Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৭

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৭

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৭
নওরিন মুনতাহা হিয়া

ওয়াশরুম থেকে গোসল করে বের হয় মেঘ। দ্রুত রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে রান্নাঘরে যায়। মূলত তার উদ্দেশ্য হল জিয়া রান্নাঘরে কি করছে তা দেখা! মেঘ রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকে না, বরং দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে উঁকি দিয়ে ভিতরে ঢুকে। মাছের তরকারি রান্না করার জন্য সবজি কাটছে জিয়া, তার সামনে থাকা টেবিলের উপর হরেক রকমের সবজি! টমেটো, ব্রউনি, আলু, সহ অনান্য সবজি। ছুরি দিয়ে কাটার জন্য প্রস্তুত হয় জিয়া। মনে সাহস নিয়ে প্রথমে, কুড়াঁল দিয়ে খড়ি কাটার মতো ছুরি বসিয়ে দেয় টমেটর উপর। টমেটো ছিটকে দূরে যায়।

রান্নাঘরে বাহিরে থাকা মেঘ আঁতকে উঠে। এই সবজি কাঁটার ধরণ দেখে বুঝে জিয়া আজ কি রান্না করবে? দূরে ছিটঁকে যাওয়া টমেটো নিয়ে এসে পুনরায় কাটাঁ শুরু করে জিয়া। প্রায় পনেরো মিনিট পর, তার সবজি কাটাঁ শুরু হয়। মেঘ শুধু এতোখন যাবত, দাঁড়িয়ে জিয়ার কাণ্ড দেখছিল! একটা মেয়ে ঠিক কতটা অর্কমা হতে পারে, তা হয়ত জিয়াকে না দেখলে সে বুঝতে পারত না। আদ্রিয়ানের উপর মায়া হচ্ছে তার, যদি এই মেয়ে তার বউ হতো নিঘার্ত এইসব খাবার খেয়ে আদ্রিয়ান মারা যেত।

জিয়ার কাটাঁ সবজির সাইজ যেন হাতির মতো বড়ো বড়ো হয়েছে। কিন্তু সবজি তো কেটে নিল? রান্না করবে কি করে? মাছের ঝোল কি করে রান্না করতে হয় তা সে জানে না। জিয়ার মাথায় বুদ্ধি আসে, সে তার পাশে থাকা ফোন হাতে নিয়ে ইউটিউবে সার্চ দেয়। গোটা শতাধিক ভিডিও চলে আসে, তা দেখে ধীরে ধীরে জিয়া রান্না করা শুরু করে দেয়। প্রথমে মরিচের কৌটা থেকে প্রায় অর্ধেক গুড়ো ঢেলে দেয়, এরপর হলুদও দেয়। ইউটিউবে লবণ দিতে বলেছে পরিমাণ অনুসারে। এখন এইটুকু তরকারির জন্য লবণ কতটুকু প্রয়োজন তা সে জানে না। তাই চামচ দিয়ে প্রায় আট থেকে দশ চামচ লবণ দেয়। এরপর কয়েক জগ পানি ঢেলে দেয়।

মেঘ মাথায় হাত দিয়ে সব দেখছে। জিয়া আজ বাড়ির সব বাজার এক মাছের তরকারি রান্না করতে শেষ করে দিবে? চুলার গ্যাস জ্বালিয়ে রান্না করা শুরু করে দেয় জিয়া। প্রায় দশ মিনিট পর তরকারির পানি ফুটতে শুরু করে, কিন্তু অসুবিধা হল পানির মধ্যে থাকা সব বেগুন ভেসে উঠছে। জিয়া বেগুন ডুবানর জন্য আর পানি দেয়, পুনরায় বেগুন ভেসে উঠে। জিয়া এইবার চরম বিরক্ত হয়ে জগের সব পানি তরকারির মধ্যে ঢেলে দেয়।
ফিক শব্দ করে হেঁসে উঠে মেঘ। তবে দ্রুত মুখে আঙুল দেয়, তার হাসির শব্দ যেন জিয়া শুনে না পায়। এই অর্কম মেয়ে এই কথাও জানে না যে, বেগুন কখনও পানিতে ডুবে না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে জিয়ার রান্না দেখছে মেঘ, তার ভীষণ হাসি পায়।
ইউটিউব দেখে খুব কষ্ট করে দুপুরের রান্না শেষ করে জিয়া। কিন্তু তার মুখশ্রীর বেহাল দশা হয়ে গেছে, নাকে _ মুখে হলুদ মরিচ গুড়ো আর কালিগ দাগ! জিয়ার অবস্থা দেখে হেঁসে কুটিকুটি হয়ে যায় মেঘ। তার স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার শখ তাই না? এখন শখ মিটছে! জিয়ার রান্না শেষ হলে মেঘ রান্নাঘরের ভিতরে যায় এরপর মুখে মিষ্টি হাসি বজায় রেখে বলে

___ “জিয়া তোমার রান্না কি শেষ? দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে?”
চুলায় রাখা তরকারি বাটিতে উঠিয়ে বড় ঢাকনা দিয়ে ঢেকে টেবিলে রাখে জিয়া। তার প্রায় সব রান্না শেষ। মেঘের উপস্থিত অনুভব করে হাসি মুখে তার প্রশ্নের উত্তর দেয়
—- “হ্যাঁ মেঘ, আমার রান্না শেষ। বিরিয়ানি, মাছের ঝোল, আর আলু ভাজি রান্না করেছি দুপুরের জন্য। এইসব আদ্রিয়ানের প্রিয় খাবার।”
মেঘ জিয়ার মুখের অবস্থা দেখে ঠোঁট টিপে হাসে। মিথ্যা যত্নের অভিনয় দেখিয়ে বলে উঠে
—-” জিয়া, তবে তুমি এখন ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল করে আসো। এরপর সবাই একসাথে দুপুরের খাবার খাব।”
—“হুম মেঘ। এখুনি যাচ্ছি।”

গোসল করার জন্য জিয়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেস্ট রুমে চলে যায়। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘের বেশ আগ্রহ হল, জিয়া কেমন রান্না করেছে তা দেখার। টেবিলে ঢাকনা গিয়ে রাখা বাটির থেকে পাশে থাকা চামচ দিয়ে এক চামচ মুখে দেয় মেঘ। রান্না করা বিরিয়ানির অংশ জিহ্বা স্পর্শ করে গলা অবধি নামার আগেই মুখের চেপে বমি চলে আসে! মরিচ, হলুদ, নুন সব মশলার মিশ্রি প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে এই বিরিয়ানি। যা স্বাদ কোন বিষের চেয়ে কম নয়! মেঘ দ্রুত বেসিনে গিয়ে মুখে থাকা বিরিয়ানি অংশ বমি করে ফেলে দেয়।

শুধু বিরিয়ানি না জিয়ার রান্না করা প্রতিটা তরকারির একই দশা। মুখে নেওয়ার যোগ্য না! কিন্তু মেঘ এতে খুশি হয়। দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় আদ্রিয়ানের অবস্থা কেমন হবে? তা ভেবে তার হাসি পায়। তবে সমস্যা হল, এই খাবার মেঘ কি করে খাবে? তার এখন নিজের জন্য আলাদা রান্না করতে হবে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে এসে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয় আদ্রিয়ান। ভয়ে ভয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়! টেবিলে কোন খাবার রান্না করা নাই। তবে কি মেঘ মিথ্যা ভয় দেখিয়েছিল তাকে? জিয়া কি তার জন্য দুপুরের রান্না করেনি! আদ্রিয়ান মনে মনে একটু স্বস্তির নি:শ্বাস ছাড়ল, কিন্তু তার ভয় দিগুণ বাড়িয়ে দিতে তার পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে নিচে নামে জিয়া। টেবিলের কাছে আদ্রিয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিয়া বলে

—–” আদ্রিয়ান, তুমি খাবার খেতে এসে গেছ? তুমি অপেক্ষা কর আমি এখুনি রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে আসছি।”
জিয়ার কণ্ঠ শুনে পিছনে ফিরে তাকায় আদ্রিয়ান! জিয়ার কথা শুনে মনে হচ্ছে ও আজ সত্যি তার জন্য দুপুরের রান্না করেছে! ভয়ে ভয়ে আদ্রিয়ান প্রশ্ন করে উঠে
—– “জিয়া, আজ দুপুরের খাবার কে রান্না করেছে? তুমি না মেঘ?”
আদ্রিয়ানের ভয়কে সত্যি করে দিয়ে জিয়া বলে উঠে
“অবশ্যই আমি আদ্রিয়ান। আজ দুপুরের খাবার তোমার জন্য আমি রান্না করেছি।”
জিয়ার কথা শুনে ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যায় আদ্রিয়ানের। মনে মনে হাজার বার “আল্লাহর ” নাম যব করতে থাকে। রান্নাঘর থেকে বাটি হাতে নিয়ে উপস্থিত হয় মেঘ! তাদের দুইজনের কণ্ঠ সে রান্নাঘরে থাকা অবস্থায় শুনতে পেয়েছে। আদ্রিয়ানের দিকে দুষ্ট হাসি দিয়ে তাকিয়ে বলে উঠে

—–“আদ্রিয়ান স্যার, জিয়া ম্যাম। আমি খাবার নিয়ে এসে পড়েছি। আপনারা দুইজন খাবার খেতে বসুন।”
রাগী রাগী চোখে মেঘের দিকে তাকায় আদ্রিয়ান! কিন্তু তার রাগের দায় ধারল না, সে হাতে থাকা খাবার টেবিলে রাখল। জিয়া এগিয়ে গিয়ে প্লেট ধুয়ে নেয়, এরপর আদ্রিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে
—– আদ্রিয়ান, তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আসো, খাবার খাওয়া শুরু কর।”
বাধ্য হয়ে টেবিলে বসে আদ্রিয়ান। উকিঁ দিয়ে বাটিতে থাকা খাবারের দিকে নজর রাখে। মাছের তরকারির উপর কাচাঁ মাছ ভেসে উঠছে দেখে তার শরীর গুলিয়ে যায়। আর বিরিয়ানি রং দেখে তার মনে হচ্ছে যেন বিরিয়ানির মধ্যে সাত রঙের রংধনু উঠেছে। আলু ভাতির আলু গুলো আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদ্রিয়ানের অবস্থা খারাপ। অন্যদিকে জিয়া অনেক খুশি সে তার রান্না করা খাবার আদ্রিয়ানকে খাওয়াবে বলে। জিয়া আদ্রিয়ানের প্লেটে প্রথমে বিরিয়ানি দেয়, যা দেখে শুকনো ঢুক গিলে আদ্রিয়ান।
রান্নাঘর থেকে নিজ রান্না করা খাবার নিয়ে আসে মেঘ। তার প্লেটে মুরগির ঝাল কাবাব, মাছ ভাজা, আর গরম গরম বেগুনি। সাধারণ দুপুরে মেঘ কখনও এমন খাবার কায় ডাল, ভাত খায়। তবে আজ তার ইচ্ছা সে আদ্রিয়ানের সামনে মজা করে করে তার রান্না করা খাবার খাবে। মেঘ তার হাতে থাকা খাবার টেবিল রাখে, জিয়া মেঘের জন্য আলাদা খাবার নিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে উঠে

—–” মেঘ, তোমার হাতে এইসব খাবার কেন? আমি তো এগুলো রান্না করিনি?
জিয়ার কথা শুনে আদ্রিয়ানও তাকায় মেঘের দিকে। মেঘের হাতে লোভনীয় সুস্বাদু খাবার দেখে তার লোভ জন্মায়! মেঘ জিয়ার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলে উঠে
—-“জিয়া, আসলে আমি নিজের জন্য আলাদা খাবার রান্না করেছি।”
—- কিন্তু কেন মেঘ? দুপুরে খাবার যথেষ্ট বাকি ছিল আলাদা করে রান্না করার প্রয়োজন কি ছিল? তুমি কি আমার হাতের রান্না খেতে চাও না।”
মেঘ মনে মনে বলে উঠে “তোমার হাতের রান্না কোন পাগলেও খেতে চাইবে না জিয়া ” কিন্তু মুখে বলে উঠে

—–“না, জিয়া এমন বিষয় নয়। সত্যি বলতে বিরিয়ানি আমার ভীষণ অপ্রিয়। আর মাছের তরকারির মধ্যে বেগুন রয়েছে, যা খেলে আমার এর্লাজি হবে। শুধু আলু ভাজি দ্বারা ভাত খাওয়া যাবে না। তাই সামান্য রান্না করেছি নিজের জন্য।”
জিয়া মেঘের উপর ভালোবাসা দেখিয়ে বলে উঠে
—- ” ওহ্ আই এম সরি মেঘ। আগে জানলে তোমার পছন্দের খাবার রান্না করতাম।”
“ইট্স অলরাইট জিয়া। তুমি আর আদ্রিয়ান স্যার খাবার খাও। আমি না হয় পরে কোনদিন তোমার রান্না খাব।”
—- “ওকে মেঘ। আমি অবশ্যই তোমায় রান্না করে খাওয়াব।”
দাঁত কটমট করে তাকায় আদ্রিয়ান মেঘের দিকে। সে জানে বিরিয়ানি, বা এলার্জি সব মিথ্যা অযুহাত মাএ মেঘ চাই না জিয়ার রান্না করা এই অখাদ্য খাবার খেতে! আদ্রিয়ান প্লেটের খাবার মুখে দিচ্ছে না দেখে, জিয়া তাড়া দিয়ে বলে উঠে

—- “আদ্রিয়ান, তুমি খাওয়া শুরু করছ না কেন? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
জিয়ার দিকে মুচকি হাসি দিয়ে প্লেটে থাকা বিরিয়ানির উপর করুণ দৃষ্টি রাখে আদ্রিয়ান। এরপর কিছুক্ষণ বিরিয়ানির উপর ডান হাত নাড়ায়! বাধ্য হয়ে এক পর্যায়ে খাবারের কিছু অংশ মুখে তুলে নেয়! সাথে সাথেই বমি করার মতো মুখশ্রী করে উঠে। এতো জঘন্য, অখাদ্য খাবার হয়ত সারা জীবনে সে কখনও খায়নি! এর চেয়ে বিষ খাওয়া উত্তম ছিল। সকালে খাওয়া ঝাজ্বাল কফির চেয়ে এর স্বাদ অতিরিক্ত বাজে। চোখ মুখে খিঁচে বন্ধ করে খাবারের অংশ ঢুক গিলল আদ্রিয়ান। গলা যে চিৎকার করে বলছে আর একটু খাবার যদি গলা দিয়ে যায়। তবে সে মারা যাবে!
জিয়া টেবিলের উপর বসে হাত মুখে দিয়ে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে আদ্রিয়ানের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। মূলত তার খাবার খেয়ে আদ্রিয়ানের কি প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখার অপেক্ষা করছে! জিয়া উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠে

—-“আদ্রিয়ান, খাবার কেমন হয়েছে? আমার রান্নার হাত কেমন?”
আদ্রিয়ান তার বিরক্তি আর কষ্ট চেপে রেখে মুখে হাসি বজায় রেখে বলে
—–“হুম ভালো জিয়া। তুমি বেশ বেটার রান্না কর।”
খুশিতে গদগদ হয়ে জিয়া বলে উঠে
—-” সত্যি আদ্রিয়ান? খাবার তোমার পছন্দ হয়েছে?”
আদ্রিয়ান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়
—- “হুম হয়েছে।”

পাশের চেয়ারে বসে মিটমাট করে হাসছে মেঘ। আদ্রিয়ানের মুখশ্রীর মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠছে তার খাবার ঠিক কতটা বিশ্রি লাগছে! ফাইনালি মেঘের প্রতিশোধ ডান। ডান হাতে ধরে মুরগির গোস্তর উপর কামড় বসায় মেঘ, আর মজা করে খাওয়া শুরু করে দেয়। অপর দিকে বেচারা আদ্রিয়ান, না পারছে এই জঘন্য খাবার বমি করে ফেলে দিতে! আর না পারছে গিলতে। আদ্রিয়ান গলা দিয়ে কয়েক লকমা খাবার গিলে! যেন এখুনি তার বমি বের হয়ে যাবে!
হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে মেঘের খাবারের ঘ্রাণ, আদ্রিয়ান প্রশান্তি ভরা মুখ নিয়ে চোখ তুলে তাকায়। মেঘ তার সামনে বসে ইচ্ছা করে মুরগির গোস্ত কামড় বসায় আর মুখ দিয়ে রান্নার প্রশংসা করে বলে উঠে
—–“আহ্, কি সুন্দর রান্না। কি মজার খাবার। দারুণ।”

মেঘের এমন মজা করে খাবার খাওয়া দেখে আদ্রিয়ানের জিহ্বে জল চলে আসে। বেচারা মুখশ্রী নিয়ে তাকায় মেঘের পানে! কিন্তু মেঘের পাথর হৃদয় গলে না মুখ ভেংচি কেটে পুনরায় মাংসে কামড় বসায়। মেঘের মতো এমন শান্ত আর লক্ষী বউ হঠাৎ করে দজ্জাল হয়ে উঠেছে কেন? এইটা কি সত্যি তার আগের মেঘ? না জীনে ভুতে ধরেছে?
পাশে চেয়ারে টেনে বসে জিয়া। আদ্রিয়ানের মুখে রান্না করা খাবারের প্রশংসা শুনে। তার বেশ ইচ্ছা হল নিজ রান্না করা খাবার খাওয়ার! দ্রুত প্লেটে বিরিয়ানি নিয়ে এক চামচ মুখে নেয়, তার আশাত্তুক মুখ ভরে উঠে চরম বিরক্তি আর জঘন্য স্বাদে। খকখক করে মুখের থাকে খাবারের অংশ দ্রুত প্লেটে ফেলে দেয়। কি বিশ্রি আর জঘন্য হয়েছে রান্না? জিয়ার দ্বারা এক চামচ মুখে তুলা সম্ভব হয়নি!
জিহ্বায় এখনও বিদখুটে রান্নার স্বাদ লেগে আছে জিয়ার, এখুনি হয়ত সে বমি করে দিবে! মেঘ পরিস্থিতি বুঝে বলে উঠে

—-“জিয়া, তুমি রান্নাঘরে গিয়ে বমি কর। টেবিলে থাকা সব খাবার সহ মেঝে নোংরা হয়ে যাবে।
মেঘের পরামর্শ শুনে দ্রুত জিয়া চেয়ার সরিয়ে উঠে দিয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। রান্নাঘরে টিউবল ছেড়ে দিয়ে বমি করে দেয়! নিজ রান্না খেয়ে জিয়ার এমন অবস্থা দেখে মেঘ শব্দ করে হেঁসে উঠে! আদ্রিয়ান সেই সুযোগ নিয়ে, মেঘের প্লেটে থাকা মাংসের দুই পিস তার প্লেটে নিয়ে খেতে শুরু করে দেয়! মেঘ তীক্ষ চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠে
—-“আদ্রিয়ান স্যার, আপনি আমার মুরগির মাংসের পিস নিলেন কেন? ফিরত দেন আমায়। এই খাবার শুধু আমি নিজের জন্য রান্না করেছি।”
মেঘের কোন কথায় আদ্রিয়ান শুনল না। মজা করে মুরগির মাংস খাওয়া শুরু করল! তবে মেঘের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলে উঠে

—-“মেঘ, স্বামী স্ত্রী মধ্যে আলাদা কিছুই হয় না। আর স্বামীকে রেখে একা খাবার খাচ্ছো! কেমন বউ তুমি?”
মেঘ খোঁচা দিয়ে বলে উঠে
—-“যে স্বামী নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীর রান্নার প্রশংসা করে। তার জন্য কোন খাবার রান্না করা উচিত নয়।”
হাত বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের প্লেট থেকে নিজ মাংসের পিস ফিরত নিতে চাই মেঘ। কিন্তু এর আগেই তা মুখে পুরে নেয় আদ্রিয়ান! মেঘের রান্নার হাত সত্যি প্রশংসনীয়। এক কথায় অসাধারণ। মেঘের রান্না আর শার্লিন বেগমের রান্না প্রায়ই একই! তাই হয়ত মেঘের সমস্ত রান্না করা খাবার আদ্রিয়ানের একটু বেশিই প্রিয়।
বেশ দীর্ঘক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসে জিয়া। আদ্রিয়ান তখন খাবার খাওয়া শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়! জিয়া এগিয়ে এসে কাচুমাচু মুখ করে বলে উঠে

—-“আদ্রিয়ান, আমার রান্না অনেক বাজে হয়েছে তা আমি জানি? আমি সত্যি দুঃখিত! তোমার দুপুরের খাবার নষ্ট করার জন্য”।
আদ্রিয়ান এখন জিয়াকে কি আর বলবে? এই মেয়ে এমনি যে ন্যাকা যদি এখন বকা দেয় অথবা রান্নার বিষয়ে নেগেটিভ মন্তব্য করে তবে হয়ত এখুনি কান্না করে শুরু করে দিবে? আর কোন ঝামেলা তার আর চাই না। আদ্রিয়ান সাধারণ ভাষায় বলে উঠে

—-” জিয়া, প্রথমবার রান্না করেছ তুমি! তাই একটু ভুল আর খারাপ হতেই পারে। মন খারাপ কর না।”
আদ্রিয়ানের সান্ত্বনা শুনে জিয়া খুশি হয়। আজ প্রথম তার কোন ভুলে তাকে বকা দিলে না আদ্রিয়ান! জিয়া বলে
—” তবুও আই এম সরি।”
—” জিয়া,থাক বাদ দাও রান্নার কথা। আমি রুমে গেলাম। শরীর বেশ টার্য়াড লাগছে, ঘুমাব একটু।”
—-“ওকে যাও।”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৬

আদ্রিয়ান মেঘের দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে রুমে চলে যায়। জিয়া আদ্রিয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ন্যাকামি করা কণ্ঠে বলে উঠে
—-” মেঘ, দেখলে তুমি। এতো খারাপ রান্না করার পরও আদ্রিয়ান আমায় বকা দিল না। তার মানে সত্যি সত্যি আদ্রিয়ান আমার প্রেম পড়ে গেছে। ধীরে ধীরে আমায় ভালোবাসতে শুরু করে দিয়েছে। ইয়েস।”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৮

1 COMMENT

Comments are closed.