নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৪
আশিকা আক্তার সোহাগী
চিনের আচুয়াং মাচু প্রদেশ।যেখানে গ্র্যাভিটি একেবারেই কাজ করে না।মাটি থেকে জাম্প করলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে আবার মাটিতে ফিরে আসতে।জিয়ানা চিনের ট্রেডিশনাল হানফু পোশাক পড়ে লাফালাফি করছে। একবার লাফ দিলে সে আকাশে ভাসছে।তারপর আবার পাখির মতো বাতাসে উড়ছে।কিন্তু এরপরের বার আকাশ বাতাস পাড় হয়ে সেটেলাইটে চলে যাচ্ছে।নাহ এটা একেবারেই অবাস্তব লাগছে।জিয়ানা চেষ্টা করে মাটিতে নামতে। কিন্তু পারে না।ধানাই পানাইয়ে কোন লাভ হচ্ছে না।এতক্ষণ যে মজা লাগছিলো এখন সেটা বিরক্তি সাথে ভয় দুইটাই লাগছে।
পাশ থেকে মৃদ্যু গোঙানির আওয়াজ আসছে।ক্রমান্বয়ে সেটা বেড়ে যাচ্ছে।জিয়ানা এবার নড়তে চড়তে পারছে না।তার হানফুও ভেনিস হয়ে কালো হুডিতে রুপান্তরিত হয়েছে। এখন সে শক্ত পাথুরে মাটিতে। গোঙানির আওয়াজ বাড়ছে।সাথে জিয়ানার অস্থিরতাও বেড়ে যাচ্ছে।কিন্তু এবার সব অন্ধকার। সে বন্ধ কোন কুঠরীতে আটকা। চোখ চাইলেও মেলানো যাচ্ছে না।কোরবানি পশু কোরবানি হলে যেমন গরগর কাটা গলা দিয়ে শব্দ বের হয়। এবার গোঙানিটা তেমন শোনা যাচ্ছে।অন্ধকারেই জিয়ানা নিজের কান চেপে ধরে। এমন ভয়ানক শব্দ সে শুনতে চায় না।হাত বেধ করে কান দিয়ে মস্তিস্কে পৌঁছে যাচ্ছে শব্দটা। ধীরেধীরে বিকট হচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
জিয়ানার মস্তিস্ক অল্প সচল হয়ে এলে ফট করে উঠে বসে।মাথা ঝিমঝিম করছে এখনো।মৃদ্যু আলোয় নিজেকে একটা ফাকা ড্রয়িংরুমে আবিস্কার করে।তাকিতুকি করে বুঝতে পারে এটা নিবিড়ের ফ্ল্যাট। আর শব্দটা আসছে পাশের বন্ধ রুম থেকে।যেদিন জিয়ানারা এখানে এসেছিলো রুমটা তালা লাগানো ছিলো।ঝিমিঝিম ভাব নিয়েই জিয়ানা উঠে দাঁড়ালো। বারকয়েক বুঝার চেষ্টা করলো কিসের শব্দ।দরজার কাছে গিয়ে জিয়ানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক পল।এটা নিবিড়ের গলা।এমন গলা কাটা গরুর মতো কাতরাচ্ছে কেন লোকটা।অসুস্থ হয়ে পড়েছে? নাকি কোন এক্সিডেন্ট হলো।
কিছুক্ষণ আগে আধোঘুমে জিয়ানার যেমন লেগেছিলো এখন তার চেয়ে দ্বিগুন খারাপ লাগছে।নিবিড়ের ছটফটানো সাথে পা দিয়ে ফ্লোরে ঘষার সাথে অদ্ভুত শব্দে জিয়ানার দম বন্ধ হয়ে এলো।এত করুনভাবে কেউ কেনো গোঙাবে।মারা যাচ্ছে কি লোকটা? জিয়ানার শরীর কাপা শুরু হলো।কাপা হাতে দরজায় নক করে ডাকলো বার কয়েকবার।আস্তে আস্তে দরজায় ধুপধাপ শব্দ করে গলা ছেড়ে ডাকা শুরু করলো ,
-সুখ। সুখ কি হয়েছে? ঠিক আছেন? সুখ? কথা বলুন?
এভাবে মিনিট পাঁচেক ডাকার পর ভেতরের শব্দ কমে এলো।একসময় নিশ্চুপ হয়ে গেলো একেবারেই।জিয়ানা দরজায় মাথা ঠেকিয়ে বসে রইলো বিমুঢ় হয়ে।আজকাল জীবন কোথায় কখন কিভাবে তাকে ছেড়ে দিচ্ছে কিচ্ছু মাথায় আসে না।কিছুক্ষণ আগে নিবিড়কে নিয়ে তার এতটা উচাটন এখন হাস্যকর লাগলো।এই লোকের যা ইচ্ছা হোক তাতে তার কি? যত্তসব ভেজাল ভন্ড লোক পড়েছে তার কপালে।এরচেয়ে একটা গ্রামের মুরুখ সুরুখ চাষা জামাই হলেও ভালো হতো। জামাই চাষ করতো জিয়ানা পায়ের উপর পা তুলে খেতো শুধু।”দূর ভাল লাগে না” বলে আবার শরীর ছেড়ে সেখানে ঘুমিয়ে গেলো সে।ক্লোরোফর্মের রিয়েকশান এখনো চলছে।
নিবিড় দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে ফ্লোরেই শুয়ে আছে জিয়ানা।জিয়ানার ডাকে নিবিড়ের দুঃস্বপ্ন কেটেছে।ভয়াবহ কতশত স্বপ্ন যে নিবিড়কে তাড়া করে বেড়ায়। ফ্লোর থেকে জিয়ানাকে উঠিয়ে বেডরুমের মেট্রেসে শুয়ে দেয়। মুখের উপর থেকে চুল গুলা সরিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে জিয়ানার তেলতেলে মুখের দিকে।কোন প্রসাধনী ছাড়া একেবারেই ন্যাচারাল এই মেয়েটাকে নিবিড় কোনভাবেই এড়িয়ে চলতে পারে না।তার গাটসই নেই। ঝুকে জিয়ানার কপালে অধর ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলে ,
-ইউ আর ম্যানারলেস ,ব্যাড টেম্পার ,ব্যাড ওমেন। ইন্সট্যান্ট আই কান্ট লিভ উইথাউট ইউ চাঁদ।
মেয়েদের ডিসিশন মেকিং এবিলিটি ,কনফিডেন্সে হাই ভ্যালু, ডেয়ারি চলাফেরা , জড়তাহীন কথাবার্তায় ছেলেরা মুগ্ধ হয়।এই প্রতিটা গুন জিয়ানার সেন্ট পার্সেন্ট আছে।নিবিড় বিচক্ষণ একজন মানব।এই মেয়ে যে অসংখ্য গুনে গুন্নানিত সেটা সে বুঝে।জিয়ানাকে সবচেয়ে বেশি টানে অসহায় মানুষজন।বিশেষ করে পথশিশুদের প্রতি কনসার্ন বেশি।
জিয়ানার সচেতন হয়ে চললেও শুধু মাত্র নিবিড়ের সাথে জড়িয়ে গেছে দেখে তার শত্রু সংখ্যা নিবিড়ের শত্রুর সমান।
সবচেয়ে ভয়ের হচ্ছে মেহেদীর চুপ করে থাকা।সেদিনের পর একবারের জন্যও না নিবিড়ের সামনে এসেছে আর না জিয়ানার।
ঝড়ের আগে যেমন প্রকৃতি একেবারেই শান্ত থাকে। মেহেদীর ব্যাপারটা ঠিক তেমন মনে হচ্ছে নিবিড়ের কাছে।পনেরদিনের ছুটিতে এসে আবার ফিরে গেলেও ,নিবিড় খবর পেয়েছে সে আসলে ইউএসএ তে যায়নি।গেছে মালেশিয়া।কিছু যে একটা পাকাচ্ছে এটা নিশ্চিত।
যে কোন স্তব্ধতাই যে বড় কোন আক্রমণের পূর্বাভাস।তাছাড়া বন্ধুরুপী শত্রুর তো অভাবই নেই।
আকাশ এক বোতল স্কচ এনে রাখলো আড্ডার মাঝখানে।নিবিড় তাকে গিফট দিয়েছে। মূলত জিয়ানার কোচিং এর খবরটা আকাশই তাকে দিয়েছে।আকাশের আজ ঈদ ঈদ লাগছে ভাবতেই যে ,ভালো পদ পাবে কমিটিতে।
স্কচের বোতল দেখেই ছেলেপুলেদের চোখ চকচক করে উঠলো। বাংলা খাওয়া ছেলেদের কাছে এর চেয়ে লোভনীয় আর কিছু নেই।একপ্যাক গলা দিয়ে নামলে যেনো জীবন ধন্য।
তাদের লোভীষ্ঠ লোক দেখে আকাশ বলে উঠলো ,
-ভাইলোক! এক বাজি হো যাইয়ে?
সমসুরে সবাই বলে উঠলো “জরুর জরুর কিউ নেহি?”
-দলের প্রধান আর উনার পিএর আজ অফিসিয়াল বাসর। বলতো দেখি কার বাসর পন্ড হয়ে যাবে?
আবার সবাই সমসুরে বলে উঠলো “নিবিড় ভাইয়ের”
তারপর সবাই ঘর কাপিয়ে হেঁসে উঠলো। সজল নামের এক ছেলে জিজ্ঞেস করে ,
-ভাই এইটা তো ওপেন সিক্রেট। নিবিড় ভাইয়ের যদি ২০০%মন থাকে বাসরে তবে ভাবি মাইনাস ২০০% এ অবস্থান করবে।মাঝখান থেকে ভাইয়ের বংশদণ্ড কার্যক্ষমতা হারাতে পারে।
সবাই হাঁসে একচোট। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ চলতে পারে না আকাশের ধমকে।
-বড় ভাইয়ের নিয়ে অসভ্যতামী?
কপট মেকি রাগ দেখিয়ে আকাশ জিজ্ঞেস করে আবার বলে উঠলো ,
-এখন তো ভাই নাই বলাই যায়। বাজি নিবিড় ভাইকে নিয়ে না। বাজি হইলো মক্কু ভাইকে নিয়ে।ভাইয়ের বাসর হবে নাকি হবে না?
অধিকাংশই বললো হবে।কিন্তু আকাশ বলল
-নাহ হবে না।মাইয়া মানুষ হেব্বি ত্যাড়া।এরা যখন বুঝবে পুরুষ তার জন্য মরিয়া তখন তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে।
তো কাল পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকুক এই স্কচ বাবু।বাসরের আলামত পাইলে বোতল তোদের। আর না পাইলে আমার জিনিস আমার কাছেই ফিরে আসবে।
পাপির দল হৈহৈ করে বলে উঠলো “এই জিনিস সামনে রেখে ঘুম হবে না। বাজিতে আমরা জিতা।মক্কু ভাই বিজয়ী হবে একশো পাঁচ পার্সেন্ট নিশ্চিত।
আকাশের কনফিডেন্সে ভাটা পড়লেও বোতলে কাউকে হাত লাগাতে দিলো না।
রাতের প্রথম ভাগের সমাপ্তি লগ্ন চলছে।কিন্তু জেনির রান্না শেষ হয়নি।অধৈয্য মক্কুর অবস্থা পানি ছাড়া মাছের মতো। রান্নাঘরের এককোনায় দাঁড়িয়ে আছে ঘাপটি মেরে।জেনির ওড়না বুকের উপরে প্যাচিয়ে কোমরে বাধা।চুল গুলো ঘাড়ের উপর হাত খোপা করা।গরমে নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘামের উপস্থিতি।একমনে শশা আর টমেটো কেটে সালাদ করতে ব্যাস্ত সে।একেবারে গৃহিণী লাগছে। পেছনে অস্থির স্বামী নামের পুরুষের ছটফটানি চোখে পড়েনি।
সালাদ করে একটু টুকরো টমেটো মক্কুর মুখে দিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-লবণ ঠিক হয়েছে? আরও কিছু এড করবো? বাদাম দিবো?
-না না আর কিছু লাগবে না।চল খাওয়া শুরু করি।
-আরেহ আমার শাওয়ার নিতে হবে।একেবারে ঘেমে গেছি।আপনাকে দেই আপনি খেতে থাকুন।
-মাথা খারাপ? একসাথে খাবো। তাছাড়া আমার খাবারের ক্ষুধা নেই। বউয়ের ক্ষুধা।
জেনির ফোনে টুং করে মেসেজের শব্দে সে মক্কুর কথা তেমন শুনেনি।ফোন চেইক করে বলে,
-ফুলের সজ্জা ছাড়া আমি বাসরে যাচ্ছি না মুসাদ্দিক।
বলে নিজের লাগেজ থেকে রেগুলার ওয়ার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।
মক্কু জেনির কথা বুঝতে পারলো মিনিট পাঁচেক পর। বুঝার সাথে সাথেই ছুটলো বাজারের দিকে।এত রাতে মরা ধরা কিংবা গাঁধাফুল পেলেও চলবে। তবুও চায় ফুলসজ্জা।
প্রায় ত্রিশ মিনিট পর মক্কু ফিরে এলো হাতে পলিথিন ভর্তি ফুল নিয়ে।মরাধরা না ভালো ফুলই পেয়েছে।ওয়াশরুম থেকে এখনো পানি পড়ার শব্দ আসছে।এতদীর্ঘ সময় লাগে জেনির গোসলে?কি জানি মেয়েদের সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। লাগতেও পারে।পার্টির এক ছেলে আছে। যে সারাদিনে একবার টয়লেটে বসে।এবং এক বসাতেই একঘন্টা।বাসা থেকে মেরে ধরেও তার এই বদ অভ্যাস ছাড়াতে পারেনি।
মক্কু একবার জিজ্ঞেস করেছিলো
-কি করিস এতক্ষণ?
উত্তরে বলেছে
-প্রথম ত্রিশ মিনিট ঘুমাই,পরের ত্রিশ মিনিট গেইম খেলতেই চলে যায়
-তো এগুলা তো রুমেই করতে পারিস?
-ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে আম্মার হেব্বি পেদানি খাওয়া লাগে।তাছাড়া বাথরুমে খেললে আমারে কেউ হারাইতে পারে না।হাগা আমার জন্য লাকিচার্ম।”
জেনিরও হইতো এই টাইপ কিছু আছে। আপন মনে ভেবে গোলাপের পাপড়ি সব বিছানায় বিছিয়ে দিলো।মাঝখানে বেলির মালা দিয়ে লাভ সেইপ দিলো।বিছানার মাথার দিয়ে গাঁধা ফুলের মালা ঝুলিয়ে দিলো যত্ন করে।
আর কিছুক্ষণ পর ফুল গুলো পিষ্ঠ হবে তাদের চাপে ভাবতে মনে মনে উদ্দীপ্ত হলো মক্কু।
জেনি এখনো বের হচ্ছে না দেখে ওয়াশরুমের দরজায় হাত রাখে সে।এবং হাত রাখার সাথে সাথেই দরজা খুলে গেলো। ভেতরে জেনি নেই।কিন্তু ঝর্ণা ছাড়া। কি হলো ব্যাপারটা মক্কু কিছু বুঝতে পারলো না। রান্নাঘর ,সিঙ্গেল রুম ,বেলকনিতেও যখন পেলো না জেনিকে মক্কুর বুকে একটা মোচড় দিলো।জেনি কি তাকে এখনো মেনে নিতে পারেনি? তাহলে এত আয়োজন করে সংসারের লোভ দেখানো এগুলা নিশ্চয় মিথ্যা না। সন্দেহ আর কষ্ট সাইডে রেখে পকেট থেকে ফোন বের করে।
ফোনের উপরেই ভাসছে জেনির লম্বা মেসেজ,
মুসাদ্দিক
আপনার মন বাসনা আমি বুঝতে পারি।এটা স্বাভাবিক। আমার উপর আপনার পূর্ণ হক আছে।আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মানি।আজকেই প্রথম আর আজকেই শেষ আমি আপনার সাথে মিথ্যার আশ্রয় নিলাম। ঘন্টাখানেক আগেও আমি জানতাম না ,আমাকে বের হতে হবে।
আমরা আমাদের কাজের একটা লাষ্ট অপারেশনের জন্য অনেকদিন থেকে অপেক্ষায় ছিলাম। জিয়ানাকে খোজে পেলে আজ আমাকে বের হতে হতো না।তামান্না আমাকে জানায় আমাদের টার্গেট আজ খুব কাছাকাছি এসেছে।তামান্না একা পারবে না।আর পারলেও তাকে আমি একা ছাড়তে পারি না।
আমি আপনাকে একটা সুন্দর সংসার দিবো এই কথাটা দেয়ার আগে ,হাতের কাছের সকল ধর্ষকদের শাস্তি দিবো এটা শপথ করেছিলাম।
আজকের মাধ্যমে আমরা এই কাজ বাদ দিবো।পরবর্তীতে শুধু পাবলিক এওয়্যারনেস নিয়ে কাজ করবো।আজকের রাতটা আমাকে মার্জনা করুন প্লিজ।আর কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবো না।প্রমিজ।
খাবারটা খেলে খুব খুশি হবো (লাভ ইমোজি)
মক্কু ডাইনিংয়ে ঢেকে রাখা খাবার গুলোর দিকে একবার তাকালো। তারপর চাবি নিয়ে বের হয়ে গেলো ক্লাবের উদ্দেশ্যে।
“চিতা বাঘকে সবচেয়ে ধূর্ত প্রানী বলা হয়। এরা কখনো নিজের টার্গেট মিস করে না।আমি এ যাবত নিবিড়কে লেপার্ড ভেবে ভুল করে এসেছি।কিন্তু এই ছেলে জাত চিতা।”
বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলো ওসি হাবিব।
-হাবিব!আমি এই বিষয়ে কোন সাহায্য করতে পারছি না।নিবিড়ের সাথে আগে তবুও হাই হ্যালো সম্পর্ক ছিলো কিন্তু মামুন ইসলামের চালে আমি এমন ভাবে আটকে গেছি এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব না।পদের লোভ দেখিয়ে আমার সাথে চুক্তি করেছিলো। বিনিময়ে কে রিপোর্ট করেছে এটা জানার জন্যও আমাকে ব্যবহার করে।মাঝখান থেকে জিয়াউলের পরিবার পথে বসলো।ওদের কাছে আমি মুখ দেখানোর মতো অবস্থাতেও নেই।নিবিড়ের কথায় ঠিক আমি আসলে রাজনীতিতে নাদান।
বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শ্যামল হাসান। তারপর কি মনে করে উঠে একটা ফাইল এনে দেখিয়ে বলে,
-এই ব্যাপারে যদি কেউ সাহায্য করতে পারে তবে সেটা একমাত্র স্বপ্না।কিন্তু মামুন ইসলাম এমন ভাবে বাড়িটা পাহাড়ায় রাখে একটা কাক পক্ষিও বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারে না। আর পারলেও স্বপ্নার কাছ থেকে কিছু জানা অসম্ভব। এই ফাইলে ওই পরিবারের যাবতীয় সম্পদের হিসাব উল্লেখ আছে।ভ্যাট পর্যন্ত এরা ফাঁকি দেয় না।ওদের বিরুদ্ধে কথা বলার কোন ফাঁক কোকর পর্যন্ত নেই।
-আচ্ছা আমাকে লাষ্ট একটা সাহায্য করুন। রাফিন ইসলাম।সন অফ রুপক মন্ডল। মানে এই ছেলেটা হিন্দু?তাহলে মুসলিম হলো কিভাবে?
-শোনা কথায় বিশ্বাস আমি করি না তবুও সাসপেন্সের খাতিরে বলছি।রুপক নাকি নীলুফাকে বিয়ে কররা জন্য ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম হয়েছিলো।এবং পরবর্তীতে রাফিনকে মামুন দত্তক নিলে তাকেও নিজের টাইটেল দিয়ে মুসলিম বানায়।স্বইচ্ছায় নাকি অন্যকিছু সেসব জানি না।তবে রাফিন ছেলেটা রুপকের গুন পেয়েছে।যদিও আমার সাথে ওইভাবে কথা হয়নি লোকমুখে শোনা।
-জ্বি উনার আচার ব্যবহার অতি উত্তম। তবে আমি এখন যে কথাটা বলবো সেটা অতি উত্তম না।
দুই চুমুকে চা শেষ করে কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে বলে ওসি হাবিব।শ্যামল হাসান সোজা হয়ে টানটান করে বসে এবার।ওসি হাবিব বলেন ,
-জিয়াউলের স্ত্রীর ট্রান্সফার বিশেষ সুপারিশ প্রাপ্ত।এবং এই সুপারিশ করেছে রাফিন ইসলাম।এমন কি জিয়াউলের মেয়ে জিয়ানার সাথে একটা সম্পর্কও গড়ে উঠেছিলো কয়েক মাসে এখানে আসার পর।
-তুমি কি বলতে চাচ্ছো এইসব প্রি-প্ল্যান করা?
-বাকিটুকু শুনলে বুঝতে পারবেন কি প্ল্যান চলছে।জিয়াউলরা মগবাজারে একটা ব্যস্ত এলাকায় থাকতো।হঠাৎ একদিন রাফিন ওকে ফোন দেয় টিউটর হয়ে।একটা বনেদি ধনী পরিবারে বিলংস করে তার নিশ্চয় টিউশনের টাকার প্রয়োজন নেই?
শ্যামল হাসান সোফায় শরীর এলিয়ে বসে মুচকি হেঁসে বলে,
-কিন্তু লাভ তো কিছু হয়নি?নিবিড় সব পন্ড করে দিয়েছে।
-একদম।সাথে মেয়েটাকে এমন ভাবে ঘিরে রেখেছে ধরি মাছ না ছুই পানি।
তুড়ি মেরে বলে ওসি সাহেব।
-তুমি কি করতে চাও?
-আমি কিছু করবো না।শুধু দেখবো। এখানে সেয়ানে সেয়ানে
লড়াই।আমরা দর্শক।
নিবিড় ঝুকে জিয়ানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল”এমন ডাবের স্বাদের মতো কোন মানুষ হয়? “তারপর লম্বা জিহবা বের করে জিয়ানার ঠোঁট থেকে নাক বরাবর একটা লিক করলো। “উয়াক “করে ধরফরিয়ে উঠে বসে জিয়ানা।
এবং কোলে স্যাসিকে দেখে ভ্রু কুচকে আশেপাশে নিবিড়কে খোঁজে। তারপর নিজের মাথায় নিজেই ঘাট্টা মারে স্বজোরে।অজ্ঞানের মেডিসিনের তার মাথার ঘিলু নিশ্চিত গলে গেছে।কোথায় বিলাই আর কোথায় নিবিড়।
কিন্তু সে না একটু আগে ড্রয়িংরুমে ছিলো। না না ওই বন্ধরুমের দরজায় ছিলো।নিবিড়ের কি যেনো হয়েছিলো। মাথা আবার যখন ঠিকঠাক কাজ করা শুরু করলো ,তখন জিয়ানা ফট করে উঠে দাঁড়ালো। স্যাসিকে কোলে নিয়ে হেটে আগায় সেই কক্ষের দিকে।দরজার কাছে এসে জিয়ানা থমকায়। ছলাৎ করে উঠে বুকের বাপাশের যন্ত্রটা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে যান্ত্রিক এক যন্ত্রের টুংটাং শব্দ।সাথে ভরাক্কি এক পুরুষ কন্ঠের সুর। কানপাতে একেবারে দরজার উপর।
আইসা দেখা নাহিন খুব সুরাত কই
জিস্ম জাইসে অজন্তা কি মুরত কই
জিসম জাইসে নিগাহোঁ পাহ জাদু কই
জিসম নাগিমা কই
জিসম খুশবু কই
জিসম জাইসে মহাশক্তি হুই চন্দনী
জিসম জাইসে মাছলতি হুই রাগনী
জিসম জাইছে কিহ খিলতা হুয়া ইক চমন
জিসম জায়েসে কিহ সুরাজ কি পাহলি কিরন
জিসম তারশা হুওয়া দিল কাশ এ দিল নিশীন
চন্দন চন্দন
মারমারেন মারমারেন
হুসনে জান কি তারিফ মুমকিন নাহি
আফরিন আফরিন
আফরিন আফরিন
তুভি দেখে আগর তো কাহে হাম নিশীন
আফরিন আফরিন
আফরিন আফরিন
(রাহাত ফাতেহ আলী খানের গান)
জিয়ানা স্তম্ভিত। নিজের হাতে নিজেই কামড় বসায়।আবার স্বপ্ন দেখছে নাতো? ব্যাথা পেলো বেশ।নাহ স্বপ্ন না।কিন্তু এই কোন সুখনীল নিবিড়? এত দরদ যার গলায়। সে কেনো দিনের আলোতে এত কঠিন? সেকোন নিজেকে আবৃত রাখে ঘনকালো মেঘে।তার চারপাশে কেনো বজ্রমেঘ? চাইল্ডহুড ট্রমাটাই কি শুধু? নাকি আরও কিছু আছে? বাচ্চা ,ফুল আর গান যে ব্যাক্তি পছন্দ করে তার অন্তর কখনো কঠিন হতে পারে না।
নিবিড়কে কবিতা আওড়াতেও শুনেছে জিয়ানা।এই লোক আস্ত এক রহস্য।জিয়ানা হাত বাড়ায় দরজার দিকে।আবার হাত গুটিয়ে আনে। জিজ্ঞেস করলে কোন উত্তর পাবে না।কিন্তু জিয়ানাকে যে জানতে হবে সব।কেনো পরিবার থাকতেও উনার এত লনলি লাইফ? যে পরিবারে পালিত পুত্রের স্থান সম্মানের সহিত থাকে। সেই পরিবারের নিজ রক্তের সাথে কিসের শত্রুতা?
জিয়ানার উত্তর চায়।এবং উত্তর সব এই বন্ধঘরেই আছে নিশ্চিত। এই ঘরে ঢুকতে হবে জিয়ানাকে। আপাতত আংকি পাংকি কিছু করবে না।তাই আস্তে করে সরে আসলো দরজা থেকে।
সকালের পর আর খাওয়া হয়নি।পেটে চুহা দৌঁড়াচ্ছে এখন।স্যাসিকে নামিয়ে আশেপাশে দেয়াল ঘড়ি খোঁজে। রাত ঠিক কতটা গভীর জানা দরকার।তার ব্যাগ পড়ে আছে টি টেবিলে।দ্রুত পায়ে ব্যাগের কাছে পৌঁছায়।সারাব্যাগ হাতড়েও ফোনের হদিস পেলো না।মেইন দরজায় বিশাল এক্সট্রা তালা ঝুলানো।তাকে কি বন্দী করে রাখবে নাকি?
আগে কিছু খাওয়া দরকার। জিয়ানা আর বন্দী এক পাল্লায় যায় না।হেঁসে হেঁসে ফ্রিজ খুলে। কিছু ক্লোড কফির ক্যান,সসেস ব্রকলি আর ডিম আছে।
সব বের করে রান্নাঘরে নিয়ে যায়।বরাবরের মতোই তুলা রান্নাঘর। আহা জীবনেও মনে হয় ব্যবহার করে নাই।সব নতুন। এই লোকের বাথরুম দেখতে হবে কেমন।সেটা নিশ্চিত ব্যবহার না করে নতুন রাখেনি।কি জানি এলিয়েন মার্কা ব্যাটা এমনটা হতেই পারে “নিজের বাথরুম হাগা যাবে না।যাই ক্লাবে গিয়ে নোংরা করে আসি।আফটার অল আম সুখনীল নিবিড় ”
একেবারে নিবিড়ের গলা কপি করে ব্যাঙ্গ করে বলতে বলতে একটা নন্সটিক প্যান চুলায় দিলো।একমাসে জেনির কাছে বেসিক কিছু রান্না শিখেছে।তানা হলে খালার রান্না খেয়ে খেয়ে জিয়ানা যুদ্ধ ছাড়া শহীদ হয়ে যেতো।
একটা ডিম পোজ করলো অল্প ব্ল্যাকপেপার দিয়ে।দুইটা সসেস চির চির করে কেটে হালকা গ্রিল করে নিলো।তারপর ক্লোড কফির ক্যান হাতে নিয়ে সিসার সিলটা একমোচড়ে খুলে অল্প টেস্ট করলো।ভালো আছে টেস্ট। তারপর সবগুলা খাবার নিয়ে সোফার দিকে বসলো।
জিয়ানা যেই ঝুকে সসেসে হাত বাড়াবে পেছন থেকে একটা কাটাচামচ ঘ্যাচাং করে সসেসের বুক ভেদ করে চলে গেলো।পরপর দুটা সসেসই গাথা হয়ে গেলে সেটা আপনা আপনি উপরে উঠলো।তারপর জিয়ানার মাথার উপর দিয়ে তার পেছনে দাঁড়ানো ব্যাক্তির মুখগহ্বরে প্রাচার হয়ে গেলো।জিয়ানার কাছে মনে হলো এটা মুখ না ব্ল্যাহোল।এত বড় বড় দুইটা সসেস দুই কামড়েই তামাম।তারপর কাটাচামচ দিয়ে আবার ঘ্যাচাং করে ডিম ওমলেটের কুসুমে বসিয়ে দিলো। জিয়ানার মনে হলো ওইটা কুসুম না তার অন্তরে গেথেছে। একই তরিকায় ডিমটা নেয়ার সময় একফোঁটা জিয়ানার গালে পড়লো। জিয়ানা একবার শুধু ব্লিংক করে।এরমাঝে রাক্ষসটার ডিম খেয়ে কফিতে হাত দেয়া শেষ।
জিয়ানা হা করে ছিলো পুরা দুই মিনিট। তার দশমিনিটের রেডি করা রান্না নিবিড় দুইমিনিটেই খতম করে দিলো।
জিয়ানা দাঁড়িয়ে রাগে কিড়মিড় করে প্রশ্ন করে ,
-এটা কি হলো? একে তো কিডন্যাপ করেছেন আবার আবার খাবার ছিনতাই করেও খেয়ে ফেললেন।
নিবিড় কফিতে চুমুক দিয়ে বলে,
-আমার ঘরে আমার খাবার আমাকে না বলে খাওয়া। তাহলে কে হলো ছিনতাইকারী?
-কিসের আপনার ঘর? বউ হই আমি আপনার।আপনার সব আমারও।
-ওও আচ্ছা? তাহলে বউকে কে কিডন্যাপ করে?
-অজ্ঞান করে নিয়ে এসেছেন মানে কিডন্যাপই।অত কথা বুঝি না।যান আমাকে খাবার এনে দেন।আমার পেটে ইন্দুর দৌঁড়াচ্ছে।আর কফি আমার খাওয়া ছিলো।আপনি আমার এঁটো খেয়েছেন।
ভ্রু নাচিয়ে বলে জিয়ানা।ভাবখানা এমন যেনো সে একপ্রকার জিতে গেছে।
-জামাইয়ের আগে বউদের খেতে নেই।তাহলে সংসারে অকল্যাণ হয়। যাও ফ্রিজে আছে আবার রেডি করে খেয়ে নাও।হাজবেন্ড ওয়াইফ একে অপরকে খায়। এঁটো আর এমন কি?
বলে মেইন দরজার দিকে য্য নিবিড়।অপরদিকে এমন খোলামেলা কথায় জিয়ানার কান ঝিঝি করে উঠলো।নিজেকে সামলিয়ে প্রশ্নে করে,
-ফালতু কথা আমার সামনে বলতে আসবেন না। আমার ফোনটা দিন।আর একটা ঘড়িও নেই ঘরে।কয়টা বাজে?
-ফোন পাবা না আর।বাজে রাত দুইটা তেইশ।ফালতু কথা ,ফালতু কাজ সব শুনতে হবে আর সহ্যও করতে হবে।
-এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে ,
-বউগিরি শুরু করেছো আসতে না আসতেই? নেশা করতে যায়। যাবা?
-ওইসব না খেয়ে গু খেতে পারেন না।যত্তসব পাপিষ্ঠ লোক।আর শুনোন আমাকে এখানে এনে খুবই রিগ্রেট করবেন। আর আপনাকে কি ঘুমের মাঝে বোবাজ্বীনে ভর করে? এমন করে গোঙাচ্ছিলেন কেনো?
নিবিড় উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে আর শুনতে পায় জিয়ানার পরবর্তী কথা।
-যাদেরকে বোবাজ্বীন ধরে তাদের একা ঘুমাতে নেই।কবে জানি ঠেসে মেরে দেয় তার ঠিক নেই।
বলে আবার ফ্রিজ খুলে। আর নিবিড় বের হয়ে যায় বাসা থেকে।মনে মনে ভাবে,
“বোবা স্মৃতি তাড়া করে”
সন্ধ্যা থেকে টানা ঘুমানোর কারণে জিয়ানার ঘুম উধাও। কতক্ষণ পায়চারি করলো।বারান্দায় সুখুর সাথে বকবক করলো।সুখু নামের তোতাটা তাকে দেখেই চাঁদ চাঁদ করে উঠে।জিয়ানার যে খারাপ লাগে তানা। বেশ ভালোই লাগে বরং। এত আদরের ডাক একটা পাখি হলেও তাকে ডাকছে এই বা কম কি?
তিনটা বেডরুম অথচ দুইটাই লক করা। ঘুরেফিরে এসে নিবিড়ের কাবার্ডের সামনে দাঁড়ায়।এইটা লক করা না।হাত বাড়িয়ে খুলে ফেলে একটা দরজা।অতি আশ্চর্যজনক ভাবে প্রত্যেকটা জামাকাপড় সুক্ষ্ণভাবে গোছানো।জিয়ানার মাথা ঘুরে গেলো এত সুবিন্যস্ত করে প্রতিটা শার্ট আলাদা ঝুলানো।সেটাও আবার কালার ওয়াইজ ডিভাইড করা।প্যান্ট ভাজ করে প্রতিটার উপর নিচ প্লাস্টিক দেয়া।যেনো একটা ধরে টান দিলে সুরুৎ করে চলে আসে। আর অন্যগুলাও এলোমেলো না হয়।লা জবাব বুদ্ধি লোকটার। মারহাবা।পাঞ্জাবি ,কাবলি ,টাউজার আলাদা আলাদা পার্টিসনে রাখা।সবচেয়ে পরিপাটি করে রাখা আন্ডারওয়্যার গুলো।আন্ডারওয়্যার দেখেই জিয়ানার মাথায় তখনকার খাবার কেড়ে নেয়ার প্রতিশোধের স্পৃহা এলো।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৩
রান্নাঘর থেকে কেচি এনে সবগুলো আন্ডারওয়্যারের পেছনে ইমোজির ফেসে ডিজাইন করলো নিপুন হাতে।এবং কল্পনা করলো পড়ার পর বামে একটা চোখ টিপ দেয়ার ইমোজির খালি অংশ দেখা যাচ্ছে।
আপন মনে কিছুক্ষণ হেঁসে লুটোপুটি হলো। তারপর ফটাফট ভালোমতো সব ভাজ করে রেখে দিলো।
আরও লাগতে আসবি জিয়ানার সাথে? খেলা শুরু করেছে নিবিড় আর শেষ করবে জিয়ানা।
