Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৩
আশিকা আক্তার সোহাগী

“দানে আনে”
যে যত বড় দাতা তার উপর আল্লাহর রহমত বরকত তত বেশি। এই দান করার শিক্ষাটা মানুষ কোন স্কুল কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটি থেকে পায় না।পায় পরিবারের কাছ থেকে। আর একটা উপায়ে পায় সেটা হচ্ছে জেনেটিক্যাল ভাবে।জিয়ানাও হয়তো জেনেটিক্যালি পেয়েছে এই গুনটা।সে দানে খুব আনন্দ পায়। তার কাছে কিচ্ছু নেই তবুও পারলে বাসায় নিয়ে গিয়ে কিছু দিয়ে দিবে টাইপ ব্যাপার আছে।সব কিছু সে নিজে আকড়ে ধরে থাকায় বিশ্বাসী না।তাছাড়া শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং রাইমস ছোট বেলায় যে শিখেছিলো সেটাও কাজে লাগায় সে।
নিবিড়ের বিছানায় সব গহনা মেলে রেখেছে।পুরো বিছানা ভর্তি হয়ে গেছে।গলার গুলা এক সাইডে ,হাতের গুলা এক সাইডে এইভাবে পার্ট বাই পার্ট আলাদা করে রাখলো।গোল্ডের কালারটা এখনকার গুলার মতো না।বিছানায় বাবু হয়ে বসে দেখে যাচ্ছে সব জুয়েলারি। তার বিশেষ কিছু ফিল হচ্ছে না।আচ্ছা সে কি অস্বাভাবিক? তানাহলে এতগুলা গোল্ড পেয়ে স্বাভাবিক কেউ হলে লম্ফঝম্প শুরু করতো।জিয়ানার গোল্ডের প্রতি কোন ফিলিংক্স আসছে না।তার আসলে কিসের প্রতি ফিলিংক্স?

তখনই বাথরুমের দরজায় খট শব্দ হলো। নিবিড় বের হয়েছে তবে আজ ভেতর থেকেই ট্রি-শার্ট আর টাওজার পড়ে এসেছে।মেডিসিন কাজে দিয়েছে তবে।আরও হও নাঙ্গু। নিবিড় তেপায়ার সামনে গিয়ে চুল মুছছে একহাতে। জিয়ানা সেইদিকে তাকিয়ে ভাবে এই তো তার আস্ত ফিলিংক্স।নিবিড়কে দেখেই যে শরীরে শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে এটাই তবে ফিলিংক্স? এটার কথায় জেনি বলেছিলো? রাফিনের জন্য জিয়ানার এই শিরশির অনুভূতিটা হয়নি।নিবিড়ের শরীরটাও টানে তাকে।নিজের চোখ টেনে সরিয়ে এনে মনে মনে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে।নিজের গালে নিজেই আলতো চাপড় দিয়ে বলে” লুচু বেডি কোনহানকার”
নিবিড় এগিয়ে এসে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-এভাবে সব মেলে রেখেছো কেনো?
-আচ্ছা এই গোল্ড গুলা পুরাতন হওয়ার জন্যই কি কালার একটু ভোতা?
-উমহু।এগুলা সনাতন গোল্ড।দাম একটু কম।
-গোল্ডেরও প্রকারভেদ আছে?
জিয়ানা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। নিবিড় জিয়ানার ফরহেডে টোকা দিয়ে বলে,
-জ্বি মহারানী। আপনি কোন ওয়ার্ল্ডে থাকেন?মেয়ে হয়েও গোল্ডের প্রকারভেদ জানেন না?
-যে ওয়ার্ল্ডে মানুষ খাবার না পেয়ে ম*রে। সেই ওয়ার্ল্ডে এইসব ধাতু আমার কাছে ভুজুংভাজুং ছাড়া আর কিছুই না।
নিবিড় জিয়ানার মুখোমুখি বসে।একহাত জিয়ানার গালে রেখে বলে,
-তুমি যে নীলুফা ইয়াসমিনের মেয়ে সেটা প্রতি নিয়তই প্রমান দিচ্ছো।একটা কথা মাথায় রেখো ,দুনিয়াতে যত বিপদে পড়ে সব ভালো মানুষেরা। খারাপ মানুষেরা আলগোছে পাড় পেয়ে যায়। এই যে তুমি আগাগোড়া ভালো স্বচ্ছ টলটলে দীঘির মতো একটা মেয়ে।তোমার লাইফ দেখো আর আমাকে দেখো?

-এখানে ভালো খারাপের কিচ্ছু নেই।তাছাড়া আমি আপনার চেয়ে সুখের দিক দিয়ে বড়লোক।
-আচ্ছা? কিভাবে দেখাও?
জিয়ানা নিবিড়ের কপালে তর্জনী আঙুল দিয়ে টেপ করে বলে,
-আস্ত একটা সুখই আমার।
-ওহো ভুলেই গিয়েছিলাম।তো সুখকে বাহিরে দাঁড় না করিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকতে দাও।তবেই না সুখ একান্তই তোমার হবে…
জিয়ানা নিবিড়ের মুখ চেপে ধরে বলে,

-আঃ! বাজে কথা রাখুন তো। কাজের কথা শুনোন।আমার একটা বহুদিনের প্ল্যান ছিলো।সেটা সফল করতে আমার বুড়া বয়েস পাড় হয়ে যেতো।কিন্তু আল্লাহ মানুষের নিয়তের উপর যে ভাগ্য লেখে রেখেছেন সেটার প্রমাণ আছ পেলাম।আপনার ফু-আম্মুর একটা জমি আছে আমার দাদুর বাড়িতে।মেইন সড়কের সাথেই অনেকটা জমি একসাথে।এতদিন সেখানে আব্বু মানে জিয়াউল আব্বুর গরুর ফার্ম ছিলো।এখন ফাঁকা।আমার প্ল্যান হচ্ছে সেই জায়গাতে একপাশে এতিমখানা আর একপাশে বাবা-মা আশ্রম করবো।
-বাবা-মা আশ্রম?
-আহা বৃদ্ধা আশ্রম বলতে আমার ভালো লাগে না।তাছাড়া শুধু বৃদ্ধারাই থাকে না তো।ছাড়ুন এইসব।
জিয়ানা হাত নেড়ে নেড়ে চোখ একবার ছোট করে আবার বড় করে কথা বলে।নিবিড় দ্বিধাগ্রস্ত। সে চোখের দিকে তাকাবে ,না হাতের দিকে ,না ঠোঁটের দিকে দেখবে? আজ এই প্রথম নিবিড়ের মনে হলো তার জন্য মাত্র দুইটা চোখ কম হয়ে গেছে।এই মেয়েকে একসাথে দেখার জন্য তার কমছে কম ছয়টা চোখ দরকার। জিয়ানা চোখের সামনে তুড়ি মেরে বলে,

-এ্যাই আপনি টাস্কি খেয়ে আছেন কেন? আমার কথা শুনছেন তো?
নিবিড় মাথা নাড়ে। তারপর উঠে দাঁড়ালো। জিয়ানার সামনে বসলেই তার কেমন কেমন লাগে।ফ্যাসাদের লোকগুলা কি এটাকেই ভালোবাসা নাম দিয়েছে? সত্যি কি আছে এমন জিনিস? ৭০০কোটি মানুষের মাঝে একটা মানুষের জন্য এমন অনুভূত হওয়ার নামই কি প্রেম /ভালোবাসা? নিবিড় মাথা ঝাকিয়ে জিয়ানার কথায় কন্সেন্ট্রেট করে।
-শুনোন সুখ।আমি এগুলা একটাও কখনো ইউজড করবো না।আমার এইসবে কোন ফ্যাসিনেশন কাজ করে না।বস্তুত কোন ধাতুতেই না।তাই প্ল্যান করেছি এখান থেকে আমি চারটা ভাগ করবো।দুইভাগ এতিমখানা আর বাবা-মাস্রম তৈরিতে ব্যবহার হবে।একভাগ এফডি আর করা থাকবে। সেটা দিয়ে মান্থলি খরচ চলবে সেখানের।আর বাকি একভাগ এই বাড়ির মহিলাদের ভাগ করে দিয়ে দিবো।তারাও ভাগিদার এর উপর।আমি কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে যাবো বলুন?

-এইসব নিয়ে তোমাকে অত ট্রিগার হওয়া লাগবে না। বড়-মার ৪০০-৫০০ভরি গোল্ড ছিলো।উনি সবার মাঝে ভাগ করে দিয়ে গেছেন।সবার কাছেই আছে কম বেশি।তবে মেজরিটি আমার বউয়ের জন্য তুলা ছিলো।
-তো আপনার বউ তো আমি।তাহলে আমি চাইলেই যা ইচ্ছা তাই করতেই পারি এগুলা দিয়ে?
-অফকোর্স নট।তুমি আর ফু-আম্মু এক ক্যাটাগরির। তাকেও বেশ অনেকটা গোল্ড দেয়া হয়েছিলো। সে নিশ্চিত হাতিম তাই হয়ে সব বিলিয়েছেন?
-না না। সব বিলিয়ে দেয়নি।ফার্মের জমিটা আম্মু তো জুয়েলারির টাকা দিয়েই কিনেছিলো।এই বাড়ির কোন একজন গোপনে আম্মুর জুয়েলারি আম্মুর হাতে তুলে দিয়েছিলো।এমন কি যত সাহায্য সব করেছেন এই বাড়ির আপনার কোন এক মা।
নিবিড়ের ভ্রুর মাঝখানটাই ভাজ হয়ে গেলো। নীলুফা ইয়াসমিন তো একবস্ত্রে বের হয়ে গিয়েছিলো। তবে উনার জন্য বরাদ্দ করা গোল্ড তো নিজে হেঁটে হেঁটে চলে যায়নি। ভেতরের কেউ সাহায্য করার ফলেই গিয়েছে।এতদিন নিবিড়ের মাথায় এই কথাটা আসেনি একেবারেই।
জিয়ানা আরও বলে,

-এখানে এসে যেটা বুঝলাম এই পরিবারের অধিকাংশই আমাকে সহজ ভাবে নিচ্ছে না।তাদের সাথে সম্পর্ক সহজ করার জন্যও হলেও কিছু দেয়া উচিত না?
-শুনো মেয়ে যত বেশি তুমি সহজ লব্ধি হবা তত বেশি স্বস্তা ভাববে সবাই। নিজেকে মাঝেমধ্যে রিজার্ব রাখা লাগে।তাছাড়া বিপদে আল্লাহর পর অর্থ সম্পদই কাজে লাগে।যখন বিপদে পড়বা কেউ এগিয়ে আসবে না।
বলে আলমারির দিকে আগায়।
-আজকের কথা না ভেবে আমি কালকের কথা আগাম ভেবে রাখি না সুখ।কালকে যদি বেঁচে না থাকি? সম্পর্ক গুলার মাধ্যমে তাদের স্মৃতিচারণের মাধ্যমেই একমাত্র কেউ বেঁচে থাকতে পারে যুগের পর যুগ।অর্থ সম্পদের তো আর সেই ক্ষমতা নেই তাই না?

নিবিড় ঘুরে জিয়ানার দিকে তাকায় আর ভাবে। “সম্পর্ক? তার কাছে সম্পর্কের কোন গুরুত্ব নেই কেনো তবে? নিবিড়কে কি কেউ মনে রাখবে না? এই পরিবার যারা কোনদিনই নিবিড়কে আপন ভাবেনি অথচ স্বার্থের টানে এখন ঠিকই নিবিড় নিবিড় যপে।তবুও সব ভুলে কেনো জিয়ানার মতো সহজ চিন্তা সে করতে পারে না? কেনো মাফ করতে পারে না এই বেইমান পরিবারটাকে? কেনো একটা খুনিকে আগলে রাখে সবাই মিলে? ” বাহিরে পড়ার ড্রেস বের করতে করতে বলে,

-তুমি কত সহজ সুন্দর চিন্তা করতে পারো জিয়ানা।আমি পারি না।আমাকে যে একদিন চিমটি কেটেছিলো আমি সেটাও ভুলিনি।সুযোগ পেলে তাকে আমি বুলডোজার দিয়ে দশহাত মাটিতে পুতে দেই।তোমার আর আমার অনেক পার্থক্য। এর মূল কারণ কি জানো? রুট ফ্যাকটর। তুমি পেয়েছো লাভলী একটা পরিবার। শত উচাটনেও তোমাকে তারা পূর্ণ ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে।আর আমি বিলাসবহুল জীবনে মমতাহীন ভাবে লালিত হয়েছি।
-আপনার জায়গায় আমি হলে পৃথিবীর ভয়ংকর মানুষ হতাম সুখ।আপনি তো বিপথে তেমন জাননি।চাইলেই ফিরতে পারবেন।আর আপনি কি এরিষ্টটলের রুট ফ্যাকটর মতবাদ মানে শৈশবের বেরে উঠার পরিবেশের কথা বলছেন?
নিবিড় মাথা দিয়ে হ্যাঁ বুঝায়।জিয়ানা আবার বলে,

-রুট ফ্যাকটরের কথা উঠলেই যে টাইমস ম্যাগাজিনের সেই প্রকাশকের বইটার কথা আসবে। মানুষের সাফল্য কিংবা মূল্যবোধের জন্য রুট ফ্যাকটর দ্বায়ী না। দ্বায়ী ব্যাক্তির ছোট ছোট চয়েস।
আর আপনি সফলই বলা চলে। ক্যারিয়ার গুছিয়ে ফেলেছেন।এবার পরিবার গুছানোর পালা।
-আমরা নিউক্লিয়ার পরিবার হবো।গুষ্টিসহ পরিবার ভাবার দরকার নেই।
-বইলিং ফ্রগ সিন্ড্রোম গবেষণার কথা শুনেছেন না? ব্যাঙকে পানি সহ আগুনে দিলে প্রথম সে পানির তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে নিজের শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে।তারপর শেষে যখন দেখে আর পারা যাচ্ছে না লাফ দিতে হবে। কিন্তু লাফ দেয়ার শক্তি সে শরীরের তাপমাত্রা বাড়াতে ব্যায় করে ফেলেছে।এবং এর ফলে মৃত্যু হয়।
সময় থাকতে তাই সব কিছু করতে হয় সুখ।বেটার লেট দ্যান নেভার।

-শুনলাম সব।মাথাতেও রাখলাম।যে আমার সাথে ভালো,আমিও তার সাথে ভালো।
-আপনার ভালোটা শুনে কেমন যেন আমার মনে খচখচ করছে।
-ভালো থাকার অন্যতম উপায় মন খচখচ করা।
এরমাঝে দরজায় একজন গভর্নেন্স নক করে জিয়ানাকে নিচে ডেকে গেলো।নিবিড় জিয়ানাকে বলে,
-এগুলা সব তোমার। তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো।তবে তাড়াহুড়ো করে না।আমি আজ সব লকারে রেখে আসি।আস্তেধীরে প্ল্যান করা যাবে।আর পারিবারিক এতিমখানা আমাদের একটা ছিলো।পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন বন্ধ।জায়গা আর ভাঙ্গাচোরা ঘর সবই আছে।তোমার দাদুবাড়ি এখান থেকে অনেক দূর।আমি এখানকারটা ব্যবস্থা করে দিবো সময় পেলে।ঠিক আছে?

আর একটা কথা বেশিরভাগ সময় রুমেই থাকবা। আমি কাজ শেষ করে আর্লি ফেরার চেষ্টা করবো।যতক্ষণ পর্যন্ত বাহিরে থাকবা আসমা তোমার সাথে থাকবে।আসমাকে মনে আছে না?
জিয়ানা মাথা নাড়ায় মনে আছে।যাকে তারা বিচারের মঞ্চ থেকে বাঁচিয়ে এনেছিলো।
জিয়ানা রুম থেকে বের হতে গেলে নিবিড় বাধা দিয়ে বলে ,
-চেইঞ্জ করে যাও।
-না। বউ বউ একটা ফিল আছে এই ঘাগড়াতে।
-বাংলার কোন বউ শ্বশুরবাড়ি প্রথম দিন শার্ট পড়ে আসে?
-সুখের বউ দুখ।
বলে জিয়ানা বের হয়ে যায় রুম থেকে।

“তোমার বিয়ে হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট পুরুষের সাথে তারমানে তুমিও নিকৃষ্ট নও।আছিয়া (রাঃ) ছিলেন পবিত্র আর আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। কিন্তু উনার স্বামী ছিলেন নিকৃষ্ট।অপরদিকে লুত(আঃ) ছিলেন নবী অথচ উনার স্ত্রী ছিলেন পাপিষ্ঠ। ”
জিয়ানা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ফারহানার উদ্দেশ্যে বলা দাদীর কথাটা শুনে।ফ্রেশটেশ হয়ে মুখে স্নো পাউডার মেখেছে বলে ,এখন একটু মানুষ লাগছে ফারজানাকে।স্বপ্না ,কুলসুম আর ফারহানা চায়ের কাপ হাতে বসে আছে শুভ্র সোফাতে।

দাদী সরি তার তো নানু হয়। উনার মাঝে রয়েল একটা ভাব আছে।সবসময় সাদা না হয় অফহোয়াইট শাড়ি পরেন। গলায় একটা লম্বা প্যাচানো বল বল চেইন। হাতে চিকন দুইটা সোনার চকচকে চুড়ি। দুইহাতের আঙুলে চারটা ভিন্ন ভিন্ন পাথরের মোটা আংটি।চশমার উপর দিয়ে চোখ উল্টিয়ে সবাইকে দেখে।তবে হাটার সময় বুকটান মাথা উঁচু এই নিয়মে হাটেন।জিয়ানা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার মাঝেই ভাবে ,উনি ফারহানাকে এই কথা কেনো বলল?নিশ্চিত জামাইয়ের সাথে ক্যাচাল।এসব ভেবে ভেবে উম্মে কুলসুমের পাশে সোফায় গিয়ে বসে।তাকে দেখে স্বপ্নার চেহারা শুকনা বড়ইয়ের মতো হয়ে গেছে।জিয়ানার খুব মজা লাগলো।একটু জাদরেল শ্বাশুড়ি না হলে জমে না আসলে।শ্বাশুড়ি মানবে না বউকে।রাত হলে মাথা ব্যাথার অজুহাতে ছেলেকে নিজের কাছে রাখবে।আহা ক্যা সিন হ্যা।কিন্তু ওইসব সিন নিবিড়ের সাথে চলবে না।সেতো মা ভক্ত খোকা না।সে মা অভক্ত দামড়া।
সোফায় বসার সাথে সাথেই জিয়ানার মনে হলো সে মেঘে ভাসছে।পেটে গুদগুদি মতো হলো, স্প্রিং এর মতো হালকা সুইম হওয়াই।বড়লোকদের সবকিছু এত বাড়াবাড়ি লেভেলের সুন্দর আর আরামের হতে কে বলেছে? এখানে কেউ না থাকলে সে “ফাইভ লিটল মাংকি জাম্পিং অন দ্যা ব্যাড “রাইমসটা বলে একটু লাফালাফি করতো।পরক্ষণেই সিঁড়ি বেয়ে ফাইজাকে নামতে দেখে তার মনে হলো,

পোস্তগোলা মাস্তুল থাইকা উইঠা আসা প্রিন্সেস। যে ঠকঠক করে তাহার চার ইঞ্চির পাদুকা দিয়ে শব্দ তৈরি করিয়া ইহদিগে এগিয়ে আসিতেছে।সাথে আর একটা জিনিস খেয়াল করলো ,ফাইজা বড্ড অস্বস্তি নিয়েই হাঁটছে।আহারে এমন ফ্যাশন কেনো করতে হবে? যেটা কষ্টদায়ক। জিয়ানা আফসোস করে মনে মনে।
কয়েক ইঞ্চি লম্বা হওয়ার জন্য মেয়েরা গোড়ালি কিংবা হাটুর বারোটা বাজিয়ে হিল পড়ে না।কবে কোথায় কেউ হইতো কোন নির্বোধ কে বুঝিয়েছে হাই হিলে হট লাগে ব্যাস তারপর থেকে এদের আর থামানো গেলো না। জিয়ানার কাছে সবথেকে আরাম লাগে পন্স বা স্যান্ডেল গুলা। কিন্তু সেগুলা তো আর বাহিরে পড়ার মতো না।জিয়ানার জুতা গবেষণার ফাটল ধরে পাশ থেকে কারো প্রশ্নের শব্দে,

-তোমরা নাকি এক রুমে আকাম করতে গিয়ে ধরা পড়ছো?পরে স্থানীয় লোকেরা ধরে বিয়া করায়ে দিছে?
অনুরাধার মা জিয়ানার মুখোমুখি সোফায় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে জিজ্ঞেস করে। এই মহিলাকে কোন ভাবেই বাড়ির হেল্পিং হেন্ড লাগছে না।হাবভাবে সেও যেনো একজন কর্তি।ফাইজা আর ফারহানার মুখে চকচকে মুচকি হাঁসি দেখে জিয়ানাও মুচকি হেঁসে বলে,
-না।আমরা বাচ্চা নষ্ট করতে গিয়ে ধরা খেয়েছি।
অনুরাধার মায়ের চা ছিটকে ফ্লোরে পড়লো আর ফাইজার কাশি উঠে গেলো।পেছনে সিঁড়িতে নিবিড়ের পা থেমে গেলো।তিন আঙুল দিয়ে ঘাড় চুলকিয়ে ভাবে,
সে অযথায় চিন্তা করছে এই মেয়েকে নিয়ে।আসলে তার চিন্তা করা উচিত এই বাড়ির মানুষ গুলার জন্য।কি হাল করবে কে জানে?
জিয়ানা স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে বলে,

-মামি! মামা কোথায়? উনাকে যে দেখছি না?
-মামা কে?
স্বপ্না চায়ের কাপ টি টেবিলের উপর রেখে বলে।
-আপনার হাজবেন্ড।
-সে অধিকাংশ সময় বাহিরেই থাকে। সপ্তাহে দুইদিন বাড়িতে থাকে।আজ আসবে। আর আমরা তোমার মামা মামি পরে শ্বশুর শ্বাশুড়ি হই আগে।
কাটকাট গলায় জবাব দেন স্বপ্না।
-যার মাধ্যমে সম্পর্ক পাতাবো সে নিজেই যখন স্বীকার করে না ,সেখানে আমার নিজের সম্পর্কই ঠিক আছে বলে মনে হচ্ছে। তাই না নানু?
কুলসুম ফট করে জিয়ানার দিকে তাকায়।এই পৃথিবীতে তাকেও কেউ নানু ডাকার আছে সেটা ভুলেই বসেছিলো।পূর্ণ্য দৃষ্টিতে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে চশমা খোলে ফেলেন তিনি।ভালোভাবে চেয়ে দেখেন নীলুর সাথে কত মিল মেয়েটার। তবে নাকটা মনে হয় নীলুর না।জিয়ানা বৃদ্ধার হতের উপর হাত রেখে বলে,

-নানু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর আজ পেয়ে গেছি আপনাকে দেখে।
কুলসুম জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়। জিয়ানা আবার বলে,
-আব্বু আম্মু কিংবা আত্মীয় স্বজনদের কারো নাক আমার মতো না।কিন্তু আজ খেয়াল করে দেখলাম আপনার নাকটা আমি পেয়েছি।রাইট?
উম্মে কুলসুম জিয়ানার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখ উঁচু করে ধরে বলে,

-নাহ। নীলুর ছোটবেলায় নাকটা এমনই ছিলো।স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাওয়ার পর গাল ভেঙে নাকটা সরু হয়ে গিয়েছিলো।
তখন নজরে আসে নিবিড়কে।সে সোজা সদর দরজা বরাবর চলে গেছে। সবাইকে যে বলে বাহিরে যেতে হয় ,এই সামান্য মেনার্স টুকু নাই এই ভণ্ড নেতার।জিয়ানা হাক ছাড়ে ,
-এ্যাই সুখ? শুনোন?
নিবিড় ঘুরে দাঁড়িয়ে একভ্রু উঁচিয়ে তাকায় জিয়ানার দিকে।জিয়ানা তড়িঘড়ি করে উঠে নিবিড়ের কাছে গিয়ে ডানহাতের বাহু ধরে টেনে স্বপ্নার সামনে এনে বলে,
-নেন সালাম করুন।ইনি আপনার মামি শ্বাশুড়ি হয়।আর উনি নানী শ্বাশুড়ি।
নিবিড় জিয়ানার ধরা অবস্থায় গম্ভীরমুখে বাহিরের দিকে রওনা হয়।জিয়ানা যেতে যেতেই বলে,
-আরেহ নিজের সম্পর্কও মানবেন না আবার আমারটাও মানবেন না। আপনি মানবেন টা কি? হ্যাঁ?
দরজা পাড় হয়ে নিবিড় জিয়ানাকে বলে,

-ফাজলামি বেশি হয়ে যাচ্ছে না? তোমার এত সম্পর্ক পাতাতে হবে না।
-মুখটা সবসময় এমন গরুর পাছার মতো করে রাখেন কেন?হাঁসতে পারেন না?হাঁসি মানুষের ন্যাচারাল অর্নামেন্টস। একমিনিট হাঁসলে দশমিনিট হাটার সমান।হাসলে স্ট্রেস হরমোন কমে যায়।
-অকারনে হাঁসে পাগলেরা।
-আপনি কারনেও হাঁসেন না।
-হাঁসলে কি নোবেল মিলবে?
-নোবেল না মিললেও অন্যকিছু মিলতে পারে।আজ থেকে ডিল করি চলুন ,আপনি যতবার হাঁসবেন আমি আপনাকে ততবার চুমু খাবো।
কথাটা শুনেই নিবিড়ের মুখ চকচকে হয়ে চমৎকার হাঁসি ফুটে উঠলো। আর জিয়ানা এগিয়ে এসে বলে,

-এই যে এইভাবে চুমুর কথা মনে করে হাঁসবেন। তাহলে আর চুমু খাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
-দড়িবাজ মেয়ে কোথাকার।
জিয়ানাও সেইম নিবিড়কে কপি করে বলে “দঁড়িবাজ মেঁয়ে কোঁথাকার”
তখনই দুইজনের নজরে পড়ে মাইমুনার গাড়ি ভেতরে ঢুকছে।জিয়ানা সেদিকে তাকিয়ে বলে,
-আপনাদের পরিবারের এই একজনই মনে হয় স্বাভাবিক।
-তুমি একবার বলেছিলা না? যদি মনে হয় কারো জীবন সোজা তাহলে আপনি তাকে চিনেন নাই? তোমাকেও সেইম কথাটা মনে করিয়ে দেই, অকারণে যখন কেউ তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসবে তখন বুঝতে হবে হয় ঘনিষ্ঠ রক্তের সম্পর্ক। না হয় গভীর কোন স্বার্থ জড়িত।ভেতরে যাও।
এরমাঝেই আপা বলে মাইমুনার গাড়ি থেকে আসমা দৌঁড়ে এসে জিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

-আমি আগেই জানতাম আপনের আর ভাইয়ার বিয়া হইবো। আল্লাহ আমি যে কি খুশিটা হইছি আফা। জানেন? কিন্তু এই বাড়িতে এত দেরিতে আসলেন ক্যা?
জিয়ানা প্রথমে চিনতেই পারে নাই।পরিবেশ পরিস্থিতি একটা মানুষ কতটা বদলে দিতে পারে।সেই কালো রোগা-সোগা মেয়েটা এখন সুস্বাস্থ্যের সাথে গায়ের রংটাও খুলে গেছে।জিয়ানা আসমার থুতনি ধরে বলে,
-আল্লাহ আফা আমিও আপনারে দেইখা মেলা খুশি হইলাম।পর্থমে তো চিনবারই পারি নাই এইডা আসমা খাতুন।
আসমা কিটকিটে হেঁসে বলে,
-যাহ মজা কইরেন না।
মাইমুনা তার মেয়ে এসে দাঁড়ায় সবার সাথে। পেছনে একজন গার্ডের হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসে।নিবিড় জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,

-আ’ম গেটিং লেট। আই নিড টু গো আউট নাও।বাই।
মাইমুনা নিবিড়ের সামনে দুইহাত দিয়ে আটকিয়ে বলে,
-ভাইয়া ভাইয়া ওয়েট।তোর বউয়ের জন্য শাড়ি এনেছি দেখে যা কোনটা পছন্দ হয়?
-শুক্রবার তার উপর আবার এত সকাল। তুই দোকান খোলা পেলি কোথায়?
-আজ শুক্রবার দেখেই আমি তাশরিফকে বলেছিলাম কাল শোরুম থেকে ফেরার সময় এক্সক্লুসিভ কিছু কালেকশন যেনো বাসায় এনে রাখে।আমি এখন গিয়ে নিয়ে আসলাম।আত্মীয় স্বজন কাল সকাল সকাল আসবে তোর আর রাফিদার বউকে দেখতে।রাফিদাও সকালে তার শ্বশুরবাড়ি গেছে বউকে আনতে। তোকেও কিন্তু থাকবে হবে?
জিয়ানা মাইমুনার কোল থেকে তাহানিকে নিজের কোলে নিয়ে বলে,

-অবশ্যই থাকবে।কোন ধানাই পানাই চলবে না কিন্তু।আচ্ছা আপু সেটা না হয় ঠিক আছে কিন্তু আমাকে এইসবে রেখো না। শাড়ি অর্নামেন্টস এসবে আমি নেই।মুজে মাফ কারদো।
-জিয়ানা যদি শাড়ি চুড়ি পড়ে রেডি হতে পারে তবে আমিও তোদের ফ্যামিলি প্রোগ্রামে থাকবো।
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে পার্কিং এড়িয়ার দিকে চলে যায়।জিয়ানা কটমট করে তাকিয়ে নিবিড়ের যাওয়া দেখে।আর মাইমুনা হেঁসে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
-যেমন ঘোড়া তেমন তার আরোহী। মেইক ফর ইচ আদার।

জিয়ানারা ভেতরে ঢুকে দেখে মেহেদী আর তা মাও এসে সোফায় বসা। মেহেদী জিয়ানাকে আগাগোড়া দেখে চমৎকার একটা হাঁসি দিয়ে বলে,
-তো মালকিন এসেই পড়েছেন নূরম্যানসনে?
জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে মেহেদীর পায়ে খামচা দিয়ে সালাম করে বলে,
-ভালো আছেন শ্রদ্ধেয় ভাশুর?
মেহেদীর পায়ে নখ বসে গেছে নিশ্চিত ছিলেও গেছে হইতো তবুও মুখে মেকি হাঁসি রেখে বলে,
-ছোট ভাইয়ের বউ এসে গেছো এখন আরও বেশি ভালো থাকবো।
ফাইজা কনুই দিয়ে ফারহানাকে গুতো দিয়ে ইশারা করে। ফারহানা রাগে ফুসফুস করছে।
মাইমুনা ব্যাগগুলা ফ্লোরে থেকে নিজের কাছে নিয়ে সোফায় বসে বলে,

-আমি তিন বউয়ের জন্যই গিফট এনেছি।জিয়ানা ভাবির জন্য একটু গর্জিয়াস বাকি দুটাও গর্জিয়াস তবে কম।
তারপর জিয়ানার জন্য বরাদ্দ মেরুন শাড়িটা খুলে দেখায় সবাইকে।অর্জিনাল অর্গাঞ্জার সাথে মসলিনের কারুকার্য করা একটা গর্জিয়াস শাড়ি।শাড়ির আলোতে মনে হচ্ছে সারাঘর আলোকিত হয়ে উঠেছে।জিয়ানা ঢোক গিলে।এই জিনিস পড়লে সে দশবার উষ্ঠা খাবে নিশ্চিত।বাকি দুইটা গোল্ডেন কালার হলেও চমৎকার শাড়ি।
ফারহানা এগিয়ে এসে জিয়ানার শাড়িটা হাতে নিয়ে বলে,
-এটা এখনো শোরুমে লন্স করোনি তাই না? অথচ ওর জন্য এনেছো ঠিকই? আমিও এমন একটা চাই। এডভান্স পে করে দিচ্ছি এখনোই।
-ভাবি এটা একটাই মেক হয়েছে।ডিজাইনের সময়ই আমি সিলেক্ট করে রেখেছিলাম জিয়ানার জন্য।তোমাদেরকেও তো এক্সক্লুসিভ ড্রেস দিয়েছি।
মাইমুনা বিরক্তি নিয়ে বলে। জিয়ানা বুঝতে পারলো মাইমুনা কিংবা তার হাজবেন্ডের নিজস্ব ব্র‍্যান্ডের শাড়ি এগুলা।সে এগিয়ে এসে বলে,

-আপু।এইসবে আমার কোনই ফ্যাসিনেশন নেই। সত্যি বলতে আমি বুঝিও না তেমন পার্থক্য।এটা ভাবিকে দাও।আর নিচের একটা আমি নেই।মামলা ডিসমিস?
মেহেদী হো হো করে হেঁসে বলে,
-ওর কাছে সবার শেখা উচিত কিভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়।এই বাড়ির বেশিরভাগ রাই তো শুধু সাজসজ্জা ,খাওয়া আর নেওয়া ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।যদিও এক একজনের স্যাগি মার্কা খোমা।ছ্যাহ।
একপ্রকার তেতে উঠে ফারহানা। তারপর জিয়ানার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে সরাসরি মেহেদীকে বলে,
-তুমি এই সবার বলতে আমাকে বুঝালে তাই না?আমি স্যাগি হয়ে গেছি? ওও এই জন্যই তো আজ এত বছর থেকে আমার দিকে ফিরেও তাকাও না।তো কাকে ভালো লাগে?
জিয়ানার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার বাহু ধরে মেহেদীর কাছে গিয়ে বলে,

-এমন ন্যাচারাল সুন্দরীকে? কিসের সৌন্দর্য আছে এর? আর কি এমন মহৎ কর্ম করেছে যে গুনগান শুরু করেছো?
ফারহানার ফ্যাচফ্যাচ গলায় মনে হচ্ছে সে কান্না করছে।সবাই ফারহানার এইসব আচরণে অভ্যস্ত। জিয়ানা ঝাক্কি মেরে ফারজানার হাত ছাড়িয়ে বলে,
-তোমার নাম জোনাকি রাখা উচিত ছিলো।যাদের পাছায় সবসময় আগুন জ্বলতেই থাকে তারাই তো জোনাকি।যত্তসব বাতেলা পাবলিক।
কুলসুম ,মাইমুনা,মেহেদী আর মেহেদীর মা হেঁসে উঠে জিয়ানার কথায়।স্বপ্না উঠে চলে যায় সেখান থেকে। আসমা সাইডে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে হেঁসে মনে মনে বলে”ঠিক হয়ছে। মাতব্বরি এহন ছুটবো।এই দুইবোনের ফ্যাসফ্যাসানি আর ভালা লাগে না।এতদিনে আসল মানুষ আসছে”
জিয়ানা মাইমুনার হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে বলে,

-এটাই নিচ্ছি আমি।শুকরিয়া অনেক বেশি সুন্দর শাড়িটা। কিন্তু আমি পড়তে পারি না আপু।
মেহেদীর মা এগিয়ে এসে বলে,
-আমি পড়িয়ে দিবো। আমার ঘরে চলে এসো ঠিক আছে?
-আচ্ছা তাহলে শাড়িটা তোমার কাছেই রাখো আন্টি।আমি আপাতত এই বাড়িটা সার্ভে করে আছি।চল আসমা।
বলে নিজের ঘাগড়া উঁচু করে ধরে হেঁটে বাহিরে বের হয়ে যায়।পেছন পেছন আসমাও যায়।
ফারহানা আর ফাইজা মুখ চুপসে ডাইনিংয়ে গিয়ে বসে। মেহেদী মুচকি হেঁসে কিছুক্ষণ পর সেও জিয়ানারা যেদিকে গেছে সেদিকে যায়।

সকালের মিষ্টতা এখনো রয়েছে।সূর্যের ত্যাজ এখনো বাড়েনি।পায়ের নিচে নরম ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে জিয়ানা ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক চোখে দেখে বিশাল বড় এরিয়ার বাড়িটা।পুরাটা এড়িয়া উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তবে গাছ খুব পাতলা পাতলা ভাবে লাগানো।তিনচারটা আম গাছ সেগুলা আবার বিশাল বড় বড়। বাকি গাছ সব ভুজুংভাজুং। মন্দিরাছাও, দেবদারুতে ভরা। এই গাছ গুলা না ফুল দেবে আর না ফল।
ভারি ঘাগড়ায় তার হাটতে কষ্ট হচ্ছে।তাই ফট করে চেইন আগলা করে খুলে ফেলে সেটা।আসমা হায় হায় করে উঠলেও নিচে জিন্স দেখে থেমে যায়।জিয়ানা আসমার মুখ দেখে হেঁসে দেয়। আসমাকে বলে,

-এটা তোর এখন থেকে। উপরের ব্লাউজও আছে। সাথে ওড়নাও আছে।তুই নিজের বিয়েতে পড়তে পারবি।প্লাস ভাড়াও দিতে পারবি অন্যদের।
নিজের বিয়ের কথা শুনে আসমা লজ্জা পায়।তারপর আমতা আমতা করে বলে,
-এত দামী জিনিস কেউ দেয়? আপনার মাতাত কি সমস্যা আছে আফা?
-আছে বোধহয়। চল পুলেও ওইদিকে একটু যায়।
আসমা ঘাগড়াটা নিচ থেকে উঠিয়ে বলে,
-খাবেন না? সবার নাস্তা করার সময় এহন।
-আমি খেয়ে এসেছি।আচ্ছা চেয়ারম্যান সাব বেশি থাকে না এই বাড়িতে তাই না?

-হ। খালি মামা না এই বাড়ির সকল পুরুষই আওলা জাওলা। মেহেদী স্যার তো পত্তেক রাইত ম*দ খাইয়া গালাগালি করতে করতে বাসায় ঢুকে।আর নিবিড় ভাই তো আসেই না।যাও মাঝখানে একদিন আসছিলো মামার গাড়ি বাইড়াইয়া গোড়াগুড়া করে রাইখা গেছে।হেরে দেখলেই আমার ডর করে।এই বাড়ির একমাত্র রাফিন স্যার স্বাভাবিক আছে।কোন নেশা পানিও করে না।তয় স্যারের মনের মধ্যে মনে হয় খুব দুক্ক।বউ মনে হয় যুতসই হয় নাই। দুইবার আনলো সাতদিন ছিলো বউটা। স্যার অন্যঘরে আছিলো।কন তো এত ভালা মানুষের সাথে এইডা কেমন বেইনসাফি করছে মামায়ে? পোলার মতামত নিবো না আগে।
জিয়ানা ঘুরে আসমার দিকে তাকায়। পেছেন নজর যেতেই ভ্রু কুচকে ফেলে মেহেদীকে আসতে দেখে।মেহেদী কাছাকাছি এসেই আসমাকে বলে,

-আউট।
আসমা জিয়ানার দিকে তাকায়।জিয়ানা ইশারা দেয় যাওয়ার।আসমা চলে যায়। তবে একেবারে না কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।নিবিড়ের নির্দেশ জিয়ানাকে একা ছাড়া যাবে না।
-নিবিড় যে তোমাকে সন্দেহ করে জানো?
-জানলাম।
-তোমার কেমন লাগে এই বিষয়টা?
-ফেউ লাগিয়ে রেখেছে ভেবে খুবই বিরক্ত হতাম।
-ফেউ কি?
-ফেউ ফেউ? এবার ক্লিয়ার?
-ডগি?
জিয়ানা মাথা দিয়ে হ্যাঁ বুঝায়।আরও বলে,

-কাহাতক ভালো লাগে এইসব একই ঘরনার জিনিস বলুন? সারাদিন পেছনে আঠার মতো লেগেই থাকে।তবে দিন যেতেই আমার ধারণা পাল্টে যায়।সুখ আমার পেছনে এমন কাউকেই পাহাড়ায় রাখে যারা আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত। এখন মনে হলেও সম্মান আসে তার উপর প্লাস তার গার্ডদের উপরেও।
-তোমাদের দুইজনের অভিনয়ই চমৎকার।ভালো হাজবেন্ড ওয়াইফের রোল প্লে করছো?দুঃখই লাগে আমার ভাইটা ক্যাপাবল না বউ রাখার।সাইকাইট্রিসের কাছে গিয়ে কি কোন উন্নতি হচ্ছে?
জিয়ানা ঘুরে মেহেদীর দিকে তাকায়।কিসের শত্রুতা এদের মাঝে? এত কেনো চোখে চোখে রাখে সবাই সবাইকে? কেনো কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা ভরসা করে না? মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সম্পুর্ন প্রসংগ বদলে বলে,

-আমার মাঝে একটা ভালো মানুষীর ভন্ডামী আছে।জানেন? দেখবেন ফট করেই কারো প্রচন্ড প্রিয় হয়ে যায় আমি।এর কারণ কি জানেন?আমি অল্প সময়েই খুব দ্রুত সামনের মানুষটার সঠিক প্রশংসা করি।যেমন এই মুহূর্তে আমি আপনার একটা প্রশংসা করতে পারবো এবং এটা একশো পার্সেন্ট শিওর এর আগে কেউ সেটা করেনি।কিন্তু করবো না কারণ আমি দূর দুরান্তেও আপনার প্রিয় হতে চাই না।তবে একটা মতামত দিতে পারি।
-গো এহেড।
-আপনি প্রচন্ড সঙ্গীহিনতায় ভোগেন। এখন পর্যন্ত নিজের একান্ত শখের কাউকে পান নাই।এটা প্রশংসা না।এটা আমার আপনার উপর পর্যবেক্ষণ। আর প্রশংসা হচ্ছে আপনাদের দুই ভাইয়েরই হাঁসি মারাত্মক সুন্দর। আপনি আর সুখ।
-আমরা সৎ ভাই।
-জ্বি জানি।অসৎ তো নন।কথায় আছে সূর্যের চেয়ে বালু গরম। আপনাদের অবস্থাও সেইম।
বলে জিয়ানা একসেকেন্ড আর দাঁড়ায় না।এই লোকটার মুখ যেনো মুখ না আস্ত সেফটি ট্যাংকি।খুললেই কেমন গন্ধ বের হয়।সেই গন্ধে কলিজায় পচন ধরায়।
মেহেদী সামনে বিশাল খালি মাঠের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তোমার সবচেয়ে মূল্যবান দুইটা জিনিস যদি কেউ তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেয় তাকে তুমি কোন চোখে দেখবে?
-করুনার চোখে দেখবো। কারণ কারোটা নিয়ে কেউ বড় হয় না।বুমেরাং হয়ে সবার কৃতকর্মের সুফল আর কুফল ফিরে আসবেই।
যেতে যেতে উত্তর দেয় জিয়ানা।

জিয়ানা দুপুরের খাবার ঘরেই খেয়েছে।আসমা দিয়ে গেছে।খেয়েই যে ঘুমিয়েছে এখনো কোন নড়াচড়া নেয়।সন্ধ্যার প্রাককালে নিবিড় চাবি দিয়ে লক খুলে রুমে ঢুকে। ঢুকেই দেখতে পায় আবছায়াতে ঘুমে কাদা তার বউ। অভার সাইজ ট্রি শার্টের ফাঁকে টামি উঁকিঝুকি দিচ্ছে। নিবিড় বিনাশব্দে। নিজের জামা কাপড় ছাড়ে। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে জিয়ানার পাশে শুয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে।তেলতেলে গালে দুই একটা পিমপল হয়েছে।ঘননেত্র পল্লব একসাথে লেগে থাকায় আরও ঘন দেখাচ্ছে।গালের নিচে হাত রাখায় ঠোঁট গুলা বাবুদের মতো ফুলে আছে।নিবিড় আর নিজেকে সংবরণ করে না।এগিয়ে গিয়ে টুপ করে চুমু দেয় ঠোঁটে। জিয়ানা ফট করে চোখ খুলেই বলে,
-আমার বাস্তবের সব প্ল্যান নস্যাৎ তো করে দেনই এখন স্বপ্নেও হানা দেয়া শুরু করেছেন?
-এবার তোমাকে নস্যাৎ করবো।
-সুখের বাচ্চা মুখে লাগাম দেন।
-নস্যাৎ করলেই না সুখের বাচ্চা আসবে না?

জিয়ানা নিবিড়ের মুখ চেপে ধরে কথা আটকায়।নিবিড়ের বেশ মজা লাগছে জিয়ানাকে বিরক্ত করতে।সে জিয়ানার কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।জিয়ানার কোন হেলদোল না দেখে নিবিড় দুষ্টুমি শুরু করে নিজের হাত দিয়ে।জিয়ানা দাঁতে দাঁত চেপে চুপচাপ শুয়ে থাকে।সে জানে রিয়েক্টশনে বিরক্ত বাড়বে।হাত যখন বিপদ সীমা পাড় করেছে খপ করে ধরে কটমট করে তাকায় জিয়ানা।নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে,
-কি আর পারলা না চুপ করে থাকতে?
জিয়ানা ফটাফট উঠে পড়ে বিছানা থেকে।নিবিড় ফুল দুষ্টামি মুডে আছে সে বুঝে গেছে।ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে নিবিড় বারান্দায় স্যাসির সাথে বসে আছে।জিয়ানা পেছন থেকে বলে,

-নেন।
-কি?
-বাসর রাতে বউকে কিছু দিতে হয়। আপনি যেতেহু দিলেন না তাই আমিই দিলাম।আংটি আপনার পালিত শ্বাশুড়ি দিয়েছে।
-এত এত গোল্ড পেয়েও আরও আশা করছো? আচ্ছা দড়িবাজ মেয়ে তো তুমি? সাথে লোভীও।
-একটু সংশোধন হবে।শুধু লোভী না প্লাস পাপী। লোভীষ্ট আমি।হয়েছে? আমাকে মুখ করে খুশী থাকুন।
-শুধু মুখ করবো কেনো সবই করবো।
-অশ্লীল ব্যাডা।
-আর তুমি মানুষের আজায়গায় কুজায়গায় যে হাত দাও। সেটা কি?
নিবিড় স্যাসিকে রেখে জিয়ানার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে।
জিয়ানা খিলখিলে হেঁসে বলে ,

-কিসমিস দেখলেই আমার চিমটি দিতে ইচ্ছা হয়। কাল ট্রায়াল রুমে আপনি কি করেছেন ভুলে গেছেন?
বলে মিররের দিকে গিয়ে নিজের চুল ঠিক করা শুরু করলো।
নিবিড় নিজ পকেটে হাত দিয়ে কিছু একটা বের করে। তারপর মুঠো মেলে ধরার সাথে সাথে নীলুফা ইয়াসমিনের সেই সোনার চেইনটা ঝুলতে থাকে। নিবিড় “জিয়ানা ” বলে ডাক দিলে জিয়ানা তাকায় আড়চোখে।ঝুলন্ত সেই চেইনটা দেখে দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরে নিবিড়কে।এতে নিবিড়ের শরীরে কারেন্ট এলো যেনো।ফিসফিসিয়ে জিয়ানার কানে কানে বলে,

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫২

-আদর করতে ইচ্ছা হচ্ছে এখন।
জিয়ানা নিবিড়ের হাত থেকে লকেট সহ চেইনটা নিজের হাতে নিয়ে বলে,
-আপনি যে আদর মিন করছেন সেটা পসিবল না।আগে ট্রিটমেন্ট কোর্স কমপ্লিট করবেন। ডাক্তার সার্টিফিকেট দিবে “সুখনীল নিবিড় ওকে নাও” দ্যান আমার কাছে আসতে পারবেন।
বলে নিবিড়কে ছেড়ে কপট রাগ দেখালো জিয়ানা।
-ভয় পাচ্ছো তবে?
-দেখুন মরে যেতে আমার ভয় কখনোই করে না।আজ বা কাল মরতে তো হবেই।কিন্তু চোখের সামনে কাউকে মৃত্যু যন্ত্রণা দেখতে ভয় লাগে খুউব।সেটা যদি আপনি হোন তবে নিজের মৃত্যুই শ্রেয়।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৪