Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ১৮

নিবৃতা পর্ব ১৮

নিবৃতা পর্ব ১৮
নেহার ছায়ালিপি

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিছানার এপাশটা সম্পূর্ণ খালি ছিল। কখনো কখনো, ঘুমের ঘোরে হাত পরলে, উষ্ণতার পরিবর্তে শূন্যতার মাঝে থাকা অপার শীতলতা ছুঁয়ে দিতো ওকে। অনুভব করিয়ে দিতো যে, সে একা। নিঃসঙ্গতাই ওর সাথী। অসম্পূর্ণতা ও অপূর্ণতাগুলো হাহাকার করতো অন্তঃস্থল জুড়ে। বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেত, কারও হৃদয়ের শ্রবনঘর অবদি এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা আর্তনাদগুলো পৌছতো পারতো না, কারণ সে ছিল একাকিত্বের পথিক। অভ্যাসে ছিল না, কারও সঙ্গ লাভের মতো অমূল্য প্রাপ্তিটি। তাই তো যখন, ভোরের আলো ফোঁটার আগে যথারীতি এলার্ম বেজে উঠলো, তখন নির্বিকার মনে, ঘুমো ঘুমো চোখে হাত বাড়িয়ে সেটি বন্ধ করতে চাইলো তাবিব। কিন্তু কিছু একটা ওকে তখনই আটকে দিলো।

অস্পষ্ট মস্তিষ্ক বিরক্ত অনুভব করলো। ঘোলা চোখে স্বীয় শিয়রে চাইতেই, বক্ষের অতীব কাছেই আরেক অবয়বের দেখা মিললো। তার থেমে ফেলা উষ্ণ স্তিমিত শ্বাস এসে ঠিকরে পরছে তাবিবের অস্তিত্বে। ও থমকে গেলো মুহুর্তের জন্য। ধীরে ধীরে সবটা পরিষ্কার হতেই আলগোছে, মুখ নামিয়ে হেসে ফেললো। খেয়ালেই ছিল না এই মানুষটির কথা! ও শ্বাস ফেলবে এর আগে আবারও এলার্ম বেজে উঠলো। আস্তেধীরে সরতে গিয়ে আবারও বাধার সম্মুখীন হতে হলো। নজর ঝুঁকিয়ে দেখলো, মেয়েটা ওর টি-শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে। গভীর ঘুমে নিমগ্ন হওয়া সত্ত্বেও বাধনে বলের অভাব নেই। ছুটাতে চাইলো না তাবিব।

উল্টো নিজে কসরত করে, শরীর বাকিয়ে ডান হাতটা কোনমতে তুলে বন্ধ করলো এক নাগাড়ে চলতে থাকা বিরক্তিকর কর্কশ শব্দটির উৎস। ফের মাথার নিচে হাত ঠেকিয়ে খানিকটা উচু হয়ে এরপর থিতু হলো। মুখ নামিয়ে সরাসরি তাকালো প্রিয় মুখ পানে। কি অপার শান্তিতে সে নিদ্রায় ডুবে আছে। চেহারায় নেই কোন সংশয়, জড়তা কিংবা উদ্বিগ্ন ভাব। কেমন শান্ত, স্থির সবকিছু। কিঞ্চিৎ খুলে রাখা দরজার ফাঁক গলিয়ে আসা মৃদু আলোয়, স্নিগ্ধ শুভ্র মুখ খানি কেমন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তাবিব দেখতে লাগলো ওকে খুটিয়ে খুটিয়ে। সবসময় কেমন পালিয়ে বেড়ায়, সুনয়নার চোখে চোখ রাখার অবকাশ মিলে না, হৃদয়ের তৃষ্ণাও মিটে না। আজ একটু সময় নিয়ে ওকে দেখলো তাবিব। কিন্তু ওয়াক্ত পার হয়ে যাওয়ার আশংকায় এই ক্ষণ দীর্ঘায়িত হলো না। বড্ড আদরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে, প্রশ্রয়ী স্বরে ডেকে উঠলো,

– নিবেদিতা!
তিন বারের সময় নড়ে উঠলো নিবৃতা। কপাল সহসা কুঁচকে এলো। তাবিব আলতো হাতে ওর ললাটের উপর পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে পুনরায় বললো,
– আলো ফুটে যাবে একটু পরই। উঠে পরো।
তাবিবের ন্যায় হতবিহ্বল অবস্থা নিবৃতারও হলো। এ সময়ে পুরুষ কন্ঠ কোথা থেকে এলো? ও বড় বড় করে আোখ মেলে চাইতেই স্পষ্ট হলো এক পুরুষ অবয়ব।
– ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। আমিই তো!
অভয় দেওয়া সেই কন্ঠের বলে নিবৃতার সমস্ত অস্থিরতা ম্লান হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। একদম স্থির হয়ে শুধু তাকিয়েই রইলো। তাবিব হাসলো। মুখ নামিয়ে, কপালের ঠিক মাঝখানটায় ওষ্ট যুগল ছুঁয়ে দিয়ে সরে আসলো পরপর।
– উঠে আসো।

মাত্র ঘটে যাওয়া কাজটা অত্যন্ত সরল হলেও বোকা নিবৃতার কাছে জটিলই লাগলো। ওর শুধু মনে হয়, লোকটা এতো বড় বড় কাজ বড্ড অবলীলায় করে বসে, এবং পর মুহুর্তেই এতো স্বাভাবিক ব্যবহার করে যেন কিচ্ছুটি হয় নি৷ সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক কি আদোও থাকে? এই যে, ওর অন্তঃকরণে প্রলয় ঘটে যায়। শ্বাস আসতে চায় না। নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খায়? এরূপ ঝড়ো, তান্ডব চালানো অনুভূতির রাশ কি সামলানো সহজ? না তো। মোটেও না। ও ততক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইলো যতক্ষণ না তাবিব ওয়াশরুমে ঢুকে পরে। যেই ও আড়ালে চলে গেলো ওমনি এক লাফে উঠে পরলো নিবৃতা। কোনরকমে ওড়না গুটিয়ে, আসেপাশে না তাকিয়ে এক প্রকার ছুটলো তানহার ঘরের দিকে।

তাবিব আজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে, সকাল সকালই বেরিয়ে পরেছে। যদিও ক’দিন বিশ্রাম নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হাসপাতালে ওকে এই মুহুর্তে প্রয়োজন। তাবিবের বিশ্বাস, প্রাপ্ত নতুন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ও ভালো কিছু করতে পারবে সবার জন্য। তাইতো নিবৃতার থেকে বিদায় নিয়ে কাজে ছুটেছে তাবিব৷ এরজন্যই সারাদিন একঘেয়েমিতেই কেটেছে নিবৃতার। তাছাড়া তানহা ছাড়া ওর ঘড়ির কাটা থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। খালা এসে কাজে টুকটাক সাহায্য করে চলেও গিয়েছেন মাঝে। একা নিজের জন্য কিছু করে খেতেও ওর ভীষন অনীহা। তবে এই অনিচ্ছা আজ নতুন নয়। আগে থেকেই খাবারের প্রতি অত্যন্ত অরুচি ও অভক্তি রয়েছে। খেতে ওর একদমই ভালো লাগে না। আগে দুপুরে তানহা সাথে থাকতো, তাইতো ওকে না চাইতেও খেতে হতো। আর রাতে থাকে তাবিব! সেই লোকটার সম্মুখে ও একান্ত বাধ্যগত একজন।

আজ অবশেষে এই সকল বাধ্যবাধকতা পেরিয়ে আজ ও একা আছে৷ সুযোগে খাবার নামক অপছন্দের বস্ত থেকে দুরত্ব মেপে নিয়েছে একদম বরাবর! তাইতো দুপুরে রান্না অবদি করে নি। একটু আগে তাবিব কল করে জানালো, আটটার মাঝে চলে আসবে সে। সেজন্য বেলা ডুবতেই, কোমড় বেধে রান্নাঘরে চলে এসেছে এখন। আদর্শ স্ত্রী সেজে স্বামীর জন্য নিজ হাতে রান্না করবে৷ একসময় কাজের মাঝে মগ্ন হতেই ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে আসা মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইল নামক এই বস্তুটা বরাবরই নিবৃতার নিকট বড্ড অবহেলার। কারও কল রিসিভ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন কাজে সেটি ব্যবহার করে না ও। রিংটোনের আওয়াজ পেতেই ও প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়ে এলো। সেই একজনের কলের আশায় ও প্রহর গুনছিলো অবিরত। স্ক্রিনে কাঙ্ক্ষিত নামটা দেখতে পেয়েই এতক্ষণের পাংশুটে মুখে স্বচ্ছ হাসি ফুটে উঠলো। ভিডিও কলটা তড়িৎ রিসিভ করতেই ভেসে উঠলো আদুরে সেই চেহারাখানি। ঠোঁটে বিস্তর হাসি ঝুলিয়ে সে সরাসরি চেয়ে আছে।

– আম্মু!!!
সেই চিরচেনা মিষ্টি কন্ঠে হৈহৈ করে উঠলো ও। নিবৃতার চোখে জল উপচে এলো। বিড়বিড় করে আওড়ালো,
– ঝিলমিল!
– হ্যা হ্যা! এই তো আমি! বলো!
নিবৃতা যত ধীরেই কথা বলুক না কেন, ওর হৃদয়ের সখী তানহা সেটা এক চোটেই বুঝে ফেলে। ওর আহ্লাদী স্বরে নিবৃতা হাসলো। মাথা নিচু করে চোখ মুছে বললো,
– ফ্লাইটে কোন সমস্যা হয় নি তো? সব ঠিক ছিল না? শরীর ভালো আছে তো? খেয়েছ এখনও?
একসাথে তার সকল উদগ্রীবতা জড়ানো প্রশ্ন। তানহার হাসি গাঢ় হয়। মা’য়ের এই চটপটে, চঞ্চল স্বভাবটার একমাত্র দর্শক যে শুধুমাত্র তানহাই। তবে ও খুব করে চায়, বাবাও এই নিদারুণ দৃশ্যের ভাগিদার যেন হতে পারে এক দিন, খুব শীঘ্রই।
– ফ্লাইটে কোন সমস্যা হয় নি৷ এমনকি আমার পাশের সিটে থাকা মেয়েটার সাথে অনেক অনেক অনেক কথা হয়েছে। আমার বয়সীই ছিল অনেকটা। বেশ মজা হয়েছে। তবে ফ্লাইটে দেওয়া খাবার ভালো লাগে নি। খাই নি তেমন একটা। একদমই বেস্বাদ!!! আর এয়ারপোর্টে নেমেই ফুপ্পিকে পেয়ে গিয়েছি। ইয়া বড়ো পোস্টোর নিয়ে আমার জন্য দাড়িয়ে ছিল। এরপর বাসায় এসেই, পেট পুরে খেলাম আগে। পেট শান্ত করে এখন আমার মন, শরীর দুটোই চাঙা আর ফুরফুরে।
মেয়ের উজ্জ্বল কন্ঠে নিবৃতার সকল উৎকন্ঠা শান্ত নদীর মতোই স্থির হয়ে এলো। ও হাসলো বিস্তৃত ঠোঁটে।

– এখন বলো, আমার আম্মুটা কি করে?
নিবৃতা রান্নাঘর অভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
– এই তো রান্না!
– এখন কেন? দুপুরে কি খেয়েছ তুমি?
নিবৃতা কি বলবে? দুপুরে ও খায় নি? তাহলে তো এই মেয়ে এলাহী কান্ড ঘটিয়ে ফেলবে। বিপদের মুখে পরে ও যখন উত্তর খুঁজতে মরিয়া তখনই তানহার পাশে এসে তাকরিমা হাজির হলেন।
– কি খবর নিবৃতা? মেয়েকে ছাড়া দিনকাল কেমন চলে?
ননাসের প্রশ্নে নিবৃতা মিইয়ে গেলো। নত গলায় সালাম জানালো প্রথমে। এরপর কিছুক্ষণ চললো ওদের আলাপ। আগামী দিনগুলোর পরিকল্পনা নিয়ে কথা হলো। শেষে মা মেয়েকে একা ছেড়ে দিয়ে যখন তাকরিমা চলে গেলেন, তখন এই দু’জন মেতে উঠলো তাদের গল্পে। খুটিনাটি সবকিছু। ফ্লাইটের মেয়েটার নাম কি, কোন এলাকার, কি নিয়ে কথা হলো, খাবারের মেনু কি ছিল, এমনকি কত ঘন্টা ঘুমালো। এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও ওদের আলাপ থেকে বাদ পরলো না। নিবৃতা মেয়ের সাথে রসিয়ে গল্প করতে করতেই কাজ করছিল। তবে মাঝে ঘটে গেলো বিপত্তি। ভুলক্রমে ছুড়ি চালিয়ে দিলো স্বীয় আঙুলের উপর দিয়ে। এক লহমায় ডান হাতের তর্জনী জখমি হয়ে গেলো। তবে তানহা কথায় মগ্ন থাকায় খেয়াল করলো না বিষয়টি। নিবৃতা আড়ালে চেপে গেলো ঘটনাটি। ওর জন্য কারও মনে চিন্তা কিংবা অস্থিরতার সঞ্চার হোক, সেটা ও চায় না। এমনিতেও কাজ প্রায় শেষের দিকে।

– একটু বিশ্রাম নাও এখন। পরে আমি কল দেবো।
– টাইম ডিফারেন্সটা এতো বেশি যে কেন!
মেয়ে দূরে গেলেও মনটা যে ওর এখানেই পরে আছে, সেটা নিবৃতা অনুভব করতে পারছে। ও ক্ষীণ হাসার চেষ্টা করে বলে,
– বাবাকে কল করেছিলে?
বাবার কথা মাথায় আসতেই জ্বিভ কাটে তানহা। মায়ের টানে বাবাকেই ভুলে বসলো? নিশ্চিত ফুপির সাথে কথা হয়েছে আর সে জানিয়েছে যে তানহা মায়ের সাথে ফোনালাপে বিভোর। নতুবা এতক্ষণে বাবার শ’খানেক কল ঠিকই চলে আসলো। ও তড়িঘড়ি করে বলে,
– আচ্ছা আম্মু রাখি। আমি ভেবেছিলাম বাবা বাসায়। তাই আলদা কল দেওয়ার কথা মনে নেই।
– আচ্ছা। সাবধানে থেকো। অপরিচিত এবং পুরুষ মানুষ থেকে দুরে থাকবে। মাথায় আছে না আম্মুর কথা?
নিবৃতা গম্ভীর গলায় বলতেই তানহা দ্রুত সায় জানালো।
– এ ব্যাপারে চিন্তা করো না আমার আম্মু জননী! দুরে কি? ওদের ছায়াও দেখবো না আমি।
সগর্বে তানহা বলে উঠতেই নিবৃতা হাপ ছাড়লো। তার মেয়েকে নিয়ে চিন্তাটা কোনভাবেই মন থেকে দুর হচ্ছে না।

তাবিব ওর কথামতো ঠিক আটটার মাঝেই, মসজিদ হয়ে বাসায় ফিরেছে। এতোদিন বাদে কর্মস্থলে ফিরে দারুণ লেগেছে। পুরোনো সেই সহকর্মীদের সাথে দেখা, স্নেহভাজন জুনিয়র ও সম্মানজনক সিনিয়েরদের সাক্ষাৎ সব মিলিয়ে বেশ একটা সময় কেটেছে। সবাই মিলে অবশ্য রাতে একসাথে খাওয়ার প্রস্তাবও মিলেছিলো, কিন্তু তাবিব নাকোচ করে দিয়েছে সেটা। জানিয়েছে অন্য আরেকদিন আড্ডার আসর বসানো যাবে। তার দ্রুত বাড়ি ফেরার তাগিদ রয়েছে, সেই একজনের জন্য। সারাদিন একলা সময় কাটিয়েছে বাসায়। তানহাটাও কাছে নেই। তাইতো সে চিন্তাতেই চলে এসেছে। যদিও তাবিব জানে না, ওর উপস্থিতি নিবৃতাকে শান্তি দেয় না কেবলমাত্র অশান্তি অনুভব করায়। ভাবভঙ্গি অবশ্য বেশ সুবিধার নয়। কিন্তু চোখের ভাষায় অনীহাও খুজে পাওয়া যায় না। কেমন যেন প্রহেলিকা।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই চোখে পরে, বেড সাইড টেবিলে এক গ্লাস পানি ঢালা এবং পাশেই ধোঁয়া ওঠা গরম চা। শীতের মৌসুমে, এই সময়টাতে চা হলে সত্যিই জমে যায়। ও একবার দরজার বাহিরে গিয়ে উঁকি দিলো। নিবৃতা ইবাদতে মশগুল আছে। যদিও ইচ্ছে ছিল দুজনে একসাথে বসে, সারাদিনের গল্প করবে আর চায়ের আস্বাদন নিবে, কিন্তু সেটা আর হলো না। সমস্যা নেই। পরে কথা হবে। ও চলে এলো ঘরে। আপাতত তার বুকশেলফে নিরীহ ভঙ্গিতে পরে থাকা বইগুলোকে একটু সময় দেওয়া যাক। বেচারারা বেশ লম্বা সময় ধরে ওর থেকে দুরে আছে।

তাবিবের এই এক সমস্যা, বইয়ের মাঝে একবার মনোযোগ দিলে ওর আর আসেপাশের কিছু খেয়ালে থাকে না। সময়ের পাল্লার হিসাবও ছুটে যায়। ন’টার মাঝে রাতের খাওয়া শেষ হলেও আজ সাড়ে ন’টা বেজে গেলো। নিবৃতা ইতিমধ্যে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাবিবের ঘরের সামনে থেকে ঘুরে এসেছে। দেখেছে লোকটা গভীর ধ্যানে বই পড়ছে। ওর বুঝে আসলো না যে, এখন কি তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানো সমীচীন হবে কি না। পরে সময় গড়াতেই দ্বিধা কাটিয়ে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলো। তাবিবের খেয়াল হতেই ও মুখ তুলে চাইলে, নিবৃতা বলে,
– খাবার দিবো?
তাবিব ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় দেখতেই তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
– হ্যা দাও। সময়ের খেয়াল ছিল না।
টেবিল ওর গোছানো শেষ আগেই। শুধু তাবিবের অপেক্ষায় ছিল। তাবিব এসে বসতেই ওর প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে যেই না নিজেরটায় হাত দিলো ওমনি বাধ সাধে তাবিব। নিবৃতা ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে কেমন নিরেট চোখে তাকিয়ে আছে সে। অপ্রস্তত হলো ও। কিছু উল্টোপাল্টা কি করে ফেললো নাকি? চারপাশে তাকিয়েও কিছু ঠাহর করতে পারলো না।

– বসো।
তাবিব ওর হাত ধরে ওকে বসিয়ে দিলো। অতঃপর কোন কথা বলেই, এক লোকমা ভাত নিবৃতার মুখের সম্মুখে ধরলো। নিবৃতা অবাক হয়ে চাইলো। আজ খাইয়ে দিচ্ছে কেন? ও তৎক্ষনাৎ নিজের হাতের দিকে চায়। সফেদ ত্বকে হওয়া ক্ষতটা একদম লালচে হয়ে আছে। চোখে লাগছে বেশ। ও আর কিছু বলতে পারলো না।
– এখন কি আমার হাতে খেতেও সমস্যা?
থমথমে কন্ঠস্বর। রাগের আভাস এতে। নিবৃতা হতবাক হলো বিস্ময়ে। তোতলানো সুরে বললো,
– সমস্যা নে-নেই তো।
– তাহলে চুপচাপ হা করো!
সেই আগের মতো ভারি গলা। নিবৃতার মনে ভয় চাপলো। কিছু বলতে পারলো না। তাবিবের আদেশ মেনে নিয়ে চুপচাপ ওর হাতেই রাতের খাবার খেতে হলো। এক পর্যায়ে আর না পেরে বললো,
– আর খেতে পারবো না।
– গুনে গুনে মাত্র পাঁচ লোকমা হলো। সমস্যা কি?
– এমনি!

মিনমিনে উত্তর। তাবিব তোয়াক্কা করলো না। ওকে বাধ্য করে আরও পাঁচ খানিক খাইয়ে দিয়ে তারপরই রেহাই দিলো। কঠোর আচরণ পাওয়ায় অভ্যস্ত নয় নিবৃতা। দুঃখী মনে, মুখটা ছোট করে ও সেখানেই বসে রইলো। অথচ তাবিব নির্বিকার চিত্তে, সময় নিয়ে নিজের খাবার শেষ করলো। একবারও চোখ তুলে নিবৃতার দিকে তাকায় নি। তারপর নিজেই সবকিছু গুছিয়ে রাখলো। নিবৃতার সাহায্য করার জন্য এগিয়ে দেওয়া হাতকে পুরোপুরি না দেখা করে উপেক্ষা করে দিলো।
– দয়া করে এখন আমাদের ঘরে এসো। ক্ষতটা ড্রেসিং করতে হবে।
থমথমে, ভারিক্কি গলার তীক্ষ্ণ শব্দে নিবৃতা অসহায় চাহনি নিক্ষেপ করলো। ভুলটা ঠিক কোথায় হলো, ও বুঝতে পারছে না। তাই তো লোকটা যেন আরও রেগে না যায়, সেজন্যই দ্রুতই পা চালিয়ে ঘরে চলে এলো। দ্বিতীয়বার তাড়া দেওয়ার কোন অবকাশ ও রাখলোই না।

পাশাপাশি বসেছে দু’জন। ড্রয়ায় থেকে, তাবিব ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এসেছে। হাতে তুলো নিয়ে তাতে এন্টিসেপ্টিক ভরিয়ে সেটা হালকা করে চেপে ধরলো কেটে যাওয়া আঙুলে। সেবকের মুখাবয়ব বড্ড চিন্তিত দেখাচ্ছে। মুখ নামিয়ে ফুঁ দিয়ে সৃষ্ট হওয়া জ্বলুনি কমানোর চেষ্টায় মগ্ন সে। ক্ষতটা বেশ গভীরই বলতে গেলে। ছুড়ি দেবে গিয়েছিলো অনেকটা পরিমানই। অথচ নিবৃতা তখন নিজের পীড়ায় জর্জরিত নয় বরঞ্চ সামনে বসা মানুষটার হঠাৎই গুরুগম্ভীর আচরণের কারণ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত। কি এমন হলো হঠাৎ করে? ও না পারতে বললো,
– আপনি এমন করছেন কেন?
কাজের মাঝে প্রশ্ন করায় বিরক্ত হলো তাবিব। ভ্রুচ কুঁচকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলে,
– কেমন করছি?
– মনে হচ্ছে রেগে আছেন। আমি কি কোন ভুল করেছি?
বড্ড নিষ্পাপ সেই কন্ঠস্বর। যেন জাগতিক কোন বিষয়ই তার বোধগম্যতার বাহিরে। তাবিব ফোস করে শ্বাস ছাড়লো। মনের কথা আজ আর চাপিয়ে রাখলো না অভ্যন্তরে।
– তোমার কোন সমস্যা যেন না হয়, সর্বদা সেই চেষ্টায় থাকি আমি। কোনটাতে তোমার সুবিধা, অসুবিধা, সবসময় সেই খেয়াল রাখি। তোমার জন্য কোনটা ভালো হবে, কোনটা মন্দ, সবই সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে প্রাধান্য দেই। কেন করি আমি এমন, বলতে পারবে?

নির্বোধ নিবৃতার বিরুদ্ধে আজ প্রথম অভিযোগ তুলেছে তাবিব। আপোষহীন কন্ঠে, নিবৃতাকে দোষী সাব্যস্ত করে ব্যক্ত করেছে নালিশগুলো। নিবৃতা মাথা নামিয়ে নেয় কুন্ঠায়। বরাবরেই ন্যায়ই ফাঁকা মস্তিষ্ক বুঝতে অপারগ যে, কেন তাকে এসব বলা হচ্ছে? এর পেছনে কারনই বা কি। তবে ও মানে, লোকটা ওর ভালো চায়। ওকে যেন কোন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়, সে চেষ্টাতেই থাকে।
– আপনি আমার ভালো চান। সেজন্য।
দ্বিধান্বিত সুর। তাবিব চুপ করে রয়৷ একসময় শ্বাস ফেলে বলে,
– তুমি আমার আপনজন। তুমি ভালো থাকলে আমি ভালো থাকবো। এটাই তো স্বাভাবিক তাই নয় কি?
– জ্বি।
– আমি চাই তুমি আমায় বিশ্বাস করো। আমি তোমার এক আস্থাভাজন আশ্রয় হয়ে উঠি। যার কাছে নিজের সমস্যা, প্রয়োজন, থেকে শুরু করে অপ্রয়োজন পর্যন্ত কোন প্রকার দ্বিধা ছাড়া প্রকাশ করতে পারো। আমার কাছে তুমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো। মস্তিষ্কে প্রশান্তি খুঁজে পাও। আমি চাই তুমি আমাকে নিজের করে ভাবতে পারো।
অবসাদগ্রস্ত তার স্বর। রয়েছে লুকানো হতাশা। নিবৃতা একটু না অনেকখানিই লজ্জাশীল মানুষ। ওর মাঝে জড়তা প্রচুর। তার মানে এই নয় যে, লোকটাকে ও আপন ভাবে না। হয়তো অন্যান্য অনুভূতির চাপা তলে পরে সেটা ও ঠিক মতো জাহির করতে পারে না। ও আড়চোখে তাকিয়ে প্রতিবাদ করে বলে,

– আমি বিশ্বাস করি তো। সেদিন না বললাম?
সরাসরি চায় তাবিব। মুখটা পূর্বের ন্যায়ই শুকনো রেখে বলে,
– এই যে হাত কেটে বসে আছো, একবারও বলেছ আমায়? তারউপর ওভাবেই খেতে বসে পরেছিলে। তুমি আদোও সেই হাতে খেতো পারতে? বলো তো। আমাকে একবারও বলো নি৷ অবশ্য বলবে কেন? তুমি তো আমাকে পছন্দই করো না!
এতটুকু ক্ষত কোন বিষয়ই নয় নিবৃতার কাছে। এগুলো ওকে ব্যথা দেয় না। কোনরূপ জ্বালাতনও করে না। এরচেয়েও বড় বড় আঘাত ও সহ্য করে এসেছে। কিন্তু সেগুলো এই লোকটাকে বলবে কে? তাই সেই বিষয়ে ও ঘাঁটতে চাইলো না। নিজের প্রশ্নটা বসালো অন্যত্রে!

– কে বলেছে আপনাকে আমি পছন্দ করি না?
লহু স্বরে বলা কথাটিতে ঝট করে তাকায় তাবিব। নত মুখের আড়ষ্টভাবে চেয়ে থেকে বলে,
– পছন্দ করলে কি আর আমার সাথে সবসময় এমন পরের মতো ব্যবহার করতে?
– আপনি তো জানেন, আমি এমনই৷
– হ্যা! আর ঠিক সেভাবেই জানি যে, তুমি আমায় পছন্দ করো না।
তাবিব বারংবার একই কথা বলতেই নিবৃতার অসহ্য লাগলো। ওষ্ঠ যুগল চেপে বল সমেত বললো,
– ভুল কথা। আমি করি তো।
– কি করো?
– পছন্দ করি তো আপনাকে।
থমকে গেলো তাবিব কয়েক মুহুর্তের জন্য। অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে দেখলো সেই আনত অবয়বের দিকে। তবে নিজের অন্দরে প্লাবিত অনুভূতির জোয়ারে নিজেকে ভাসালো না তখনই। কণ্ঠস্বরে পরোয়া না ঢেলে বললো,
– সে আর তেমন কি। রাস্তায় নামজানা গাছে, অচেনা সুন্দর একটা ফুল চোখে পরলেও সেটাকে পছন্দ হয়ে যায়। সেখানে আমি তো এক জ্বলজ্যান্ত মানুষ। পছন্দ করতেই পারো। তবে দিনশেষে ভালো তো আর বাসো না।
ভালোবাসা! এই শব্দটা আজও নিবৃতার নিকট দূর্বোধ্য। এর অনুভুতিকে বুঝে উঠতে ব্যর্থ! সেভাবেই ও অজ্ঞের ন্যায় বললো,

– ভালোবাসা, এটা ঠিক কেমন, আমার জানা নেই। বুঝি না তো। নাহলে বলতে পারতাম।
– ভালোবাসা বুঝো না?
ছোট মুখে মাথা নাড়ায় নিবৃতা। তাবিব বিভ্রান্ত হলো৷ ভালোবাসা বুঝে না। এ আবার কেমন কথা? তাহলে কি এর আগে ও কাওকে ভালোবাসে নি? তাহলে কিভাবে হলো? না-কি সে ভালোবাসতে ভুলে গিয়েছে? অজস্র ভাবনার স্রোত পেরিয়ে তাবিব স্থির হলো। বর্তমানে মনোযোগ দেওয়াই শ্রেয়! অতীত ঘেঁটে কি হবে? ও সরল গলায় বললো,
– তানহার প্রতি তুমি যা অনুভব করো, সেটাই ভালোবাসা। তবে মেয়ের ভালোবাসা ও স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় কিছু পার্থক্য আছে।
– সেই পার্থক্যটা কি?
– তুমি শিখতে চাও?
– হ্যা! আপনি শিখাবেন?
উৎসুক কন্ঠস্বরে নিভু নিভু দৃষ্টি তুলে চাইলো নিবৃতা। ওকে যে ভীষন মিষ্টি দেখালো! তাবিবের হৃদয় বুঝি থমকে গেলো! ও শ্বাস আটকে বললো,

– চলো তাহলে। আজ তোমাকে ভালেবাসার অগনীত রঙের মধ্য থেকে বিশেষ একটি রঙে রাঙাবো।
নিবৃতা বুঝলো না। অবুঝ চোখো চাইতেই তাবিব ওকে আগলে ধরে উঠালো৷ সোজা এসে থামলো তানহার ঘরের আলমারির সম্মুখে। কপাট খুলতেই উদ্ভাসিত হলো এক পাশে টাঙিয়ে রাখা বাহারি রঙের শাড়ির বহর।
– তুমি শাড়ি পরো না কেন?
নিবৃতা তখন তাবিবের কার্যকলাপ না বুঝতে পেরে বিভ্রমে হাবুডুবু খাচ্ছিলো। সেভাবেই বললো,
– এমনিই। সামলাতে সমস্যা।
– আমি যদি এখন পরতে বলি, তাহলে কি পরবে?
কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকে নিবৃতা। সবকিছু কেমন যেন লাগছে। অজানা ভয় জাগে শুরু করেছে মস্তিষ্কে। তবে এই মানুষটার আদেশ ও অমান্য করতে পারবে না। তাই মিইয়ে যাওয়া গলায় বললো,
– পরবো।
তাবিব সন্তোষে হাসলো। খুজে খুজে টকটকে লাল রঙের সাধারণ একটি শাড়ি নামিয়ে নিলো। প্রশস্ত হেসে সেটা নিবৃতার হাতে তুলে দিয়ে বললো,
– এটা!

নীরবে মেনে নিয়ে শাড়ি পরতে চলে গেলো নিবৃতা। যদিও ও একদমই পটু নয় এতে, তবে সেদিন তানহার সাহচর্যে কিছুটা হলেও এই মারপ্যাচ উদ্ধার করতে পেরেছিলো। তাবিব যখন অপেক্ষমান হৃদয় নিয়ে বসে ছিল, তখনই নিবৃতা বেরিয়ে এলো। উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে, শুভ্র ত্বকে জড়ানো লালিমা যেন, কোন স্বর্গীয় রূপের প্রতিমা তৈরি করেছিল। লজ্জায় বুদ হওয়া নাজুক নিবৃতাকে দেখে তাবিবের ঘোর লেগে গেলো। এই প্রথম, ও নিবৃতার সম্মুখে ও বাকহারা হলো। ধ্যান জ্ঞান হারিয়ে নিবিষ্ট নিবিড় চোখে শুধু তাকিয়েই রইলো। এদিকে নিবৃতা তখম নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত। মা এবং ভাবির দেওয়া নানান সাংসারিক পরামর্শ ও নির্দেশনা ওর মাথার ঘুরপাক খাচ্ছিলো। সময়ের তালে, বাস্তব জ্ঞানেরও কিছুটা হলেও ওর আয়ত্তে আসায়, ও বুঝতে পারছিলো, যে কি হতে যাচ্ছে। তাইতো নিজের মাঝে লতাপাতা ছড়িয়ে, গভীর শিকড়ে আঁকড়ে থাকা ভঙ্গুর সত্তাকে ও কাবু করার চেষ্টায় আছে। নিজের অপরাগতা, কষ্ট ও সংশয়ের জন্য তাবিবের ইচ্ছেকে ও লাঞ্ছিত করতে চাইছে না। এই সম্পর্কের ভিত্তি তানহা। আজ যদি তাবিব ওর কারণে কষ্ট পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে এর ফল অত্যন্ত বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। উপরন্তু লোকটা ওকে দীর্ঘ, লম্বা এক সময় দিয়েছিলো। যেটার সমাপ্তি বহু আগেই ঘটেছে। তাই, এখন নিজের এই কুৎসিত, অসহায়, সর্বগ্রাসী রূপকে ওর দাবিয়ে রাখতে হবে। আর নয়! ওদের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না৷ একদমই না। নিজের অন্তর সত্তার সাথে, নীরব যু্দ্ধে নিমগ্ন নিবৃতার ধ্যান ভাঙে তাবিবের স্পর্শে। আজ আর দ্বিধা জিইয়ে রাখে না। চোখ তুলে তাকায়৷ লোকটা এক ঝাক অনুভূতির পসরা সেই জ্বলজ্বলে নয়ন যুগলে সাজিয়ে তাকিয়ে আছে ওর পানে। ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসির রেশ।

– আমি কুঁচিগুলো ঠিক করে দেই?
সবকিছু ঠিকঠাক করে পারলেও কুঁচিগুলো এলোমেলো করে ছেড়েছে নিবৃতা। ও নিশ্চুপে মাথা নাড়তেই তাবিব নিচে হাঁটু গেড়ে বসলো। সুন্দর মতন দক্ষ হাতে কুঁচির ভাজগুলো গুছিয়ে আনলো। এরপর কোন কথা ছাড়াই তানহার ড্রেসিং টেবিল থেকে ওর কাজলটা হাতে তুলে নিলো। পরপর পুনরায় নিবৃতার অতি নিকটে দাড়িয়ে ওর ডাগর ডাগর অক্ষি যুগলে আলতো করে আঙুল দ্বারা ছুয়ে দিলো। মোহনীয় কন্ঠে শুধায়,
– তোমার এই অবুঝ লোচনের বিভ্রান্ত চাহনি আমার সবচেয়ে পছন্দের। বহু দিনের ইচ্ছে, তাদের আমি নিজ হাতে কাজল দিয়ে সাজাবো। তুমি কি পরবে আমার হাতে কাজল?
– পরবো!
আজ তাবিব যা চাইবে, তাতে বিনাবাক্যে রাজি হওয়ার পণ করে নিয়েছে নিবৃতা। ওর ধিমি উত্তর পেতেই তাবিবের চঞ্চল হাত উঠে এলো। আলতো করে নিবৃতার চিবুক স্পর্শ করে তুলে নিলো ওর মুখ খানি উঁচুতে। খুবই নিবেশন সহকারে কাজলের রেখা টেনে দিলো রমনীর ভাসা ভাসা নেত্রদ্বয়ে।

– অপূর্ব!
নারী সৌন্দর্যের প্রশংসা করা বাঞ্ছনীয়। তাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে অপার রূপের মহীমা হিসেবে। সেটারই যথার্থতা দেখালো তাবিব।
– চলো আমার সাথে।
আজ অভিব্যক্তিতে নেই কোন সংকোচ। মস্তিষ্ক নীরব যুদ্ধে ব্যস্ত যে! তাবিব নিবৃতাকে নিয়ে চললো তাদের কক্ষে! তাবিবের ঘরের ডান পাশের জানালাটা বন্ধ থাকে সবসময়। বুকশেলফগুলোর জন্যই৷ যদি আচমকা বৃষ্টির ঝাট এসে ভিজে যায়? সেজন্যই আগে থেকে সর্তক থাকে তাবিব। আর এখন তো শীতের মৌসুম। তবুও আজ গিয়ে সেখানেই দাঁড়ালো ওরা। তাবিব পর্দা সরিয়ে খুলে দিলো থাই গ্লাস। উন্মুক্ত হলো আঁধারিয়া অন্তরিক্ষে জ্বলজ্বল করা পূর্ণ চন্দ্র এবং এর ছড়ানো স্নিগ্ধ কিরণ। একদম স্পষ্ট! মনে হচ্ছে খুব কাছে! নিবৃতার মনোযোগ সেখানে লেগে যেতেই অনুভব করলো সাথের মানুষটা ওকে আগলে নিয়েছে।

– সুন্দর না?
– জ্বি।
– তুমি ঐ চাঁদের মতোই আমার কাছে।
নিবৃতা দেখে চলে চন্দ্রিমা। সেথায় থাকা কালো কালো ছাপগুলো মনে করিয়ে দেয়, ওর অস্তিত্বে গেথে যাওয়া কালিমাগুলো। যেগুলো হয়তো সারাজীবন বয়ে বেড়াবে ও৷ তাবিব ভুল বলে নি৷ অবশ্য কখনোই বলে না৷ নিবৃতা সেই চাঁদের মতোই তো!
– ভালোবাসা হলো তার ভালোবাসার মানুষটিকে আগলে রাখা। সেটা সমস্ত বিপদ আপদ, ঝড় ঝাপটা থেকে হোক, কিংবা শীতের ঠান্ডা বাতাস থেকে অথবা শান্তির জন্য নিজের বক্ষ মাঝে!
আলতো হাতে, নম্রতা ঢেলে নিবৃতাকে গভীর আলিঙ্গনে বাঁধলো তাবিব। সে কি বর্ণনাতীত অনুভুতি। মনে হলো, কি অমোঘ এক প্রাপ্তি মিললো ওর শূণ্য খাতায়। নিবৃতা ওর মাঝে নিজেকে সপে দিলেও আগ বাড়িয়ে ধরলো না তাবিবকে। ওর মাঝে সকল অনুভূতিরা কেমন ম্লান হয়ে আসছে। কিন্তু সেই জড়তা প্রকাশ্যে নেই, তাইতো তাবিব বুঝলো না আজ ওকে।

– তাকে ছুঁয়ে দিয়ে অনুভব করানো যে, আমি আছি৷ তোমার পাশে কিংবা তোমার সাথে।
শুকনো গালে ওষ্ঠের উষ্ণ স্পর্শ মিললো। জটিল সকল ভাবনার তোড়ে বন্ধ হয়ে গেলো চোখের পাতা। দীর্ঘ পাপড়িগুলো ময়ুরের মেলে রাখা পালকের ন্যায় বিন্যস্ত হয়ে উঠলো। তাবিবের লোভ জাগলো। মুখ নামিয়ে দু চোখের পল্লবে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। দৃশ্যমান রূপে পলকা বদন কেঁপে উঠতেই বন্ধন জোড়ালো করলো তাবিব।
– আপনার ঘৃণা হয় না আমাকে ছুঁতে?
হীনমন্যতা! যা আমাদের ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার যথেষ্ট। তাবিবের মায়া হলো,
– আমার স্পর্শে তোমার ঘৃণা হয়?
নিবৃতা এর উত্তর জানে না। ওর মিশ্র অনুভূতি হয়। মিথ্যা ও বলতে পারে না আর সত্য? সেটা সবসময় সুখকর হয় না৷ তবে এই নীরবতাকে তাবিব ইতিবাচক ভেবে নিলো। এরপর কি হলো, আচমকা নিবৃতাকে ছেড়ে দিয়ে ও সরে এলো। অন্তঃকরণে তীব্র বেগে ছুটে চলা অস্থিরতাকে থামিয়ে দিয়ে, শ্বাস নিলো। অতঃপর সম্মুখে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে, মদিরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে, কাতর স্বরে বললো,

– মিসেস তানজীব! মাই নিবেদিতা! তুমি কি চাও আমার সাথে ভালোবাসাময় জীবনের এই অধ্যায়ে পা রাখতে? যদি চাও তবে আঁকড়ে ধরো আমার হাত, হয়ে যাও আমার। আর না চাইলে, চুপ থাকো। আমিও আজ নিশ্চুপে তোমায় বুঝে নিবো। আরও সময় দেবো৷ এই তানজীবের সংযম ওতটাও ঠুনকো নয়।
তাবিব আজ প্রতি পদে পদে নিবৃতার কাছে অনুমতি চাইছে। তার প্রত্যেক নিবেদনে ছিল নিবৃতার সম্মতির প্রাধান্য। নিবৃতা একটুও দ্বিধা দেখালে যে সে এগিয়ে আসতো না সেটা সত্য। তবে নিবৃতার এই ইচ্ছে স্বাধীনতা থাকা সত্বেও ও আজ সবকিছু মনের বিরুদ্ধে করছে, বলছে। ওর জন্য সারাটা জীবন ওর পরিবার অনেক কষ্ট পেয়েছে, হেয় হয়েছে। তবুও কেউ ওকে একা ছাড়ে নি। তাদের সর্বস্ব দিয়ে নিবৃতাকে ভালো রাখার চেষ্টা করেছে। নিবৃতার বাবা! ওর বাবার মতো বাবা বোধহয় খুব কমই হয়৷ কিন্তু সেই ভালোও বেশিদিন রয় নি৷ চলে গেলেন নিবৃতাকে ছেড়ে। এরপর এলো তানহা, এবং সাথে করে নিয়ে এলো এই চমৎকার মানুষটাকেও। যে নিবৃতার ভালোর জন্য সর্বদা তৎপর। তাহলে তাকে ও কষ্ট দেয় কি করে? সম্ভব নয়! এ জীবনে নিজের জন্য আর কাওকে ভোগাবে না ও। কয়েক ক্ষনের নীরবতা শেষে, কম্পনশীল হাতটা বাড়িয়ে ও তুলে দিলো তাবিবের হাতের উপর৷ অতি মূল্যবান কিছু মিলেছে যেন, সেভাবেই এক লহমায় লুফে নিলো সেটা তাবিব। শক্ত করে পাকড়াও করলো নিবৃতার সরু হাত খানি। সাথে টেনে ওকেও নিয়ে এলো সন্নিকটে। সমস্ত ভালোবাসা নিঙরে দিয়ে চুমু খেলো ওর ললাট মাঝে।
ভালোবাসা কি, ভালোবাসা কয় ধরনের হয় এবং ঠিক কিরূপ হয়, সেই শিখনের শিক্ষক হিসেবে তাবিব নিজের সর্বোচ্চ দিলো৷ অতি আদরে, আহ্লাদে তার বাহুডোরে নিবদ্ধ থাকা নিবৃতা আগলে নিলো নিজের মাঝে। কোন কথা হলো না, শুধুমাত্র কর্মের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে থাকলো, ওর ভালোবাসার গভীরতা! প্রতিটি স্পর্শ যেন পুষ্প নরম। প্রতিটি ছোয়ায় ঝরে আকুলতা। নিবৃতা চোখ বুঁজে চুপ থাকলেও এক পর্যায়ে বাধ্য হলো খানিকটা বিরোধিতা করতে। আকুতি সেই স্বরে।

– আলোটা নিভিয়ে দিবেন প্লিজ!
লাজুক নিবৃতার, ব্রিড়ায় আড়ষ্ট! তাই ভেবে মুচকি হেসে ঘরটাকে আঁধারে মুড়িয়ে দিলো তাবিব। একমাত্র খোলা জানালা থেকে আসা জোৎস্নার কিরণে গোটা কক্ষ প্রেম রাঙা হয়ে উঠলো।
– ভালোবাসি নিবেদিতা!
নিবৃতার কর্ণধার ছুঁয়ে মূল্যবান শব্দ খানি জাহির করলো তাবিব। আপন অনুভূতি সাগরে ভাসমান ও বুঝলোই না, লাজে নয় বরঞ্চ কুণ্ঠায় আলো নেভাতে বলেছিল নিবৃতা। আড়াল করতে চাইছে নিজ অস্তিত্বে লুকনো সকল কলঙ্ক, যা আজও ওর গোটা বদন জুড়ে জ্বলজ্বল করে। প্রত্যেকটি দাগের পেছনে চাপা পরে আছে ওর এককালের আর্তনাদগুলো। খুবই কৌশলে, সেগুলো লুকিয়ে গেলো নিবৃতা। দেখাতে চায় না ও সেগুলো, কখনোই না। কোনভাবেই না! অন্তত এই কারণে, সংস্পর্শে থাকা মানুষটার মুখে শুনতে চায় না যে, সে নোংরা! চায় না! একদমই চায় না!

রাত গভীর হতেই শীতের তান্ডব বেড়েছে। অথচ সেই ঠান্ডার প্রকোপ থেকে নিবৃতাকে রক্ষার্থে, নিজের উষ্ণতায় ওকে মুড়িয়ে নিয়েছে তাবিব। খুবই যত্নে, মায়ায় স্থান দিয়েছে স্বীয় বক্ষ মাঝে। অনিয়ন্ত্রিত অনুভূতিমালার প্রলয় শেষে এখন শান্ত হয়ে ঘুমে তাবিব। নিদ্রায় মগ্ন মুখাবয়বে প্রশান্তির ছাপ।কিন্তু যার কারণে আজ ও প্রসন্নতায় ভাসছে, তার চোখে ঘুম নেই। আধো অন্ধকার কক্ষে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে নিবৃতা। গলদেশে আছড়ে পরছে ঘুমন্ত মানুষটার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। ক্ষনকাল গড়াতেই নিবৃতা, আলগোছে নিজেকে তাবিবের বাধন থেকে ছুটিয়ে উঠে বসলো। অতঃপর নিজেকে গুছিয়ে চলে এলো সেই খোলা জানালার কাছে। কারোরই খেয়াল ছিল না এটা বন্ধ করতে। নিবৃতা গিয়ে ঠাই নিলো মেঝের উপর। শীতল বাতাসের দাপট!

নিবৃতা পর্ব ১৭

বড়ফ ঠান্ডা টাইলসের মেঝে! কিছুই ওর মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি করলো না। দু হাঁটুর মাঝে মাথা গুজে এক চিত্তে চেয়ে রইলো গগন পানে। রাত বাড়ার সাথে সাথে চাঁদের আলোর তীব্রতাও বুঝি বেড়েছে। নিবৃতা এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো। চোখের পলক অবদি পরলো না। শুধু এক সময়, নোনা জলের স্রোত বেয়ে গেলো বিষন্ন, ম্লান চোখদুটো থেকে। ভিজিয়ে দিলো কপোলদ্বয়, নেত্রদ্বযুগলে লেপটে গেলো তাবিবের ভীষন শখ করে পরিয়ে দেওয়া কাজল রেখা। এভাবেই পুরোটা রাত একটু একটু করে পেরিয়ে গেলো। একই কক্ষে উপস্থিত একজন শান্তির ঘুমে মশগুল, তো আরেকজনের কেটে গেলো বিষাদে ডোবা, বিনিদ্র রজনী!

নিবৃতা পর্ব ১৯