তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ৯
রিমঝিম বৃষ্টি
ইরাদ ভিজে একদম একাকার। ফারিশা স্থির হয়ে রইলো ইরাদকে দেখে সে ভেবেছিলো হয়তো ইরাদ হাল ছেড়েছে কিন্তু এভাবে ইরাদকে আজ দেখে বেশ অবাক হলো। পাশ থেকে ইয়াশ ইরাদকে ভিজতে দেখে মায়ের থ্রিপিসের কোণা টেনে ধরে হাসছে তাতেই ফারিশার ঘোর কাটলো। হাতে থাকা পাইপ টা চট করে নিচে ফেলে দিলো। ইরাদ যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। মুখে হাত দিয়ে পানি ঝাপটে চোখ মিলে তাকালো। চুল থেকে পানি পড়ছে অনবরত, ফর্সা মুখ খানা যেনো জ্বলজ্বল করছে। শীতল চাহনি নিক্ষেপ করলো ফারিশার দিকে। ফারিশা ইরাদের চাহনি দেখে কিছুটা ভড়কালো। নিজেও ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে আছে হুট করেই এক হাঁচি দিয়ে উঠলো দু’হাত দিয়ে নাক ঢেকে। পাশ থেকে ইয়াশ বলে উঠলো,
” আম্মু চলো জিতানের কাচে ( কাছে) যাবে না..?”
ফারিশা ইরাদের দিকে তাকিয়ে ইয়াশকে চট করে কোলে তুলে ইরাদকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু তার আগেই ফারিশার হাতে কোনো শক্ত হাতের টান পড়লো। ইরাদ ফারিশাকে পালাতে দেখে খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলে। ফারিশা বাঁকা হয়ে ঘুরে আস্তে করে বললো,
” হাত ছাড়ুন আমার..?”
” আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে পালাচ্ছো তুমি? আমি ভেজা গায়ে বাড়িও ফিরতে পারবো কি করবো বলো..?”
ইরাদের কথায় তার দিকে এক নজর পরখ্ করে ফারিশা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
” আমার সাথে আসুন..?”,
বলেই সামনে হাটা ধরলে ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে তার পিছু পিছু হাটতে লাগলো। নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সাথে ইরাদও। ইরাদ রুমগুলো এক নজর দেখলো ভেতরে তেমন ফার্নিচারও নেই বলা যায়।
ইরাদ কে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে ওয়াশরুম দেখালো আর বললো,
” যান গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন..?”
” পড়বো টা কি..?”
ফারিশা এবার চিন্তিত হলো আসলেই তো পড়বে টা কি। এখানে তো ছেলেও থাকে না যে তার টা দিবে। চট করে মনে পড়লো তুবা গত সপ্তাহে বাড়ি থেকে আসার পরে ব্যাগ চেক করে দেখে ভুল করে তার বাবার এক সেট কাপড়-চোপড় নিয়ে চলে এসেছিলো। ফারিশা ইয়াশকে নামিয়ে বললো,
” বাবা তুমি এখানেই থাকো দৌড়াতে যেওনা পড়ে যাবে..? আপনি একটু দাঁড়ান দেখছি কিছু আছে কি না..?”,
শেষ কথাটা ইরাদকে বলেই তুবার রুমে চলে গেলো ইরাদ ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াশের দিকে তাকালে ইয়াশ বললো,
” তুমি যামা ( জামা) আনো নি..?”
ইরাদ ঠোঁট উল্টে বললো,
” না আমার জামা-কাপড় নাই..? ”
ইয়াশ ইরাদের কথা শুনে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেলো তাদের জামা-কাপড় রাখার ছোট্ট র্যাক সেখানে ধীরে পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের একটা নীল রঙের গেঞ্জি আর নীল হাফপ্যান্ট নিয়ে সামনে ঘুরে ইরাদের দিকে এগিয়ে এসে তা সামনে ধরলো আর বললো,
” মিলাদ তুমি এটা পলো ( পড়ো)? ”
ছেলের এমন কান্ড দেখে ইরাদ মুখে হাত দিয়ে হালকা হেসে উঠলো আর বললো,
” এগুলো তো অনেক ছোট আমার গায়ে হবে না ছিঁড়ে যাবে তখন কান্না করবা না তো..?”
ইয়াশ মাথা নাড়িয়ে বললো,
” না আম্মু কিনে দিবে..? ”
ইরাদ হাতের ঈশারায় এবার ছেলেকে কাছে ডাকলো তা দেখে ইয়াশ এগিয়ে যেতেই ইরাদ ইয়াশকে কোলে নিয়ে বললো,
” চলেন দু’জনে একসাথে গোসল করি আজ..? ”
ইয়াশ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,
” আমায় নিবে তুমি..?”
ইরাদ মাথা নাড়িয়ে বললো,
” হুম..!”
” বৃষ্টি মাম দিবে..?”
” হুম দিবো..!”
” কালো তেল দিবে..?”
ছেলের কথায় ইরাদ ভ্রু নাচিয়ে ভাবতে লাগলো কালো তেল আবার কি পরক্ষণেই মনে পড়লো শ্যাম্পুর কথা বলছে বোধহয়।
” আচ্ছা তোমায় আমি কালো তেলের শ্যাম্পুও দিবো..!”
” আল ফলসা ( ফর্সা) হওয়াল শাবান..?”
ইরাদ এবার না হেসে পারলো না। বাচ্চাদের এমন আদো আদো গলায় কথা শুনতে যে এমন মিষ্টি-মধুর লাগে তা ইরাদ অনুভর করলো। ইচ্ছে করছে যেনো এখনি তাকে নিয়ে যেতে আর নিজের কাছে রাখতে। ইয়াশের গাল টেনে বললো,
” আজ তোমায় এত ফর্সা বানিয়ে দিবো ঠিক আছে..? ”
” শুনন..?”
ফারিশার ডাকে ইরাদ ঘাড় কাত করে পাশে তাকালো ফারিশার হাতে একটা সাদা লুঙ্গি আর বাদামী রঙের শার্ট দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর বললো,
” তুমি কী আমায় লুঙ্গি পড়তে বলবে। আমি লুঙ্গি পড়বো না..?”
ফারিশা এগিয়ে এসে সামনে ধরলো তা আর বললো,
” এর চেয়ে এ বাড়িতে আর কিছু নেই। নিলে নেন না নিলে যান বাড়ি। ইয়াশ কে দিন..?”,
বলেই ফারিশা ইয়াশের দিকে হাত বাড়ালে ইয়াশ ইরাদের ঘাড়ে হাত রেখে বলে উঠলো,
” আমি মিলাদের সাথে গোতুল কলবো..?”
ফারিশা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” ইয়াশ বড় হয় নাম ধরে ডাকছো কেন তুমি। এসো বলছি..?”
ইরাদ ফারিশার হাত থেকে জামা-কাপড় নিয়ে ইয়াশকে নিয়েই ওয়াশরুমে যেতে যেতে বললো,
” তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও ইয়াশ আমার সাথেই আজ গোসল করবে। আর হে, অতিথি এসেছে একটু রান্না-বাড়িও করো..!”,
বলেই চট করে দরজা আটকে দিলো তা দেখে ফারিশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তারপর আর না পেরে মনের ভয়ে রুমের দরজা তালা দিয়ে চাবিটা ওড়নার কোণায় বেঁধে তুবার রুমের ওয়াশরুমে গেলো। ইরাদ ওয়াশরুমে গিয়ে ইয়াশকে পাশে দাঁড় করিয়ে আশেপাশে তাকাতেই দেখতে পেলো শ্যাম্পুর ছোট্ট বোতল আর সোপ। শ্যাম্পু হাতে ঠেলে ইয়াশের মাথায় ডলতে গেলে ইয়াশ ছুটে পালাতে চাইলে ইরাদ এক টানে নিজের বা হাতের ওপর তুলে তাকে উঁচুতে উঠালো আর ডান হাত দিয়ে শ্যাম্পু করাতে করাতে বললো,
” মজা লাগছে..?”
” হুম..!”
ছেলের কথায় মৃদু হাসলো ইরাদ। হ্যান্ডশাওয়ার দিয়ে মাথা ধুইয়ে দিয়ে নিচে নামাতেই ইয়াশ মুখ উঁচু করে ইরাদ কে বললো,
” তোমাল টুল নোঙলা হয়ে গেচে আসো তোমাকেও তেল দিয়ে দেয়..?”
ইরাদ শ্যাম্পু নিজের মাথায় নিয়ে ঝর্ণা অন করে ফ্লোরে বসে পড়লো, ইয়াশকে নিজের উরুর ওপর দাঁড় করিয়ে মাথা নিচু করে বললো,
” নাও করে দাও…?”
ইয়াশ বেশ উৎফুল্ল হয়ে ইরাদের মাথায় তার ছোট্ট দু’টো হাতখানা রাখলো তারপর আলতো করে ডলতে শুরু করলো। কখনো ডলতে ডলতে ইরাদের চোখের কাছে এগিয়ে আসছে তো কখনো আবার তার কপালেও লাগিয়ে দিচ্ছে কিন্তু ইরাদের সে হুশ নেই সে দিব্যি উপভোগ করছে চোখ বন্ধ করে ছেলের যত্ন যেনো।
ফারিশা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমের তালা খুলে দেখলো দু’জনে এখনো ওয়াশরুমে তা দেখে নিজের ফোন নিয়ে বেলকনিতে গেলো আর তুবাকে ফোন দিলো। ওপাশ থেকে রিসিভ করতেই তুবা বলে উঠলো,
” কি রে আসবি কখন..? ”
” তুবা তুই বাড়ি আয় ইরাদ আসছে। আমার ভয় করছে যদি ইয়াশকে নিয়ে আবার কিছু বলে..?”
তুবা ওপাশ থেকে তাড়া গলায় বললো,
” কি বলিস কখন আসলো। আচ্ছা দাঁড়া জিসান কে নিয়ে আসছি আমি..?”
” জিসানকে বলিস না, ও এসে কি করবে। তুই আয় জলদি..?”
তুবা ফারিশার কথায় বললো,
” আচ্ছা চিন্তা করিস না তুই কিছু বলে থামিয়ে রাখ আমি আসছি…!”,
বলেই ফোন কেটে দিলো। তার কয়েক মিনিট বাদেই দু’জনেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো
ইরাদের পরনে বাদামি রঙের শার্ট আর সাদা লুঙ্গি একদম খাঁটি বাঙালীর ছেলেরা যেমন হয় ঠিক তেমনটায় তাকে দেখে লাগছে যেনো। ভেজা চুলে এক ফোঁটা দু’ফোটা করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ইরাদের কোলে ইয়াশ তার পরনে নীল গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট। দু’জনেই রুমে এসে বেডের ওপর বসে পড়লো ইরাদ বসে টাওয়াল দিয়ে ইয়াশের মাথা মুছে দিচ্ছে ফারিশা দূর হতে তা দেখলো। ফারিশার যেনো চোখ জ্বলে উঠলো এই মুর্হুতে তার এটাই মনে হচ্ছে যে তার যেনো একটা পরিপূর্ণ সংসার আছে কথাটা যদি সত্যি হতো তাহলে তার ছেলে না জানি কতটা আদরে মানুষ হতো আরও কে জানে তা..?
” ফারিশা রান্না করেছো কিছু। না খেয়ে কিন্তু এ বাড়ি থেকে এক পাও লড়বো না। ”
ফারিশা ইরাদের কথায় ঘোর থেকে বেরিয়ে রুম থেকে চলে যেতে যেতে বললো,
” আমি এমন শিক্ষাও পাই নি যে বাড়িতে কোনো অতিথি এলে না খেয়ে বিদায় করবো। বসুন রান্না প্রায় শেষের দিকে..!”,
ফারিশা রান্নাঘরে গিয়ে ঢাকনা তুলতেই দেখলো খিচুড়ি প্রায়ই হওয়ার দিকে। আজ ভেবেছিলো তারা ভর্তা আর ভাত রান্না করলেই হয়ে যাবে আর ইয়াশের জন্য ডিম সিদ্ধ দিলেই আর কিছু লাগবে না কিন্তু ইরাদের জন্য পড়লো মুশকিলে। রান্নার জন্য কোনো মাছ বা মাংসই নেই তার ঘরে তাই ঘরে যা সবজি ছিলো ফারিশা জানে ইরাদ খিচুড়ি খেতে ভালোবাসে তাই দিয়ে সবজি খিচুড়ি রান্না করছে। ফারিশা খুন্তি দিয়ে ভাত নেড়েচেড়ে দেখছে। তার পিছনেই রান্না ঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরাদ দু’হাত ভাজ করে আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ মায়ের রান্না দেখছে সে। ফারিশার পরনে হালকা বেগুনি রঙের থ্রিপিস আজ। ইরাদ ফারিশার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শুধু। কয়েক সেকেন্ড দাঁড় হয়ে সেখান থেকে সরে গেলো ইরাদ রুমে চলে গিয়ে বসতেই ইয়াশ এসে পাশ বসলো আর বললো,
” তুমি কী থাকবে আমাল বাসায়..?”
” না আমার তে একটা বড় বাড়ি আছে সেখানে আমার আম্মু আছে, বাবা আছে, দাদী আছে তুমি কী যাবে আমার সাথে..? ”
ইয়াশ ইরাদের কথায় স্থির হয়ে বললো,
” না আমি আম্মুর সাথেই থাকবো..!”
ছেলের কথায় ইরাদ আর কিছু বললো না। বুঝলে হুট করে নিয়ে গেলে ছেলের জন্যই বিপদ হবে। রান্না শেষ হতেই ফারিশা প্লেটে ভাত বেড়ে তার বেডের ওপর রাখলো আর বললো,
” নিন খান আমার আপনার বাড়ির মতো বড়ো ডাইনিং রুমও নেই আর না আছে টেবিল। এখানেই বসেই খান..?”
ইরাদ ইয়াশকে কোলে নিয়ে বেডের ওপর বসে খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখলো খিচুড়ি। ইরাদ এক নজর খাবারের দিকে তাকিয়ে ফারিশার মুখ পানে চেয়ে দেখলো। ফারিশা সেখান থেকে সরে জগ আর গ্লাস নিয়ে আসতে গেলো। ইরাদ ইয়াশকে জিজ্ঞেস করলো,
” ইয়াশ তুমি এগুলো খাবে..?”
ইরাদ মাথা তুলে বললো,
” হুম এটা অনকে ভালো লাগে আমাল..!”
দু’জনে বেশ তৃপ্তি করে খাচ্ছে যেনো তা ফারিশা এক নজর দেখলো শুধু দরজার আড়াল থেকে এর মাঝেই তুবা চলে আসলো। তুবা রুমে একবার উঁকি মেরে ফারিশার দিকে তাকালো তারপর পাশেই দাঁড় হয়ে রইলো।
” আম্মু চাকরি হওয়ার কত টুকু চান্স আছে..? ”
জিসানের মা জাহানারা শিকদার কেবিনে বসে রির্পোট লিখছিলো। বিকেল হতেই সেই যখন থেকে ছেলে এসেছে তখন থেকেই একই প্রশ্ন বারবার করছে। এবার ছেলের কথায় কাজ করতে করতেই বলে উঠলো,
” ৯৯ % কিন্তু কেনো বল তো হঠাৎ এমন বিচলিত হওয়ার কারণ কী..?”
জিসান টেবিলের ওপর থুতনি রেখে বললো,
” আম্মু একটা আবদার করলে রাখবে..?”
” বল শুনি আগে…?”
জিসান মায়ের মন বুঝে বলে উঠলো,
” আমি চাকরি পেলে যদি ফারিশাকে বিয়ে করতে চায় তুমি কী রাজি হবে..?”
জাহানার হাত থেমে গেলো কলম টা পেপারের ওপর রেখে মুখে তুলে তাকালো আর বললো,
” এটা কেমন কথা জিসান। আমি বলছি না, ফারিশা খারাপ মেয়ে। ও অনেক লক্ষী মেয়ে কিন্তু তুমি কেনো একটা এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করবে..? ”
জিসান মায়ের কথায় কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” আম্মু আমার অসুবিধা নেই ইয়াশ অনেক ভালো। তুমি ম্যানেজ করো না প্লিজ..?”
জাহানারা মাথা দুলিয়ে ফের লিখতে শুরু করলো আর বললো,
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ৮
” তোমার বাবা শুনলে কী করবে জানে তো। আমায় আর এসব বলো না তুমি..?”,
জিসান বসা থেকে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে চলে যেতে যেতে বললো,
” ওকে আমি বাবাকে ম্যানেজ করে নিবো, আগে চাকরি টা হোক.!”,
বলেই চলে গেলো জাহানারা ছেলের যাওয়ার পানে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস ফেললো।
