Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৩
আশিকা আক্তার সোহাগী

“সাধারণ সফল আর অসাধারণ সফলদের মধ্যে পার্থক্য হলো ,অসাধারণ সফলদের “না” বলার ক্ষমতাও অসাধারণ “-(ওয়ারেন বাফেট)
জিয়ানা অসাধারণ সফলদের কাতারের কেউ না।তাই তার” না ” একেবারেই সাধারণদের কাতারে।আঞ্জুমানকে আজ স্পষ্ট করে না করে এসেছে। সে জমি বিক্রি কিংবা অন্য কাউকে দিবে না।

বিকেলের শেষ প্রান্ত।শিরশির বাতাসে জিয়ানার খোপার বাহিরে বের হওয়া কিছু এলোমেলো চুল দোলছে।
ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে কলেজ স্ট্রিটের সেই ফাঁকা গলির ফুটপাতে ,একগাছ ভর্তি বাগান বিলাসের নিচে মাথা নিচু করে বসে আছে জিয়ানা।এই জায়গাটা জিয়ানার খুব খুব পছন্দের। পরিত্যক্ত কোন লাটের বাড়ির সামনের ফুটপাতটাও দামী টাইলস লাগানো।যার কাড়ি কাড়ি টাকার চুলকানিতে এমন একটা বিশাল বাড়ি করেও পড়ে আছে বিদেশ।আর বাড়িটা পরিত্যক্ত। কিন্তু বাড়ির মালিকের রোপণ করা গাছগুলো এখনো নিজ ইচ্ছায় বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

পায়ের সাদা লাইটওয়েট স্নেকার্স টা ময়লার কারনে ধূসর হয়ে আছে।দুইবছর আগে জুনায়েদ কলকাতায় ঘুরতে গেলে শ্রীলেদার থেকে এনেছিলো।খুবই কম্ফি এই স্নেকার্সটা জিয়ানার নিত্যসঙ্গী। সবাই কম বেশি দূরে সরে গেলেও দুইবছর থেকে বিনাশব্দে জিয়ানাকে সাধ দিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু জিয়ানা একে একদমই যত্ন করে না।তাই তো অবহেলায় অযত্নে কেমন মলিন হয়ে উঠেছে।যেমন মলিন জিয়ানার মনের রং।
আজ তার খুব মন খারাপ করতে ইচ্ছা হচ্ছে।কিন্তু কি জানি বিশেষ কারনে জিয়ানার ঠিকঠাক মনটাও খারাপ হচ্ছে না।এমনকি কখনোই হয়ও না।মাঝেমধ্যে মনে হয় কোন ল্যাবে ঢুকে রিচার্সার দের ডেকে বলতে ,
-এই যে আমাকে নমুনা হিসেবে রেখে দিতে পারেন।আমার কোন মন খারাপ হয় না।শরীরের কষ্ট মনকে ছুতে পারে না। আমার কাউকে ভালোবাসতেও ইচ্ছা হয় না,আবার কাউকে খারাপবাসতেও ইচ্ছা হয় না।কাউকে আপন করতে ইচ্ছা হয় না।মরে যেতেও ইচ্ছা হয় না,আবার বেঁচে থাকতে ইচ্ছা হয় না।এককথায় ইচ্ছাহীন,মনখারাপ হীন ,অভিমান হীন ,ব্যাথাহীন এই আমি এই দুনিয়ার বাসিন্দা না।আমাকে চিরে ফেরে টুকরো টুকরো করে কাচের বৈয়ামে ভরে রাখুন।

পরক্ষণেই মনে পড়লো ,আসলে ছিন্নমূল সে।এইসব অনুভূতি প্রয়োগ করতে একান্ত ব্যাক্তিগত মানুষ লাগে।পরিবার লাগে।রাস্তার কারো সাথে তো আর নিজের অভিমান কষ্ট প্রকাশ করা যায় না? একদম ছোট থেকেই জিয়ানা বোঝে এসেছে সে একা। তার আপনজন এরা হলেও একান্ত আপন না। তাই এইসব স্বাভাবিক অনুভূতি গুলো এতকাল সয়ে এসে এসে এখন আর কোন রিয়েকশান দিতে পারে না।
ফিক করে হেঁসে উঠল। একমাত্র হাঁসি আর রাগ ছাড়া জিয়ানার কোন রিয়েকশান জানা নেই।কিন্তু ঠোঁটে হাঁসি থাকলেও চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।আর কিছুক্ষণ আগের ঘটনা জাবর কাটে বাগান বিলাসের ঝরা পাপড়ি কুড়াতে কুড়াতে ।

ব্যাগভর্তি বাজার আর মাছ মাংস দেখে আঞ্জুমান তেড়ে গিয়ে জিয়ানাকে একটা থা*প্পড় দিলো।পা দিয়ে বাজারের ব্যাগ লা*ত্থি দিয়ে ফেলে রাগে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
-দান দক্ষিণা করতে এসেছিস আমাদের? আমাদের করুনা দেখানো শেষ হলে বের হয়ে যা এখনই।কি ভেবেছিস? এই সামান্য বাজার করে এনে আমাদের ভুলাতে পারবি?
জিয়ানা রাগের কারণ বুঝতে না পেরে একবার জিয়াউলের দিকে তাকায়।সে মাথা নিচু করে বসে আছে সোফায়।লম্বা শরীর শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেছে। সেই সাথে মিশে গেছে সকল আত্মসম্মানবোধ আর কঠোর ব্যাক্তিত্ব। জিয়াউলের দিক থেকে নজর হাটিয়ে আঞ্জুমানকে জিজ্ঞেস করলো ,
-আম.. চাচি কি হয়েছে যদি বলতে? আমি আবার প্রাইভেট পেয়েছি।আর আজই বেতন পেলাম। নিজের টাকায় বাজার তো এই প্রথম করিনি।আগেও তো টুকটাক টিউশনি করিয়ে সংসার চালিয়েছি।তাহলে আজ এগুলা তোমার কাছে দান দক্ষিণা লাগছে কেনো?

-কারণ তুমি নেহাৎই মসকারা করছো তাই।তোমার যদি সত্যি ঋণ শোধ করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা থাকতো তাহলে ফার্মের জমিটা লিখে দিতে পারতে।সেটা তো করছো না? এসেছো কিছু বাজার নিয়ে সার্কাস করতে।আমাদের চলছে ধার দেনা করে সেটা তুমি জানো? জানো না।তোমার হাজবেন্ডের টাকা দিয়ে যে এফডিআর করা ছিলো ,সেটাও জুনায়েদ আমাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গেছে।আমার তো জয়েনিং আরও দুই মাস পর। তাহলে এই একমাস কিভাবে চলেছি? সামনে কিভাবে চলবো?খোজ নিয়েছো?
-এটা একটু বেইনসাফি হয়ে যাচ্ছে না আম্মু সরি চাচি? আমাকেই কেনো ঋণ শোধ করতে হবে? তোমার নিজের সন্তানদের কোন দ্বায় নেই? আর যদি ফেয়ারই বলি তাহলে আমাকে বড় করতে যা খরচ সেটার চেয়ে বহুগুন বেশি আমার আম্মু তোমাদের দিয়ে গেছে।
আঞ্জুমান ঘাড় ঘুরিয়ে রক্তচক্ষু করে জিয়াউলের দিকে তাকায়।এই লোক সব বলে দিয়েছে।ঘাড় ফিরে আবার জিয়ানার কথায়,

-আমাকে কি দিয়েছো বল? স্মৃতি হিসেবে উনার গলার চেইন টা ছাড়া? যদি বলি জন্মগত কোন ঋণের দ্বায় আমার নেই।তোমরা মানবতার খাতিরে হলেও আমাকে লালন পালন করে বড় করেছো।এইজন্য আমি আমার শিরা উপশিরা তোমাদেরকেই একমাত্র পরিবার বলে জানি। একদন্ড শান্তি পেতেই বারবার তোমাদের কাছেই আসি।সত্যি বলতে বাস্তবিক অর্থে আমি তোমাদের কাছে ঋণী না। এমনকি সেই এম্বুলেন্স ড্রাইভারের কাছেও ঋণী না।যিনি আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলো।কারণ উনাকেও আম্মু নিজের সোনার কানের দুল দিয়ে দিয়েছিলো।যদি ঋণ থাকেও ,সম্পর্কের ঋণ আসলে শোধও করার কোন উপায় আছে কি?কেউ পারে সেটা শোধ করতে?
আর সম্পত্তি আমি কোনদিনই দিবো না তোমাদের। আজকের পর থেকে তো একদমই না। সেখানে আমি এতিমখানা করবো। কারো অন্যায়ের ভর্তুকি দিতে আমি আমার মায়ের শেষ স্মৃতি নষ্ট করবো না।
তারপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাজার গুলো আবার ব্যাগে ভরে বিদায় না নিয়েই বের হয়ে আসে সেখান থেকে।

জিয়ানারা যে বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে সেই বিল্ডিংয়ের ছয় তলায় সেইম দুইরুমের একটা ফ্ল্যাট খালি পেয়ে জেনি আর মক্কু ভাড়া নিয়েছে। গত একমাস দুইজন প্রায় প্রতিদিনই বাসা খোঁজেছে।অথচ শেষমেষ এই বিল্ডিংয়েই পেয়েছে।
আজ তারা উঠলো বাসায়।নিবিড় অনেক কিছু গিফট দিয়েছে।একটা কিং সাইজ বেড ,একটা কাবার্ড আর একটা ডিভান। মক্কু একটা ডাইনিং টেবিল আর ফ্রিজ সাথে রান্নাঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র কিনেছে।
জেনি সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছে জিয়ানাকে।বান্দী লাপা লেডিস হয়ে গেছে।ফোনে জিয়ানাকে এইজীবনে পাওয়া যায় না।সে যে ফোন কি জন্য ব্যবহার করে জেনি সেটাই বুঝে না।একটা ফেসবুক আইডি আছে সেটাতে চারমাস আগে একটা মেসেজ দিয়েছিলো।এখন পর্যন্ত সিন করে নাই।
ধপ করে ডিভানে বসে পড়লো জেনি।ভেবেছে দুইবোন মিলে গোছগাছ করবে। কিসের কি এই মেয়ে হাওয়া হয়ে গেছে। জেনিকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে মক্কু হাতের ওয়াল হ্যাজ্ঞিং গুলা নিচে রেখে জেনির পায়ের কাছে বসে জিজ্ঞেস করলো ,

-ফার্নিচার গুলা পছন্দ হয় নাই তোমার?
জেনি মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে তার ব্যাক্তিগত মানুষটাকে।গত একমাসে বেশ পরিবর্তন হয়েছে।নেশা ছেড়ে স্বাস্থ আর গায়ের রংয়েরও উন্নতি হয়েছে।তবে সিগারেট ছাড়েনি।সবথেকে বেশি উন্নতি হয়েছে তাদের সম্পর্কের।জেনি নিজের হাত দিয়ে মক্কুর দুইগালে ধরে বলে উঠলো ,
-আমার লাইফে এত এক্সপেন্সিভ ফার্নিচার কখনো দেখিনি।এই একটা বেডের প্রাইসে আমাদের ঘরের সব ফার্নিচার হয়ে যেতো।নিবিড় ভাইয়ের পছন্দ বেশ চমৎকার। সন্দেহ নেই এতে।
মক্কু নিজের হাত জেনির হাতের নিচে রেখে বলে,

-হুম এইজন্যই তো আমার শালিকাকে পছন্দ করেছে।উইনিক পছন্দ ভাইয়ের।
-এটা আমার মনে হয় না মুসাদ্দিক, নিবিড় ভাই জিয়ানাকে কোনভাবে পছন্দ করে।প্রায় দেড়মাস হয় বিয়ে হয়েছে একটা বার কলও করেনি কখনো।বরং দেখা হলেই তেড়ে যায় ,হয় গলা টিপে ধরতে। না হয় হুমকি ধামকি।ওদের সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নেই।
-ভাই আর জিয়ানা দুইজনই অদ্ভুত মানুষ। তারা আনপ্রেডিক্টেবল। তাদের অনুভূতিও আনপ্রেডিক্টেবল। আমি একশো পার্সেন্ট নিশ্চিত ভাই নাকে মুখে প্রেমে পড়ছে জিয়ানার।সেটা স্বীকার করতে চায় না।কিছুদিন আগে জিয়ানার মিস ক্যাম্পাস কমপিটিশনের একটা ছবি এক ছেলে কনফেশন গ্রুপে দিয়ে কাব্যিক কথাবার্তা লিখেছিলো। সেই ছেলেটাকে ভাই যে কি হাল করেছেন ,দেখলে বুঝতা কতটা পজেজিভ উনি জিয়ানার প্রতি।কনফেশনের গ্রুপটাকেও উড়িয়ে দিয়েছে।

অপরদিকে তোমার বোন তো মাথা ছাটা তাকে আমার পক্ষে ইহ জিন্দেগীতে বুঝা সম্ভব না।
মাথা ছাটা কথাটা জেনির একদম পছন্দ হলো না।নাক ফুলিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো মক্কুর দিকে।নাক ফুলানো দেখেই মক্কুর বুঝা শেষ বউ খেপেছে।পরিস্থিতি ঘুরানোর জন্য জেনিকে বলল,
-আচ্ছা ওদের কথা বাদ।তারা স্লো যাচ্ছে কিন্তু আমরা তো ফাষ্ট।চলো বেডটা টেস্ট করি।কেমন মজবুত দেখা উচিত।
জেনির রাগ গলে লজ্জা জমা হওয়া শুরু হলো।লজ্জা লুকাতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলে ,
-রান্নাঘরে কাজ আছে আমার সরুন।
মক্কুর হঠাৎ কি হলো ,এগিয়ে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,

-আর কত সরবো? সাইত্রিশ দিন হয় বিয়ে করেছি এখনো একটা চুমু নসিবে জুটলো না। মানুষ আমাকে নিয়ে উপহাস করে।
জেনি কপট মেকি রাগ দেখিয়ে বলে ,
-মুসাদ্দিক ভালো হচ্ছে না কিন্তু?
-ওইতো এমনিতেও খারাপই হবে ওমনিতেও খারাপই হবে।তাই এখন থেকে সবই হবে।
-আমমমম….
কথা বন্ধ করে দিয়েছে বখাটে মুসাদ্দিক নিজের কালচে ঠোঁট দিয়ে।জেনি নিজের পেলব হাত দিয়ে খামচে ধরে মক্কুর কোমড়ের কাছের শার্ট।
হালকা সিগারেটের স্বাদের সাথে পুরুষের প্রথম প্রেমময় স্পর্শে শিহরণ যখন রন্ধে রন্ধে ,আচম্বিতে বিকট আওয়াজে মক্কুর পকেটের ফোন আর্তনাদ করে উঠে।ফোনের শব্দে ছিটকে সরে যায় জেনি।মহাবিরক্ত হয়ে মক্কু ফোন বের করে দেখে নিবিড়ের কল।বিড়বিড় করে বলে,

-নিজেও বংশবিস্তার করবে না। আমাকেও করতে দিবে না।একেই বলে ডিজিটাল মীর জাফর। তারপর স্পষ্ট করে বলে হ্যাঁ ভাই বলেন।
-মীর জাফর কাকে বললি?
-আমাকে ভাই। নিজেকে বলেছি।সময় অসময় আমার মীর জাফর মন খালি বউ বউ করে।
-আমার কাছে আয় লা*ত্থি দিয়ে পেছনের ফোটা দিয়ে মীর জাফর মনকে বের করে দেই।শোন আমি আজ যেতে পারবো না।ফার্নিচারের পছন্দ হয়েছে না?
-হ্যাঁ ভাই ফাষ্ট ক্লাস হয়ছে সব। কিন্তু দামটা বেশি। আসতে পারবেন না কেন? আজ তো ক্লাবে বিশেষ কোন কাজ নাই?

-তোর বউয়ের বোন কলেজ স্ট্রিটে ঝিম মেরে ঘন্টা থেকে বসে আছে। তাছাড়া তোকে যে ইনফরমেশন দিতে বলেছিলাম সেটা তোর আগেই আমি বের করে ফেলেছি। এই মাইয়াই মেহুল খান। গবেটটা নিজেও জানে না কোথায় জড়িয়েছে।
মক্কু হা হয়ে গেলো নিবিড়ের কথা শুনে।চব্বিশ ঘন্টা জিয়ানাকে কড়া পাহাড়ায় রাখে তারা।তারপরও কিভাবে সে কোন প্রফেশনাল সিক্রেট ইনফর্মার হতে পারে।এই এলাকার অনেক গুলো গোপন তথ্য ফাঁশ হয়েছে রিসেন্ট বিভিন্ন পত্রিকায়।এর মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিলো শয়তানের পূজারীদের চক্রকে এক্সপোজ করা। সেই রিপোর্টের সূত্র ধরে দুইজন বিদেশি গ্রেফতার হয়েছে।সেটাও সাভার নবীনগর এলাকা থেকে। এতে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের উপর কেন্দ্রী কমিটি থেকে মারাত্মক প্রেসার আসে।এই দেশের মানুষ খুব সেনসেটিভ। বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে।সেখানে সরাসরি শয়তানের পূজা সেটাও আবার একাবারে সবার নাকের ডগায়।মানুষের ক্ষোভে আর সমালোচনায় সরকার দিশাহারা প্রায়।

অনেক গুলা টাকা খসিয়ে মামুন ইসলাম নামটা বের করেছে “মেহুল খান”।কিন্তু পরিচয় বের করতে পারেনি। শেষমেষ নিবিড়কে দায়িত্ব দেয়।কিন্তু নিবিড়ও শর্তসাপেক্ষে সেই দ্বায়িত্ব নিজ কাধে নেয়।
নমিনেশনের লোভে মামুন ইসলাম বিনাবাক্যে নিবিড়ের শর্ত মেনে নেয়।
প্রায় একমাস পর পরিচয় বের করতে পেরেছে। কিন্তু জিয়ানা কিভাবে সম্ভব। মক্কু আমতা আমতা করে বলল,
-ভাই কোথাও ভুল হইতাছে নাতো? জিয়ানাকে আমি সহ রাব্বি আর সজল টানা সময় নজরে রাখি।সে বাহিরে বের হয়ে কোথায় যায় আবার কখন বাসায় ঢুকে সব নিজ চোক্ষে দেখা।
-দেখা হলে বলি? আপাতত জংলী পাখি খাঁচায় ভরার পালা।পোষ মানবে না জানি। তবুও উড়াউড়ি বন্ধ করতে হবে।
-কি করতে চাইতাছেন ভাই? চেয়ারম্যান স্যারকে নিশ্চয় জানাবেন না…
অপরপাশ থেকে খট করে শব্দ হলো ডিসকানেকটের।মক্কুর রোমান্সের ঘন্টা মাথায় উঠিয়ে দিলো এই দুই অদ্ভুত মানব মানবী। তারপর ফট করে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া মেরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো ,
-দুনিয়া ইসপার ছে ওসপার দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলেও মক্কুর আজ বউকে চায়ই চায়।বলা যায় না একটু পর জেনি তার বোনের খবর শোনে কি করবে।নাহ কোন রিস্ক আজ সে নিবে না।খাট পরিক্ষা এখন, এই মুহূর্তেই করতে হবে।ছুটলো রান্নাঘরের দিকে।

সৃষ্টিকর্তা জন্মলগ্নে বাঙ্গালী মেয়েদের সংকোচ, লজ্জা ,জড়তা ঠেসে ঠেসে এঁটে দিয়েছেন।কিন্তু জিয়ানাকে দেননি।জিয়ানা ব্যাতিক্রম। সে চমকায় না ,সংকোচবোধ কিংবা লজ্জাও আসে না। জড়তা তো বরাবর নেই।
আচম্বিতে নিবিড় জিয়ানার সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়ায়। জিয়ানার সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।নিবিড় বাইক থেকে নেমে পাশে বসে।ঘাড় বাকিয়ে একপলক দেখে তারপর আঙুল দিয়ে জিয়ানার গাল থেকে একফোটা পানি নিয়ে জিহবায় ছুঁয়ে বলে ,
-জিয়ানা হকের চোখের পানিও দেখি Nacl.nH2O। আমি ভেবেছিলাম অন্যকিছু হবে।
-আঃ! ভালো লাগছে না।ফুটুন এখান থেকে।
-তোমার কথাতেই?
জিয়ানা উত্তর দিলো না। একমনে বাগান বিলাসের পাতা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
-মেহুল খান?
-এতদেরিতে।
-শেষ পর্যন্ত দেখলাম কত দূর যেতে পারো।
-যেতে পারলাম আর কই? আপনি তো সব প্রমাণ মাটিতে মিশিয়ে দেন।
হোঁ হোঁ করে হেসে উঠলো নিবিড়।

-তুমি একটা চিজ জিয়ানা।আমার সত্যিই বুঝতে অনেক সময় লেগেছে।তোমার পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটার সাথে প্রতিদিন কোচিং এ বোরকা পড়ে যেতা অথচ সবাই ভেবেছি দুইজনই স্কুল স্টুডেন্ট। বিলিভ মি কোচিং-এর দাওয়াতে না গেলে আমি তোমাকে ধরতেই পারতাম না। কোন সন্দেহ হয়নি।
-জুতাজোড়া খেয়াল করবেন না?আমার একজোড়া জুতাই।আপনার ব্রেইন দিন দিন ভোতা হয়ে যাচ্ছে।এটা বুঝেন নাই আপনার ক্লাবের সিক্রেট রুমেও গিয়েছিলাম।পাতালের ঘরটাতে।যেখানে আপনার হাই কনফিগারেশনের সব ডেস্কটপ সেটাপ দেয়া।
-আমি যেতে দিয়েছি দেখেই যেতে পেরেছো।
-তা ঠিক। ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক দরজায় কেউ তালা ঝুলাই না। আমিও বুঝেছিলাম।
আবার আকাশ বাতাস কাপিয়ে নিবিড় হেসে উঠলো। তারপর জিয়ানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,

-তোমাকে তোমার কোম্পানি শুধু ব্যবহার করছে। ওইসব চুক্তির ফাঁদে ফেলে একবছর বিনাবেতনে খাটাবে। তারপর তোমার ইনফরমেশনের ভিত্তিতে তোমাকেই ব্ল্যাকমেইল করে চক্রাকারে আরও বেশি রিস্কি কাজ করাবে।
-ব্লেইকমেইল করবে কিনা জানি না।তবে সব ইনফরমেশন পাবলিশ করে না। কালপিটদের সাথে আগে কড়া মূল্যে দরদামে বেচাকেনা করে।তারপর দামে সুবিধা করতে না পারলে সেটা পাবলিস করে।আমি আমার নীতি ধরে রাখতে পারছি না।পায়ের নিচের মাটি না থাকলে বুঝি এমনই হয়।
জিয়ানা হাটুতে মুখ গুজে প্রশ্ন করে নিবিড়কে।নিবিড় জিয়ানার দিকে ঝুকে ফিসফিসিয়ে বলে,
-তোমার পায়ের নিচে মাটি নেই ঠিকই কিন্তু কনক্রিট আছে।সেই কনক্রিট ঠিক কতটা কঠিন এইবার হাড়েহাড়ে টের পাবে।
এতক্ষণ নিবিড়কে শান্ত লাগলেও এবার যেনো আগুনের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।
জিয়ানা ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করলো ,

-পাপ্পুর ভাই পাভেলকে ব্যবহার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপর হামলা চালিয়েছেন এই ইনফরমেশন কিনতে কত টাকা গচ্ছা গেছে?
-টাকা যাবে ,টাকা আসবে কিন্তু মুক্ত বাতাসে জিয়ানা হক নামের কেউ আর ঘুরতে পারবে না।
জিয়ানা বড় বড় চোখ মেলে চরাক করে উঠে দাঁড়ালো। নিবিড়ও সাথে সাথেই উঠে নিজের ক্লোরোফর্ম মিশ্রিত রুমাল চেপে ধরলো তার নাকে মুখে।
জিয়ানা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি নিবিড় এমনটা করবে। মস্তিস্কে প্রচন্ড ঝিমঝিমানি শুরু করলো। তারপর হাত পা অসার অনুভূত হলো আর কিছু বুঝে উঠার আগেই ত্রিশ সেকেন্ডেই সে হেলে পড়ে নিবিড়ের প্রসস্থ বক্ষদেশে। সব অন্ধকার। গভীর ঘুম।নির্জন নিস্তব্ধ চারপাশ।
একহাতে জিয়ানাকে আকড়ে ধরে রুমালটা আগে পকেটে ভরে নিবিড়। তারপর দুইহাতে পাজাকোলে করে হাটা ধরলো সামনের দিকে।এই গলিতে রিক্সা অটো কিছুই পাবে না।গলির মাথা পর্যন্ত যেতে হবে এই তুলার বস্তাকে কোলে নিয়ে।অজ্ঞান না করলে একে ভাগে আনা অসম্ভব। আর কোন উপয়া নেই নিবিড়ের।অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়ে ফেলেছে।কড়া পাহাড়া দিয়েও চোখে ধুলো দিতে পারে এই মেয়ে।এর নাম জিয়ানা না রেখে সিয়ানা রাখা উচিত ছিলো।
কিছুটা যাওয়ার পর নিবিড় হাটার গতি স্লো করে। কারণ কলেজের কিছু ছেলের দল কোচিং করার জন্য যাচ্ছিলো। নিবিড়কে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়।কোলে জিয়ানাকে দেখে বিটলা এক ছেলে জিজ্ঞেস করে ,

-ভাই ,ভাবি নাকি?উনি কি অসুস্থ?
জবাবে নিবিড় মুচকি হাঁসে।আরেকজন জিজ্ঞেস করলো ,
-সুখবর নাকি ভাই? কিন্তু ভাবি আমাদের মাশা-আল্লাহ হুর একেবারে।ভাই জিতছেন।
এবার আর মুচকি হাঁসি এলো না নিবিড়ের। নিবিড়ের থমথমে মুখ দেখে পেছন থেকে একজন প্রশ্নকারী ছেলেটার মাথায় চাট্টি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
-হা*লার পু হা*লা কার লগে মশকরা করিস? এখানে তোমারে পু*ন্দে রেখে যাবে।
নিবিড় তাদের পাশ কাটিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায় কিছুটা।তারপর থেমে জিয়ানার দিকে তাকায়।চুল খোলে ঝুলে আছে নিচে।এই প্রথম নিবিড় জিয়ানার খোলা চুল দেখলো। সুইমিংপুলে বুঝা যায়নি এত চুল মাথায় মেয়েটার।ক্লোরোফর্মের ঘোরে বিভোর হয়ে আছে।কি নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটাকে। একেবারে ঘুমন্ত রাজকন্যা। কে বলবে মারকুটে রূপও আছে এই মেয়ের।নিবিড়ের কাছে জিয়ানাকে এখন সবচেয়ে মোহনীয় লাগছে।একটু আগে ছেলেটার কথা অনুযায়ী নিজেও আওড়ালো “মাশা-আল্লাহ”

ছেলেরা নিজের চোখ দিয়ে দেখার চেয়ে অন্যের চোখ দিয়ে বেশি দেখে।মানে তার নিজের কাছে যেটা সুন্দর, সেটা সুন্দর। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার বন্ধুবান্ধব কিংবা আশেপাশের কারো মন্তব্যে যদি সেই স্বাভাবিক সুন্দরকে একটু ঘটা করে কেউ প্রকাশ করে ,তবে রাতারাতি সেই স্বাভাবিক সুন্দর হয়ে উঠবে অনিন্দ্য সুন্দর। জেলাসিতে ছেলেরা ছেড়ে যায় না।কঠিন ভাবে সেটা আরও আকড়ে ধরে।
নিবিড় নিজের অনুভূতি কিংবা অন্য মেয়েদের থেকে জিয়ানাকে আলাদা করে যে দেখে সেটা সে স্বীকার করে না।তবে কেউ জিয়ানার প্রশংসা করলে সেটাও সহ্য করে না।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩২

অটোতে উঠে জিয়ানাকে নিজের একেবারে কাছে মিশিয়ে রাখে নিবিড়। কাছাকাছি হওয়াই জিয়ানার শরীরের মেয়েলি মিষ্টি সেই কচি ডাবের গন্ধে নিবিড়ের কাছে মনে হয় এই মেয়ে কোন নারী না ,আস্ত এক কোকেইন। এখন থেকে প্রতিদিন প্রতিবেলা এই কোকেইন নিবিড়ের।
দেখা যাক এদের স্বীকারহীন সম্পর্ক পরবর্তীতে কোথায় যায়?

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৪