Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩১ (২)

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩১ (২)

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩১ (২)
ঐশী আফরিন

সেই পুরোনো ভাঙা বিল্ডিংটায় আজও চলছে বিভিষিকা। আজ শোনা যাচ্ছে অসংখ্য চিৎকার। কারা যেন বাঁচার জন্য প্রাণপন চিৎকার করে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আগুনে ঝলসে যাচ্ছে তাদের গা। কিন্ত তাকালে দেখতে পায় তাদের গায়ে কিছুই নেই। অথচ গা জ্বলছে বিচুটি পাতার মত। সেই দিনের মত আজও চারদিকে লন্ঠন জ্বলছে। সামনে জ্বলছে আগুন। আগুনের সামনে মাথার খুলি। আজ অগ্নিমূর্তি প্রচন্ড রেগে আছে তার জ্বলন্ত চোখজোরা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্ত কি এমন হলো যে এতগুলো প্রাণকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছে? এমনকি প্রতিদিনই হয় এই পরিত্যক্ত ভাঙা বিল্ডিংয়ে? কিন্ত কে করে এসব? কথাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এখানে যতই কেউ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করুক একটা টু শব্দও কীভাবে যেন বাহিরে বের হতে পারে না। অথচ বিল্ডিংটা লোকালয়ে অবস্থিত। এমনকি মেইন রাস্তায়। যেখানে সারাক্ষণই চলাফেরা করে হাজার হাজার পথচারী। তারা কি কখনো জেনেছে বা জানবে এই বিল্ডিং এর রহস্য? সবাই তো জানে এখানে এক নব দম্পতির বসবাস। এটা শহর এলাকা হওয়ার আশেপাশে দু একটা বিল্ডিং চোখে পরে। তার মধ্যে এটা একটা। এছাড়া গ্রাম অঞ্চল পুরো ঘেটেও শুধু রাজ বাদশাহদের দালান ছাড়া আর কোন বিল্ডিং চোখে পরে না। কিন্ত এই নব দম্পতির বাড়িতে এমন অত্যাচার কাদের উপর করা হয়? কারা হয় এই হিংস্রতার শিকার?

কিছুক্ষন পড় নরখাদক উঠে দাঁড়ায়। হাতে থাকা এক দলা মানুষের টগবগে রক্ত ঢেলে দেয় আগুনে। মুহুর্তেই বাতাসে মিশে যায় উটকো গন্ধ। অগ্নিমূর্তিটি সেই গন্ধ খুব আনন্দের সাথে শুঁকে নেয়। তারপর ঠোঁটে একটা ফিচেল হাসি টেনে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের বসবাসের রুমে যায়। সেখানে একটা মেয়ে অশ্লীল ভাবে গায়ে শাড়ি জরিয়ে বসে আছে। মেয়েটার লাশ্যময়ী অঙ্গভঙ্গীর দিকে তাকিয়ে আবারও ফিচেল হাসে অগ্নিমূর্তি। এগিয়ে যায় লাশ্যময়ী নারীটির দিকে। কোন আগাম বার্তা ছাড়াই একটানে খুলে ফেলে তার পরনের শাড়িটি। তবে মেয়েটা কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং মধ্যেখানের দুরত্ব ঘুচিয়ে আরো কাছাকাছি হয়। মেয়েটার অঙ্গভঙ্গীর দিকে তাকিয়ে একটা বিকৃত হাসি দিয়ে অগ্নিমূর্তি বলে “রূপ দেখায়া বে*শ্যা*গি*রি* করাতে কিন্ত তোরে খুব মানায়। মা*গি*বা*জি*র মধ্যে তুই সেরা রে খা*ন*কি”
মেয়েটা গর্ব করে হাসে। যেন তাকে কেউ প্রশংসা করছে। ঠোঁট কামরে বলে “ধন্যবাদ খারাপ লোক। এবার আমাকে বিয়েটা করে নিন তো”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

লোকটা মুখ বিকৃত করে বলে “বিয়ে আমি তোকে কেন,কোন মা*গী*কেই করবো না। ইহজীবনেও কোন কাল নাগীনিকে জীবনে স্থান দিবো না। তোরা মা*গী*রা ব্যবহারের মাল। ব্যাবহার করে ফেলে দেবো। আজ রাতটা তোর জীবনের নরকীয় রাত হতে চলেছে। বাঁচার সাধ চিরতরে মাথা থেকে মুছে ফেলে আমাকে সঙ্গ দে”
“আপনার সান্নিধ্য পেতে দু একটা নরকীয় রাত গেলে খারাপ হবে না”
“বুঝে নিস। তোর জীবনে আসা সবগুলো পুরুষের থেকে এই পুরুষটা ভয়ংকর”
“আপনার থেকে বেশী পুরুষের সান্নিধ্য পেয়েছে এই লাশ্য*ময়ী দেহ”
“দেখা যাক আমাকে ঠিক কতটা সহ্য করতে পারিস খা*ন*কি মা*গী*র ঝি”
কথাটা শেষ করতেই অগ্নিমূর্তির শক্ত হাতের থাবায় মেয়েটা উল্টে পরে বিছানায়। একমুহুর্ত দেড়ি না করে লোকটা গায়ের শার্টটা খুলে ঝাঁপিয়ে পরে। মুহুর্তেই আবারও চিৎকারে কেপে উঠে বিল্ডিংটা। তবে সেই চিৎকার আর এই চিৎকারে যে আকাশ পাতাল তফাত।

আনোয়ার ইশান সহ সকলে আগে পৌছে গেছে। ওরা গরুর গাড়িতে আসায় তারা আগে পৌছেছে। আরিয়ানরা তো পালকিতে আসছে তাই দেঁড়ি হবে। সেই সুযোগে তারা এদিকটা সামলাবে। মাধবী তাদের নিজেদের মেয়ের মত। তাই তাকে নিয়ে এত নাটক করার কিছু নেই। কিন্ত ইচ্ছে? সে তো পরের বাড়ির মেয়ে। তাকে কী এভাবেই ঘরে তোলা যাবে? তার উপর বাড়ির বড় ছেলের বউ। তাকে তো নতুন বউয়ের মতই আদর করে ঘরে তুলতে হবে। তাছাড়া বিয়ে তো ছোট করে হয়নি। বিশাল বড় করে হয়েছে। তো সেই ভাবেই ঘরে তুলতে হবে। পুরো ‘ইশানস প্যালেস’ রঙিন কাগজে সজ্জিত। রেডিও বেজে চলেছে নিজস্ব ছন্দে। বাড়িতে বিয়ের আমেজ। ‘ইশানস প্যালেস’ টা পরেছে একেবারে শহরের মধ্যে মানে মেইন শহরে। এদিকে তাদের এত আত্মীয় স্বজন নেই। তাই এখন বাড়ির মানুষজন আর দূর থেকে আসা নিকট আত্মীয়দের সাথে নিয়েই বাকি অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ করবে। এসেই মাহমুদা,নমিতা,রাশেদা ইশান কাজে লেগে গেছে। অপূর্বরা বাহিরের সব সামলাচ্ছে। ছেলেগুলো সারাদিনই পরিশ্রম করে গেছে এখনও করছে। বন্ধুদের বিয়ে বলে কথা, বসে থাকলে হবে? তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছে যেন কোন সমস্যা না হয়। অপূর্ব চাপা কষ্ট নিয়েও ভারি কাজ করে যাচ্ছে দেখে বাকিদের খুব খারাপ লাগে। অরিন্দ বলে “ভাই একটু বিশ্রাম নেও। তুমি কীভাবে এখনও এত শক্ত আছে?”

অপূর্ব গুমট হেসে বলে “কীভাবে ভেঙে পরি বলতো? আমাকে ভেঙে পরতে দেখলে আরিয়ান টা কে সামলাবে কে? ওর জন্য হলেও তো আমাকে ঠিক থাকতে হবে”
অভি হাতের কাজ ফেলে প্লাস্টিকের চেয়ারটায় অপূর্ব কে জোর করে বসিয়ে নিজেও বসে। শরীরটা টানা দিয়ে বলে “গা টা ম্যাজম্যাজ করছে রে। অরিন্দ এবার কাজ রেখে উঠ তো”
অরিন্দও এবার ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধপ করে বসে পরে। চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বলে “আরিয়ান জানলে কী হবে ভাবছি”

অপূর্বর মনে অজানা আশংকা হয়। তার তো আপন বলতে এই একটা ছেলেই। যদি আরিয়ান তাকে ভূল বোঝে? সে জানে তাকে আরিয়ান বোঝে। তবুও বুকের ধুকপুকুনি নিয়ে বলে “দোস্ত তোরা আমাকে একটা ওয়াদা করবি? বল তোরা কখনো আরিয়ান কে এই ব্যাপারে কিছু বলবি না। ও ওর মধুর বিষয়ে কারো সাথে আপোষ করে না। সে যেই হোক। আমার কসম তোদের কাছ থেকে যেন ও কোনভাবেই জানতে না পারে”
ওরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। অপূর্বর চোখে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট আরিয়ান কে হাড়ানোর ভয়। দুজনেই ওয়াদাবদ্ধ হলো যে, তাদের দ্বারা আরিয়ান কখনোই জানবে না কিছু। ওদের কথা শুনে অপূর্ব সাময়িকের জন্য স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেও ভেতরে ভেতরে তীব্র দহনে পুরছে হৃদয়। তখনই বাড়ির ভেতর থেকে আনোয়ার ইশান ডেকে বলে “তোমরা ভেতরে এসে হালকা নাস্তা করো। ওদের আসতে দেঁড়ি হবে”

ওরা একে ওপরের সাথে চাওয়া চাওয়ি করে উঠে ভেতরে যায়। সত্যিই কিছু নাস্তা করার দরকার। ওরা গিয়ে বৈঠক খানায় বসলে আরশি আর রুহি নাস্তা এনে দেয়। সাথে ওরাও খায়। মাহমুদা ইশান কয়েকজন লোক দিয়ে অনেকগুলো ফুলের ডালা পাঠায় আরিয়ানদের ঘরে। অপূর্ব একবার আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে চোখ সরাতে যাবে কিন্ত মাহমুদা ইশানের কথায় তার হাতসহ হৃদপিন্ডটা থেমে যায়।
“হ্যা গো আব্বারা তোমরা খেয়ে ওদের রুমটা সাজিয়ে দিয়ে আসো। এখানে তো তোমরাই আছো। সবাই মিলে একটু সাজিয়ে দিয়ো তো কেমন”

বলে তিনি আবারও নিজের কাজে মনোযোগ দেন। অভি অপূর্বের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে “থাক আমরা আমরা করে নেব। তোকে যেতে হবে না। তুই বরং বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নে। বাকিটা আমরা সামলে নেব”
অপূর্বের যেন গলায় কেউ চেপে ধরেছে। বড্ড হাশফাশ লাগছে ভেতরে। এতক্ষন যা হয়েছে মানার মত কিন্ত এখন কীনা যাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে তার জন্য নিজের হাতে বাসর সাজাবে? কী এমন পাপ করেছিলো যে আল্লাহ এমন ভায়নক শাস্তি দিচ্ছে তাকে? নিঃশ্বব্দে সে নিজের বক্ষস্থলের ভয়াবহ বাদ্যকে আড়াল করে ছোট্ট করে আওড়ায় “ভালো লাগছে না আমার। তোরা থাক। আমি চলে যাচ্ছি”
অরিন্দ শশব্যাস্ত হয়ে সুধায় করে “আরিয়ান ভাই জিজ্ঞেস করলে কী বলবো?”

অপূর্ব কিছুক্ষন নিরবে শব্দ খোঁজে। নাহ উত্তর দেয়ার মত উপযুক্ত শব্দ তার ভান্ডারে নেই। নিজেকে কিছুটা ধাতস্ত করার চেষ্টা করে কিছু বলতে। আচমকা ধপ করে চেয়ারে বসে পরে। রাশেদা ইশান এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন হঠাৎই ওকে এভাবে ধপ করে পড়তে দেখে চিৎকার করে উঠে। এগিয়ে আসতে আসতে অভি আর অরিন্দ ধরে ফেলে। কিছুক্ষনের মধ্যেই অপূর্ব জ্ঞান হাড়ায়। এই দু বছরে হিসাবের চেয়ে বেশি চেয়েছে সে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার কাজ করেছে একটা নাম। মনে প্রাণে ভেবেছে অগ্নিপরি তার। শুধু আর শুধুমাত্র তার। কিন্ত আচমকা সেদিন এমন একটা খবর শুনে নিজেকে ধরে রাখা দায়। সে ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি যে তার বন্ধুর মধুমতীই তার অগ্নিপরি। টের পেলে কক্ষনো ওকে ভালোবাসার মত দুঃস্বপ্ন দেখতো না। এই কয়েদিনে ভালোভাবে খাওয়া দাওয়া না করার ফলে শরীর দূর্বল।

তার উপর আজ প্রচুর ধকল গেছে। তাই দূর্বলতা ও মানসিক চাপ থেকে জ্ঞান হাড়িয়েছে। ততক্ষনে বাকিরাও সেখানে উপস্থিত হয়েছে। রাশেদা ইশান দ্রুত অপূর্ব কে উপরের ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিতে বলে। অভি অরিন্দ ও ফখরুল ইশান ধরে উপরের তলায় উঠে। দুর্ভাগ্য ক্রমে আরিয়ানদের পাশের ঘরেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। অভি সাময়িকের জন্য একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। উপর থেকে নিচে তাকিয়ে দেখে আরশিও মাহমুদা সেই কথায় স্তব্ধ নেত্রে দাঁড়িয়ে আছে। রুহি কত কিছু বলে শান্তনা দিচ্ছে। এসব দেখলে কী ভালো লাগে? অরিন্দ ও অভি নৈঃশ্বব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেমে আসে।

রুহিকে বলে ওকে ঘরে নিয়ে যেতে। রুহি জোর করে ওকে ঘরে নিয়ে যায়। ফিরে এসে তারা তিনজন সাথে কয়েকজন লোক নিয়ে আরিয়ানদের ঘরটা সাজিয়ে ফেলে। তারপর দরজায় খিল দিয়ে সেটাও ফুলে সজ্জিত করে। বারান্দায় আসতেই তখনই বাহির থেকে শোনা যায় হুরুস্থুল। হয়তো নব দম্পতিরা এসে গেছে। ওরা একবার উপরের ঘরটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে। ততক্ষনে বাড়ির সকলে তাদের বরণ করছে। তিনজনে গিয়ে দাঁড়ায়। আরিয়ান ও আয়াজ পালকি থেকে নেমে তাদের মাকে সালাম করে। আরিয়ান মুখটা ফুরফুরে হলেও আয়াজের মুখটা বিষন্নতায় ঘেরা। আরিয়ান হাসি মুখে পালকির সামনে গিয়ে মাধবীকে তার কোলে চড়তে বলে। মাধবী আহাম্মকের মত তাকিয়ে বলে “আমি কি সবার সামনে এভাবে যাবো?”

আরিয়ান ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়িয়ে বলে “হুম তাও তো কথা। আচ্ছা কোলে চরে মুখটা আমার বুকে লুকিয়ে রাখিস। তাহলে কেউ দেখবে না তোকে। চাইলে ঢুকেও পরতে পারিস। অনুমতি কিন্ত দেওয়া আছে”
“ভালো হবেন না আপনি?”
আরিয়ান চোখ টিপে শয়তানি হেসে বলে “কসম আজ রাতেই ভালো হয়ে যাবো”
বলতে বলতে মাধবীকে পাজকোলা করে কোলে তুলে নেয়। মাধবী কুণ্ঠায় মুখ ঠেকায় তার সফেদ পাঞ্জাবির বুকে। দু হাতে খামচে ধরে রাখে তার বক্ষস্থলের বোতাম দুটোকে। পায়ের নূপুর গুলো ঝুমঝুম করে উঠে। স্বজ্ঞানে থাকা অবস্থায় এই প্রথম কোন পুরুষের এতটা নিকটবর্তি সে। তার বক্ষস্থলের বা পাশের তীব্র ধুকপুকুনির সাথে আরিয়ানের বুকের ধুকপুকুনি মিলেমিশে একাকার হচ্ছে। আরিয়ানের গায়ের মন মাতানো শুঘ্রাণ তার ভেতর পর্যন্ত নাড়া দিচ্ছে। প্রণয়ের প্রথম ছোঁয়ার সাথে শুরু হয় প্রলয়ের শুত্রপাত।

আয়াজও ইচ্ছেকে পাজকোলা করে তোলে। মেয়েটা নেতিয়ে আছে। কিচ্ছুটি বলছে না মুখ ফুটে। যেন সে আস্ত একটা পুতুল। তাকে নিয়ে যে যা ইচ্ছা করবে তাতে তার কোন যায় আসে না। দু বর দুই বউ নামক রূপকথার রুপসীদের কোলে নিয়ে ‘ইশানস প্যালেস’ এর চৌকাঠ পেরোয়। দু বউয়ের নূপুরের শব্দে বাড়ি ঝুমঝুম করে উঠে। সকলে সম্মহোনি চিত্তে অনুভব করে বাড়িতে এই প্রথম বিয়ে হলো এবং প্রথমবারের মত বাড়িটা দ্বিগুণ আলোয় ঝলমলে হলো। দু বউকে বসানো হলো সোফায়। মাহমুদা ইশান মুগ্ধ চোখে অবলোকন করে তার একমাত্র পুত্র বধূকে। লাল বেনারসিতে কী অপূর্বই না লাগছে মেয়েটাকে।

বাড়ি ভরতি মেহমান কিলবিল করছে। পুরুষ মহিলা সব ধরণের লোক। মাধবীর ঘোমট টানা হয়েছে এককদম পুরো মুখ ঢেকে। শাড়ির নিচে ঢাকা পরেছে পা এবং ঘোমটার নিচে হাত। তবুও আরিয়ানের ভেতর নিশপিশ করছে এত মানুষের ভেতরে তার মধুকে বসিয়ে রাখতে। সবাই যে যার মত টেবিল সাজাচ্ছে। এখনই নব দম্পতিদের খাইয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেবেন। রাত তো কম হলো না। শীতের রাতের নয়টা। আজ রাতটা তো সকলের জীবনেরই আকাঙ্খিত একটি রাত। তাই তারা তাড়াতাড়ি যা করার করছে। দু বউ তো আগেই এ বাড়িতে থেকেছে তাই আর কেউ অযথা নিয়ম কানুন পালন করেননি। সকলে গ্রামে যাওয়ার আগে মাধবী আরিয়ান দুজনেই পইপই করে বলে গেছে বাহিরের মেহমানদের সামনে যেন মাধবীর কন্ঠ শোনাতে না হয়। এমনকি রাতের খাবারও ওদের ঘরে দিয়ে আসার কথা বলে গেছে। হাতের কাজের ফাঁকে রাশেদা ইশান বলেন “মাধবী মায়ের খাবার যেহেতু ঘরে দেয়া হবে তো ওদেরটাও ওখানেই দেয়া হোক”

নমিতা ইশানও শায় জানায় “হ্যা গো ভাবি উপরেই দিয়ে দিন”
মাহমুদা ইশানও আর নাকচ না করে বসার ঘরে এসে বলে “যার যার বউ নিজ দায়িত্বে ঘরে নিয়ে যাও। ঘরে তোমাদের খাবার পৌছে যাবে। আর বাকিরা সবাই খেতে বসো”
উনার বলতে দেঁড়ি আরিয়ানের মাধবীকে কোলে নিয়ে উপরে উঠতে দেঁড়ি হয় না। মাধবী হকচকিয়ে উঠে মনে মনে খাছ বাংলায় দুটো গালি ছুড়ে দেয় আরিয়ানের উদ্দেশ্যে। আশেপাশে মানুষ না থাকলে মুখেই বলতো। মাহমুদা ইশান দাঁড়িয়ে বিরবির করে “হতচ্ছাড়া বউয়ের ট্যাওটা”

আয়াজ আর কী করবে। আরিয়ান যেহেতু পাজকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে তাকেও তো সেভাবেই নিতে হবে। ভালোবাসা না থাকলেও দেখাতে তো হবে! ভাবনা মত ইচ্ছেকে পাঁজকোলা করে নেয়। মেয়েটার ভাবভঙ্গী একই রকম। না কোন ভালো অনুভূতি আছে আর না কোন তিক্ততা। দুই নব দম্পতিরা বিদায় নিলে তারা খাবারগুলো পাঠিয়ে দেয়। সবাই নিজেদের মত খাওয়া দাওয়া করে আড্ডায় বসে। আয়াজ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে কোন দিকে না তাকিয়ে আগে ইচ্ছেকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। ইচ্ছে আশপাশটায় একবার অবলোকন করে শশব্যাস্ত চোখ নামিয়ে ফেলে। আয়াজ বারান্দায় চলে গেছে। সে একবার বারান্দার উঁকি দিয়ে সেদিকে পা বারায়। খুব ক্ষীণ স্বরে সুধায় “ভেতরের দরজাটা চাপিয়ে দিচ্ছি। শাড়ি পাল্টাবো”

আয়াজ দূর আকাশে তাকিয়ে থেকেই আনমনে উত্তর দেয় “হুম”
ইচ্ছে কোন কথা না বারিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে শাড়িটা পালটে সেলোয়ার কামিজ পরে নেয়। দরজাটা খুলে দিলে আয়াজ ঢুকে কোন কথা ছাড়া সোফায় গিয়ে শুয়ে পরে। ইচ্ছে একবার সেদিকে তাকিয়ে নিজেও বিছানায় গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পরে। চলে গেল তাদের শ্রেষ্ঠ রাতটা অমাবশ্যার ন্যায় কেটে গেল। ভাতের থাল এভাবেই পরে রইল অনাদরে।

আরিয়ান মাধবীকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই নানান রকম ফুলের সুবাস বারি খায় তাদের নাখশ্রাব্দে। মাধবী তার বক্ষস্থল থেকে মুখ উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করে কিন্ত আকস্মিক আরিয়ানের কাজে একেবারেই ভরকে যায় মেয়েটা। অসভ্য লোকটা কোনভাবে দরজাটা লাগিয়ে রুমের মাঝ বরাবর এসে তাকে কোলে নিয়েই ঘুরতে থাকে। মাধবী মৃদু চেঁচিয়ে উঠে। যেভাবে পারে কিল ঘুষি দিতে থাকে স্বামীর প্রশস্ত বুকে। কিন্ত আরিয়ানের কোন হোলদোল নেই। প্রায় দশ মিনিট হতে যাবে এমন সময় আরিয়ান তাকে নামায়। লোকটার মুখে ঝলমলে হাসি।সে নিভু চোখে দেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস চালালো। তার মাথা ঘুরছে। অথচ লোকটা কত অবলীলায় দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান মাথা নিচু করে মাধবীর মুখের সামনে আসে। টক্কর খায় নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস।

“কাপড় পালটে ওযু করে আসুন তো গৃহিনী সাহেবা। উপর ওয়ালার কাছে একটু শুক্রিয়া আদায় করি আমার মত ভোলাভালা এমপির গৃহে এমন এক হৃদয়েশ্বরী ডাকাত রাণীকে পাঠানোর জন্য”
মাধবীর কানে বারি খায় ‘গৃহিনী সাহেবা’ আর ‘হৃদয়েশ্বরী’ কথাটা। সন্তুষ্ট হয় তার ব্যাকুল চিত্ত। লাজুক হাসি ঝলকায় পাতলা ওষ্ঠে। সেদিকে নেশাগ্রস্থের ন্যায় দৃষ্টি ফেলে অভদ্র পুরুষটা। তাড়া দেয় জলদি ওযু করে আসতে। মাধবী আর কথা না বারিয়ে ওযু করে আসে। দুজনে আগ পিছ দাঁড়িয়ে দু রাকাত নামায পড়ে। মোনাজাতে আরিয়ান খুব করে রবের শুক্রিয়া আদায় করলেও মাধবী কান্না করে দেয়। এই দিনটা যে বাবা ছাড়া একেবারেই শূণ্য শূণ্য লেগেছে। বদনে হাসি টেনে রাখলেও চিত্তে ছিলো গভীর শূণ্যতা। পরিবার হীনতা। বিষয়টা আর কেউ না জানলেও মাধবী নিজে তো জানে, আসলে মানুষ তাকে খুব কঠোর ভাবলেও সে তো শুধু বাহিরেই বহন করে তার কঠোরতা।

ভেতরে ভেতরে তো সে তার নামের মাধবীলতা ফুলের মতই সচ্ছ ও কমোল হৃদয়ের অধিকারিনী। আজ সারাটা দিন তার মনে ঝর বয়েছে কেবল বাবার শূণ্যতায়। এই দিনে মাহফুজ চৌধুরী থাকলে কতই না খুশি হতেন। কিন্ত তিনি অনুপস্থিত। তিনি দেখতে পারলেন না স্বচোখে মেয়ের খুশি। ভাবতেই মাধবীর মন বিষিয়ে উঠে। সে তো চেষ্টার খামতি রাখছে না খুনিদের খোঁজার। তবুও আজ পর্যন্ত একটা প্রমাণ পায়নি। যখন সে ব্যার্থ হয় তখন নিজেকে তার বড্ড অসহায় মনে হয়। তখনই অনুভব করে তার বাবা নেই। সে এতিম। পরিবারহীন। ভাবতেই হুহু করে মোনাজাতেই কান্না করে দেয়।

বাধ ভাঙে জমানো অশ্রুরা। আরিয়ান শশব্যাস্ত হয়ে সুধায় কী হয়েছে। কিন্ত সে উত্তর না দিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় রবের দরবারে “ইয়া রব। আমার মত পাপী তোমার দরবারে নির্লজ্জের মত চাইছি গো মাওলা। তুমি আমার পাঞ্জাবিওয়ালাকে আমার চিরসঙ্গী বানাও। এক পাপী হয়ে ভীক্ষা চাইছি আরেক পাপীর নিঃশ্বর্ত ভালোবাসা। তোমার অধম বান্দা এতিম গো খোদা। তাকে জীবন যুদ্ধে সফলতা দেও। মৃত পিতাকে দেওয়া ওয়াদা যেন আমি পূরন করতে পারি। প্রতিটা খুনিকে যেন নিজ হাতে মিনি জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে আনতে পারি। তুমি তৌফিক দান করো”
মোনাজাত ভেঙে চোখ মুছতে মুছতে খেয়াল করে আরিয়ান তার একেবারে সম্মুখে বসে আছে। শুনে ফেললো কী ?

তাহলে তো তাকে দূর্বল ভাববে। সে তো কান্নাও করতে চায় না কিন্ত মন আর চোখের পানি দুটোই যে বেঈমানী করে। আরিয়ান টুঁ শব্দ না করে আবারও তাকে পাজঁকোলা করে নিয়ে পালঙ্কে বসায়। স্বযত্নে চোখের কোণ মুছে দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে তার প্রশস্ত বক্ষে। মন থেকে কতটা ভাঙা তবে বাহিরে কী শক্ত খোলসেই না থাকে এই নবযৌবনা তরুণী! দীর্ঘদিন পর এরকম একটা নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত বুক পেয়ে মাধবী আর ধরে রাখতে পারে না নিজেকে। স্বামীর পাঞ্জাবির কলার খাঁমচে হাউমাউ করে চিৎকার করে কেঁদে উঠে তরুণী। এতদিন ধরে হৃদয়ে জমে থাকা বরফ শুরু করে প্রাণ প্রিয় স্বামীর উষ্ণতায়। মেয়েটা প্রচণ্ড ধৈর্যশীল।

নাহলে পুরো পরিবারের মৃত্যুর পরেও শুধু কান্না করেছিলো সেদিন। এরপর গ্রাম থেকে আসার পথে জঙ্গলে। এছাড়া কান্না নামক কোন কিছুর আস্তিত্বই যেন নেই তার ডাগড় ডাগাড় আখি জুড়ে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে মেয়েটার তবুও আরিয়ান বাঁধা দেয় না। দীর্ঘদিন পর কান্না করছে। কান্না না করতে পারলেই তো দুঃখ ব্যাপক হয়। অনেকক্ষন পর সে নিজ থেকেই নেতিয়ে আসে। যখন বুঝলো মেয়েটার কান্না পুরো দমে শেষ হয়েছে তখন আবারও মুছে দেয় আখির কোণ। মাধবী মাথা তুলে তাকায়। আজ তাহলে কোনভাবেই নিজের দূর্বলতা লুকোতে পারলো না? সে ধীরে ধীরে মাথা তোলে। আরিয়ান নিজের পাঞ্জাবির দিকে তাকায় বুকের কাছে পুরোটাই ভেজা। নাহ অনেক হয়েছে এই গুমট পরিবেশ। এবার মেয়েটাকে হাসাতে হবে। সে ভ্রু কুচকে বলে “এটা কি করলি?”
মাধবী নাক টেনে বলে “কী করলাম?”

“এই যে পাঞ্জাবিটাকে নিজের ব্যক্তিগত রুমাল ভেবে সর্দি মুছলি। কে ধুবে পাঞ্জাবি?”
মাধবী বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলে “বালের মায় এসে ধুয়ে দিয়ে যাবে”
“সেই বালের মা টা বরং তুই হয়ে যা”
“আপনি কি ঠিকই করে ফেলেছেন যে ভালো হবেন না?”
“আসার সময় তো বললাম”
“কী বললেন?”
“তুই চাইলে এই শীতের সকালে প্রতিদিন তোর ফরজ গোসলের কারণ হতে পারি। বিশ্বাস কর কসম গোসল খানা থেকে বেরিয়েই ভালো হয়ে যাবো”
মাধবী নাখ মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠে “ছিঃ কী নির্লজ্জ বেহায়া লোক। আপনার মত নির্লজ্জ আমি জীবনে দুটো দেখিনি”
“দেখবি কীভাবে। তুই মানুষই তো দেখেছিস কয়েকটা। আর লজ্জা নারীদের ভূষন। পুরুষদের বেলেহাজ চরিত্রেই মানায়। তবে সেটা শুধু ব্যাক্তিগত ঘরোনির ক্ষেত্রে”
“তাই বলে মুখে যা আসবে তাই বলবেন!”

আরিয়ান তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছোড়ে “তোকে একটা চুমু খাই?”। তবে শুধু মুখে বললেও অনুমতির অপেক্ষা করেনি। তৎক্ষনাত দীর্ঘদিনের প্রতিক্ষার পর তার রুক্ষ ওষ্ঠের মিলন হয় এক মোলায়েম ওষ্ঠের সাথে। সেসময়ই আরিয়ান ছোট্ট করে আওড়ায় #তুই_আমার_৭_মিনিট”। মাধবী কথার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করতে যাবে তবে পারে না।ধীরে ধীরে বারতে থাকে লোকটার উন্মাদনা। খাবার পরে রয় টেবিলের বুকে।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩১

আরিয়াননের হস্তজোরা বিচরণ করে তরুনীর দেহের আঁকা বাকা পথ ধরে। উষ্ণতা ছড়ায় নারী দেহের প্রতিটা খাঁজে খাঁজে। তরুণীর দেহ নেতিয়ে পরলে সে শক্ত করে ধরে তাকে। দুজনের মধ্যখানের ফাঁকটা সঙ্কুচিত হয়ে আসে। তরুণীও সায় জানালো স্বামীর আহ্বানে। নানান প্রজাতির ফুলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়। এক টুকরো নূর এসে ধরা দেয় ঘরে। নব জাগরণ হয় মরণ প্রেমের। যে প্রমে আছে – প্রণয় , প্রলয় , ধ্বংস , বিশ্বাস , প্রতিশ্রুতি , প্রতিশোধ , সনর্থন , ক্ষয় , অনিষ্ট , অনিশ্চয়তা ও অন্ধকার। সব কিছু ছঁপিয়েও আজ এক হয়েছে দুটো নিঃশ্বাস। সেদিন রাতটা ছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম রাত।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩২