরাধ্য বোধ হয় খুশিই হলো। মেয়েটা তাকে মানে তাকে ভালোবেসে আর কী চাই তার। কিছুই না !
ইফরাহ কে বুক থেকে সরিয়ে বলল, “ বাসায় ডাক্তার আসবে চেকাপ করিয়ে নিও। শরীরের অযত্ন করবে না ইরা! আমি মানতে পারবো না।”
কাব্য করুণ চোখে দেখছে কেবলি সব দৃশ্য। মাতব্বর চোখ বুজে তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। নিজের একমাত্র ছেলের খুনের শাস্তি সে আজ দিতে পেরেছে আরাধ্য কে। মনে মনে ডাকল চয়ন কে , “চয়ন আব্বা , আমার বাপ। তোর খুনি শাস্তি পাইবো বাপ।”
নাহিদুল হাতকড়া পড়ালো আরাধ্যের হাতে। কাব্য সহ সকল পুলিশ আরাধ্যের পিছনে যেতে লাগলো। চেয়ারম্যান বসা ছেড়ে এসে ইফরাহ কে ঘুরিয়ে একটা থাপ্পর বসাতে যাচ্ছিলো বোধ হয় তবে, হলো না।সদর দরজা পেরোনো আগেই আরাধ্যের কড়া ধমকে থেমে গেলো তার হাত, “ফারহান ফাইয়াজ আরাধ্য ঘরওয়ালি সে। মীর পরিবারের বউরানী, আমার অবর্তমানে আমার অর্ধাঙ্গিনীকে আপনার আমানতে রাখলাম আব্বাজান। অবশ্যই আপনি সন্তানের আমানতের খেয়ানত করবেন না। আসছি;
আরাধ্য বেড়িয়ে গেলো। ভঙ্গুর হৃদয় দু পা পিছিয়ে গেলো চেয়ারম্যান। পড়তে নিলেই তাকে ধরে ফেললো ইফরাহ। চেয়ারম্যান করুন চোখে দেখলো মেয়েটাকে।
মীর বাড়িতে ডাক্তার এলো বিকাল শেষের দিকে। ইফরাহ তখন জায়নামাজ বসে মোনাজাতে করছিলো ওই বান্দার জন্যে। কেঁদেছে মেয়েটা গালের উপর পানি শুকিয়ে যাবার দাগ। সময় টা তখন মাগরিবের আগ মুহূর্ত। একজন মহিলা ডাক্তার নিয়ে ঘরে এলেন অরুনিমা। ইফরাহ জায়নামাজ রেখে খাটে এসে বসলো। ডাক্তার তাবাসসুম টুকিটাকি খানিক চেকাপ করলেন। এরপর ইফরাহ কে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক প্রশ্নই করলেন। প্রেসার একদম নেই বললেই চলে। মানহা রাইসা দুজনেই এসে হাজির হলো ঘরে।
ইফরাহ দেখলো রাইসার চেহারায় অবনতি হয়েছে। চেহারা লাবণ্য হারিয়েছে মেয়েটা। তবে উল্টো দিকে মানহার চেহারায় উজ্জ্বলতা কারণ কী সে কি আরাধ্য কে ভুলতে পেরেছে? নিজেকে সামলে তুলেছে সব ঝামেলা থেকে। হবে হয়তো , এক ক্ষত কত কাল আর কাচা থাকবে। ডাক্তার তাবাসসুম একটু পানি চাইলেন , অরুনিমা পিছনে তাকাতেই রাইসা পানি আনতে গেলো। অরুনিমা একদম নিকটে এসে বসলো ইফরাহর। প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকলো ডাক্তারের দিকে , ডাক্তার তাবাসসুম বলল , “খুশির সংবাদ রয়েছে গিন্নিমা। উৎসব করুন।”
অরুনিমা মুখে খুশির রেখা ফুটে উঠলো। তবে মানহার এসব মাথায় ঢুকছে না। সে অবুঝের মতোই বলল , “ কি খুশির সংবাদ?”
ডাক্তার তাবাসসুম বলল , “ মীর বাড়ির উত্তরাধিকার আসছে।”
খনিকেই অমাবস্যা নেমে এলো মানহার মুখে। বুকে বাম দিকের চিনচিন ব্যথাটা যেন আবারো বাড়লো। অসহায় এক দৃষ্টিতেতে ইফরাহর দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। ইফরাহ কিছু একটা আন্দাজ করছ আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেললো। রাইসা এলো কয়ূকটা মিষ্টি সাথে একগ্লাস পানি নিয়ে। সে শুধুই পানি আর ফল এনেছিলো। তবে খুশি সংবাদ শুনে আবারো মিষ্টি এনেছে।
ডাক্তার তাবাসসুম বললেন , “ শিঘ্রই বউমা কে নিয়ে হাসপাতালে আসবেন গিন্নিমা।”
একটা মিষ্টি মুখে দিয়ে পানি পান করলো ডাক্তার তাবাসসুম , “এখন তবে আসছি আমি।”
অরুনিমা ডাক্তার তাবাসসুম কে বিদায় দিতে চললেন। রাইসা এসেছিলো ইফরাহ কাছে , কিছু প্রয়োজন কিনা জিজ্ঞেস করতে। ইফরাহ কিছু বলেনি। এক এক করে সকলেই চললো ঘর ছেড়ে। মানহা গেলো না ইফরাহ জিজ্ঞেস করলো , “ কিছু বলবে বুবু?”
মানহা এগিয়ে এসে বসল। একটু খানি তাকিয়ে থেকে বলল , “তবে, শেষ বেলায় এসে নীড়হারা পাখিটাও কারো আশ্রয়ে রাত্রি যাপন করলো। অতঃপর সে ঘরেও পরবর্তী প্রজন্ম আবির্ভাব ঘটলো।”
ইফরাহ শান্ত চোখে চেয়ে। থেকে বলল , “ এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। “
মানহা চোখে চোখ মেলালো , “বলছো?”
-হুম!
মানহা তাচ্ছিল্য হাসল , “ সে ঘর বাঁধার মানুষ ছিলো না মেয়ে।”
-বেঁধেছে তো! ৯টা মাস সংসার ও করলো।
মানহা উত্তর করলো না। ইফরাহ বলল , “সে ভালোবাসার ঘৃণার মানুষ, তবুও বাধ্য করলো আমাকে ভালোবাসতে। আমিও স্বার্থপর হয়ে একখান ঘরের লোভে পড়লাম অতঃপর আমি তাকে আর ঘৃণায় রাখতে পারলাম না।
-ভালোবেসে ফেললে ?
-বাসলাম তো!
মাহনা আবারো চুপসে গেলো। একটু খানি নীরবতা কটালো দুজনের মাঝে , “ ভাগ্য আমায় কী দিলো বলতে পরো বউরানী?”
ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলল , “ যেটা ভাগ্যের নেই তার উপর আবার অভিযোগ কেন বুবু?”
মানহা দৃষ্টি সরালো , “ তাকে নির্দোষ বলতে চাইছো?”
-সে নির্দোষ বুবু সে তো তোমাকে চায়নি, তুমি তাকে চেয়েছো। অবশ্যই তোমার উচিত ছিলো তাকে তোমার মোহে বাঁধা।
মানহা ভ্রু কুঁচকে নিলো , “ বাঁধতে চাইনি বলতে চাইছো?”
ইফরাহ মাথা ঝাঁকালো , “ উঁহু। বাঁধতে পারো নি বলছি।”
-বিরোধ করছো ?
ইফরাহ হাসল , “একটুও না। যেটা আমার সেটার জন্যের বিরোধের প্রয়োজন নেই। তুমি চেষ্টা করে নাও তাকে! যদি সে তোমার হয় আমি সরে দাড়াবো।”
ইফরাহ উঠে দাড়ালো হেঁটে গিয়ে বেলকনিতে দাড়লো। মানহা সেদিকেই পা বাড়িয়ে বলল , “এটা কী বউরানীর উদারতা?”
-একদম নয়।
-তবে কী নাম দিবে এটার।
“সুখ”
মানহার কপালে ভাঁজ ফুটলো , “ সুখ?”
ইফরাহ রেলিংয়ের গা ঘেঁষে দাড়ালো , “সবার বিরুদ্ধে গিয়ে ভালোবাসবো এতো বড় দুঃসাহস আমার নেই। আমি খাঁচায় বন্দী পাখিকে ভালোবাসি না তাকে মায়া করি। মায়া করি এইজন্যই যে , বন্দি পাখি ছাড়া পেলে কখনোই খাঁচার মায়া করে না। আর মুক্ত পাখি কখনো মায়াতেই থাকে না। মূলত , যে পাখি সারাদিন উড়ে শেষ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে তাকেই ভালোবাসি।
-বড় কঠিন ব্যখ্যা , মস্তিষ্কের এই সমীকরণ বুঝা কঠিন।
ইফরাহ মুসকি হাসল তবে এটা তাচ্ছিল্যের। মানহা বলল , “ তোমার হাসি সুন্দর বউরানী!
-কিজানি , আজকাল তো মুগ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়েছি। এখন যা হচ্ছে সব বিষাদের খেলা।
মানহা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকল, “ অনুভূতি বেশি হলে দুঃখটাও বেশি হয়।
-তবে কি অনুভুতি শূন্য হতে বলছো?
-বলছি না। তবে নিজেকে দেখে অনুভব করছি, অবেগী হলেই পৃথিবী কাঁদায়। ভাগ্য ধোঁকা দেয়!
-পৃথিবীর বুকে দুঃখ ব্যতিত কেউ চিরস্থায়ী নয়। দুঃখের স্বাদ থাকলেই না সুখ মিষ্টি লাগবে।
-তবে কী প্রেম কে দুঃখ নাম দিবো।
ইফরাহ মাথা ঝাঁকালো , উঁহু!
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৭
-তবে?
-বিরহ ডাকো।
দুজনের মাঝে আরো খানিক টা সময় নীরবে কাটলো। মাগরিবের আযান পড়ছে চারদিকে মানহা ঘরে চলে এলো। ইফরাহ বেলকনি থেকে এসে ওযু দিয়ে নামাজে বসলো।
