নিবৃতা পর্ব ৩৫
নেহার ছায়ালিপি
দিবাকরের মিষ্টি, উত্তাপ বিহীন, স্নিগ্ধ আলোয় নতুন প্রভাতের আগমন ঘটেছে। নয়া দিনের আরম্ভ বার্তা জানাতে, পাখিদের মিহি সুরের কূজন ভেসে বেড়াচ্ছে মিঠা, সতেজ সমীরণে। স্বচ্ছ মেঘের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সূর্য! চারপাশে এখনও ব্যস্ততার কোলাহল ছড়িয়ে পরে নি কারণ ঘড়ির কাটা সবেমাত্র সকাল ছ’টা পেরিয়েছে। কিন্তু এ সময়েও একজনের আজ বিশেষ তাড়া। কর্মস্থলে রয়েছে প্রয়োজন।
দ্রুত কদমে ওয়াশরুম থেকে বের হলো তাবিব। পরনে কালো প্যান্ট, ঘাড় পেচিয়ে ঝুলে আছে ভিজে তোয়ালে। পুরুষালী অবয়ব এখনও সিক্ত। মসৃণ, ঝরঝরে চুলের প্রান্ত বেয়ে গড়িয়ে পরছে বিন্দু বিন্দু জলরাশি। চশমা বিহীন আর্দ্র চোখ দুটোর পর্দায় আজ স্পষ্ট এক দীপ্তি। লুকিয়ে আছে কোন এক প্রসন্নতা!
একবার ঘড়ির দিকে তাকালো তাবিব। ওমনি নয়ন যুগল ছোট ছোট হয়ে এলো। লাভ যে নেই কোন! অতিমাত্রায় পড়ালেখার ফলে আজ তার দৃষ্টি শক্তি বড্ড নাজুক! বড় দেয়াল ঘড়িতে ভেসে ওঠা গোটা গোটা সংখ্যাগুলোও স্পষ্ট দেখা যায় না। ভীষন ঘোলাটে তারা! সময় দেখার চেষ্টা বাদ দিলো সে। নাক মুখ কুঁচকে চলে গেলো আলমারির কাছে। সাথে মাথায় চললো নানান চিন্তা। তানহাকে বেশি বেশি করে ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। নাহয় তাবিবের এই সমস্যাটি ওর মাঝে চলে আসা অতি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এই মেয়েকে নিয়ে ঝামেলা। এসব খাওয়াতেই তো নাভিশ্বাস উঠে যাবে। খাবার নিয়ে তার নানান অভিমত যে রয়েছে।
আলমারির তাঁকে তাঁকে সাজানো সারি সারি কাপড় ঘেঁটে ঘেঁটে, সে বের করলো আকাশ রঙা হালকা বর্ণের শান্তিময় প্রভাবের একটি শার্ট। সেটি হাতে নিয়ে পিছু ঘুরতেই নজরে পরে স্বীয় বিছানার উপর, যার ঠিক মধ্যভাগে একটি শায়িত মানুষের অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। আপাদমস্তক চাদরে আবৃত। সুশ্রী মুখশ্রীটি, অগোছালো কেশগুচ্ছেের বিশদ আধিপত্যে লুকায়িত। সহসা চওড়া হাসি ছুঁয়ে গেলো পাতলা পৌরুষ ওষ্ঠে। এক নিদারুণ ঔজ্জ্বল্যে ঝলমল করে উঠলো শ্যামল মুখটা! অন্তঃপটে ছলকে উঠলো প্রেমময় আবেগ! চোখের দৃষ্টিতে নেমে এলো নমনীয়তা। কোথায় ছুটলো ওর তাড়া! উল্টো মনে ভর করলো, এখানেই অনন্তকাল ব্যয় করে দেওয়ার নির্মল বাসনা! কখন যে অজান্তেই কদম যুগল এগোলো সম্মুখে ওর নিজেরও খেয়ালে ছিল না।
নিবৃতা গভীর ঘুমে তলিয়ে। শান্ত, মসৃন ললাট দেখে মনে হচ্ছে, কতকাল পর সুখ নিদ্রায় বিভোর সে! এই ঘুম ছোটাতে তাবিবের মায়া হলো। কিন্তু ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছেড়ে যেতেও দ্বিধা। হঠাৎ উঠে যদি খালি বাসা পায়, তাহলে মেয়েটা ভয় পেয়ে যেতে পারে। আর সেটা অবশ্যই তাবিব চায় না। বিছানার ধারে এসে, শরীর নামিয়ে ঝুঁকে এলো ও। একদম নিবৃতার স্থির মুখটির কাছে। এক হাত বিছানায় ঠেকিয়ে, আরেক হাতে, খুবই আলতো করে সরিয়ে দিলো চেহারার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুলগুলো। উদ্ভাসিত হলো মায়াময় সেই মুখকান্তি, যেখানে তাবিবের প্রশান্তি নিহিত। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের মাঝে জেগে ওঠা প্রলয়ংকারী আবেগকে হাতের মুঠ থেকে একটু একটু করে ছুটে যেতে অনূভব করায় তাবিব নিঃশব্দে, ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো! পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক থেকে আর কয়েক বছর বাদে মধ্য বয়সে প্রবেশ করবে সে অথচ মন গহীনের অবস্থাটা ঠিক এতোটাই বেসামাল উৎপীড়নে মত্ত যে নিজেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক, ছেলেমানুষ মনে হচ্ছে তাবিবের! তীব্র ভালোবাসার অনুভূতি বুঝি এমনই! সময়, বয়স, ভেদাভেদ কিংবা অবস্থান কোনকিছুকেই তোয়াক্কা করে না সে! শুধুমাত্র জানে এক অনবদ্য আবেগ, অনুভবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। একবারের জন্য হলেও নিয়মতান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ত যান্ত্রিক মানুষদের ভীষণ করে অনিয়ন্ত্রিত করে ছাড়ে!
ঠোঁট নামিয়ে ললাটের মধ্যভাগে স্নিগ্ধ স্পর্শ বুলালো তাবিব। অতঃপর শান্ত নজরে কিছুক্ষণ দেখলো পছন্দের চেহারাটিকে। কে জানে, ঘুম থেকে উঠলে আবার ঠিকমতো দেখতে পাবে কি না! কয়েক ঘন্টা আগে কাটানো সুখময় সময়গুলো মনে করে তো এউ শান্ত রমনীর উৎকণ্ঠিত হয়ে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে থাকার কথা। তখন তাবিব তো চেয়েও পারবে নত মুখটা উঁচু করতে। ওদিকে দেরীও হচ্ছে বেশ। নিজেকে বাগে আনলো তাবিব। তবে সুপ্ত এক রূপ আজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। জেগে উঠেছে দুষ্ট সুলভ মনোভাব৷ সিক্ত চুলগুলো তখনও ঠিকঠাক মোছা হয় নি। তাবিব ওভাবেই মাথাটা জোরে ঝাকালো। পরপর শীতল পানির ছটা গিয়ে পরলো নিবৃতার উষ্ণ, লালচে ত্বকের উপর। ওমনি বিকৃত হলো শান্ত ভ্রু যুগল। সরল মুখে ছড়ালো বিরক্তি। তাবিব আবারও হাসলো। এখন থেকে এই ছোট ছোট সুখানুভূতির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে ওকে। কারন এই খুশির উৎস মানবীটিকে তাবিব যে আর কোথাও যেতে দিবে না! বেঁধে রাখবে নিজের সাথে আজীবন!
খুব বেশিক্ষণ হয় নি তাদের ঘুমিয়ে পরার। বড়োজোর হয়তো দুই ঘন্টা। তাইতো অসন্তোষে নিবৃতার মুখটা আমসে হয়ে এলো। কোনমতে অক্ষী পল্লব টেনে টুনে মেলতেই উজ্জ্বল আলোয় চোখ দুটো জ্বলে উঠলো! কিন্তু সকল বিরক্তি সেই মুহুর্তেই নিরুদ্দেশ হলো যখন মাথায় কারও আদুরে হাতের বুলিয়ে দেওয়া টের পেলো।
– অসময়ে ঘুম ভাঙানোর জন্য দুঃখিত। কিন্তু কিছু করার নেই যে। আমাকে বের হতে হবে। বলেছিলাম না যে গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি আছে আজ।
অত্যন্ত নরম সেই কন্ঠস্বর। শ্রবনেন্দ্রীয়ে আরাম জাগানিয়া অনুভূতি। কিন্তু সহসা কিছু একটা খেয়ালে আসতেই নিবৃতা চট করে তাকালো। চেহারায় তটস্থতা। ওকে সবেগে উঠতে দেখে তাবিব সরে এলো কিঞ্চিৎ।
– আপনি তৈরী হতে থাকুন, আমি এখনই নাশতার ব্যবস্থা করে আসছি।
চোখে মুখে তার ব্যস্ততা। তাবিব ওর কাঁধে হাত রেখে থামালো। অভিব্যক্তিতে কি যে কোমলতা! আলতো করে নিবৃতার সরু নাকটা টেনে দিয়ে নিচু স্বরে বললো,
– বোকা!
বোকা বললেও নিবৃতা বুঝলো এবার। তড়িৎ চোখ বুঁজে নিলো লাজে! এতোটাই নির্বোধ সে! লালিমায় ছেয়ে যাওয়া তপ্ত গালে পরম আশ্লেষে আঙুল বোলালো তাবিব।
– হসপিটালে গিয়ে আগে মিটিংয়ে বসবো। সবকিছু কথাবার্তা বলে ঠিকটাক করে এরপর নাশতা করে নিবো। এতো চিন্তার কিছু নেই। বুঝলে?
মনের অন্দরমহলে চলা ঝড়কে সামাল দিয়ে মাথা ঝাকালো নিবৃতা। যার অর্থ বুঝেছে সে। তাবিব সন্তোষজনক হেসে সরে আসলো। এবার সত্যিই দেরী হয়ে যাচ্ছে! কোনমতে মাথাটা মুছে কাঁধ থেকে তোয়ালেটা নামিয়ে আগে গিয়ে ঝটপট শার্ট পরায় মনোযোগ দিলো সে। পরিপাটি করে তৈরী হতে হবে যে।
এদিকে ব্যস্ত তাবিবকে মনোনিবেশ সহকারে দেখে চলেছে তারই স্ত্রী। আজ সেই চক্ষু নজরে হায়ার অভাব বোধহয়। কেমন নিরন্তর চাহনি৷ পূর্বের সেই জড়তা বিলুপ্ত হওয়ার পথে বুঝি! লোকটাকে পরোখ করতে করতেই নিবৃতার ঠোঁটে হাসি ফুটলো। মনে পরলো, গত রজনীতে কাটানো বিশেষ মুহুর্তগুলো। পীড়ায় জড়ানো সেই স্মৃতি আজ বিলীন হয়েছে কারও অপার যত্নে। অতি বিশেষ মায়া ও বিশুদ্ধ প্রেমের পরশে। মনের মিল থাকলে বুঝি না বলা কথাগুলোও নীরবতায় তাদের মনোভাব লেনদেনের রাস্তা খুঁজে নেয়। তাবিব নামক মানুষটা হয়ে উঠেছে নিবৃতার একান্ত আপন ভরসাস্থল। যার জন্যই ওর সকল সংশয় প্রকাশ তার কাছেই গতকাল তাদের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। মানুষটার ধৈর্য নিবৃতাকে সাহস জুগায়৷ নিজের ভাঙাচোরা অবশিষ্টাংশকে জড়ো করে, সাজিয়ে গুছিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়ার আস্থা প্রদান করে। তাই তো এবার আর নিবৃতা পিছিয়ে যায় নি৷ সকল হীনমন্যতা কাটিয়ে নিজের স্বচ্ছ অনুভূতির প্রকাশ করেছে। আর ঐ অসাধারণ মানুষটা? পরম ভালেবাসায় সেগুলোকে স্বীয় মনিকোঠায় তুলে রেখেছে। আর নিবৃতাকে আগলে নিয়েছে আপন বক্ষমাঝে।
দৃশ্যপটে তখনও মুগ্ধতার রেশ কাটে নি। সময় কখন পালিয়েছে সেই খেয়ালও নেই৷ আচমকা সুদর্শন মুখটা কাছে নেমে এতেই হকচকালো সে। দেখলো, তাবিব ওর খসে পরা অগোছালো শাড়ির আচলটা আস্তে করে কাঁধের উপর তুলে দিচ্ছে। এতে ডাগর ডাগর আখিদ্বয় প্রকট হতেই তাবিব আবার হাসলো। আর সেই হাসিতেই অভ্যাস সুলভ জেঁকে ধরতে আসা তাবিবের সেই অপছন্দের জড়তাকে ঠেলেঠুলে দূরে সরালো নিবৃতা। তাবিবকে অবাক করে দিয়ে নিজেও পাল্টা হাসলো মিষ্টি করে! সর্বনাশ! তাবিবের এখানেই সর্বনাশ ঘটে গেলো৷ পারলো না নিজেকে আটকাতে। সেই উৎপল, ললিত মুখখানি এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই ওর। হতাশায় মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে এলো সহসা। পরপর মিয়ানো গালে মুখ দাবিয়ে চুমু খেলো।
– তোমার মাঝে যে কি ভীষন মায়া, আমার নিবেদিতা!
নিবৃতা আজ অক্ষি সংযোগ সরালো না। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখলো তাবিবের চকচক করা চাহনি। সেই নজরে প্রকাশ করা নিবৃতার প্রতি একান্ত তীব্র অনুরাগ। নিবৃতায় মজে থাকা মুগ্ধ সেই ভাবভঙ্গি। সবটাই দেখলো ও! এবং আফসোস হলো কেন এর আগে দেখলো না ও? তাবিব তো ওকে কেবল আজ থেকে ভালবাসে নি। উনি তো সেই আড়াই বছর আগে, হাজার হাজার ক্রোশ দূরে অবস্থান করেও নিবৃতার জন্য তার অনুভূতি জাহির করেছিল। তাহলে নিশ্চয়ই তখন থেকে সে ঠিক এভাবেই দেখে নিবৃতাকে! সেসব দেখা নিবৃতার ছুটে গেলো! এই ক্ষতির ভর্তুকি কিভাবে মিলবে?
ওর কোমল হাত দুটো উঠে এলো তাবিবের মুখ পানে। কোমলতা মিশিয়ে চোখের পাতা ছুঁয়ে দিয়ে বললো,
– আপনার চোখ দুটো না ভীষন সুন্দর!
একের পর এক পাওয়া চমকে তাবিবের অল্প তুষ্ট হওয়া মনটা অস্থির বেপরোয়া। ধেয়ে আসা প্রফুল্ল হাসিটা চাপা রেখে, ভ্রু নাচিয়ে বললো,
– হঠাৎ? কেন, এর আগে এই অধমের উপর আপনার দৃষ্টি পরে নি?
– পরেছে তো। কিন্তু সাহস হয় নি দেখার!
নিবৃতার সহজ সরল স্বীকারোক্তি। তাবিব ফের বললো,
– আজ তাহলে কি ভিন্ন?
– আপনি আমাকে সেই সাহসটা দিয়েছেন যে, তাই!
তাবিব অতিশয় প্রসন্ন হলো। ভরাট কন্ঠে বললো,
– এই সাহসটা আর কখনও হারাবে না তো?
– আপনি সাথে থাকলে হারানো তো দূর, উল্টো আরও বাড়বে!
শিশুসুলভ সেই স্বর। তাবিব স্বচ্ছ হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সরে আসলো। নিবৃতার পছন্দের সেই দু’চোখে কাঁচের চশমা এঁটে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিলো। এরপর এসে নিবৃতাকে কাঁধ পেঁচিয়ে দাঁড় করালো নিজের সাথে। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
– একা বাসায় ঘুমাতে পারবে?
সেটা হয়তো পারবে না নিবৃতা। মাথা নাড়িয়ে বললো,
– আর ঘুমাবো না।
– ঘুম হয় নি তো তোমার।
– সমস্যা নেই।
– আমি মিটিং শেষে সময় পেলে, তানহাকে দিয়ে যাবো বাসায়।
নিবৃতা চিন্তা নিয়ে বললো,
– না না। দরকার নেই। আপনি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েন। আমি গিয়ে নিয়ে আসবো ওকে।
– ঠিক তো?
– জ্বি, পারবো আমি।
– জানি তো, আমর নিবেদিতা এখন অনেক কিছুই পারে।
প্রশংসায় খুশিতে আটখানা হয়ে নিবৃতা নত মুখে হাসলো আবারও।
– আচ্ছা। আমার কিন্তু আসতে দেরী হতে পারে। খেয়ে নিয়ো তোমরা। অপেক্ষা করো না।
এ কথার জবাব দিলো না নিবৃতা। অপেক্ষা করতে না বললেই কি সে করবে না, না-কি? সেটা ওর ইচ্ছে!
নিবৃতার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো তাবিব। আজ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রপাচারের পাশাপাশি অন্য একটি কাজও রয়েছে। সময় যে সেখানেও নেই৷ আজ বাদে কাল এলেই সুযোগ হাত ছুটে পালাবে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে নিবৃতাকে না পেয়ে অনেকটাই অবাক হয়েছে তানহা৷ আম্মু তাকে এখানে, এভাবে একা রেখে চলে গেলো? বিষয়টা মানতেই পারছিল না ও। তবে মাঝে ওকে সামলানোর জন্য নিভান এসেছিল। বললো,
– তোমার বাবার গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি রয়েছে আজ। কিছু জিনিসপত্র খুঁজে পেতে নিবৃতার সাহায্য লাগতো। তাই জরুরি ভিত্তিতে নিবৃতাকে যেতে হয়েছে।
মিথ্যে বলে হলেও পরিস্থিতি শান্ত করাটাই মূখ্য ছিল। তানহাকে বুঝিয়ে পড়িয়ে নাশতা করিয়েছে নিভান। এরপর মেজাজ পরতেই, এখন সে ঘরে বসে বসে, নিভানের ল্যাপটপে ওর কানাডা থাকাকালীন নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর ছবি, ভিডিওগুলো দেখছিলো।
নিভানের কিছু কাজ রয়েছে। নতুন ঝামেলা এসে কাঁধে উঠেছে। সেটাকে এখন না নামানো অবদি নিস্তার নেই যে! ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজা খুলতেই পেছন থেকে ডাক ভেসে এলো।
– নিভান!
সেই স্বরটায় অদ্ভুত কাঠিন্যতা মিশে ছিল। নিভান পিছু ঘুরে দেখতেই মায়ের কঠোর মুখের সম্মুখীন হলো। শিউলির মতো শান্তশিষ্ট মানুষের মেজাজ চটে যাওয়া এতো সহজ নয়৷ তাহলে কি হলো? দরজাটা ওভাবেই খোলা রেখে নিভান এগিয়ে এলো।
– কি হয়েছে মা?
শিউলির বুক ভেঙে কান্না আসতে চাইছে। যখনই মনে করেন তার পরিবার এখন মসৃণ পথে চলছে, সন্তান দুটো ভালো আছে তখনই এক ধাক্কা চলে আসে। এই বয়সে এসেও ছেলেমেয়েদের দিশাহীন জীবন দেখতে আর ভালো লাগছে না। একটু আগে চেনা এক নম্বর থেকে কল এসেছিল। মানুষটা তার বেয়াই হন। রত্নার বাবা। তবে সেই সম্মানিত সম্পর্কে আজ ফাটল ধরেছে। ভদ্রলোকের চেহারা থেকে শালীনতার মুখোশ খসে বেরিয়ে পরেছে ভয়ংকর নোংরা রূপ। কথাবার্তায় তার কেমন ঝাঝ এবং দাপট! তার ছেলেকে নিয়ে করার নানান কুরুচি সম্পন্ন মন্তব্য এবং সভ্য সমাজে এরূপ নিচ শব্দের ব্যবহার শিউলিকে মুক বানিয়ে ছেড়েছে। ক্রন্দনরত মুখে চেয়ারে বসে পরেন শিউলি। মা’কে হঠাৎ এভাবে কাঁদতে দেখে অবাক হয় নিভান। তড়িৎ অস্থির হয়ে বলে,
– কি হয়েছে মা? এভাবে কাঁদছো কেন?
শিউলি চুপচাপ তার মোবাইল এগিয়ে দিলেন। কল রেকর্ডিং চালু করা তার মোবাইলে। কারও সাথে কথা বললে সেগুলো আপনা আপনিই জমায়েত হয়ে থাকে মোবাইলে। নিভান ভ্রু কুঁচকে মোবাইল হাতে নিলো। অডিও প্লেয়ার চালু করতেই, একের পর এক যা ঢ়া শুনতে পেলো এতে ওর তীক্ষ্ণ ধারালো চোয়াল পাথুরে শক্ত হয়ো এলো। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধে চোখের সফেদ অংশ লাল হয়ে গেলো। হাত হলো মুষ্টিবদ্ধ!
নীরব ফারুকি এবং শিউলি রহমানের মতোন দুজন শান্ত নরম মানুষের মতো দম্পতির সন্তান নিভান, অথচ তার মেজাজ যেন বারুদের মতো তপ্ত সর্বক্ষণ! সে দাঁত খিঁচিয়ে বললো,
– জা*********! এতো বড় সাহস আমার মায়ের সাথে এভাবে কথা বলে! আমি ওর জ্বিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো। ও আমাকে চিনে না ******!
শিউলি তৎক্ষনাৎ ওর হাত খামচে ধরলেন।
– এই বেয়াদব! মুখ সামলা! তোর শশুড় হয়। এসব কি বলছিস!
– তুমিও তো আমার মা হও। সেই সম্মান সে রেখেছে?
– আর তুই? তুই কি কাজ করে এসেছিস হ্যা? তুই কিভাবে পারলি রত্নাকে তালাক দিতে?
নিভান মুখ ঘুরিয়ে নিলো। রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না ও। চোয়াল চিবিয়ে বললো,
– মুখ দিয়ে তালাক দিয়েছি। হয়েছে?
– চুপ বেয়াদব!
শিউলি হাহাকার করে উঠেন। ছেলেটা দূরে থেকে কি তাহলে উল্টো বিগড়ে গেলো? নীরবের প্রচেষ্টা তবে ব্যর্থ হলো কি? উনি ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলেন।
নিভান মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকলো। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা ওর জীবনে এসেছে কি না জানা নেই। আজ ওর কারনে মা’কে এসব শুনতে হলো। নিভানের কান যেন আগুনে পোড়া তাপে জ্বলছে। মা’য়ের অপমান ও ভুলতে পারছে না।
– একটা সম্পর্ক শেষ করে দেওয়া এতো সহজ না বাবা। এতো সহজ না।
নিভান ক্লান্ত নজরে তাকালো মায়ের দিকে। পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে চুপচাপ বসলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
– তাহলে ভালো থাকা এতো কঠিন কেন মা?
স্বরটা কেমন অসহায়, কাতর শোনালো। শিউলি অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে দেখেন ছেলের ভঙ্গুর মুখটা।
– জীবনে মানসিক শান্তিটাই তো চেয়েছিলাম মা। বিয়ে তো আমি করতে চাই নি৷ তোমার জোরজবরদস্তিতে করলাম। এবং তোমার এই চাওয়ার মান রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমি করেছি। কিন্তু দিনশেষে আমিও মানুষ৷ আমার দ্বারা ভুল হবে। আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পরবো এটা কি স্বাভাবিক না? যেখানে এতো ছোট একটা পরিবার আমার। সেই অল্পকেও যদি কেউ প্রতিনিয়ত বিভক্ত করতে চায়, অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে আমার কি করা উচিত?
রত্নার সাথে এতো বছর থেকেছেন শিউলি। উনি জানেন ছেলের বৌ তার কেমন৷ কিন্তু বিষয়টা এতো গুরুতর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল সেই আন্দাজ উনি করতে পারেন নি মোটেও।
– তাই বলে, মা বোনের জন্য বৌকে ছাড়বি? নিবুর তো নিজের পরিবার আছে এখম। আমারও বয়স হয়েছে৷ ক’দিন হায়াত আছে তার ঠিক নেই। তুই কেন রত্নাকে তালাক দিলি? মা’কে একবার বলার প্রয়োজন মনে করিস নি? এতেটাই তুচ্ছ আমি?
নিভানের মাথা নিচু হয়ে এলো। পরাজিত স্বরে বললো,
– আমি আমার আব্বুর রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করার জন্য যা যা করার সব করবো। এতে কার কি এসে যায় এতে আমার কিচ্ছু দেখার বিষয় না। আর, নিবুর নতুন পরিবার হলেও আমরা থাকবো ওর পাশে। আমাদের উপর ওর অধিকার এতে কোন অংশে কমে যায় নি। আব্বু নেই সাথে। তোমার নেক হায়াতের জন্য দোয়া করি আমি সবসময়। তোমার বৃদ্ধা হাত ধরে আমি সোয়াব কামিয়ে গুনাহ মাফের চিন্তায় আছি। তাই উল্টো পাল্টা কিছু বলবে না, বলে দিলাম।
ছেলের কথায় শিউলির মাতৃ হৃদয়টা ভরে এলো। কাঁপা কাঁপা হাতটা নিভানের মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বলেন,
– তাই বলে নিজের জীবনটা এভাবে নষ্ট করবি?
– আমি ভালো থাকতে চাই মা। রব না চাইলে এ জীবনে আর কোন কষ্ট নয়। এবার আমার যা মন চাইবে আমি তাই করবো, সুখে থাকবো। এখন সে পথে কাঁটা থাকলে সেগুলো সরানোর ব্যবস্থাও নিবো। কিছু কিছু সম্পর্কের সমাপ্তি আমাদের স্বস্তি দেয়। মা সবসময় সন্তানের ভালোটাই চান। সেভাবে তুমিও চেয়েছিলে ছেলের সুখ। কিন্তু রত্না সেই সুখের সিঁড়ি নয়৷ উল্টো আমাকে দুঃখের চোরাবালিতে শ্বাসরোধ করে শেষ করে দিতে চাচ্ছিলো। আমরা অনেক কিছুই আশা করি কিন্তু শেষে গিয়ে ভাগ্যে যেটা থাকে সেটাই হয়। সংসার সবার জন্য নয় মা। পৃথিবীতে নানান ভিন্নতা রয়েছে এবং হয়তো আমিও তাদের একজন। তুমি দয়া করে এবার আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
ছেলের কথার প্রেক্ষিতে শিউলি চুপ হয়ে গেলেন। বলার মতোন কিছু খুঁজে পেলেন না। অসহায়ত্ব ঘিরে নিলো তাকে। ক্লান্ত হাতে চোখের পানি মুছতেই দরজায় নজর পরলো। সেখানে স্তম্ভিতের ন্যায় জড়োসড়ো হয়ে নিবৃতা দাঁড়িয়ে আছে। অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট যে, এতক্ষণে এখানে ঘটা সবকিছুই ও শুনেছে।
ধরনীতে আঁধার নেমেছে বহুক্ষণ আগেই। এখন একটু একটু করে রাতের গহন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কিছু কিছু ল্যাম্পোস্টের আলোও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে৷ পাশাপাশি দালানগুলোতে কর্মরত দারোয়ানরা একত্রিত হয়ে কথাবার্তা বলছে। তাদের এই আড্ডা নতুন কিছু নয়। সারাদিনের অলস সময় ব্যয় করতে এ পন্থাই অবলম্বন করে তারা। আলাপচারিতার বিষয়বস্তু একেকদিন থাকে একেক রকম।
আলো আধারির মিশেলে উদ্ভাসিত রাস্তার শেষ মাথায় হঠাৎই এক লম্বাটে ছায়া পরলো। শেষ এই প্রান্তে থাকা ভাঙাচোরা ইটের তৈরী নড়বড়ে প্রাচীরের উপরে দাঁড়িয়ে সেটি। সম্মুখেই হলদেটে রঙের একটি দালান। এটিই এ রাস্তার শেষ বাড়ি। এরপর এই প্রাচীরটার মাধ্যমেই এই গলি সমাপ্ত হয়েছে। এই টানা প্রাচীর দেওয়ালের পিছে পরিত্যক্ত এক জমি। এখনও কনস্ট্রাকশনেী কাজ শুরু হয় নি সেখানে।
তাই মানুষজনের নিত্যদিনের ময়লা আবর্জনা ফেলার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় সেটি। ছায়াটি সে দূর্গম পথেই এখানে উঠে এসেছে। এখন, এখান থেকে প্রায় দশ হাতের মতো দুরত্বে, উল্টো ঘুরে দু’জন দারোয়ান কথা বলায় মত্ত। তাদের হাতে জ্বলছে বিষাক্ত শলাকা। ছায়াটি কাল বিলম্ব না করে, পাশেই থাকা বড় কাঁঠাল গাছটির ক্রমশ ঢালু হয়ে নামা কান্ডে, খুবই সাবধানে পা দিয়ে, নিজের আশ্রয় বুঝে নিলো। অতঃপর নিঃশব্দে, খুবই ধীর গতিতে নেমে আসে নিচে। একবার কারও নজরে পরে গেলে সকল পরিশ্রম বৃথা! মাটিতে পা পরতেই চোখের পলকে লম্বা এক পিলারের পেছনে লুকিয়ে পরলো সে। যখন বুঝলো মানুষ দুটোর মনোযোগ এখানে আসার সম্ভাবনা নেই, ওমনি চট করে ঢুকে গেলো হলদে রঙের বাড়িটির ভেতরে। গ্যারেজটির আকার মাঝারি ধরনের। এরই মাঝে এক পাশে দারোয়ানের খাট বিছানো। মাথার উপর নিম্ন ভোল্টেজের আলো জ্বলছে। চারপাশে একবার জহুরি নজর বুলিয়ে নিলো সে। পরপর চলে গেলো সিঁড়ির দিকে। গন্তব্য তিন তলা।
ব্যবসায়িক কাজে আবারও ঢাকা আসতে হয়েছে তাকে। বয়স বাড়ছে দিন দিন। শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। তবুও সব কাজ নিজ হাতেই সামলাতে হয়। ছেলে তার বড়ই অকর্মন্য। কোন দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে না সে। পারলে উল্টো বাবার ব্যবসায় লাল বাতি জ্বালায়। এরজন্য অতিষ্ঠ হয়ে এই বয়সে এসেও তাকে অবিরত কাজ করে যেতে হচ্ছে। সবেমাত্র, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আরামদায়ক বিছানায় পীঠ ঠেকেছিল, ওমনি কলিং বেল বাজলো। এ সময়ে কারও আগমনের সম্ভাবনায় সে অবাক হলো। কে আসতে পারে এখানে? পরিচিত কেউ তো এখানকার ঠিকানা চেনে না! ভ্রু কুঁচকে এলো তার।
বিছানা থেকে নেমে এলো তখনই৷ এক হাতে কোনমতে পরনের পাঞ্জাবি টেনে পরিপাটি করে নিলো৷ একটু আগেই প্রোস্থেটিক হাতটা খুলে রাখা হয়েছে। এখন সেটা আবার পরা অত্যন্ত ঝামেলার। তাই চেয়ারে থাকা পাতলা চাদরটা তুলে নিলো নিজের গায়ে৷ এখন আর এটা সামলাতে কষ্ট হয় না৷ দীর্ঘ সময়ে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। বরঞ্চ কেউ যদি তার আরেক হাতা ওভাবে খালি ঝুলে থাকতে দেখে এতেই তার বেশি অস্বস্তি হয়। নিজেকে ঠিক করে এগোনোর পথে আবারও বেলের আওয়াজ এলো। তবে দু’বারই খুব ক্ষীণ শব্দে বাজানো হয়েছে সেটি। আগন্তুকের তাড়া থাকলেও তাকে ভদ্র মনে হলো। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সামান্য উঁচু কন্ঠে প্রশ্ন করলো সে,
– কে?
– আমি!
ভারি পুরুষালি স্বর। চিনতে পারলো না সে। বেশি কিছু চিন্তা ভাবনায় এলোও না। দারোয়ানও হতে পারে। সে ছিটকিনি নামিয়ে দিলো। পরপর দরজা খুলতেই সম্মুখে দেখা গেলো এক লম্বাটে গড়নের পুরুষ অবয়ব। কালো প্যান্ট, কালো জ্যাকেট, মুখে কালো মাস্ক, চোখ দু’টো কালো মোটা চশমার আড়ালে ঢাকা, মাথায় ক্যাপ। পীঠে একটি ব্যাকপ্যাক ঝোলানো। এবং আশ্চর্যজনকভাবে তার দু’হাতেই গ্লাভস পরা। লোকটি অবাক হলেন বেশ। সাথে কোন এক দুর্ভেদ্য কারণে হঠাৎই তার ভয়ও লাগতে শুরু করলো। কোনমতে নিজের হাতটা দরজায় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, অস্ফুটে বলে উঠলো,
নিবৃতা পর্ব ৩৪
– কে তুমি?
– তোর যম!
