Home তুমি এলে বসন্ত নামে তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১১

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১১

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১১
রিমঝিম বৃষ্টি

ঢাকার কোলাহল যেখানে এসে এক শান্ত স্তব্ধতার রুপ নেয় ঠিক সেখানেই রাজউকের আধুনিক সীমানা পেরিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো চিরচেনা রুপসী বাংলা নলভোগ গ্রাম। উত্তরার সুউচ্চ দালানকোঠা আর দিয়াবাড়ীর মেট্রোরেলের যান্ত্রিক আওয়াজ কে পেছনে ফেলে মাত্র কয়েক কদম পেরুলেই নলভোগের সেই আদিম রুপ চোখে পড়ে যেখানে কংক্রিটের ভিড়েও সকালটা কাটে পাখির ডাকে যেনো।
লোকালয়ের এক কোণে যেখানে আগে ছিলো সাধারণ টিনের ঘর আজ সেখানে একতলার বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ইরাদ সামনে এগিয়ে গিয়ে বাড়িতে কলিং বেল বাজাতেই ওপাশ থেকে দরজা খুলে দিলো এক মহিলা। কয়েক বছর বাদে সেই এলাকায় এসেছে, সেই বাড়িতে। মহিলার মুখের গঠন ঠিক যেনো আগের মতোই আছে। শাইলা বেগম ইরাদকে দেখে বেশ চমকালো এত বছর বাদে এখানে আসলো কেনো। নিজেকে সামলে বলে উঠলো,

” কে আপনি? কী চায় এখানে..?”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” নাটক করছেন। ভেতরে যেতে দিন কিছু কথা আছে বলেই চলে যাবো। বাইরে থেকে হুদাই তামাশা করবেন না তাহলে আমার না আপনার সম্মানই যাবে..?”
শাইলা তাড়াতাড়ি দরজা থেকে সরে গিয়ে বললো,
” ভেতরে আসো..! ”
ইরাদ ভেতরে গিয়ে বসার রুমে বসতেই পাশে রুম থেকে কিছুটা বয়স্ক লোক শাইলা বেগমের স্বামী তমাল সওদাগর বেরিয়ে এসে সোফায় বসে সামনে তাকাতেই কিছুটা স্থির হলো। ইরাদ দু’জনের দিকে তাকিয়েই বললো,

” ফারিশা কোথায় মামী…?”
তমাল বউয়ের দিকে তাকিয়ে ইরাদকে বললো,
” এত বছর বাদে কোন আনন্দে এলে শুনি। তার ওপর বউয়ের খোঁজ করছো। সে তো সেই বছরেই এ বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেছে..!”
” কোথায় গেছে খোঁজ নিয়েছেন কখনো..? আমার বউ হওয়ার আগেই সে তো আপনার রক্তের তাহলে খোঁজ নিয়েছেন কি তার, সে কোথায় গেছে..? ”
ইরাদের কথায় শাইলা মুখ বাকিয়ে স্বামীর পাশে বসতে বসতে বললো,
” সে খোঁজ আমরা রেখে কী করবো। তাকে কী আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি যে সে চলে যাবে। দেখো হয়তো কোনো পোলার সাথে ভেগে গেছে..?”
ইরাদ সোফার সাথে হেলান দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বললো,
” সেদিন আমার সাথে বাজে ব্যবহার করার জন্য ফারিশাকে উসকেছিলো কে মামী..?”
শাইলা থতমত খেয়ে বললো,

” ও কী বাচ্চা যে আমরা শিখিয়ে দিবো..? এত বছর বাদে এসেছিলো ভদ্রলোকের মতো বসো চা, পানি খাও বিদায় হও..!”,
বলেই রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগলে ইরাদের কথায় থেমে যায়।
” আয়েশা চৌধুরীর সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করেছেন সোজাসাপ্টা উত্তর দিলেই তো হয়। এর জন্য কত টাকা পেয়েছেন আমি তার দ্বিগুণ টাকা দিবো যদি সত্যিটা বলতে পারেন আমায়.?”
ইরাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো। টাকার কথা শুনতেই শাইলা আড়ঁচোখে স্বামীর পানে তাকাতেই তমাল ইরাদকে বললো,
” টাকার লোভ দেখাচ্ছো, আমাদের টাকার লোভ দেখিয়ে লাভ নেই চলে যাও এখান থেকে..?”
” যা চাইবেন তাই দিবো বলুন। ফারিশাকে খুঁজে পাবো কি না জানি না কিন্তু বলতে তো অসুবিধা নেই এখন..?”
ইরাদের কথায় তমাল সোজা বললো,

” তোমার দাদী মোটা অংকের টাকা দিয়েছিলো। আমরা গরীব ছিলাম বলে টাকা দিয়েছিলো আর বলেছিলো তোমার জীবন থেকে ফারিশাকে সরে যেতে…! আমরাই বা কী করতাম বড়লোক মানুষ তোমরা জোর করে তো আর কারোর সংসারে দেওয়া যায় না..! ”
ইরাদ স্থির হলো ক্ষণিকের জন্য। এতটুকুই শোনার ছিলো তার যার জন্য টাকার লোভ দেখালো সে । বসা থেকে দাঁড় হয়ে ধারালো গলায় বললো,
” আমার যা জানার জানা হয়ে গেছে আর রইলো টাকা, আপনাদের টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আপনাদের মতো মানুষই সামান্য টাকার জন্য একটা মানুষের সংসার শেষ করে দেয়, কেন করেন এইকাজ। আপনি কী জানেন একটা সংসার ভাঙা কত বড় পাপ কাজ। এর ফল আমি না দিলেও ওপর ওয়ালা কিন্তু চুপ থাকবে না। আপনাদের চেহারা আর ভুলেও দেখতে চায় না। প্রয়োজন ছিলো জন্য এসেছি নয়তো ভুলেও আসতাম না…! “,

বলেই সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলে ফের পিছু ঘুরে বললো,
” ফারিশাকে তো ছোট থেকে মানুষ করেছেন এতটুকু দয়াও কি আপনার মনে ছিলো না তার জন্য..?”,
বলেই গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো। ইরাদ বেরিয়ে যেতেই শাইলা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো, ভেতরে এসে তমাল কে বললো,
” কি পোলা দেখছেন তো টাকার নাম করে সব জেনে নিলো। আচ্ছা শুধু দাদীর নাম নিলে যে..?”
তমাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
” এতে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই শাইলা। তাই বলে দিলাম। শুধু মেইন মাথা যে ছিলো তার নাম বলেছি। ওরা বুঝে নিক এবার আমাদের কী..?”
ইরাদ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতেই এক তরুণ বাড়ির সামনে এসে তা এক নজর দেখলে গাড়ি টা যেনো তার বড্ড চেনা মনে হলো। তবুও মনের ভুল ভেবে আর না ভেবেই বাড়িতে চলে গেলো। বাসর রুমে দু’জনকে একসাথে বসে থাকতে দেখে তরুণ টি বলে উঠলো,
” কে এসেছিলো মা..?”
শাইলা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,

” চিনিনা কার যেনো খোঁজ করতে আসছিলো। কিন্তু তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি..?”
” ফারিশার খোঁজে গিয়েছিলাম.!”
” তোমায় না বারণ করেছি ওকে না খুঁজতে..? ”
বাবার কথায় তরুণটি বলে উঠলো,
” ওকে না পেলে তোমাদের খবর আছে। কোন সাহসে ওকে তাড়িয়েছো তোমরা এজন্য আমাকে এতদিন মিথ্যা বলেছিলে তাই না । বাইরে থেকে যখনি কথা বলতে চাইলাম মিথ্যা বুঝিয়ে থামিয়ে দিতে। মা ভালো করে বলে রাখলাম ফারিশাকে না পেলে সত্যি তোমাদের কী করবো আমি জানি না..? “,
বলেই গটগট করে নিজের রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দিলো তা দেখে শাইলা তমালকে বললো,
” দেখো ছেলের কী কথা। ওই মেয়ের জন্য আমাদের সাথে এমন করছে। ভালো লাগে না আর যত নষ্টের গোড়ায় ওই মেয়ে..! তোমায় বলেছিলাম ও মামা বাড়িই থাকে কেনো বাড়িতে আসতে বললে এখন বুঝো ঠেলা..! এত বছর তো মামার কাছেই ছিলো তাহলে বাড়ি আনার মানে কী..?”,
বলেই নিজের কাজে গেলো শাইলা আর তমাল সেখানেই বসে রইলো স্থির হয়ে।

চৌধুরী প্যালেস———–
দুপুর হতেই ইরাদ ফ্রেশ হয়ে বেডের ওপর বসলো ল্যাপটপ নিয়ে।
” ইরাদ আসবো..?”
ইরাদ মাথা তুলে সামনে তাকাতেই মাকে দেখে বললো,
” আম্মু তোমায় কী আমি বলেছি আমার ঘরে আসার সময় পারমিশন নিতে এসো তো.?”
ইভা হেসে ভেতরে ঢুকলো ট্রেতে করে কিছু ফল আর জুস নিয়ে বেডের ওপর রাখলো আর বললো,
” সকালে কই ছিলি নাস্তাও করলি না। নে এগুলো খা তো..?”
ইরাদ ল্যাপটপ টা পাশ রেখে মায়ের কোলে মাথা রাখলো আর বললো,
” আম্মু আমি বাবা হিসেবে কেমন হবো বলো তো ? ”
ছেলের কথায় ইভা তার চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
” তুই কী ফারিশার খোঁজ পেয়েছিস..?”
ইরাদ চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকালো মাথা দুলিয়ে বললো,

” ফারিশার সাথে তোমার নাতিও আছে আম্মু..?”
ইভা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
” এবার মিটমাট করে নে বাবা। এমন করে তো আর জীবন চলে না। সিদ্ধান্ত নে, হয় তাদেরকে মেনে নে নয়তো ছেড়ে দে.?”
” উহু ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। আমি শীঘ্রই ওদের নিয়ে আসবো..?”
ইভা ছেলের কপালের কাছে হাত আনতেই চিন্তিত গলায় বললো,
” কী রে তোর কপাল গরম কেন…? “,
বলেই গলায় হাত দিতেই বুঝলো জ্বর এসেছে। ইভা হতাশার সুরে বললো,
” সবেমাত্র দেশে ফিরেছিস এত শাওয়ার নিলে হয় জ্বর এসেছে দেখতো..। তুই বস আমি মেডিসিন আনছি..?”
” আম্মু পর কখনো ক্ষতি করে না, ক্ষতি নিজের লোকেরাই করে কিন্তু কেন আম্মু..?”
ছেলের এমন প্রশ্নে ইভা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,

” হঠাৎ এমন কথা বলছিস কেনো ইরাদ..?”
ইরাদ সূক্ষ্ম হাসলো প্রসঙ্গ বদলাতে বললো,
” আচ্ছা আম্মু একজন সন্তানের কাছে বাবা বেশি দরকার না মা..?”
ইভা ছেলের এমন ছেলেমানুষী প্রশ্ন শুনে না হেসে আর পারলো না।
” শোন সন্তানের জন্য দু’জনকেই দরকার ঠিক যেমন একজন মানুষ এক পায়ে চলতে পারে না দু’পা ছাড়া, যারা এক পায়ে চলে তারাই বুঝে দুনিয়া কত কঠিন । তেমনি একটা সমাজে বাবা ছাড়া একটা মেয়ের একার পক্ষে সন্তান নিয়ে চলা খুব কঠিন । তবে, আমার মনে হয় মায়েরা একটু অন্য রকম হয় কেন জানিস..?”
ইরাদ মায়ের মুখপানে চেয়ে থাকলে ইভা নরম গলায় বললো,
” মায়েরা কষ্ট হলেও, চেয়ে হলেও সন্তানের জন্য ভাবে। নিজে না খেয়েও সন্তানের জন্য রাখে তা। বাবারাও তাই করে কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম কারণ, তারা একা হাতে সন্তান সামলাতে হিমশিম খায়। মেয়েদের মতো ধৈর্য খুব কম পুরুষেরই হয়..!”
ইরাদ কিছু একটা ভেবে বেড থেকে নেমে উঠে দাঁড়ালো
তা দেখে ইভাও উঠতে উঠতে বললো,

” এগুলো খেতে থাক আমি মেডিসিন নিয়ে আসি..? আচ্ছা একটা কথা বল, তুই একই শার্ট এত কিনেছিস কেন…? ”
” এটা আমার পছন্দ আম্মু। আমার যেই কালার বেশি পছন্দ সেগুলো আমি একের অধিক করে কিনে থাকি..!”,
ইরাদ হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
” আম্মু আমি এসে খাবার খাবো তুমি রেখে দিও..?”,
বলেই বেরিয়ে গেলো ইভা পিছন থেকে জোরে বলে উঠলো,
” কোথায় যাস এইসময় আবার। মেডিসিন তো খেয়ে যা..? ”
কিন্তু কে শোনে কার কথা ইরাদ দ্রুত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ইভা ছেলের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। রুম থেকে বের হতেই ইমদাদুল এগিয়ে এসে বললো,
” ছেলে এত কোথায় যাচ্ছে খবর রেখেছো তুমি? শোনো ওই মেয়েকে যেনো এ বাড়িতে আর না তুলে তোমার ছেলেকে ভালো করে বুঝিয়ে বলো নয়তো মা কী করবে জানোই তো.?”
ইভা স্বামীর কথা শুনে চুপ করে রইলো। জীবনটা তার ছেলের সে কেনো তার পরিবারের কথা শুনে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করবে। যা হয়েছে হয়েছে এবার সব ঠিক করে ফেলা উচিত হয় তাতে পরিবারে যদি ঝড় উঠে উঠুক। ইভা স্বামীর কথায় উত্তর দিলো না নিচতলায় চলে গেলো।

বিকেল শেষে সন্ধ্যা নামবে বলে কী ? অথচ, একটা ডাক্তারেও দেখা মেলেনি। ফারিশা দুপুর অব্দিও বাড়িতেই জলপট্টি দিয়েছে, মাথায় পানি দিয়েছে, মেডিসিন খাইয়েছে অথচ তার জ্বর কমার নামগন্ধ নেই। জিসানকেও বলতে পারছে না জিসান চাকরির জন্য সিলেটে তার মামার সাথে দেখা করতে গেছে সকালে সাথে তার মাও গেছে। হসপিটালে এসেছে বিকালে কিন্তু নিচের সরকারি কেবিন গুলো সব ভর্তি হওয়ায় তাকে কেবিনের বাইরের ফ্লোরেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। পাশে আরও রোগীও আছে যারা ওর মতোই নিচে বসে আছে। ডাক্তার বলেছিলো কেবিনের রোগী শেষ করে তারপর বাইরের গুলো দেখবে কিন্তু তাদের আর আসার নামে খবর নেই । কিছুক্ষণ আগে একটা নার্স এসে শুধু জ্বর মেপে গেছে। ফারিশা ছেলের এমন জ্বর দেখে কেঁদেই উঠলো আগে কখনো এত জ্বর আসেনি তার। তুবাও কখন থেকে কেবিনে ঘুরপাক খাচ্ছে ডাক্তার যেনো আসে। ওপরতলার সব কেবিন স্পেশাল যা নেওয়ার মতো ক্ষমতা ফারিশার নেই।

” আমাকে দাও ফারিশা..?”
কোনো পুরুষের কন্ঠ পেতেই ফারিশা মুখ তুলে তাকালো দেখলো ইরাদ। সেইসময় মায়ের সাথে গল্প করতে করতে ইরাদ নিজের জ্বরের কথা ভাবতেই ইয়াশের কথা মনে পড়েছিলো কারণ, সেদিন দু’জনে অনেকক্ষণ গোসল করেছিলো। তারপর তাড়াহুড়ো করে ফারিশার বাড়ির সামনে আসতেই দারোয়ান জানায় তারা নেই ইয়াশের জ্বর আসায় হসপিটাল গেছে কিন্তু কোন হসপিটাল তা বলে যায়নি। ইরাদ খুঁজতে খুঁজতে এই হসপিটালে এসেছে। ইরাদকে এখানে দেখে ফারিশা নিচু গলায় বললো,
” এখানে কেনো আপনি..?”
ইরাদ হাটু গেড়ে নিচে ঝুঁকে এসে ফারিশার কোল থেকে ইয়াশ নিতে নিতে বললো,
” তা পড়ে বলা যাবে আগে ইয়াশকে দাও ওর চিকিৎসার দরকার..?”,
বলেই কোলে তুলে নিলো ফারিশা কিছু বললো না ছেলের সুস্থতা তার আগে দরকার। ইরাদের পিছু পিছু ফারিশা আর তুবাও ছুটলো। ওপর তলার কেবিনে গিয়ে একটা কেবিনের সামনে ঢুকতে গেলে নার্স বলে উঠলো,

” ডাক্তার দেখিয়েছেন আগে..?”
ইরাদ লালিত চোখে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললো,
” এই হসপিটালে শিশু চিকিৎসক যে আছে তাকে দ্রুত ডাকুন। আমার ছেলের কিছু হলে আপনাদের কাউকে ছাড়বো না বলে দিলাম…?”,
বলেই কেবিনে ঢুকে পড়লো আর নার্স দ্রুত ডাক্তার ডাকতে গেলো।
কয়কে মিনিট পর ডাক্তার এসে চেক-আপ করে গেলো। ইরাদ এর মাঝে তিহানকে ফোন দিয়েছিলো তার ভাইকে আসার জন্য ,অন্য ডাক্তার দেখাতে তার ভয় হলো যদি ভালো চিকিৎসা না করে কিন্তু তিহান জানাই সেটা তো তার নিজের ভাই না। এক দু:সম্পের্কর বড় ভাই বলা যায় তারওপর সেও নেই ছুটিতে গেছে তাই ইরাদ আর কিছু বললো না।

রাত হতেই ইরাদ নিতেজ হওয়া ছেলেকেই কোলে তুলে বেডের ওপর শুইয়ে আছে সাথে নিজেও। তার বুকের ওপর ছেলের মাথা রাখলো। ইয়াশ বাম হাত টা তার বাবার ডান বুকের ওপর রেখে দিয়েছে। ছেলের গায়ের গরম আঁচ যেনো তার শরীরেও আঁচড়ে পড়ছে। ইরাদ ব্যাথারত চোখে ছেলের বা’হাত টার দিকে তাকালো একবার। কিছুক্ষণ আগেই এক ডাক্তার এসে ক্যানেলা পড়িয়ে গেছে। একটা ক্যানেলা পড়াতে ডাক্তারও ঘেমে যেনো একাকার। ইরাদ কতবার যে ধমকিয়েছে তার ছেলের যেনো ব্যাথা না লাগে তাই । ডাক্তার অধির কষ্টে ক্যানেলা পড়িয়েছে আর বলেছে শরীর দুর্বল হয়ে গেছে জ্বরের জন্য । ইয়াশের নিস্তব্ধতা তার কাছে যেনো বিস্বাদ মনে হচ্ছে । এতক্ষণে সুস্থ থাকলে বোধহয় ” মিলাদ! মিলাদ! ” বলে পাগল হতো তা ভাবতেই ইরাদ কিছুটা চাপা স্বরে হেসে উঠলো। নিজের বা হাতটা ছেলের মাথায় দিয়ে আসতে করে বিলি কেটে দিতে লাগলো। ইয়াশ জ্বরের তোপে চোখ দুটো বন্ধ করে রেখেছে , একদমই হুশ নেই তার। ছেলেকে দেখে আজ বড্ড মায়া লাগলো তার। কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট জোড়া ছুঁইয়ে দিলো ইরাদ। তার ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে আনমনে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলো,

~” বুকের কোথায়, তোকে রাখি বলনা
মায়াপাখিটা আমার শুধু বলনা..!”
ছেলের ক্যানেলা দেওয়া হাতের তালুর পাশেই আস্তে ধীরে নিজের আঙ্গুল বুলিয়ে দিলো। ছেলের ব্যাথা লেগেছে ঠিক কতটা ভাবতেই তার গলা শুকিয়ে গেলো। বুকের মাঝে আরেকটু শক্ত করে ছেলের মাথা চেপে ধরলো।
” আগলে রাখবো ঠিক যত্ন করে..
আগলে রাখবো ঠিক যত্ন করে
ফুলের টোকাও লাগতে দেবো না..!”
বাড়িতে কেউ নেই জন্য তুবাকে পাঠিয়ে দিয়েছে আর বলেছে রাতের জন্য যেনো খাবার নিয়ে আসে। তাকে বিদায় দিয়ে ছেলের কেবিনের সামনে দাঁড় হলো ফারিশা, দরজার পাশ থেকে উঁকি মেরে দু’জনকে দেখলো এক নজর । টলমল চোখে চেয়ে রইলো শুধু। দূর হতে জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে যেনো বাবা-ছেলের গায়ে। ফারিশার গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। ভেতরে যাবে কি না ভেবে পেলো না। ছেলের জন্য তবুও ভেতরে ধীরে পায়ে এগিয়ে গেলো। ভেতরে পা রাখতেই কানে ভেসে এলো এক মিষ্টি আওয়াজ।
” বুকের কোথায়, তোকে রাখি বলনা
মায়াপাখিটাই আমার বল.., বলনা..!”~
ফারিশা এগিয়ে আসতেই ইরাদ চোখ মিলে তাকালো তার দিকে। ফারিশা ইরাদের তাকানো দেখে বললো,

” আপনি জানলেন কী করে আমরা এখানে…?”
” খুঁজেছি তো অনেক জায়গায় পরে ভাবলাম বাড়ির পিছন দিকটাই তো একটা হসপিটাল আছে তাই এখানেই এসেছি খুঁজতে। ভাগ্যিস পেয়েছি ছেলের এই হাল হবে দেখতেই বুক ফাটছে আমার। ”
ফারিশা ধীর গলায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইয়াশের গলা পেলো।
” আম্মু মাতা ব্যাতা কলছে..?”,
ভাঙা গলায় বলেই যেনো ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। তা দেখে ইরাদ ইয়াশের কপাল টিপে দিতে দিতে শান্ত গলায় বললো,

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১০

” এই তো বাবা কপালে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে এখুনি ঠিক যাবে..?”
ইরাদের চোখ লাল দেখে ফারিশা নিজের অজান্তেই ইরাদের কপালে হাত রাখলো আর বুঝতে পারলো তারও জ্বর। ইরাদ মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই ফারিশা কপাল থেকে হাত সরিয়ে পিছন ঘুরে বাইরে যেতে যেতে বললো,
” নিজে অসুস্থ শরীরে কী করে আছেন ডাক্তার ডাকছি আমি..?”
ফারিশা বলেই চলে গেলো ইরাদ আর ডাকলো না ফারিশাকে। তারও জ্বর রাত দেখে খুব বেড়েছে তার ওপর খাওয়া হয়নি আজ সকাল থেকে ভালো করে। চুপটি করে ছেলের মাথা টিপে দিতে লাগলো।

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১২