তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৪
ঐশী আফরিন
চারদিকে মৃদু আলো ফুঁটতে শুরু করেছে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে গরুর গাড়িটা নিজ গতিতে এগোচ্ছে। হিমেল হাওয়ায় মন জুরিয়ে যাওয়ার কথা; কিন্ত গাড়ির প্রতিটা লোক বিষন্ন। ইচ্ছে ছাউনিতে কপাল ঠেকিয়ে অদূরে থাকা মাঠ ঘাট দেখছে। পরনের শ্যাওলা রঙের শাড়িটে আর একটু হলেই চাকায় লেগে যাবে। কিন্ত সেদিকে তার ধ্যান নেই। তার কাঁধেই রুহি মাথা রেখে চোখ বুজে আছে।
যথা সম্ভব কান্না দমিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে সাথে মন মস্তিষ্ক জুড়ে তার অভি নামক ডাক্তার বাবুর রাজত্ব। আয়াজ এক পা ছরিয়ে আরেক হাঁটুর উপর বা কনুই ঠেকিয়ে রেখেছে। ডান হাতে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে। চোখ সামনে দৌড়ানো ষাড় দুটোর গলার রশির দিকে। ফখরুল ইশান এখানেই শুয়ে ঘুমিয়েছে। আশেপাশে কোলাহল বলতে বেশি নমিতা ইশানের কান্নার শব্দই শোনা যাচ্ছে। মহিলা যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছে রুহিকে। অন্য সময় হলে আয়াজ তেঁতে উঠতো বোনকে বকাবকি করার জন্য। কিন্ত এখন নিশ্চুপ। বড্ড বেশি কষ্ট পেয়েছে কিনা বোনের ব্যবহারে!
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
প্রায় মিনিট দশের মধ্যেই তারা একটা ভাঙা টিনের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। দুটো টিনের ঘরের পাশেই আরো দুটো মাটির ঘর। উঠোনের বা দিকের গোয়াল ঘর থেকে গরুর হাঁক ডাক শোনা যাচ্ছে। নমিতা ইশান অনেক গুলো বছর পর এলেন বাপের বাড়ি। বাবা মা মরার পর এই প্রথম আসা। বাড়িতে দু ভাই থাকে নিজেদের বউ বাচ্চাদের নিয়ে। ওদের নিজেদেরই অভাবের সংসার;এখন এতগুলো মানুষ দেখে কি না কি বলে। নমিতা ইশান নিজেই দরজায় কড়া নাড়লে ভেতর থেকে ওনার বড় ভাইয়ের বউ বেরিয়ে আসে। এতগুলো মানুষ দেখতেই উনার মুখের ভঙ্গিমা পাল্টে যায়। চটজলদি দরজা ছেড়ে বাহিরে বেরিয়ে আসে। কুৎসিত ভঙ্গিমায় বলে “সক্কাল সক্কাল আইয়া পরলেন যে এই গরিবের বাড়ি? তা বাড়িত থাইকা বাহির কইরা দিলো নাকি?”
নমিতা ইশান আচঁলে মুখ লুকিয়ে চোখের পানি মোছে। ছেলের বউটাকে প্রথম নিয়ে আসলেন বাপের বাড়ি, তা-ও এই অবস্থায়। তিনি জানেন নিজের ভাই বউদের চরিত্র। এখনে থাকতে দেবে ঠিকই কিন্ত চরম অপমান আর লাঞ্ছিতের সহিত। তিনি করুন স্বরে বলে “কেমন আছেন ভাবি?”
মহিলা আবারও কটাক্ষ করে বলে “গেরামে থাহি, গরু টরু পালি; তয় যেমনে থাহার হেমনেই আছি। কইলি না তো সাত সকালে আইছোছ ক্যান?”
নমিতা ইশান কিছুটা অনুনয় করে বলে “ভাবি! শুধু কয়েকটা দিন এই বাড়িতে থেকেই চলে যাবো। দেখোনা আয়াজের বউ নিয়ে আসছি। ভাইজান কই? ডাক দিয়ে দেখতে বলো”
বহিরের কথাবার্তার শব্দ শুনে লতিফ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। লুঙ্গি ঠিক করতে করতে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে “ওই মাটির ঘরে থাকোন লাগবো। পারবি নি এতগুলা মানুষ দুইডা ঘরে থাকতে?”
নমিতা ইশান কৃতজ্ঞতা সহিত মাথা নাড়িয়ে বলে “হবে ভাইজান,হবে। আয়াজ আর বাবা এক ঘরে থাকবে আর আমরা মেয়েরা এক ঘরে”
“হইলে তো হইলোই। যা ঘর গুছায়ে নে। সকালের খাওন বানাইতে সাহায্য করিছ তোর ভাবিরে”
বলে চাবিটা নমিতার হাতে দিয়ে বউকে নিয়ে ঘরে ঢুকে পরে। চাবি হাতে নিয়ে তিনি আবারও চোখের জল মোছেন। আয়াজ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সবটা সহ্য করে নেয় স্বার্থের জন্য। রুহি ডুকরে কেঁদে উঠে। তার জন্যই তো সবাই কে অপমানিত হতে হয়েছে। ইচ্ছে এই প্রথম আসলো কিন্ত তাকেও তার জন্য তাচ্ছিল্যের স্বীকার হতে হলো। নমিতা চোখের কোণ মুছে দরজা খুলে দেয়। ভেতরে অনেক দিন ধরেই কেউ না থাকায় মাকরশার জাল বিছিয়ে আছে সাথে ধুলো বালিতে একাকার অবস্থা। দুটো ঘরের দুটো চৌকিতে শুধু দুটো শীতল পাটি বেছানো। আর দুটো বালিশ। আয়াজ ঘরের অবস্থা দেখা মাত্রই বেরিয়ে যায়।
বাজারের বট তলায় বসে সিগারেট ফুঁকবে বলে। রুহি কান্না থামিয়ে ঘর গুছতে সাহায্য করে। ইচ্ছেও হাত লাগায়। নমিতা আরেক দফা রুহিকে গালিগালাজ করে সকালের নাস্তা বানাতে যায়। ঘরে গোছানো শেষে ইচ্ছে ঘুমিয়ে পরে। রুহি পাশের জানালার সামনে দাঁড়ায়। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে। সবসময় নরম বিছানায় ঘুমানো মানুষ গুলো আজ শক্ত চৌকিতে ঘুমাবে। এক দিকে সে নিশ্চিন্ত, আর যাই হোক তাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে পারবে না। কিন্ত কতদিনই বা এতগুলো লোককে ওরা চালাবে। বাড়িতে কি আদেও আর কখনও যাওয়া হবে কিনা তা-ও ঠিক নেই। ভাইকেও কি আর কখনও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারবে? কীভাবেই বা বলবে? এত বড় বেয়াদবির পর তার ভাই কি এখনও তাকে ভালবাসবে আগের মত? কাল রাতে তো অভির গায়ে হাত দিয়ে দিয়েছিলো বলে তার মাথা ঠিক ছিলো না। হঠাৎ করেই কেন যেন তার মনে হচ্ছে জীবন টা দূর্বিসহ হয়ে উঠবে। ভালোবাসায় এই ধর্মের দেয়াল তাদের ধ্বংস করে দেবে। মাত্র তো বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। সামনে আর কি কি ছাড়তে হয়, আল্লাহ মালুম।
সুবিশাল ছায়ালোকের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে অবিস্তিন্য মেঘের রাজত্ব। চারদিকে আবছা অন্ধকারে তাকালে শুধু দেখা যায় মানুষের হাহাকার আর বিষাদ বদন। ঠান্ডা হিমেল হাওয়া বইছে গ্রাম জুড়ে। এটাই তো সেই বাতাস! যা শুধু কারণে অকারণে বয়ে বেরাতো ময়মনসিংহের রাণী মায়ের গায়ে। কিন্ত আজ? আজ তা রাণী মাকে ছাড়িয়ে বয়ে চলছে তার সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ রাজ্য জুড়ে। লোকেদের এই বিদ্ধস্ত ভীত চেহারা আঘাত হানছে রাণীর মনে। সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধের কথা। কথাটা ঠিক কতখানি সত্য তা যাচাই না করেই তা মনে হচ্ছে সব শেষ হতে চললো।
ছোট থেকে এই পর্যন্ত এত দুঃসাহসীকতার পরিচয় দিয়ে কিই বা হলো? তার দুঃসাহসীকতায়-ই তো তার বাবা ভরসা করে তাকে নিজের তিল তিল করে পরিশ্রমে গড়া গ্রামটা হাতে তুলে দিয়ে গেছে। নিজের কথা না ভেবেও গ্রামের লোকের সমস্ত বিপদাপদে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্ষনো কোন অনাচার অবিচার হতে দেয়নি। ঘূর্ণাক্ষরেও কাউকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। উনার সেই সাধের গড়া রাজ্যে কি হলো হঠাত? যে সবাই ধ্বংস হবে। মাধবী কী আদেও পারবে তার বাবার সন্মান রেখে রাজ্যের প্রতিটা মানুষ কে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে? কেমন এমন হচ্ছে তার সাথে? প্রথমে ভাইকে হাড়ালো পরে হাড়ালো সম্পূর্ণ পরিবারকেই। এখন শেষ সম্বল রাজ্যের মানুষগুলোকেও যদি হাড়িয়ে ফেলে তো কি হবে এই রাণীর মুকুট পরে? আর কি-ই বা হবে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে? এরকম নানান বিসংবাদ এসে ধরা দেয় মাধবীর মস্তিষ্কে। আচানক সমস্ত অন্তঃকরণ জুড়ে ছরিয়ে যাচ্ছে হিংস্রতা। মস্তিষ্ক জুড়ে বারি খাচ্ছে একটাই কথা ‘ভেঙে পরলে চলবে না,সাহস রাখতে হবে,শত্রুর সামনে নিজেকে দূর্বল প্রমাণ করা যাবে না,এবং ধীরতা ও কাঠিন্যতা অবলম্বন করতে হবে। এটাই তো শিখিয়েছে তার বাবা।
“আপনার কথা যে সত্য সেটার প্রমাণ কী?”
আরিয়ানের গম্ভীর ধাঁচের উচ্চবাক্যে করা প্রশ্নে ধ্যান ভাঙে মাধবীর। আরিয়ানের উচ্চবাক্য প্রশ্নে বৃদ্ধ লোকটাও উচ্চবাক্যে হেসে উঠে “বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হলে কর। তবে প্রমাণ চাস না”
তারপর লাঠির সাহায্যে পেছনের শোয়ানো লোকটার দিকে ইশারা করে বলে “যাহ দেখা আয় ওর মৃত্যুটা”
আরিয়ান ভ্রু কুঞ্চিত করে বৃদ্ধের পেছনে তাকায়। বৃদ্ধের কথা মত মাধবী সামনে এগিয়ে যায়। হাঁটু গেছে বসে পরে সুইয়ে রাখা লোকটার সামনে। গলার স্বর যথাসম্ভব শক্ত রেখে জিজ্ঞেস করে “কীভাবে হয়েছে ওর মৃত্যু?”
কান্নারত মহিলারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আরিয়ান এসে হাতের শীড়া অনুধাবন করে। লোকটার সম্পূর্ণ হাত পা অসাড় হয়ে বরফ শীতল হয়ে আছে। হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে “অনেকক্ষন আগেই মারা গেছে”
পাশ থেকে এক মহিলা বলে “না সাহেব। এই অল্প কিছুক্ষনের মাঝেই মারা গেছে”
মহিলার কথা সে অবাক হয় প্রচুর “কিছুক্ষনের মধ্যে মারা গেলে এত তাড়াতাড়িই শরীর অসার হয়ে গেল কীভাবে?”
মহিলাটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জবাব দেয় “জানি না সাহেব”
মহিলার উত্তর ভাবিয়ে তোলে তাকে। মাধবীর দিকে তাকালে মাধবী চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে মহিলাকে জিজ্ঞেস করে “কীভাবে মারা গেলো কিছু জানেন?”
মহিলাটা বললো “ওর বউ জানে”
মাধবী আদেশ দেয় লোকটার বউকে সামনে আনার জন্য। এক অল্প বয়সী মহিলা সামনে আসলে মাধবী জিজ্ঞেস করে “আপনি কাল রাতে আপনার স্বামীর সাথে ছিলেন?”
মহিলা কাঁপা কন্ঠে বলে “জে রাণী মা”
“শুরু থেকে শেষ সম্পূর্ণ ঘটনা বলবেন। কিচ্ছু যেন বাদ না যায়”
আরিয়ানের মৃদু ধমকে মহিলাটা আবারও কেঁপে উঠে। তার তো কাল শেষ রাতের দৃশ্য গুলো মনে হলেই বুক কেঁপে উঠে। তবুও সাহস জুগিয়ে বলা শুরু করলো।
রাত তখন মধ্যভাগে। গ্রামটা আজ সন্ধ্যা থেকেই নিরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে। এমন নিস্তব্ধতায় সন্ধ্যা থেকেই মনে হচ্ছিলো গভীর রাত বিধায় গ্রামের লোকেরা যে যার মত ঘুমিয়ে যায়। ওরা দুজনোও ঘুমিয়ে যায়। তবে গভীর রাতে হঠাৎই দূর থেকে ভেসে আসে নাম ধরে ডাকার শব্দ।
“আ…লি…ফ…?”
ডাকটা এতটাই ভয়ংকর ছিলো যেন মনে হচ্ছিল, যে ডাকছে তাকে কেউ শ্বাসরোধ করে রেখেছে। নিজের নামটা এমন ভয়ানক আওয়াজে কানে যেতেই ধরফরিয়ে উঠে বসে আলিফ। তার এমন তাড়াহুড়ো করে উঠাতে ঘুম ভেঙে যায় রেহেনারও। কিছু জিজ্ঞেস করবে স্বামীকে তার আগেই তার বুকের ভেতর অকারণেই ধাক্কা খেলো হৃদপিন্ড। আশপাশ আরো নিঝুম মনে হচ্ছে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ থাকার পরেও মনে হলো ভেতরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎই চৌকির নিচ থেকে ‘খচ…খচ…’ শব্দ হলো। যেন কেউ নখের আঁচরে মাটি খুরছে। আলিফ নিঃশ্বাস আটকে ফেলে। কপাল বেয়ে সরু ঘামে রেখা নেমে যাচ্ছে। আচমকা দরজার অপাশ থেকে ভেসে আসলো কারো ফিসফিসানো কন্ঠ “খুলে দে খোকা”
কন্ঠ টা তার খুব পরিচিত। মায়ের কন্ঠ। কিন্ত তার মা তো তিন বছর আগেই মারা গেছে। যেই দরজাটা এতক্ষন লাগানো ছিলো তা এখন অল্প ফাঁক হয়ে গেল। চাঁদের আলো গলে এক সুবিশাল লম্বা ছাঁয়া পড়লো ঘরে। রেহেনা ভয়ে চিৎকার দিতে যাবে কিন্ত আলিফ থামিয়ে দেয়। দরজার দিকে এগোতে নিলে রেহেনা দুহাতে মুখ চেপে ধরে। আলিফ যেই না ছাঁয়াটার কাছে গেল সঙ্গে সঙ্গেই এক বিকট হাসিতে কেঁপে উঠলো মাটির ঘরখানা। এতটাই বিকৃত হাসি যে রেহেনা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হাড়ায়। তার পরেই শেষ রাতের দিকে আলিফের প্রাণ ছেড়া বিকট চিৎকারে গ্রামের লোকজন জড়ো হয় তাদের ঘরের সামনে। অদ্ভুত ভাবে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় তা ভাঙতে হলো। মেঝেতে দেখা গেল আলিফের নিথর দেহ পরে থাকতে। চোখে মুখে ছড়িয়ে আছে আতঙ্ক। চেহারা হয়ে আছে রক্তশূন্য ফ্যকাশে। কীভাবে মারা গেল কেউই বুঝলো না। কেননা সম্পূর্ণ শরীরে কোন মারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শুধু ঘারের কাছে সিদূর দিয়ে লেখা একটা চিহ্ন ছাড়া।
রেহেনার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরিয়ান আলিফের ঘারের দিকটা উন্মুক্ত করে। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটি চিহ্ন। যা কিছুটা তারার মত সিদূর দিয়ে আঁকা। মাধবীও চিহ্ন টা খেয়াল করে। কিন্ত কারোরই কিছু বুঝে আসে না। আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে “কোন ঘরে হয়েছে এসব?”
রেহেনা হাতে ইশারায় ঘর দেখিয়ে দিলে মাধবী আরিয়ান দুজনেই প্রবেশ করে। আশপাশ লক্ষ্য করলে দেখতে পায় এক কোণে একটি লাল কাপড় রাখা। আরিয়ান সেদিকে এগিয়ে যায়। কাপড়টা ধরতে নিলে বৃদ্ধ লোকটি থামিয়ে দিয়ে বলে “তুই স্পর্শ করিস না বাছা। আমি দেখছি”
আরিয়ান কপাল কুঁচকে সরে গেলে লোকটা কাপড়টা হাতে নিয়ে ভাজ খুললে দেখা যায় তাতে কালো সুতোর লেখা
“যার সময় শেষ….
সে আলিফ….
‘পরেরজন’…”
লেখাটা পরে বৃদ্ধ লোকটা কেমন করে মাথাটা দুলিয়ে বলে “আরো লোক মরবে। দেখেনিস। পরেরজন। পরেরজন কে তৈরী থাকতে বল”
লেখাটা দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আরো লোক মারা। মাধবী বিচলিত হয়ে বলে “কিন্ত কে করছে এসব?”
বৃদ্ধ লোকটা মাথা নাড়িয়ে কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে “ইতিহাস ঘাটতে হবে রে বাছা। আমি নিশ্চিত কারো অতৃপ্ত আত্মা রয়েছে এই গ্রামে। নিজের অতৃপ্ত আত্মা কে তৃপ্ত করতে কেউ শুরু করেছে ধ্বংস লিলা। যে কারো অভিশাপে অভিশপ্ত হয়ে আছে গ্রাম। সব থেকে বড় কথা কালো যাদুর স্বীকার হয়েছে এই অভিশপ্ত নগরী। এর থেকে প্রতিকার পেতে বেগ পোহাতে হবে তোদের”
বৃদ্ধের কথা শেষ হতেই আরিয়ান বলে “আপনি কীভাবে জানেন এসব?”
“আমি সব জানিরে বাছা”
“আপনি কী এই গ্রামেই থাকেন?”
“লোকচক্ষুর আড়ালে”
“মানে?”
“মানে কিছু না। এখন অপেক্ষা কর কাল পর্যন্ত”
বলে বৃদ্ধ টি বেরিয়ে যায়। মাধবী আরিয়ানের কাছে এগিয়ে আসলে আরিয়ান বলে “শালা বড্ড রহস্যজনক”
মাধবী দরজার দিকে চোখ রেখেই বলে “তা ঠিক। কিন্ত এখন কীভাবে কী করবেন?”
“আজ রাতটা দেখি। যদি শালার কথা মত আর কেউ মারা যায়। তাহলে বুঝবো শালা কাজের”
মাধবীও সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে বের হয়। চারদিক থেকে গ্রামের লোকজন ঘিরে ধরে তাদের। সকলে মাথা নিচু করে বলে “রাণী মা তাহলে কী আমরা সকলে মারা যাবো?”
লোকের কথায় মাধবী আরিয়ান একে ওপরের দিকে তাকায়। আরিয়ান চোখ দিয়ে মাধবীকে আশ্বাস দেয় ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। স্বামীর আশ্বাস পেয়ে মাধবী স্মিথ হেসে গলা উঁচিয়ে বলে,
“শুনে রাখো সকলে। সাম্রাজ্যটা জমিদার মাহফুজ চৌধুরীর। আর তার কন্যা রাণী মাধবীলতা বেঁচে থাকতে তার সাম্রাজ্য কক্ষনো ধ্বংস হতে দেবে না। সমস্ত সাধারণ প্রজাদের কথা দিলাম, সব অনিষ্টতা এবং অভিশাপের ছাঁয়া ছঁপিয়েও এক মুঠো সুখের সন্ধান এনে ফেলবো আপনাদের চরণে”
আগাম বিপদ সংকেত কাঁধে নিয়েও গ্রামবাসীর ঠোঁটে দেখা যায় হাসির ঝিলিক। একসাথে ঝাঝিয়ে উঠে তাদের কন্ঠস্বর,
” জয় সেনাপতি আরিয়ান, জয় রাণী মাধবীলতা”
আবছা সোনালি রোদ হাতছানি দিচ্ছে ঊর্ধ্ব দিগন্ত জুড়ে। পাল্লা দিয়ে নীড়ে ফিরছে অবসন্ন পাখপাখালিরা। ধীরে ধীরে আবার তা ছাই বর্ণও ধারন করছে।আকাশের কোণে কালচে ছাঁদের ওপর ছোপ ছোপ রক্তিম আভারাও মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়। সন্ধ্যার হিমেল হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে মাধবীও পাঞ্জাবিওয়ালার জন্য অপেক্ষরত হয়ে আছে। আরিয়ান কিছুক্ষন আগে অজয়ের সাথে এক কবরস্থান দর্শনে বেরিয়েছে। সংবাদ এসেছে ৬০-৭০ হাজার বছর পুরনো সেই কবরটা নাকি আজ সকালে উল্টে গেছে। কৃষকেরা ক্ষেতে যাওয়ার পথে দেখেছে কবরের মাটি উলোট পালট হয়ে উপরে হাড়গোড় পরে আছে।
খবরটা শোনামাত্র আরিয়ান বেরিয়ে গেছে। মাধবীও যেতে চেয়েছিলো কিন্ত বাধা হয়েছে আরিয়ান। সেদিন সেই বৃদ্ধের বলা কথাটাই ফলে যাচ্ছে সপ্তাহ খানেক ধরে। তাই তারা গ্রামে এসে গেছে একেবারে। প্রতিদিনই একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে। এবং মৃত্যুটা একই ভাবে একই আলামতেই হচ্ছে। এবং ঘরের কোণে পাওয়া যাচ্ছে সেই একই লেখা “যার সময় শেষ… তার নাম অমুক… পরেরজন” । পুরো সপ্তাহেও কেউ কোন প্রতিকার দিতে পারেনি। কালো যাদু কিংবা আধ্যাত্মিক বিষয়ে মাধবী কখনও সরাসরি আরিয়ানের সাথে কথা বলেনি। কেননা বললেই দুজনেরই দুজনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই কাকতালীয় ভাবে দুজনেই এই বিষয়ে দুজনকে এরিয়ে চলে। কিন্ত এখন অনেক ভাবার পর মাধবী দেখলো, এখন কথা না বললে গ্রাম সত্যিই ধ্বংসের পথে।
আকাশের পেজাঁতুলোর মত মেঘের দিকে তাকিয়ে আনমনেই ভেবে যাচ্ছে এসব। আচমকা নিজের ‘আরিয়ানের সাথে কালো যাদু নিয়ে সরাসরি কথা বলবে’ এই ভাবনায় নিজেই হকচকিয়ে যায়। দৃষ্টি নিবন্ধ করে ছাদের পাশের ছোট্ট দেয়ালের উপর বসা পেঁচাটার দিকে। আজও তাদের সাথে সাথে থাকে এটা। একটি বারের জন্যও চোখের আড়াল হয় না। আনমনেই সে পেঁচাটকে ‘বুলবুল’ নামে নামকরণ করে। সে যেই সন্দেহের বসে বুলবুলকে বন্দি করেছিল তার কোন কিছুই ঘটেনি। আজও এটা তাদের কোন ক্ষতি করেনি। তবে মাধবী পুরোপুরি আস্থাও করেনি। কেননা পেঁচা অশুভ। বুলবুলের দিকে দৃষ্টি রেখেই সে চিন্তা পরিবর্তন করলো। নাহ এই ব্যাপারে আরিয়ান নিজে কথা না বললে সে-ও বলবে না। গ্রামের এই অদ্ভুত ব্যাপার গুলোর তোড়ে প্রথম কিছুদিন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকলেও এখন চিন্তা করা ছেড়ে দিয়ে প্রতিকার খুঁজতে ব্যাস্ত হয়েছে।
বৃদ্ধ লোকটাকে খুব অল্প সময় দেখা যায়। তা-ও মাঝে মাঝে রাতের শেষ প্রহরে। সারাদিন কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করলে শুধু একটা উত্তরই দেয় ‘লোকচক্ষুর আড়ালে’ । মাধবীও আর লোকটাকে নিয়ে না ঘেটে মনে মনে এক বীড়াট কিছু করা তোড়জোড় চালাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটা বলেছিলো ইতিহাস ঘাটতে। তাই সে-ও তাই করবে। কিন্ত ইতিহাস ঘাটতে হলে তাকে এক দুঃসাহসী কাজ করতে হবে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধও হয়েছে যে, সে যেভাবেই হোক আরিয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই কাজ করবে। তার জন্য তার অপুকে প্রয়োজন। কিন্ত অপুর দিনকাল ভিষন খারাপ যাচ্ছে। তার শয্যাশায়ী বৃদ্ধ মা মরনের দ্বারপ্রান্তে। জমিদারের নিজস্ব হাসপাতালে তাকে রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ মাধবীর ভরসায়। অপুটা সর্বক্ষণ তার মায়ের সাথে সাথে থেকে সেবায় রত থাকে। মাধবীও গ্রামের এই দূরঅবস্থায় সঙ্গ দিতে অক্ষম। তবুও রাতে সময় করে খোঁজখবর নিয়ে আসে।
অপু মাধবীর তীক্ষ্ণতা,তেজস্বতা এবং দুঃসাহসীকতার সম্পর্কে অবগত থাকলেও যাদুটোনার ব্যাপারেও যে মাধবীরও জ্ঞান আছে তা অনোবগত ছিলো। মাধবীও নিজেও তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। তবে কালো যাদু হচ্ছে শোনার পরেও মাধবীর তেমন প্রতিক্রিয়া না দেখে তার মনে সন্দেহ জাগে। তবে তাকে বিস্মিত হতে হয়। কারণ ছোটবেলা থেকেই মাধবীর সমস্ত সত্ত্বার সাথে একমাত্র সে-ই পরিচিত ছিলো। আজ পর্যন্ত মাধবীর করা সমস্ত নিকৃষ্ট নিকোষ কালো অপরাধের নিরব সাক্ষী হয়ে একমাত্র সে-ই পৃথিবীতে মুক্ত নিঃশ্বাস নিচ্ছে। নয়তো মাধবী কক্ষনো সাক্ষী বা প্রমাণ রেখে কোন কাজ করে না।
অথচ এখন মাধবীর ভাবভঙ্গী দেখে তার মনে হয় সে আজও মাধবীর ব্যাপারে অজানা। মনে মনে শত বার সাতপাঁচ ভেবেও জটলা থেকেই যায় ভেতরে। এমনকি আরিয়ানের ব্যাপারেও সে ততটা জানে যতটা মাধবী জানে। তবে আরিয়ানের ব্যাপের কোন কিছু জানার আগ্রহ সে দেখেনি মাধবীর মাঝে। কৌতুহলী সে বরাবরই এই দুটো মানব মানবিকে বুঝতে অক্ষম। কেমন যেন সব গুলিয়ে আসে আরিয়ান আর মাধবীকে নিয়ে ভাবতে গেলে। সেদিন তো মাধবী হাসপাতালে খোঁজ নিতে গেলে সে বলেই ফেলেছিলো- “পাঞ্জাবিওয়ালা এবং তার মধুতির অভিমূর্তি ও ধূর্ততা বুঝতে হলে আমাকে আবার নতুন করে জন্ম নিতে হবে। আমার দেখা সর্বোত্তম রহস্যময় জুড়ি তোরা। যাদের শুরু থেকে জানার পরেও অজানা মনে হয়”
কথাটা মনে হতেই মাধবী একা একাই ফিঁক করে হেসে দেয়। নিস্তব্ধ ছাঁদে ঝঙ্কার তোলে তার মুক্ত ঝড়া হাসিতে। বুলবুলও তার বিকৃত চোখে মুগ্ধতা আনার চেষ্টা করে। তবে তার বিকৃত মুখ ছাপিয়ে তা প্রকাশ না পেলেও সে ভিষন মুগ্ধ! তৎক্ষনাত ডানা ঝাপটে মাধবীর বা কাধে স্থান করে নেয়। মাধবী মনে মনে অপু নির্বোধ আজ্ঞা দেয়। তখনই নিচে কারো পদাচরনের শব্দ পেয়ে সেদিকে দৃষ্টি দেয়। আরিয়ান ঢুকছে বাড়িতে। ঘার ছুঁই ছুঁই বাবরি চুলগুলো ঘামে চটচটে হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। শুভ্র পাঞ্জাবির পেছনে ভিজে পিঠের সাথে মিশে গেছে। যার ফলে সুবলিষ্ঠ পেশি বিদ্যমান। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই পায়ের বাদামি রঙের নাগ্রা জুতো জোড়া দু পা ঝাকিয়ে ছুরে ফেলে। কপালের ভাজগুলো দেখে তাকে চিন্তিত মনে হলো মাধবীর কাছে।
তাই ত্রস্ত পায়ে নেমে পরে ছাঁদ বেয়ে। বুলবুল পেছন থেকে এক পল মাধবীর নূপুর পরিহিত দৌড়ে সিরি বেয়ে নিচে নামা পা গুলো দেখে। সাদার মধ্যে কালো পাড়ের শাড়িটা এক পেচে ধরনের পড়েছে। তার চিকন গায়ে এভাবে শাড়ি পরলে আরো নান্দনিক লাগে। যখন সে দু হাত পেটের কাছে রাজকীয় ভঙ্গিতে ধরে দাম্ভিকতার সাথে চরন ফেলে তখন তাকে মনে হয় সে-ই এই সম্পূর্ণ পৃথিবীর রাণী! তার চেহারা না দেখলেও রাজকীয় হাঁটা চলা দেখলেই বোঝা যায় এটা রাণী মাধবীলতা হেঁটে যাচ্ছে। বুলবুল কিছুক্ষন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মালকিনের সাথে নেমে আসে।
সন্ধ্যার ছাপিয়ে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে ধরনী জুড়ে। একটি মহিলা মাদ্রাসার কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে মাধবী। মাদ্রাসাটা শুধু মেয়েদের হওয়ায় আরিয়ান ঢোকেনি ভেতরে। মাধবীর পাশেই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকা ফেরদৌসি দাঁড়িয়ে। মাদ্রাসার বিষয়ে সমস্ত খবরাখবর নিয়ে মাধবী বলে “আমাকে নিলে চলুন সেই কক্ষে”
ফেরদৌসি আতঙ্কিত হয়ে বলে “রাণী মা উক্ত ঘটনার পর সেই কক্ষের ধারে কাছেও কেউ যায় না”
মাধবী দৃরতার সাথে বলে “আপনার যেতে হবে না। আপনি মেয়েদের নিয়ে নিরাপদে দাঁড়ান এখানে। ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই বাহিরে সেনাপতি আছে এবং আমার সহচরিদের রেখে যাচ্ছি। আপনি শুধু কক্ষ টা দেখিয়ে দিন”
ফেরদৌসি উৎকন্ঠা নিয়ে বলে “রাণী আপনি একা কীভাবে…?”
“কক্ষটা কোন দিকে?”
মাধবীর সরাসরি কঠিন বাক্যে ফেরদৌসি দমে যায়। আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দেয় কক্ষটি। মাধবী এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় এটা হেদায়াতুন্নাহু জামাতের কক্ষ। কাঠের দরজাটা ধরে টান দিয়ে হাঁট করে খুলে ফেলে দরজাটা। দেখতে পায় ছোট্ট কক্ষটার ঠিক মাঝ বরাবর একটা ফাটল। সে আয়াতুল কুরসি পরে ভেতরে ঢোকে। ফাঁটা মেঝের চারপাশে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ফেরদৌসি বলেছিলো, যখন মেয়েরা নিজ নিজ পড়াশোনায় ব্যস্ত; তখন আচমকা নিজ থেকেই মেঝে ফেঁটে যায় ঠিক কক্ষের মাঝ বরাবর। প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও যখন দেখলে ফাটলের আশেপাশে ছোপ ছোপ রক্ত তখন তারম্বরে সকলে চিৎকার করে উঠে। দিক বেদিক ভুলে কক্ষ থেকে বের হতে নিলে আবিষ্কার করে দরজা বাহির থেকে বন্ধ! আতঙ্কে মেয়েগুলোর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। রুমের শেষ প্রান্তে বড় করে মোটা পর্দা টাঙানো।
পর্দার ওপাশে হুজুরেরা বসে পর্দা পসিদার খেয়াল রেখে মেয়েদের ক্লাস করায়। সেদিক দিয়ে বের হবার পথ থাকলেও কোন মেয়ে সেদিকে পা বারাতো না কারণ সেদিকে পুরুষের আনাগোনা থাকতো। কিন্ত এই শ্বাস রুদ্ধ পরিস্থিতিতে তারা পর্দার কথা ভুলে গিয়ে সেদিক দিয়ে বের হতে যাবে তখন দেখা যায়, কেউ হাত দ্বারা পর্দা সরাচ্ছে। তারা ভেবেছিলো চিৎকার শুনে হয়তো আবাসিক হুজুরেরা তাদের উদ্ধার করতে এসেছে; কিন্ত যখন তারা দেখলো হাতের আঙুল গুলোই একেকটা হাতের মত লম্বা। হাতের নখগুলো আঙুলের মত লম্বা! ব্যস! মেয়েরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে। সেই ভয়ানক হাতে সাহায্যেই সম্পূর্ণ পর্দাটি উন্মোচন হয়ে যায়। তবে কারো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। হাতটাও উধাও হয়ে যায়।
মেয়েরা সব ভুলে নিঃশ্বাস আটকে সেদিক দিয়েই বেরিয়ে যায়। কয়েকজন দৌড়ে বাড়ি চলে গেলেও কয়েকজন ফেরদৌসির কাছে জানালে, ফেরদৌসি আতঙ্কগ্রস্থ হয়। কেননা মেয়েরা এত জোরে চিৎকার করলেও বাহিরে একটা চিৎকারও শোনা যায়নি। কিছু মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চৈতন্য হাড়ালেও কিছু মেয়ে এখনও ডুকরে কেঁদে উঠছে। এরকম ভয়ানক পরিস্থিতিতো ওরা কক্ষনো পরেনি। ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার সাধের রাজ্যে যে সত্যিই ধ্বংস লিলা শুরু হয়েছে তা মেনে নিতে এখন বাধ্য সে। এবার ফাঁটা জায়গা থেকে চোখ সরিয়ে গাঢ় নীল রঙের পর্দাটির দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎই মনে হয় তার পেছনে কেউ আছে। সে সম্পূর্ণ শরীর নিয়ে তৎক্ষনাত পেছনে ফেরে। টিনের দেয়াল জুড়ে বারি খায় তার নিঃশ্বাসের আওয়াজ। পেছনে কাউকে না দেখতে পেয়ে আবার সামনে আগায়। আবারও মনে কেউ তার পেছন পেছন আসছে। কিন্ত ফিরে দেখলো কেউ নেই। সে কেতাবে পড়েছে, যখন কেউ নির্জনে চলাফেরার সময় অনুভব করে তার পেছনে কেউ আছে; তাহলে শুধু ঘার না ফিরিয়ে সম্পূর্ণ শরীর নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। নয়তো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এরকম তিনবার হয় মাধবীর সাথে। পেছনে ফিরে কাউকে একবারও না দেখতে পেয়ে আর পেছনে ফেরে না। যখন সে একদম পর্দাটার কাছাকাছি যায়; অনুভব করে তার ঘারে আর গলার কাছে গরম নিঃশ্বাস পরছে। এতটাই গরম যে মনে হবে প্রকান্ড আগুনের তাপ! সে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। আরেকবার মনে মনে আয়াতুল করসি পড় আচানক শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতেই একটা দোয়া পড়তে থাকে জোড়ে জোড়ে। পড়তেই পড়তেই পর্দার কাছে গেলে, হাতটা কোথাও না পেলেও পর্দার সাথেও ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পায়। আশেপাশে আরো কিছুক্ষণ অবলোকন করে পেছনে ফেরে। নাহ এখনও কেউ নেই। দোয়া পরা অব্যাহত রেখেই সে সম্পূর্ণ কক্ষ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। চোখ যায় একদম কোনায় পরে থাকা এক কালো সুতোর দিকে। সুতোটা হাতে নিয়ে দেখে তাতে অনেকগুলো গীঁট দেয়া। সুতোটা নিয়ে সে বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। শাড়ির ভাজে তা লুকিয়ে ফেরদৌসির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে “এ ছাড়াও কি আর কিছু হয়েছে?”
তখন একটা ১৩-১৪ বয়সই মেয়ে এসে বলে “কালকে আমরা ৬ জন পশ্চিমের বড় গোসলখানাটায় গোসল করছিলাম। তারপর হঠাত টিনের উপর এক লম্বা ছাঁয়া দেখেছি। অনেক লম্বা ছিলো ছাঁয়াটা। তারপর আবার টিনের খুটিতে আরেক গুলো কালো সুতা বাধা দেখেছি”
কথাটা শুনে মাধবী এক ভ্রু কুঞ্চিত করে। সব মিলিয়ে জগাখিচুরি হয়ে যাচ্ছে। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে আরিয়ানের কাছে যায়। মাধবীকে মাদ্রাসা থেকে বের হতে দেখে আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে “কী হলো?”
মাধবী নেকাবের উপর দিয়েই কপালে মৃদু ঘর্ষন করে বলে “বলছি সব। আগে মেয়েগুলো হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন। কয়েকজন ভয় বাড়িতে চলে গেছে। তাদের খোঁজ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করুন। প্রচন্ড ভয় পেয়ে জ্ঞান হাড়িয়েছে। ওরা কিন্ত বড় বড় মেয়ে। পর্দা ঠিক রেখে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিন। আর মাদ্রাসাটা আপাতত বন্ধ করে দিন। তাড়াতাড়িই”
সবগুলো কথা অজয় মনোযোগ সহকারে শুনে সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পরে। আরিয়ান কিছু একটা চিন্তা করে বলে “সমস্যা যখন দেখা দিয়েছে, আমার মনে সমস্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা আপাতত বন্ধ থাক। মাইকিং করে পুরো ময়মনসিংহকে সতর্ক করে দিলেই ভালো হবে”
মাধবীও ভেবে সম্মতি জানায়। গ্রামে এখন সন্ধ্যার পর পরেই ভুতুরে নিস্তব্ধতা নামে।নির্জন নিস্তব্ধ হয়ে থাকে আশপাশ। ঝিঁ ঝিঁ পোকারাও আর ডাকাডাকি করে না। আধারে তলিয়ে যায় সম্পূর্ণ ময়মনসিংহ! সম্পূর্ণ আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে সবাই কে। মাধবী আরিয়ান চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। রাজ্য নিয়ে আরিয়ানের কোন চিন্তা নেই। তার সমস্ত চিন্তা ঘিরে আছে মাধবীকে নিয়ে। লক্ষ্য একটাই যে করেই হোক, মাধবীর বিষন্নতা দূর করে মুখে হাসি ফোটাতে হবে। আর তার উৎস; গ্রামকে আবার হাসাতে হবে। আর গ্রামকে হাসাতে গেলে যে করেই হোক এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে সবাই কে। কিছুক্ষন ঘরময় পায়চারি করে মাধবীর কাছে মাদ্রাসায় কী কী হয়েছে জানতে চাইলে মাধবী সব কাহিনী বলে। সব শুনে আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার সামনে যায়। হাত দুটো পেছনে দিকে ধরে সিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ায় বাহিরে দৃষ্টি দেয়। বুলবুল এসে তার কাধে বসে। কাঁধের উপরে পাঞ্জাবির বোতামে ঠোঁট দিয়ে কিছুক্ষন ঠোরাঠুরি করে শান্ত হয়ে বসে পরে। মাধবী পরিশ্রান্ত বদনে আরিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে বলে “কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না”
আরিয়ান বাহিরের ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে চোখ সরিয়ে মাধবীর দিকে তাকায়। বাহিরে চাঁদ নেই। অমাবশ্যার নিকোষ কালো অন্ধকার চাঁদে স্নিগ্ধ আলোকে ঢেকে রেখেছে। ঘরের ভেতরের টিমটিমে কুফি বাতি এবং মোমদানিতে জ্বলতে থাকা মোমের আলোয় ঘর আবছা আলোকিত। জানালার কাছের লন্ঠনের আলোটায় মাধবীর চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারা দ্যুতি ছড়াচ্ছে। মাধবীর খোলা চুলগুলো মৃদু বাতাসের তোড়ে নড়ে উঠছে। চোখ সরিয়ে ফেলে আরিয়ান। নইলে যে এক্ষুনি ঝলসে যাবে চোখ দুটি! তার যে সাধ্যি নেই লন্ঠনের এই নরম আলোয় ভুবন মহিনী রুপসীর কাজল কালো চোখের দিকে তাকিয়ে দম নেওয়ার! চোখে চোখ রেখে কথা বলতে গেলে তো তার অকালেই অক্কা পেতে হবে! মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই পর্যন্ত আরিয়ান কক্ষনো মাধবীর চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পায়নি। ঐ মোটা করে কাজল দেয়া চোখ যখন অন্য কিছু দেখতে ব্যস্ত থাকে তখনই শুধু সে সেই গভীর নিখাদ চোখে চেয়ে তৃপ্তি খুঁজতে পারে। নয়তো ঐ ধারালো চোখ তার চোখের দিকে তাক হলে অচিরেই সে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে মারা যাবে।
“কি হলো?”
মাধবীর প্রশ্নে আরিয়ানের ধ্যান ভাঙে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ সরিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে “ভাবছি”
মাধবী চোখ সরু করে বলে “কী ভাবছেন?”
আরিয়ান নিজেকে যথেষ্ট সংবরন করে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলে “ঐ বৃদ্ধ ফকির যা বলেছে তা-ই সত্যি”
মাধবীও সম্মতি জানায় “আমারও মনে হচ্ছে। আমার মনে হয় উনিই কোন সমাধান বের করতে পারবে। কোথায় এখন উনি?”
“জানি না। তবে সন্ধ্যার পর একবার দেখেছিলাম। পরে আর দেখিনি”
মাধবী ভাবুক হয়ে বলে “লোকটা বেশ রহস্যজনক। উনাকে আরেক বার পেলে আটকানোর ব্যবস্থা করবেন”
আরিয়ান মূল প্রসঙ্গ তোলে “কিন্ত কি এমন হয়েছিলো কারো সাথে যে, আত্মা অতৃপ্ত হয়ে আছে? তবে শুধু আত্মার কাহিনী নয়। এখানে কালো যাদুরও সংযোগ আছে। আমার মনে হয়, কেউ বা কারা শত্রুতা বসত এই কাজ করছে। শত্রু বলতে যারা চৌধুরীদের ধ্বংস করেছে তারাই এই কাজ করছে। আর সব কিছুর কেন্দ্র বিন্দু একই! এই তিন বছরে যা হয়েছে এবং পরবর্তিতে যা যা হবে সব কিছু একই হেতুর হাতে”
মাধবী বুঝেছে এমন ভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে “হুম তাই হবে। কিন্ত করছে টা কে এসব? শত্রুপক্ষ বলতে জমিদার কাশেম ছাড়া কেউ আছে বলে আমার মনে হয় না। আপনি কিছু জানেন?”
আরিয়ান স্মৃতি হাতরে দ্বিতীয় কোন শত্রুর সন্ধ্যান করতে পারে না “নাহ। আর কাউকে তো পাচ্ছি না”
মাধবী বিরক্ত হয়ে বিষন্ন বদনে বলে “বিপদের উপর বিপদ লেগেই আছে। ভেবেছিলাম তৃশান ভাই কে এবার খুঁজে বের করেই ফেলবো”
অতঃপর মন খারাপ করে বলে “ধুরর! কিছুই হবে না”
মাধবী বাহিরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলে। আরিয়ান ওর গলার স্বর পরিবর্তন হতে দেখে চোখের দিকে তাকায়। দিনে মাধবী কাজল পরলেও রাতে মোটা করে সুরমা লাগায়। কি সুন্দরই না লাগে তখন! সাদার মধ্যে কালো পেড়ের লম্বা আচঁলটা মেঝে ছুঁয়ে দিচ্ছে। তার সাথে সমান তালে চুলগুলো হাটুঁর নিচ অবধি। ব্যস এটুকুই আরিয়ান কে স্বর্গীয় স্বর্গ থেকে ঘুরিয়ে আনতে যথেষ্ট! হুট করে মাধবী ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে “আমার কাছে একটা বু…”
মাধবীকে এদিকে ফিরতে দেখে আরিয়ান তৎক্ষনাত চোখ সরিয়ে বাহিরে দৃষ্টি রাখে। মুহুর্তেই হৃদস্পন্দন বেরে গেছে হাজার গুন। মাধবী কথা মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায়। দু হাত দু দিকে কোমরের উপর রেখে জেরা করার মত করে জিজ্ঞেস করে “আপনি ওদিকে ফিরে গেলেন কেন?”
আরিয়ান ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয় “ইচ্ছে হলো”
মাধবী চোখ ছোট ছোট করে বলে “তাই বলে আমি ফিরতেই ওদিকে ফিরবেন? আপনি কি কোনভাবে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন?”
মাধবীর এহেন প্রশ্নে আরিয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ়! যাকে দেখলে হার্ট খুলে বেরিয়ে আসতে চায়; তাকে নাকি এড়িয়ে যাচ্ছে!? সে-ও চট করে বলে “তুই এতদিনে তোর স্বামীকে এত ভালো ভাবে বুঝতে পারার জন্য তোকে এক কলস সমবেদনা”
বলে ঠোঁট টিপে মুচকি হাসে। মাধবী বিরক্ত হয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে বলে “এদিকে তাকান”
“পারবো না”
“পারবেন”
“বললাম তো না”
“সমস্যা কি?
“অনেক সমস্যা আছে”
“আমার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা আমি মানবে না। জলদি এদিকে ফিরুন”
আরিয়ান মাধবীর দিকে ফিরলো ঠিকই কিন্ত দৃষ্টি তার চেহারার উপর দিয়ে বলো “ফিরলাম”
এবার চট করে তার মস্তিষ্ক কেচ করে যে, আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে চায় না। কেনো? কেনো? কেনো? নিজ মনেই কিছুক্ষন বিরবির করে বলে “চোখের দিকে তাকান”
আরিয়ানও এবার বুঝে ফেলে তার ধূরন্ধ্যর গৃহিনী টের পেয়ে গেছে তার দূর্বলতা। দূর্বলতা!? হ্যা দূর্বলতাই। বর্তমানে মাধবীর ঐ মায়াবন চোখ জোড়াই তার একমাত্র আশক্তি ও দূর্বলতা। মাধবী অধৈর্য হয়ে বলে “কি হলো তাকান”
” সইতে পারবি?”
কথার মানে না বুঝে মাধবী জিজ্ঞেস করে “মানে?”
” আমি তাকিয়ে থাকা শুরু করলে সামলাতে পারবি নিজেকে?”
“কেন পারবো না? অবশ্যই পারবো”
“তুই পারলেও আমি পারবো না”
“কেন বলুন তো?”
আরিয়ান ছোটফটিয়ে উঠে। সে তো নিজের ধ্বংস ছাড়া ঐ চোখে আর কিছু পায় না। হৃদয়িস্থিতে তোলপাড় করা ঝড়ের সাথে ভেসে গিয়ে চোখ মুখ খিঁচে নিয়ে বলে ” মধুমতী তুই শ্যামাঙ্গিনী হোস
আমি সাদরে গ্রহন করবো,
তবে ভূবন মহিনী সর্ব গ্রাসী হোস না
আমি যে তোর গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাবো ”
তারপর পিছনে হোটে গিয়ে বিছানায় বসতে বসতে স্বীকার করে নেয় “তোর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে আমার এক বুক সাহসের প্রয়োজন; যা আমার কোন কালেই ছিলো না”
অতঃপর বিছানায় সুয়ে কাথা গায়ে দিয়ে বলে
” শত্রুদের কীভাবে ধ্বংস করবি জানি না। তবে আমাকে ধ্বংস করতে তোর চোখে চোখ রাখাই যথেষ্ট ”
থেমে গিয়ে আবারও বলে ” ভবিষ্যতে যদি কখনো আমাকে ধ্বংস করতে চাস; তবে শুধু একটি বারের জন্য তোর চোখে চোখ রাখতে বাধ্য করিস। কথা দিলাম, চোখের পলকে আমার ধ্বংসের এক মুষ্ঠি ছাঁই এনে ফেলবো তোর পায়ে ”
মাধবী স্তব্ধ বিমূঢ় নেত্রে কথা গুলো শুনে যায়। সাথে তার অন্তঃকরণের দ্রীম দ্রীম শব্দও কানে বাজে তীব্র ভাবে। হ্যা সে বুঝেছে আরিয়ান তার চোখে তাকিয়ে কথা বলতে চাইছে না। তবে এই কারণে যে চাইছে না; তা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি। সে এতদিন ভাবতো সে একাই এই রোগের ভুক্তভোগী। আরিয়ান যখনই ঘুমায় তখনই সে কিছুক্ষন সময় নিয়ে আরিয়ানের চোখ দুটোতে তাকিয়ে থাকে। যখন অন্য ধ্যানে থাকে তখনও তাকিয়ে থাকে। ভাবে, ঐ নিখাদ তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার চেয়ে কি আর কোন সুন্দর বস্তু আছে? কিন্ত প্রতিবার মন মস্তিষ্ক একই উত্তর দেয় ‘ঐ চোখ জোড়ার চেয়ে সুন্দর কোন দৃশ্য সে কখনো দেখেনি’। লোকটা শ্যাম বর্নের হলেও তার সবকিছুই আকর্ষণীয়। রাজকীয় ভঙ্গিতে হাঁটা চলা, চওড়া কাঁধ, প্রশস্ত বক্ষ, বিশাল উচ্চতা, সবসময় শুভ্র কাবলি সেট পরে কাধে শুভ্র শাল ঝুলিয়ে রাখা, এই সবকিছুই আকর্ষণীয়।
তবে সবচাইতে আকর্ষণীয় হচ্ছে তার ঐ বাজ পাখির মত চোখ! বাঁ চোখের নিচের সেই ছোট্ট কাটা দাগটা তার নজর কারে বরাবরের মতই। এই দাগের জন্যই চোখজোড়া আরো মায়াবী দেখায়। আর মায়াবনের এত ধূর্ত চোখে মায়াবিনীর তীক্ষ্ণ চোখ কখনো পরে গেলে কী হবে!? ভেবেই মাধবীর গা ঝাঁকি দিয়ে উঠে। কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে আরিয়ানের কাছে যায়। ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে নিশ্চিত হয় আরিয়ান ঘুমিয়ে গেছে। শুধু আরিয়ান নয়; অজয় সহ বাড়ির প্রতিটা প্রহরী এবং কাজের লোকেরা গভীর নিদ্রায় শায়িত। সে সকলের রাতের খাবারে ঘুমের জরিবুটি মিশিয়ে দিয়েছে।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৩
কাল সকালের আগে কেউ উঠবে না। মাধবী নিজের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী জানালার কাছ থেকে লন্ঠন হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরে বাড়ি থেকে। চারদিকে বড় বড় গাছগাছালি। শোঁ শোঁ করে আসা সেই ঠান্ডা বাতাসটা বয়ে যায় গা জুড়ে। এক হাতে তার লন্ঠন, অন্য হাতে তলোয়ার। গভীর অন্ধকার ভেদ করে তার লন্ঠনের আলো এগিয়ে যেতে থাকে অগ্রে। দালানের বারান্দা থেকে তা অবলোকন করে এক চিরাচরিত গম্ভীর আখির মালিক। বুলবুল!
