Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৩২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩২
আশিকা আক্তার সোহাগী

“সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না।তেমন সব উত্তরে আবার সন্তুষ্টিও আসে না।এরজন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে “চুপ করে থাকা”
তবে চাইলেও কিছু মানুষকে কখনোই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। নিবিড়ও পারলো না জিয়ানার সকল প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে।তার গাটস নেই এই মেয়েকে এড়িয়ে যাওয়ার। অদ্ভুত রকম হিপনোটাইজ করে ফেলে যেনো নিবিড়কে।যে নিবিড় শিকারী চিতার মতো সকল মানুষের চোখের মনির দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে কথা বলে।আর মেপে নেয় অপজিটের ব্যাক্তির কথার গ্রহনযোগ্যতা ঠিক কতখানি। কিন্তু সে জিয়ানার সাথে এই কাজ করতে পারে না।চোখ এক মিনিট স্থির থাকলে হার্টে ব্লাড সার্কুলেশন বেড়ে যায়।মস্তিস্কের নিউরনের আন্দোলন শুরু হয়।জেনে বুঝে নিজের বিপদ নিবিড় নিজের ঘাড়ে উঠিয়েছে।যে ছিলো পিছুটানহীন ছন্নছাড়া ,বাধনহারা।সেই তাকে এখন কোন কিছু প্ল্যান করলে আগে জিয়ানাকে নিয়ে ভাবতে হয়।তার নিরাপত্তা আগে মাথায় ঘুরাফিরা করে।

-রাজনীতিতে সবচেয়ে ভালো মানুষটাও অর্জিনাল শু*য়রের বাচ্চা।
ঝুকে থাকা জিয়ানার টি-শার্টের কলার আঘাতপ্রাপ্ত হাত দিয়ে টেনে ধরে আর একটু কাছে এনে জিজ্ঞেস করলো নিবিড়।
জিয়ানা নিবিড়ের ব্যান্ডেজের উপর শক্ত করে চেপে ধরে।সদ্য শুভ্র ব্যান্ডেজে চাপের ফলে সাদা থেকে রঙিন হওয়া শুরু হয়।সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে জিজ্ঞেস করে ,
-তাহলে আপনিও শু*য়রের বাচ্চা?
-হ্যাঁ জাত শু*য়র বলতে পারো। আই ওন্ট টেক ইট টু হার্ট।
বলার পর চোখ গেলো টি-শার্ট টানার ফলে উন্মুক্ত গলার বিউটি বোনের নিচে কালো কুচকুচে তিলটার দিকে।সকালে জিয়ানার ড্রেস চেইঞ্জের সময় এই ছোট্ট স্পটটাকে দেখে নিবিড়ের দুনিয়া টলে উঠেছিলো।স্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো কয়েক মিনিট।ঘোর কাটার পর তাকিয়ে দেখে সামনে কেউ নেই।এখন আবার সেই সর্বনাশা জিনিস সামনে পড়েছে।
সৃষ্টিকর্তা বড় বড় জালেমদের ধ্বংস করতে ছোট ছোট প্রাণীকে সৃষ্টি করেছে। ঠিক তেমনই নিবিড়ের এত বছরের গড়া পুরুষত্বের ভিত্তি কে নাড়িয়ে দিয়েছে ছোট একটা কালো তিল? এযেনো অতি আশ্চর্যজনক ব্যাপার। সাথে হাস্যকর বটে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সমাবেশ শুরু করার আগে নিবিড় যখন ক্লাবে ড্রেস বদলানোর জন্য নিজের বক্ষদেশ উন্মুক্ত করে। পাশের টেবিল হতে একটা কালো মার্কার নিয়ে জিয়ানার মতো সেখানেই নিজের শরীরে একটা ফেইক তিল বানায়।কিন্তু কই জিয়ানার শরীরের মতো মোহনীয় লাগেনি।বরং মনে হয়েছে অতি জঘন্য।
নিবিড় নিজেই স্তম্ভিত হয়েছিলো নিজের বোকা কর্মে। প্রেমে পড়লে মেয়ে মানুষ হয় বোকা আর পুরুষ হয় বাচ্চা।প্রেমের তীব্রতা যত বেশি বোকামি আর বাচ্চামি ঠিক ততটাই বেশি।
নিবিড় মনোযোগ সেই ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে সরিয়ে কোনভাবেই বক্তবের স্ক্রিপ্টে মন বসাতে পারেনি। বারবার সে ছোট বিন্দুতে মন প্রাণ পড়েছিলো। মস্তিস্কের নিউরনের ছুটাছুটি ছিলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুতগামী। মাখনরঙা শরীরের সেই ছোট্ট বিন্দুর এত ক্ষমতা ভেবে নিজের গলা শুকিয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। কখনো ভাগে পেলে সেই তিলকে কে যে কড়া শাস্তি দিবে সেটাও ঠিক করে রেখেছে মনে মনে।
নিবিড়ের নজর কোন দিকে সেটা বুঝে জিয়ানা টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

-আপনার নজর তাহলে শেষমেষ নিচে নেমেছে বলুন?
জিয়ানার কথায় ধ্যান ছুটে নিবিড়ের।চোখ ঘুরিয়ে অহেতুক গলা খাকি দেয়ার চেষ্টা করে।কোন উত্তর তার আপাতত জানা নেই। তবুও বলে,
-বউ হও তুমি আমার।ট্যাক্স দিয়ে নিশ্চয় দেখা লাগবে না? তাছাড়া নিজেই তো আমার সামনে আজ উন্মুক্ত করে দেখার সুযোগ দিয়েছো।
-ওইটুকুই সারাজীবন মনে করে বেঁচে থাকুন।জিয়ানা অত সস্তা না।তখন কোন কথা বলতে ইচ্ছা হয়নি বিধায় ওইভাবে টেকনিকালি ড্রেস বদলিয়েছি।আর একটা কথা।আমাকে জোর করে গাড়িতে না আটকিয়ে রাখলে আমি ঘুনাক্ষরেও টের পেতাম না আপনার প্ল্যান এইসব।

-কি টের পেলে শুনি?
-ওই যে বললাম নিজের নাক কেটে অন্যের রথযাত্রা ভঙ্গ। আপনি আগে থেকেই সব প্ল্যান করে রেখেছিলেন।তাই আমাকে নিরাপত্তা দিতে আগেই সরিয়েছেন।আপনি আহত হয়ে মন্ত্রীকে তো বাঁচিয়েই নিলেন। এতে রাজনীতিতে আপনার অবস্থান পাকা হয়ে গেলো। আর সন্দেহ যাদের উপর পড়লো তারা মোটামুটি বাতিল হয়ে যাবে।
আর আমাকে আটকিয়ে আপনি কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন? আপনি আমার প্রতি অনেক কনর্সান?
-না আমার কর্মীদের প্রতি কন্সার্ন আমি।তোমাকে সেই গ্যাঞ্জামে খোলা রেখে আরও গ্যাঞ্জাম বাড়াতে চাইনি।যা মারকুটে তুমি।দেখা যেতো পরে আবার আমার ঘাড়ে এসেই পড়লে।

-স্বীকার করলেন তাহলে নিজ অপরাধ? স্বচ্ছ রাজনীতি করতে পারেন না আপনারা?
-যা কিছু অস্বচ্ছ তাহাই রাজনীতি।
-এই জীবনের নিশ্চয়তা কি?
-তোমার জীবনের নিশ্চয়তা কি?কালকে তুমি বেঁচে থাকবে সেটা কি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে? পরবর্তী পাঁচ মিনিট কি হবে সেটারই যখনই নিশ্চয়তা নেই তাহলে লাইফ টাইম নিশ্চয়তা খোঁজা বোকামি না?
জিয়ানা স্থির করে নিবিড়ের দিকে তাকালো।লোকটার চিন্তা ভাবনা ভালো।তবে নষ্টের দিকে ধাবিত হচ্ছে।তার ভালো চিন্তা কখনো মানব কল্যান বয়ে আনবে না।অথচ ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের দেশেও কত চমৎকার নেতৃত্ব দেয়ার মানুষ বের হয়ে আসতো। প্রথম থেকেই শেখানো হয় রাজনীতি মানেই নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরানো। অশেষ ক্ষমতা আর আধিপত্য বিস্তার।
নিবিড় জিয়ানার সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলে,

-ওইসব সততা এই দেশে চলে না মেয়ে।তুমি যেটা ভাবছো সেটা ২০% ওও সফল হবে না এখানে।একজন ভালো হতে গেলে পেছন থেকে একশোজন ছু*রি মারবে।এবং শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই আঘাত চলতেই থাকবে।
খারাপ হলেও সত্যি কি জানো?
জিয়ানা স্তম্ভিত হলো এটা ভেবে নিবিড় কিভাবে বুঝতে পারলো তার মনের কথা। নাকি নিবিড়ের কথার প্রেক্ষিতে তার চুপ হয়ে যাওয়ার জন্য বুঝে গেছে জিয়ানা কি নিয়ে ওভার থিংকিং করছে।এই লোকের আইকিউ মনে হচ্ছে অতি উচ্চতর পর্যায়ে আছে।
জিয়ানার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে নিবিড় আবার বলে,

-এইদেশে খারাপ কাজ প্রকাশ্যে করা গেলেও ,ভালো কাজ করতে হয় লুকিয়ে।হাজবেন্ড ওয়াইফ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করলে কেউ বাধা দিবে না।কিন্তু একটু কাছাকাছি হাটলে কিংবা সামান্য জড়িয়ে ধরলেও দেখবা কতজন এসে বাধা দিবে। সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জ্ঞান দিবে।তাই তোমাদের কাছে যেটা সততা আর বাস্তবতা সেটা আমরা গুনাই ধরি না।
-এই জন্যই কি প্রকাশ্যে নিজেকে খারাপ বানিয়ে আড়ালে নগরবধূদের ভালো জীবনে ফিরিয়ে দেন? দিনের বেলা প্রতিটা কর্মীদের নোংরা রাজনীতি ,সন্ধ্যায় নেশা করিয়ে,মাঝরাত থেকে তাদের ফ্রিল্যান্সিং ক্লাস করান?
জবাবে কিছু না বলে চোখ বন্ধ করল নিবিড়।জিয়ানা জানে এই ভন্ড লোক উত্তর দিবে না।তাই নিজে নিজেই বলে,
-আমি আপনাকে একদমই বুঝি না। নাকি যেটা বুঝি সেটাই বুঝি না?
-তুমি এখন যাও জিয়ানা। আমাকে তোমার ওই ছোট্ট ইরিটেটিং তিলটা খুব বিরক্ত করছে। I can’t stop thinking about it।
নিবিড়ের বিড়বিড়িয়ে বলা কথা জিয়ানা শুনেনি। শুধু এখন যাও টুকু ছাড়া। তাই বিনাবাক্যে বের হয় কেবিন থেকে।

-যে শিয়াল লোকসমাগমে বেশি থাকে সে আর শিয়াল থাকে না ,কুত্তা হয়ে যায়। বুঝলেন মামুন সাহেব?
মামুন ইসলাম ভেতর ভেতর ঘাবড়ে গেলো।মন্ত্রী কিসের ইঙ্গিত দিলো। পকেটের রুমালটা গোপনে বার কয়েক চিপে নিজের নার্ভ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন।এমনিতেই এইবার তার বদনাম রটে গেছে ইউনিয়নে।তারপর মন্ত্রীর উপর এটাক। মামুলী কোন ব্যাপার না।এই ধাক্কায় নিবিড় যে টাইমলাইনে চলে আসবে সেটা পরিস্কার। নমিনেশন নিয়ে টানাটানি বেজে যাবে।অথচ তার প্ল্যান ছিলো সংসদ পর্যায়ে নির্বাচন করার। এইজন্য শ্যামল হাসানের সাথে গোপন চুক্তিও করা শেষ। রেজাউল সরকার নিজেও আর নিবিড়ের উপর ভরসা করতে পারচ্ছে না।নিবিড় উনার সকল অনৈতিক কারবারের প্রত্যক্ষদর্শী। বর্তমানে তাদের তিনজনের একজনই প্রতিপক্ষ সেটা সুখনীল নিবিড়। কিন্তু তাদের ধারণার বাহিরে ছিলো সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলাপ আছে তার।তবে এখন তো মনে হচ্ছে আলাপ না মন্ত্রীর জীবন বাঁচিয়ে পরিবারের সদস্যই হয়ে গেলো।সব সিডিউল বাদ দিয়ে ক্লিনিকের বারান্দায় বসে আছেন নিবিড়ের জন্য।

বার কয়েক পিএ এসে ফোন বাড়িয়ে দিলে উনার রক্তচক্ষু দেখে লেজগুটিয়ে পালিয়েছে পিএ ব্যাটা।
নিজের ওভার থিংকিং সাইডে রেখে বড্ড নাজুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-এই কথা কেনো বললেন স্যার? কোন অপরাধ হয়েছে আমার ধারা?
-অপরাধ তো করেইছেন মামুন সাহেব।এই দেশের কতজন চেয়ারম্যান সরকারি ক্রান সঠিক বন্টন করেছে? খুবই কম। এই খুবই কমের সংখ্যাতে আপনিও আছেন।আপনি আর রাজনীতিবিদ নন। হয়ে গেছেন সমাজসেবী।
-একজন সমাজসেবীই কি প্রকৃত রাজনীতিবিদ নন?
-না! সমাজসেবীরা মঙ্গল অমঙ্গলের হিসেব করে।আর রাজনৈতিকবিদরা লাভ ক্ষতির। আপনার এখন ধর্ম কর্ম আর সমাজসেবা নিয়েই থাকা উচিত। ভালো মানুষ দিয়ে রাজনীতি হয় না বুঝলেন?

তাদের আলোচনা ছেদ হলো সামনে কারো উপস্থিতিতে।মাথা উঠিয়ে উক্ত ব্যাক্তিটিকে দেখে ঝটকা মতো খেলো যেনো মামুন ইসলাম। লম্বাচুলের ঢিলা খোপায় এই যেনো ইয়াং নীলুফা। মামুন ইসলামের চোখের পাতা কেপে উঠলো। বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন আপনা আপনি। জিয়ানা নিষ্পলক দেখে যাচ্ছেন সামনের বয়স্ক লোকটিকে। মেহেদী দিয়ে চুল দাড়ি লাল করা। সিজদা দিতে দিতে কপালে কালিও পড়েছে।পুরাই সুন্নতি চেহারা। কিন্তু ভেতর ভেতর এক নাম্বারের নমরুদ।
জিয়ানা কোন ভনিতা কিংবা কোন সম্মোধনে গেলো না।সরাসরি মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো ,
-স্যার উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ করে কিন্তু জীবনই যদি না থাকে তবে উন্নয়ন কিসের জন্য লাগবে? আমাদের এই এলাকা সহ দেশের অনেক গুলো টিনএজ মেয়ে নিখোঁজ। অথচ আইনের কোন বিশেষ তৎপরতা নেই। কেনো বলতে পারেন?

মন্ত্রী বেশ বিরক্তবোধ করলেন। মন্ত্রী হয়েছেন বলেই কি সবার সব কথার জবাবদিহি করতে হবে।চুপ করে আছে দেখে পিএ জানালো এটা মিসেস নিবিড়। মন্ত্রী এবার নরম হলেন যেনো।তারপর মুখে মেকি হাসি এঁকে বললেন,
-আইনের কাজ সবসময় ভিজিবল হয় না। কিছু কাজ গোপনেই করতে হয়।যেটা আমরা পাবলিক করি না।তারমানে এই না যে আমরা কাজ করছি না।
-আইন তো এখন বিজনেস হয়ে গেছে। একটু কাজ করে দুই একটু প্রচার করে পাবলিককে ঠান্ডা করায় যেনো প্রধান উদ্দেশ্য। সূদুর প্রসারি কোন সমাধান দিতে পারে না।আপনারা ভিআইপি পার্সোনরা যদি সাধারণের মতো চিন্তা করেন তাহলে কিভাবে হবে স্যার?
জিয়ানা বেশ বিনয়ের সহিত জিজ্ঞেস করলো।

-টু ডে ওর টুমর উই হ্যাভ টু বি ম্যাংগো পিপলস। দিন শেষে সবার ক্ষমতার আসন কিংবা অসাধারণত্ব মিলিয়ে যাবে সাধারণের মাঝে। আমরাও অতি সাধারণ কেউ। অসাধারণ কেউ রাজনীতিবিদ হতে পারে না।তবে তোমার কথায় বেশ দৃঢ়তা আছে।আই থিংক তুমি আইন কিংবা জার্নালিজমের স্টুডেন্ট। রাইট?
পাশ থেকে মামুন ইসলাম হোঁ হোঁ করে হেঁসে উত্তর দিলো ,
-জ্বি স্যার সঠিক ধরেছেন।জার্নালিজমের। কিন্তু আর একটা পরিচয় আছে তার। আমার পরিবারের পুত্রবধূ ছাড়াও সে আমাদেরই পরিবারের মেয়েও সে।

-আচ্ছা এই জন্যই এই সাহস। জেনেটিকাল? হুম?
জিয়ানা তাদের কৌতুকে কোন হাস্যরসের কিছু খোঁজে পেলো না।তাই মুখটা কঠিন করেই। আবার প্রশ্ন করলো ,
-আমি যদি কোন দিন প্রমাণ করতে পারি এই দেশের সকল বড় বড় অপরাধের মদতদাতা আপনাদেরই আইনশৃংখলা বাহিনী।তবে কি আপনি কোন স্টেপ নিবেন স্যার?
-অবশ্যই মেয়ে। যাও তোমার জন্য আমার দরজা চব্বিশ ঘন্টা খোলা রইলো।
-দরজা না স্যার ফোন নাম্বারটা খোলা থাকলেই হবে।আর একটা ইচ্ছা পোষণ করি?
জিজ্ঞেস করলো ঠিকই কিন্তু উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বলে উঠলো ,
-আমার প্রফেশনাল প্রথম প্রেস ব্রিফিং আমি আপনাকে দিয়ে শুরু করতে চাই স্যার।
মন্ত্রী মশাই গদগদ হয়ে গেলেন। মূলত জিয়ানা হালকার উপর ঝাপসা চামে চিকনে তেল মর্দন করে দিলো মন্ত্রী মশাইকে। জীবনেও এইসব লোকের ব্রিফিংয়ের সামনে জিয়ানা থাকবে না।
পিএ এর দিকে তাকিয়ে ইশারা করার পর একটা ভিজিটিং কার্ড নিজ হাতে জিয়ানার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
-এটা আমার পার্সোনাল কার্ড।তোমার যেকোন প্রয়োজনে এনি টাইম যোগাযোগ করবে।
জিয়ানা হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নেয়।

পরেরদিন ক্লাসে এসে জিয়ানারা জানতে পারলো আজ ক্লাস হবে না।কাল ক্যাম্পাসে ঝামেলা হওয়াই কোন প্রফেসরই আজ আর আসেনি।স্টুডেন্টও যে খুব এসেছে তানা।যারা জানে না তারাই শুধু এসেছে।আর জানার মাঝে জিয়ানা একাই।মিম মৌসুমী কেউ আসেনি।খালি ক্যাম্পাসে জিয়ানা বেশ কিছুক্ষণ আরামছে ঘুরাফেরা করে সিদ্ধান্ত নিলো চারটা প্রাইভেটে গিয়ে আজ পরিচিত হয়ে আসবে।

কেটে গেছে একমাস। জিয়ানার লাইফ ঝিংগা লালা বেগে ছুটছে।নিবিড়ের সাথে দেখা হলেই দফায় দফায় ঝগড়া মারামারি হয়েছে কয়েকবার।নিবিড় গলা টিপে ধরতে চাইলে জিয়ানা রেডি ছিলো। যখনই হাত বাড়িয়ে ধরতে গেছে ফট করে সরে তলপেটে পাঞ্চ করেছে।জিয়ানার পাঞ্চ যে বেশ জোরেই লাগতো সেটা নিবিড়ের মুখ দেখেই বুঝা যেতো। তবুও এমন ভাব করতো যেনো বিড়াল ইঁদুর নিয়ে খেলছে। এমন প্রতিপক্ষকে আঘাত করে আসলে মজা নেই।মার খেয়ে যদি কেউ না কাতরাই তবে সেটা খুবই হতাশাজনক।
অপরদিকে অমায়িক সব লাটের বেটা জুটেছে প্রাইভেটে।অদ্ভুত আর স্বস্তিদ্বায়ী ব্যাপার হচ্ছে প্রতিটা স্টুডেন্ট খুবই মনোযোগী আর ওভিডিয়েন্ট।এর আগে যত প্রাইভেট পড়িয়েছে জিয়ানা সব গুলাই ছিলো ত্যাদড়ের ত্যাদড়। সেসব ত্যাদড়দের যে কত রকম ত্যাঁন্দড় ব্যাঁন্দড় সহ্য করা লাগতো।

চারটা প্রাইভেটের মাঝে দুইটার সবচেয়ে চমৎকার দিক হচ্ছে রাজকীয় নাস্তা।আর সব নাস্তা খেতে না পারলে পার্সেল করে জিয়ানার হতে ঝুলিয়ে দেয়।নিতে না চাইলে স্টুডেন্টদের গার্ডিয়ানরা এমন বিহেভ করবে যেনো ,জিয়ানা না নিলে তাদের জেল ফাঁস হবে।
মিষ্টি মিষ্টি এমন আদর আপ্যায়নে পর জিয়ানার কয়েকদিন সন্দেহ হয়।তারপর স্টুডেন্টদের কাছে খোঁজ নিয়েছে বিবাহযোগ্য কোন পাত্র আছে নাকি তাদের কোন আত্মীয়। যার কারনে জিয়ানাকে পাত্রী হিসেবে সিলেক্ট করেছে। সেই জন্য এত আপ্যায়ন করছে।
পরবর্তীতে দেখে না সব আন্ডা বাচ্চা। বিবাহ্য উপযুক্ত কেউ নেই।জিয়ানা নিজের কপালে নিজেই চুমু দেয় আঙুল দিয়ে।লা জবাব কপাল খানা। আহা কজন এমন প্রাইভেট পায়?

একমাস কমপ্লিট হওয়ার সাথে সাথে টপাটপ চারটা প্রাইভেট থেকেই বেতন হাজির।যে দুই বাসায় থেকে তেমন নাস্তা দিতো না বলে জিয়ানা মনে মনে গালাগালি করেছে তারা আজ জিয়ানাকে চমকে দিয়েছে বোনাস দিয়ে।একমাসে তাদের বাচ্চার উন্নতি দেখে আর জিয়ানার ব্যবহারের জন্য দুই হাজার করে এক্সট্রা দিয়েছে।টু আর থ্রির বাচ্চার বেতন তিনহাজার করে। আর ফাইভ আর সেভেনের স্টুডেন্ট দুইটার পাঁচ হাজার করে। জিয়ানার হিসেব মতে ষোল হাজার পাবে। কিন্তু বোনাস পাওয়াই বিশ হাজার বেতন পেয়েছে।সেই খুশিতে জিয়ানা লাষ্টের বাসার বাথরুমে ঢুকে উড়াধুরা নেচেছে।অবশ্য নাচার সময় বাথরুমের টিস্যু হোল্ডারটা ভেঙে এসেছে। ওইটা ব্যাপার না একটা টিস্যু হোল্ডার গিফট করবেনি পরে।জিয়ানা এখন অনেক বড়লোক। আহা কত টাকা বেতন ভাবতেই কেমন নিজেকে বড়লোক বড়লোক লাগছে।আব্বু যতই বলুক টাকা পয়সায় বড়লোক হয় না,আসল বড়লোকের স্বাদ আসলে টাকাতেই।যাদের টাকা নেই তারা নিজেকে সান্ত্বনা দিগেই ওইসব ভুগিচুগি আওড়ায়।

আজ ঠিক করেছে জিয়াউলকে দেখতে যাবে।একমাসে দুইবার গিয়েছিলো।একদিন গিয়ে ফিরে এসেছে সাথে সাথেই।জিয়ানার উচ্চমধ্যবিত্ত ছিলো।খাওয়া দাওয়াও বিলাসিতা না থাকলেও ,যথেষ্ঠ ভালো খাবার খেয়ে এসেছে।কিন্তু সেদিন গিয়ে দেখে করল্লা ভাজি আর পাতলা ডাল দিয়ে দুপুরের ভাত খাচ্ছে জিয়াউল।জিয়ানাকে দেখেই যে আঞ্জুমান আর জিয়াউল ইতস্তত করা শুরু করেছিলো।নিজেদের অবস্থা ডাকতে বলেছিলো পেটের সমস্যা তাই এমন লাইট খাবার খাচ্ছে।জিয়ানাও বসে খেয়ে এসেছে সেই খাবার।চিরচেনা অতি সাধারণ সেই খাবার অমৃত লেগেছে।
ফেরার পথে সারাটা রাস্তা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে এসেছে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩১

নিবিড়ের দেয়া টাকাটা যে জুনায়েদকে দিয়েছে সেটা পরিস্কার। এখন খেয়ে না খেয়ে চলছে দুইজন।রিষ্টপুষ্ট দুইজন মানুষের অবস্থা এখন হাড্ডিসার। আজ জিয়ানা বাজার করবে অনেক কিছু। সেই উদ্দেশ্যে বাজারের পথে যাচ্ছিলো কিন্তু থামলো গার্লস স্কুলের পেছনের গলিতে।তাদের বিল্ডিংয়ের একটা চৌদ্দ পনেরো বছরের মেয়ে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিদেশি ছেলের সাথে।ছেলেটা হইতো এশিয়ান। গৌড় বর্ণে ছোট ছোট চোখ।
জিয়ানা ব্যাকপ্যাকে ঝুলানো পুতুলে সেট করা ক্যামেরায় ক্লিক করে কয়েকটা ছবি ক্যাপচার করলো। তারপর ছুটলো বাজারের দিকে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৩