তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ৩
রিমঝিম বৃষ্টি
ইরাদ রাগে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে মায়ের থেকে সরে এলো তারপর সোফায় গিয়ে বসে পড়লো। সামনে থাকা ইমদাদুল ছেলের এমন মুখ খানা দেখে এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালো আর বললো,
” বাবাকে দেখছি ভুলেই গেছো পাশে যে রয়েছে তা চোখে দেখোনি…?”
ইরাদ সোফায় মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে উঠলো,
” চোখে তো দেখেছি! আর কী করবো টেস্ট করেও দেখবো নাকি সেটা মাকে বলো আমায় না..?”
ছেলের এমন লাগামহীন কথা শুনে ইমদাদুল মুখ কুঁচকে ফেললো পাশ ঘুরে স্ত্রীর পানে তাকাতেই ইভা ইশারায় চুপ করতে বললো। আয়েশা শিউলির দিকে তাকিয়ে বললো,
” কী রে দামড়ি তুই কী খাড়াইয়া খাড়াইয়া দেখবি যা ওর জন্য ঠান্ডা কিছু নিয়ে আয়…?”
শিউলি এক নজর ইরাদের দিকে তাকাতেই ইরাদের তীক্ষ্ণ নজর চোখে পড়লো। শিউলির বয়স হবে ২১ বছর। আগে তার মা এ বাড়িতে কাজ করতো। তারপর সে মারার যাওয়ার পর থেকেই তার মেয়ে এই বাড়িতে থাকে আর কাজ করে, তার কেউ নেই জন্য ইমদাদুল এ বাড়িতেই থাকতে দিয়েছে, এমনকি তার পড়ার মেধা ভালো জন্য কাজের পাশাপাশি পড়াশোনার জন্যও খরচ দেয়। শিউলি ওড়না খানা আঙুলে পেচাইতে পেচাইতে ইভার দিকে তাকিয়ে বললো,
” বড় ম্যাডাম ওইডা আপনার পোলা। আমি তো চোর ভাবছিলাম..?”
ইরাদের কানে যেতেই যেনো সে সজাগ হলো। সোজা মাথা তুলে বসলো তারপর পায়ের জুতো টা এক ঝটকায় খুলে ফেললো। দূর হতে হুট করেই ছুঁড়ে মারলো শিউলির গায়ে। তড়িৎ বেগে জুতো আসতে দেখে শিউলি ছিটকে সরে যায়। ইরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
” আমারে তোর চোর মনে হলো। কাকের মতো তোকে যদি আর চিল্লাইতে দেখছি না তোর গলা ছিঁড়ে আমি কষাইয়ের কাছে দিয়ে আসবো..?”
ইরাদের এমন আচরণে বাড়ির সবাই ভেবলার মতো তাকিয়ে রইলো। এদিকে শিউলির ভয়ে ভুলবশত ফের চিৎকার দিয়ে বসলো,
” আল্লাহ গো এ তো দেহি দানবের মতো…?”,
বলেই এক প্রকার দৌড়ে দ্রুত কিচেনে চলে গেলো। তার যাওয়া দেখে আয়েশা কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ইরাদের পাশে বসে বললো,
” তুই ওরে ধমকালি কে? তুই জানিস ওর গলায় কী জোর? একদিন রাইতের বেলায় চোরও ধরছিলো ও..! ওকে রাইখা ভালোই হয়ছে আমাদের! ”
” আমার বউকে চায় দীদা…! ”
ইরাদের এই একটা কথায় যেনো পুরো বাড়ির সবার মুখের হাসি কেড়ে নিলো। গত পাঁচ বছর আগে যাকে ত্যাগ করে এসেছে তার কোনো অস্তিত্ব এরপর এ বাড়িতেই ছুয়াইনি কেউ। হুট করে বউকে চায় বলাতে সবাই কিছু টা অবাক হলো। আয়েশা পাশ থেকে মুখ বাকিয়ে বলে উঠলো,
” কীসের বউ ভুলে গেছিস তোকে ও ডির্ভোস পেপার দিয়েছে পাঠিয়ে সই সময়ই , তোদের আর কোনো সম্পর্ক নেই..? সেদিন যে তোরে শশুর বাড়িতে অপমান করলো তা ভুলে গেলি, ওই মেয়ের কথা তুললি কোন মুখ নিয়া তুই..?”
ইরাদ শীতল চাহনি নিক্ষেপ করলো আয়েশার দিকে। সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” আমি কিন্তু সাইন করিনি দীদা তাই আমি চাইলেই আমার বউকে পেতে পারি..!”
” ইমদাদুল দেখ তো তোর পোলার পাগলের মতো কথাবার্তা কয় কেন? নি”র্ল”জ্জ না হলে কেউ ওই বউকে চায় আবার। ”
ইমদাদুল এগিয়ে আসতে গেলে তারেক ইমদাদুল এর কাঁধ ধরে থামিয়ে দিয়ে সে এগিয়ে এসে ইরাদের পাশে বসে বললো,
” ইয়াংম্যান কী খবর? ট্রেনিং প্লাস বিদেশী ভ্রমণ কেমন কাটলো সময় তোমার..?”
” জাস্ট ওয়াও চাচ্চু! সিরিয়াসলি সমুদ্রের মাঝে দিন পার করেছি একদম ফ্রেশ ছিলাম..! তবে দেশে এসে মাইন্ড ফ্রেশ এর বদলে আরও বিগড়ে গিয়েছে বরং! ”
তারেক এক নজর ভাইয়ের দিকে নরম গলায় বললো,
” কেনো কিছু হয়েছে? হঠাৎ এমন লাগার কারণ..? ”
ইরাদ এক নজর তারেকের দিকে তাকিয়ে একুরিয়াম টা হাতে নিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আম্মু আমার রুম পরিষ্কার করা আছে কি..?”
ইভা এগিয়ে এসে বললো,
” তুই বলেছিস যে আসবি তাহলে পরিষ্কার করে রাখতাম। তোর রুম অবশ্য পরিষ্কারই শুধু ঝাড়ু দিতে হবে সব ঢাকা আছে তো। তুই এক কাজ কর আপাতত গেস্ট রুমে গিয়ে ফ্রেশ হো ততক্ষণে হয়ে যাবে তোর রুম পরিষ্কার..? ”
মায়ের কথায় সোজা ওপরের রুমের যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওঠার জন্য পা বাড়াতেই আয়েশার কথায় থেমে গেলো।
” শোনো দাদু ভাই এসেছো যখন বিকেলে একটু কাবিশাকে আসতে বলি, ও তোমাকে দেখার জন্য এমনিতেই পাগল। তোমার আসার খবর পেলে ভীষণ খুশি হবে ও..?”
” হু ইজ্ সি, দীদা ? যাকে তাকে ডাকবে কেনো দীদা? তোমার কি মনে হয় আমি কোনো শপের প্রোডাক্টস্..! সবেমাত্র এসেছি রাগীও না প্লিজ..?”,
বলেই গটগট পায়ে ওপরে চলে গেলো। ইরাদ যেতেই আয়েশা ইমদাদুল কে কটমটিয়ে বলে উঠলো,
” তোর ছেলের ঝিটকানো এখনো গেলো না? আসলে ভালো চাইতে নেই কারোর? “,
বলেই নিজের রুমে চলে গেলো। ইমদাদুল আর কিছু বললো না তারেক জোর করে তাকে নিয়ে বাজারে চলে গেলো বাজার করতে, এত বছর বাদে ছেলে এসেছে ভালো-মন্দ রান্না করা উচিত। তারা চলে যেতেই ইভা ছেলের লাগেজ নিয়ে ছুটলো ওপর ঘরের দিকে তাকে সাহায্য করার জন্য সুমানাও এগিয়ে গেলো। সুমানা আর ইভার মাঝে কোনো মনমালিন্য নেই। বেশির ভাগ যৌথ পরিবারে যেমন এক জা এর সাথে আরেক জা এর সবর্দা এই-সেই লেগেই থাকে কিন্তু তাদের দু’জনের মাঝে
সামান্য হিংসা অব্দিও নেই। তারা ওপরে যেতেই সাবাহ্ এগিয়ে এসে ইভানের পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলে উঠলো,
” ইভান ভাই ইরাদ ভাই এমন চটে আছে কেনো? আমাদের সাথে কথাও বললো না আজ..?”,
বলেই হাতে থাকা আপেলের ওপর কচ্ করে কামড় বসালো। ইভান আড়ঁচোখে তা দেখে এক ঝটকায় আপেল টা কেড়ে নিয়ে বললো,
” তোর মাথার ব্রেন নষ্ট গাড়ির মতো ঠিক করলে দু’দিন পর যা তাই হয়ে যাবে। ওই মাথা নিয়ে আমার ভাইয়ের মন বোঝা তো দূরের কথা, এক টুকরো থু ফেললে তাও খুঁজে পাবার ব্রেন নেই তাই হুদাই খাটাশ না…? “,
বলেই আপেল খেতে লাগলে সাবাহ্ রগে কোমরে দু’হাত রেখে কিছু উঁচু গলায় বললো,
” ইভান ভাই তুমি আমারে খাটাশ বললা..?”
ইভান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললো,
” ধুর বেডী কালা নাকি তুই? বললাম খাটাশ না এর মানে ভাবিস না বলেছি..!”
সাবাহ্ চোখ পিটপিট করতে লাগলো এবার তা দেখে তমা এগিয়ে এসে সাবাহ্ পিঠে এক চাপড় মেরে বললো,
” ফালতু পেঁচাল না পেরে যা পড়তে বস গিয়ে..? ”
” যাচ্ছি বাবা রে পরীক্ষার জ্বালায় বাঁচি না..?”,
বলেই নিজের রুমে চলে গেলো। তার যাওয়ার পানে এক নজর তাকালো ইভান তারপর ওপরে নিজের রুমে চলে গেলো সাথে তমাও তার রুমে চলে গেলো।
উত্তরা ১১ তে গলির মাথায় একটা তিনতলা বড় ইউনিট করার বাড়ি। সে বাড়িতে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন পরিবার সহ ভাড়া থাকে। দোতলার একটা ফ্ল্যাট নিয়েই ফারিশা গত চার বছরের মতো হলো থাকে তুবার সাথে। ফ্ল্যাট টা তেমন বড় না বললেই চলে। ভেতরে দুটো রুম, একটা কিচেন, একটা ওয়াশরুম আর একটা ছোট-খাটো বসার রুম এইটুকুর জন্য তাদের ভাড়া দিতে হয় প্রতিমাসে ৫০০০ টাকা। ফারিশার তা একার পক্ষে দেওয়া সম্ভবও নয় তাই তুবাকে বলায় সেও থাকতে রাজি হয়। তুবার পরিবার থাকে চট্টগ্রামে। পড়াশোনার জন্য ঢাকা শহরে তার থাকা। তারও ভাড়া বাড়ুর প্রয়োজন ছিলো। ফারিশা ইয়াশকে নিয়ে রুমে ঢুকেই ব্যাগ টা পাশে রেখে ইয়াশকে বিছানায় দাঁড় করিয়ে বললো,
” চলো গোসল করিয়ে দেয় তোমায় তারপর রান্না করবো..?”
ইয়াশ এর পরনের গেঞ্জি খুলতে গেলে ইয়াশ মায়ের গলা জড়িয়ে বললো,
” বৃষ্টি মাম দিয়ে কলবো কিন্তু..? ”
ফারিশা হেসে বললো,
” আচ্ছা চলো! ”
বলেই ওয়াশরুমে নিয়ে গেলো। হেড শাওয়ার ছেড়ে দিতেই ইয়াশের খুশি দেখে কে। লাফিয়ে লাফিয়ে ভিজতে লাগলো তো কখনো আবার সেই পানি চেটে খেতে লাগলো তা দেখে ফারিশা কিছু টা বকা দিয়েই উঠলো,
” ছি: বাবা এই পানি খেতে হয় না..! ”
তার বদলে ইয়াশ এক গাল হেসেই উড়িয়ে দিলো। গোসল শেষ করতেই ইয়াশ কে রুমে বসিয়ে সামনে খেলনা দিয়ে বললো,
” তুমি এখানে বসে খেলো হে, আমি গোসল করে আসি..?”
ইয়াশ মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বললে ফারিশা গোসলে চলে যায়। প্রায় বিশ মিনিট এর মাথায় বের হয়ে আসলো পরনে তার কালো সুতার থ্রিপিস। থ্রিপিস টা পুরোনো হলেও পরিপাটি বেশ। ফারিশা রুমে যেতেই দেখে ইয়াশ চুপটি করে গাড়ি নিয়ে খেলছে তা দেখে মুচকি হেসে উঠলো। কলিং বেল বাজতেই ফারিশা ঘড়ির দিকে তাকালো এই সময় তো তুবা আসবে না তার তো ভার্সিটি যাওয়ার কথা। ফারিশা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই সামনে দেখলো এক অচেনা মেয়ে। মেয়েটার পরনের ড্রেসআপ দেখেই বোঝা যায় বড়লোক হবে সে।
” কে আপনি..?”
” দরজার ওপাশে থাকা মেয়েটা কিছুটা শান্ত গলায় বললো,
” সরি আসতে হলো একটু। শুনলাম তোমার নাকি সাড়ে ৪ বছরের মতো বয়সের একটা ছেলে আছে..? ”
ফারিশা নিচু গলায় বললো,
” জি আছে। কিন্তু কেনো আপু কি হয়েছে..?”
মেয়েটা ভ্রু নাচিয়ে কিছুটা খোঁচা মেরেই বললো,
” শুনলাম ওর বাবা নেই কীভাবে চলে তোমার সংসার?”
ফারিশার বুকে বিঁধলো যেনো কথাটা। এমন ভাবে অচেনা মেয়ের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়লো। ফারিশা প্রসঙ্গ বদলাতে বলে উঠলো,
” আপনি কী এ বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া..? ”
” জি আমারও ওই বয়সীই ছেলে আছে বুঝলে তো? ওর বাবা আবার দু’দিন পর পরই কত যে গেঞ্জি, প্যান্ট, জুতো, খেলনা কিনে তার ঠিক নেই। তাই ও একটা ছেড়ে আরেকটা পড়ে বাকিগুলো ফেলে দিতে হয়..?”
ফারিশার মুখটা ছোট হয়ে গেলো। ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
” ওহ! আপনি ভেতরে এসে কথা বলুন..?”
মেয়েটা এক নজর ঘরের ভেতরে উঁকি মেরে দেখলো তারপর সরে এসে ব্যাগ থেকে কয়েকটা পুরোনো গেঞ্জি আর প্যান্ট বের করে সামনে ধরে বললো,
” না থাক! নিচে ফেলে দিতেই গেছিলাম তো নিচের ফ্ল্যাটের মালিক বললো আপনাদের নাকি সেই কষ্ট। বাচ্চার জামা-কাপড় কিনতে পারেন না এগুলো রাখুন..?”
ফারিশা এক নজর গেঞ্জিটার দিকে তাকালো। বেশ চকচকে করছে নতুন মনে হচ্ছে একদম। এর আগেও একজন ভাড়াটিয়া এমন করে দিতে এসেছিলো তখন তুবা বেশ বকেছিলো ফারিশাকে আর বলেছিলো যেটুকুই হোক কম দামী হলেও নিজের টাকায় ছেলেকে জামা-কাপড় দিবি কিন্তু অন্যের জিনিস নিবি না। সেই থেকে ফারিশা কারোর টা নেয় না । সবসময় কম দামে হলেও ফুটপাত থেকে কিনে শুধু ঈদে একটু ভালো দেখে কিনে দেয়। কিন্তু সব মায়েরাই তো চায় তার ছেলে দামি দামি পোশাক পড়ুক। সামনে থাকা গেঞ্জি টার দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও বাড়ালো না নিজের ওড়না শক্ত করে চেপে ধরে স্বাভাবিক গলায় বললো,
” শুনুন আপু কিছু মনে করবেন না, দিতে এসেছেন এর জন্য ধন্যবাদ তবে তার মা আছে। আমি যথেষ্ট টাকা ইনকাম করি। আমার ছেলেকে কম দামি হলেও পোশাক কিনে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, আপনি এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যান..!”
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২
মেয়েটা যেনো কিছুটা অপমানবোধ হলো। মুখ ভেঙচিয়ে পিছন ঘুরে যেতে যেতে বললো,
” আসলে লোকে ঠিকই বলে এসব গরীর লোকেরাই বড়লোকীদের মতো ফুটানি করে বেড়ায়? আশায় ভুল হয়েছে এখানে..?”,
আরও কত কী বলতে বলতে চলে গেলো সে তার ঠিক নেই । ফারিশা তা আর কানে করলো না দরজা আটকে দু’ফোটা জল ফেললো শুধু ।
