তুমি আমার বিতৃষ্ণা পর্ব ১০
মাশকুরা মায়িশা
ভোর ৫:৫০
ফজরের নামাজ পড়া শেষ করে আহসান বাড়ির সকল পুরুষ এলাকারই একটি মসজিদ থেকে বের হয়েছে,, সবাই একে অপরের সাথে হেসে কথা বলতে বলতে বাড়ি থেকে এগিয়ে চলছে,, এমন সময় আবিদ আয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলে,,
আবিদ:- আয়ান তুই এতক্ষণ ধরে মোনাজাতে কি বলছিলি বলতো ?? আমাদের নামাজ শেষ হওয়ার পরে আরো আধা ঘণ্টা তুই শুধু মোনাজাতই করছিলি ..!
এতে আয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং মুখে বিশাল বড় এক হাসি এনে বলে,,
আয়ান:- আমাদের বাড়ি থেকে কালো ছায়া সরানোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম,,
ইয়াশ:- কালো ছায়া??!
আয়ান:- হ্যা! কালো ছায়া! কারণ দেখছো না আমাদের বাড়ির সবার বিয়ে কেমন আজব ভাবে হয়ে যাচ্ছে? একটা বিয়েও তো আমরা শান্তি মত খেতে পারিনি! তাই এবারে ছোট আপুর বিয়েটা যেন ঠিকঠাক ভাবে হয় তাই দোয়া করেছি!
আয়ানের কথায় তারা হাসবে নাকি কাঁদবে সেটাই বুঝতে পারে না,, শুধু হা হয়ে তাকিয়ে থাকে,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সন্ধ্যা ৬:৩০
মাসফিয়া আর অভ্র-এর বিয়ে,, মাশফিয়া বউ বসে সেজে বসে আছে,, ওরা বাড়ি জুরে হুল্লোড় হচ্ছে,, বর চলে আসে সবাই মাশফিয়াকে ঘরে রেখে চলে যায়,,
মাশফিয়ার আজকে বিয়ে,, অথচ মেয়েটার মুখে কোন হাসি নেই,, অজান্তেই চোখে কোন এক পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে,,
তখনই তার ঘরের ব্যালকনি থেকে কিছু আওয়াজ হয়,, সে কিছুটা ভয় পেয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়,, এমন সময় মাগরিবের আজানো শুরু হয়ে যায়,,
কাজী সাহেব বসে আছেন,, তার পাশে অভ্রকেও বসানো হয়েছে,, তবে অভ্রর মুখেও কোন হাসি নেই,, নেই বিয়ের জন্য কোন উত্তেজনা,,
কাজী :- এবার কনে কে আনার ব্যবস্থা করুন,,
কাজের কথায় ঐশী আর মায়িশা কোনে মানে মাশফিয়াকে আনার জন্য তার ঘরে যায় কিন্তু অবাক করে তার ঘরে তারা কাউকেই খুঁজে পায় না,, যা দুজনকেই অবাক করে দেয় সাথে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়,,
পুরো বাড়ি জুড়ে খবর ছড়িয়ে যায় বউ পালিয়েছে,, মায়িশা মাসফিয়া আর আয়ানের মা লিপি বেগম এতক্ষণে প্রায় দু-তিনবার জ্ঞান হারিয়েছেন,, যাকে সবাই সান্তনা দিচ্ছে,,
ইয়াশ আর আবিদ দুজনেই প্রায় পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে মাশফিয়ার খোঁজ লাগানো শুরু করে দিয়েছে,, কিন্তু আজব ভাবে আব্রাহামকে তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে,,
এমন সময় আব্রাহামের ফোনে কারো একজনের কল আসে কল পাওয়ার সাথে সাথেই সে ইয়াস আর আবিদকে তার সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চাইলে তখনই অভ্র তাদেরকে আটকায়,,
অভ্র :- আমিও যাব!
তারা তিনজনে কতক্ষণ একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে তাকে সাথে নেয়,,
চোখে পানির ছিটা পড়ায় মাসফিয়ার জ্ঞান ফিরে,,
চোখ মেলে তাকাতেই সে দেখতে পায়,, তার সামনে রেয়ান বসে আছে তার,, তবে মাশফিয়ার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না,, তখনই রেয়ান মাসফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
রেয়ান :- ভয়! এমন একটি জিনিস যা এই রেয়ানের মধ্যে নেই,, আজ অব্দি বহু মানুষের জীবন নিয়েছি আমি আমার হাতে,, কখনো ভয় পাইনি,, না এই জীবন দিতে কখনো ভয় হয়!
(হঠাৎ করে জান হেসে দেয়,,এবং মাশফিয়ার চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে)
কিন্তু বিশ্বাস করো নীলাঞ্জনা,, প্রথমবার আমি ভয় পেয়েছি,, তোমাকে হারানোর ভয়,, তোমার জন্য আমি বড্ড ভীতু,,
এসব বলে রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং তার পাশে থাকা সিফাত কি উদ্দেশ্য করে বলে
রেয়ান:- সিফাত! কাজী কে বল বিয়ে পড়াতে!
সিফাত মাথা নাড়ে,, তখনই কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করে,, কাজী মাশফিয়া কে উদ্দেশ্য করে বলে,,
কাজী:- তুমি কি রেজোয়ান খান রেয়ানকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছো? বল কবুল
সিফাত মাসফিয়া কে কবুল বলানোর জন্য রাজি করাতে রিভ-ল;ভার বের করতেই যাবে তার আগেই মাশফিয়া দ্রুত গতিতে বলে ওঠে,,
মাশফিয়া :- কবুল, কবুল, কবুল!
এত দ্রুত গতিতে কবুল বলা শুনে রেয়ান বিষম খায়,, সিফাতের হাত থেকে রিভ-লবার পড়ে যায়,,
কাজী :- রেজোয়ান খান রেয়ান আপনি কি মাহদিয়াত আহসান মাশফিয়াকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন? বলুন কবুল!
রেয়ান এখনো মাসফিয়ার এত দ্রুত গতিতে কবুল বলায় নিয়ে ভরকে আছে,, তাই সে অনেক কষ্টে বলতে শুরু করে,,
রেয়ান:- বকুল- ধুরু কাবু- থুক্কু কবুল..
রেয়ানের এমন ভাবে কবুল বলায় তারা হা হয়ে তাকিয়ে থাকে,, তখনই সেই গোপন গোডাউনের দরজা ভেদ করে আব্রাহাম ভেতরে ঢুকে রেয়ানের গালে স্ব-জোরে ঘুসি মা-রে!
আব্রাহাম রেয়ান কে আরো একটা ঘুসি দিতে গেলে বুঝতে পারে যে এটা আর কেউ নয় বরং রেয়ান,,
সে কতক্ষণ থম মেরে যায়,, পরিস্থিতি বেগতিতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে মাশফিয়া সিফাতকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
মাসফিয়া :- এই ভাই! আবালের মত এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?! হয় ওদেরকে আটকান নয় আমার বাঁধন খুলে দিন!
সিফাত কি করবে বুঝতে না পেরে মাসফিয়ার বাঁধন খুলে দেয়,,ছাড়া পাওয়ার সাথে সাথে মাসফিয়া আব্রাহাম আর রেয়ান এর মাঝে চলে যায়,, এমন সময় ইয়াশ বলে ওঠে,,
ইয়াস :- রেয়ান ভাই আপনি এরকম কাজ কিভাবে করতে পারলেন?
মাশফিয়া:- প্লিজ ভাইয়া তোমরা থামো! আমি জানি যে সে আমাকে জো-র করে তুলে এনেছে কিন্তু এই বিয়েতে আমার অমত ছিল না!
এবারে যেন রেয়ান নিজেও থমকে যায়,,মাসফিয়া আবারো বলে,,
মাসফিয়া :- যাকে এত ভালোবাসি তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার থেকে তো এরকম জো-র করে বিয়েটাই ভালো!
এবার আবিদ আর ইয়াস কিছু বলতে যাবে তার আগেই আব্রাহাম উচ্চস্বরে হেসে ওঠে তার এরকম হাসি দেখে সবাই ভরকে যায়
আব্রাহাম :- আজকে রেয়ান প্রমাণ করলি তুই আমার assistant এবং বেস্ট ফ্রেন্ড! ইয়াস, আবিদ আমি জানি তোরা অবাক হচ্ছিস,,কিন্তু এই বিয়েটা আটকানোর জন্য আমিও কিছু প্ল্যান করেছিলাম! এবং প্রথমে আমি ভেবেছিলাম মাশফির উধাও হওয়াটা আমারই লোকেদের কাজ! কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি আমার সব সময় বলদ সেজে থাকা বন্ধুও এমন কাজ করতে পারে!
আব্রাহামের কথায় যেন ইয়াস, আবিদ আর অভ্র আকাশ থেকে পড়ে,, আব্রাহাম তাদেরকে সবকিছু পরিষ্কার করে বললেন তারা বিষয়টা বুঝতে পারে,,
পুরো আহসান বাড়ি ধরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে,, আজহারুল হাসান এবং মাজহারুল আহসান গম্ভীর মুখে বসে আছেন,,তাদের সামনে মাসফিয়া আর রেয়ান বসানো হয়েছে,, পুরো বাড়ির সবার মুখে ভয় দেখা যাচ্ছে,,
আজহারুল আহসান রেয়ান কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করেন,,
আজহারুল আহসান :- রেয়ান ছোট থেকে তোমাকে আমরা চিনি,, এমন কি আমাদের কোম্পানির একটি বেশ বড় পদেই তুমি চাকরিরত আছো,, এমনটা কিভাবে করতে পারলে? তুমি যদি মাসফিয়াকে বিয়ে করতে চাও আমাদের আগে বললেই তো পারতে!
এতে রেয়ান ভয় পায় না বরং সে অনেক শান্ত স্বরে বলে,,
রেয়ান :- ভয় ছিল! ভয় ছিল যে যদি আমার আর নীলা- মাশফিয়ার জন্য আব্রাহামের সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন? তাই কিছু বলার সাহস হয়ে ওঠেনি!
মাজহারুল আহসান :- কি কথা শোনালে! তুমি ভয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারোনি, ভয়ে বিয়ের কথাও বলতে পারোনি কিন্তু সোজা কিড-ন্যাপ করে বিয়ে করে নিতে পারলে?!
এবারের রেয়ান কি বলবে সেটা বুঝতে পারে না,, পরিস্থিতি খারাপ দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সামাল দিতে আব্রাহাম এবার বলে ওঠে,,
আব্রাহাম :- ডেড, ছোট আব্বু আমি জানি বিষয়টা তোমাদের জন্য মেনে নেওয়া কষ্ট হচ্ছে তবে এইসবই আমি আগে থেকেই জানতাম আর তোমরাও তো রেয়ান কে চেনো তাই আমার মতে আমাদের রেয়ান আর মাশফিয়াকে মেনে নেওয়া উচিত কারণ তারা দুজনই দুজনকে ভালোবাসে!
অনেক চিন্তাভাবনার পরে তাদেরকে মেনে নেওয়ার কথাই ঠিক করা হয়,, আজহারুল আহসান রেয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন,,
মাজহারুল আহসান:- তোমাদের সম্পর্ক মেনে নিচ্ছি বলে খুশি হয়ে যেও না,, তোমার বাবা মা কে আমার মেয়েকে তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে আসতে বলবে!
রেয়ান খুশি হয়ে মাথা নাড়ে এবং সবকিছু এখানেই ঠিক হয়ে গেলে হঠাৎ করে আয়ান বলে ওঠে..
আয়ান:- আমার আর কোনো ভাই বোনের বিয়ে খাওয়া হলো না,, এখন খাওয়ার জন্য শুধু আমার নিজের বিয়েটাই বাকি আছে..!
আয়ানের কথায় বাড়ির সবাই হেসে ওঠে..!
আব্রাহাম ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল,, তখনই ছাদে অভ্র আসে,, যার দিকে না তাকিয়েই আব্রাহাম বলে ওঠে,,
আব্রাহাম :- কালকে কয়টায় ফ্লাইট?
অভ্র যে বিদেশ যাচ্ছে সেটা সে কাউকেই জানায়নি,, তবে আব্রাহাম যে জানে এটা জেনেই সে অবাক হয়ে যায় তবে সে নিজের অবাক হওয়াটা প্রকাশ করে না এবং শান্তস্বরে বলে,,
অভ্র :- ভোর পাঁচটায়,,
হঠাৎ করে কিছু পুরনো স্মৃতি মনে করে আর অভ্র আব্রাহাম কে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,,
অভ্র :- জানিস “হিটলার”? ৫ বছর আগে তোর করা বদ দোয়া আমার উপরে লেগে গিয়েছে! দেখ আজকে আমিও ভালোবেসে কষ্ট পাচ্ছি! নিজের শখের প্রজাপতিকে অন্যের পাশে দেখে আমারও বুক কাঁপছে,, কিন্তু এরপরও এই দহনই আমার কাছে এত ভালো লাগছে কেন?
তুমি আমার বিতৃষ্ণা পর্ব ৯
জানিস একটা জিনিস আমি মানতে শিখেছি,, সে যদি অন্য কারো হয়ে থাকতে চায় থাকুক,, আমি নাহয় তার সাথের বোনা সকল স্বপ্নগুলো নিয়েই বেঁচে থাকি!
কালকে আমি বিদেশ চলে যাব এরপর আমি আর কবে ফিরবো তার কোনো ঠিক নেই,, এখন অন্তত আমার সাথে একটু কথা বল! দেখ তোর সকল চাওয়া পূর্ণ হয়েছে আমিও কষ্ট পাচ্ছি,,
অভ্র চলে যেতে চাইলে আব্রাহাম তাকে জড়িয়ে ধরে,, এতে অভ্র কতক্ষণ থমকে থাকে,, পরে সেও জড়িয়ে ধরে,,
