তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৪
আশফিয়া হিয়া
সময় ও স্রোত কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। কথাটি চিরন্তন সত্য। দেখতে দেখতে পবিএ রমজান মাস চলে এসেছে।প্রথম রমযান উপলক্ষে আজ বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। আহি আরু রুহানি বাড়ির তিন কন্যাকেও আজ রান্না ঘরে দেখা যাচ্ছে। তারা আজ বিভিন্ন কাবাবের আইটেম বানাবে। বাড়ির গৃন্নীরা রান্নাঘরের একপাশে তাদের জায়গা দিয়ে দিল। অন্যদিকে তারা অন্যান্য খাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত। রুহানি গরুর মাংস মেরিনেট করছে। পাশ থেকে আরু ও আহি তাতে মসলা দিচ্ছে।
– ” হয়েছে আর দিস না।” রুহানির কথা শুনে আহি বলল,
– ” আরেএএ যতো বেশি মসলা দেবে তত মজা হবে।”
আরু ব্যাঙ্গ করে বলল,
– ” তোকে বলেছে?”
– ” চুপ কর তো তোরা রান্নায় মনোযোগ দে। খারাপ হলে মান ইজ্জত কিছু থাকবে না।”
– ” বাই এনি চান্স যদি খারাপ হয়। তোমার তো মান সম্মান একদমই থাকবে না আপু তোমার জামাই আসছে আজকে।” আরুর কথা শুনে রুহানি মাথা ঘুরানোর এক্টিং করে দেখাল। তারপর তিনজনই একসাথে হেসে দিল।
ইয়াজ বাইরে গেছিল একটু। ফিরে এসেই রান্নাঘরে উঁকি দিল তিনজনকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে দেখে পা টিপে টিপে ভেতরে এল। সুমিতা বেগম তাকে দেখে ফেলল যেই কিছু বলতে যাবে ইয়াজ হাত দিয়ে চুপ করতে বলল। তিনজন মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল। ইয়াজের উপস্থিতি টের পায়নি।ইয়াজ পেছন থেকে ধাক্কা মারল। তিনজনই ভয়ে চমকে উঠল। বুকে থু থু ছিটাল। ইয়াজ হেসেই যাচ্ছে বড়রাও এদের কান্ড দেখে হেসে দিল। রুহানি আর আরু মিলে ইয়াজের পিঠে কয়েকটা কিল বসাল। আহি ভদ্র সেজে থাকল। মায়ের সামনে সে ইয়াজের গায়ে হাত তোলে না। তাহলে বড় ভাইয়ের সাথে বেয়াদবি করার জন্য মা তার হাতটাই কেটে নেবে।
– ” কিরে রান্না করতে গিয়ে আবার কিছু খেয়ে ফেলিসনি তো?” কথাটা আহিকে উদ্দেশ্য করে বলেছে সেটা তিনজনই বুঝতে পারল। আহি চোখ গরম করে ইয়াজের দিকে তাকাল।
বিড়বিড় করে বলল,
– ” সামনে মা আছে দেখে বেঁচে গেলি ইয়াজের বাচ্চা।”
তার বিড়বিড়ানি ইয়াজ শুনতে পেয়েছে। শয়তানি হাসি দিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
– ” কি বললি শুনতে পাইনি? কার বাচ্চা?”
আহি আরেকবার চোখ গরম দিয়ে কাজে মনোযোগ দিল। আরু ইয়াজকে ঠেলে রান্নাঘর থেকে বের করে দিল। এই বান্দা রান্নাঘরে থাকলে তাদের কোনো কাজই হবে না।
আজ প্রথম রমজান তাই বাড়ির হবু জামাই ফারিশকেও দাওয়াত করা হয়েছে। ছেলেটার মা – বাবা নেই। ছোট থেকেই মামার বাড়িতে মানুষ সে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরপরই সে আলাদা ফ্যাট নিয়ে থাকে। ফারিশ এসেই রুদ্ধর রুমে গিয়েছিল। দুই বন্ধু অনেসময় ধরে আড্ডা দিল। নানারকমের আইটেম দিয়ে ইফতার টেবিল ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। আরু আহি ও রুহানি মিলে প্লেটে প্লেটে খাবার সাজিয়ে দিল। এরপর ইফরতারের সময় সবাই একসাথে বসল। রুদ্ধর এক পাশে আরু বসেছে তার পাশে ফারিশ। ফারিশের এক পাশে রুহানি বসেছে। রুদ্ধ ভাজা পোড়া খেতে খুব একটা পছন্দ করে না তাই সে যতটুকু পারল খেল বাকিটা আরুর প্লেটে তুলে নিল। আরু বিনাবাক্যে খেয়ে নিল। অন্যদিকে ফারিশও যেটা খেতে পারছিল না রুহানির প্লেটে দিয়ে দিল রুহানিও বিনা বাক্যে খেয়ে নিল।
ইফতার করে নামাজ পড়েই আরু আহি বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল। রুহানি বেডের একপাশে এসে বসল। আহি আরুর পেটে হাত বুলিয়ে বলল,
– ” তোর পেট দেখে তো তোকে তিন মাসের প্রেগ্যানেন্ট মনে হচ্ছে রে আপু।”
তার কথা শুনে দুজনেই হেসে দিল।
– ” আমারও তো তাই মনে হচ্ছে। আজ বেশি খেয়ে ফেলেছি।”
– ” চল ছাদে গিয়ে হেঁটে আসি?”
আহি হাঁই তুলে বলল,
– ” তোমরা যাও আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।”
আরু রুহানি ছাদে এসে দেখল ফারিশ আগে থেকেই ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে এগিয়ে এল। আরুকে চোখ দিয়ে কিছু ইশারা করতেই আরু বাহানা দিয়ে ছাদ থেকে বেরিয়ে এল। সে ছাদের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল উঁকি দিয়ে ফারিশ রুহানিকে দেখতে লাগল। আরু যেতেই ফারিশ রুহানির হাত টেনে কাছে নিয়ে এল।
– ” তোমাকে খুব মিস করেছি জান।” রুহানি তার বুকে মাথা রেখে পিঠ জড়িয়ে ধরল।
– ” আমিও।”
ফারিশ আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল গলার কাছে মুখ নামাতেই রুহানি তাকে সরিয়ে দিল। তাদের দেখে আরুর গাল দুটো লাল হয়ে গেল। ছিহ ছিহ এসব দেখা কি ঠিক হবে? পরক্ষণে ভাবল একটু দেখলে কিছুই হবে না।
রুহানির সরিয়ে দেয়ায় ফারিশ বিরক্ত হলো।
– ” কি হয়েছে?”
রুহানি চোখ রাঙিয়ে বলল,
– ” একদম গলায় মুখ দেবে না। কাল ওরা আমার গলার দাগ দেখে ফেলেছিল। ছিহ্ কি লজ্জার ব্যাপার।
– ” তো তুমি ঢেকে রাখবে না?”
– ” এটাও আমার দোষ একদম কাছে আসবে না।”
ফারিশ তার কথা শুনলে তো শক্ত করে কোমর জরিয়ে গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল।
আরু তৎক্ষনাত সড়ে গেল। লজ্জায় গাল গুলো লাল হয়ে গেছে। সে ঘুরতেই কারোর সাথে ধাক্কা খেল। রুদ্ধকে দেখে চমকে গেল। একবার ছাদের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার রুদ্ধর দিকে। রুদ্ধ তার দিকে এগিয়ে এল। তার গাল দুটো ধরে ভ্রু কুঁচকে এপাশ ওপাশ ভালো করে দেখল। এরপর চিন্তিত ভঙিতে প্রশ্ন করল,
– ” কি হয়েছে গাল দুটো এমন লাল দেখাচ্ছে কেনো?”
আরু আমতা আমতা করল,
– ” কো..কোথায়?”
– ” এখানে দাঁড়িয়ে কেনো? সর ভেতরে যাব।”
– ” না না।”
– “কি না না?”
– ” মানে এখন যেতে হবে না।”
– ” তোর কথায়?” রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল।
– ” না না আমার কথায় হতে যাবে কেনো? আমি তো আপনার ভালোর জন্যই বলছি।” আরু স্বাভাবিকের তুলনায় জোড়ে কথা বলছে। যাতে তার শব্দ রুহানিদের কান অবদি পৌছায়। এবং দুজনেই সতর্ক হয়ে যায়।
তার এত জোরে কথায় রুদ্ধ বিরক্ত হলো,
– ” এত জোরে কথা বলছিস কেনো আমি কানে শুনতে পাই না?”
আরু আরোও কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফারিশ রুহানি ছাদ থেকে বেরিয়ে এল। তাদের দেখে রুদ্ধর যা বোঝার বুঝা হয়ে গেল। রুহানি ভাইকে দেখে লজ্জা পেয়ে নিচে চলে গেল। রুদ্ধ ফারিশকে রুমে যেতে বলল সে আসছে। ফারিশ মাথা নেড়ে চলে গেল।
রুদ্ধ এবার আরুর হাত ধরে ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে যেতেই আরুকে দোলনায় বসিয়ে দিল। সে আরুর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।আরু অবাক হয়ে তাকাল। কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। রুদ্ধ পকেট থেকে এক জোড়া নূপুর বের করল। খুব সুন্দর নূপুর জোড়া দেখতে। আরুর চোখ দুটো খুশিতে ছলছল করে উঠল। রুদ্ধ আরুর পা আলতো করে ধরে তার উরুর ওপর রাখল। এরপর তার পায়ে পড়ে থাকা নূপুর জোড়া খুলে তার শার্টের পকেটে রেখে দিল।এরপর খুব যত্ন করে তার আনা নূপুর জোড়া আরুর পায়ে পড়িয়ে দিল।
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৩
পুরোটা সময় আরু রুদ্ধর দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে ছিল। রুদ্ধ এবার তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। আরুর চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। রুদ্ধ দোলনায় তার পাশে বসে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিল। আরু রুদ্ধর কাঁধে মাথা রেখে এক হাত জরিয়ে ধরল। রুদ্ধ তাকে সরিয়ে দিল না বরং পেছন থেকে হাত দিয়ে তার এক বাহু জরিয়ে ধরল।
