Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৭২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭২
আশিকা আক্তার সোহাগী

“পিসমিল সলিউশনের নাম শুনেছিস?চিনের বিপ্লবী মাও সেতুং এর একটা পদ্ধতি। যেকোন বড় কাজের সাফল্য পাওয়ার জন্য পরিকল্পনা মাফিক ছোট ছোট পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়।মানে একটা বিল্ডিং আমরা একবারে বানাতে পারি না।এরজন্য নকশা তৈরি ,সয়েল টেস্ট থেকে শুরু করে পাইলিং ,পিলার বানানো সহ ইট গাথা থেকে নানান ধাপে ধাপে কাজ আগায়।এরাও সেইম ভাবে বহু বছর ধরে একটু একটু করে সব গুছিয়ে রেখেছে”
বলে ছবিটা জুম করে দেখে নিবিড়।রাফিন আর মেহেদী কিছুই বুঝেনি যে ,সেটা তাদের তাকানো দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
আলোর বিচ্ছুরণের প্রতিফলনে সৃষ্ট চিত্রটি একটা সংকেতবহ চিঠি। যেটাতে মনে হচ্ছে আলকেমি সংকেত ব্যবহার করা হয়েছে।মাঝখানে বড় করে একটা এস চিহ্ন আকা আর তার চারপাশে হিবিজিবি বর্ণ।সব কালো বর্ণের হলেও কয়েকটা বর্ণ ভিন্ন ভিন্ন কালার। দূর থেকে দেখে মনে হবে ক্যালিগ্রাফি।
মেহেদী নিবিড়ের হাত থেকে ফটোটা নিয়ে বলে ,

‘এখানে মাল্টি কালারের বর্ণ গুলার আলাদা অর্থ আছে। দেখ সব গুলা বোল্ড বর্ণ।’
রাফিন হাতে নিয়ে বলে,’আমার কাছে তো রাসায়নিক মৌল আর যৌগের নাম মনে হচ্ছে।এগুলা সব এক করে দেখা যাক কি অর্থ হয়?’
‘অর্থ হবে,এদের ফাইনাল প্রোগ্রামের ডেট।’
নিবিড় বলে ছবিটা নিজের ফোনে সেন্ট করে।মেহেদী আর রাফিন একসাথে মৃদু চিৎকার করে বলে,
‘হোয়াট?তুই কিভাবে জানিস?’
‘সামি আসলে এর মানে জানে না।তবে বারবার টর্চারের সময় বলতো “একটা ডেট উল্লেখ্য করে সবাইকে ইনভাইট করা হয়েছে।সবাই এক জায়গায় মিলিত হবে।আর সেদিনই এই দেশে তাদের শেষ কার্যক্রম সংগঠিত হবে।’

‘এখানে আলকেমি সংকেত ব্যাবহার করা হয়েছে।রাসায়ন ,পদার্থবিদ্যা আর গণিতশাস্ত্র নিয়ে জগাখিচুড়ি একটা ব্যাপার আছে।ডেট বের করতে গেলে ফাটবে ভাই।’
মেহেদী বলে স্ট্যান্ড ভাজ করে গুটিয়ে নেয়।
‘আমার কাছে মনে হচ্ছে এগুলা রাসায়নিক যৌগ আর মৌলের নাম দিয়ে লেখা কথা।আমাদের ক্যাম্পাসের রসায়ন ল্যাবে সব যৌগ আর মৌলের চার্ট আছে।সেটা পেলে সুবিধা হতো?’
বলে রাফিন নিজের ফোনে ফটোটা নেয়।মেহেদী একটা ট্রলি ব্যাগে সব ভরে বলে,
‘আমার কাছেই আছে। ল্যাব লাগবে না।সকালেই জেনে যাবি সব।সত্যি যদি ডেট থাকে তবে।’
‘এখানে ডেট বা কি আছে তোরা বের কর।আমি যাচ্ছি।আমার বাঘিনী উঠে পড়তে পারে যেকোন সময়।’
বলে নিবিড় বের হয়ে যায় সেই বদ্ধরুম থেকে।
রাফিন বলে ,’চল। এটার অর্থ না জানা পর্যন্ত আমার শান্তি লাগবে না।’

রাত দুইটা পর্যন্ত আকাশ মিমকে দিয়ে নিজের ঘর পরিস্কার করিয়েছে।মাথার বউ ওড়না খুলে ,বেনারসি কোমরে গুজে একমনে কাজ করছে মিম।মাঝেমধ্যে লম্বা বেনিটা বিরক্ত করছে কাজে।
আকাশ ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে।মেয়েটা যে তাকে ভয় পায় সেটা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছে।একটু জোরে কথা বললেই কেপে উঠে।
মিসেস রত্না টায়ার্ড থাকায় শুধুমাত্র রুমে দিয়েই উনি নিজ রুমে চলে গেছেন।
সব শেষে মিম বেডসিট বদলাচ্ছে।হাটুগেরে বসে অপরপাশের চাদরটা মেলার সময় মিমের মেদহীন কোমড় বের হয়ে এলো।আকাশ কিছুক্ষন টুকুটুকু দেখে গলা খাকি দিয়ে বলে,
‘ডিম!এদিকে আসো’

মিম মাথা নিচু করে সামনে এসে দাঁড়ায়।লম্বায় মেয়েটা আকাশের বুক পর্যন্ত। একে তো কোলে নিয়ে গাছে ঢিল ছুড়ে আম পাড়া যাবে।মনে মনে এই কথা ভাবলেও মুখে বলে,
‘কাজ করার সময় অবশ্যই নিজের শরীরের জামা কাপড়ের দিকে নজর রাখবা।মনে থাকবে?’
মিম মাথা নিচু করেই ঘাড় কাত হ্যাঁ বুঝায়।আকাশ বসের মতো করে বলে,
‘গুড। এবার আমাকে সালাম করো।বাসর রাতে ঘরে ঢুকেই স্বামীকে সালাম করতে হয়। এতক্ষণ হয়ে গেলে অথচ একবারও সালাম করলা না?এতক্ষণে অন্তত দশবার সালাম করা উচিত ছিলো।’
মিম নিচু হয়েই অবাক হয়। এসেছে থেকে একমিনিট দাঁড়াতে পারেনি। এটা সেটা অর্ডার করেই যাচ্ছে।আর এখন বলছে সে কেনো সালাম করেনি।কেমন ফেতনাবাজ মানুষ দেখো।এইজন্য জিয়ানাকে বলেছিলো বিয়ে করবে না।তার বলদমার্কা কপালের দুর্দশা কাটার নয়।বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে।ক্লান্তিতে শরীর ঝিমিয়েও এসেছে।নিশ্চিত বলবে ফ্লোরে ঘুমাতে।

আকাশ ধমকে উঠে ,’কি হলো?’
‘পায়ে ঝুকে সালাম করার জায়েজ নাই।’
ভয় নিয়েই আস্তে করে বলে মিম।
‘স্বামী যেটা বলে সেটা করাই উচিত।স্বামীর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। ইয়ে না মানে স্ত্রীর বেহেস্ত।ঠিক আছে জায়েজ নাই যেহেতু সেহেতু লাগবে না সেটা।’
মিম মাথা তোলে তাকায় আকাশের দিকে।জিরাফের মতো লম্বা মানুষটার ধর্মীও কোন এলেম নাই।কি সব ভুলভাল হাদিস বলে যাচ্ছে।একমাত্র মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেস্ত।এটাও জানে না এই গুন্ডা?
আকাশ মিমের চোখের দিকে তাকায়।এই প্রথম মেয়েটা তার চোখের দিকে তাকিয়েছে।আসার সময় কেঁদে কেটে সাজ সব ভষ্কিয়ে ফেলেছে।এখন তাকে কাঞ্চানার মতো লাগছে।কিন্তু কিউট কাঞ্চানা।নির্ঘাত নিজেকে আয়নায় দেখলে হার্ট ফেইল করবে এই মেয়ে।

আকাশ আবার সিরিয়াস হওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
‘অনেক অবাধ্য তুমি। প্রথম দিন তাই কিছু বললাম না। এবার আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকো পাঁচ মিনিট।কুইক।’
মিম বড় বড় করে তাকায়।আকাশ ধমকে উঠে আবার।এবার মিমের চোখ জলে ভরে উঠে।ঠোঁট ভেঙে আসে।টপটপ করে চোখের পানি পড়া দেখে হকচকিয়ে যায় আকাশ।পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে যত্ন করে চোখের পানি মুছে বলে,
‘কাম সারছে রে থাক থাক। সালাম লাগবে না। জড়িয়ে ধরাও লাগবে না।’

তারপর নজর যায় অল্প বেঁচে থাকা লিপষ্টিক দেয়া লাল ঠোঁটের দিকে।নজর টেনে সেখান থেকে সরিয়ে, টুপ করে গালে একটা চুমু দিয়ে ফট করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।মিমের কান্না বন্ধ হয়ে গিয়ে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।প্রথম চুম্বনে তার গালে মনে হচ্ছে ঝিমঝিম লেগে গেছে।
ওয়াশরুমে ঢুকে আকাশ হাওয়াই পাঞ্চিং খেলে।তার ভেতরের আত্মা ছটফট করছে।অনুভূতির ধামাদা বাজছে।এমন টালমাটাল অবস্থায় কতক্ষণ কেটে গেলো সেখানে তার হিসেব নেই।বের যখন হলো ততক্ষণে মিম বিছানায় হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে ঘুমিয়ে কাদা।
ঝুকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মিমের দিকে।শাড়ি দিয়ে সারা শরীর মুড়িয়ে বসে আছে।তার মতো ছন্নছাড়া মানুষ বেশ বাধ্যগত বউ পেয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ পড়ে মনে মনে।
বেডসাইট টেবিল থেকে রিমোট নিয়ে রুম টেম্পারেচার ষোল তে সেট করে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে।চোখ বন্ধ করে কাউন্ড করতে থাকে এক দুই তিন….

পনেরো পর্যন্ত যাওয়ার পর মিম হুড়মুড় করে উঠে ,গুটিশুটি মে*রে বিছানা শুয়ে পড়ে। আকাশের হাত আস্তে করে মিমের দিকে আগাতে থাকে।অল্প ছুয়া লাগার সাথে সাথেই আকাশ মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বসে বলে,
‘ছি ছি ছি তোমাকে বেশ সহজ সরল ভেবেছিলাম?’
ঘুম ভেঙে আতংকিত হয়ে বসে পড়ে মিম।আকাশ আবার বলে,
‘এত তাড়াতাড়ি কাছে আসতে চাচ্ছো?আজকালকার মেয়েদের লাজ হায়া বলে কিছু নেই নাকি?’
মিমের নাক ফুলে উঠে।আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় তারা কখনো কোন আত্মীয়ের বাসায় সমাদৃত হয়নি।না কারো নরম নজর তাদের উপর পড়েছে।তবে অবহেলা পেলেও অপমানিত হয়নি কখনো।এখানে আসছে থেকে আকাশ তাকে নেগলেট করে যাচ্ছে।
‘দুঃখিত’ বলে দরজার দিকে চলে যায়। বসার রুমে বসে থেকে রাত কাটিয়ে সকালে বাড়ি ফিরে যাবে।এটা মনে মনে ঠিক করে। কিন্তু লকে হাত রাখার সাথে সাথে সে হাওয়াই ভাসতে ভাসতে বিছানায় পড়ে।আকাশ চ্যাংদোলা করে উঠিয়ে এনেছে।

মিমের হেচকি দেয়া কান্না দেখে আকাশ বোকা হেঁসে বলে,
‘আরেহ আরেহ সরি সরি।আরেহ মজা করেছি।আচ্ছা শোনো একটা জোকস বলি,
“স্বামী বউকে জিজ্ঞেস করলো,’বলতো স্বর্গে বিয়ে হয় না কেন?’
বউ:কেন?
স্বামী:বিয়ে হলে তো সেটা আর স্বর্গ থাকবে না। ”
বলে ঘর কাপিয়ে নিজেই হেঁসে লুটোপুটি খায়।মিম ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে।এটা কোন পঁচিশ বছরের ছেলে কে বলবে? এখন মনে হচ্ছে সদ্য কিশোর।
আকাশ মিমের তাকিয়ে থাকা দেখে হাঁসি বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে বলে,
‘পঁচিশ বছর দেরি করার জন্য আর একমিনিটের জন্যও ডিস্কাউন্ট নেই।ফাইনাল কাজকর্ম শুরুর আগে একখান কথা জিগায় ভালোই ভালোই উত্তর দিবা?
মিম ডানপাশে মাথা কাত করে। আকাশ বলে ,

‘আসছো থেকে একটা কথাও বললা না? আমি একাই ভ্যাজরভ্যাজর করতাছি।লোকে বলে বউ নাকি তোতাপাখির মতো কথা বলে।আচ্ছা থাকুক লোকের কথা।আসল কথা বলি,
আমি বেকার না।ফ্রিল্যান্সিং করি।তোমার দেনমোহর কাল পাবা।এখন যদি স্বামী হিসেবে কিছু চাই দিবা?’
মিম মুখ খুলে বলে,
‘জ্বি অবশ্যই।’
‘গুড।এবার যৌতুক হিসেবে এককোটি টাকা দাও?’
মিম হকচকিয়ে যায়।সে ভাবলো কি আর হলো কি।বড় বড় করে তাকানো দেখে আকাশ বলে,
‘কি হলো? দাও?’
‘এককোটি টাকা আমার চোদ্দগুষ্টির কারো নেই।’
‘আমার সাথে মিথায়?’
‘বিশ্বাস করুন?আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত। আর আত্মীয় স্বজনদেরও অধিকাংশই অসচ্ছল। ‘
‘কিন্তু আমি তো জানি তোমার কাছেই শতকোটি টাকার জিনিস আছে?’
একব্রু উচুতে উঠিয়ে আকাশ হেয়ালি করে বলে।মিম ঘনঘন ব্লিং করে চোখের পাতা।কোন পাগলের পাল্লায় পড়লো।না নিজে ঘুমাচ্ছে আর তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে?

‘দিবা তো?’
‘আপনি পেলে নেন। একশো কোটিই দিলাম।’
‘আরেহ বাস।চাইলাম এক কোটি পাইলাম শতকোটি?ওকে তবে তোমাকে পুরোটাই চাইলাম।আমার হয়ে যাও আরিফা?সারা জীবনের জন্য?হবে?’
‘জ্বি।’
‘আমার যোগ্য বউ হবে?’
‘জ্বি।’
‘আমার বাবা মায়ের ছেলের বউয়ের চেয়ে মেয়ে হয়ে উঠবে?’
‘জ্বি অবশ্যই।’
‘আমার ঘরের রানী হবে?’
‘চেষ্টা করবো।’
‘আমাকে ভালোবাসবে?’
‘জ্বি।’
‘আমার একঘর ছেলে মেয়ের মা হবে?’
‘জ্বি…
বলে ফিক করে হেঁসে দেয় মিম।আকাশও হেঁসে বলে,
‘মাশা-আল্লাহ বেনিওয়ালির হাঁসি তো বেনির চেয়ে সুন্দর। তবে আর দেরি কিসের? হো যায়ে মোলাকাত? ‘
এরপর আকাশ আর পাতাল সব মিলে মিশে একাকার।বউ বউ করে মাথা খেয়ে ফেলা ছেলেটাও বউ পেলো।এবার বউ তার পাগলামি সামলাক।আমরা কেটে পড়ি।

মানুষ তখনই দূর্বল হয়ে পড়ে যখন সে কারো গভীর প্রেমে পড়ে।জিয়ানার এই কথাটার মর্ম আজ বুঝতে পারলো।নিবিড়ের প্রেমে সে নিবিড় ভাবেই পড়েছে।আর নিবিড় নিজেও।তাই তো সকল বিপদ সকুল্য থেকে আগলিয়ে আগলিয়ে রাখে জিয়ানাকে।এক মিনিটের জন্যও ঘরের বাহিরে কাছ ছাড়া করে না।নিজের ঘাড়ে বয়ে বেড়ায় সব।জিয়ানার কাছে এখন এই প্রেম পায়ের বেড়ির মত লাগছে।এই প্রেমে পড়ে তার মাঝে বাতুলতার প্রলেপ।সে কখনোই এত বেখেয়ালি ছিলো না।
আবছা অন্ধকার ড্রয়িংরুম থেকে পা বাড়ালো বেডরুমের দিকে।রুমে এসে মটকা মেরে শুয়ে থাকে।ঘুম মনে হয় আর হবে না।নিবিড়ের পায়ের শব্দে চোখ বন্ধ করে জিয়ানা।
নিবিড় ঝটপট ট্রি-শার্ট খুলে বিছানায় শুয়ে জিয়ানাকে বুকে টেনে নেয়।এই ব্যাটার অভ্যাস এত বাজে।বউকে অফিসিয়ালি কোলবালিশ বানিয়ে ছেড়েছে।দাঁতে দাঁত চেপে অনড় জিয়ানা মনে মনে গালাগালি করে।জিয়ানার কানের কাছে গিয়ে নিবিড় বলে,

‘আগেই বলেছি এক্টিংয়ে তুমি শূন্য।যেহেতু ঘুমাওনি চলো একটু আদর সোহাগ করি।
‘সুখ আপনার এই চটকা চটকির অভ্যাস বদলাবেন।আমি মানুষ না বালিশ?’
‘দুইটাই।’
‘ইনিয়ে বিনিয়ে আপনি প্রতিদিন আমাকে চটকান তারপর রোলার গাড়ি হয়ে যান।দেখুন সহ্যের একটা সীমা আছে?’
নিবিড় জিয়ানার কথার ধাচে না গিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘তো কি দেখলে?’
‘কি আর দেখবো পেছন পেছন গিয়ে দেখি আপনি হাওয়া। কিছুক্ষন এদিক সেদিন খুঁজে না পেয়ে আবার এসে মটমা মেরে শুয়ে আছি তাই।’
‘ওহো মিস হয়ে গেলো?’

‘আমি ইদানীং স্লো হয়ে গেছি।এটা বলুন প্রতিবার আপনি কিভাবে বুঝেন আমি জেগে আছি?’
‘ঘুমের সময় তোমার হাত পায়ের আঙুল ছড়ানো থাকে। আর ঘুমের ভানের সময় সব কুচকে থাকে।’
বলে হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠে নিবিড়।জিয়ানা নিবিড়ের লম্বা চুল দুইহাতে টেনে ধরে বলে,
‘এত চালাক হতে কে বলেছে?’
নিবিড়ের দুষ্টু হাত দুষ্টুমি শুরু করলে জিয়ানা চট করে চুল ছেড়ে দেয়।আর নিবিড় বলে,
‘তোমাকে এত নরম হতে কে বলেছে?আমার হাতের কি দোষ? ‘
‘ছাড়ুন ঘুম পাচ্ছে। ‘
‘আমি কি তোমার চোখ ধরেছি?তুমি ঘুমাও।’
‘সুখ?’
‘সরি কান্ট হেল্প।’
আরও কিছুক্ষণ তাদের খুনসুটি ময় ভালোবাসা চলে।
এরপর রাত মরে সকালে জন্ম হয়।অপরদিকে নিবিড়ের নিবিড়তা হালকা হয়।গাল ফুলিয়ে রাখা জিয়ানাকে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে ফজরের নামাজ পড়ে ,আগের দিনের মতো বরইপাতার পানি খাইয়ে রুকাইয়া করে।তারপর দুইজনই মিলে হাটতে বের হয় নূর ম্যানসনের বাহিরে।

নিদ্রাহীন রাত পাড় করে মেহেদী আর রাফিন ফ্লোরেই ঝিমাচ্ছে। নিবিড় এসে দেখে শত শত কাটাছেড়ার পাতা ,স্কেল ,ক্যাম্পাস সহ নানা জিনিসপত্র সারাঘর ময়।বিনে উপচে পড়ছে দলামলা করা অসংখ্য কাগজের বল।মেহেদীর কানের পেছনে কাঠমিস্ত্রীর মতো একটা পেন্সিল গুজে রাখা।বিছানায় কিছু কাটাছেঁড়া ছাড়া কাগজ।যেগুলায় রাফিন আর মেহেদীর লেখায় ভরে আছে।
একটা কাগজ হাতে নিয়ে নিবিড় পড়ার চেষ্টা করে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার সাথে ইংলিশ অনেক গুলা বর্ণ লেখা।আগামাথা কিছুই না বুঝে অন্য কাগজ হাতে নেয়।এখানেও একই রকম ভিন্ন সূত্র লেখা।এরপর নিচের একটা পাতায় চোখ আটকায়।
প্রথম সারিতে স্টার ,সান আর মুনের গ্রাফ আঁকা। দ্বিতীয় সারিতে অর্ধ মুনের সাথে প্লাস অর্ধ সান ইকোয়ালটু ড্রার্ক মুন।

তৃতীয় সারিতে সান মাঝখানে মুন আর পৃথিবী আঁকানো। মুন আর পৃথিবীর মাঝ বরাবর আম্ব্রা আর পেনাম্ব্রা লিখে ড্রার্ক কিছু বুঝানো হয়েছে।আম্ব্রাতে আবার একটা লাল ক্রস দিয়ে কাটা দেয়া।
নিবিড় এই গ্রাফটা সাইডে রেখে বাকি গুলাও দেখে। ডিকোর্ড দিয়ে লিখা কিছু।সিবলিক সংকেত দিয়েও আছে কিছু।
নিবিড় ধ্বংস কামনা করে স্যাটানিজমের লোকদের গালাগালি করে ভাবে এইভাবে এনক্রিপশন করা কোন সাধারণ মানুষের কাজ নয়।যারাই একমাত্র ডিক্রিপশন করতে পারবে তারাই এগুলা তৈরি করে।তারমানে কয়েক বছরের না শতশত বছরের সাধনার ফল এসব।গোপনে অনেক দূর পর্যন্ত শেকড় পৌঁছে গেছে এদের।
নিবিড় তিনটা তিন ক্যাটাগরির পাতা হাতে নিয়ে পা দিয়ে রাফিন আর মেহেদীর পায়ে লাত্থি দেয়।রাফিন ‘হুহ ‘ বলে একচোখে তাকায়।মেহেদী ‘আব্বেহ শা*লা **মারানি ‘বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
এমন বিশ্রী গালি শুনে রাফিন আর নিবিড় দুইজনে একসাথে কিক করে মেহেদীর দুই পায়ে।এবার ঘুম কাক হয়ে উড়ে যায়।মেহেদী সটান দাঁড়িয়ে বলে,

‘ঘুমের রিহার্সাল করছিলাম।এভাবে কাজ করে আমার অভ্যাস আছে।বল তারপর কি চলে?’
রাফিন আড়মোড়া ভেঙে বলে,
‘চোখে মুখে পানি দিয়ে এবার ফ্রেশ হওয়ার রিহার্সালটাও করে ফেল।ঝটপট আয় কথা আছে।’
মেহেদী ফ্রেশ হয়ে আসতে আসতে নিবিড় তিনকাপ কফি নিয়ে হাজির হয় নিচ থেকে। ভোর সকাল তাই কেউই উঠেনি ঘুম থেকে।
মেহেদী কফি কাপে চুমুক দিয়ে বলে,’আহা এতটা শান্তি প্রথম চুমুতেও ছিলো না।’
‘তোর বয়স বাড়ে না মেহেদী? এখনো আগের মতো ফাতরামি করিস কিভাবে?’
‘কাজের কথা বল?প্রচুর খেটেছিস দেখেই বুঝা যাচ্ছে।’
বলে নিবিড় কফির কাপ ফিজানের পড়ার টেবিলে রাখে।
‘হ্যাঁ। একটা গুড নিউজ আছে আর একটা ব্যাড নিউজ আছে।অবশ্য দুইটাই ব্যাড।কোনটা আগে শুনবি?’
মেহেদী নিবিড়কে জিজ্ঞেস করলো।

‘তোর যেটা বলতে সুবিধা সেটাই বল।’
‘ঘটনা এখানে সংক্ষেপে বলা আছে।পুরোটাই বাইজেন্টাইন সম্রাজের ভাষায় লেখা।
“নীলুফা ফুপুকে এরা উনিশ বছর থেকে নিজেদের কাছে রেখেছে।তারা নাম উল্লেখ্য করেছে প্রিন্সেস নী দিয়ে।আমরা নিশ্চিত না এটাই ফুপ্পি কিনা।এই যে দেখ ডানপাশের এই কোটেশন বরাবর দেখে মনে হচ্ছে ইংলিশে লেখা কিন্তু এটা তিনহাজার বছরের অধিক পুরাতন ভাষায় লেখা।আমরা এই ভাষা খুঁজতে গিয়ে ছোটখাটো একটা ভাষার ডিপ্লোমা করে ফেলেছি।
পরের কাহিনি ভয়াবহ। “উনিশ বছর ধরে প্রিন্সেসকে বিশেষ ভাবে ট্রিট করার জন্য উনিশ বালিকা বলি হয়েছে।কিন্তু প্রিন্সেস খুশি হয়নি।তাই তিনি এখনো ঘুমন্ত।কঠিন স্যাক্রিফাইস ছাড়া লুসিফার জাগ্রত হচ্ছে না।এখন প্রিন্সেসের নিজের সোলমেট হবে বিশতম বলি। এটা সম্পুর্ন লুসিফারের উদ্দেশ্য। সমগ্র শক্তি একথাকা দরকার এই দিনে।স্যো ইউ মাষ্ট কাম।”
কি বুঝলি?’

‘এটাই ফ-আম্মু। আর নীলকে এইজন্যই অফিস থেকে সরিয়েছে।এইজন্যই নীলকে অপহরণ করা হয়েছে।নীল উনার নিজের সন্তান।সোলমেটই তো।’
উত্তেজিত হয়ে নিবিড় বলে উঠে।রাফিন নিবিড়ের কাধে হাত রেখে বলে,
‘কাম ডাউন।আমরা দুইজনকেই উদ্ধার করতে পারবো।’
মেহেদী বলে ,’এবার ঝামেলার ব্যাপার হচ্ছে।আমরা আসলে ফাইনাল ডেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে যেতে পারিনি।কোনটা যে আসল মিনিং বুঝতে পারছি না।এখানে একসাথে অনেক গুলা সাংকেতিক শব্দের একটা ক্যালিগ্রাফি করা আছে।তবে তোর কথায় ঠিক একটা নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে এই ক্যালিগ্রাফিটা। আর নির্দিষ্ট দিনিটা কোনটা হতে পারে সেটা আমরা ফিফটি পার্সেন্ট নিশ্চিত হয়েছি।

যেদিন শয়তানের উপাসনা করা হয়েছিলো ,এখানে স্পষ্ট সেটা উল্লেখ করা আছে।দেখ বড় ‘এস ‘এর গায়ে বাইনারি নাম্বার দেয়া আছে।অতি সুক্ষ্ম সেটা। যেটা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া পড়া অসম্ভব। তবে এই পাতায় দেখ গতবার ওরা যে আনব্যাপ্টিসম করেছিলো সেটার একটা সংকেত ব্যবহার করা হয়েছে।এই যে এস এর নিচে এ্যালিনিকা ভাষায় লেখা।মনে হয় উল্টা ইংলিশ আলফাবেট।এটা সবার আগে আমার চোখে পড়েছে।’
একনাগাড়ে বলে থামে মেহেদী।নিবিড় সব মনোযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছে।এবার রাফিন বলে,
‘আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা বেকার খেটেছি রাসায়ন আর পদার্থ নিয়ে পড়ে থেকে।সম্পুর্ন চিন্তা ঘুরানোর জন্য অহেতুক কিছু শব্দ এরা যুক্ত করেছে। যেনো কেউ বিপরীত দিকে চলে যায়।প্রচন্ড গবেষণা করে এই জিনিস তৈরি করা হয়েছে।এদের এত এত সিকিউরিটির কারণ টা নিশ্চয়ই মামুলি কিছু না? ‘

নিবিড় বলে,’তোদের কাছে গ্রহন যোগ্যতার দিক দিয়ে তবে কোনটা বেশি এগিয়ে?’
রাফিন বলে ,’ আনব্যাপ্টিসমের নেক্সট ডেট হচ্ছে সম্ভবত ডেট।’
মেহেদী বলে,’না। উপাসনার জন্য ওদের নির্দিষ্ট কোন দিন নেই ।অন্য কোন সংযোগ আছে।আর আমার মনে হচ্ছে সেটা কোন গ্রহনের দিন।’
নিবিড় তুড়ি বাজিয়ে বলে,’পয়েন্ট।এস এর পুরাটা শুধু বাইনারি দিয়ে লেখা না। এই যে গ্রাফটা করেছিস সূর্য,চাঁদ আর পৃথিবী নিয়ে এগুলাও আছে। একটা কথা বল,এই সান মুনের গ্রাফটা মাথায় এলো কেন?’
‘এস এর শেপের কারণে। এসটা নরমাল এস না।উপরের মাথাটা অর্ধচন্দ্র হলেও নিচের মাথা পূর্ণচন্দ্র মতো এটা সূর্য।আর মাঝখানে পৃথিবী বুঝাতে ম্যাপ আঁকা আছে।জল আর স্থলের একটা সুক্ষ্ম রেখা আঁকা। তাই কিছুটা কৌতুহল হিসেবে পূর্ণচন্দ্র গ্রহের গ্রাফটা এঁকেছি।’

বলে মেহেদী।মেহেদী আর নিবিড়ের কথা অনুযায়ী রাফিন ঝটপট নেটে সার্চ দিয়ে বলে উঠে ,’পরশু রাত শোয়া একটা থেকে পূর্ণচন্দ্র গ্রহন শুরু ।প্রায় আধাঘন্টা থাকবে চন্দ্রগ্রহণ কিন্তু পূর্ণচন্দ্র গ্রহন থাকবে তিনমিনিট।’
নিবিড় দাঁড়িয়ে যায়।পরশু তার নির্বাচনও।তারমানে নীল আর নীলুফার সাথে সেদিনই কিছু ঘটতে চলেছে।
‘দেখেছিস বিপদ কিভাবে একসাথে আসে?আমার নির্বাচনের দিনটাতেই চন্দ্রগ্রহণ। আর এটাই হচ্ছে সকল কালোজাদুঘরদের জন্য সেরা দিন।হাতে আর মাত্র দুইদিন সময় আছে।লেজার লক ভাঙ্গার কোন টেকনোলজি আমার জানা নেই।কিভাবে ঢুকি সেখানে? ‘
নিবিড় বলে নিজের লম্বা চুল টেনে হাটু গেরে বসে পড়ে ফ্লোরে।এই প্রথম রাফিন দেখলো কোন কিছু নিয়ে নিবিড়কে সরাসরি বিচলিত হতে।মেহেদী নিবিড়ের কাধে হাত রেখে বলে,

‘লেজার সিস্টেম বানচালের জন্য একটা স্প্রে আছে। যেটা ছিটিয়ে দিলে মিনিট খানেক লেজারের জাল ছিড়ে যায়।কিন্তু দ্রুতই সেটা আবার আগের অবস্থায় ফিরতও যায়।বিডিতে পাওয়া যাবে কিনা আই ডোন্ট নো?’
রাফিন বলে,’সিক্রেট এজেন্ট টাইপ এজেন্সিদের কাছে এইসব থাকে।নরমালি অন্য কোথাও পাবি না।ওয়েট আমার একজন ক্লোজ ফ্রেন্ড আছে ডিবিতে।ওকে রিকোয়েস্ট করে দেখবো নাকি?’
‘আমারও আছে একজন এফবিআই তে জব করে। তবে তাকেও আমি রিকোয়েস্ট করে দেখি?’
বলে উঠে নিবিড়।
রাফিন বলে,’বিষাক্ত সাপের কথা বলেছিলি যে সেটার কি হবে?’
‘ক্যাম্পাসের ল্যাব থেকে কার্বলিক এসিড আজই কালেক্টড করবো।’
‘কার্বলিক এসিড সাপ তাড়ায় না।এটা ঝাঝালো গন্ধের হওয়াই সাপ বাতাসে নিশ্বাস নেয়ার সময় বুঝতে পারে এই পরিবেশ তাদের অনুকূলে নেই তাই নিজেকে গুটিয়ে নেই।’বলে মেহেদী বিছনায় এলোমেলো কাগজের উপর শুয়ে পড়ে।
রাফিন জিজ্ঞেস করে ,’তবে?’

‘গল্প উপন্যাসে পড়ে মানুষ ভাবে কার্বলিক এসিড সাপ তাড়ায়। আসলে এটা যেকোন প্রানীর গায়ে জ্বলুনি সৃষ্টি করে। সাপের গায়েও তাই হয়।এক্ষেত্রে সে নিক্ষেপ করবে তার নিজেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।এটা একটা এসিড।এরচেয়ে ন্যাপথলিন বেশ কাজের।রসুন,পেয়াজের গন্ধও সাপের জন্য ইরিটেটিং। ‘
‘এখন কি রসুন পেয়াজ নিয়ে যাবো নাকি?’
রাফিন কপাল ভাঁজ করে প্রশ্ন করে। মেহেদী বলে,
‘কার্বলিক এসিড নিলে নিজেরাই পুড়ে মরবি আগে।’
‘স্প্রে বোতলে করে যদি নেই?’
নিবিড় প্রশ্ন করে। মেহেদী উঠে বসে বলে,
‘মেটালের স্প্রে বোতল কই পাবি?’
‘আছে। শুধু হেন্ডেল ম্যানেজ করতে হবে।আচ্ছা কাপড়ে যদি কড়া করে কার্বলিক এসিড মেখে নিয়ে যায় তবে? যেমন রুপক মন্ডল করে?’

‘উনার মতো গায়ে চাদর দিয়ে যাবি তবে?’
রাফিন প্রশ্ন করে।
‘এক্সট্রা শার্ট ,প্যান্ট পড়া যায়।তবে শরীরে লাগলে ক্ষত হবে।এরপর লেজারে সেটার কি রিয়েক্টশন হবে হো নোজ?’
বলে মেহেদী সব কাগজ গুছানো শুরু করলো। নিবিড় বলে ‘আচ্ছা ন্যাপথলিন আর এন্টিভেনম ইনজেকশন নেয়াটাই বেটার হবে।রাইট?’
‘দ্যাটস স্পেলন্ডিড।এটাই বেটার অপশন।’
বলে তুড়ি বাজায় মেহেদী।
‘এন্ট্রি নিবি কোনদিক দিয়ে?আর এক্সজিসই বা কোন দিক দিয়ে হবে?ওইখানে কতজন থাকবে সেটা না জেনে আমরা মাত্র তিনজন কিভাবে যাবো?’
‘তিনজন যাবো কেন?একটা টিম আছে আমার কাছে।আমরা যাবো পরে।আগে বারোজনের টিম পাঠাবো।’
‘হো আর দে?’
মেহেদী নিবিড়ের সামনে এসে জিজ্ঞেস করে।
‘যারা টাকার জন্য সব করতে পারে।’
রাফিন বলে,’জিয়ানাকে বলবি না?’
‘মাথা খারাপ?ওর জন্য হাইলি রিস্কি ওই জায়গা।ওইখানের কেউ জানেই না নীলুফা ইয়াসমিনের আরও সন্তান আছে।

মেহেদী আর রাফিন মাথা নাড়ায়।
বেডরুমে বসে জিয়ানা সম্পুর্ন কথা শুনলো।শীতল সকালেও সে ঘেমে গেছে।
জিয়ানা তার ফোন দিয়ে নিবিড়ের ফোনে কল দিয়ে কানেক্টেড করে রেখে দিয়েছিলো টেবিলের উপর।জিয়ানা যখন বই নিয়ে বসছে নিবিড় ফোন হাতে নেয়।জিয়ানা জানে ফোন অন করলেই ধরা খাবে তাই এগিয়ে এসে নিবিড়কে টাইট হাগ দিয়ে মনোযোগ অন্যদিকে ডায়ভার্ট করে।এই সময় নিবিড় ফোন আর অন না করেই পকেটে ভরে ফেলে।জিয়ানা জড়িয়ে ধরেই বলে,’শুকরিয়া আপনাকে।দুইদিনেই শরীর বেশ আরাম লাগছে।আলহামদুলিল্লাহ। ‘
নিবিড় জিয়ানার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,’আমি একটু আসছি।তুমি পড়ো।’
এরপর নিবিড় সরাসরি মেহেদীর রুমে যায়।আর তাদের যাবতীয় কথা জিয়ানা শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। দুইদিন সময় মাত্র?জিয়ানার পাগল পাগল লাগে।আবার মনে মনে উৎফুল্ল বোধ করে তার মাকে দেখতে পাবে ,ছুতে পারবে।তার ভাই আছে।পরক্ষণেই মনে ভয় জেগে উঠে।নিবিড়রা যেভাবে বর্ণনা করলো স্বাভাবিক কেউ ঢুকতে পারবে না।ঢুকলেও বেশি দূর যাওয়ার আগেই খতম হয়ে যাবে।তার যদি যেতেই হয় তবে নিবিড়দের পেছন পেছনই যেতে হবে।মনে মনে প্ল্যান করে কিভাবে নিবিড়কে ফাকি দিয়ে তাকেই ফলো করা যাবে।

জেনি নূর ম্যানসনে এসে চিল্লিয়ে জিয়ানার রুমে ঢুকে।জিয়ানাকে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখে নিজের পায়ের গতি কমিয়ে এসে সামনে বসে। জেনিকে দেখে জিয়ানা নিজেকে স্বাভাবিক করে একটা চমৎকার হাঁসি দেয়।জেনি সেই হাঁসি দেখে ব্রু ভাজ করে বলে,
‘চুন্নি কাল আমার বাসায় তুই আমাকে দেখতে গিয়েছিলি নাকি আমার ব্রাসিয়ার চুরি করতে?’
জিয়ানা হেঁসে বলে,
‘দুইটাই।আমার গুলা তুমি নিয়ে যাও আপি।সুখ যেগুলা এনেছে সব বড় হয়।’
‘জেনে বুঝেই এনেছে।সে বুদ্ধিমান পুরুষ। ‘
‘টাকা দিয়ে অভার সাইজ কিনে এনেছে তুমি এটাকে বুদ্ধিমানের কাজ বলছো? দোকানদার তাকে চুনা বানিয়েছে।’
‘আর কিছুদিন যাক ঠিকই বুঝতে পারবি।চোখ মুখের এই অবস্থা কেন? রাতে ঘুমাসনি? ‘
জিয়ানা মাথা দিয়ে না করে বলে,’তুমি এত সকাল সকাল? ‘
জেনি মুখ কাচুমাচু করে নজর লুকায়।জিয়ানা জেনির থুতনি ধরে মুখ উপরে উঠিয়ে বলে,
‘ঝগড়া করে এসেছো? তুমি মক্কু ভাইকে নিরিহ পেয়ে খুব টর্চার করছো আজকাল?’
জেনির চোখ ভিজে উঠে। কাপা গলায় বলে,
‘সত্যি আমি ওকে অনেক প্যারা দিচ্ছি আজকাল।মন মেজাজ এত বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে কি বলবো?’
‘কেনো আপি? এনিথিং রং? ভাই ভালোবাসে না?না বাসলে বলো এক্ষুনি গিয়ে তার মুখের ডিসপ্লে পাল্টিয়ে দিয়ে আসি।’

জেনি ফিক করে হেঁসে জিয়ানার গালে আলতু চাপর দিয়ে বলে,’খালি মারদাঙ্গা মুড তোর না?মুসাদ্দিক কিচ্ছু করেনি।এই যে কিচ্ছু করে নাই এইজন্য আমার রাগ হয়েছে।আর ঝগড়া করেও শান্তি নেই।একটু প্রাণখোলে ঝগড়া করা যায় না। একটা উত্তর দেয় না।একটুও রাগে না।তাই মেজাজ খারাপ।আর খালি পেটে ইউরিন টেস্টের জন্য এসেছিলাম এই এলাকার একটা ক্লিনিংকে। তাই ভাবলাম তোকে দেখে যাই।আর আমার ব্রাসিয়ার গুলাও উদ্ধার করে যাই।দে ফেরত দে সব গুলা?’
‘এই আমি তোমার ছোট বোন না।সামান্য জিনিস নিয়ে এমন কিপ্টামি করছো কেন?দাঁড়াও তোমাকে ব্র‍্যান্ডের নতুন ফুলো ফুলো হটি নটি গুলা দিচ্ছি।’
বলে আলমারি খুলে একটা বক্স বের করে সেখান থেকে দুইটা বের করে জেনির দিকে ছুড়ে মারে।জেনিও হাতে নিয়ে জিয়ানার দিকে ছুড়ে বলে,

‘রেগুলার ওয়ারের জন্য এগুলা না গাধি।এগুলা সব ভালো ফেব্রিকসের। ‘
জিয়ানা আবার ছুড়ে মারে।এবার একটু জোরে মারাতে সব দরজার দিকে উড়ে যায়।ঠিক তখনই নিবিড় এসে দাঁড়ায়।আর নিবিড়ের মুখে আছড়ে পরে টকটকে লাল আর কালো দুইটা ব্যাক্তিগত পোশাক।জেনি নিবিড়কে দেখে লজ্জায় রুম থেকে বের হয়ে যায়। নিবিড়েরও শুকনা কাশি শুরু হয়।জিয়ানার দিকে এগিয়ে এসে বলে,
‘এগুলা কি খেলার জিনিস? এভাবে ঢিলাঢিলি করছো কেনো?’
‘তো কি করবো? একটাও সাইজের আনেন নাই।সব অভার সাইজ।’
‘এসব একটু অভার সাইজ পড়া ভালো ‘
‘আমার এত ভালো সহ্য হয় না।’
বলে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়। থামে নিবিড়ের ডাকে,’এগুলা এভাবে রেখে যাচ্ছো কেনো? ‘
‘তো কি করবো?’
‘তো কি করবে মানে?পড়ে ট্রায়াল দাও।আমি দেখছি কোথায় সমস্যা? ‘
নিবিড়ের ঠোঁটে দুষ্টুমি। জিয়ানা চোয়াল শক্ত করে বলে,
‘আপনি পড়ে বসে থাকুন ভন্ড নেতা।’

জেনি আর রেবেকা সোফায় বসে চা খাচ্ছে।কুলসুম এসেও বসলো তাদের সাথে।ফিজানের স্কুল বাস গেটে হর্ণ দিচ্ছে অনবরত। ফারহানা আর ফিজান তড়িঘড়ি করে নামছে উপর থেকে।
রেবেকা জেনির দিকে তাকিয়ে বলে,
‘কত মাস চলে?’
জেনি বিস্মিত হয়ে বড় চোখে তাকানো দেখে রেবেকা হেঁসে বলে,
‘চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।মা হওয়ার ব্যাপারটা ঐশ্বরিক। চেহারায় আলাদা একটা মাতৃত্বের জেল্লা এনে দেয়।’
‘ওরকম কিছু না আন্টি।’
আমতা আমতা করে লজ্জায় নিচু হয়ে বলে জেনি।কুলসুম চশমার ফাঁকা দিয়ে দেখে বলে ,
‘ডাক্তারের কাছে যাও মেয়ে।তোমার চেহারায় বলে দিচ্ছে নতুন মানুষ আসছে।’
জিয়ানা এসে সে কথা শুনেই জেনির পায়ের কাছে হাটু গেরে বসে বলে,

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭১

‘সত্যি আপি?’
‘এখনো তো জানি না রে।আমি এখন আর স্বপ্ন বা আশাও করি না।আশা ভঙ্গ হলে প্রচন্ড হতাশ হয়ে পড়ি।’
‘ওয়েট দেখি এখানে কেউ আছে কিনা?’
বলে জিয়ানা জেনির পেটে কান পেতে বলে,’হ্যালো চেক মাইক টেস্টিং?ভেতরে কেউ আছেন?যদি থাকেন তবে সিগনাল দিন।দেরিতে দিলে আপনাকে উল্টা ঝুলিয়ে রাখবো কিন্তু?’
জেনি লজ্জায় মরি মরি করছে।দুইজন মুরুব্বির সামনে এই মেয়ে কি শুরু করলো। রেবেকা আর কুলসুম একসুরে হেঁসে উঠে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৩