Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৫
আশিকা আক্তার সোহাগী

“আমি নিজের ভুল ঠিক যতদ্রুত ক্যাচ করতে পারবো ,সেই ভুল শুধরে যত তাড়াতাড়ি নিজেকে বদলাতে পারবো, তবেই অন্যকে বদলানোর আশা করতে পারবো। সম্পর্ক ভাঙার চেয়ে সম্পর্ক সুন্দর করা সহজ না?”
বলে জিয়ানা জেনির কুলে শুয়ে পড়ে।জেনি ফুলে উঠা কপালে হাত বুলিয়ে বলে,
-মানলাম তোর ফিলোসোফি। কিন্তু নানু একটা কথা বলে , স্বামীর যত্নে চল্লিশের বুড়ি হয় ছুরি আর অবহেলায় ষোল বছরের ছুরি হয় বুড়ি। যে পুরুষ যত যত্নবান সে নারী তত ভাগ্যবান। আল্লাহ কেনো তোর ভাগ্যেই এমনটা লিখেছেন?

-অহেতুক আল্লাহকে দোষ দিয়ো নাতো আপি।
-নিজের ভাগ্যকে মেনে নেয়ার মেয়ে তো তুই না জিয়ু? কোথায় গেলো তোর ফাইটিং স্পিরিট?
-কার সাথে ফাইট করবো বলতে পারো? নিজ স্বত্ত্বার সাথে ফাইট করা যায়? আমি যার অংশ তার পূর্ণ অধিকার কাছে আমাকে যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যবহার করার।
-হ্যা সেটা ভালোবাসার ব্যাবহার হবে।এখানে তো সেটা নেই তাইনা?
-প্রতিটার ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া আছে না? যেহেতু ভালোবাসে না তাই আঘাত করছে।সিম্পল।
-এইভাবে মার খেলে তো মরে যাবি।সে তোকে কষ্ট দিতে চাচ্ছে আর তুই দুই হাত বাড়িয়ে সে গ্রহন করছিস?
-যাবো।সমস্যা কি?আমি বেঁচে থেকে কার কি উপকার হচ্ছে?তাছাড়া জিয়ানাকে কষ্ট দেয়ার ক্ষমতা কারো নেই।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-জীবন কি ছেলে খেলা?
-হুম আমার জন্য মেয়ে খেলা।
-একবার শান্ত মাথায় ভেবে দেখ।পুলিশি কমপ্ল্যাইন কর। ডিভোর্স নে।ফ্রিলি লাইফ লিড কর।এত অল্প বয়সে জীবন এভাবে থেমে থাকতে পারে না।
-প্রতিদিন তো আয়ু ফুরাচ্ছে। থেমে আছে কই? সুখকে ছেড়ে যেতে পারবো না।উনি অসুস্থ।আমাকে মেরে যদি ফোবিয়াটা কাটে তবে সেটাই হোক।হি নিড লাভস।অতিরিক্ত রাগী মানুষের ভালোবাসার ঘাটতির থাকার জন্য তারা এমন।
সম্পর্কের চেয়ে মূল্যবান কিছু এই ধরিত্রীপুরে নেই আপি।এমন কোন ইস্যুকেই স্বামী স্ত্রীর উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত না।

-এমন গোড়া দের মতো কথা বলছিস কেন?লাইফে ইনজয়মেন্টের ব্যাপার আছে না? সেটা পাবি তুই কখনো নিবিড়ের কাছে?তোর মতো একটা মেয়ে ভালো একটা হাজবেন্ড ডিজার্ব করে।
-জীবন এত ক্ষুদ্র যে প্রতিটা মুহুর্তই এনজয় করতে হয়।সেই মুহুর্তটা হতে পারে আনন্দের কিংবা বিষাদের।আর আমি কি ফুলের গন্ধে ঘুমিয়ে যাওয়া রাজকুমারী যার জন্য টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কোন রাজকুমার আসবে?তাছাড়া ওইসব অলম্বুস রাজকুমার আমার পছন্দ না।সুখই ঠিক আছে।
-ঠিক আছে? কোন দিক দিয়ে?পারবে তোকে সুখী করতে?
-বিবাহিত পুরুষের কামনার শেষ নাই কিন্তু আমার জামাইয়ের কামনার শুরুই নাই।এমন এক্সসেপশনাল মানুষ আছে কোথাও?
-হেয়ালি করছিস? লাইফ নিয়ে হেয়ালি কিভাবে করিস? আর সব জায়গায় লজিক চলে না।এত লজিক্যাল মানুষ আমার পছন্দ না জিয়ু।

-তুমি ইমোশনাল আমি লজিক্যাল।মানুষ মানেই এই দুইশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আমি তোমার ইমোশনকে ছোট করে দেখছি না আপু।কিংবা দেখার সুযোগ নাই।কিন্তু আমি ইমোশনালি ভাবতে পারি না।ইমোশন আসবে আর যাবে। কিন্তু লজিক স্থির। আমি বিয়ের দিন থেকেই সুখকে লজিক্যালি স্বামী হিসেবে মেনে তো নিয়েইছি এমনকি এই মুহূর্ত থেকে লজিক্যালি ভালোওবেসে ফেলেছি।
-ভালোবাসা লজিক দিয়ে হয়?
-আমার হয়।
-তোর ভেতরে যে একটা হাহাকার আছে সেটা কি তুই জানিস?
-হ্যাঁ মধুর হাহাকার।
ওইসব ছাড়ো আপি।আমাকে এটা বলো বিবাহিত মেয়েদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কি? ডিটেইলস বললো?ইনক্লুইড ইষ্টুপিষ্টু।প্রতিদিন সকালে গোসল করতে হয় তাই না?

-জিয়ু?
-আরেহ বল না? আচ্ছা তোমরাও ইষ্টুপিষ্টু করেছো?কেমন….
জেনি মুখ চেপে ধরে পিঠে চড় লাগিয়ে বলে,
-বেয়াদপের বেয়াদপ।বড় বোন মানে না। কেন তোর জামাই নাই? এতই গান গাইলি তার ,তাকে বলবি।
মুখ চেপে ধরায় জিয়ানা কাকিয়ে উঠলেও কন্ঠে দুষ্টুমির ছাপ এনে বলে,
-ভালো বুদ্ধি দিয়েছো তো! কিভাবে বলবো? ওই ভন্ডনেতা চলেন আমরা ইষ্টুপিষ্টু করি।
জেনি আর জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে।জিয়ানার হাঁসি ভেতরে রুটহীন।সে ওই নীতিতে চলে “পৃথিবীতে এমনিতেই তো কষ্ট দুঃখের শেষ নেই। অহেতুক সে কেনো আরও একটা কষ্ট বাড়াবে।”

তাছাড়া সে জেনে গেছে নিবিড়ের মনের কথা।এখন মুখে যতই অস্বীকার করুক জিয়ানা তো এর শেষ দেখে ছাড়বে।ব্যাটা রোবটকে প্রেম শিখাবে কিন্তু জিয়ানা নিজেই তো গতানুগতিক ভাবে প্রেম করতে জানে না। তার ভাষায় প্রেম মানে একজন আরেকজনের সাহারা হওয়া।যাকে ভালোবাসি তাকে পূর্ন স্বাধীনতা দেয়া।যাকে ভালোবাসি তার মানসিক শান্তি হওয়া।যাকে ভালোবাসি তাকে বিনাবাক্যে বিশ্বাস আর ভরসা করা।
মনে মনে আরেকটা কথা ভাবলো ,নিবিড়ের ফোবিয়ার ঘটনা এখনো ক্লিয়ার না।তবে ছোটবেলায় তাদের কিডন্যাপের সময় ভায়োলেন্স কিছু দেখেছে যা তার মস্তিস্কে স্থায়ী ভাবে বসে গেছে।এখন জিয়ানার বাকি কথাগুলা জানতে হবে। তাকে যেতে হবে নূর ম্যানসন।
অপরদিকে চাবি নিতে এসে নিবিড় ,জিয়ানা আর জেনির সম্পুর্ন বিকচিত শুনে চোখ বন্ধ করলো। হনহনিয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে মক্কুকে বলল,

-ঝামেলা শেষ হলে সাইকাইট্রিসের কাছে যাবো।মনে করিস। এজ সোন এজ পসিবল।
মক্কু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না।নিশ্চিত হওয়ার জন্য কানে আঙুল দিয়ে নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-ভাই আমি কি ভুল কিছু শুনলাম?
নিবিড় মক্কুর মাথায় চাট্টি মেরে বলে,
-এইবার ঠিক শুনেছিস?
-আলহামদুলিল্লাহ ভাই। অনেক খুশি হইলাম।আজ যদি পুলিশি ঝামেলা না হয় তাহলে আজকেই চলেন।
-দেখা যাক।
বলে মক্কুর হাত থেকে আকাশের বাইকের চাবি নিয়ে নিজেই বসে বলে,

-চল শহরটা চক্কর দেই। আজ কেনো জানি পাখি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে।কিংবা শঙ্খচিলের আদলের একটা ঘুড়ি।মেঘের দলের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে ,
“সুখনীল নিবিড়ের একজন আছে।যে তাকে নিয়ে ভাবে।নিবিড় শুধুই নিবিড় না ,সে সুখ ”
মক্কু খুশিতে নিবিড়কে জড়িয়ে ধরে।নিবিড় মক্কুর শার্টের কলার ধরে দূরে সরিয়ে বলে,
-আজ থেকে সুখনীল নিবিড় একজনের প্রাইভেট প্রোপার্টি। নো ঝাপ্টাঝাপ্টি। দূরে সর।
-ভাই বাসর করেও এত আনন্দ লাগে নাই আজ আপনার চেহারা দেখে যতটা লাগতাছে।
নিবিড় মুখটা থমথমে করে ফেললেই মক্কু কান ধরে বলে ,
-অতি আবেগে বলে ফেলছি ভাই।
-ইটস ওকে মক্কু।চল নিরিবিলি শহরটা ঘুরি।

জনগন বিপ্লবীকে পছন্দ করে কিন্তু বিপ্লবীর সাথে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা বড্ড অপছন্দের।আবার একজন বিপ্লবী ঠিক যতটা সমাদৃত হয় লোকসমাজে। ঠিক উল্টোটা হয় সেই বিপ্লবী যখন রাষ্ট্র নায়ক হয়।ইতিহাস সেটাই বলে।মাও সেতুং, ফ্রিদেল কাসতো আর শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যাক্তিরা ছিলেন সফল বিপ্লবী। কিন্তু তাদের রাষ্ট্র পরিচলনা নিয়েই যত অভিযোগ।একসময়ের কঠিন সফল বিপ্লবীরা ক্ষমতার লোভে গনতন্ত্রকে পরিবারতন্ত্র বানিয়ে হয়ে উঠেছেন কঠিন সব ফ্যাসিস্টে। ক্ষমতার স্বাদ এতটাই বেশি যে ক্ষুদ্র একজন মানুষ নিজেকে ভাবতে শুরু করে সর্বেসর্বা। তাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে করে চলে যত অনাচার।

তাই এইদেশের মানুষ বিপ্লবীদের পছন্দ করলেও , অনেকেই রাজনীতিবিদদের পছন্দ করে না। তাদের সকল অপরাধ যেনো ওপেন সিক্রেট।কোন ভালোঘরের সন্তানকেও এইসব নোংরা রাজনীতিতে বাবা মারা জড়াতেও দেন না।আকাশের পরিবারেও একই চিত্র।বাবা মা সুনামধন্য ডাক্তার হলেও ছেলে ভার্সিটিতে উঠেই জড়িয়ে গেছে সস্তা রাজনীতিতে।ধরে বেধেও আটকানো যায়নি।নেতা তার অন্তপ্রাণ। নেতার কথা শিব খেরের বানি যেনো। ক্লাবই তার ঘর সংসার। নিবিড়ের কাছেও অনুনয় বিনয় করেও লাভ হয়নি উল্টা আকাশ বাবা মার সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটা বিশেষ সার্জারী করে মিড নাইটে ডাক্তার সুবহান লাউন্সে বসে কফি পান করছিলেন।তখনই নিউজে আকাশের গুরু নিবিড়ের কুকীর্তির গুনগান চলছিলো।স্থানীয় থানায় মামলা হয়েছে এই কথা শোনার পরই আকাশের নাম্বারে ফোন দিলেন। ফোন সুইচড অফ। সেইফটির জন্য আকাশের ব্যাচমেট তালহার নাম্বার রেখেছিলেন।এই একটা ছেলেকে উনার পছন্দ পোলাইট আর ইন্টিলিজেন্ট ছেলেটা। দরিদ্র হওয়াই ক্লাবের খরচে পড়াশোনা চালায়।এইজন্য না চাইতেও হইতো পলিটিক্সে জড়িয়ে গেছে।ফোন রিসিভ হতেই চমৎকার বিনয়ের সাথে সম্পুর্ন সালাম দিলো তালহা। তারপর আকাশের দিকে ফোন বাড়িয়ে পা দিয়ে ঠেলা দিলো। আকাশ ঘুমে ঢুলছিলো চেয়ারে বসে।ফোন হাতে নিয়ে বলে,

-কইয়া ফেলান।
-দিন দিন ভাষাটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তোমার আকাশ।পাঁচ মিনিটের মাঝে বাড়ি ফিরবে।এর যেনো নড়চড় না হয়।
-পাঁচ মাসেও ফিরা হয় কিনা সন্দেহ আব্বু।কট খেয়েছি। যদিও ভুয়া সব।
-ক্রিমিনালি যে তোমরা করো সেটা তো একজন ব্লাইন্ড পাবলিকও বুঝবে।সারাদিন ড্রিংক্স করা ,রাস্তা ঘাটে মেয়েদের টিজ করা ,চাঁদাবাজি ,টেন্ডারবাজি এইসবই তো তোমাদের প্রধান কাজ। রাইট?
-না আব্বু। ওই গুলা জুনিয়ররা করে।আমরা এখন সিনিয়র হয়ে গেছি।ভদ্র কাজগুলা আমাদের আন্ডারে।তোমার প্রমোশন লাগলে বইলো করায়ে দিবোনি।ফোন দিয়ে ভালো করেছো আমার মাথার ঝিমঝিমানি তুমি আর আমার বউ ছাড়া কেউ কাটাতে পারে না।

-নিজ পিতার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেই ম্যানার্সটুকুও গিলে ফেলেছো?তোমার লেখাপড়া করার দরকার নেই।ভিসা রেডি করে দিবো চাচ্চুর কাছে ফ্লোরিডায় চলে যাবে।গিয়ে কামলা গিরী করবে তবুও এই অধঃপতন দেখতে পারছি না।
-ওকে করো। আমিও একটা বউ যোগার করি। হানিমুনে যাবো। ওহ্যা জেলে পড়লে দেখতে যেয়ো কিন্তু। না গেলে আমি মাইন্ড করবো না যদিও। আলাবু।
বলে ফোন কেটে দিলো আকাশ।ছোট থেকেই সে একাই মানুষ। গভর্নেস দিয়ে কি আর বাবা মায়ের স্বাদ পাওয়া যায়? তার পুরা শৈশব ঘেটেও কোথাও মনে পড়ে না ,ফ্যামিলির সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ডের কথা।একসাথে ছুটির দিনটা কাটানোর কথা। কিংবা একবেলা আব্বু আম্মুর মাঝখানে বসে আহলাদ করে মিল নেয়ার কথা।তার রোবটিক জীবনে একমাত্র অর্জন বেষ্ট স্কুল এন্ড কলেজ ,বেষ্ট টয়স ,বেষ্ট ড্রেসেস ,বেষ্ট গেইম সেটাপ ,বেষ্ট ফুড।কিন্তু সব ছাপিয়ে যায় যখন দেখতো স্কুলের অন্য বাচ্চারা নিজের বাবা মার আঙুল ধরে গাড়ি থেকে নামতো , তাদের পরিবারের কথা শুনে আকাশ স্বপ্ন দেখতো তার বাবা মা একটু সময় বের করে তাকেও স্কুলে দিয়ে যাচ্ছে কিংবা সবাই একসাথে রেস্টুরেন্টে বসেছে।

হ্যাঁ তাদেরও একসাথে বিভিন্ন ইভেন্টে যাওয়া হয়েছে। ওইতো ডাক্তার এসোসিয়েশনের নানা প্রোগ্রামে।যেখানে সব ডাক্তার আর তাদের ফ্যামিলা থাকতো কিন্তু বাচ্চাদের আলাদা কিড জোনে বাচ্চা রাখা হতো।
আকাশের ব্যাস্ত বাবা মা নিজ ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচুর সিরিয়াস ছিলো সেই সাথে সিরিয়াস ছিলো ছেলেকে বেষ্ট লাইফ দেয়ার। কিন্তু সন্তানের জন্য সেরা উপহারই যে হচ্ছে বাবা মার সময় দেয়া সেটা কজন বাবা মা জানেন? আকাশ অভ্যস্ত ছিলো ওই লাইফে।কিন্তু ভার্সিটিতে এসে সে খোলা আকাশ দেখেছে।মুক্ত বাতাসের গন্ধ পেয়েছে।পেয়েছে কড়া ব্যাক্তিত্বের এক ভরাট গলার পুরুষকে। যে তার আইডল। সুখনীল নিবিড়কে দেখে সে তার প্ল্যান, মোটিভ সব বদলিয়ে ক্লাবে যোগ দেয়। এই ক্লাবটাই তাকে শান্তি দেয়। শ’খানেক রিলেশন করেও কোন মেয়ের মাঝে যা পায় না এই ক্লাব এই ভাই ব্রাদার তার সেই শান্তির জায়গা।
তাছাড়া নিবিড়ের হসপিটালিটি ,ছোট ভাই হিসেবে পরম স্নেহ ,ভুলের জন্য কড়া শাসন ,সঠিক গাইড লাইনের জন্য এই ক্লাবটাকেই নিজের পরিবার মনে হয়।
অবশ্যই সে শুনবে বাবা মার কথা।কিন্তু ভার্সিটি লাইফ সে নিজের মতো করে লিড করতে চায়।

নিবিড় ঘন্টাখানেক ঘুরে আবার বাসার নিচে এসে দাঁড়ায়।মক্কু নিবিড়ের দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থা দেখে বলে,
-ভাই আপনারই বউ।কাছে যাইতে বুধ শুক্র গ্রহের হিসেব করা লাগবে না।
নিবিড় মক্কুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-কয়টা বাজে?
-সাড়ে তিনটা।
নিবিড় সিঁড়ি বেয়ে উঠা শুরু করলো। মক্কুও তার পেছন পেছন। ঘুমে ঢুলু ঢুলু দারোয়ান মেকি হাঁসি দিয়ে রাখলেও মনে মনে গালিগালাজ করছিলো।
নিবিড় ফ্ল্যাটে ফিঙ্গার প্রিন্ট লক খুলে সটান ঢুকে যায়।ড্রয়িংরুম ফাঁকা হওয়াই বেডরুমে উঁকি মেরে দেখে দুইবোন ঘুমে কাদা।নিবিড় মক্কুকে ইশারা করে ,

-তোরটাকে উঠা।
-এতরাতে উঠাউঠি কি ঠিক হবে ভাই? ওরা যেমনে ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। আমরা ড্রয়িংরুমে বসি।
নিবিড়ের চোখ লাল করা দেখে মক্কু আর কথা না বলে রুমে ঢুকে জেনিকে কোলে করে সোফায় বসে।নড়াচড়ায় জেনির ঘুম ছুটে যায়। সোজা হয়ে বসে মক্কুর দিকে কটমট করে তাকায়। সেই অবস্থাতেই মক্কু টপাটপ জেনির গালে চুমু খায়। যতক্ষণ না সেই কটমট চাহনি নরম হয় ততক্ষণ চুমুর ঝড় চলতেই থাকে।
নিবিড় নিজের পরিধেয় বস্ত্রের উপরিভাগ খুলে ফ্লোরে রেখে জিয়ানার পাশে শুয়ে পড়ে। কাটা ঠোঁট আর ফুলে উঠা কপাল দেখে নিজের উপরই রাগ হয়।নিজের রাগের যদি একটু কন্ট্রোল সে করতে পারতো আজ তবে সবার সাথে অল্প হলেও সুসম্পর্ক থাকতো।পরক্ষণেই জিয়ানার ঘুমন্ত তেলতেলে মুখের দিকে তাকিয়ে শিথিল হয়ে আসে মন মেজাজ।আস্তে করে আওড়াই,

“পূর্নিমা রাতের আকাশের চাঁদ
আর তোমার মুখখানা যেনো একই রকম।
গভীর রাতে বিশ্ব যখন নিদ্রামগ্ন ,
চাঁদ তখন আকাশে আর তুমি ঘুমন্ত
আমি ভাবি দেখবো কাকে?চাঁদকে নাকি তোমাকে।
-মিনহাজ তানভীর ”
জিয়ানা চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
-আজ পূর্নিমা না ,যতসব ভাওতাবাজি।
নিবিড় না চমকিয়ে হেঁসে বলে ,
-জার্নালে না পড়ে এক্টিং করতে পারতে?
-আপনিও পলিটিক্স না করে কবি হতে পারতেন।
-কথায় আছে কবিরা হেটে গেলে গদ্যকারদের রাস্তা ছেড়ে দিতে হয়। অনেক সম্মানের সেই পথ।আমার সেই যোগ্যতা নেই।

-পলিটিক্স করতে যে কোন যোগ্যতা লাগে না সেটা ইন্ডাইরেক্টলি স্বীকার করলেন?
-লাগে। অনেক অনেক কুটনৈতিক চিন্তা লাগে।সেই চিন্তা যার বেশি সেই এই ফিল্ডে টিকে থাকতে পারে।
-আপনাকে না জানিয়ে ওইঘরে ঢুকার জন্য দুঃখীত।এইবার আপনিও মাফ চান।
-সরি।
জিয়ানা ফট করে উঠে বসে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে ,
-ওরেহ বাস।এটা কি দি গ্রেইট সুখনীল নিবিড় নাকি? তার আত্মা?
নিবিড় মুচকি হেঁসে জিয়ানাকে একহাতে টেনে নিজের কাছে এনে বলে,
-কি জানলে ওই ঘর থেকে?
-আপনার মাইন্ড অনেক থ্রিল। অধিকাংশ জানতেই পারিনি।

-অতি চালাকি করলে অনেক সময় সহজ জিনিস চোখে পড়ে না।মাঝেমধ্যে সহজ চিন্তাও করে দেখবা।
জিয়ানা ভ্রু কুচকে ভাবে। সহজ কঠিন সবই তো এপ্লাই করেছে।নিবিড় আরও বলে,
-কাল হইতো আমার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার শুরু হবে আর না হয় শেষ হয়ে যাবে।তোমাকে এই ফ্ল্যাটে রাখা উচিত হবে না।কিছুদিন আড়ালে থাকতে হতে পারে তোমার। অন্তত আমি যতদিন ভেজাল মুক্ত না হচ্ছি।
-কাল কি হবে? কট খেয়েছেন?
-না ভুয়া নিউজের উপর ডিপেন্ড করে মামলা হয়েছে।সমস্যা সেটা না তবে রেজাউল সরকার সমস্যা। সবাই তার পালতু তো তার সুরে তারই লিখা লিরিক্স গাইবে সবাই ,সমসুরে।
-আপনি কি সরাসরি তাকে এক্সপোজ করতে চেয়েছিলেন?
-হুম।

-ভুল তো এখানেই।বড় গাছ কাটার আগে মগডালে একটা মই বাধা হয় প্রথমে তারপর ডালপালা সব ছেটে ফেলা হয়।সর্বশেষ চারপাশে কাটা হয়। তবেই মাঝা যতই শক্তই হোক আফটার সাম টাইম আপনা আপনি ভেঙে পড়ে।
-ক্লিয়ারলি বলো।
-উনার বড় মেয়ের জামাইয়ের জাল টাকার ব্যাবসা আছে।সেটা এক্সপোজ করুন, ছোট মেয়ে যতপ্রকার ড্রাগস আছে সব নেয়,পুত্র আমেরিকায় মেয়েবাজি করে বেড়ায়।আর স্ত্রী চাকরির জন্য মোটা টাকার কমিশন নেন।
-এগুলা কম বেশি সবাই জানে। তবে প্রমাণ নেই।
-প্রমাণ আমি বের করে দিবো আপনাকে। আগে বলুন আপনার উদ্দেশ্য কি?
-ক্ষমতা।
-স্থানীয় নির্বাচন?
-উমহু। জাতীয় নির্বাচন।
চরাক করে উঠে বসে জিয়ানা।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ,

-বুর্জোয়া শক্তির কাছে আপনি মামলি এক ইনসান। কই আগারতলা আর কই নিবিড়তলা।
বুর্জোয়া কথাটা শুনে নিবিড়ের হাঁসি পেলেও হাঁসি সংবরণ করে জিজ্ঞেস করে ,
-কেন আমাকে তোমার মামলি ইনসান মনে হলো?
-জাতীয় নির্বাচন করতে শতকোটি টাকা খসবে। আছে আপনার এত?
-নেই কিন্তু হয়ে যাবে।
-কিভাবে?জিয়ানার গলায় প্রচুর কৌতুহল।নিবিড় সেটা বুঝে জিয়ানাকে টেনে নিচের শরীরের সাথে মিশিয়ে বলে,
-যৌতুক নিবো শ্বশুরবাড়ি থেকে।
-ওই হ্যালো। শ্বশুরবাড়িই তো নেই আবার যৌতুক।নাইস জোক।বলুন আপনার প্ল্যান কি? ভয় নেই আমি আপনার বিপক্ষে নির্বাচন করবো না।
নিবিড় জিয়ানার গলায় নাক ডুবিয়ে বলে,

-বাপের নাম খাটিয়ে হিউজ চাঁদাবাজি করবো তোমার কথা মতো বুর্জোয়া শক্তির কাছ থেকে।কাইন্ড অফ ব্ল্যাক মেইল।
-খবিশ আদমি। নিজেকে হিরার মতো বানান।তবে দেখবেন টাকা ছাড়াও কাজ হয়।
-হিরা হয়ে কি লাভ? সে নিজেই তো স্বার্থপর। যে নিজে জ্বলজ্বল করে কিন্তু অন্যকে আলোকিত করে না।অপরদিকে দশটাকার মোমবাতি নিজে পুড়ে কিন্তু অন্যকে আলো দেয়।
-ফালতু লজিক পুরাই।অন্তর হিরার মতো করতে বলেছি।ক্ষমতায় না যেয়েই দুই নাম্বারি চিন্তা আমি নিজেই আপনাকে ভোট দিবো না। যদি চেয়ার পেয়েও যান মোটা মোটা নেগেটিভ নিউজস ছাপাবো জার্নালে।

-দিবে না ভোট?
-কাভি নেহি?
-আমি দেই ভোট?
বলে নিজের বিশাল হাত জিয়ানার উদরে বিচরণ করে।
-সরুন এমন কচলাকচলি করছেন কেনো?
-তুমি কচলাকচলির জিনিস তাই।
-আমি কি পিংপং বল নাকি?আহ সুখ ছাড়ুন।
-পাঁচ মিনিট। চুপচাপ থাকো।আমার ভালো লাগছে।
অতপর জিয়ানা চুপচাপ হয়ে যায়।এইভাবে রিকুয়েষ্ট করে বললে সে কিডনিও দিয়ে দিবে। দাঁড়ির খুচা আর সুড়সুড়ি এমন কি। জিয়ানা সেই অবস্থায় অনড় হয়ে প্রশ্ন করে ,
-আপনার মামু শ্যামল হাসানের সাহায্য নিচ্ছেন না কেনো?
-উনার কথা মনে হলো কেনো?

নিবিড় কথা বললে তার ঠোঁট জিয়ানার গ্রীবাদেশে আকুলিবিকুলি করে এতে জিয়ানা পায়ের আঙুল খিচে রেখেছে।বলতেও পারছে না তার সুড়সুড়ি লাগছে। কি এক মুসিবত। নিজের অনুভূতি সাইডে রেখে বলে,
-কারন উনি আপনার শত্রুর শত্রু।
-শত্রুর শত্রু সবসময় মিত্র ভাবার কারণ নেই।তাছাড়া মেরুদন্ডহীন প্রানী কখনোই সুফল বয়ে আনে না। মামা যেদিকে মেঘ সেদিকে মুখ করে রাখে।উনার সাথে আমার পলিসি আগাগোড়া পার্থক্য।
একপর্যায়ে জিয়ানা খিলখিল করে হেঁসে দেয়।নিবিড় মুখ উঠিয়ে আবছা অন্ধকারে নেশাগ্রস্ত হয়ে সেই ঝংকার করা হাঁসি দেখে।ঠা ঠা করে রুমের ওয়ালে বাড়ি খাচ্ছে প্রতিটা হাঁসির ইকু।এরচেয়ে শ্রুতিমধুর আর কোন শব্দ পৃথিবীতে নিবিড় খোঁজে পেলো না।জিয়ানা নিবিড়ের তাকানো দেখে হাঁসি থামিয়ে বলে,

-দেখুন আপনার দাঁড়ির খুচায় আমার সুড়সুড়ি লাগে।
নিবিড়ের মুগদ্ধতায় ভাটা পড়লো। কপালে কয়েকটা ভাজ এনে প্রশ্ন করে,
-তোমার আমাকে ফিল করা উচিত তানা না এই মুহূর্তে কেউ হাঁসে?
-ফিলের সাথে হাঁসির কোন সংঘাত আছে? নাই তো তাহলে ফিল করা আর হাঁসা একসাথে জায়েজ।
-জায়েজ টেনে ব্যাপারটাকে মিসলিডিং থেকে বাঁচানো জার্নালিস্টের বৈশিষ্ট্য।আচ্ছা ধরলাম ফিল করেছো? কোথায় দেখি?
জিয়ানা নিজের পা নিবিড়ের কাছে এনে পায়ের আঙুল দেখিয়ে বলে,
-এই যে এইখানে। ফিলে তারা কুকরে যায়।
নিবিড় অপরহাতে খপ করে পা টেনে ধরে।

-আঃ! পা ধরছেন কেনো? ছাড়ুন।
-রাস্তাঘাটে এই পা দিয়ে আমাকে অনেক কিক দিয়েছো। এখন আবার এত আদব?
-আপনার কৃতকর্মের জন্যই খেয়েছেন।বারাবাড়ি একদম পছন্দ না আমার।
নিবিড় পা ছেড়ে আবার জিয়ানার গ্রীবায় মুখ রেখে লম্বা শ্বাস টেনে ,শরীরের অর্ধেক ভর জিয়ানার উপর ছেড়ে বলে,
-আমি অনেক ক্লান্ত জিয়ানা।একটু ঘুমাই এখানে?
জিয়ানা কিছু বলে না।মিনিট তিনেক পর নিবিড়ের নিশ্বাস ভারি হয়ে আসে।জিয়ানার শরীর ঝিরঝির করে। নিবিড়ের একহাতের উপর জিয়ানা শোয়া। আরেক হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে জিয়ানাকে।
জিয়ানার অনুভূতি ঝিরিঝিরি থেকে শিরশিরে পরিনত হয়।
পাবলিক বাসে পুরুষের ঘামের গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতো। অথচ নিবিড়ের শরীরের নিজস্ব পুরুষালী গন্ধটা কেমন ভালো লাগছে তার।নিবিড়ের এত কাছে আসাটাও আজ খারাপ কিংবা অস্বস্তি লাগছে না।
নিবিড়ের ঘুমন্ত মুখটা দেখে নিজের মুক্ত হাতে তার চুলে বিচরণ করে। একঝাক চুল মাথা ভর্তি।প্রথম দিকে জিয়ানা নিবিড়ের চুল দেখলেই মন চাইতো ধরে ঝুটি করে দিতে।আজ ধরে দেখলো চুল গুলো বেশ স্মুদ।জিয়ানার চুলও এতটা স্মুদ না।

হাত বুলাতে বুলাতে নিজেও নিবিড়ের হাতের উপর মাথার ভর ছেড়ে দেয়।মন মনে ভাবে আপনি কাছে আসলে আপনাকে ফিরাবো না কাবলিওয়ালা। আপনার সমস্ত কথা আমার জানতে হবে। এবং আপনার মুখ দিয়েই সব শুনবো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৪

একসময় জিয়ানারও চোখ লেগে আসে।ঘুম ছুটে কলিংবেলের ঠংঠং শব্দে।জিয়ানা নিবিড় দুইজনই উঠে বসে। নিবিড় নিজের ফোন বের করে দেখে ৯টা বাজে।কত বছর পর সে একটানা স্মুদলি ঘুমালো সে হিসেবে গেলো না।বরং ঘুমের মেডিসিন জিয়ানার কপালে ঠোঁট ছুয়ে বলে,
-ধন্যবাদ আমার জিয়নকাঠি। এখন যেতে হবে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৬