Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ১

নীতিহীন রাজ পর্ব ১

নীতিহীন রাজ পর্ব ১
আশিকা আক্তার সোহাগী

গলগল করে রক্ত ঝরা হাত নিয়েই নীলুর ডান হাত চেপে ধরলো তারই বাবার সেক্রেটারি রুপক মণ্ডল। টানতে টানতে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনে। মোটা আম গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো স্বল্পরিচিত এক যুবক। সেই যুবকের হাতে নীলুকে সোপর্দ করে কাতর কণ্ঠে বলল,
‘তোদের ধর্মে না আমানতের অনেক গুরুত্ব। আজ থেকে নীলুকে তোর কাছে আমানত রাখলাম।’
এরপর ব্যথাতুর চোখে নীলুর দিকে তাকিয়ে বলল ,

‘পেছনে তাকাবি না। অনেক অনেক দূরে চলে যাবি। আমি ঠিক খুঁজে নেব তোদের।’
নীলুফা ইয়াসমিন তার হাত খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বলে ওঠে,
‘রুপকদা আব্বা আম্মারে ওরা জবাই করে ফেলছে গো। আমারেও মারতে দাও। আমি বেঁচে থেকে কী করব?আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবো না। আমার সুখকে এনে দাও অনন্ত?’
বলেই পা জড়িয়ে ধরল।
‘ভেতরে কী অবস্থা আমি জানি না। তুই দ্রুত চলে যা। আমি আবার ভেতরে ঢুকব।’
বলে রুপক বাড়ির দিকে পা বাড়াল কিন্তু আবার টেনে ধরল নীলু।
‘রুপকদা তোমার হাত তো বলি হয়ে গেছে?’
বলে নিজের গায়ের ওড়না দিয়ে বেঁধে দিলো শক্ত করে। তীব্র ব্যথায় চোখ মুখ কুচঁকে ফেলে রুপক। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল ,
‘আবার দেখা হবে নিলু।’

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বিশ বছর পর
টিনের দরজা ঠেলে কোমরে বেল্ট পড়তে পড়তে বের হল উনত্রিশ বছর বয়সী এক শক্তপোক্ত শ্যামপুরুষ। প্যান্টে বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে “মক্কু! আমার বোতল।” বলে চিল্লিয়ে উঠে।
পাশের ঘর থেকে হ্যাংলা পাতলা এক যুবক বের হল কাচের একটা হাফ লিটারের ধূসর রঙের তরল নিয়ে।দাঁত দিয়ে কামড়ে বোতলের ছিপি খুলে থু করে মাটিতে ফেলে দিলো। প্রথমে মুখে নিয়ে কুলি করলো তারপর ঢকঢক করে পুরোটাই খেয়ে ফেলে বোতল মক্কুর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে,
‘মালটারে ফুরানোর চেয়ে পাচঁশো কম দিবি।অরিজিনাল একটা স্লাট। আই হেইড দোজ কাইন্ড অফ উইমেন। থু! হাসপাতালে পাঠানো লাগলে পাঠাইস। আর হাসপাতাল থেকে সোজা হাপিস’
এরপর চোখ আর মাথা ঝাকিয়ে বাইকে উঠে বসে।মক্কু এক ছুটে ভেতরে ঢুকে আবার পরের মিনিটেই পেছন পেছন এসে চড়ে বসল বাইকে।মাঝখানে ফাঁকা রেখে বসে যেন গায়ে না লাগে ।সাঁই সাঁই করে ছুটে চলল মোটর বাইক বাতাসের বেগে।

দাঁতে দাঁত চেপে মক্কু বাতাসের সাথে লড়ে খিচে বসে রইল।না সহ্য করে উপায় কি জলে কুমির ,ডাঙ্গায় বাঘ। এই এলাকার কোন যুবক বাদ নেই যাকে রাজনীতিতে জড়ানো হয়নি। ছেলে সন্তান মানেই ক্ষমতাসীন দলের খাতায় নাম উঠানো। প্রাণের ভয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সেটা করতে হয়।
সবাই যে আবার বিরুদ্ধে সেটাও না। ক্ষমতাসীনরা বিপুল জনপ্রিয় এই এলাকায়।স্থানীয় চেয়ারম্যান আলহাজ মামুন ইসলাম অত্যাধিক ভালো মানুষ। উনার মতো পরোপকারী , ধর্মভীরু , পরহেজগার মানুষ দ্বিতীয়টি নেই।কোন মানুষই উনার কাছে গেলে খালি হাতে ফিরে না।

তবে উনার পুত্র সুখনীল নিবিড়ের সুশীল সমাজে খুব বদনাম। সবাই জানে এমন কোন খারাপ কাজ নেই যা সে করে না। নিত্যনতুন নারীসঙ্গ , মদ , জুয়া , মারামারি সব হয় তার দ্বারা। তবে এলাকার যুব সমাজে সে অন্তপ্রাণ। নিবিড় ভাই নামের এক ডাকে কয়েক হাজার ছেলেপেলে জমা হয়ে যায়।
চেয়ারম্যান সাহেব জানেন না উনার এই উশৃঙ্খল ছেলের কর্মকাণ্ড। তবে জানলেও হাতের নাগালে পাবেন না তাকে। এই যে বছরের পর বছর উনি ক্ষমতায় টিকে আছেন সেটা একমাত্র নিবিড়ের জন্যই।তাছাড়া নূর জাহান মহল থেকে যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক এই সুখনীল নিবিড়।অধিক অর্থসুখে হয়তো বেপরোয়া জীবন যাপন করে এই তরুন নেতা।

মুখে কালো মাস্ক ,মাথায় সানক্যাপ ,চোখে সান প্রোটেক্টর সাদাগ্লাস ,যেটা সূর্যের আলোতে কালো হয়ে যায়। বয়কাট চুল ,ওভারসাইজ কালো শার্ট হাটুর একটু উপর পর্যন্ত ,ডেনিম জিন্স,পায়ে স্নিকার্স আর হাতে কালো হাফ গ্লাভস পরে বাইসাইকেল চালিয়ে ভার্সিটিতে প্রবেশ করলো জিয়ানা হক।
আপাতত দৃষ্টিতে কেউ বুঝবে না ছেলে না মেয়ে। হাইটও পাঁচফুট পাঁচ। ভার্সিটির এন্ট্রির একটু আগেই নিবিড়ের ক্লাবঘর। সেটার পাশে করিম চাচার চায়ের টং দোকান। এই দোকানে চা জাতীয় চা। মানে সবার জন্য উন্মুক্ত যারা নিবিড়েএ চ্যালা।জিয়ানা সাঁই সাঁই করে ঢুকে যাওয়াই চ্যালাগুলো হকচকিয়ে গেলো। নিবিড় ছাড়া এইভাবে তাদের ক্লাবঘরের সামনে দিয়ে এমন গতিতে কেউ চলাচল করে না।তাই তাদের সম্মানে লাগলো ব্যাপারটা।
‘নিবিড় ভাই এখানে নাই, তানাহলে কান বরাবর একটা চটকানা ফরজ ছিলো এই পোলার। ”
বলে সিগারেটে লম্বাটান দিলো নিবিড়ের ডান হাত কম বন্ধু বেশি সজিব।
‘পোলা না মাইয়া আমি তো কিছুই বুঝলাম না মাইরি।
বলে বদি চোখ কচলায়।’
‘যাই হোক নতুন আমদানী ,এলাকার নিয়মশৃঙ্খলা কিছু জানে না হয়তো।আমগোর দায়িত্ব নিয়ে শিখাতে হবে।চল।’
বলে উঠে দাঁড়ায় সজিব। তখনই ফোনে কল আসে তার ফোনে। রিসিভ করে বললো “আসতাছি ভাই।”

জিয়ানা সাইকেল পার্ক করে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট খুঁজে চলেছে। সে এই ভার্সিটিতে দ্বিতীয়বর্ষের ট্রান্সফার নিউ স্টুডেন্ট। তার আম্মু গার্লস কলেজের শিক্ষিকা। উনার বদলি হওয়াই সহপরিবার এই এলাকায় শিফট হয়েছে। তবে বড় বোন জেনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল ইয়ারে পড়ে এই ভার্সিটিতেই। জিয়ানা ফোন বের করে কল দিলো জেনিকে। কিছুটা দূরে একটা জটলা দেখে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল সেই দিকে। কালচারাল ক্লাবের কিছু মেয়ে আর কমন জেন্ডার কয়েকজন ব্যানারে সম অধিকার লিখে অনশনে বসেছে।

সে পর্যন্ত ঠিকই ছিলো কিন্তু তাদের সামনে একটা কাবলি কুর্তা পরা লোক চেয়ারে বসে কায়দা করে স্টাইল দেখিয়ে শর্মা খাচ্ছে। জিয়ানা মুখকুচকে সেই কাবলিওয়ালাকে দেখছে। মনে হচ্ছে সিনেমার ভিলেনের দৃশ্যে অভিনয় করার জন্য এমন গুন্ডা মেকাপ দিয়েছে। ওরে বাপরে বেটা আবার সুরমাও দিয়েছে।
জেল দিয়ে ঘাড় সমান লম্বা চুল ব্যাক ব্রাশ করা। কাবলির উপরের তিনটা বোতাম হা করে খোলা আর সেই ফাঁক দিয়ে বুকের ঘন জঙ্গল উঁকিঝুকি দিচ্ছে। হাতে আবার ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি। দামি মাস্তান তাহলে।চাপদাড়ি রেখে নিজেকে ট্রেন্ডি ফর্মে রেখেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মাঝে কাবলিওয়ালা খাওয়া শেষ করলো।খাওয়া শেষে আঙুল মেলে ধরার সাথে সাথে পাশ থেকে একজন এগিয়ে এসে হাত মুছে দেয়,আরেকজন পানি এগিয়ে দেয়।জিয়ানার হাসি পেলো এমন দৃশ্য দেখে। মনে হচ্ছে নাট্যমঞ্চে ঢুকে গেছে। সিরিয়াস মুখে সব শুটিং চলছে।

কাবলিওয়ালা মুখ খুললো, ‘‘তো সবাই সম অধিকার চাও?ভালো কথা।তারজন্য প্রিন্সিপালের অফিসে তালা ঝুলানোর আস্পর্ধা কীভাবে হল?কে কে কোন হাত দিয়ে তালা লাগিয়েছ সামনে আসো?’
সাইড থেকে এক সাঙ্গু হুংকার ছাড়লো ,’কথা কানে যায় না? ভাই সামনে আইতে কইছে না? ‘
মাঝের আর পেছন থেকে দুইজন উঠে এলো। একজন ছেলে একজন মেয়ে।তাদের ভীতিকর চেহারা দেখেও জিয়ানার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। একজন নেতাকে ফেস করতে পারছে না ,আবার এরা করবে অনশন অবরোধ ,যত্তসব। তো আরেক পাঙ্গু এসে দুইজনকে কাবলিওয়ালার সামনে বসিয়ে দিলো।
‘সম অধিকার আমরাও চাই। তবে কোথাও সম আর কোথাও অসম। সৃষ্টিকর্তা নিজেই কম বেশি করে নারীপুরুষ বানিয়েছেন , সেখানে সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব না। তোমরা যেহেতু বেশি চাচ্ছো আজ আমি তোমাদের সম অধিকার ঘোষণা করলাম।’

কাবলিওয়ালার ভাষণে সাঙ্গুপাঙ্গু সব হাত তালি দিয়ে উঠলো। নেতা ভাই হাত তুলে থামতে বলা মাত্রই সব নিরবও হয়ে যায়।
‘তো আজ এই মুহূর্ত থেকেই সম অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক। দুইজন দুইজনের ড্রেস এক্সচেইঞ্জ কর। কুইক। সময় পাঁচ মিনিট।’
সাঙ্গুপাঙুরা হৈ হৈ করে উঠলো। অনশন কারী সবাই ভয় আর বেক্কেলের সংমিশ্রণে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়েই আছে।এইবার কাবলিওয়ালার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়ে প্রকান্ড এক ধমক দিলো। ধমক খেয়ে ছেলে অনশনকারী বলল,
‘ভাই ওর ড্রেস পড়লে তো আমাকে হাস্যকর লাগবে।’

‘মেয়েদের ড্রেস পড়লে যদি ছেলেদের হাস্যকরই লাগে তাহলে সম অধিকার চাওয়াটাও হাস্যকর।’
বলে হঠাৎ চোখ গেলো ভীড়ে দাঁড়ানো জিয়ানার দিকে। আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলল , ‘মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরলে হাস্যকর না লাগলেও সুন্দর লাগে না। এরা ছেলেদের কাতারে আসার জন্য নিজের ঘোল পাল্টায়। কিন্তু ছেলেদের কাতারের মেয়েরা কখনই আসতে পারবে না।কারণ এদের অবস্থা সবসময় ছেলেদের নিচেই।’
এতক্ষণ এদের কান্ডকারখানা দেখতে জিয়ানার ভালো লাগলেও এইবার অপমানে মুখ থমথমে হয়ে গেল।আর বলে উঠল,

‘দুনিয়াতে পুরুষরা নিজেদের যত বড় বাহাদুর কিংবা শাহেন শাহ ভাবুক না কেনো সকল পুরুষের জান্নাত একজন নারীর পদতলে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা মিষ্টার কাবলিওয়ালা?’
সবার চোখ জিয়ানার দিকে ঘুরে যায়।সাথে অবাকও হয়েছে নিবিড়ের মুখে মুখে তর্ক করছে কেউ ,এই যেনো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। নিবিড় নিজেও অবাক। সাথে তার সাঙ্গুপাঙ্গুরাও চেতে গেল।হঠাৎ জিয়ানার হাতে টান পড়ে।জেনি টেনে নিয়ে সরে গেল একসাইডে।
‘ক্যাম্পাসে এসে না এসেই শুরু করেছিস তুই জিয়ু? আব্বু বলেছে না কোন ঝামেলায় না জড়াতে? এটা ঢাকা না। এখানে ক্যম্পাস আর ভিলেজ পলিটিক্স খুবই নোংরা। আর নিবিড়কে দেখলে সালাম দিয়ে কেটে পড়বি।’
‘ওয়েট ,ওয়েট কোন নিবিড়? তোমার বয়ফ্রেন্ড যার চামচা সে?’
‘আহা চামচা হবে কেন? ওরা ফ্রেন্ড। আর সজিবের সাথে রিলেশনে আছি বলেই সেইফ আছি এই ক্যাম্পাসে । নাহলে এদের হানি ট্র‍্যাপের অভাব নাই। যাইহোক আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। সবাই নিবিড়ের চরিত্র ভালো না। কানাঘুঁষা চলে,ক্যাম্পাসের অধিকাংশ মেয়ের সাথে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড হয়েছে। স্থানীয় ইউপির চেয়ারম্যান পুত্র দেখে মেয়েদের হুশ থাকে না।’

‘ছি কেমন লো ক্লাস টেস্ট এই ক্যাম্পাসের মেয়েদের। এমন ভিলেন মার্কা চেহারার কাউকে মনে ধরে কারো?’
‘বসে আছে দেখে বুঝিস নাই। হাইট আর বডি একেবারে হলিউড হিরো। আর ইন্সট্রা তে যে ফটো দেয় ,মেয়েরা ওইখানেই এমনিতেই খুন। আর চাল চলন থেকে কথা বলার স্টাইল খুবই ম্যানলি।প্রথম দিকে আমিও ক্রাশ খেয়েছিলাম।সেসব থাক।এখন চল তোর ডিপার্টমেন্টে দিয়ে আসি। আব্বুর কথা মনে আছে না? নো ঝামেলায় জড়ানো।’বলে ক্যপটা ঠিক করে হাটা ধরলো জেনি আর জিয়ানা।
অনশন পন্ড করে নিবিড় আর তার দল ক্লাবে বসে চা খাচ্ছে ,তখন বদী প্রশ্ন করলো
‘ভাই ওইটা যে মাইয়া বুঝলেন কেমনে? আবার বেয়াদবের একসেড়।’
নিবিড় চায়ের কাপ নামিয়ে বলল ‘মেধা আর শরীর কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না।’

নীতিহীন রাজ পর্ব ২