Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৩

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৩

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৩
ঐশী আফরিন

নিচে চিৎকার চেঁচামেচি বারতে থাকলে মাধবী বিরক্ত চোখে চা না খেয়েই দৌঁড়ে নামে। তবে নিচে নেমে যা দেখে, তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। অবাক চোখে সে সিরির গোরায় দাঁড়িয়ে দেখে আরিয়ান ইচ্ছেকে সমানে ধমকে যাচ্ছে। কিন্ত ইচ্ছের আচরণ তার কাছে ভিষন অবাক লাগে। হতবিহম্বিত চোখে সে সবাইকে দেখে। সকলে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আর আরিয়ান ইচ্ছের সাথে তর্কা তর্কি করতে ব্যস্ত। ইচ্ছে কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। লম্বা চুলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।

সে চিৎকার করছে আর বারবার চুল টেনে ধরছে। হঠাৎ কান্না করছে আবার আচমকাই খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে। কি কি বির বির করছে, আবার আরিয়ানের সাথে তর্ক করছে। এবার সে বুঝলো বিরোধী দলের সাথে কিছু হয় নি। এতক্ষন ইচ্ছেকেই আরিয়ান বকছে। কি হয়েছে দেখার জন্য সে ত্রস্ত পায়ে সিরি ভেঙে নেমে আসে। রুহিকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো ইচ্ছেকে নাকি জ্বীনে ধরেছে। সে হতবিহম্বিত চোখে তাকালো ইচ্ছের দিকে। ইচ্ছের শরীরে ভর করেছে। আরিয়ান চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলে এক হাতে থুতনিতে দিয়ে আরেক হাত হাটুতে দিয়ে তর্ক করছে। লোকটা গলা খাকারি দিয়ে তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে “এই মেয়ের কাছে কি?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ইচ্ছের ভেতরের জ্বীনটা বলে “এই মেয়েকে আমি পছন্দ করি”
আয়াজ আশ্চর্যের সাথে রাগত চোখে তাকায়। আরিয়ান আঙুলের ইশারায় আয়াজ কে থামতে ইশারা করে বলে “পাছায় কয়েকটা আমার বউয়ের কাঁথা শেলাই করা সুঁইয়ের গুঁতো পরলেই পছন্দ হাওয়ায় উঁড়বে”
“ওকে আমি আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই”
আয়াজ শার্টের হাতা গুটিয়ে সামনে আসতে নিলে আরিয়ান ধমকে উঠে “আগে এই বলদ কে বিদায় করি পরে তুই বলদ ভাষন দিস। এখন মুখটা বন্ধ কর”
তারপর ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে বলে “তোমার মা**গী লাগে তো? তুমি কইলা আর নিয়ে গেলা? পাছায় লাগছো ক্যান ঐ টা বলো চান্দু”

“মেয়েটা সবসময় উদাসীন থাকে। আর সেদিন আমার পায়ের সাথে উষ্ঠা খেয়েও সালাম না করে বেয়াদবি করেছে”
“আরেক ব্যাটার মা**গী উদাসীন থাকবে তাতে তোমার কী চান্দু? আর তুমি শ্যা**টা মেলায়া বসে থাকবা? আবার বেয়াদবি মারাও? ফুঁট। শালা রামছাগল”
“আপনি আমাদের জাতির সাথে এরকম ব্যবহার করতে পারেন না”
“তোর জাতির মায়েরে বিবাহ বিচ্ছেদের শুভেচ্ছা”
“আপনি কিন্ত আমাদের সর্দারের নজরে পরে গেছেন”
“তুই মনে হয় নতুন জ্বীন হয়েছিস? আগে মানুষ ছিলি। শালা রামছাগল। এক্ষন এখান থেকে না গেলে পেছনের ফুটো শেলাই করে দেব কিন্ত”

এবার জ্বীনটা দমে যায়। মাধবী কপাল চাপরায়। জ্বীন টা বোধ হয় এই লোকটাকে পাগল ভাবছে। পাগল না হলে কি আর এরকম ব্যবহার করে? কি বলে, কি করে, এই লোকটা হয়তো নিজেও জানে না। কী ভাষার ছিড়ি। তাও আবার জ্বীনের সাথে। সবচেয়ে বড় কথা সবার সামনে এসব কি শুরু করেছে? সবাই যদি সবটা জেনে যায়? মাথায় মনে হয় গোবর নিয়ে চলে। নইলে এরকমও কোন সাধারণ মানুষ করে? আরিয়ান পা নামিয়ে দু হাটুতে দু কনুই ঠেকিয়ে বসে। কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে বলে “কোন গোত্র?”
“আরওয়াহ”
“এই গরীবানা গোত্র থেকে উঠে এসে তুমি শা*** চু***? তোরে যে এখনও কিছু করি নাই ভাগ্য ভাল। এবার ভালোয় ভালোয় চলে যা বলছি”

“আমি এভাবেই চলে যাবো না। ওকে সাথে নিয়ে যাবো”
আয়াজ আবারও কিছু বলতে গেলে সে আবারও ধমকে উঠে “বলদ, তুই কি ঐ মেয়েকে মারবি নাকি? মারলে কি এই রামছাগলের গায়ে লাগবে না, তোমার বউয়ের গায়ে? তুইও দেখা যায় রামছাগল হয়ে যাচ্ছিস। আচ্ছা তোর সাথে পরে কথা বলি। আগে ওর সাথে একটু কানাকানি করে নেই”
আয়াজ কিছু বলার আগে মাধবী চেঁচিয়ে উঠে “এই! এই! আপনি কি ওর সাথে কানকানি করবেন নাকি? খবরদার বলে দিচ্ছি কিন্ত”
আরিয়ান কপালে ভাজ ফেলে তাকায় মাধবীর দিকে। মেয়েটা সামান্য অভিমানের সাথে রাগী চোখে তাকিয়েছে। ইদানীং মেয়েটা একটু কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে না? এটা কি সত্যি সত্যিই পরিবর্তন? নাকি অভিনয়? আচ্ছা যা-ই হোক। সে সোজা হয়ে বসে বলে “তাহলে ব্যাটাকে বলি তোর গায়ে ভর করতে? তাহলেই তোর সাথে কানাকানি করতে পারবো”

সে কঠিন কন্ঠে বলে “উল্টো পাল্টা কথা বলবেন না”
এবার আরিয়ান নরম সুরে বলে “শুধু দুটো কথা বলবো। ও এখন হুশে নেই। নিজ জ্ঞানে আসলে কিচ্ছু মনে থাকবে না। তোকে নিশ্চয়ই বোঝাতে হবে না। শুধু দুটো কথা বলবো”
মাধবী প্রথমে কাপল কুচকায়। পরক্ষণেই সম্মতি দিয়ে দেয়। বাকি সকলে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ধারে কাছেও আসছে না। উঠোনের মাঝখানে শুধু মাধবী, আরিয়ান, আয়াজ এবং ইচ্ছে আছে। সম্মতি পাওয়া সত্ত্বেও আরিয়ান আবার জিজ্ঞেস করে “কী? সত্যিই সম্মতি দিচ্ছিস? না কি পরে আবার…”
কথা শেষ করার আগেই আয়াজ মাধবীকে বলে “বোন আমার এমন করিস না। কোনো ভাবে ইচ্ছে টা সুস্থ হয়ে গেলে আর কক্ষনো ওকে তোর স্বামীর আশেপাশেও আসতে দেব না”
“আরে নাহ ভাইয়া। সমস্যা নেই। আরিয়ান ভাই আপনি বলুন”

তবুও আরিয়ানের মনে সংশয় থেকে যায়। তাই সে আর কাছে যায় না। যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে শুধু কিছু একটা দেখায় জ্বীন টাকে। সে চাইছিলো না এমন কিছু করতে। কিন্ত বউয়ের হোক বলে কথা। তাই যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে শুধু কিছু ইশারা দেয়। এতেই জ্বীন টা কাঁপা স্বরে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আরিয়ান বলে “আর একটা টুঁ শব্দ বের হবে মুখ থেকে। তাহলে জানিসই তো কী হবে। ভালোয় ভালোয় চলে যা এখান থেকে”
ব্যাস সত্যিই মুহুর্তের মধ্যেই ইচ্ছের নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পরে। আয়াজ দৌড়ে গিয়ে ইচ্ছেকে আগলে ধরে। আরিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে মাধবীর কাছে যায়। সে অবাক হয়ে বলে “কীভাবে কী আরিয়ান ভাই!”
আরিয়ান চোখ টিপে বলে “একটু চাপা মেরে ভয় দেখালাম। এতেই ব্যাটার ঘাম ছুটে গেছে। যা-ই হোক। আমি আসছি। আর আজ বাদামি রঙের শাড়ি টা পরবি। এই রঙে তোকে অপ্সরার মত লাগে”

“সে তো প্রতিদিনই এক কথা শুনছি”
“যেটা সত্যি সেটাই বলি”
বলে মুচকি হেসে চলে যায়। লোকটা প্রতিটা দিন এই কথা বলবেই। যখনই সে গোসল করে আসে তখনই বলে – এই রঙে তোকে অপ্সরার মত লাগে। ব্যাপার টা এখন যেন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। প্রতিদিন গোসল করে আসলে এই কথাটা না শুনলে কেমন যেন লাগে। সবাই অবাক চোখে আরিয়ানের প্রস্থান দেখে। আরিয়ান চলে গেলেও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় মাধবীকে। রাশেদা ইশান এসে জিজ্ঞেস করে “আরিয়ান কিভাবে কি করলো?”
সে নিজেও জানে না আরিয়ান কীভাবে কি করেছে। তবে জিজ্ঞেসও করবে না। কারণ সেদিন আরিয়ান মানা করেছিলো তার সুখের জন্য হলেও কিছু জিজ্ঞেস না করতে। তাই এখন আর মাধবী কিছু জিজ্ঞেস করে না। সে আরিয়ানের বলা কথাটাই বললো “চাপা মেরে নাকি ভয় দেখিয়েছে”

নমিতা ইশান এগিয়ে এসে বলে “চাপা মেরে ভয় দেখালো আর জ্বীনটা চলে গেল?”
মাধবী ভ্রু কুচকে তাকায় “তিনি আমাকে যা বললেন তা-ই তো বললাম”
“বোকা পেয়েছো?
মাধবী এবার দাঁত পিশে বুকে হাত বেধে দাঁড়িয়ে বলে “বোকা পাওয়ার কিছু নেই। আপনারা বোকা-ই”
বলে আর এক সেকেন্ডেও না দাঁড়িয়ে উপরে চলে যায়। মাহমুদা ইশান তীক্ষ্ণ চোখে খেয়াল করে মাধবীর প্রস্থান। রাশেদা ইশান চোখ পাকিয়ে বলে “দেখেছিস মেঝো? তোর ছেলে বউ কেমন বেয়াদবি করে গেল? কিছু বললি না কেন”

মাহমুদা ইশান ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয় “ও আমার ছেলের বউ হওয়ার আগে তোমাদের সবার ভাগ্নী। আর এই পরিচয়েই ও এ বাড়িতে প্রথম এসেছিলো”
নমিতা ইশান মুখ কালো করে বলে “শাসন করলেও তো এই মেয়ে মানে কাউকে? বেয়াদব”
মাহমুদা ইশান কঠোর কন্ঠে বলে “সে শাসন মানে না , সে শাসন করে। আর তুই হয়তো ভূলে গেছিস, ও মাহফুজ চৌধুরীর কন্যা”
বলে তিনিও হনহনিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যান। আয়াজ ইচ্ছেকে কোলে করে ঘরে দিয়ে এসে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে আরশি এবং রুহিকে বলে গেছে যেন জ্ঞান ফিরলে ওকে কিছু জানানো না হয়। আর ও যে ইচ্ছেকে কোলে নিয়েছে তা-ও যেন না বলে। ইদানীং আয়াজ বাড়িতেই থাকে না কারণ ইচ্ছে কথায় কথায় ঝগড়া করে। নমিতা এবং রাশেদা ইশান মাহমুদা ইশানের এই উত্তরে আর কিছু বলার সাহস পেলো না। নিজেদের ঘরে চলে গেল।

রাত তখন শেষ দিকে। বাহিরে শিয়ালের হাক। সাথে নেওটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে রাতের তীব্রতা স্পষ্ট হচ্ছে। আকাশের থালার মত চাঁদ টা রাতের সৌন্দর্য কে বারিয়ে তুলছে। কাঁপা হাতে চিঠি নিয়ে অপেক্ষায় রত রুহি। একটা চিঠির জোরে এই রাত বিরাতে সে ছুটে এসেছে। হাতে ধরা চিঠিটা অভির দেওয়া। এই প্রথম লোকটা চিঠি দিয়েছে। এবং তাতে স্বযত্নে লিখে বলেছে তাকে রাতের শেষ প্রহরে বাড়ির পেছনের পুকুরে দেখা করতে। তাই সে-ও নির্দিধায় চলে এসেছে। কিছুক্ষন পরেই আগমন ঘটে অভির। লন্ঠন হাতে এদিকে আসছে। সামনে আসলে সে সালাম দেয়। সালামের উত্তর দিয়ে অভি বলে “এত রাতে একটা ছেলের চিঠি পেয়ে একা একা ছুটে এলে? ভয় করলো না?”
রুহি হেসে বলে “মাধবী আপুর সাথে থাকতে থাকতে ভয় ডর নামক জিনিস টা উঠে যাচ্ছে মন থেকে”

“তা-ও। তার উপর আমি অন্যধর্মী”
“বার বার এই কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মনের ঘাঁ বারাবেন না”
অভি আশ পাশ তাকিয়ে বলে “যদি কেউ দেখে নেয়? আরিয়ান আর ওর বউ, দুজনেরই কিন্ত চিলের চোখ। দেখে নিলে?”
“ওরা দেখলে সমস্যা নেই। আয়াজ ভাইয়া না দেখলেই হলো”
“ধরো দেখে নিলো”
“বাজে কথা না বলে কেন ডেকেছিলেন সেটা বলুন”
অভি কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে “ভাবছি বাড়িতে কিছু একটা বলবো। নয়তো এভাবে আর কতদিন? এখন তুমি যদি বলো, তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো তাহলে আমি কিছু একটা করবো”

“প্রমাণ চাচ্ছেন ভালোবাসার?”
“নাহ। শুধু জানতে চাইছি। যার জন্য নিজের জাত কূল ধর্ম ত্যাগ করবো, সে কি সত্যিই সব পরিস্থিতিতে আমার পাশে থাকতে পারবে কী না”
“একবার শুধু আপনি মুসলিম হয়ে যান। মৃত্যু নামক জঘন্য পরিস্থিতিতেও আপনার হাত কক্ষনো ছাড়বো না”
“এখনও তো ধরো-ই নি হাত টা। ছাড়বে কীভাবে?”
বলে অভি নিজের রুক্ষ হাতটা সামনে বারিয়ে দেয়। তাকায় কাজল কালো সেই ঘায়েল করা আখিতে। রুহি প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। চোখে চোখ রেখে প্রথম বারের মত কোন পুরুষের হাতে হাত রাখে। অভি হাতটা শক্ত করে ধরে বলে “যার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারবো তাকে ছুঁয়ে ওয়াদা করলাম, মৃত্যু যদি মুখোমুখিও হয় তবুও এই পিচ্চি হাতটা নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরেও হাতের মুঠোয় থাকবে”

রুহির চোখ ভিজে উঠে “মৃত্যুর পরেও যেন দুটো হাত একে ওপরের ভরসার স্থান হয়”
তখনই অভির লন্ঠনের আলো ছাড়াও আরো একটা লন্ঠনের আলো তাক হয় তাদের উপর। রুহির আত্মা ধরফরিয়ে উঠে। শিওরে উঠে গা। সামনে তার ভাই কে দাঁড়ানো দেখে। তবুও হাতটা ছাড়ে না। ধীরে ধীরে দুজনের হাত আড়াল করে ফেলে। অভি আরো শক্ত করে ধরে রুহির হাতটা। এমনিতেই আয়াজের মন মেজাজ প্রচন্ড খারাপ হয়ে আছে। মাত্রও ইচ্ছের সাথে ঝগড়া হয়েছে। পেকেট ভর্তি বিরি নিয়ে এসেছিলো রাতটা ঘাটে বসেই পার করবে বলে। এখন এই দৃশ্য দেখে তার শিরদারা সোজা হয়ে যায়। যতই অভি তাদের বন্ধু হোক, সে হিন্দু। আর নিজের বোনকে কোনো ছেলের সাথে দেখলে এমনিতেই একটা ভাই তা সহজে মেনে নেবে না। তার উপর ছেলেটা যদি হয় বিধর্মী। তাও এই শেষ রাতে। ভাবতেই মুহুর্তেই আয়াজের মেজাজ আরও খারাপ হয়। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে জিজ্ঞেস করে “কতদিন ধরে চলছে এসব?”

চারদিক থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। রুহির হৃদস্পন্দন বেরে যায়। শুকনো ঢোক গেলে বার দুয়েক। কাঁপা কন্ঠে বলে “ভা ভাইয়া আসলে…”
“চুপপপ”
হঠাৎ ধমকে আবারও কেঁপে উঠে তার ছোট্ট দেহ। সিটিয়ে যায় অভির সাথে। আয়াজ এগিয়ে এস সরাসরি অভির কলার খাঁমচে ধরে। রুহির আতঙ্ক এবার আকাশ ছুঁলো। অভি একবার কলারে ধরা হাতটার দিকে তাকিয়ে রুহির হাতের দিকে তাকায়। মেয়েটা এখনও কাপছে তবুও যতটুকু জোর আছে তা দিয়েই হাতটা ধরে আছে। অভি রাগ সংবরন করে বলে “আয়াজ তুই…”

কথা শেষ করার আগেই আয়াজের শক্ত হাতের ঘুষিতে সে পিছিয়ে যায় খানিক। নাক ফেটে রক্ত বের হয়। রুহি চিৎকার করে কান্না করে উঠে। অভি সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই পাল্টা দিতে যাবে তবে রুহির দিকে তাকিয়ে হাতটা থেমে যায়। আয়াজ পর পর আরো কয়েকটা ঘুষি দেয়। ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয় তবুও সে কিছু করে না। সে চাইলেই এখন আয়াজকে বেধরোম পেটাতে পারতো। কারণ ও এখন নেশাগ্রস্থের মত হয়ে আছে। তবুও কিছু করলো না রুহির দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা পরিস্থিতি সামাল দিতে চেঁচিয়ে সবাই কে ডাকছে। কিন্ত তৎখনাত রুহি একটা অবিশ্বাস্য কাজ করে বসলো। অভিকে অবাক করে দিয়ে পাশে থাকা একটা চ্যালাকাঠ দিয়ে মেরে বসে আয়াজের পায়ের নলি বরাবর। ও দূর্বলই ছিলো আগে থেকে, আর রুহিও বারি টা দিয়েছে এমন জায়গায়, যেন আপাততর জন্য নিরব হয়। পায়ের নলিতে লাগায় আয়াজ তৎখনাত পা ধরে নিচে বসে পরে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় একমাত্র বোনের দিকে। তেমনই অবিশ্বাস্য সুরে জিজ্ঞেস করে “তুই…?”

রুহিও সাথে সাথে বলে উঠে “হ্যা আমি। তুমি ঐ ইচ্ছের পাল্লায় পরে পাগল হয়ে গেছো ভাইয়া। ভেবে দেখ তুমি আগে কি ছিলে, আর এখন? পুরো পাগল পাগল লাগে তোমাকে। কি করছো তুমি নিজেও বুঝতে পারছো না”
আরিয়ান উপরে বারান্দায় ছিলো। রুহির ডাক শুনেই ছুটে এসেছে। সে-ই আয়াজ কে কিছু একটা করতো তবে রুহির সাহসিকতায় খুশি হলো। পরনের শালটা কাধে ঝুলিয়ে এগিয়ে এসে বললো “সাব্বাশ রুহি। আমার ছাগল টার সাথে থেকে থেকে দেখা যায় একটু হলেও ছাগলামি শিখছিস। ভালো। বড়দের সমস্ত শাসন মেনে নিবি কিন্ত ভালোবাসার ব্যাপারে কোন ছাড় দিবি না”

রুহি ভয় পেলো “ভাইয়া তুমি জানলে কীভাবে?”
“আমার বোন আমারই বন্ধুর প্রেমে মাতোয়ারা আর আমি জানবো না?”
নাকের রক্তটা মুছে অভি হাসে। তবে তার মাথায় আসে অপূর্বের কথা। এ সবার মনের কথা পড়তে পারলেও বেচারা অপূর্বের কথা জীবনেও পড়তে পারে না? যেই ছেলেটা সবসময় তাদের বন্ধুমহলটা হাসি খুশিতে মাতিয়ে রাখতো সেই ছেলে আজ প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না। এই বিষয়গুলো কী আরিয়ানের চোখে পরে না? আগের মত আর আড্ডায় শামিল হয় না। টং দোকানের চা ওয়ালা কাকুটা যখন সবার আড্ডার মাঝে জিজ্ঞেস করে, অপূর্ব বাজান কই?। তখন কি আরিয়ানের কানে এসব যায় না?

আগে তো বন্ধুর কিছু হওয়ার আগে ছুটে আসতো। এখন? বউ পেয়ে এমন হয়ে গেল নাকি? আরিয়ান আগে খুব একটা কথা বলতো না। খুব গম্ভীর ধাঁচের ছিলো। কিন্ত হঠাৎই এমন রসিক স্বভাবের হয়ে গেছে। আর অপূর্ব টা পেয়ে গেছে আরিয়ানের গম্ভীর স্বভাবটা। আয়াজটা কেমন যেন অদ্ভুত অস্বাভাবিক থাকে। ইচ্ছে আগের মত হাসি খুশি থাকে না। কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে না তাদের বন্ধুত্বটা? তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম কিন্ত অপূর্ব আরিয়ান? ওদের তো কলিজার বন্ধুত্ব ছিলো বলতে গেলে। ছোট থেকে দুজনে একসাথে এতিম হওয়ায় একে ওপরের সমস্ত দুঃখ ভাগাভাগি করে নিত। স্কুলে তাদের বন্ধুত্বের বাহবা স্যার মেডামরা সহ পুরো স্কুলের শিক্ষার্থীরাও করতো। তবে এই সুন্দর বন্ধুত্বের অবসান ঘটিয়ে এক অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডিত পরীর আগমন ঘটলো। শেষ হলো সবার বন্ধুত্ব, সবার আকাঙ্খা।

“এই শেষ রাতে তোমরা এখানে কি করছো?”
এক গম্ভীর ভারিক্কি স্বরে ধ্যান ভাঙলো অভির। সামনে তাকিয়ে দেখে গোটা বাড়ি শুদ্ধ লোক উঠে এসেছে। আনোয়ার ইশানের চোখ যায় মেঝেতে পা ধরে বসে থাকা ছেলের পানে। ততক্ষনে রাশেদা ইশান ছুটে গেছে ছেলের কাছে। মাধবী এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলো। এখনও চোখ ঘুমে ঢুলু। হাই তুলে আশেপাশে দেখে বোঝার চেষ্টা করে কি হয়েছে এখানে। অভিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এবং রুহিকে তটস্থ অবস্থায় দেখে তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক তৎক্ষনাত সজাগ হয়। কিছুটা তার মস্তিষ্কে খেলে গেছে যে, এখানে ঠিক কি হয়েছে। শশব্যাস্ত ঘুম ছুটে যায় তার। সে সামনে এগোতে যাবে তার আগেই মাহমুদা ইশান তাকে বগলথাবা করে আটকে রাখে। সে প্রশ্নত্নক দৃষ্টিতে তাকালে তিনি বলেন “রাত করে এই ভর জঙ্গলে সুন্দরী মেয়েদের একা হাঁটতে নেই। চুপ করে লক্ষ্মী মেয়ের মত আমার পাশে দাঁড়া”

তার এবার দম ফেটে হাসি আসলো। সবার মাঝে থেকেও নাকি একা পা বারানো যাবে না। অথচ সে একা একা জঙ্গল পর্যন্ত ঘুরে আসে, যেই জঙ্গলের আশে পাশে দিনের বেলাতেও কেউ যায় না। সে বহু কষ্টে হাসি সংবরন করলো। বাকিরা কৌতুহলি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বোঝার চেষ্টা করছে, এখানে হয়েছেটা কি। আনোয়ার ইশান ছেলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “এত রাতে কি হয়েছে এখানে আর তুই ব্যাথা পেলি কিভাবে?”
সে একবার জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ভাঙা কন্ঠে বলে “আমার আদরের বোনের কাছে তার ভালোবাসা বড় হয়ে গেছে গো আব্বা। সে নিজের প্রেমিক কে বাঁচাতে বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছে। খুব বড় হয়ে গেছে তো”

আনোয়ার ইশান কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিয়ান হাই তুলে বলে “ভাই তোর এই মেয়েদের মত ন্যাকামি মার্কা ইমোশনাল ডায়লোগ ছেড়ে উঠে সোজা হয়ে ভালোভাবে কথা বল”
আনোয়ার ইশান চুপ থাকলেও রাশেদা ইশান পারলেন না। যা বোঝার তিনি বুঝে গেছেন। তিনি অভির সামনে দাঁড়িয়ে মুখ বিকৃত করে বলে “ছ্যা। লজ্জা করলো না এক মালি জাতের ধর্ম নিয়ে আমার মুসলমান মেয়েকে ভালোবাসতে?”

অভি কিছু বলার আগেই রুহি মুখ খোলে “আম্মা! এসব কি বলছো?”
রাশেদা ইশান এবার তেড়ে যান মেয়ের দিকে। হাত উঠান মেয়েকে স্বজোরে এক থাপ্পড় দিতে। কিন্ত তার আগেই এক চিকন মসৃণ হাত শক্ত করে ধরে ফেলে তার হাতটা। তারপর স্বজোরে তা ছুরে ফেলার মত ছেড়ে দেয়। মহিলা অবাকের সাথে রাগত হয়ে তাকান সামনে অগ্নি দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা মাধবীর পানে। এই তীক্ষ্ণ চোখের সামনে তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। মাধবী দাঁত চেপে বলে “কারো ধর্মকে নিচু করার অধিকার ইসলাম আপনাকে দেয়নি মামি। কোন সাহসে আপনি ওনার ধর্মকে মালি বলে অসম্মান করলেন? কে দিয়েছে এই সাহস আপনাকে? এত যে নিজের মেয়ে মুসলিম মুসলিম করছেন, কই কখনো তো দেখিনি এক ওয়াক্ত নামায পড়তে? তো কীসের মুসলিম টা আপনি? আবার কত্ত বড় স্পৃহা নিয়ে অন্যের ধর্মকে ছোট করছেন?”

আনোয়ার ইশান রাগে রি রি করে উঠেন “এই মেয়ের জন্যই আমার মেয়েটা এমন সাহস…
তিনি কথা শেষ করার আগেই এক ঠান্ডা কিন্ত ভয়ংকর স্বর বাতাসে ভেসে আসে “জানের ভয় আছে?”
আনোয়ার ইশান আরিয়ানের দিকে তাকান। এই ছেলেই লাই দিচ্ছে এই মেয়েকে। নয়তো একটা মেয়ে মানুষ কেন এত দুঃসাহসী এবং প্রতিবাদী হবে? মেয়ে হবে মেয়ের মত নম্র এবং শালীন। তিনি আরিয়ানের হুমকির বিপরীতে বললেন “ভয় দেখাচ্ছো চাচাকে?”

“সেটা বড় কথা নয়। আমার গন্য মান্য জঘন্য চাচা জান। বড় কথা হচ্ছে, আপনি আমার গৃহীনি সাহেবার সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে পারেন না। পরে মাঝারি কথা হচ্ছে, আপনি মনে মনে ভাবছেন একটা মেয়ে কেন এমন প্রতিবাদী হবে? এই প্রশ্নটা। তার উত্তর হচ্ছে আমার গৃহীনি সাহেবা এক হিংস্র বাঘিনি। আর বাকি মেয়েরা নারী। তো সবাই যদি নারী হয় তো তাদের রক্ষাবাচক কে হবে? আপনাদের মত কাপুরুষরা? একটু ভেবে দেখবেন আমার সম্মানিত চাচা জান, আপনার থেকেও আমার গৃহীনি সাহেবার সাহস হাজার গুন বেশি। তাই তাকে নিয়ে যেন কোন বাজে মন্তব্য আমার কানে না আসে। আর ছোট কথা হচ্ছে, আমি ভয় দেখাই না চাচা। কারণ আমি নিজেই ভয়ংকর ভয়”
আরিয়ানের কথার উত্তরে আনোয়ার ইশানের আগে চেঁচিয়ে উঠলেন রাশেদা ইশান “বেয়াদব ছেলে। চাচা হয় তোমার। রূপ দেখানো সুন্দরী বউয়ের পাল্লায় পরে দিন দিন…”

তিনি কথা শেষ করার আগে মাহমুদা ইশান বলে “আমার ছেলেকে আদব আর বেয়াদব বলার অনুমতি আমি তোমাকে দেইনি ভাবি”
বাকিরা নিরব দর্শক হয় দেখছে সবকিছু। এবার নমিতা ইশানও জোগ দিলেন “আপনারা ঝগড়া শুরু করে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন না কি? মেয়ে রাত বিরাতে বিধর্মী ছেলের সাথে দেখা করতে এসেছে। ছ্যাহ। কি লজ্জা! কি লজ্জা!”

অভি এবার সকলের মাঝে কথা বলে “মুখটা খোলাবেন না আন্টি। নিজের মেয়েকে আগে সামলান”
আরশি এবার কেঁপে উঠে। তার ব্যাপারে কথা উঠলে তো তার মা জেনে যাবে যে- সে আরিয়ান কে ভালোবাসে। কেউ জানুক আর না জানুক। সে তো জানে তার মা কুক্ষনেও আরিয়ান কে দেখতে পারে না। এই ব্যাপারটা তার মা জানতে পারলে কি যে হবে- ভেবেই সে অভিকে ইশারা দিয়ে আকুতি মিনতি করে কিছু না বলতে। রাশেদা ইশান ক্ষেপে উঠে নমিতা ইশানের উপর “আর তোর মেয়ে খুব সাধু তাই না? সেদিন তো মরতেই গিয়েছিলো। সে কি আর আমরা জানি না বুঝি? না জানি কোন কুকির্তী করে মরতে চেয়েছিলো”

একমাত্র মেয়ের নামে এরকম কথায় তেঁতে উঠে ফখরুল ইশানও “মুখ সামলে কথা বলুন বড় ভাবি”
আনোয়ার ইশানও ছোট ভাইয়ের উপর ক্ষেপে যান বউয়ের মুখে মুখে কথা বলার জন্য। এক পর্যায়ে ঝগড়ার রেশ বেরে দ্বিগুণ হয়। একেবারে পুরোনো থেকে পুরোনো ঘটনাও একে একে তোলা দিতে থাকে। আর তার নিরব দর্শক হয় মাধবী,আরিয়ান,রুহি,অভি। আর বাকিরা চেঁচিয়েই যাচ্ছে। থেমে নেই আয়াজ এবং আরশিও। মাধবীও ক্ষণে ক্ষণে দু একটা উচিত কথা মুখের উপর বলে দিচ্ছে। যখন পরিস্থিতি একেবারেই ঘোলাটে হয় মাহমুদা ইশান থামানোর চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে আনোয়ার ইশান ঘোষনা দেয় “আমরা আর এই বাড়িতে থাকবো না। ছেলে মেয়ে সহ চলে যাচ্ছি। এই বালের বাড়িতে না থাকলে কি হবে”

আয়াজ এবং রাশেদাও সায় মেলায় ওনার সাথে। তবে বিরোধিতা করে রুহি। সে কোনভাবেই যাবে না এই বাড়ি ছেড়ে। আনোয়ার ইশান ধমকে উঠেন মেয়েকে “তোর মত নির্বোধ আমি একটাও দেখিনি আমি। কীভাবে পারলি একটা বিধর্মী ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে?”
রুহি কান্না জড়িত কন্ঠে বলে “আব্বা আমি ওনাকে ভালোবাসি”
বলার সাথে সাথেই একটা শক্ত চড় এসে পরলো তার নরম গালে। সে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকায় নিজ বাবার পানে। কোনদিন তার বাবা তার গায়ে হাত তোলেনি। আর আজ কি না কাউকে ভালোবাসেন দায়ে তার গায়ে হাত তুললো! এবার মাধবীও বাধা দিলো না। রাশেদা ইশান তাচ্ছিল্য করে কেঁদে দিয়ে বলে “তোর জন্য আজ আমার ছোট জাঁ রা আমার সাথে বেয়াদবি করেছে। তোর জন্য এতগুলো কথা শুনতে হয়েছে”
বলেই তিনি আচঁলে মুখ গুঁজে কান্না করে দেন। নমিতা ইশান মুখ বাকিয়ে বলে “মনে হচ্ছে তারা এ বাড়িতে না থাকলে বাড়ি খোঁয়ে যাবে”

পর পর ফখরুল ইশান এবং আরশিকে বলে “চলো চলো। এদের নাটক দেখার সময় নেই। বাড়িতে আসো সবাই”
ফখরুল ইশান রাগ দেখিয়ে চলে গেলে আরশিও আর মায়ের অবাধ্য হওয়ার সাহস দেখায় না। ওরা চলে যেতেই আয়াজ রুহির হাত ধরে বলে “আর এক সেকেন্ডেও দাঁড়াবো না এ বাড়ি। চল”
বলে টেনে নিয়ে যেতে থাকে রুহিকে। রুহি শব্দ করে কান্না করে দেয়। চেঁচিয়ে মাধবীকে বলে “আপা আমি তোমাকে ছাড়া যাবো না। আপা ওরা আমাকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে। আপা আমি ডাক্তার বাবুকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করলে মরে যাবো। তুমি এদের বোঝাও না”

তবে কেউই তার কথায় সাহায্য করতে পারে না। কারন মাধবী আরিয়ান আর যাই করুক- কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে মতামত দেয় না। ওদের ইচ্ছে হয়েছে ওরা চলে যাবে। এতে তাদের কোন কিছু বলার অধিকার নেই। তাই অভিও চুপ থাকে। রাশেদা ইশান ছেলের বউকেও টেনে নিয়ে যায়। ইচ্ছের খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো ‘আমাকে এতটুকু শান্তি দিন আপনারা। এখানে থাকলে তবুও তো মানুষটাকে চোখের সামনে দেখতে পারতাম। এই সৌভাগ্য টুকু কেড়ে নিয়েন না’

তবে মুখে কিচ্ছুটি না বলে চোখ বন্ধ করে নেয়। রুহির কান্না সহ্য করতে পারে না। সবার আড়ালে চোখের ইশারা দিয়ে বোঝায় ‘আমি থাকতে কেউ তোকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে পারবে না’
ব্যাস এতটুকুতেই কান্না থেমে যায় মেয়েটার। আপু যেহেতু বলেছে তাহলে সত্যিই কথা রাখবে। বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে অভির দিকে তাকাতেই অভি বলে “চিন্তা করবেন না পাখি। আপনার ডাক্তার বাবু বেচে থাকতে তার পাখিকে অন্য কারো হতে দিবে না। এই বিদায় ক্ষণিকের। আমরা চিরস্থায়ী ভাবে একসাথে থাকবো। শুধু অপেক্ষা করুন”
এই পুরো সময়টা দাঁড়িয়ে আরিয়ান তামাশা দেখে। বাড়ি তার। অথচ একেকজন ক্ষমতার সাথে কথা বলছে। আবার নাকি এ বাড়িতে থাকবে না বলে চলেও যাচ্ছে। ওরা যেতেই মাধবী অভিকে বলে “ওকে যেন অন্য কোথাও বিয়ে দিতে না পারে। ও আপনাকে ভালোবাসে। বিশ্বাসও করে। আশা করি ওর বিশ্বাসের যথেষ্ট মর্যাদা দেবেন?”

“কক্ষনো ওর বিশ্বাসের অমর্যাদা করবো না। কথা দিলাম আপনাকে”
বলে আরিয়ান কে বলে “ভাই ওরা এখন কোথায় যেতে পারে?”
আরিয়ান ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয় “কোথায় আবার? হয় চাচির বাপের বাড়ি। নয়তো ভাড়া”
“ওহ। আচ্ছা আমি সমস্ত খোঁজখবর রাখবো ওদের। আজ যাই। আর হ্যা, তোর বন্ধুর একটু খবর নিস। চলি”
বলে সে-ও চলে যায়। মাধবী আরিয়ান কে বলে “ইচ্ছের ব্যাপার টা নিয়ে ভেবেছেন?”
“ওটা তেমন কিছু না। ইচ্ছেকে পছন্দ করতো শুধু”
“আবার কিছু করবে না তো?”
“না”
তখনই ভেতর থেকে মাহমুদা ইশান ডেকে বলে “গ্রাম থেকে অজয় টেলিফোন করেছে। আরিয়ান তোকে জরুরি যেতে বলেছে”

দুজনে একে ওপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। এত রাতে কি হলো হঠাত যে এত জরুরি তলব? দুজনে শশব্যাস্ত ভেতরে ঢোকে। আবারও টেলিফোন করে অজয়কে। তবে বিপরীত দিক থেকে আর ধরা হয় না টেলিফোন টা। দুজনে বেশ চিন্তিত হয়। আরিয়ান দ্রুত ঘোড়া বের করে। মাহমুদা ইশান মাধবী কে বলে “রাত করে মেয়েটার যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আরিয়ান তুই একা যা”

মাধবী তৎক্ষনাত বলে “আমাকে যেতে হবে মামি। নইলে বাড়িতে থেকে আমি স্টোক করবো চিন্তায়”
তবুও তিনি নানান কথা বলে মাধবীকে আটকানোর চেষ্টা করে। তবে মেয়েটা কথা শুনতে নারাজ। নাছরবান্দা হয়ে উঠে বসে ঘোড়ায়। আরিয়ান জানতো, শুধু শুধু মহিলা নিজের শক্তি ক্ষয় করছে কথা বলে। এই মেয়ে জীবনেও মানবে না। সে ঘোড়ার লাগাম টেনে বলে “আসছি আম্মা”
তিনি হাত নাড়িয়ে বলে “সাবধানে যাস। আর পৌছে টেলিফোন করে জানাস কি হয়েছে”
ততক্ষনে ঘোড়া চলতে শুরু করেছে। মাধবী উঁচু গলায় বলে “দোয়া করবেন মামি। যেন খারাপ কিছু না হয়”

চিন্তিত বদনে দুজনে গ্রামে প্রবেশ করে। আশ্চর্যের ব্যাপার আজ যেন গ্রামটা একটু বেশিই নিরব। গ্রামের বাতাস যেন হঠাৎই থেমে গেছে— না পাতার শব্দ, না পোকামাকড়ের ডাক। যেন কেউ পুরো গ্রামটাকে শ্বাস বন্ধ করে ধরেছে। গ্রামের কুকুরগুলো একদম নিশ্চুপ। এমন চুপ আগে কখনো হয়নি। চাঁদ উঠেছিল, কিন্তু আলো দিচ্ছে না—মনে হচ্ছে আকাশে কেউ একটা কালো কাপড় টেনে দিয়েছে। এত নিস্তব্ধতায় দুজনেরই শিউরে ওঠে। বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা ধরে শশব্যাস্ত। তবে মাঝ রাস্তাতেই থামতে হয় তাদের। ভেসে আসছে কিছু মানুষের করুন কান্নার শব্দ ও অনেকের কোলাহল। দুজনেই খুব চিন্তিত হয়। আরিয়ান তাড়া দিয়ে বলে “চল। আগে দেখে আসি এত কোলাহল কেন”

দুজনেই ঘোড়া ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। কারণ গ্রামে একজনের ঘরের উপর দিয়ে আরেক জনের ঘরে যেতে হয়। মানে উঠোন পেরিয়ে যেতে হবে। শুধু মেইন রাস্তা গ্রামে একটাই। আর বাকি সব মাটির সরু পথ। আরিয়ান নিজের আঙুলের ভাজে মাধবীর হাতটা নিয়ে ত্রস্ত হাঁটা ধরে। শব্দ অনুসারে পৌছলে দেখতে পায়- এক ছনের ঘরের সামনে শত শত লোকের ভীর জমেছে। ভীরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ। অবস্থা কিছুটা বেগতিক লাগলে আরিয়ান খাপ থেকে তলোয়ার বের করে। খারাপ কিছু হয়েছে আচঁ করেই সে বেরোনোর সময় তলোয়ার সাথে নিয়েছিল। খাপবদ্ধ তলোয়ার খোলার শব্দ সকলে জটজলদি পেছনে ফেরে। সেনাপতির সাথে রাণী মাকে দেখলে সবাই মাথা নিচু করে পিছিয়ে গিয়ে মাঝে জায়গা করে দেয়।

উচ্চ পরিবারের দালান বাড়ি ছাড়া কারেন্ট জোটেনি এখনও সাধারণ মানুষের কপালে। তবে কেরোসিন তেলের দাম রাণীর আদেশে হয়েছে একেবারেই স্বল্প মূল্যের। তাই কারেন্ট না থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণ লন্ঠন এবং কুফি বাতি আছে সবার কাছেই। সেগুলোর আলোতেই দেখা যাচ্ছে কাউকে মাটিতে সুইয়ে রাখা আছে। পাশে গ্রামের মহিলারা কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে কান্না করছে। মাধবীকে দেখে তারাও ক্রন্দন রত মুখে উঠে দাঁড়া। এত এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও চারদিকে কেমন যেন সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। এই অদ্ভুত নিরবতায় গা শিউরে উঠার কথা। আরিয়ান এতক্ষন থাকা চিন্তিত বদনটা ঢেকে ফেলে কঠোরতার আড়ালে। কঠোর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “কি হয়েছে এখানে?”
সবাই কে আগের ন্যায় মাথা নিচু করে রাখতে দেখে মাধবী চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “কী হলো? কি হচ্ছে এখানে?”
তখনই ভীড়ের মধ্য থেকে অজয় বেরিয়ে আসে। কাঁপা কন্ঠে বলে “জ জী ভাই। গ্রাম খুব বড় বিপদের মুখে আছে রাণী মা”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩২

মাধবী কপাল সহ ভ্রু গুটিয়ে ফেলে “কি হয়েছে সেটা বলো”
অজয় মাথা নিচু করেই কিছুটা পাশ ফিরে পিছনে কাউকে আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে বলে “উনি জানেন সব কিছু”
মাধবী আরিয়ান দুজনেই ত্রস্ত তাকায় তাদের পেছনে। কাউকে দেখতে না পেয়ে বলে “কই? কেউ নেই তো এখানে”
তখনই পেছন থেকে কেউ একজন বলে “গ্রাম বড় বিপদে পরেছে। চারদিক ভয়াবহ অভিশাপের লেলিহান সিখায় ছাড়খার হয়ে যাবে। ধ্বংস হবে সব, যেভাবে হয়েছে জমিদাররা। পরিত্যক্ত হবে গ্রাম, যেভাবে হয়েছে রাজবাড়ি। মৃত্যু হবে সবার, যেভাবে হয়েছে চৌধুরী বংশের। চলে যেতে হবে সবাই কে, যেভাবে যেতে হয়েছে রাণী কে”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৪