Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৭
আশিকা আক্তার সোহাগী

“বেইমান মানুষ কখনোই কারোর দীর্ঘদিনের সঙ্গী হতে পারে না কারণ তাদের চরিত্রই হলো এক জায়গায় বেশিদিন না টিকে থাকা- কালেক্টেড ”
তাই তো বদিরুজ্জামান নিজের কোন স্থির জায়গা নেই।গাদ্দারি একবার রক্তে মিশে গেলে ,যেকেউ কিনে নিতে পারে।রুহানীর ব্যাডে নগ্ন পিঠে উপর হয়ে শুয়ে আছে বদি।নেশায় অর্ধ জাগ্রত ,অর্ধঘুম।রুহানী নিজেকে কাপড়ে মুড়িয়ে ফোন হাতে নিয়ে কাউকে মেসেজ করে।
মিনিট পাচেক পর দুইজন শক্তপোক্ত গার্ড এলে ,তাদের ইশারা করে নিয়ে যেতে।আজই হইতো ওর শেষ দিন এই ধরনীতে।

ঘন্টাখানেক আগে রেজাউলের বাংলোতে বদি আসে রুহানীর ডাকে।গার্ড সরাসরি তাকে রুহানীর বেডরুমে নিয়ে আসে।বদি আসার সাথে সাথেই রুহানী নিজের শরীরে পরিধেয় নাইটির উপরিভাগ টান মেরে খুলে বদীর দিকে আগায়।বদি স্বল্প বসনার নারীকে দেখে ঘাবড়ে যায়।রুহানী অত্যন্ত লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হেলেদুলে আগায় বদির দিকে।এর আগে নানা ভাবে বদিকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টায় ব্যার্থ হয়ে শেষমেশ আজ এই পন্থায় এসে ঠেকেছে।
রুহানী নিজের সুতানো আঙুল বদির গাল বেয়ে গলা পর্যন্ত স্পর্শ করতে করতে বলে,
-একজনের চামচা হয়ে সবসময় তার পেছনে পড়ে থাকতে চাও?নাকি আমার প্রিন্স হয়ে তার জায়গায় থাকতে চাও?
বদি শুকনো ঢোক গিলে।ক্ষমতার লোভ তার মস্তিস্কে জায়গা দখলের আগে কামনার ছয়লাব। স্বয়ং এমপি কন্যা তাকে অফার করছে ভাবতেই মনে হলো,সে কোন মামুলি আদমি না।নিশ্চয় তার মাঝে এমন কিছু আছে। যার জন্য নিবিড়কে সরিয়ে তাকে চাচ্ছে।
রুহানী বদির গোলগাল চেহারায় নিজের প্রতি কামনা স্পষ্ট দেখতে পেলো।তাই আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-কেমন পুরুষ তুমি। আজ তোমার ক্ষমতা দেখতে চাই।
বদি আর নিজেকে আটকিয়ে রাখতে পারে না।হইতো বেশিরভাগ পুরুষই পারে না।তাদের কামনার কাছে বিবেক বুদ্ধি কিংবা শতবছরের প্রেমও কিচ্ছু না।
বদির উন্মাদনা যখন চরমে তখন রুহানী তাকে থামিয়ে ড্রিংকস করাই।আর আস্তে আস্তে জেনে নেয় নিবিড়ের সব কিছু।বিশেষ করে লুটপাটের পেছনে যে নিবিড় দ্বায়ী সেটার প্রমাণ আছে একমাত্র এই বদির কাছেই।খোজ পেয়েই তাই বদিকেই টার্গেট বানিয়েছে।
রেজাউলের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই নিবিড়ের ব্যবহারের পরিবর্তন রুহানী নিতে পারেনি।তাকে যে ব্যবহার করেছে নিবিড় সেটা বুঝতে আর দেরি হয়নি।খোজ নিয়ে জানতে পারে তার স্ত্রীর প্রতি সে লয়াল।তাই এবার নেমেছে তাকে ব্যবহার করার শাস্তি দিতে।সত্যি বলতে রুহানী নিবিড়কে মন প্রাণ দিয়েই চেয়েছে।কিন্তু খারাপ ভাবে ঠকে গেছে মনে করে সেই ভালোবাসার টুটি চেপে ধরবে এবার।
বদির দিকে তাকিয়ে কুটিল হেঁসে গ্লাস ভর্তি রেড ওয়াইন গলায় ঢেলে দেয়।

পৃথিবীতে দুইটা জিনিসের কোন সীমা পরিসীমা নেই।এক ,মুগদ্ধতা। দুই,সাফল্য।
জিয়ানা আজ এর প্রমাণ পেলো নূর ম্যানসনের হল রুমে ঢুকে।নিচ তলা আর দুতলা যতটা আভিজাত্য দিয়ে ঘেরা তিলতলা ঠিক তার উল্টা।বিশাল বিশাল বনসাই আর ইনডোর প্ল্যানেট দিয়ে সাজানো।উপরের ছাদটা ট্রান্সপারেন্ট পোর্টেবল ডিজাইন।রোদ প্রবেশের জন্য দিনের বেলা হইতো খোলা হয়।একপ্রান্তে একটা চার ইঞ্চি উঁচু স্টেজ। আর একপাশে ফাঁকা ফাঁকা ছোট্ট ছাউনির নিচে পিতলের বড় বড় ঢাকনাওয়ালা বুফে সিস্টেমের গামলা রাখা। এত এত খাবারের পদ সাজানো। গন্ধে মম করছে পুরা হলরুম। ঠিক তার অপজিটে চিকন পানির ফাউন্টেন। যাতে রঙিন অসংখ্য মাছ ভর্তি।পুরা বাড়ি মিলে এই এক হলরুম।এরা বলেছিলো ঘরোয়া প্রোগ্রাম। কিন্তু জিয়ানার দেখে পুরাই এলাহি কারবার।

স্টেজে এনাউন্স হলো।”লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যানস ,প্লিজ পুট ইউর হ্যান্ডস টুগেদার ফর আওয়ার মিডডে জুয়েল ,সুখনীল নিবিড় এন্ড জিয়ানা হক”
জিয়ানা আর নিবিড়কে ডাকা হচ্ছে।যিনি ডাকছেন উনার সাথে এখনো জিয়ানার কথা হয়নি।মাইমুনার হাজবেন্ড তাশজিদ আবরার।হাইট কম একেবারেই। ঘাড়টা অত্যাধিক খাটো দেখে আরও ছোটখাটো লাগে।জিয়ানা বুঝতে পারলো না মাইমুনার মতো চার্মিং একটা মেয়ের এমন বর কেনো।নিবিড়ের পাশে দাঁড়ালে এই লোককে খুজেই পাওয়া যাবে না।

জিয়ানার ভাবনার মাঝে নিবিড় তার হাত আকড়ে ধরে সামনের দিকে হাটা ধরে।ড্রামাটিক ওয়েটে দুইপাশে সবাই সরে গিয়ে মাঝখানের লাল গালিচা উন্মুক্ত করে দেয় তাদের যাওয়ার জন্য।হাটা শুরুর সাথে সাথে দুইপাশ থেকে অজস্র পুষ্পপল্লবের বৃষ্টি শুরু হলো।জিয়ানা বিমুগ্ধ হয়ে চোখ মেলে দেখে চারপাশ।নিবিড়ের হাত শক্ত করে ধরে নিজেও।তার জীবনের গল্পটা কিভাবে যেনো অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগেও একবেলা ভালো খেলে পরের বেলা না খেয়ে থাকতে হতো।অথচ আজ সে লাল কার্পেটে হাটছে।আচ্ছা এই প্রোগ্রামের খরচ কি নিবিড় বহন করছে? নাকি নূর জাহান ফান্ডের? হঠাৎ জিয়ানার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।এই প্রোগ্রামের টাকাটা দিয়ে রাব্বি আক্কাসের লাইফ টাইম একটা এসেটের ব্যাবস্থা করা যেতো।অন্তত পক্ষে ওদেরকেও দাওয়াত দেয়া যেতো।এই সব মোহ বিলাসিতা জিয়ানার জন্য না।
স্টেজে উঠার পর নিবিড় আর জিয়ানা মাঝখানে কাউচে বসে।ক্ষুধায় জিয়ানা চোখে লাল নীল দেখছে।সামনের ছোট টেবিল থেকে একটা সফট ড্রিংকসের ছিপিটা খুলে নিবিড় জিয়ানার দিকে বাড়িয়ে দেয়।জিয়ানা আড়চোখে সেই বোতল দেখে বলে,

-এত সোহাগ দেখাতে হবে না। সরুন।
নিবিড় জিয়ানার দিকে ঝুকে কানে কানে কিছু বললে জিয়ানা অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার দিকে।তখন আবার এনাউন্স হলো ,লেটস ওয়েলকাম আওয়ার নেক্সট কাপেল রাফিন ইসলাম এন্ড সাফা শাখাওয়াত।
তারাও এসে পাশাপাশি বসলো জিয়ানা আর নিবিড়ের সাথে।একে একে সবাই নিজের জায়গায় বসে যায়।এরমাঝে কয়েকজন বয়স্ক মহিলা প্রবেশ করে হলরুমে।সবারই অবস্থা অতি ভদ্রচিত।গায়ের পোশাক আশাকে অভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে।তবে কুচকানো ঠোঁটে সবাই প্রায় লাল লিপষ্টিক দেয়ার ব্যাপারটা জিয়ানাকে অবাক করলো।বুড়ি বয়সেও কি সাজুনি সব। অথচ ও একটু লিপষ্টিক দেয়ায় ব্যাটা ভিমরুল খেয়ে নিলো।ছ্যাহ। ওই যে বলে না ,আমার জীবনে লাভ লস নাই ,জীবনটাই লস।ওইটা এখন জিয়ানারও মনে হলো।
উম্মে কুলসুম সবাইকে নিয়ে জিয়ানার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।সবাই সোনা দিয়ে জিয়ানার মুখ দেখছে।আর এক কথায় বলছে” একেবারেই নীলুর মতো ”
এদের মাঝে একজনকে জিয়ানা চিনে। নিবিড়ের পাশের ফ্ল্যাট যাদের সেই ভদ্র মহিলা।উনি জিয়ানাকে দেখে মুচকি হেঁসে বলেন,

-আজ তোমাকে চেনায় যাচ্ছে না মেয়ে।সেদিন একেবারেই বাচ্চা বাচ্চা লেগেছে আজ একদম রমনী মনে হচ্ছে।
তারপর নিবিড় দিকে তাকিয়েই বলে,
-তো সুখবর শোনাবে কবে?বাচ্চা মানুষ করার বয়স তো এটাই নাকি?
নিবিড় ভাবহীন তাকিয়ে থাকে।নিবিড়কে দেখে জিয়ানার মন চায়, মাথায় ঘাট্টা মেরে হাসাতে।কেমন ম্যানার্লেস হলে একটা লোক জবাব তো দেয়ই না ,বিনিময়ে একটু হাঁসেও না।তাই জিয়ানা বড় করে হেসে নিজেই বলে,
-আপনাদের বাচ্চা আগে মানুষ হোক তারপর না নিজের বাচ্চার কথা চিন্তা করবো দাদী।
বৃদ্ধা একটু থতমত খায় জিয়ানার কথাতে।নিবিড় শুকনা কাশে।পাশ থেকে সাফা ফিক করে হেসে দেয়।গেইষ্টদের ট্যাকেল দেন কুলসুম। সবাইকে খাবারের আয়োজনের দিকে নিয়ে যান নিজ দায়িত্বে। যেতে যেতে কেউ কেউ বলেও ” বউ দেখি খুব কড়কড়ে। ”

জিয়াউল আর আঞ্জুমান এগিয়ে এসে জিয়ানার হাতে একটা খাম দেয়।জিয়ানা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায় তাদের দিকে।জিয়াউল জিয়ানার মাথায় হাত রেখে বলে,
-জ্ঞানিগুনিরা বলেন ,মা বাবা শক্ত না হলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নরম হয়ে যায়। কিন্তু আমি মনে হয় বেশি শক্ত হয়ে ছিলাম তোর প্রতি তাই নারে আম্মু?
জিয়ানা মাথা থেকে জিয়াউলের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে সেখানে চুমু দিয়ে বলে ,

-হ্যাঁ। অবশ্যই।চৌদ্দ পনেরো বছরের একটা মেয়েকে টাক্কু করে দিয়েছো বারবার।বেশি শক্ত না অদ্ভুত শক্ত ছিলে তুমি।তবে আমাকে ট্রেনিংয়ের নামে বেসিক যে বাস্তব মুখী জ্ঞান দিয়েছো আব্বু সেটার জন্য তোমার এই বাড়াবাড়ি ব্যাপারটা একেবারেই মাইনাস হয়ে গেছে।তবে তুমি আর একটু বুড়ো হলে তোমাকেও আমি টাক্কু করে রাখবো। দেখো?
জিয়ানার কথাতে উপস্থিত সবাই হাসে। সবার সাথে মাথা নিচু করে নিবিড়ও হাসে।নিবিড়ের হাসি দেখে সবাই অবাক হয়।এই লোকের হাসি জিয়ানা ছাড়া বাড়ির লোক পর্যন্ত কেউ দেখেনি।জিয়ানার সেই দিকে খেয়াল নেই।সে জিয়াউলের দেয়া খাম খুলে অবাক নেত্রে তাকায়।জমির দলিল একটা।আঞ্জুমান জিয়ানার হাত ধরে বলে,

-এটার মালিক তুই। তাই তোর কাছেই রাখ।
জিয়ানা লজ্জা পায় সেদিনের সেই ব্যবহারের জন্য।সে গলা নামিয়ে বলে,
-সেদিন আমিও ঠিক ব্যবহার করিনি আম্মু।এই জমি আর লাগবে না।সুখদের একটা এতিমখানা আছেই। পরিত্যক্ত হলেও সেখানে আবার মেরামত করা যাবে।তোমাদের যেমন ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারো।আব্বু আবার ফার্মটা চালু করে দাও।
জিয়াউল বলে,
-নারে আম্মু।আমার আর সেই শক্তি নেই।
জিয়ানার হাত থেকে নিবিড় খামটা নিয়ে জিয়াউলের হাতে দিয়ে কাটকাট গলায় বলে,

-এটা আপনাদের কাছেই রাখুন।জিয়ানা লিখে দিবে জেনি আর জুনায়েদের নামে।ফু-আম্মু নিশ্চয় এমনটাই করতো।এটা নিয়ে আর কোন কথা বলবেন না আশা করি।
জিয়াউল থতমত খায়। কি জামাই রে বাবা রিকুয়েষ্ট করছে নাকি থ্রেট দিচ্ছে।জিয়ানা চোখ ছোট করে তাকায় নিবিড়ের দিকে।নিবিড় ব্রু নাচায়।
রাফিন এদের চোখাচোখি ইশারা সহ্য করতে না পেরে উঠে যায় সেখান থেকে।রাফিনের পেছন পেছন সাফাও যায়।
জেনি এসে জিয়াউল আর আঞ্জুমানকে নিয়ে ফুড কোর্টের দিকে গেলো।নিবিড় জিয়ানার দিকে ঝুকে বলে,
-সবাই এটা সেটা দিচ্ছে।আমার কাছে কি চাও বলো?
জিয়ানা নিবিড়ের কাছ থেকে একটু সরে মুখোমুখি বসে বলে,

-সত্যি দিবেন?
-হুম
-এমন একটা টেকনোলজি যেটা দিয়ে এখানে হিশু করলে তিন ফিট দূরে গিয়ে পড়বে।
নিবিড় বেক্কেল হয়ে বড় বড় করে তাকায়।ব্যাকব্রাশ করা চুলে আবার হাত চালায়। সে ছেলে হয়েও এমন কথা বলতে পারবে না।জিয়ানা দাঁত বের করে বলে,
-এটা আমার ছোটবেলার একমাত্র কাঙ্খিত জিনিস ছিলো।
-আল্লাহ তোমাকে কি মাটি দিয়ে বানিয়েছে জিয়ানা?
নিজের কপাল চুলকে প্রশ্ন করে নিবিড়।

-আপনার বুকের পাজর দিয়ে।
-এইজন্যই এমন অদ্ভুত। তোমাকে জিজ্ঞেস করা আমার একদম উচিত হয়নি।মঁসিয়ে ,মাফ করো ,পারদোঁ।
জিয়ানা খিলখিয়ে হেসে উঠে নিবিড়ের ক্ষমা চাওয়া দেখে।দূর হতে রাফিন সেই খিলখিয়ে হাসি দেখে উল্টা ঘুরে যায়।মনে মনে ভাবে ,এভাবে জিয়ানা আর নিবিড়কে ঘনিষ্ঠতা দেখে একবাড়িতে থাকতে পারবে না সে।তার মাথা আওলাঝাওলা হয়ে যাচ্ছে।
তাশদীদ আবরার এগিয়ে এসে জিয়ানার সাথে পরিচিত হয়।তারপর কথায় কথায় বলে,
-ভাবি কি জানেন নিবিড় ভাই যে চমৎকার গান গায়তে পারে?
-কখনো সরাসরি শুনিনি। কি করে জানবো?
-ওহো মিস করেছেন তবে আজ একটা এরেঞ্জমেন্ট করা আছে।একটু পর শুরু হবে। আপনাদের জন্য ছোট্ট একটা আয়োজন আছে আমার পক্ষ্য থেকে।সেখানে চাইলে ভাই একটা গান আপনাকে ডেডিকেট করতেই পারে?

-গান? নো ওয়ে।
বলে নিবিড় কাউচ থেকে উঠে যায়।পাশ থেকে মেহেদী এসে বলে ,
-জিয়ানা আমি তোমাকে গান শুনাতে পারি।আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য কাইন্ড অফ গিফট এটা।
জিয়ানা একবার নিবিড়ের দিকে তাকায় তারপর মনে মনে ভাবে ” ব্যাটা তুই গাইবি আরও তোর ঘাড় গাইবে। ” মেহেদীর দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে বলে,
-নিশ্চয় শুনবো ভাইয়া।
নিবিড় জিয়ানার গদগদ হওয়া দেখে তার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বলে,
-তোমার না ক্ষুধা লেগেছে।চলো খেয়ে আসবে।

শ্যামল হাসান পরিবার সহ এসে উপস্থিত হয় নূর ম্যানসনে।স্বপ্না নিজে দাওয়াত দিয়েছে।স্বপ্না তাদেরকে দেখে এগিয়ে যায়।কুশলাদি বিনিময় করে খাবারের জন্য বললে ,শ্যামল হাসান স্বপ্নাকে থামিয়ে কপাল চেইক করে। গতরাতে রুপক মন্ডলের ধাক্কায় ড্রেসিং টেবিলের কোনা লেগে ফুলে আছে।শ্যামল স্বপ্নার সাথে কথা আছে বলে ,সবাইকে আগে খেয়ে নিতে বলে।
একসাইডে ছোট ফাউন্টেনের দিকে এনে শ্যামল জিজ্ঞেস করে ,
-এইভাবেই জীবন পাড় করবি?এই বয়সে এসেও মা*র খাচ্ছিস? কিসের জন্য পড়ে আছিস এই জাহান্নামে?
-পড়ে আছি?
বলে হোঁ হোঁ হেসে উঠলো স্বপ্না।সেই হাসিতে অনেকের দৃষ্টি তাদের উপর পড়ে।দূরে দাঁড়িয়ে জিয়ানাও দেখলো।নিবিড় সামনে বসিয়ে জিয়ানাকে খাওয়াচ্ছে।জিয়ানা মুখ ভরে খাবার মুখে দেয়।নিবিড় মুখ চেপে সব বের করে অল্প করে দেয়।জিয়ানা চোখ রাঙিয়ে আবার মুখে দেয়।

-টেবিল ম্যানার্স জানো না এত বড় হয়েছো? এভাবে বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে কে খায়?
-বাচ্চারাই খায়।ছাড়ুন তো আমাকে শান্তি মতো খেতে দেন।
-নো আর কিছুদিন পর বাচ্চার মা হয়ে যাবা। এখনো টেবিল ম্যানার্স জানো না?
-ফালতু বইকেন নাতো মিয়া? আর আপনি কাকে শিখাচ্ছেন? নিজে তো সামাজিকতায় জানেন না।কেউ প্রশ্ন করলে না উত্তর দেন আর না হাসেন। ম্যানার্সলেস লোক আমাকে খাওয়া শিখায়।জান এই যে কি এটা যেনো?আরও কয়েকটা আনোন।

-বাকালাবা।
-ওইটাই আনোন।
-ভদ্রভাবে খাও। একদম হা করে চিবাবে না।
-উফ আপনি বড্ড ডোমিনেটিক হাজবেন্ড।
অন্যথা নিবিড়কে যেতে হলো ডেজার্ট টা আনতে। এই সুযোগে জিয়ানা আর একটা সম্পুর্ন বাকালাবা মুখে পুড়ে দৌঁড় লাগায় স্বপ্না আর শ্যামল হাসানের দিকে।পেছন দিয়ে পিলার ঘেঁষে দাঁড়ায়ি শুনতে পায় স্বপ্নার কথা,
-প্রতিটা পুরুষই হচ্ছে বেঈমান ,মাংস খেয়ে হাড্ডি ফেলে রাখে।কেউ আপন না। না বাপ ,না স্বামী আর না ছেলে ,ভাই তো আগে আগে না।
-শফিক আহমেদ কিন্তু এখন দেশে।বেশ কয়েকবার তোর খোঁজ করতে আমার কাছে এসেছিলো।মা মরা মেয়েটাকে নিয়ে একাই কাটিয়ে দিয়েছে সারাজীবন। কিছুদিন আগে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে।তুই ভেবে দেখ।আমি ব্যবস্থা করবো সব।

-লোক হাসাতে চাই না আর ভাই।এতকাল যখন আমার কথা তোমাদের মাথায় আসেনি এখন আর দরকারও নেই।এই ম্যানসনেই পঁচে গলে মরবো।এটাই আমার নিয়তি।তাছাড়া এই পরিবারের রেপুটেশন সবার আগে।এরা কোনদিনই আমাকে জীবিত এই ম্যানসন থেকে বের হতে দিবে না।
-আমি যদি ব্যবস্থা করি?শফিক তো সুইডিস নাগরিকত্ব পেয়েছে।তোরা সেখানে চলে যাবি।সামাজিকতার ভয় নেই।অন্তত বাকি জীবনটা শান্তি পাবি।
স্বপ্না নিজের আঁচল টেনে এনে চোখ মুছে বলে,

-নিজের শরীরের উপর রাগ করে একটা জা*নুয়ারের অংশ কে জন্ম দিতে চাইনি।কতবার চেষ্টা করেছি এই জীবন ত্যাগ করার। পারিনি ভাই।যতদিনে বুঝলাম বাচ্চাটা আমারও অংশ।ততদিনে বহু দেরি করে ফেলছি।এক আকাশ ফারাক সৃষ্টি হয়েছে আমাদের মা ছেলের সম্পর্কের মাঝে।নিজের সন্তান অথচ আমি জানি না ওর গায়ের গন্ধ কেমন? ওর প্রথম হাটার কথা,প্রথম স্কুলে যাওয়ার কথা।এমনকি ওকে কখনো জড়িয়ে ধরলে কেমন লাগে সেটাও জানি না ভাই।সতেরো বছর বয়স থেকে আলাদা থাকে।রাগ আর জেদ এত বেশি হয়েছে কখনো একবার আম্মু বলেও ডাকেনি।এত বছর পর আবার চোখের সামনে থাকছে ,অন্তত এই সুখটুকুই পেতে চাই। কোন রিকুয়েষ্ট করো না প্লিজ।যাও খেয়ে নাও। লান্সের অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।

জিয়ানা পিলারে মাথা ঠেকিয়ে দেয়।আর ভাবে সত্যি কোন মানুষই কাছ থেকে খারাপ না।সবার খারাপ হওয়ার পেছনে থাকে করুন কাহিনী ,না হয় চরম বাস্তবতা।এই যে শেহনাজ স্বপ্না ,উনি খুবই অল্প বয়সেই রেপড হয়েছেন।বন্দী থেকেছেন।নিশ্চিত প্রেগ্ন্যাসির সময় মারাত্মক ভাবে ডিপ্রেশনে ভোগেছেন।স্বপ্ন ভাঙা ,নির্যাতিত ,পরিবারহীন একজন নারী কীভাবে ভালো মা হবে? তারপর চারপাশ তাকিয়ে দেখে।পরিবারের মোটামুটি সবাই আছে।কিন্তু তার নিজের পরিবারের কেউ নেই।বাবা-মা ,ভাই। আদৌ দুনিয়াতে আছে কিনা সেটাও জানে না।ইদানীং মনটা খুব লোভী হয়ে উঠছে ,মাকে একটু ছুঁয়ে দেখার।তার গায়ের মা মা গন্ধটা নেয়ার।এই লোভ না তাকে দূর্বল করে দেয়।আর একটা সমস্যা হয়েছে লোভী মন মস্তিস্ককেও কবজা করে ফেলেছে।তাই তো কথায় কথায় চোখের চল ঝরায়।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিলার ছেড়ে বেড়িয়ে আসে জিয়ানা।
স্বপ্নার পেছন থেকে ডাকে,

-মা!
স্বপ্না থমকায় কিছুটা চমকায়।আস্তে করে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় এটা ভেবে হইতো কেউ ভুলে ডেকেছে তাকে। জিয়ানা তার দিকেই তাকিয়ে এগিয়ে এসে বলে,
-একটু জড়িয়ে ধরবো তোমাকে মা?
স্বপ্না স্থির চেয়ে। সে এই মেয়েকে বুঝতে পারে না।নীলুফা যতটা সহন ছিলো তার মেয়ে ঠিক ততটাই জটিল।তবে চেহারায় একটা নিষ্পাপ ভাব আছে।যে কাউকে মায়ায় ফেলার মতো একটা ক্ষমতাও আছে ।জিয়ানা আর অনুমতির অপেক্ষায় না থেকে এসে জড়িয়ে ধরে নূর ম্যানসনের সবচেয়ে দুঃখী মানুষটাকে।কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-ভাগ্য সবসময় সহায় না হলেও নিজেই নিজের সাহারা হতে হয়।ভাগ্য আগ বাড়িয়ে কিছু দেয় না বরং কেড়ে নেয়।নিজের ভালো থাকার রাস্তা নিজেকেই বানিয়ে নিতে হয়।তুমি চাইলে আমাকে একবার ভরসা করে দেখতে পারো,ঠকবে না ,আই গেরেন্টেড।

ড্রিংকস সাইড থেকে মেহেদী দেখে জিয়ানা আর স্বপ্নার আলিঙ্গন।দুই হাতে দুইটা সফট ড্রিংকস নিয়ে রাফিনের কাছে গিয়ে ইশারা করে জিয়ানাদের দিকে।রাফিন ফোনে ব্যস্ত ছিলো মেহেদী ইশারায় অনাগ্রহে তাকায় সেদিকে।তাকিয়ে চোখ কপালে উঠে যায়।কারণ স্বপ্না কারো সাথে ঠিক করে কথা বলে না।আর বললেও কাটকাট গলায় দুই একটা। সেখানে কেউ জরিয়ে ধরেছে আর উনি স্থির দাঁড়িয়ে। মেহেদী একছিপ ড্রিংকস নিয়ে বলে,
-নিবিড় লটারি জিতেছে। শা*লা একটা ক্রিপ্টো। কিভাবে কিভাবে যেনো ভাগ্য চমৎকার হয়ে যায়।তোর ফেলে দেয়া টোকেন সে কুড়িয়ে নিয়ে বিলিয়নিয়ার হয়ে গেছে দেখ।

-সে না হয় কুড়িয়ে নিয়েছে কিন্তু তুই তো কিডন্যাপ করতে চাচ্ছিস?
-আমার টেস্ট অত খারাপ না ভাই।মেয়ে মানুষ হবে মেয়ে মানুষের মতো। এমন মেয়ে মানুষের শরীরে পুরুষ আমার পছন্দ না।সব জায়গায় আধিপত্য মেনে নেয়া গেলেও এরা ইন বেড ভেরি ডমিন্যাটিং।
-ভদ্রভাবে কথা বল মেহেদী?তোর ভাইয়ের বউ হয়।
-সো হোয়াট? আমি অত সম্পর্ক দেখে কথা বলি না।যেখানে লাইফ রে*প মি মার্সিলেসলি ,সেখানে আবার ভদ্রতা? হ্যাহ।
-মার্সি দিয়ে নিশ্চয়ই রে*প হয় না।আর নিজের মতো জিয়ানাকেও সাবস্ট্যান্ডার্ড ভাবিস না।তার ক্লাস বুঝার জন্য সুখনীল নিবিড়ে ওয়াইফ না ,নীলুফা ইয়াসমিনের মেয়ে সে, এটাই উপযুক্ত কারণ।
-তুই তো বলবিই।তবে এই যে নতুন থাকাকালে ওয়াইফ বা ওয়াইফি বলে মানুষ। কিছুটা পুরাতন হওয়ার সাথে সাথেই বলা হয় বিবি। বি বি ,ডাবল মৌমাছি। যে মধুও দেয় আবার হোলও ফুটায়।
ফিজানকে খাইয়ে দিচ্ছে ফাইজা সেদিকে ইশারা করে বলে,

-দেখ যে মেয়ে ওয়াশরুমেও যায় মেকাপ করে আজ প্রোগ্রামে এমন ভাবে ঘুরছে যেনো বিধবা।
-বিধবাই তো।নিবিড়ের সাথে জেদ করে বিয়ে করেছিস যেদিন সেদিন থেকেই বিধবা সে।
-আর নিবিড় তোর সাথে জেদ করে জিয়ানাকে বিয়ে করেছে।
-এখন আর সেটা মনে হচ্ছে না। নিবিড়ের জেদের টার্গেট এত লম্বা সময় থাকে না।
মেহেদী ওয়েটার কে ডেকে খালি গ্লাস দিয়ে বলে
-বিয়ার এনে সার্ভ করে দে যাহ।
-স্যার দুঃখীত। নিবিড় স্যার হার্ড ড্রিংকস নিষেধ করে দিয়েছে। তাই আমরা কোন প্রকার এলকোহল এড করিনি মেনুতে।
-চাল হাট।
বলে সরিয়ে দেয় ওয়েটারকে।গজরাতে থাকে নিজ মনে।ফারহানা তাকে চিনেই না এমন ভাব করছে।কারণ কিছু খুঁজে পাচ্ছে না।যে মেয়ে তার এটেনশান পাওয়ার জন্য নানা ফন্দি আটে সেই মেয়ে আজ তাকে দেখেও দেখছে না।গট গট করে হেটে স্টেজের দিকে যায়।গানের জন্য সরঞ্জাম সব ফিক্সড করা শেষ। একজন মেয়ে সিঙ্গার কিছুক্ষণ টুংটাং করায় বিরক্ত হয়ে গেছে মেহেদী।

নিবিড় এসে দেখে জিয়ানা নেই সেখানে।আশেপাশে তাকিয়ে দেখে স্বপ্নাকে জড়িয়ে ধরে আছে জিয়ানা।কেমন জানি একটা ঠান্ডা আর ভোতা মিশ্রণের অনুভূতি খেলে যায় নিবিড়ের মস্তিস্কে।সামনে শ্যামল হাসানকে দেখে নিবিড় এগিয়ে যায় উনার দিকে।সালাম দিলে শ্যামল হাসান বলে,
-আচ্ছা তোমার হ্যান্ডশেক না করার কারণটা আমি ঠিক বুঝি না নিবিড়?
-কোন কারণ নেই।অহেতুক স্পর্শ আমার পছন্দ না।
হোঁ হোঁ করে হেসে শ্যামল হাসান বলে,
-তবে রাত দিন যে ভোটের কালেকশনে বের হয়।অধিকাংশকেই দেখে বুঝা যায় জাঙ্গিয়া রিফু করা পাবলিক।তাদের সাথে কীভাবে কানেক্টেড হও একটু শুনি?

-জনতা জনার্দন।তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করতেই হয়।
-হ্যাঁ ভিডিও দেখেছি। গ্লাভস পড়ে। তাই তো?
বলে আবার অট্টহাসি দেয় ভদ্রলোক। নিবিড় স্থির চেয়ে দেখে প্রশ্ন করে ,
-কোন প্রকার প্রচারণায় গেলেন না যে?
-তুমি তো প্রচুর প্রচারণা করছো?
-করতেই হয়। আমার তো ব্যাকাপ নেই।আপনার নিশ্চিত জয় তাই অহেতুক প্রচারণা করে কি করবেন বলুন?
-তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হচ্ছে।
-নিউরোপ্যারাসাইট একটা মৃত্যু পোকার মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রন করে এবং হাটতে বাধ্য করে। রিসেন্ট সোসাল সাইটের ভাইরাল এই ভিডিওটা দেখেছেন?আমাদের মাঝেও এমন অসংখ্য ব্যাক্তি আছে যারা আসলে মৃত্য তবে অন্যের ধারা হাত পা নাড়ে।

-রাজনীতির নিয়মই এটা।যার মাথার উপর যত বড় ছাতা তার রোদের ভয় তত কম।
বলে চোখ থেকে উপনেত্র খুলে পকেটের ভেতর থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতে বলল শ্যামল হাসান।
-আপনারা সবাই শুধু বুঝেন উপরে উঠার ইদুর দোঁড়।এই জন্য কিছু মানুষের জন্য স্বপ্ন দেখাও বাতুলতা।
-একজন সাধারণ মানুষ যখন বলে ক্ষমতা পেলেই মানুষ শুয়োর হয়ে যায়। আবার সেই মানুষটাকে সুযোগ দিলে সে নিজেই হায়েনা হয়ে যাবে।তোমাদের মতো ইয়াংরা তো আরও বেশি হয়।
-আমি মনে করি দেশের চিত্র যদি কেউ পরিবর্তন করতে পারে সেটা একমাত্র ইয়াংরাই পারবে।সমরেশ মজুমদার বলেছেন, “অন্য দেশের ধার করা শ্লোগান দিয়ে আর এক দেশে বিপ্লব হয় না”
পাখির শেখানো বুলির মতো আওড়ানো যদি হয় একজন ফ্রন্ট লাইন নেতার কাজ তবে এমন নেতার মুখে কি ছুঁড়ে দেয়া উচিত মামু?

-তুমি অযথায় সন্দেহ করছো আমাকে নিবিড়।
-জ্বি আমার অযথা সন্দেহের দাম ১০০কোটি। রাইট?
-ওইসব গুজব।আমার সর্বকুল বিকিয়েও এত টাকা হবে না।সেখানে মাত্র দেড় বছরের উপনির্বাচনের জন্য এতটাকা ইনভেস্ট কে করে?
-যা রটে তা কিছুটা হলেও বটে?
এরমাঝে স্টেজে গান বেজে উঠে।মেহেদী গান ধরেছে,
“আই জাষ্ট ওয়েকাপ ফ্রম আ ড্রিম
হোয়ার ইউ এন্ড আই হেড টু স্যে গুড বাই
আই ওয়ানা হোন্ড ইউ জাষ্ট ফর আ হোয়াইল
এন্ড ডাই ইউথ আ স্মাইল”
সবাই মেহেদীর গানে স্টেজের সামনে জড়ো হলেও ফারহানা গটগট করে নিচে নেমে গেলো।মেহেদী আড় চোখে একবার তাকিয়ে দেখলো শুধু।মেহেদীর গান শেষে রাফিন এগিয়ে আসে। পাশ থেকে আর একটা গিটার নিয়ে গাওয়া শুরু করে ,


ইউ আর দ্যা লাইট ,ইউ আর দ্যা নাইট
ইউ আর দ্যা কালার অফ মাই ব্লাড
ইউ আর দ্যা কিউর ,ইউ আর দ্যা পেইন
ইউ আর দ্যা অনলি থিংক আই ওয়ন্না টাচ
নেভার নিউ দ্যাট ইট কোড মিন সো মাচ ,সো মাচ
সো লাভ মি লাইক ইউ ডু ,লা লা লাভ মি লাইক ইউ ডু

সবাই সমতালে হাত তালি দিলো।জিয়ানাও জোরে জোরে হাত তালিয়ে শিষ বাজিয়ে বলে,
-বাহ স্যার আপনি তো চমৎকার গান করেন?
রাফিন মুচকি হাসে জিয়ানার প্রশংসা শুনে।কিন্তু নিবিড় তেলে বেগুনে জ্বলে স্টেজে উঠে যায়।মেহেদীর পাশে ইলেক্ট্রিক গিটার নিজের কোলে নিয়ে বাজানো শুরু করে। জিয়ানা নিবিড়কে উস্কানোর জন্য রাফিনের প্রশংসা করছে।এবং কাজেও দিলো।নিবিড় শুরু করে ,
সময় তো আর থেমে নেই
মনের কথা মনে তেই
গোপনে ,স্বপনে ,কল্পনায়
তুমি রবে
কেনো হাঁসি গান সুখ আর সয় না
মনের আকাশে কেনো পাখি উড়ে না
কেনো তোমার পানে বসে থাকি জানি না
যাও জানি না ,কিছু জানি না
মন কি খুঁজে তবুও কেনো বোঝে না,
কেনো হাঁসি গান সুখ….
নিবিড়ের গান থামলেও মেহেদী থামে না বাজানো। তার গিটারে “ওরে নীল ধরিয়া”সুর। রাফিন সাধ দেয় তার।নিবিড়ও শুরু করে।তিনজন সমসুরে গেয়ে উঠে,

“হইয়া আমি দেশান্তরি…….
পুরা হলঘর স্তব্দ।কুলসুমের চোখে পানি।স্বপ্না মাইমুনা সহ সকলেই অবাক।তাদের আরও অবাক করে দিয়ে গান শেষে নিবিড় মেহেদীর বসা টোলে লাত্থি দিয়ে ফেলে বলে,
-ইউ রুইন্ড দ্যা সং ইডিয়ট।
মেহেদী নিচে থেকে উঠে নিবিড়ের বাহুতে ঘুষি দিয়ে বলে,
-বহুদিন বাংলা গানের প্র‍্যাক্টিস নেই।অভ্যাস চলে গেছে।তাই বলে এইভাবে ফেলে দিবি রা*স্কেল?
রাফিন হেসে বলে,
-নিবিড় তোর ভয়েস এখন আরও ভারি হয়েছে।
তিনজনেই আচম্বিতেই জ্ঞান ফিরে।একমুহূর্তের জন্য তারা ছোটবেলায় ফেরত গিয়েছিলো।তাদের সম্পর্ক এখন যে আগের মতো নেই গান গাওয়ার সময় কারো মাথাতেই ছিলো না।তিনজন আবার তিন দিকে দিরে উল্টা হয়ে ঘুরে যায়।
জিয়ানা হাত তালিয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে নিবিড়ের বাহু জড়িয়ে ধরে বলে,

-আমার হাজবেন্ড ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট।সুপার্ব।
মেহেদী মেকি হেসে তার ফর্মে ফিরে গিয়ে নিবিড়ের কানের কাছে বলে,
-বউটাকে এখনো ভার্জি*ন রেখেছিস অথচ দেখ তোকে ফাস্ট বানিয়ে দিচ্ছে।নিজের অপারগতা স্বীকার করে ফেল। এইসব ফাস্ট টাস্ট টুকুস করে ছুটে যাবে।
-তুই কি বুঝবি হালাল সম্পর্কের গুরুত্ব?
রাফিন এগিয়ে এসে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
-অভিনন্দন তোমাদের।আশা করি সবার মতো স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন হবে তোমাদের।যেকোন সাহায্যে আমাকে পাশে পাবে।আমার দরজা অলওয়েজ ওপেন তোমাদের জন্য।
নিবিড় রাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

-সব কিছুই স্বাভাবিক আছে।আমাদের নিয়ে ওভারথিংকি এর জন্য ধন্যবাদ।আর নিজের আঙুলে সুই ফুটিয়ে ভাবছিস অন্যের সর্বাঙ্গে ব্যাথা? সুস্থ আঙুল দিয়ে টিপে দেখ ব্যাথাটা তোর।
বলে সেখান থেকে জিয়ানার হাত ধরে চলে আসে দোতলায়।সবাই জানে নিবিড়ের স্বভাব সম্পর্কে। তাই কেউ আর কিছু মনে করলো না।এতক্ষণ থেকেছে এটাই যেনো অনেক।দোতলায় রুমের বাহিরে জিয়ানাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বলে ,
-দুই মিনিট ওয়েট করবে এখানে। এক জায়গায় যাবো।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্দেশ্যহীন হয়ে নিবিড় জিয়ানাকে নিয়ে বাইক রাইড করছে।শীতল হিম হাওয়া নাকে মুখে লাগায় ভালো লাগছে জিয়ানার।কিন্তু সারাদিনের ধকলে তার শরীর বিছানা চাচ্ছে।পেছন থেকে নিবিড়ের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে নেতানো গলায় গেয়ে উঠে,
“একটা ভুল মানুষের হাতে আমি রাইখাছিলাম হাত
তার প্রেমেতে পইড়া আমার জীবনটাই বরবাদ
আমি সামনে পিছে না ভাবিয়া একি করিলাম
নিজের পায়ে নিজেই আমি কুড়াল মারিলাম
ওহো কুড়াল মারিলাম”
এমন গান শুনে নিবিড় হার্ডব্রেক কষে। ঘাড় বাকিয়ে হেলমেটের ভেতর থেকে কটমটিয়ে তাকায়।জিয়ানা নিবিড়ের কাছে এসে বলে,

-এ্যাই সুখ? বাসায় চলুন।আমার অনেক টায়ার্ড লাগছে।এখানেই কিন্তু ঘুমিয়ে যাবো?
সেসবের ধারে কাছে না গিয়ে নিবিড় বলে,
-রাফিন না শুধু যেকোন ছেলেকেই যতই হাম্বেল ,ইনোসেন্ট কিংবা জেন্টেল লাগুল।তুমি তাদের ভাই কিংবা বাপের নজরে দেখো না কেনো। তাদের কল্পনা থেকে তুমি রক্ষা পাবে না।ছেলেদের টেম্পটেশন সম্পর্কে কোন মেয়েরই ধারণা নেই।
-কিসের মাঝে কি পান্তা ভাতে ঘি? তাহলে আপনিও এরকম?
-হুম
-কিহ?
বলে নিবিড়ের পিঠে পাঞ্চ মারা শুরু করে একাধারে।জিয়ানার টায়ার্ডনেস কেটে গেলো চরাক করে।জিয়ানা লাফ দিয়ে নিজের হাতের ভাজে নিবিড়ের গলা আটকিয়ে রাগে একপ্রকার চিল্লিয়ে চিল্লিয়েই বলে,
-অসভ্য ব্যাটা ,বজ্জাত আদমী ,ভণ্ডনেতা। ওই আপনার বউ থাকতে অন্য মেয়েদের দেখেন ক্যান? বউ হচ্ছে চোখের মনি ,জাফরি।
-বউ যদি জামাইকে কাছে আসতে না দেয় তবে তাকাইতেই হয়।
-কাছে আসেন নাই? এত বড় অনাচারের কথা কেমনে বলেন? আপনি কি আমার চামড়ার ভেতরে ঢুকে যেতে চান?
-হুম। একেবারেই ভেতরে।
-ছিহ অশ্লীল ব্যাটা।যামুই না তোর সাথে। চাল হাট।
বলে জিয়ানা হাটা শুরু করে উল্টা দিকে।নিবিড় বাইক রেখে জিয়ানার পেছনে এসে খপ করে হাত টেনে ধরে নিজের দিকে ঘুরায়।তারপর বাঘের থাবার মতো দুই গাল একসাথে চেপে ধরে বলে,

-বিএওয়ার জিয়ানা।ফার্দার যদি তুই তুকারি করো তবে আমি ভুলে যাবো তুমি কে? অসম্মান আর মিথ্যা আমি নিতে পারি না।যাও এখন কোথায় যাবা যাও। গো..
বলে জিয়ানার পিঠে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দেয় সামনের দিকে।জিয়ানা নড়ে না।সে ঘাড় ত্যাড়ামি করে বলে,
-সম্মানের কি কাজটা আপনি করেছেন শুনি? অসঁম্মায়ায়ান আঁর মিঁথ্যায়ায়া আঁমি নিতে পাঁড়ি না।হুহ।
ব্যঙ্গ করে বলে জিয়ানা।নিবিড়ের রাগ পড়ে যায় জিয়ানার চোখ মুখ উল্টিয়ে ব্যঙ্গার্থক কথা শুনে।তারপর আবার হাত ধরে হাটা ধরে বাইকের দিকে।যেতে যেতে কাউকে ফোনে জিজ্ঞেস করে,
“সব রেডি?”
কথা বলার মাঝেই ফুটপাতে কারো সাথে ধাক্কা লাগে নিবিড়ের।ফলে ফোনটা পড়ে যায় রাস্তায়।হেলমেট পড়ায় লোকটা নিবিড়কে না চিনে তেড়ে এসে বলে,
-ওই মিয়া চোক্ষে দেহেন না নাকি? চোখ কি পা** রাইক্ষা হাটেন?
নিবিড় শান্ত ভাবে বলে,

-আস্তে?
লোকটা এতে আরও তেতে উঠে মার মার করে এগিয়ে এলে ,পেছন থেকে জিয়ানা নিজের শাড়ি গুটিয়ে কাট ফ্লিপ কিক করে লোকটাকে। ফলে হ্যাংলা পাতলা লোকটা কাগজের মতো ছিটকে পড়ে রাস্তায়। জিয়ানা আবার তেড়ে যেতে চায়।কিন্তু নিবিড় গিয়ে পেট আকড়ে ধরে আটকায়।ধরা অবস্থায় জিয়ানা গলা চড়িয়ে বলে,
-চোখ তোর ইয়ে ভরে দিবো শা*লা। কাকে তুই পা*ছা দেখাস? আয় এবার আয় দেখি কেমন বাপের বেটা?
সাথে আরও বাংলা গালি ছুড়ে লোকটার দিকে।নিবিড় টাস্কি খেয়ে গেছে তার ভাষা প্রয়োগ দেখে।আর লোকটা ভয়ে জান হাতে খুড়িয়ে খুড়িয়ে দৌঁড় লাগায়।
-বাহ কি অসাধারণ গুন তোমার?এমন জঘন্য গালি তো আমিও দিতে পারি না।তাছাড়া তুমি নিজেও আমাকে অনেক আজেবাজে কথা বলো।তার বেলায় কিছু না?
-আমি আর এই লোক এক? আমার জিনিস আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি।অন্য কারো সেই অধিকার নেই?
নিবিড় মুচকি হেসে দ্রুত গতিতে হাটে।জিয়ানা বড় বড় পা ফেলেও নিবিড়ের সাথে হেটে পারছে না।বাইকের কাছে এসে হাত ছেড়ে জিয়ানার কোমরে ধরে বাইকে বসায়। জিয়ানার কাছে লাগে সে একটা ককসিট। যার ওজন একশো গ্রাম।

ফুল স্প্রিডে বাইক চালিয়ে নূর ম্যনাসনে যখন তারা পৌঁছায় তখন কাঁচা সন্ধ্যা শেষে রাতের আগমন হয়েছে।আত্মীয় স্বজন চলে গেছে অনেক আগেই।বাসার সবাই সারাদিনে টায়ার্ড থাকায় যে যার রুমে রেস্ট করছে।অন্যদিনের তুলনায় আজ আরও বেশি ঝকঝকে লাগছে নূর ম্যানসন।দোতলায় উঠে রুমের কাছে যেতেই ধক করে বেলি ফুলের গন্ধ ধাক্কা লাগে জিয়ানার নাকে।বেলি ফুল তার ভিশন পছন্দের।নিবিড় দরজা সটান খুলে দিয়ে রুমে ঢুকে যায়।তারপর একহাত নিজের পেছনে আরেক হাত সামনে জিয়ানার দিকে মেলে দিয়ে বলে,
-কাম ইন মাই কুইন।
জিয়ানা একবার সেই মেলে দেয়া হাত দেখে আর একবার দেখে সামনের বিশাল কালো রঙা রাজকীয় খাট টাকে। সেটা ঢেকে আছে শুভ্র সাদা থোকা থোকা বেলি দিয়ে।ছাদ থেকে ঝুলছে অসংখ্য বেলির মালা।বিমূর্ত জিয়ানার যেনো আজ অবাক হওয়ার দিন।বিয়ের প্রায় একবছর হতে চললো ,অস্বাভাবিক হলেও সত্যি তাদের বাসর হয়নি।হওয়ার মতো পরিস্থিতিই ছিলো না।আজ তবে কি সেই কাঙ্খিত দিন?

“এ বসন্তে প্রিয়া তব পূর্নিমানিশীথে
নবমল্লিকার মালা জড়াইয়া কেশে
তোমার আকাঙ্ক্ষাদীপ্ত অতৃপ্ত আখিতে
যে দৃষ্টি হানিয়াছিলো একটি নিমিষে
সে কি রাখে নাই গেঁথে অক্ষর সংগীতে।
সে কি গেছে পুষ্পচ্যুত সৌরভের দেশে।
-রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ”

কবিতাটি আওড়িয়ে আলমারি থেকে একটা খাম বের করে আনে নিবিড়। জিয়ানা ঘুরে ঘুরে রুম দেখতে আর বেলির গন্ধ শুকতে ব্যস্ত।নিবিড় জিয়ানাকে ব্যাক হাগ করে হাতে খামটা দেয়।জিয়ানা খামটা নিয়ে খুলে দেখে সাদা কাগজ কিন্তু নিচে নিবিড়ের সাইন করা।জিয়ানা জিজ্ঞেস করে ,
-এতকিছুর দরকার ছিলো না মিষ্টার সুখনীল নিবিড়।
নিবিড় মুচকি হেঁসে হাতের বাঁধন শক্ত করে। জিয়ানা বলে,
-কলম দিন এই সাদা কাগজ ভরিয়ে দেই।কিন্তু আমি জানতাম।আপনার ট্রাস্ট ইস্যু আছে?
নিবিড় ড্রয়ার থেকে একটা বলপেন কলম এনে দেয়।জিয়ানা তেপায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা লিখে নিবিড়ের হাতে দেয়।কাগজটা মেলার পর নিবিড়ের নজরে আসে পুরা পাতা জুড়ে “সুখনীল নিবিড় ” লেখা বড় করে।নিবিড় মুচকি হেঁসে তাকিয়ে দেখে জিয়ানা শাড়ি খুলে ফেলেছে।পেটিকোটে হাত দিয়েছে যখন নিবিড় বলে,
-বাহ বেশ তাড়া দেখছি তোমার?

জিয়ানা সেসব পাত্তা না দিয়ে ফট করে খুলে ফেলে।নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে দেয়।এই মেয়ে শাড়ির নিচেও জিন্স পড়েছে।তবে হাঁসি আচানক গায়েব হয়। ব্লাউজ আর জিন্সের ফাঁকে উকি মারা ফর্সা উদরে নজর পড়ায়।জিয়ানার সেসব খেয়ালে নেই।দ্বীধা সংকোচহীন সে নিজের কর্মে ব্যাস্ত।আলমারি থেকে নিবিড়ের একটা ট্রি শার্ট বের করে গলা ঢুকায়। তারপর ট্রি শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কায়দা করে ব্লাউজ খুলে আনে।রুমে যে একজন পুরুষ এমন মোহময় কামড়ায় ঘেমে যাচ্ছে এই মেয়ের সেটা বিন্দুমাত্র ধারনা নেই। নিবিড় গলা খাকড়ি দেয়।জিয়ানা ঘুরে বলে,
-শোনোন এই বিছানায় ঘুমিয়ে ফুল গুলো নষ্ট করতে চাচ্ছি না।কি সুন্দর করে সাজিয়েছে বলুন? ওদের কষ্টের দাম হিসেবে আমাদের এই খানে না ঘুমিয়ে সম্মান জানানো উচিত তাই না?
বলে উল্টা ঘুরে মুচকি হাঁসে জিয়ানা।নিবিড় ফটাফট জিয়ানার কাছে চলে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
-একদম একমত আমি তোমার সাথে।আজ আমরা ঘুমাবো না।ডেকোরেশনের লোকগুলা এত কষ্ট করে সাজিয়েছে তাদেরকে সম্মানের স্বার্থে আমাদের আজ বাসর করতেই হবে।
জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে বলে,

-আচ্ছা তবে আমাকে আমার পছন্দ সই গান গেয়ে আগে শুনাতে হবে।
-উল্টা পাল্টা গান গাইতে বললে পারবো না।দুঃখীত।
জিয়ানা কাধ নাচিয়ে বলে ,
-তাহলে আমিও দুঃখীত।
নিবিড় ফট করে পাজাকোলে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়।বারান্দায় গিয়ে জিয়ানা আরও বেশি বিস্মিত হয়।উপরের ছাদ থেকে একটা দোলনা ঝুলছে। বসার জায়গাটা কাঠের। আর ঝুলানো লোহার শিকলেও ঘরের মতো কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো।দোলনা থেকে চোখ সরিয়ে নিবিড়ের দিকে তাকায়। তার যে দোলনা পছন্দ সেটা কিভাবে জানলো?
নিবিড় জিয়ানাকে কোলে নিয়েই দোলনায় বসে।ফলে হালকা দোলা শুরু করলো দোলনাটা।জিয়ানা নিবিড়ের হাত সরিয়া উল্টা ঘুরে যায়।তারপর নিজের দুইপা নিবিড়ের কোমরের দুই সাইডে দিয়ে আর হাত দিয়ে ঘাড় ধরে মুখোমুখি বসে যায় কোলে।নিবিড় জিয়ানার কোমড় ধরে কাছাকাছি এনে জোরে দোল দেয়।জিয়ানা নিবিড়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলে,

-আপির কাছ থেকে জেনেছেন সব তাই না?
-হুম।
-দোলনার ঘটনাটা বলেছে নিশ্চিত? আমার মান সম্মান সব ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।
-ঘটনা কি বলো তো?
জিয়ানা মাথা উঠিয়ে নিবিড়ের দিকে তাকায়।তারমানে বলে নাই।
-তেমন কিছু না।
-বলো?
-আরেহ বললাম না।
নিবিড় বুঝলো নিশ্চিত উল্টাপাল্টা কোন ঘটনা ঘটিয়েছে তাই বলতে চাচ্ছে না।তাই কোমড়ের হাত দিয়ে সুরসুরি দেয়া আরম্ভ করে। জিয়ানা একেবেকে যাওয়াই দোলনার ঝুল বাড়ে।নিবিড় জোর করে ,

-বলো কি বদমায়েশি করেছো? এইজন্য জেনি বলেছে তোমার জন্য দোলনা নিষিদ্ধ ছিলো।
-আপির নানু বাড়ি গ্রামে।একেবারেই পল্লী গ্রাম।গ্রামটা খুব সুন্দর ছিলো।আমরা বছরের একটা ঈদে যেতাম সেখানে।সেই গ্রামের ঈদ গা মাঠের পাশে ছিলো বিশাল বড় বড় জাম গাছ।সেখানকার একটা জাম গাছে বাধা ছিলো গাড়ির টায়ার দিয়ে মোটা মইয়ের দোলনা। এই এক দোলনার জন্য ছিলো লম্বা লাইন।একবার কেউ উঠলে সহজেই নামতে চাইতো না।একবার আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো সেখানে বসার।তবে এর আগে আমি কয়েকজনকে এত জোরে জোরে ঝুল দিয়েছি ,এরমাঝে একজন বাচ্চা ছেলে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলে।

আমি তখন দাঁড়িয়ে দোল খাচ্ছিলাম। সবাই হাত তালি দিচ্ছিলো আমার কায়দা করে ঝুলা দেখে।তখন সেই প্যান্ট নষ্ট করা ছেলেটা তার বড় ভাইকে ডেকে আনে।সেই বড় ভাই আমি দাঁড়িয়ে ঝুল খাওয়া অবস্থায় পেছন থেকে জোরে ধাক্কা দেয়।আমি ছিটকে পড়ি নিচে।ফলে বাম পা টা মচকে যায়।অনেক জায়গায় ছিলেও যায়।এতে উপস্থিত সব বাচ্চাই হৈ হৈ করে উঠে হাত তালি দেয়।
আব্বু মনে করে আমি অসাবধানে পড়ে গেছি।এরপর থেকে দোলনা আমার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।তবে রাতে গিয়ে সেই টায়ার আমি জ্বালিয়ে এসেছিলাম।মইটাও কুচিকুচি করে কেটে রেখে আসি।
বলে কিটকিট করে হাঁসে জিয়ানা।নিবিড় একহাত কোমর ছেড়ে নাকটা টেনে বলে,

-সাব্বাস আমার যোগ্য বউ।
জিয়ানাও নিবিড়ের নাক টেনে বলে ,
-তবে আপনি একটু বেশি বেশি সুখ।আমি কাউকে আঘাত করি না।বস্তুগত জিনিস ছোট বেলায় রাগের বশে নষ্ট করলেও কাউকে আঘাতের কথা চিন্তা করতে পারি না।ভুলে যদি আঘাত করেও ফেলি তবে রতন টাটার সেই গল্পের কথা মনে পড়ে।আপনি জানেন সেটা?
-কোনটা?
-মুম্বায়ে টাটা ফাইভ স্টার হোটেলের স্টাফের সাথে রতন টাটার ঘটনাটা।
-নাহ।

-মুম্বায়ের ফাইভ স্টার হোটেলের ফ্লোর রাব করার সময় একজন মহিলা স্টাফ রতন টাটাকে বলেন ,সমুদ্রের সাইডের রুমটা তার বোনের জন্য বুকড করতে।হোটেলটা যেহেতু তাদের নিশ্চয়ই ডিস্কাউন্ট পাবে।একজন স্টাফ এভাবে কথা বলার জন্য জনাব টাটা তাকে একটা ধমক দেয়।এবং রুম ছেড়ে চলে যেতে বলে।মহিলাটা ভয়ে ভয়ে বের হয় রুম থেকে।এবং সারাদিন খুবই ভয়ে আর মনমরা হয়ে কাটায়।সন্ধ্যায় যখন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে স্টাফদের জন্য নির্দিষ্ট গেইট দিয়ে বের হয় এই ভেবে যে নিশ্চিত কাল এসে জানবে তার চাকরি আর নেই। তখন দেখতে পায় গেটে স্বয়ং রতন টাটা দাঁড়িয়ে আছে গাড়িতে হেলান দিয়ে।মহিলাটিকে দেখে মুচকি হেঁসে বলে,

“দেখুন বোন আমি আপনার একটা দিন ধমক দিয়ে নষ্ট করেছি যেহেতু তাই আমার দায়িত্ব হলো কোন না কোন ভাবে আপনাকে খুশি করে অল্প একটু আনন্দ হলেও ফেরত দেয়া। তাই আজ আমি আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিতে চাই”
মহিলাটির মনে হয়েছে সে স্বপ্ন দেখছে।চিন্তা করুন তবে আমরা সামান্য মানুষ হয়ে দিনে ঠিক কতজনের মনে দাগ কাটি? কখনো সেই দাগ কি মুছার চিন্তা করেছি?বড় বড় মানুষ গুলা আসলে এমনি এমনি বড় হয়নি।তারা হাজার হাজার তারার মাঝে এক একজন সূর্য। সবার চেয়ে আলাদ।
নিবিড় নিজের নাক দিয়ে জিয়ানার গালে টেপ করে। সে অভিভূত হয় প্রতি মুহুর্তে এই মেয়েটির চিন্তায়।যা নিবিড়ের মস্তিস্কে আসেনি কখনো এই মেয়েটা কত সহজেই সেটা অবজার্ভ করে রেখেছে।নিবিড় আস্তে করে বলে,

-চুপ হয়ে গেলে কেনো?
-একটা জিনিস ভাবছিলাম।
-কি?
-আপনি তো প্রেম ভালোবাসা বিশ্বাস করেন না। তবে আমাদের সম্পর্কে নাম আপনার কাছে কি?
-স্বামী-স্ত্রী।
-যাহ এটা তো সামাজিক পাঠ্যগত নাম।অনুভূতির নাম বলুন?
-অন্যদের অনুভূতির নাম জানি না।তবে আমার কাছে অনুভূতি নাম জিয়ানা। সাতশ কোটি মানুষের মাঝে একটা মানুষের স্পর্শই আমার কাছে আফিমের মতো টানে।এই একজনের গায়ের গন্ধে আমি মাতাল হয়।এই একজনকেই আমার সারাক্ষণ ঘিরে থাকতে ইচ্ছা হয়।

-সাতশ কোটি মানুষের মাঝে আমিই কেনো?আপনি তো আর সাতশ কোটি মানুষের কাছে গিয়ে শুকে আসেন নাই?তবে এত নিশ্চিত হয়ে বলছেন যে? কোন বিশেষ উদ্দেশ্য? দেখুন আমাকে অসংখ্য মানুষ বলেছে আক্কেলদোষে আমার ঘর সংসার হবে না কোনদিনই।যদিও হয় সেটা হবে মন্দের খুশি।আগেই এলার্ট করে রাখলাম আপনাকে?
-উদ্দেশ্য তো অবশ্যই আছে।আর যারা তোমাকে জানে না তারাই বলে এইসব কথা।আমি তো দেখি কত শত কিছু।এই যে তোমার মতো পন্ডিত বডিগার্ড ,একই সাথে জার্নালিস্ট আবার স্পাই এবং ইনফরমার ,লাষ্ট একেবারেই সাদামাটা।কোন সাজ সজ্জা নেই। বিশেষ করে বস্তুগত চাহিদা নেই।একটা ট্রি শার্ট কিনে দুইজনই পড়তে পারবো।এত এত গুনি একটা বউ আর দ্বিতীয়টা হবে?এইজন্যই সাতশো কোটির মাঝে তুমি।তাই তো মনে হয় এইভাবে টুপ করে খেয়ে ফেলি।
বলে জিয়ানার গালে বড় করে চু*মু দেয়।জিয়ানা একটু না সরে বলে,

-আপনি আচ্ছা ত্যাদড় আছেন।ভন্ডামীর শীর্ষে আপনার অবস্থান।পাম পট্টি মা*ইরা আস্তে কইরা কাইট্টা কুইট্টা খাইয়া ফেলাবেন নাতো?
-মাঝে মাঝে তোমার ভাষার যে ডায়রিয়া হয় জানো?
-না এটা ডায়রিয়া না। যদি কষা হা…..
নিবিড় জিয়ানার ঠোঁট দুই আঙুল দিয়ে টিপে বন্ধ করে বলে,
-তুমি ন্যাস্টি কথার দিকে গিয়ে এই ওয়েদারটা বদলে দিতে চাইছো? তবে সেটা আজ হচ্ছে না।মুখ বন্ধ করো। না হয় ভালো কথা বলো।
জিয়ানা নিবিড়ের কোল থেকে নামতে চায়।নিবিড় ছাড়ে না।জিয়ানা নিজের কনুই নিয়ে নিবিড়ের গলার বোন্সে হালকা চাপ দিয়ে আটকানো ঠোঁট দিয়ে উ উ উ করে। নিবিড় ছেড়ে দেয় ঠোঁট জোড়া।তারপর বলে,

-এমন মিলিটারি কায়দায় মা*র দেয়াও কি ট্রেনিং এর অংশ?
জিয়ানা মাথা দিয়ে হ্যাঁ করে।এরমঝে জিয়ানার নজর যায় বারান্দার রেলিঙের উপর দুইটা প্রজাপতির দিকে।জিয়ানা উঠে গিয়ে সেই প্রজাতির ধরে এনে বলে,
-সুখ দেখুন।
জোড়া লাগা দুইটা প্রজাপতি দেখালো জিয়ানা।নিবিড় লজ্জায় চোখ আইডাই করে।জিয়ানা সেগুলা নিবিড়ের আরও কাছে এনে বলে ,
-দেখুন এরাও ভালোবাসা বাসি করছে।
-আল্লাহ কি তোমাকে একটু লজ্জা কিংবা সংকুচ দেয়নি জিয়ানা?
জিয়ানা মাথা নাড়ে। দেয়নি তাকে।তারপর মুখ খুলে বলে ,
-চলুন আমরাও ভালোবাসাবাসি করি।
-এটা ভালোবাসা বাসি না।এটা ভালোবাসার চূড়ান্ত লেবেল।
-বাসর?ওদেরও বাসর হয়? বলে খিলখিল করে হাঁসা শুরু করলো। নিবিড় কিছুক্ষণ মোহগ্রস্তের তাকিয়ে থাকে এই অদ্ভুত মেয়েটার দিকে।তারপর বলে,

-পৃথিবীতে তুমিই মনে হয় একমাত্র মেয়ে যে নিজে থেকেই হাজবেন্ডকে বাসরের অফার দিচ্ছে।
বলে এক সেকেন্ড দেরি করে না জিয়ানাকে পাজাকোলে উঠাতে।কোলে চড়েই জিয়ানা বলে,
-অদ্ভুত তো ন্যাচারাল একটা জিনিস দেখালাম আর আপনি অন্য মাইন্ডে নিচ্ছেন। নেস্টি মাইন্ড? হুম?
ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে জিয়ানা।নিবিড় তাকে ওয়াশরুমের দরজায় নামিয়ে বলে ,
-যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। তোমার চক্করে পড়ে আমি নিজেও ফ্রেশ হতে ভুলে গেছি।
অন্যথা জিয়ানা আর কথা না বাড়িয়ে ঢুকে যায় ফ্রেশ হতে।নিবিড় স্পিকারে মৃদ্যু আওয়াজে রোমান্টিক মিউজিক ছেড়ে নিজেও পোশাক পাল্টে নেয়।জিয়ানা বের হয়ে দেখে রুমের চেহারায় পাল্টে গেছে।ক্যান্ডেল জ্বলছে চার-পাঁচটা তেপায়ার উপরে।হালকা ইংলিশ রোমান্টিক গানও চলছে।নিবিড় নেই রুমে।জিয়ানা তাকিতুকি করে খুঁজে। না পেয়ে বিছানার কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখে ফুল গুলো।কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন একটা পরিবেশ। জিয়ানার শরীর শিরশির করে উঠে।চোখ মুদে একমুঠো ফুল নিজ হাতে নিয়ে নাকের কাছে রাখে।দরজায় কট করে শব্দ হলে জিয়ানা চোখ মেলে তাকায়। নিবিড়ও ফ্রেশ হয়ে এসেছে।সাথে খাবারের ট্রলি। জিয়ানা নিবিড়কে দেখে বলে,

-ফুল গুলা নষ্ট করতে ইচ্ছা হচ্ছে না।চলুন দুইজন মিলে ফ্লোরে সাজিয়ে রাখি?
-নো। ওগুলো নষ্ট হওয়ার জন্যই বিছানো হয়েছে।চলো খাবে।
জিয়ানা খাবারের কাছে গিয়ে বেক্কেল হয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-এই ভাত মাছ কেন? আমার বাকালাবা কই?
-তুমি যে সহজ চিজ নও আমি জানি জিয়ানা।
বলে ট্রলির দ্বিতীয় স্টেপের ঢাকনা সরিয়ে দেয়।সেখানে বিরিয়ানি আর ডেজার্ট হিসেবে এরাবিয়ান ডিস বাকালাবাও রাখা।জিয়ানা সেখান থেকে একটা নিয়ে ফটাফট নিজ মুখে চালান করে দেয়।মুচমুচে জুসি বাকালাবা মুখে যাওয়ার আগে কিছুটা ঠোঁটের বাহিরের লাগে।নিবিড় ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে খাওয়া শেষ হওয়ার। কিন্তু জিয়ানার জিহ্বা দিয়ে ওষ্ঠপুট লিক করা দেখে সকল ধৈর্য্যের বাদ ছুটে যায়।টান দিয়ে খাবারের ট্রলি সরিয়ে ওষ্ঠাধর সহ পুরো জিয়ানাকেই নিজের কবজায় নিয়ে নেয় নিবিড়।জিয়ানা আজ তৈরি।না চমকালো আর ইতস্তত করলো।স্বামীর সাধ দিলো সমান তালে।

বিছানার ফুল যখন বিছানায় কম আর ফ্লোরে বেশি তখন বাহিরে শিরশির বাতাস।শব্দহীন বাতাসে দূর থেকে ভেসে আসে গাড়ির হর্ণ।তবে পুষ্পসজ্জিত কক্ষের ভেতরে শব্দরা যেখানে নিশ্চুপ ,নিশ্বাসেরা সেখানে মাদল বাজায়।সেই মাদলে দুইটি মন আর তনু মাতে।বাতাসের শীতলতা হ্রাস পায়।পাখিরা লজ্জায় মুখ নিজের পাখনায় লুকায়।চাঁদ মেঘের আড়ালে যায়।
কুহেলিকা গান ধরে”এমন প্রেম প্রেম বাতায়নে তুমি এলে” সুখের সুখ বাড়ে। তার শরীরের বাধভাঙ্গা প্রেম মিছরির ছুড়ির মতো ফালা ফালা করে দেয় জিয়ানাকে।হাতরে আকড়ে ধরার জিনিস খুঁজে জিয়ানা।নিশ্বাসের টান পড়ে। তবুও সুখের তান্ডব থামে না।উথাল পাতাল ঝড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় জিয়ানা।সহ্যের সীমা যখন দূর বহুদূর। বিশ্বচরাচর আচম্বিতে বিস্মিত হয়।পৃথিবীর সমস্ত ঝড় একসাথে প্রলয় তুলে। সেই প্রলয় ঝড়ের নাম নিবিড়। জিয়ানা ডানাঝাপটা পাখির মতো ছটফট করে তবুও মুখে একটা টু শব্দ করলো না।

এক আকাশে দুইটা চাঁদ হয় না। তবুও মনে হবে আজ উঠেছে ভালোবাসার দুইটা চাঁদ। মস্তিস্কের প্রচন্ড আলোড়নে আলোকিত সেই চাঁদ দুটো।আসল চাঁদের প্রতিফলে তেজি সূর্যের মতো বলিষ্ঠ পুরুষ সুখনীল নিবিড় ,তাকে এখন নরম আলোর সূর্য মনে হচ্ছে।তবে সেই নরম সূর্যের প্রখরতা শুধু বিপরীতের জিয়ানা রুপি চাঁদটাই বুঝতে পারে।তাই তো সূর্য রুপী নিবিড়ের তান্ডব যখন তুঙ্গে তখন জিয়ানা কাতর কন্ঠে শুধু একবার বলে,
-আই কান্ট বেয়ার দিস সুখ।
ঘর্মাক্ত নিবিড় মোহাচ্ছন্ন হয়ে জোর করে একটা বাক্য বের করে নিজের কন্ঠনালী থেকে।
-আমার হক আমাকে পুরোপুরি পেতে দাও চাঁদ।
জিয়ানা সহ্য করে কষ্ট মিশ্রিত মিষ্টিমধুর অত্যাচার।জিয়ানার সাম্রাজ্য পুরোপুরি কবজায় রাজা সুখনীল নিবিড়ের।কিছুক্ষণ পর শ্বাস আস্তেধীরে ছেড়ে নিথর হয়ে নিজের কিলার কন্ঠে বলে ,

-ঠিক আছো?
জিয়ানা সাড়া শব্দ করে না।চুপ করে শুয়েই থাকে।নিবিড় নিজের বাহুতে আগলে নিয়ে বলে,
-নিবিড়ের জীবনে সুখের পুষ্প হয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ চাঁদ।অমিয় সুখের ধারা হওয়ার জন্য ধন্যবাদ আমার জিয়নকাঠি।খা খা মরুভূমিতে এক পসলা বৃষ্টির জন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আমার ধারণা পাল্টানোর জন্য।ধন্যবাদ সুখের সংজ্ঞা বদলে দেয়ার জন্য। এই নষ্ট পৃথীবীতে বিশটা বছর আমার জন্য নিজেকে সংরক্ষিত রাখার জন্য ধন্যবাদ সুখের অর্ধাঙ্গিনী। তুমি সাইক্লিং করেও ভা….
জিয়ানা একহাত দিয়ে নিবিড়ের মুখ চেপে ধরে বলে,

-চুপ করুন ভন্ড লোক।আসছে ধন্যবাদ দিতে। বেইমানের বেইমান। মায়া দয়াহীন।এখন আসছে দরদ দেখাতে।সরুন ঘুমাতে দেন এখন।
জিয়ানা চোখ বন্ধ করেই বলে।নিবিড় জিয়ানার মুখের কাছে গিয়ে ঝুকে বলে,
-ওয়েট তুমি লজ্জা পাচ্ছো রাইট?
-না। আমার ঘুম পাচ্ছে।বাই। ঘ্যানঘ্যান করলে এক ঘা বসিয়ে দিবো।জামাই বলে খাতির করবো না।
-আজকের মতো এইটুকু খাতির করলেই হবে শুধু। তবে বিয়ে করে একটা অপুরনীয় ক্ষতি যে হয়েছে সেটা কে বলেবে?
-কি?
-আই লস মাই ভার্জি*নিটি।
বলে নিবিড় জিয়ানার পাশে শুয়ে পড়ে।
-আহা রে আপনি হারিয়েছেন আর আমি মনে হয় সেটা জমিয়ে বড়লোক হয়ে গেছি।
বলে লজ্জা পেয়ে চাদর নিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে জিয়ানা।এবার নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠে।

ভালোবাসার রাত অতি দ্রুত যায়।জিয়াসুখের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হলো।শেষরাতে ঘুমিয়ে ঘুম ভাঙ্গে জিয়ানার বিখ্যাত রিংটোনের শব্দে।একাধারে বেজে যাচ্ছে” বলো ছাইয়া ছাইয়া ছাইয়া ছাইয়া বলো ছাইয়া ছাইয়া”
নিবিড় চরাক করে উঠে বসে এমন বিকট শব্দের কারণে। চোখমুখ লাল হয়ে আছে।অপরদিকে জিয়ানা ফোন কানে দিয়ে হু হা করে রেখে দিলো।নিবিড় জিয়ানার পাশে আধশোয়া হয়ে বলে,
-এই বিদঘুটে রিংটন কে সেট করে?
-জিয়ানা করে।কারণ ছোট সময় এই গানের একটা খেলনা মোবাইলের খুব শখ ছিলো আমার।কিন্তু কখনোই কিনা হয়নি।আপনার এই দামী ফোনটার সেই অনুভূতি নেই।যেটা সেই খেলনা ফোনের জন্য ছিলো।তাই এই গানটা বাজলে আমার সেই না পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর শিখায় ,শখের দাম লাখ টাকা না ,শখের দাম সঠিক বয়স।
নিবিড় ঝুকে জিয়ানার কপালের অধর ছুঁয়ে বলে,

-অসংখ্য না পাওয়ার মাঝে বড় হয়েও তুমি নীলুফা ইয়াসমিনের মেয়ে হওয়াই কত চমৎকার করে ভাবতে পারো।আর আমি প্রচন্ড বিলাসিতায় বড় হয়েও মামুন ইসলামের ছেলে হওয়াই দূষিত চিন্তা বের হয় শুধু ।
জিয়ানা নিবিড়কে জড়িয়ে ধরে বলে,
-আপনার পলিসি একটু ঘুরালেই নীলুফা ইয়াসমিনের ভাতিজা হয়ে যাবেন সুখ।
জিয়ানা এতটা কাছে আসায় নিবিড় আর একটু সেটে যায় জিয়ানার দিকে।তারপর ফেলে আসা মধুর রাতের কথা ইশারা করে বলে,

-তাহলে বলো হেরে গেছো?আরও পাংজ্ঞা নিতে আসবে?
জিয়ানা ধাক্কিয়ে সরিয়ে দেয় নিবিড়কে। আস্তেধীরে উঠে বসে। সাথে সাথেই মুখ কুচকে ফেলে। আবার পরক্ষণেই স্বাভাবিকও করে ফেলে।রাগী চোখে তাকায় নিবিড়ের দিকে।পাশ থেকে নিবিড়ের শার্ট গায়ে জড়িয়ে ধীর পায়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে।আবার মাথা বের করে উঁকি দিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলে,
-নিজেরই তেল শেষ হয়ে গিয়েছিলো।আর আমাকে আসে বলতে।ফালতু আদমী কাহিকে।
নিবিড় দ্রুত উঠে এসে ধরতে চায় জিয়ানাকে।জিয়ানা ততক্ষণে দরজা ভেতর থেকে আটকে ফেলেছে।নিবিড় ধুপধাপ করে নক করে বলে,

-বের হবা না আর? এইবার কোন রিকুয়েষ্টেই কাজ হবে না বলে দিলাম।কন্ঠ শুনে কিন্তু বুঝা গেছে শব্দহীন কান্না করিয়েছি।
-এই যান তো যান।আসছে বীর বাহাদুর প্রতাপ সিংহ।পারে শুধু আমার সাথেই।
তেতে উঠে জবাব দেয় জিয়ানা।
-চাঁদ। ওপেন দ্যা ডোর।পানি নষ্ট করা উচিত না।একসাথে দুইজন গোসলের উপকার অনেক গুলা।
-আমার পিঠ মাজার দরকার নাই জনাব।
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে,
-এনি সার্ভিস মিসেস?
-নো।

-তবে আমাকেও সার্ভিস দিতে পারো। স্বামীকে সেবা যত্ন করে গোসল করিয়ে দিলে অনেক সোয়াব হয়।
-ফট করে দরজা খুলে যায়। আর এক বালতি পানি ঝপাৎ করে নিবিড়ের উপর পড়ে। রুমের ফ্লোর পানিতে ভিজে চুবুচুবু হয়। জিয়ানা দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,
-নেন আপনার গোসল হয়ে গেলো। অনেক সোয়াব কামাই করলাম।এবার ফুটেন।
নিবিড় ভেজা শরীর নিয়ে ওয়াশরুমে ডুকে বলে ভ্রু নাচিয়ে বলে,
-এবার?

জিয়ানা হাত পা ছুড়া শুরু করে। নিবিড় দরজা লাগিয়ে সামলায় তার বাঘিনী বউকে।
সম্পর্ক আর মানুষের জীবন ঠিক জিয়াসুখের মতোই।একটা শিশু জন্মের পর থেকে প্রথম কয়েকমাস সব বর্ণহীন দেখে। আস্তে আস্তে সে কালার দেখা শুরু করে। একটা সম্পর্কের শুরুতেও সেটা বর্ণহীন থাকে। শ্রম আর ডেডিকেশন সেই সম্পর্ককে রঙিন করে।একটা পর্যায়ে যখন দুইপক্ষই একে অপরের পরিপূরক হয়।তখন মিশে যায় পরস্পরের অস্তিত্বে। এইজন্য অবশ্যই সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।জানার জন্য ,বুঝার জন্য। অপজিটের মানুষকে গুছিয়ে নিতে প্লাস নিজের ভেতরেও তার জন্য জায়গা করতে সময়ের প্রয়োজন।এই সময়টা যে বা যারা দেয় এবং পায় তাদের সম্পর্ক বিল্ডাপ হয় চমৎকার ভাবে।একটা ইটের গাথুনি থেকে একসময় বিশাল ইমারত তৈরি হয়ে যায়।তাই সম্পর্কে জন্য ধৈর্য্য আর সহনশীলতাই সবচেয়ে বড় নিদান।তাই তো জিয়াসুখের মতো দুইজন দুইপ্রান্তের মানুষও একে অপরের পরিপূরকে পরিনত হয়েছে।মিশে গেছে একে অপরের অস্তিতের মাঝে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৬

হঠাৎ মনে হতে পারে জিয়ানা অপরিবর্তিত আর সুখনিল নিবিড়ের ভীষণ পরিবর্তন। সত্যি কথা হচ্ছে মানুষ যখন কাউকে সত্যিকারের অর্থে চায় তখন তার জন্য নিজের চামড়া পাল্টিয়ে হলেও নিজের পরিবর্তন করে।আর এটা বেশি ঘটে পুরুষের ক্ষেত্রেই।কথায় আছে পৃথীবীর বড় বড় পরিবর্তন হয় দুইটা কারণে ,এক,ভালোবাসা আর দুই ,যুদ্ধ।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৮