নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৬
আশিকা আক্তার সোহাগী
“বাঘে সিংহে লড়াই ” আমরা শুনে থাকি।কখনো বাঘে মহিষে লড়াই শুনি না।এমন কি বিশাল বাইসনের সাথেও বাঘের লড়াই কিংবা হাতির সাথেও শোনা যায় না।লড়াই টা হয়ই সমানে সমানে। শক্তির উঁচু নিচু হলে সেটা আর লড়াই থাকে না।হয়ে যায় জুলুম।
মে মাসের সকালের তেজহীন রোদেও জিয়ানার ঘাম ছুটে গেলো এটা ভাবতেই যে” সে তার ধারণার চেয়েও ভয়াবহ কিছুর সাথে লড়াইয়ে নেমেছে।এখানে সব অদৃশ্য শত্রু।এমন কি এটাও হতে পারে ,সবাই শত্রু নাহয় সবাই বন্ধু”
তখনই জিয়ানা নিজের ডান কাধে কারো টোকা অনুভব করে।ডানে বামে না ভেবে বাম হাত দিয়ে খপ করে সেই হাত ধরে একটা মোচড় দিয়ে দ্রুত ঘুরে যায়।আর ডান হাত মুষ্টি করে ঘুষি উড়িয়ে নেয় পেছনের লোকটার নাক বরাবর। কিন্তু নাকের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগে হার্ড ব্রেক কষে নিজের হাতের।মেহেদী সটান দাঁড়িয়ে আছে তার বরাবর। মু্খে সেই বাকা হাঁসি।যেটা অপরিচিত কারো কাছে চমৎকার লাগলেও জিয়ানার কাছে লাগে গিধড়ের মতো। তার ভাবনা ছেদ ঘটিয়ে এই বান্দার মুখ সক্কাল সক্কাল দেখবে ,সেটা আশা করেনি একেবারে।না জানি সারাটা দিন যেমন যায়?
মুখের মুচকি হাঁসি নিয়েই মেহেদী জিজ্ঞেস করে ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-তোমার কোন ভয় ডর নেই?ভোরের আলো এখনো ঠিকঠাক ফুটেনি আর তুমি একটা গোরস্থানে স্পাইগিরী করছো?
-নাহ। মেয়েদের ভয় কম।এটা আমি না সাইকোলজি বলে।মেয়েদের ভয় একটা জিনিসেই সেটা হচ্ছে রুপ নিয়ে।যে মেয়ে রুপ হারানোর ভয় জয় করতে পারে। তার আর কোন কিছুতে ভয় নেই।বাকি যারা ভয়ের ভং ধরে ,সব এটেনশান পাওয়ার জন্য।
-তোমার হাজবেন্ড জানে? এত সকালে তুমি বের হয়ে এসেছো?
-যেকোন মুহূর্তে জেনে যাবে। ফিকার নট।
-মানে?
জিয়ানা নিজের জুতাসহ পা মেহেদীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
-এইটা সুখ কিনে দিয়েছে।সে বউকে জুতা কিনে দিয়ে আদিখ্যেতা দেখানোর মতো হাজবেন্ড না।নিশ্চিত ট্র্যাকার আছে ভেতরে।
মেহেদী হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে,
-আচ্ছা তোমরা সংসার করবে কিভাবে? অতি চালাক দুইজন মানুষ একসাথে থাকতে পারে না।
-আগে কেউ হইতো পারেনি। আমরা পারবো।আসি।
বলে জিয়ানা মেহেদী কে পাশ কাটিয়ে দুই কদম ফেলার আগেই মেহেদী আবার বলে,
-সে রাগের সময় যেকোন মুহূর্তে তোমাকে খু*ন করতে দুইবার ভাববে না।
-যাদের রাগ বেশি তাদের ভালোবাসাও বেশি।অনেক ভালোবেসে ফট করে মে*রে দিবে এটা আমিও চাই।অহেতুক বেঁচে থেকে কার কি লাভটা হবে?
-বোকারা রাগে বেশি।
-হাজবেন্ড হিসেবে বোকারাই বেষ্ট।
-তাহলে স্বীকার করছো নিবিড় বোকা?
-আপনার কথার প্রেক্ষিতে বললাম।আপনার সুরে সুর মিলিয়ে উত্তর দিলাম। প্রশংসা আমি তেমন করি না।কারণ অনেকেই প্রসংশাকে চাপা মারা বলে।আর আমি চাপা মারতে পছন্দ করি না। ওইটা মিথ্যাবাদীদের কাজ।
-আমাকে এত অবিশ্বাসের কারণ?
-চরিত্রহীন পুরুষ সবচেয়ে খারাপ পুরুষ। কাল রাতেও আপনি বাহিরে ছিলেন।সকালে ফেরার সময় আমাকে দেখে আমার পেছন পেছন এসেছেন। রাইট?
-শোন জন্মগত ভাবে আমরা কু*ত্তা।যতই জান্নাত থেকে হুড় এনে দাও আমাদের এক নারীতে হয় না।এটা জেনেটিক্যালি আমারা পেয়ে এসেছি।একটা গল্প শোনাই দাড়াও
“একলোকের মরার আগে খুব শখ হলো সে তার পালিত কুকুরের লেজটা সোজা দেখতে চায়।তাই মৃত্যু দেবতা বললেন ঠিক আছে তোকে একশো বছর আয়ু দেয়া হলো।লোকটা খুশি মনে একটা সোজা চুংজ্ঞায় কুকুরের লেজ ভরে রাখলে।দুইশো বছর পর সেই মৃত্যু দেবতা আবার এলো তার সময় শেষ জানায়।বৃদ্ধা চুংজ্ঞা থেকে লেজ বের করে দেখে ,যেছা কি ওছা।সেই শোক নিতে না পেরে সাথে সাথেই স্ট্রোক করে সাথে সাথেই মারা গেলো।”
জিয়ানার মেজাজ তিড়তিড়িয়ে খারাপ হতে লাগলো এমন ফালতু গল্প শুনে।তাই মোটামুটি চিবিয়ে চিবিয়েই বলে,
-বারবার আমারা আমরা বলে নিজের দল ভারি করলেও পাপ কমবে না জনাব। নিজের জানালা অপরিস্কার থাকলে বাহিরের সব দৃশ্যই নোংরা লাগা স্বাভাবিক।
-তুমি জলে নেমে কুমিরের সাথে লড়ায়ে নেমেছো মেয়ে।কিংবা গুল্মলতা হয়ে হাতির পা বাধতে চাচ্ছো।
-ধরলাম আপনি হাতি।আপনার ওজন বেশি। আর আমি একটা লতানো ছোট কাটাগাছ।আপনি আমাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে ভর্তা করে দিতে পারেন।কিন্তু মনে রাখবেন আপনার ওজন বেশি কারনে চাপটাও বেশি আর কাটাও ফুটবে বেশি।প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল করে আমেরিকা কত বছর আফগানিস্তানে যুদ্ধ করলো।ফলাফল কি হয়েছে?
বলে চলে আসবে ,পরক্ষণেই অনুরাধার মায়ের কথা মনে পড়ায় সেদিকে তাকায়।কিন্তু তিনি উদাও।আচম্বিতে জিয়ানা মেহেদীর দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটা আরও বেশি হাঁসছে।একজন হাঁসে না আরেক মুখ সবসময় ভেটকিয়েই রাখে।মেহেদী ভ্রু নাচিয়ে বলে,
-কি? এনি কোশ্চেন?
-আপনি এখানে কেনো?
-তুমিই তো বললা তোমার পেছন পেছন এসেছি।
-আমি সিএনজি দিয়ে দ্রুত এসেছি। পেছনে কোন গাড়ি ছিলো না। তারমানে আপনি সরাসরি এখানে এসেছেন। এটা আপনাদের পারিবারিক কবরস্থান না।পাবলিক গোরস্থান।কি জন্য এসেছেন বলুন?
-সবকিছুতেই তোমার অধিক কৌতুহল। অধিক কৌতুহলে মন্ত্রী ফাঁসে।
-অনুরাধা কে?
-অনুরাধা অনুরাধাই।
-আপনার জেঠার অবৈধ্য সন্তান?
মেহেদীর চেহারা হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠলো। জিয়ানার পাশের গাছটাতে সজোরে ঘুষি দিয়ে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
-একজন মৃত্য মানুষের সম্পর্কে এভাবে বলাটা কে তুমি ভালো মানুষের বৈশিষ্ট্য বলে মনে করো? আর আমাকে বলতে আসো আমি খারাপ?
জিয়ানা স্থির নয়নে মেহেদীর চোখের দিকে তাকায়। যে লোকটা নিজের ছোট ভাইয়ের বউকে প্রথম দেখাতেই ভার্জিন কিনা জিজ্ঞেস করে ,সেই লোকটার চোখে অন্য একটা মৃত্য মেয়ের সম্মান ঝরে পড়ছে।জিয়ানা আরও গভীর ভাবে তাকায় সেই জলজলে ক্রুদ্ধ চোখের দিকে।তাই আর একটু ঘাটার জন্য বলে,
-খারাপ মেয়ে ছিলো সে।অন্য কাউকে রাতের আধারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সুখকে ফাঁসাতে চেয়েছিলো।
মেহেদী হাত উঁচিয়ে ধরে জিয়ানাকে প্রহার করতে কিন্তু মাঝপথে থেমে গর্জে বলে,
-জিয়ানা শাট ইউর ডার্টি মাউথ।আমার অনু পবিত্র ছিলো।তোমার ওই ভন্ড জামাই আমার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিয়েছে।আমার সামনেই তাকে সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলেছে।আমার হাতের উপরই রক্ত বমি করে তড়পাতে তড়পাতে মা*রা গেছে অনু।
-আপনার অনু মানে? ফাজলামি করছেন?আপনাদের বাড়ির আশ্রিতা ছিলো সে।
জিয়ানা মেহেদীর কপালের দিকে তাকিয়ে বলে।এটাও একটা ট্রিকস।মানুষকে কনফিউজড করার জন্য তার কপাল বরাবর তাকিয়ে কথা বললে সে দ্বিধায় পড়ে কথায় কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে।মেয়েদীও হারালো।
-আমার মানে আমারই।আমার প্রথম আবেগ।পুস্প পল্লবের মতো মুখ।সদ্যফোটা কদমের মতো টলটলে চোখ।আর কোকড়ানো চুলের পুতুলের মতো মেয়েটা সারাক্ষণ আমার আশেপাশে থাকতো।এটা সেটা এগিয়ে দিতো। নিবিড় আমার কাছ থেকে ওকে কেড়ে নিয়েছে।ওকে ধ*ষর্নের পর খুন করেছে।কারণ ওর কাজই সবাইকে কেড়ে নেয়া।রনি ভাইকেও ম*রতে হয়েছে ওর স্বার্থপরতার জন্য।আমার থেকে আমার আব্বুকেও কেড়ে নিয়েছে।তাই তো সেদিন ওর নিজের মা যখন ওর গলায় দা ধরেছিলো তখন আব্বু আমাকে ফেলে ওকে বাচিয়েছে।ওর কোন অধিকারই ছিলো না যে নূরম্যানসনে সেখানে সম্পত্তি পাওয়ার পর থেকে সবার চোখের মনি হয়ে যায়।
বলে থমকায় মেহেদী।সে কি বললো? এত চাইল্ডিস সে কবে হলো? অবাক চোখে জিয়ানার দিকে তাকায়।এই মেয়ে কি হিপনোটিজমেও দক্ষ নাকি? জিয়ানা মুচকি হেঁসে বলে,
-আমার আপনার ধারণা পাল্টানোর কোন অভিব্যক্তি নেই।তবে যেহেতু আপনি আমার স্বামীর নামে কথা বলছেন তাই আপনাকে একটা সত্যি কথা বলি।সুখ ট্রামালাইড। কোন মেয়েকে ধর্ষ*ণ তো দূরের কথা বস্ত্রহীন সহ্য করতে পারে না।সেখানে সতেরো আঠারো বছরের সুখের পক্ষে সেটা ছিলো আরও অসম্ভব। আর রনি ইসলামের ভাগ্য সেদিন সহায় ছিলো না।আপনারা বড্ড অকৃতজ্ঞ জানেন? কারণ সেদিন রনির জায়গায় আপনারাও থাকতেন।আট নয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলে বুদ্ধি করে সবার শরীরের আঘাতের কথা না বললে আজ এখানে আপনার দেবদাসগিরি ছুটে যেতো।লাষ্টলি ,অনুরাধা কিংবা অনু বিনতে মাজাহার মানে আপনার জেঠার অবৈধ্য কন্যার সম্পর্কে আমি কিচ্ছু জানি না।এই মাত্র তার মাকে এই কবরের সামনে দেখেই বুঝতে পেরেছি।
সুখ স্বার্থপর না,স্বার্থপর আপনি আর রাফিন।পুরা নূর ম্যানসন।নূরজাহান কোম্পানির সকল মিল ফ্যাক্টরি সুখের নামে হওয়ার পরেও কানাকড়িও সে নেয় না সেখান থেকে।অথচ আপনারা গান্ডেপিন্ডে চোদ্দগুষ্টি সহ সব ভোগ বিলাস করছেন।আপনি তার জায়গায় হলে কি করতেন? আপনার মা থেকেও না থাকলে কিংবা নিজের পিতাকে একবার আব্বু বলার নসিব না হলে? চোখের সামনে ভয়ংকর শয়তানবাদিদের উপাসনা দেখলে?
মেহেদী বাকরুদ্ধ। সে জানে নিবিড়ের সাইকোলজি সমস্যা আছে। কিন্তু এত গভীরভাবে জানতো না।আর রনির ব্যাপারটা ভেবেই দেখেনি।তবুও নিজের জায়গা বজায় রাখার জন্য হলেও কিছু বলার দরকার।কিন্তু অনেক হাতরেও কোন শব্দ খুঁজে পেলো না সে।জিয়ানা আবার বলে,
-আমরা আমরা না বলে আমি বলবেন নেক্সট থেকে।জেনেটিক্যালি খারাপ গুন সুখ কিচ্ছু পায়নি।যা পেয়েছে সব সঙ্গের গুনে।নীলুফা ইয়াসমিন নিজ হতে মানুষ করেছে তাকে। কু*ত্তার লেজ যেটা সেটা আপনি আর রাফিন।আপনাদের আমি বিন্দু পরিমান বিশ্বাস করি না।কারন সিংহ নিজের নোখ আর দাত কেটে বলল,আমি মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।আপনি কি বিশ্বাস করবেন?
মেহেদী গাছের গুড়িতে বসে পড়ে নিচের দিকে মরা পাতা সরিয়ে মাটি বের করতে করতে বলে,
-শা*লা নিবিড়ের ভাগ্য দেখে আমি বরাবরই অবাক হই।কিছু পায়নি পায়নি করে লটারি জিতে যায় বাই***। না তার কখনো মন ভেঙেছে আর না আমার মতো পর পুরুষের জন্য কাতর বউ পেয়েছে।পেয়েছে একজন উকিল বউ।যে সবসময় রেডি তাকে ডিফেন্ড করতে।রাফিন জানে যাকে চাওয়া হয় তাকে না পেলে কেমন লাগে।আর আমি জানি পুরুষের ব্যার্থতা কোথায়? সঠিক নারী জীবন না এলে জীবন কতটা বরবাদ হয়ে যায়।তবে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি খুব শীঘ্রই নিবিড়ের অর্জিনাল কালার তোমাকে দেখাবো।
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই সে কার সাথে কথা বলছে। যে বুঝে না তাকে বুঝানো যায়। আর যে বুঝেও না বুঝার ভান করে তাকে বুঝানো যায় না।তবুও লাষ্ট একটা কথা সে না বলে পাড়লো না,
-কার্ল জুঙ্গ যিনি আধুনিক মনস্ততের জনক উনি বলেছেন ,আধুনিক পুরুষের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো নিজের স্বত্ত্বাকে হারিয়ে অন্যের চাহিদার পুতুল হয়ে উঠা।এই অন্যের চাহিদা বলতে বুঝিয়েছেন প্রেম কিংবা ভালোবাসার সম্পর্ককে।পুরুষের নড়বড়ে স্বত্বা যারা ভাবে নারী তার প্রেমে পড়ে। কিন্তু না ,নারী সব সময় তার মনের ভেতর কল্পিত ফ্যান্টাসি পুরুষকে ভালোবাসে।যে পুরুষের সাথে সেই কল্পনার পুরুষ মিলে তাকে বাস্তবে গ্রহন করে।কিন্তু বাস্তের কোন পুরুষই পুরোপুরি সেই কল্পনার সাথে মিলবে না।
এইজন্য বলা হয় পুরুষের ইন্ডিভিডুয়েশন মানে অন্যের দ্বারা না নিজের স্বত্বা কে উপলব্ধি করা। একই সাথে নিজের শক্তি ও দূর্বলতাকে মেনে নেয়া। আপনিও মেনে নেন।দেখবেন জীবন সুন্দর।
হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে,
-জীবনের বড় ভুল ওইটাই করছিলাম।নিবিড়কে প্রথম ফারহানার সাথে কথা বলতে দেখে ভেবেছিলাম হইতো ওদের সম্পর্ক চলে।তাই ভুলিয়ে ভালিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলি আর বান্দী সুড়সুড় করে আমার বিছানায় চলে আসে।তারপর একেবারে বাড়িতে চলে আসে সাথে উঁচু পেট।আমার নকল বাপ সাথে সাথেই ঘরের বউ করে তুলে।
জিয়ানা মেহেদী থেকে দূরে যেতে যেতে বলে,
-এই যে আপনি ভালো ,আবার খারাপ। আধাখেঁচড়া মানুষ আমার দুইচোক্ষের বিষ।কিছুদিন পর বুমেরাং হয়ে আপনার কথা ফিরে আসবে।ফিজান অন্য কারো মুখে শুনবে “বেজন্মা”
মেহেদী চরাক করে উঠে দাঁড়ালো। কি বললো এই মেয়ে? স্তব্ধ হয়ে অপলক সে জিয়ানার যাওয়া দেখে।কানে বিশাল ঘন্টার মতো ঢং ঢং করে বাজতে থাকে “বেঁ জ ন্মা ”
জিয়ানার মাঝেমধ্যে প্রচন্ড কান্না পায়।আজ সেই মাঝেমধ্যের একদিন।মানুষের ভাগ্য এই মেহেদী কিংবা সুখের মতো কেনো হয় সে ভেবে পায় না।কেনো মাজাহার ইসলাম আর মামুন ইসলামের নষ্ট জীবনের কাফফারা তার ছেলেরা দিবে?
আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন পদযুগল থামিয়ে ভাবে।
আচ্ছা সৃষ্টিকর্তা কেনো সরাসরি রেগে আসমান থেকে এদের উপর গজব বর্ষণ করেন না? কেনো লোকসমাগমে এই সব মানুষদের নোংড়া চামড়া টেনে ছিড়ে ফেলা হয় না?জিয়ানার ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসে।
নিজেকে নিজে শান্তনা দেয় “জিয়ানা কাম ডাউন।আরও নুয়্যান্স শিখতে হবে তোর।এরা আসলে কেউ খারাপ না।পরিস্থিতির শিকার প্রতিটা মানুষ। এখনো সবার মনে সবার জন্য টান আর উচাটন সুপ্ত ভাবে বেঁচে আছে।”
বাহিরে এসে দেখে রাব্বিরা এখনো দাঁড়িয়ে। জিয়ানার মুড প্রচন্ড এলোমেলো হয়ে আছে।তাই ওদের বিদায় করে দিয়ে আবার ছুটলো নূর ম্যানসনের দিকে।
নিবিড় চোখ মেলার আগে নাক খুলে। জিয়ানার অনুপস্থিতি বুঝতে পেরে ফট করে চোখ মেলে তাকায়।মাথা উঠিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় দেখে।তারপর কিছুক্ষণ জিয়ানার বালিশে নাক ডুবিয়ে শুয়ে থেকে নিজের পরিবর্তনের কথা ভাবে,
প্রায় পাঁচ মাস থেকে সব রকমের এলকোহল ছেড়েছে সে।প্রথম প্রথম প্রচন্ড কষ্ট হলেও ডাক্তারের কাউন্সিলিংয়ে কয়েক মাসেই ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু নেশা ছেড়ে তার যে নতুন জিয়ানা নেশা ধরেছে। এটা তার ম্যান ইগোতে একেবারেই হার্ড করছে না।বরং মনের ভেতর ফুরফুরে লাগে।রাজনৈতিক প্রেসারে যখন নিবিড় দিশেহারা হয়ে যায় ,তখনই জিয়ানার সাথে কথা বললেই তার মেজাজ ঠান্ডা হয়ে আসে।এই যে এখন থেকে প্রতিটা রাত জিয়ানাকে কাছে পাবে ,সকালে ঘুম ভেঙেই মুখটা আগে দেখবে ,এটা ভাবতেই কেমন একটা শিরশিরে ভালো লাগা বয়ে যাচ্ছে মস্তিস্কে।এর ব্যাখ্যা নিবিড়ের কাছে নেই।
বালিশকে আরও জোরে চেপে ধরায় মনে পড়ে কাল জিয়ানার সাথে করা কাজ গুলোর কথা।মেয়েটা ভাঙ্গবে তবুও মচকায় না।লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠে কিন্তু মুখে অস্বীকার করে ০।
পরক্ষণেই দরজা খোলার শব্দে কান খাড়া করে। ধপধপ পায়ে হাটে জিয়ানাই।তাই মুখ না উঠিয়েই শুয়ে থাকে।জিয়ানা রুমে ঢুকেই নিবিড়কে বলে,
-একটা সুজলা সুফলা বউ থাকতে আপনি বালিশ নিয়ে কচলাকচলি করছেন কেন?
নিবিড় সাড়া শব্দ করে না দেখে জিয়ানা কাছে গিয়ে উন্মুক্ত পিঠে হাত রেখে ধাক্কা দেয়।নিবিড় চরাক করে সেই হাত টেনে জিয়ানাকে নিজের কাছে এনে বলে,
-যাদের বউ বেশি ধানাই পানাই করে তাদের তো একমাত্র বালিশই ভরসা।
-ধানাই পানাই আমি কখন করলাম? কাল আমকে আপনি আলু ভর্তা করলেন কিচ্ছু বলেছি?
নিবিড় ঘনিষ্ঠ হয় জিয়ানার।পিলপিল করে আঙুল উপরে উঠানো শুরু করলে ,জিয়ানা মোচড়ামুচড়ি করে বলে,
-ছাড়ুন এখন।এমনিতেই দেরি করে ফেলেছি।শাওয়ার নিতে হবে।মাইমুনা আপু আসবে একটু পর। আমার রেডি হতে হবে।আহা! সুখ?
নিবিড় জিয়ানাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে বসে বলে,
-দ্যান লেটস গো।
-লেটস গো? কোথায় লেটস গো?
-লেটস টেক আ বাথ টুগেদার। একসাথে দুইজন গোসলের উপকার অনেক গুলা।
-হ্যাঁ জানি একে অপরের পিঠ মাজা যায়। তাই না?
বলে জিয়ানা আলমারি খুলে প্রয়োজনীয় কলথ হাতে নেয়।
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে,
-হুম। আর পানি অপচয় হয় না প্লাস সুন্নত।
-এক কাজ করি আমি বাথটাবে গোসলের পানি জমিয়ে রাখি।আপনি সেটা দিয়ে কাজে লাগাবেন।অপচয় হবে না তাতে।
নিবিড় কপাল ভাজ করে তাকিয়ে থাকে ,সেটা দেখে জিয়ানা কাছে এসে ভাজ করা কপালে টোকা দিয়ে বলে,
-ওয়াশরুমে আপনাকে নিয়ে ঢুকি আর আপনি আমাকে মেরে ফেলে রাখুন। এটাই প্ল্যান তাই না?
-প্ল্যান না তুমি করলা রাতে? আগে আমাকে খু*ন করবে তারপর আমি তোমাকে।
তাদের কথার মাঝে দরজায় টোকা পড়ে।জিয়ানা খুলে দেখে আসমা হাঁসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।জিয়ানাকে দেখেই বলে,
-আপা! তাহানির মা বলছে তাত্তারি যাইতে।সাজানির বেডিরা আইসে।
-আমি ওদের কাছে সাজবো না তুই গিয়ে বল।আমি জাষ্ট শাড়িটা পড়বো। বড়জোর কাজল। বেশি প্যারা দিলে ওয়াল টপকে পালাবো। যা এইভাবেই বলবি।
-ওমা কি কন? রাফিন স্যারের বউরে পুতুলের মতো সাজাইতাছে।কি সুন্দর লাগতাছে জানেন? আপনারেও হেব্বি লাগবো।
-না ওরা পুতুল তাই পুতুলের মতো লাগে।আমি রোবট আমাকে জোকার লাগবে।
নিবিড় পেছন থেকে বলে,
-গিয়ে বল জিয়ানা যেটা চাচ্ছে সেটাই হবে।আমি বলেছি।
নিবিড়ের গলা শুনে আসমা আর দাঁড়ায় না।সে জমের মতো ভয় পায় এই লোককে।এবার কিভাবে জানি শান্ত আছে।প্রতিবারই যখন আসে মহাপ্রলয় ঘটায় বাড়িতে।হয় গাড়ি ভাঙে ,না হয় ডায়নিং টেবিল সহ যা সামনে পায় সব।আসমা ভেবে পায় না ,রাগের সাথে জিনিস ভাঙ্গার কি সম্পর্ক। হইতো টাকা বেশি থাকলে সম্পর্ক থাকে।বড়লোকদের কত ব্যাপার স্যাপার।
মাইমুনা তার রুমে জিয়ানাকে শাড়ি পড়ানো শেষ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসায়।জিয়ানা নিজেকে মিররে দেখে বলে,
-মনেই হচ্ছে না শাড়ি পড়েছি।এত লাইট ওয়েট।এই জন্যই মনে হয় ব্র্যান্ড ভ্যালুটা প্রিফার করে। তাই না আপু?
-হুম।
ছোট করে উত্তর দিয়ে চুলে খোপা করে দেয়।
-এর আগেও অবশ্য একবার পড়ার সুযোগ হয়েছিলো কিন্তু সেটা পুড়ে গেছে।
-ওমা কিভাবে? গ্যাসের আগুনে?নাকি তোমার রুপের আগুনে?
-রুপে আগুন তো নাই তবে তোমার ভাইয়ের মেজাজের আগুনেও হতে পারে।
-ঠিকঠিক। স্বয়ং সূর্যই উনি।
দুইজনই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে।শাড়ি পড়ানোর পর মাইমুনা জিয়ানার সামনে এক বক্স মেকাপ মেলে ধরে।জিয়ানা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
-আপু ওনলি লিপষ্টিক আর কাজল ওকে?
-নো। তুমি যেহেতু বিউটিশিয়ানের কাছে সাজলেই না তাই আমি যেমন সাজাবো তেমনই সাজতে হবে।ডোন্ট ওরি আমিও মেকাপ আর্টিস্টের চেয়ে কম কিছু না।
-দশ মিনিট জিয়ানাকে ঘষামাজা করেও যখন শেষ হচ্ছে না জিয়ানার উসফিস শুরু হয়।সে এখান থেকে পালানোর প্ল্যান করে মনে মনে। আয়নায় দেখে তাহানী আরামছে চকলেট খাচ্ছে।জিয়ানা নিচ থেকে আস্তে করে বলে,
-আপু গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। পানি খেয়ে আসি?
-পালানোর চেষ্টা করছো তাই না? দাঁড়াও আমি ব্যবস্থা করছি।
বলে নিজেই বের হয় রুম থেকে।জিয়ানা তাহানীকে ডেকে বলে,
-তাহা বেবি? আমাকে কেমন লাগছে?
-বালো।আম্মাল মাম্মাও এমন সেজেছিলো। অনেক বিউতিফুল লেগেচে।
-হ্যাঁ আমি জানি।উনাকে বিয়ের দিন সবচেয়ে বেশি সুন্দর লেগেছে।
-তুমি দেখেচো?
-হুম। কেনো তুমি দেখোনি?
-নাতো?
-এমা তোমাকে মনে হয় দাওয়াত দেয়নি।বাসায় একা রেখে তারা বিয়ে করতে গিয়েছিলো।
মুখটা বিষিয়ে বলে জিয়ানা।তাহানী অবাক হয়ে ভাবে কিছু।তখনই মাইমুনা রুমে ঢুকে পেছনে পেছনে একজন গভর্নেন্স যার হাতের ট্রে তে কিছু স্ন্যাকস ,সফট ড্রিংক্স আর পানি।তাহানী মাইমুনাকে দেখেই দৌঁড়ে গিয়ে বলে,
-মাম্মা তুমি আল পাপা আমাকে একা বাসায় রিকে বিয়ে কত্তে গেচো?আমাকে নিয়ে যাও নাই কিনু?আমাকে দুয়াত দিও নাক কিনু?
বলে ফ্লোরে হাত পা ছড়িয়ে বসে কান্না শুরু করে। মাইমুনা পড়ে বিপদে।নিজেও শাড়ি পড়েছে।জিয়ানা মুচকি হেঁসে বললো,
-আপু লিপষ্টিক লাগিয়ে নিচ্ছি তবেই ডান।আর কিছু দিতে হবে না।আপনি ওকে সামলান।
অন্যথা মাইমুনা তাহানিকে বুঝানো শুরু করলো। কিন্তু বেচারি কিছুতেই মানছে। তাই জিয়ানা এগিয়ে এসে বলে,
-আরেহ তাহানি তখন তো তুমি জান্নাতে আল্লাহর কাছে ছিলে।উপর থেকে তোমার মাম্মা আর ড্যাডকে দেখেছো।
এবার বাচ্চাটার কান্না থামে। চোখ মুছে মায়ের কোলে উঠে।সুন্দর পার্টি ড্রেসটা দলামলা হয়ে গেছে।ঘাড় সমান চুল এলোমেলো সারা মুখময় ছড়িয়ে।মাইমুনা মেয়েকে আবার রেডি করানোর জন্য কোলে নিয়ে বলে,
-তুমি তবে নিচে এসো। গেইষ্টরা সবাই এলে আমরা হলরুমে যাবো।
জিয়ানা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
সংসারে একটা মেয়ে আর একটা মেয়েকে চট করে মেনে নিতে পারে না।বিশেষ করে যখন দেখে তার থেকে আগতজন অনেক বেশি সুখী।
রাফিনের স্ত্রী একেবারে বউ সেজে ভারি গহনা পড়ে বসে আছে সোফায়।তাকে দেখে স্বপ্নার বিশেষ ভাবান্তর না হলেও,যখন জিয়ানা নেমে এলো আপনা আপনি সবার চোয়াল ঝুলে গেলো কয়েক ইঞ্চি।লম্বা হওয়াই শাড়িতে ঠিক একজন মডেলের মতো লাগছে।শাড়ি পড়ার কারনে অভ্যাসগত হাটার বেশ পরিবর্তন হয়েছে।আস্তে-ধীরে সিঁড়ি বেয়ে যখন নেমে এলো নারী কায়াই সাক্ষাত নীলুফা ইয়াসমিন তবে তার চেয়েও মনোরম।
বৃদ্ধা কুলসুমের চোখ চিকচিক করে উঠে।তার লম্বা জীবনে মেয়েটার সুখ দেখা হয়নি।তাই তো স্বপ্নার মাধ্যমে যাবতীয় জুয়েলারি নীলুফার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।রুপক যখন মালেশিয়া থেকে ফিরে এলো কিন্তু নীলুফাকে পেলো না। সে তখন বড্ড উন্মাদ।পাগলামি আরও বাড়ে যখন জানতে পারে নীলুফা আর সাগর বিয়ে করেছে।সে কি আর্তনাদ তার।কি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।উম্মে কুলসুম ভুলেও টের পায়নি এই ছেলের অনুভূতি। অতি স্নেহ করে ভেবে সেদিকে বিশেষ নজরই দেয়নি সে।কিন্তু নিজ সন্তানের হত্যাকারীকেও মেনে নিতে পারে না।
বৃদ্ধার ভাবনার মাঝেই জিয়ানা উনার পাশে এসে বসে।কুলসুম নিজের হাতের বালা খুলে জিয়ানাকে একটা পড়িয়ে দেয়,আরেকটা সাফাকে।জিয়ানা সাফাকে খেয়াল করে প্রচন্ড শুকনো মুখে বসা।চোখ মুখে একপ্রকার ভয় আর হতাশা।অথচ কি সুন্দর মুখটা।মেকাপের প্রলাপে সত্যি পুতুল পুতুল লাগছে।সে জায়গা বদলিয়ে সাফার পাশে বসে।তারপর নিজের হাত সাফার হাতের উপর রেখে বলে,
-ভাঙ্গা কাঠের টুকরাকে মানুষ সবার আগে চুলায় পুড়ে। তাই ভেতরটা ভেঙে গেলেও বাহিরের প্রাচীর শক্ত রাখা উচিত ততক্ষণ ,যতক্ষন প্রাণ থাকে শরীরে।
সাফা মুখ তুলে তাকায় জিয়ানার দিকে।জিয়ানা চমৎকার হেঁসে বলে,
-বাগান বিলাস খুব পছন্দ?
সাফা মাথা নিচু করে ফেলে।যাহ সে ধরা পড়ে গেছে ।এরমাঝে কিছু মানুষ সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে।আর তাদের পেছনে জিয়াউল আর আঞ্জুমানও। জিয়ানা সাফাকে আরও বলে,
-হাঁসি হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।সবসময় মুখে হাঁসি রাখলে শত্রুর কনফিডেন্স কমে যায়।
তারপর উঠে দাড়ায় সোফা থেকে।ঘুরে দেখে জিয়াউল ,আঞ্জুমান ,জেনি আর মক্কু এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। জিয়াউলের মুখের দিকে জিয়ানার মনে হলো,আগের জিয়াউল হলে এক্ষুনি একটা রাম ধমক দিয়ে বলতো,
“অভিনন্দন তোমাকে।তোমাকে নিয়ে আমার এই মিথ্যা আশা ভেঙে দেয়ার জন্য।আমি এতকাল জেনে এসেছি আমার মেয়ে হবে কীর্তিমান কিন্তু সে হয়েছে কীর্তিনাশা।খুব ভালো করেছো এইসব ফালতু চুড়ি মালা শাড়ি পড়ে সং সেজে এখন ঘর সংসার করবে।গর্বিত জননী হয়ে একদিন টুকুস করে মারাও যাবে।নো ওয়ান নো দ্যাট জিয়ানা হক নামের কেউ এই পৃথিবীর আলো বাতাস খরচ করেছে।এসব শুনে জিয়ানা তিতা খাওয়া খাওয়া মুখ করে বসে থাকবে”
কিন্তু এখনকার জিয়াউল সেসব বললো না। তার চোখের তারায় জোত্যি খেলছে জিয়ানাকে এই সাজে দেখে।আঞ্জুমান আর হুইল চেয়ার সহ জিয়াউল এগিয়ে আসে জিয়ানার দিকে।জিয়ানা হাটু গেড়ে বসে জিয়াউলের সামনে।জিয়াউলের চোখে মুগদ্ধতা।জিয়ানা খুশি হতে পারে না এই মুগ্ধতা দেখে। তবুও চোখে মুখে খুশির ছাপ এনে বলে,
“আজি হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর ”
জিয়াউল চমৎকার হাঁসে।আঞ্জুমান এসে জড়িয়ে ধরে জিয়ানাকে।কতবড় বাড়ির মেয়েকে সে নিজের হাতে মানুষ করেছে ভেবে আজ কুন্ঠিত হয়।জেনে ,না জেনে ,কারণে অকারণে নিজের সন্তান নয় ভেবে মাঝেমধ্যে অবহেলাও করেছে।সত্যি আজ সে লজ্জিত।জেনির ঘোর কাটে না।সে বিস্মিত। এই সে কাকে দেখছে? জিয়ানা গিয়ে কানে কানে বলে,
-কি মহিলা? কেমন লাগছে আমাকে?
জেনি থুতনি ধরে বলে ,
-নিচু হো জিয়ু।তোর কপাল নাগাল পাই নাতো?
জিয়ানা নিচু হয় জেনি আদর করে দেয় বোনকে।মক্কু সাইড থেকে বলে ,
-শালি হিসেবে আমারও চান্স আছে নাকি? এমন আদর দেয়ার?
-আমার আপত্তি নাই ভাই।তবে আপনার ভাই আপনাকে কি করবে সেই রিস্ক আপনার।
জেনি কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
-ঠোঁটে মাস্টার গাম লাগিয়ে দিবে নিবিড় ভাই।সাহস থাকলে উনার সামনে বলো এই কথাটা।
জিয়ানা আর মক্কু একসাথে হেঁসে উঠে।জিয়াউল আর আঞ্জুমানকে দেখে স্বপ্না আর কুলসুম এগিয়ে আসে।সবাই উপস্থিত থাকলেও মামুন ইসলাম ওরফে রুপক মন্ডল কখনো এইসব ঘরোয়া প্রোগ্রামে থাকে না।কাজের অযুহাতে সব সময় সরে থাকে।আর একজন থাকে না মেহেদীর মা।খুব বেশি পছন্দের মানুষ ছাড়া উনি বিশেষ একটা কথাও বলেন না।
এরমাঝে ফারহানা আর ফাইজা নেমে এলো।ফাইজা একটা সেমি পার্টি ওয়ার পড়েছে।কিন্তু ফারহানা একেবারেই আজ সাদাসিধা একটা শাড়ি পড়েছে।এমনকি বিশেষ সাজেওনি।বাড়ির কেউ বিশেষ ঘাটলো না ওকে।তবে আসমা জিয়ানার কানের কাছে এসে বার কয়েকবার বলে গেছে,
-আফা আপনের আসার পর থাইক্কা এই বাড়িতে হাস আর ডাকে না।কাকরাও কা কা করে না।কি যে শান্তিতে আছি আজ দুইদিন থাইক্কা।আল্লাহ আপনার হায়াত দরাজ করুক।
জিয়ানা মৃদ্যু ধমক দিয়ে বলেছে,
-তার জায়গায় তুই থাকলে এরচেয়ে বেশি প্যাকপ্যাক করতি।তার জামাই কেমন দেখিস নাই?মেয়েদের অর্থকড়ি থাকুক আর না থাকুক ভালো জামাই না থাকলে চারইঞ্চি কপাল পুরাটাই ভোগাস। বুঝলি?
আসমা নেড়ে বলে,
-তওবা তওবা আর কইতাম না আপা।ছরি।কিন্তু আপনারে নায়কা কবুরির মতো লাগতাছে এক্কেরে। এইডা কিন্তু হাছা।
জিয়ানা হেঁসে বলে,
-হুম একটু পর আমার রাজ্জাক নামবে তাকেও বলিস আপনাকে নায়ক রাজ্জাকের মতো লাগে।
-ওরে আল্লাহ মাফ চাই আফা।ভাইরে আমি যমের মতো ডরাই।ধইরা একটা আছাড় দিলে আমি শ্যাষ।আপনেরে আল্লাহ সে কি দিয়ে বানাইছে বাঘেরে নিয়া একঘরে থাকেন।
জিয়ানা খিলখিল করে হেঁসে দেয় আসমার কথা শুনে আর মনে মনে ভাবে তোদের বাঘ আমার কাছে আসলে ওন্দা বিলাই হয়ে যায়।
অদূরে জিয়ানার হাঁসির দিকে আকুল চোখে তাকিয়ে রাফিন।সাফা বারবার খেয়াল করছে সেটা।তার দিকে ভুলেও তাকায়নি অথচ জিয়ানার দিক থেকে চোখ সরাচ্ছে না।অপরদিকে জিয়ানার কাছেও লাগে তার দিকে কেউ তাকিয়ে আছে।কিন্তু কে তাকিয়ে সেটা ধরতে পারছে না।তাই একটা ফেইক হামি দিলো বেশ সময় নিয়ে।এবং তার দিকে যে তাকিয়ে ছিলো সেও হামি দিলো। জিয়ানা চোর ধরে ফেলে। আর কেউ না রাফিন ইসলাম। সাফার দিকে একবার তাকিয়ে তার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।টাইম ট্রাভেল করে যদি লাইফটা আবার গুছানো যেতো।
জিয়ানাকে ঘিরে রেখেছে আগত আত্মীয় স্বজন।সিনিয়র পাবলিক এখনো আসেনি।সিনিয়র মানে কুলসুমের জীবিত পাঁচ বোন ,বাকি দুইবোন মৃত্য।জিয়ানা সবার সাথে পরিচিত হওয়ার সময় তাকিয়ে দেখে নিবিড় আসছে।মেরুন পাঞ্জাবি পড়ে সেটার হাতা ভাজ করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো জিয়ানা অপলক সেদিকে তাকিয়ে ভাবে ,
“শাহানশাহ ,বীরে কামেল ,দিক বিজয়ী সিংহ পুরুষ ,প্রতাপ চৌধুরী ,শৌর্যবীর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ,শত্রুর বুকের ভয়ের কাপন ,মিত্রের মিত্র ,মধ্যযুগীয় উৎকৃষ্ট যুদ্ধা ,নূর ম্যানসনের যোগ্য উত্তরসূরী ,জিয়ানা হকের পতি জনাব সুখনীল নিবিড় হাজিইইইইইর ”
হাজির হয়ে বান্দা খাবি খায়।জিয়ানার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় অদূরে।তার ভেতরের অনুভূতি যেনো চুলায় গরম দুধের মতো উপচে পড়ছে।মেরুন শাড়ি পড়া লাস্যময়ী এক নারী যার চেহারা আজ অন্যদিনের চেয়ে বেশি আলোকিত।খোপায় কাচাফুল ,ডার্ক লিপষ্টিকের ফাঁকে মুক্তার মতো দাঁতের হাঁসিতে কোন সুনিপুণ হাতের আঁকা অপ্সরী যেনো।বাকানো কোমড়ে শাড়ির ভাজ যেনো পাহাড়ি নদীর বাক। কাজল কালো চোখ যেনো হাজার মৃগের বিসর্জন দেয়া নয়ন।আবার ঘাড় ঘুরিয়ে সেই সর্বনাশা নেত্রের দিকে তাকায়।যেটা বড় বড় করে ভ্রু কপালে উঠিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।নিবিড়ের চোখ ঘুরে বেড়ায় জিয়ানার চোখে,নাকে ,ঠোঁটে এসে থামে।কিছুটা পেছনে রাফিনকে জিয়ানার দিকে মুগদ্ধ চোখে থাকিয়ে দেখে তার মুগ্ধতা ফুস করে উড়ে গিয়ে পারদের ঘরে আগুন লেগে যায়।গমগমি জিয়ানার কাছে গিয়ে খপ করে হাতখানা ধরে সবার মাঝখান থেকেই টেনে তুলে নিজের লায়ন ভয়েসে বলে উঠে,
-একটু কাজ আছে আসো।
জিয়ানাকে আর সুযোগ না দিয়ে নিজেই টেনে বের করে আনে সেখান থেকে।আশেপাশের সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।স্বপ্না এগিয়ে এসে বলে,
-অনেক আত্মীয় স্বজন এখানে উপস্থিত। একটু মেনার্স রেখে চল সুখ।
নিবিড় তাকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে পেছনের দিকে করিডোরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।
জেনি সেই তখন থেকেই দেখছে রাফিনকে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে থাকতে।তাই কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বলে,
-স্যার কেমন আছেন?ভাবি মাশা-আল্লাহ সুন্দর আছেন।
জবাবে রাফিন মেকি হাঁসি দিয়ে একবার সাফার দিকে তাকায়।মেয়েটার জ্বর শরীরে।কাল সে পশুর মতো ব্যবহার করেছে ভাবতেই নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে এখন।তার ধ্যান কাটে জেনির কথাতে।
-এখনো কি জিয়ুকে টম বয় লাগে স্যার?
রাফিন মাথা নিচু করে বলে,
-এইজন্য আমি জিয়ানার কাছে অনেক বেশি লজ্জিত জেনি।
-আপনার এখনকার লজ্জায় তো আর জিয়ানার তখনকার সাতদিনের কষ্টটা চলে যাবে না। তাইনা?
রাফিন মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
-মানে?
-মানে কিশোরী বয়সে আপনি ওর সাথে একটা ডাবলরুল প্লে করেছেন।প্রথমে আদর আদর করে গার্লি ট্রিট করে ধপ করে একদিন বলে দিলেন টম বয়।জিয়ানা সেটা নিতে পারেনি।টানা তিনদিন জেদ করে না খেয়ে সাতদিন জ্বরে পড়ে ছিলো।আপনি ওইসব বলে ভালো করেছেন অবশ্য। তানা হলে নিবিড় ওর লাইফে আসতো না।ওর মতো পাগল মেয়েকে সামলানোর জন্য কড়া নিবিড় ভাই পার্ফেক্ট।
বলে চলে আসে সেখান থেকে।আর তাদের ঠিক পেছনে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সম্পুর্ন কথাটা শুনে একজন মুচকি হাঁসি দেয়।
নিবিড় করিডোরের একেবারের কিনারায় নিয়ে যায় জিয়ানাকে।হাত ছেড়ে কোমর আগড়ে ধরে আচম্বিতে ওষ্ঠাধর কিডন্যাপ করে।হ্যাঁ জিয়ানার কাছে কিডন্যাপই লাগে।আজকের কিডন্যাপটা অন্যরকম লাগছে তার কাছে।লিটারেলি এটা কোন ক্যাটাগরির চুমু জিয়ানার স্মরনে এলো না।বান্দা গুনে গুনে তিন মিনিট পর ছেড়ে দিয়ে বলে,
-এখন ঠিক আছে।একেবারে ক্লিন করে দিয়েছ।আর কখনো এমন ডার্ক লিপষ্টিক দিবে না।
জিয়ানার ঠোঁট আক্রমনে ভিমরুলের কামড়ের মতো ফুলে গেছে মনে হচ্ছে।তার বলতে ইচ্ছা হলো “ব্যাটা ভিমরুল তোর জ্ঞান তোর কাছে রাখ।আমার ঠোঁট ঠিক করে দে।”
কিন্তু সহজেই কিছু চাওয়ার অভ্যাস তার দাচে নেই ।তাই বলে,
-সকাল থেকে না খেয়ে আছি।খিদায়ে চেয়ার টেবিল খেয়ে ফেলার উপক্রম আর আপনি মশকরা করছেন?আচ্ছা তবে চোখ আর গালটাও খেয়ে ক্লিন করে দেন না প্লিজ? এখানেও অনেক কিছু দিয়েছে মাইমুনা আপু।
নিবিড় চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলে,
নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৫
-আই উইল ইট এভ্রিথিং টু নাইট। গেট রেডি।আর খাওনি কেনো? কোথায় গিয়েছিলে সকাল বেলা?
-ওকি আপনিও ক্যানিবাল নাকি? ওমা গো..
বলে ছুট লাগায় জিয়ানা।নিবিড় পেছন থেকে বলে,
-আর কখনো এমন সাজে বাহিরে আসবে না জিয়ানা। আমি এলাও করছি না।
-আপনার এলায়েও গুষ্টির তুষ্টি ভিমরুল ব্যাটা।
