তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১
রিমঝিম বৃষ্টি
৫ বছর পর দেশে ফিরে একটা ক্যাফের ভেতরে যেতেই ওয়েটার হিসেবে নিজের বউকে দেখে চমকালো নেভির ক্যাপ্টেন ইরাদ যাকে সে ৫ বছর আগে ফেলা চলে গেছিলো দেশের বাইরে।
৫ বছর আগে নেভির অফিসার হিসেবে দেশ ছেড়েছিলো ইশতিয়াক চৌধুরী ইরাদ। আজ এত বছর পর লম্বা ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরছে।
সকাল ৮ টা। ঢাকা এয়ারপোর্টে। ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হতেই গেটের বাইরে ছিলো নেভির সাদা বাস। যেখানে বড় বড় করে লেখা ” Bangladesh Navy”।
” ক্যাপ্টেন, একে না আনলেই নয়। এনিমি একটা সবসময় যত্ন পায় এ, আর এর জন্য আপনি আপনাদের সময় দেন না…?”,
বলেই লেভটেন্যান্ট তিহান ঠোঁট উল্টে ইরাদের দিকে তাকালো। ট্রেনিং এর শুরুর থেকেই তিহানের সাথে ইরাদের পরিচয় হয় তারপর বন্ডিং তৈরী হয় বেশ ভালো। ইরাদ মুখটা তখনো গম্ভীর করে রেখেছে। সামনে পা বাড়িয়ে হাটতে হাটতে বললো,
” ইটস্ মাই ফ্রেন্ডস্ তিহান..! তোমাদের আগে একে দেখে রাখা উচিত কারণ, এটা অনেক ছোট..!”
বলেই ইরাদ বা হাতে থাকা ছোট্ট গোল একুরিয়ামটা উঁচুতে তুলতেই চোখে পড়লো এক গোলাপের পাপড়ির মতো ছড়ানো মাছ নাম ব্লু রোজটেইল। সুন্দর করে বুট বুট তুলছে পানির ভেতরে, লেজ টা একদম গোলাপের মতো ছড়ানো । থাইল্যান্ডে ট্রেনিং চলাকালীন এই মাছ টি সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করেছিলো, দেখতে যেমনি সুন্দর তেমনি আকর্ষণীয়। ট্রেনিং এর ফাঁকে সময় পেলেই মাছটার যত্ন নেয় সাথে।
ইরাদের পরনে ফরমাল ড্রেসআপ আজ, একটা ব্ল্যাক শার্ট আর ব্ল্যাক প্যান্ট, ৬ ফুট লম্বা গঠনের সুঠাম দেহের এক পুরুষ, ফর্সা গঠনের ওপর তার সরু নাক , চওড়া কপাল, মাথায় কালো চুল, চুলগুলো একদম প্রফেশনালের ধারা বজায় রেখে কাটছাঁট করে ছোট ছোট রাখা হয়েছে যে কেউ দেখলেই বুঝে যাবে কোন চাকরিজীবী যুবক সে, এক কাঁধে ব্যাগ রেখে হাতে ছোট্ট একুরিয়াম আর অন্য হাতে লাগেজ টানতে টানতে বাসে উঠলো তার দেখাদেখি তার সাথে আসা ১২-১৩ জন অফিসার একে একে তারাও বাসে উঠলো সবাই । তারাও ইরাদের মতো কেউ ৪ বছর তো কেউ ৩ বছর ডিউটি, ট্রেনিং, ইউএন (UN) মিশন শেষ করার জন্য দেশ ছেড়েছিলো। সবার চোখে-মুখে যেনো উপচে পড়ছে ছুটির অনাবিল আনন্দ। এতবছর দেশের বাইরে থেকেছে আজ যেনো নিজের দেশে পা রেখে এক প্রশান্তির ছোঁয়া পাচ্ছে।
বাসে নিজের সিটে হেলান দিয়ে বসে ইরাদ ফোন অন করতেই দেখতে পেলো তার বাড়ি থেকে কয়েকবার ফোন দিয়েছিলো। ইরাদ তা দেখে শুধু মৃদু হেসে উঠলো মাকে সারপ্রাইজ দিবে বলে বাড়ির কাউকেই জানানো হয়নি যে, আজ ফিরছে সে।
ড্রাইভার স্যালুট দিয়ে এগিয়ে এসে বললো,
” ক্যাপ্টেন কোথায় যাবেন..?”
ইরাদ সবার উদ্দেশ্যে এক নজর তাকিয়ে বললো,
” আগে একটা রেস্টুরেন্টে বা কোনো ক্যাফেতে নিয়ে চলো সকাল সকাল কফি না খেলে জমবে না…?”
ইরাদের কথায় ড্রাইভার তার নিজের সিটে চলে গেলো। বাস ছুটলো আপন গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে থামলো ঢাকা উত্তরার একটা ছোট্ট মাঝারি ক্যাফের সামনে। টেকআউটের সামনে, জায়গাটা ছোট তবে যেটা বড় না হলেও অনায়াসে ৩০-৪০ জন বসতে পারবে। ইরাদ বাস থেকে নামতেই একে একে সবাই নেমে এলো। পাশ থেকে লেভটেন্যান্ট তিহান বলে উঠলো,
” ক্যাপ্টেন এইটা তো জাস্ট ক্যাফে মনে হচ্ছে..! ”
” ইটস্ ওকে আমরা জাস্ট কফি খাবো তারপর সোজা বাড়ি..!”,
বলেই ভেতরে চলে গেলো সাথে সবাই। সবার পরনেই ফরমাল ড্রেসআপ। ভেতরে গিয়ে বসতেই সেখানকার মালিক বিনয়ী মুখে এগিয়ে আসলো। এই ছোট্ট ক্যাফের মালিক এক তরুণ, বয়স ২৪ এর কাছাকাছি হবে, বাবার টাকায় একটা ক্যাফে খুলেছে বেশ বছর খানেক হলো, মাস গেলে বেশ টাকা ইনকাম হয় জন্য সাথে আরও দুটো মেয়ে আর একটা ছেলে রেখেছে তবে অন্যজন নয় তারা তার নিজেরই বন্ধু। জিসান এগিয়ে গিয়ে ইরাদের টেবিলে দাঁড় হয়ে বিনীত সুরে বললো,
” স্যার আপনাদের কী লাগবে বলুন..?”
পাশ থেকে ইরাদ এক নজর ছেলেটাকে দেখলো। ছিপছিপে গঠনের শ্যামবর্ণের একটা ছেলে দেখতেও বেশ পরিপাটি । ইরাদের সামনে মেনু কার্ড টা ধরতেই ইরাদ হাত উচিয়ে না করে সূক্ষ্ম গলায় বললো,
” আমাদের জন্য জাস্ট কফির ব্যবস্থা করুন..?”
” ওকে স্যার..!”,
বলেই জিসান দ্রুত ক্যাফের কিচেনে চলে গেলো। ভেতর গিয়ে তাড়া গলায় হাঁক ছাড়লো,
” ফারিশা জলদি ৩০ কাফ কফি বানা, আর তুবা তুই কফির কাপগুলো রেডি কর..!”,
কিচেনের ভেতরে তখন বসে ছিলো ২৩ বছরের এক তরুণী – ফারিশা তাবাসসুম। কোলে তার ৪ বছর ৩ মাসের বাচ্চা ছেলে বসে ছিলো, তার পরনে একটা পুরনো সাদা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট, তবে দেখতে যেনো একদম রাজপুত্রের মতো সুন্দর আর অপর সাইডে বসে ছিলো তুবা যে ফারিশার সমবয়সী আর তার পাশে বসে আছে জাহিদ সে আর জিসান একই বয়সীর। সকাল সকাল সাধারণত কোনো কাস্টমার আসে না তাই তারা আড্ডা জমিয়েছিলো প্রতিদিনের মতোই কিন্তু এই প্রথম এত সকালে কাস্টমার এলো তার ওপর আবার ৩০ জন। দ্রুত ব্যস্ত হয়ে ফারিশা উঠে দাঁড়ালো। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে কোমর অব্দি চুলগুলো হাত দিয়ে পেচিয়ে খোঁপা করে নিলো, তারপর ছেলেকে সামনে বসে থাকা জাহিদের দিকে ধরে বললো,
” জাহিদ তুই ওকে নে তো একটু, ছেড়ে দিস না কিন্তু নয়তো অকাম করবে..! “,
জাহিদ মুচকি হেসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো। জাহিদের কোলে উঠেই ছোট্ট ইয়াশ আধো আধো সুরে বলে উঠলো,
” মা কাত ( কাজ) কলবে ( করবে)..?”,
বলেই ফোকলা দাঁতে হা করে তাকিয়ে রইলো জাহিদের মুখ পানে। জাহিদ ইয়াশের তাকানো দেখে হেসে উঠলো আর বললো,
” জি স্যার, আপনার মা কাজ করবে। আপনি একটু লক্ষ্মী ছেলের মতো চুপটি করে থাকেন তো। চলুন দেখে
আসি বাইরে কারা এলো..?”
জাহিদ ইয়াশকে নিয়ে ক্যাফের মূল অংশে আসতেই দেখল, পাঁচ-ছয়টা টেবিল জুড়ে এক ঝাঁক তরুণ বসে আছে। সবার চুলের ছাঁট, চেহারা গঠন দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো চাকরীজীবী তরুণ হয়তো তারা। ঘাড় বাকাতেই কাচের দেওয়াল ভেদ করে বাইরে তাদের নেভির চেনা বাসটা দেখতেই বুঝতে পারলো এরা সব নেভির লোক।
ইরাদ আর তিহান যখন নিজেদের গল্পে মজে উঠলো হঠাৎই তিহানের চোখ গেলো কিছুটা দূরে দাঁড়ালো জাহিদ আর তার কোলে থাকা বাচ্চাটার ওপরে। ফর্সা গঠনের সুন্দর বাচ্চা দেখে তিহান প্রফুল্ল সুরে বললো,
” বাচ্চাটা কি সুন্দর দেখুন ক্যাপ্টেন..?”
তিহানের কথা শুনে ইরাদ ও সেদিকে তাকালো। তাকানো মাত্রই তার দৃষ্টি যেনো ক্ষণিকের জন্য স্থির হলো, বুকের মধ্যে কেমন যেনো হঠাৎ চড়ক দিয়ে উঠলো। ফর্সা গোলগাল একটা বাচ্চা, যার চুলের স্টাইল, চোখের চাহনি, হুবহু যেনো নিজের মতো মনে হচ্ছে। এর মাঝেই ইরাদের ব্যাঘাত ঘটলো তিহানের কথায়। ব্যাঘাত ঘটতেই ইরাদ হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো এমন ভাবনার জন্য।
তিহান হাত তুলে জাহিদকে ডেকে বললো,
” এই যে ভাইয়া একটু এদিকে আসবেন..? ”
অচেনা এক ছেলের ডাকে জিহাদ এগিয়ে আসতেই তিহান বাচ্চাটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
” ওকে কি একটু কোলে নিতে পারি? এটা কি আপনার ছেলে..? ”
জাহিদ ইয়াশকে তিহানের কোলে দিয়ে হেসে বললো,
” না স্যার, এটা আমার বান্ধবীর ছেলে..!”
তিহানের কোলে গিয়ে ইয়াশ বড় বড় চোখ করে ওর মুখের দিকে তাকালো। তারপর আদো আদো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
” তুমি তে ( কে)..? ”
পাশ থেকে ইরাদ কৌতুহল সামলাতে না পেরে বাচ্চাটার গাল টিপে নরম গলায় বললো,
” তোমার নাম কি বাবু..?”
ইয়াশ এবার ইরাদের দিকে তাকালো। ছোট ছোট চোখ খানা অজান্তেই য়েনো চিকচিক করে উঠলো, প্রশস্ত হলো তার ছোট্ট ঠোঁট জোড়া। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছেলেটা তাকিয়ে থেকে হুট করেই হাত বাড়ালো ইরাদের কোলে উঠার জন্য। তা দেখে তিহান ফিক করে হেসে বললো,
” ক্যাপ্টেন, ও তো আপনাকেই পছন্দ করে ফেলেছে। নিন, এবার একটু কোলে তুলুন..? ”
ইরাদ ইয়াশকে কোলে নিতেই ইয়াশ খুশিতে হাত তালি দিয়ে বলে উঠলো,
” তুমি তুব ( খুব) বালো ( ভালো)..!”
বাচ্চাটার কথা শুনে ইরাদের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। বাচ্চাটার থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করলো,
” নাম কি তোমার..?”
” ইয়াত…!”
ইরাদ কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই জাহিদ পাশ থেকে হেসে বলে উঠলো,
” আরে ও আসলে ইয়াশ বলেছে। খালি তোতলায় তো তাই এমন শোনাচ্ছে…! ”
ইরাদ ইয়াশের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” বাচ্চা মানুষ বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। বয়স কত ওর.?”
” এই তো প্রায় সাড়ে ৪ বছর হবে হয়তো..!”
এতক্ষণে তিহান গভীর মনযোগ নিয়ে ইরাদ আর ইয়াশ কে দেখছিলো। দু’জনের কথার মাঝেই ইরাদ কে বলে উঠলো তিহান,
” ক্যাপ্টেন, একটা জিনিস খেয়াল করেছেন। বাচ্চাটার মুখের আদল আর চোখের গঠন কিন্তু হুবহু আপনার মতো দেখতে..!”
ইরাদ এবার সরু চোখ করে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালো। ঠিক তখনি জিসান আর ফারিশা দু’জন দু’টো বড় বড় ট্রেতে করে কফি নিয়ে হাজির হলো। ফারিশা সোজা ইরাদের টেবিলের ওপর ট্রে টা রাখলো। তারপর একে একে সবাইকে দিতে শুরু করলো কফির কাপ। কফির কাপ টা ইরাদের সামনে ধরতেই আচমকা ইরাদের মুখ দেখে সাথে সাথে হাত দু’টো থেমে গেলো। হাসি মুখ মুর্হুতেই ভয়ে পরিণত হলো, ফারিশা যেনো ভয়ের তোপে জমে গেলো । ইরাদও কফির কাপ টা নিতে গিয়ে থমকালো। সামনে থাকা মেয়েটাকে দেখে যেনো ভেতরের সমস্ত অতীত এসে হানা দিলো এক নিমিষেই। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর নিজের স্ত্রী কে এভাবে ক্যাফেতে ওয়েটারের পোশাকে দেখবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবে নি। তার ওপর আবার ঢাকা শহরে। যে মেয়ে একদিন বেকারত্বের অজুহাতে তাকে আবলীলায় ছুঁড়ে ফেলেছিলো, সে আজ এখানে..?
তাকে দেখে ইরাদের চোখ-মুখ মুর্হুতের মাঝেই শক্ত হয়ে উঠলো রাগে আর ক্ষোভে। অন্যদিকে ইরাদের কোলে নিজের ছেলেকে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে। ফারিশা আর এক মুর্হুত দেরি না করে ট্রে টা টেবিলের ওপর রেখে, প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে ইয়াশ কে তার কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে হনহনিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেলো।
টেবিলে বসা বাকি সব জুনিয়র অফিসাররা সহ জিহাদ এই অদ্ভুত কান্ড দেখে হাঁ হয়ে রইল। কেউ কিছু বুঝতে পারলো না। কিন্তু ইরাদ ততক্ষণে রাগে নাকের পাতা ফুলিয়ে কফির কাপ একটু শক্ত করে চেপে ধরে টেবিলে রাখলো কিছুটা শব্দ করে। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা কিচেনের দিকে পা বাড়ালো। পিছন থেকে জাহিদ আর তিহান কিছু বললেও কানে করলো না।
ফারিশা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কিচেনের এক কোণায় দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, ভয়ে যেনো তার শরীর কাঁপছিলো। ছেলেকে বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক রাশভারী, গম্ভীর আর চেনা কন্ঠস্বর,
” তুমি এখানে কেন? আর তোমার কোলে ওটা কে ফারিশা..?”
