Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৬

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৬

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৬
আশিকা আক্তার সোহাগী

“যে নিজের চোখের জল ফেলে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হয় তার কষ্ট সবাই বুঝে না -সমরেশ মজুমদার ”
ঠিক তেমনই নূর ম্যানশনের একটা রাত আর গোটা একটা দিন কেটে গেছে ,অথচ কেউ একবারও স্বপ্নার কথা তুলেনি।তবে উম্মে কুলসুমের ব্লাড সুগার নীল হয়ে গেছে।আর রেবেকাকে সারাদিন রুমের বাহিরেও দেখা যায়নি।বাচ্চা ছেলে ফিজান পর্যন্ত কেমন স্বাভাবিক। তবে কাল রাতে কেউই ডিনার করেনি।জিয়ানা ভার্সিটি থেকে ফিরে এসবই ভাবছিলো সোফায় বসে।

নিবিড় গেছে সাভারের শেষ সীমানায় ক্যানভাস করতে। আজ নাকি মেহেদীও গেছে তার সাথে।নিশ্চিত মেয়ে দেখতে গেছে বাড়ি বাড়ি। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে।
জিয়ানা বাজে স্মেল পেয়ে পাশে ফিরে দেখে ফিজান বারবার কাত হচ্ছে।সিঙ্গেল সোফায় ফাইজা মোবাইল গুতোগুতিতে ব্যাস্ত।ফোনের পেছনে চিকচিক করা কতগুলো ফিতা ঝুলছে।এই মেয়ে পুরাই চমলক্ক। ফারহানা টিভিতে সিআইডি দেখছে বরাবরের মতো।ভোতা ভোতা কিছু চেহারার লোক টিভি স্কিনে চোখ মুখ কুচকে আং চাং ফাং করছে। জিয়ানার চুপচাপ অহেতুক বসে থাকতে ভালো লাগছে না।তাই ফারহানাকে জিজ্ঞেস করে ,
‘ভাবি?ওইসব ক্রাইম টিভি শো বাচ্চাদের সামনে দেখতে নিষেধ করে শিশু বিশেষজ্ঞরা। ‘
ফারহানা নজর টিভি থেকে হাটিয়ে ফিজানের দিকে তাকিয়ে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

‘ও তো গেইম খেলতে ব্যাস্ত থাকে। এসবে মনোযোগ দেয় না।’
জিয়ানা ফিজানকে জিজ্ঞেস করে ‘এটা কি গেম রে তুলম্বু?’
‘মাইন ক্রাফট।’
‘তোর ফেবারিট? ‘
‘নো।বাল্লেরিনা ক্যাপিচিনা আমার পছন্দ বেশি। তোমার কোনটা ফেবারিট? ‘
ফোনের দিকে তাকিয়েই বলে ফিজান।
জিয়ানা উকি মেরে দেখে কেমন বক্স বক্স কার্টুন দৌঁড়াদৌঁড়ি করে কি সব বানাচ্ছে।জিয়ানার নাকে আবার ধাক্কা লাগে সেই স্মেল।এবার শব্দ সহ।শব্দের উৎস ফিজান।ফারহানা পিঠে চাপর দিয়ে বলে,
‘স্কুলে আজ কি কি খেয়েছিস ফিজান?যা পটিতে বস গিয়ে?’
‘মম ডোন্ট স্যে দ্যাট। আমার একটা মিনিমাম লেভেলের ডিগনিটি আছে।ইউ নো?’
‘ডিগনিটি দেখানো হচ্ছে?তুই টাকা পেলি কোথায়?’
‘বিএফএফ এর বার্থডে ছিলো। ওই ট্রিট দিয়েছে।’
বলে আবার ছাড়ে একটা। জিয়ানা অট্টহাসি দিয়ে বলে,
‘তুলম্বু তোকে একটা জিনিস গিফট করবো ভাবছি।যেটা তোর ডিগনিটি বাঁচাবে।’
‘কি?’

‘ভ্যানভেরা বানিয়ে দিবো তোকে।এত পাদিস কেন?’
‘হোয়াটিস ভ্যানভেরা?এন্ড ইয়াক তুমি এমন আসমা আন্টির মতো পাডিস বলছো কেন?’
জিয়ানা এবার খিলখিলিয়ে হেঁসে বলে,’আরেহ বাপ তুই তো দেখি ব্রিটিশদের মতো দ কে ড বলছিস।শোন বাপ তুই আর তোর চোদ্দগুষ্টি বাঙ্গালী। জিহ্বাকে ছেড়ে কথা বলবি।আর হ্যাঁ অবশ্যই প্রাণখোলে পা*দবি। নো প্রবলেম বেটা।শুধু ফ্রেগেন্সের দিকে নজর দিস। কেউ যেনো শহীদ হয়ে না যায়?’
‘ভ্যানভেরা কি বললে নাতো?’

‘ভ্যানভেরার আরেক নাম প্রাল্লো।এটা একসময় প্রচলিত ছিলো ইতালির ভেনিসে শহরে। সেখানকার সম্ভ্রান্ত পরিবার গুলা জৈবিক বায়ু নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহার করতো।এই মেশিনের সরু দিক বায়ু ত্যাগের রাস্তায় আটকে রাখা হতো। আর এর ভেতরে থাকতো সুগন্ধি ভেষজ। আর একটা পদ্ধতি যাতে বিরক্তিকর দুর্গন্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ করে সুগন্ধ আর উচ্চাশব্দ থেকে মৃদ্যু শব্দে পরিনত হয়।’
ফারহানার প্রথমে হাঁসি পেলেও এবার সোজা হয়ে বসে।এত স্বাভাবিক ভাবে সে কখনো ফিজানের সাথে কথা বলেছে বলে মনে পড়ে না।তার ধারণা ছিলো বাচ্চারা বাচ্চাদের সঙ্গ পছন্দ করে। অন্যদের সাথে দূরত্ব মেইনটেইন করে। অথচ জিয়ানার সাথে কি সুন্দর ফ্র‍্যান্ডি বিহেভ করছে।
ফিক করে হেঁসে দিয়ে ফিজান বলে,
‘তবে আমরাও একটা বানাবো ওকে?আর আমার এক ফ্রেন্ডকে মাষ্ট গিফট দিতে হবে।ওর ইরিটেটিং ফার্টিংয়ে আমরা ক্লাসের সবাই ডিস্টার্ব। ‘

জিয়ানা হেঁসে জিজানের সাথে হাই ফাইভ করে।এরমাঝে রাফিন এসে ফিজানের পাশে বসে । সাফাও আসে পেছন পেছন। রাফিন কখনোই শর্টস পড়ে না।লং টাউজার আর ট্রি-শার্ট পড়ে থাকে।চুলগুলো আবার মুরগী ছিলা দিয়েছে।জিয়ানার কাছে রাফিনকে এখন একপ্রকার অদৃশ্য মানব লাগে।কি দেখে এই তব্দার প্রতি তার ফাষ্ট ফিলিংক্স আসছিলো আল্লাহ মালুম।যাক নিবিড় প্ল্যান ফ্ল্যান করে তাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। তানাহলে এই ব্যাটাকে জিয়ানা কিলিয়েই মে*রে দিতো।জিয়ানার ভাবনার মাঝেই মেহেদী আর নিবিড়ও এসে উপস্থিত হয় সেখানে।রাফিন ফিজানকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে।
মেহেদী এসে বসে ফিজানের আরেকপাশে।ইদানীং সে ছেলের দিকে অল্পস্বল্প নজর দিচ্ছে।জিয়ানা খেয়াল করে দেখে ফিজান একেবারেই ফারহানার মতো হয়েছে।গোলগাল নাদুসনুদুস। বাপের কিচ্ছু পায়নি।এরমাঝে ফিজান রাফিনের একটা প্রশ্নের উত্তরে বলে,

‘চাচ্চু ইউ নো না?আওয়ার স্কুল ইজ মোষ্ট ওয়ান্টেড এন্ড প্রেস্টিজিয়াস স্কুল ইন দিস টাউন? এখানে ভর্তি হতে কত কত কমিশন আর লিংআপ লাগে জানো? সো আম নট আ এভারেজ পাবলিক ওকে?’
মেহেদী পিঠে চাপর দিয়ে বলে, ‘তবুও যে বলদ হচ্ছিস তুই।সেটা কে বলবে?’
নিবিড় জিয়ানার পেছনে দাঁড়িয়ে ফিজানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে ,’তোর ড্যাড কোন স্কুলে পড়েছে জানিস?’
ফিজান নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ডানে বামে নাড়িয়ে না করে।নিবিড় আবার বলে,’প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে।তখনকার সময় তিন এলাকা মিলে একটা স্কুলও ছিলো না।নিরাপত্তার খাতিরে আমরা কাছাকাছি সরকারি প্রাইমারিতে পড়েছি।কেউ কি মেহেদীকে জিজ্ঞেস করে যে সে কোন স্কুলে পড়েছে?নাকি এটা জিজ্ঞেস করে তার রেজাল্ট কি?ভালো স্কুলের স্টুডেন্ট হলেই কি স্কলারশিপ পাওয়া যায়? নাকি ভালো রেজাল্ট লাগে?’
রাফিন বাকি কথা বলে,’স্টুডেন্ট ভালো হলে দুনিয়ার যেকোনো স্কুলেই সে ভালো করতে পারে। তোমার ড্যাড যেনোতেনো স্কুলে পড়েও বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ল্যাবে একজন গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন।এটা কি স্কুলের ক্রেডিট নাকি তার নিজের?’

ফিজান মাথা নিচু করে বলে,’আই মেড আ মিসটেক।আম সরি। ‘
নিবিড় বলে,’ আ ম্যান নেভার আস্কস ফর ফরগিভনেস।পুরুষ কাজে প্রমাণ করে আগের ভুল সে শুধরে নিয়েছে।’
জিয়ানা উল্টো ঘুরে নিবিড়ের দিকে তাকায়।জিয়ানার মাথার কাছে ঝুকে আছে নিবিড়।কথা বলার সময় এডাম আপেল উঠানাম করছে।ড্রয়িংরুম না হলে জিয়ানা একটু ছুঁয়ে দেখতো।এই সুউচ্চ জিনিসটার জন্যই কি লোকটার ভয়েস এমন লায়নের মতো?জিয়ানার দৃষ্টি হঠাৎ ফাইজার উপর পরে।ফোন বন্ধ করে হা করে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। জিয়ানার ফুরফুরে মেজাজ চিরবির করে খারাপ হয়ে গেলো।এই মেয়েকে একটা শিক্ষা না দিলেই না। আবার নিবিড়ের দিকে তাকায়।কে বলেছে এই লোকটাকে এমন সিংহ পুরুষ হতে?একটু খাটো হতো কিংবা ভয়েস হতো প্যাচপ্যাচে। জ-লাইন ভোতা হতো।পেটের ভুড়ি ঠেলেঠুলে বেড়িয়ে আসতে চাইতো।

তারপর কল্পনা করে এমন নিবিড়কে।দাঁত কেলিয়ে ভুড়ি নাড়িয়ে নাড়িয়ে জিয়ানার দিকে এগিয়ে আসছে বউ বউ করতে করতে।কল্পনার মাঝেই নো ওয়ে বলে দাঁড়িয়ে যায় জিয়ানা।আচম্বিতে দাঁড়ানোর ফলে মাথা গিয়ে লাগে নিবিড়ের থুতনিতে।
নিবিড়ের লাগলেও সেটা প্রকাশ করলো না।অপরদিকে তখন ম্যানসনে প্রবেশ করে মাইমুনা আর রুহানি।
রুহানি এমন মোহনী ভাবে সেজে এসেছে দেখে জিয়ানারা পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়িতে এসেছে।জিয়ানার জানার খুব ইচ্ছা শীতের দিন এই মাইয়া স্লিভলেস পড়ে কিনা?
এসেই কথাবার্তা ছাড়াই নিবিড়ের বাহু জড়িয়ে ধরে ঢং করে যাচ্ছে।মেহেদী বাঁকা হেঁসে সোফায় হেলান দিয়ে বসে।চমৎকার একটা ড্রামা দেখার আশায়।রাফিন দাঁড়িয়ে রুহানিকে বসতে বলে।
মাইমুনা এসে জানায় রুহানী তাদের শোরুমে গিয়েছিলো কিছু এক্সক্লুসিভ ড্রেস নিতে কিন্তু একটাও পছন্দ হয়নি।পরে ক্যাটালগ দেখে জিয়ানার শাড়িটা পছন্দ করেছে।সেটা লাইভ দেখতে তাই আমার সাথে এসেছে।প্লাস নাকি নিবিড় ভাইয়ার সাথে দরকার আছে।’

একে দেখেই জিয়ানার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে।চিবিয়ে চিবিয়ে নিবিড়ের কাছে গিয়ে রুহানীর দিকে তাকিয়ে বলে ,
‘ওই শাড়ি সাফা ভাবির কাছে।’
তারপর নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার মাথা ঘুরছে।রুমে দিয়ে আসুন, বলে হাত উড়িয়ে দেয়।’
‘তুমি যাও আমি আসছি।একটু দরকার আছে এখানে।’
জিয়ানা দপদপ পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে আর যাওয়ার সময় নিবিড়ের পায়ের আঙুলে পা দিয়ে পিশে দিয়ে যায়।
যেতে যেতে জিয়ানা ভাবে ,এই মিডফিল্ডার মানে ননদ গুলা হচ্ছে এক্সট্রা ঝামেলা।বাড়ি বয়ে ঝামেলা আনতে পারদর্শী।

রাতের ডিনারের পর জিয়ানা তার একাডেমিক পড়াশোনা করছে টানা ঘন্টা তিনেক থেকে।বিকেলের পর থেকে নিবিড়কে দেখেও দেখছে না।নিবিড় বারান্দা গিয়ে কয়েকটা নিকোটিন শেষ করে এসে পাশে বসে জিয়ানার।
নোট করছে ফাইভ জি গতিতে।মেয়েটার হাতের লেখা খুবই গুছানো। কিন্তু নিজে প্রচন্ড এলোমেলো। তখনকার বাহিরের পড়া জামাকাপড় তেপায়ার উপরে ঝুলছে।আন্ডার গার্মেন্টস বাথরুমের বেসিংয়ে রেখেছে।ভেজা টাওয়াল বালিশের উপর।ঘরে ঢুকেই নিবিড়ের মাথায় আগুন জ্বলে উঠলেও ,জিয়ানাকে বিছানায় উল্টা হয়ে পা উপরে মাথা নিচে রেখে পড়তে দেখে ফিক করে হেঁসে দেয়।জিয়ানা ভুলেও তাকায়নি তার দিকে।নিবিড় আগে রুম গুছিয়েছে।তারপর নিজে থেকে কয়েকবার এটা সেটা জিজ্ঞেসও করছে।কিন্তু জিয়ানা হুম না তেই উত্তর দিয়েছে।রাত বাজে এগারোটা চল্লিশ।নিবিড় জিয়ানার হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে বলে,

‘সমস্যা কি?’
‘দেখুন এই কয়দিনে একেবারেই পড়াশোনা হয়নি।এইবার আমি লাড্ডুগুড্ডু হবো নিশ্চিত। পড়তে দিন।বিরক্ত করবেন না।’
নিবিড় জিয়ানাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে হাগ করতে যায়।জিয়ানা কায়দা করে হাতের নিচ থেকে বেড়িয়ে নিবিড়ের চোয়ালে একটা পাঞ্চ করে।নিবিড় ছিটকে পড়ে ফ্লোরে।জিয়ানা বিছানা থেকে জাম্প করে নিবিড়ের কাছে নেমে বলে,’আজ যদি একবিন্দু বিরক্ত করেছেন তবে ভুলে যাবো আপনি আমার জামাই।’
নিবিড় চোয়াল ঘষে মেকি ব্যাথা পাওয়ার ভান করে বলে,
‘তোমার কি জাহান্নামের ভয় নাই? হাজবেন্ডের গায়ে হাত উঠাও?’
‘যে জামাই অন্য বেডির জন্য বউকে উপেক্ষা করে তাকে কেলানো জায়েজ।’

‘ঠিক আছে ক্যারাটে খেলি চলো?যে একটা করে মুভ হারবে সে একটা করে ড্রেস খুলবে। রাজি?’
‘মক্কেল পাইছেন আমাকে?আজ আপনি যদি আমার ধারেকাছেও আসেন আপনার ডিম ফাটিয়ে দিবো।’
নিবিড় উঠে এসে জিয়ানাকে আটকিয়ে ফেলে দুইহাতে।তারপর বাঁকা হেঁসে বলে,’আমি জানতাম আমার পাঁজের হাড় ১৮০ডিগ্রী বাকা কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না এটা একেবারে রাউন্ড। ‘
জিয়ানা নিবিড়কে সহ বিছানায় জাম্প করে। আচম্বিতে পড়ায় নিবিড়ের হাত ঢিলা হয়ে যায় আর জিয়ানা এই সুযোগে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি দিতে থাকে।
মার খেতে খেতে নিবিড় বলে,
‘চিমসানো শরীর নিয়ে আমার সাথে লড়াই করতে আসো? এখন যদি নিচে ফেলে চাপা দেই সাথে সাথেই তো চ্যাপ্টা শুটকি হয়ে যাবা?’

‘আমি অত দূর্বল নই।টেস্ট করে বুঝেন নাই?’
‘ভুলে গেছি দেখি আবার একটু….
দরজায় নক হয় তখনই।নিবিড় এগিয়ে গিয়ে দরজা অল্প খুলে। রাতের স্নেকস আর দুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে একজন গভর্নেন্স। নিবিড় খাবারের ট্রলি ভেতরে আনে।জিয়ানা আড় চোখে দেখে।
নিশ্চিত কুসুম গরম দুধ এনেছে।এই দুধ আজ খাবে না জিয়ানা।আজ তিনদিন থেকে নিবিড় গাল টিপে টিপে তাকে খাওয়াই এই জিনিস।দুধ খেতে জিয়ানার খারাপ লাগে না।তবে আজকে সারাদিন জিয়ানা ভেবেছে নিবিড়ের সাথে ঘুমালে সে ভোররাতের কথা কিছু বলতে পারে না।একাবারে ডিপ স্লিপ হয়।অথচ জিয়াউল জিয়ানাকে শিখিয়েছে মিলিটারি স্লিপ।চোখ আর মস্তিস্ক ঘুমালেও কান কখনো ঘুমাবে না।কিন্তু এই কয়দিন থেকে সে সারা শরীরে ঘুমাচ্ছে। আজ রাতে পরিক্ষা হয়ে যাক।

নিবিড় নিজে একমুঠ মিক্সড বাদাম খেয়ে নিলো।জিয়ানা মনে মনে ব্যাঙ্গায়। হ্যাঁ বেশি করে এইসব শক্তিবর্ধক খাবি আর বউয়ের উপর এর প্রভাব খাটাবি।ব্যাটা খাটাশ।
দুধের গ্লাস জিয়ানার সামনে এনে ইশারা করে খাওয়ার জন্য। জিয়ানা সুবোধ মেয়ের মতো হাতে নিয়ে খাওয়ার ভান করে।নিবিড় ঘুরে যখন আবার বাদাম নিতে যায় জিয়ানা তখন বেডের পাশে বড় ফ্লাওয়ার ভাসে পুরো দুধ ডেলে দেয়।নিবিড় পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়।জিয়ানা সেটা রিজেক্ট করে শুয়ে পরে।

নিবিড় যখন বের হয় রুম থেকে তখন ঘড়ির অলস কাটা ঠিক দুইয়ের ঘরে।মেহেদী ,রাফিন আগে থেকেই তিনতলার হলরুমে অপেক্ষা করছে।হলরুম থেকে মই বেয়ে তিনজন নিচে নেমে আসে।বেজমেন্টের পেছনের এলিভেটরের একটা একটা ছোট ঘর আছে। সেটার জানালা দিনের বেলায় খুলে গেছে নিবিড়।সেটা দিয়ে ঢুকে যায় সেখানে।এলিভেটর ঘর থেকে বের হয়ে সোজা মেকানিক স্টোররুমে গিয়ে দাঁড়ায় তিনজন।বাহির থেকে দেখে মনে হবে তিনজন এফবিআই অফিসার গোপনে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
নিবিড় ঝুকে গিয়ে কাঙ্খিত গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ারটা খোঁজে।সেটা পাওয়ার পর পকেট থেকে হান্টার বের করে অল্প ছিদ্র করে।আর সেটার ভেতর থেকে একটা খাকি কাগজ বের করে আনে।বেজমেন্টের অল্প লাল আলোয় এই সাইডটা অন্ধকার। সেই লাল আলোতে কাগজ মেলে ধরার পর দ্রুতি বের হওয়া দেখে রাফিন আর মেহেদী অতি আশ্চর্য হয়ে যায়।মেহেদী ঝুকে কাগজটা হাতে নিয়ে গলার আওয়াজ একেবারেই নিচে নামিয়ে প্রশ্ন করে ,

‘কোন সিক্রেট খাজানার সন্ধান পেয়েছিস নিবিড়?’
রাফিন মেহেদীর মাথায় টোকা দিয়ে কাগজটা হাতে নেয়।তারপর নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘খুলে বল?’
‘এটা হচ্ছে স্যাটানিজমের বইয়ের কিংবা সেই বইয়ের ভাষায় লেখা একটা চিঠি।এর অর্থ বের করার জন্য আমি অনেক কাঠখড় পুড়েছি।কিন্তু আজ মনে হয় এর দ্বারপ্রান্তে। আমি এই পরিবার ছাড়া এই বিষয়ে অন্য কাউকে বিন্দু মাত্র ভরসা করতে পারছি না।আজ নিশী নামের এক প্রস্টিটিউটের আস্থানায় আসবে যে ছেলেটা সে আমার সবচেয়ে বেশি সাসপিসিয়াস পার্সন।এছাড়া আরও সাতজন আছে।’

নিবিড় বলে কাগজটা ভাজ করে প্যান্টের পেছনে গুজে রাখে।
মেহেদী জিজ্ঞেস করে ,’বুঝি নাই ডিটেইলস বল? এই ছেলেটার সাথে কি সম্পর্ক? ‘
‘দেখ আমি তিনটা স্পটে আজ আট বছর থেকে নজরদারি করে আসছি।পুরাতন নূর ম্যানসন,ইউপি পরিষদের অফিস আর ওপেন ম্যানহোলের উন্মুক্ত শেষ পথ।যেগুলা দিয়ে এই এরিয়ার পানি নদীতে গিয়ে পড়ে।কিন্তু পুরাতন নূর ম্যানসন আর ম্যানহোলে কিচ্ছু মিলেনি।মিলেছে ইউপি পরিষদের অফিসে।সেখানে গত একবছরে সাড়ে তিনলক্ষ্য মানুষের আনাগোনা ছিলো।এরমাঝে অধিকাংশই স্থানীয়। আর সবাই কাজ শেষে ফিরে আসে।কিন্তু কিছু গ্রুপ একসাথে অনেকজন একবারে ঢুকে।আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে চাঁদা নিতে ছেলেদের গ্রুপ গেছে।কিন্তু এই গ্রুপ প্রতিবার ঢুকার সময় ঢুকে যতজন বের হয় এক দুইজন কম। ‘
‘তারমানে ভেতরে থেকে যায়? এই ছেলেটাই কি সেই?’
রাফিন প্রশ্ন করে। নিবিড় মাথা নাড়িয়ে বলে,

‘হ্যাঁ এ তাদের মাঝে একজন।লাষ্ট এই ছেলে সাতদিন পর বের হয়েছে।আবার অন্য একটা গ্রুপের সাথে।ভীড়ে মিশে এমন ভাবে এরা ঢুকে আর বের হয় যেটা বুঝা দুষ্কর ছিলো।আমি নিজেও প্রথমে বুঝিনি।দিনের পরদিন বারবার দেখতে দেখতে চোখে পড়েছে।’
মেহেদী নিবিড়ের কাধে চপেটাঘাত করে বলে,’তুই তো জিনিয়াস আছিস।আচ্ছা এটা বল এতদিন থেকে যে অনুসন্ধান করছিস ,তুই কি নিশ্চিত ফুপ্পি ভেতরে আছে?’
নিবিড় কপাল চুলকে বলে,’হ্যাঁ আছেন।তবে কি অবস্থায় আছেন সেটা জানি না।’
রাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,’ওর বাপ একটা উন্মাদ। নিশ্চয়ই ভালো কিছু হয়নি আম্মুর সাথে?’
রাফিন কথা কাটিয়ে বলে,’নীলুমাসি যদি বেঁচে থাকে তবে সেটা মীরাক্কেল। তবে আমাদের টার্গেট নীল। তবে চল নিবিড় ওই বাষ্টার্ডকে ধরি আগে।আর আমি একটা প্রস্তাব রাখতে চাই তোদের কাছে?’
‘বল’

একসাথেই মেহেদী আর নিবিড় বলে।রাফিন কপাল এক আঙুল দিয়ে চুলকে বলে,
‘বাবার সাথে আমি কথা বললে ব্যাপারটা সোজা হয়ে যায় না?উনাকে কোন খারাপ কাজ করতে দেখেছিস তোরা? উনি কখনো নিজের স্বার্থে কিছু করেছে কি? নাকি অর্থের লোভ আছে?’
মেহেদী রাফিনের কাধে হাত রেখে বলে, ‘রাফিদা উনার এইসব বস্তুগত কোনকিছুর লোভ নাই।তবে আমি নিজ চোক্ষে দেখেছি নীলু ফুপ্পির জন্য উনার পাগলামী।নিজের জীবনের বাজি রেখে আগে ফুপ্পিকে রেসকিউ করেছে।ভেতরে কোন কিন্তু তো অবশ্যই আছে সেটা জানার জন্য হলেও আমাদের আগানো উচিত। ‘
‘হ্যাঁ। আর তাকে বলা মানে এতদিনের সব পরিশ্রম পন্ড হয়ে যাবে।এখানে শুধু নীল কিংবা আম্মুর একার প্রশ্ন না।এখানে আরও বহু মানুষের প্রাণ জড়িত আছে বলে আমি মনে করি।আর বাকি কথা আমি তোদের গাড়িতে বুঝিয়ে দিবো।’
নিবিড় বলার পর রাফিন বলে,’ঠিক আছে তবে।এখন চল যাওয়া যাক।কিন্তু লোকেশন কোথায়?’

‘কলেজ স্ট্রিটের পরিত্যক্ত বাড়িটার পাশে ডুপ্লেক্স ভবনটা।সামনের গলিতে গাড়ি রেডি আছে চল ‘
নূর ম্যানসনের দেয়াল টপকে টান টান হয়ে মিলিটারি ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে তিন সিপাহি। সটান হাটার জন্য দূর থেকে ছায়া গুলা দানবের আকার ধারণ করেছে।নিশুতি রাতের নিশাচর প্রাণীরাও এদের দেখে আড়ালে চলে যাচ্ছে।থেকে থেকে দূরের কোথাও কুকুরের আর্তচিৎকার ভেসে আসছে।
বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট পর গন্তব্যে স্থলে পৌঁছায় নিবিড়রা।কলেজ স্ট্রিটের এই এড়িয়া ভিআইপি আর ঢাকার শিল্পপতিদের বাংলোতে সাজানো আভিজাত্য এলাকা।রাতে বাহিরের অচেনা কেউ এলাও না। তাই গেট গুলা সব মূল সড়কের কাছে তালা ঝুলানো।

গাড়িতে ডিটেইলস বলেছে নিবিড় ।সিক্রেট দরজা আর ভেতরে সম্ভাব্য কি কি থাকতে পারে।আর এখানের ছেলেটার নাম মাইকেল সামি।সম্ভবতঃ ক্রিস্টিয়ান।আর এই মেয়ের কাছে মাসে একবার আসে।সেটাও গভীর রাতে।আবার ভোর হওয়ার আগেই ফিরে যায়।গাড়ি গলি থেকে দূরে পার্ক করে তিনজন হেঁটে আসে স্বস্থানে।নিবিড় গাড়িতে কিছু সরঞ্জাম সহ পাতলা কাধ ব্যাগ দিয়েছে।এতে মেটাল গলানোর স্প্রে ,লক খুলার স্প্রে আর দুইজনকে দুইটা লাইসেন্স ছাড়া Beretta M92 রি*ভালবার দিয়েছে।মেহেদী হাতে নিয়েই সুপার এক্সাইটেড। কিন্তু রাফিন নেয়নি।সে সামাজিক কোন ক্রাইম করতে চায় না।মেহেদীর অতি আগ্রহে পানি ঢেলে নিবিড় জানিয়েছে ,আবার রিটার্ন নিবে।এগুলা পার্টির।’

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৫

নিবিড়রা বাড়িটার প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষন।তারপর প্রথমে নিবিড় আগায় ,পেছনে মেহেদী সবশেষে রাফিন।বাড়ির কাছে গিয়ে রাফিন সাবধান করে ভেতরে ঢুকতে।কারণ লোকটা যদি বের হয় তবে ধরতে সুবিধা।ভেতরে কি আছে জানা নেই তাদের। নিবিড় আর মেহেদী সম্মতি দেয় রাফিনের কথায়।কিন্তু মিনিট পাঁচেক পর ভেতরে একটা মেয়েলি আর্তনাদ ভেসে আসে।তাই নিবিড়রা ঠিক করে ভেতরে ঢুকবে।দুলতলায় উঠে দরজায় লক ছুটানোর স্প্রে করে মেহেদী।লক ছাড়িয়ে ভেতরে এসে তিনজনই অবাক হয়ে যায়।নিবিড় বলে,
‘ইট সীমস উই আর স্টাক ইন আ ট্র‍্যাপ ‘

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৭