নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১১
নাজনীন নেছা নাবিলা
নীলা খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছে।আর মিহাল নিজের মতো করে পড়াচ্ছে। বরাবরই মিহাল কেবল ক্লাসে এসে পড়িয়ে স্টুডেন্টদের ডাউট সলভ করে, অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ক্লাস থেকে চলে যায়। অন্য কোন খানে মন অথবা চোখ দেয় না। কিন্তু আজ না চাইতেও সামনের বেঞ্চে নিজের বইতে মগ্ন থাকা বোরকা হিজাব এবং মাস্ক পরে থাকা মেয়েটির দিকে তার নজর চলে যাচ্ছে। সকালে সে কেবল মেয়েটির চোখ দেখে ছিল কারণ মেয়েটির মাস্ক পরা ছিল। আর কেবল মেয়েটির কণ্ঠ শুনেছে। তাছাড়া আর কিছুই জানা নেই তার এই মেয়েটির সম্পর্কে। অবশ্য জানতে তার এক সেকেন্ডও সময় বেশি লাগবে না। মন বলছে এই মেয়েটি সম্পর্কে জানতে কিন্তু ইগো এবং মস্তিষ্ক বলছে এই মেয়েটি তেমন ইম্পরট্যান্ট না তার জন্য এই মেয়েটির সম্পর্কে কিছু না জানলেও চলবে।
সে এখন মন এবং মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তের মাঝখানে বন্দি আছে।তবুও বারবারই পড়ানোর মাঝে মেয়েটির চোখের দিকে নজড় চলে যাচ্ছে। এবং নিজের এহেন কাজে সে নিজেই বিরক্ত বোধ করছে। তার সাথে কখনো এমন ঘটেনি। যতটা নিজের উপর বিরক্ত বোধ করছে তার থেকে বেশি মেয়েটির উপর বিরক্ত বোধ করছে। মেয়েটি এমন ভাব নিয়ে বসে আছে যেন মেয়েটি তাকে চিনে না এবং সকালে কিছুই ঘটেনি তাদের মাঝে। অথচ এমন কাজ করেছে যা আজ পর্যন্ত কেউ করার সাহস পায়নি। একজন বাদে।তার সেই ছোট্ট নীলাঞ্জনা।যে একবার তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছিল। যখন মিহাল তার ছোট্ট নীলাঞ্জনা কে প্রথমবার দেখেছিল তখন নিষ্পাপ শিশু বাচ্চাটি তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনাটি আজ থেকে ২১ বছর আগের। অথচ ২১ বছর পর এক মেয়ে এসে আবার তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিল। যেই কাজ একবার তার নীলাঞ্জনা করে ফেলেছিল সেই কাজ দ্বিতীয়বার অন্য কেউ করেছে এটা ঠিক পছন্দ হলো না মিহালের।মিহাল নিজের মাথা নেড়ে সকল চিন্তাভাবনা দূর করলো। কারণ সে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারবে না।তার একটাই লক্ষ্য সেটা হলো প্রতিশোধ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মুনভি ইউনিভার্সিটির চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজছে সেই মেয়েটিকে। যাকে সকালে এক নজর দেখছিল।মনে পরে গেল সকালের ঘটনা ____
সে মিহালের সাথে ক্যান্টিনে বসে ছিল।তখন দুটি মেয়ে এক সাথে ক্যান্টিনে প্রবেশ করল। দুজনেই বোরকা হিজাব এবং মাস্ক পরেছিল। সবার থেকে ভিন্ন ছিল বলে প্রথমেই মুনভির দৃষ্টি চলে গেল মেয়ে দুটির দিকে। দুটি মেয়ের মধ্যে একজন লাইট পিঙ্ক রঙের বোরকা পরেছিল।হিজাবও একই রঙের।চোখ টানা টানা।মুনভি না চাইতেও বার বার মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ মুনভি থমকে গেল যখন মেয়েটি নিজের মাস্ক খুলে বোতল দিয়ে পানি পান করতে লাগলো। গোলগাল চেহারা। গায়ের রং উজ্জল।গালে আছে জন্ম দাগ যা মুনভির নজর কাড়ার জন্যই যথেষ্ট ছিল। হঠাৎ পাশের মেয়েটি বলে উঠলো ___
ইকরা।
নামটি শুনে মুনভি বাস্তবে ফিরে এলো।আবার একই নাম শুনলো সে।
“ইকরা।”
সে বুঝতে পারছে না আদৌ কি সেই নামটি শুনেছে নাকি এটা তার কল্পনা।
নীলা ক্লাস থেকে বের হলো এবং ইকরার ক্লাস যেখানে সেখানে থেকে ইকরা কে বের হতে দেখল। তখন ইকরাও ক্লাস শেষ সেও ক্লাস থেকে বের হল। নীলা ইকরাকে ক্লাস থেকে বের হতে দেখে ইকরার নাম ধরে দূর থেকেই ডাক দিল।আর তাই মুনভি ডাকটি শুনতে পেল।সে করিডোরের মাঝখানে ছিল। সামনের থেকে দেখল সে যাকে এতক্ষণ ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজছিল সে মেয়েটি হেঁটে আসছে।মুনভির পা সেখানেই থেমে গেল। মেয়েটির চোখ আরো স্পষ্ট হলো। এতক্ষণ দূরে ছিল বিধায় চোখ ছোট ছোট দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু মেয়েটি যত কাছে হেঁটে আসতে লাগলো তত যেন মুনভির বুক ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগলো। সে নিজে একজন ডাক্তার কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে তার নিজেরই কোন এক ডাক্তারের প্রয়োজন। ইকরা একদম তার কাছে চলে এলো।মুনভি এক নজরে তাকিয়ে রইল।ইকরা যেই না তার পাশ কাটিয়ে সামনে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হল তখনই সে নরম সুরে বলল___
ওয়েট।
ইকরা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটা নীলার মতন না এত প্রতিবাদী আর না এত সাহসী। সে কিছুটা ভীত প্রকৃতির বটে। কিন্তু তবুও নিজের ভয় প্রকাশ না করে স্বাভাবিক কণ্ঠে তাকে যেই পুরুষটি ডেকেছে সেই পুরুষটির দিকে তাকিয়ে
বলল ___
ইয়েস?
মুনভির গায়ে লোম দাঁড়িয়ে গেল নিজের পাশে থাকা মেয়েটির নরম কণ্ঠ শুনে। এই মুহূর্তে তার মনে হল যদি এই মেয়েটি একবার তাকে অনুমতি দেয় তাহলে সে আজীবন এই মেয়েটির কন্ঠ শুনে নিজের জীবন পার করে দিতে পারবে। সে মেয়েটির চেহারা দেখার জন্য দু কদম পিছিয়ে গেল। এখন তারা দুজন একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মুনভির হাইট হবে ৬ ফুট। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির হাইট হবে ৫ ফুট ৪ কি ৫। মেয়েটির হাইট দেখে মুনভি মুচকি হাসলো এবং মনে মনে বলল___
তারমানে আমাদের ভালই বানাবে।
ইকরা বেশ হাঁসফাঁস করতে লাগলো। একেই তো অচেনা পরিবেশ। তার উপর আবার অচেনা মানুষ। আবার তাকে ডেকেছে অথচ কিছুই বলছে না। সেই কিছুটা ভয় পাচ্ছে মনে মনে। কিন্তু কিছু প্রকাশ করল না।
অন্যদিকে নীলা নিজের ক্লাসরুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে সবটা দেখছে। আর ক্লাসরুমের ভেতর থেকে মিহাল নীলাকে দেখছে।নীলা দূর থেকে তাড়িয়ে ইকরাকে দেখেই বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে। তাই কিছু না ভেবে ইকরার কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। আর মিহাল যখন দেখলো নীলা তার চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে সেও নিজের ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে এলো। সে ভেবেছিল ক্লাস শেষ হলে মেয়েটির সাথে সে নিজের বোঝাপড়া মিটিয়ে নিবে। কিন্তু তা করার আগেই মেয়েটি চলে যেতে লাগলো। তাই সেও মেয়েটির পেছন পেছন হাঁটতে লাগলো।
নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি এখনো কিছু বলছে না দেখে ইকরা বেশ বিরক্ত বোধ করলো। মুখ দিয়ে ” চ” শব্দ উচ্চারণ করে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল____
কিছু হয়েছে?
মুনভি নিজের হোশে ফিরে এলো।সে মুখ দিয়ে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু গলা দিয়ে তার শব্দ বের হলো না। আমতা আমতা করে বলতে লাগলো__
আআআআআআ,,,আই মিন আই আই একচুয়ালি
নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি কে এমন ভাবে তোতলাতে দেখে ইকরা বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরলো। ততক্ষণে নীলাও সেখানে এসে পরেছে।নীলা কাছে আসতে ইকরা কিছুটা সাহস পেল। নীলা ইকরার হাত ধরে মুনভির সামনে দাঁড়ালো। তাদের দুজনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি এখনো তোতলাচ্ছে। নীলা যুবকটিকে বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিল। তার কাছে মনে হলো না যুবকটির কোন খারাপ উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু যুবক টার মনে কি আছে এইটাও সে ঠিক বুঝতে পারছে না।
মিহাল দূর থেকে দেখেই চিনতে পারলো এইটা মুনভি। কিন্তু সে এটা বুঝতে পারল না যে মুনভি ওই মেয়েটির সাথে কি কথা বলছে। সে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগলো তাদের দিকে।
মুনভি আবার বলতে শুরু করল___
একচুয়ালি আই নো আই মিন আআআ ইউ আর,নো আই এম
বলতে বলতে আবার থেমে গেল। কখনোই তার সাথে এমন হয়নি আজ প্রথম এমন হচ্ছে। নিজের উপর নিজে ভীষণ রাগ উঠছে। ইচ্ছে করছে পাশে দেওয়ালে নিজের মাথা ফাটাতে।
নীলা আর ইকরা একবার সামনে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে তাকালেও তো আরেকবার একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর হঠাৎ গ্রাউন্ড থেকে মাইকের শব্দ এল। বড় মাঠের ফাকা স্থানের এলাউন্সমেন্ট এর ব্যবস্থা করা আছে। এখানে বেশ জরুরী ঘোষণা গুলো এলাউন্সমেন্ট করা হয় যাতে সকল স্টুডেন্ট যেখানেই থাকুক না কেন সেখান থেকে শুনতে পারে। মাইকের শব্দ শুনে সবাই সেখানে তাকালো। নীলা ইকরার হাত ধরে দৌড় লাগালো সেই দিকে। মুনভি তাদের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল। ততক্ষণে মিহাল মুনভির কাছে চলে এলো। এসেই মুনভির পিঠে কিল বসিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল____
কিরে মেয়েটার সাথে কি কথা বলছিলি?
মুনভি হকচকিয়ে উঠলো এবং মনে মনে বলল____
আমতা আমতা করি কোন পেলাম না আবার কথা বলব।
কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বলল না। কারণ সে প্রকাশ করতে চায় না যে সে কোন মেয়ের প্রতি দুর্বল হতে চলেছে। তারপর ভাব নিয়ে বলল_____
আসলে মেয়েটা এসে আমাকে বলল আমি নাকি দেখতে খুব হ্যান্ডসাম। আমাকে দেখে তারা এই ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ভেবেছিল। আমার বয়স বুঝতে পারেনি। আমাকে তো এখনো ইয়াং লাগে তাই এটা স্বাভাবিক। যখন বললাম আমি স্টুডেন্ট না আমি একজন ডাক্তার তখন তো অনেক অবাক হয়ে গেল। তারপর টুকিটাকি কথা বলে তারা চলে গেল।
মিহালের ঠিক হজম হলো না মুনভির কথা। খুব ভালো করে তার বন্ধুকে চিনে। আর একটু আগেও মেয়েটিকে সে ক্লাস রুমে দেখেছে। বয়স তো তার কম হলো না সে খুব ভালো করেই মানুষ চিনতে পারে। এই মেয়েটি যে এমন কথা বলতে পারে না এটা সে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু যেহেতু এখানে উপস্থিত ছিল না তাই এ বিষয়টি আর ঘাঁটালো না। তারাও এগিয়ে গেল এলাউসমেন্ট শুনতে।
মাঠে প্রচন্ড ভিড় জমেছে। এখানে সিনিয়র জুনিয়র সকল স্টুডেন্ট উপস্থিত। টিচাররা সবাই যেখানে এলাউন্সমেন্ট করে সেই স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে।
(যেহেতু এই গল্প টায় প্যারিস উল্লেখ করা তারমানে বুঝে ফেলবেন সেখানের যারা কথা বলবে সবাই ফারসি ভাষায় কথা বলবে। কেবল নায়ক-নায়িকা তাদের বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবার ব্যতীত সবাই। অর্থাৎ গল্পে যাদের বাঙালি বলে দাবি করা হয়েছে)বারবার প্রত্যেক লাইনে শেষে “কথাটি সে ইংরেজিতে/ফারসিতে বলেছে” এটা লিখে দেওয়া বিরক্তিকর লাগে। পরবর্তী পর্বগুলোতে এটার উল্লেখ করবো না আপনারা বুঝে নিবেন।)
প্রিন্সিপাল সকলের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো____
এই ইউনিভার্সিটিতে অ্যানুয়াল ফাংশন অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানটি আরো আগেই হয় কিন্তু কোন কারনে অনুষ্ঠানটি এখনো পর্যন্ত হয়নি। যেহেতু স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে থেকে অনেক স্টুডেন্ট এসেছে আমাদের এই ইউনিভার্সিটিতে তাই ভাবলাম সবাইকে নিয়েই অনুষ্ঠানটি করি। তোমরা নিজেরা নিজেদের মতো ড্রেসের থিম চুজ করে পরবে। কিন্তু হে যার ড্রেস একদম আইকনিক হবে তাকে আমাদের ইউনিভার্সিটি তরফ থেকে সারপ্রাইজ গিফট দেয়া হবে। তাই সবাই সবার বেস্ট ট্রাই করবে। আর যারা কোন কারিকুলামে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী সিনিয়র এবং টিচারদের সাথে যোগাযোগ করবে। ধন্যবাদ সবাইকে।
কথাগুলো বলেই প্রিন্সিপাল স্টেজ থেকে নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে হট্টগোল শোনা গেল। সকল স্টুডেন্টরা খুশিতে আত্মহারা। যারা পুরাতন তারা খুশি হয়েছে কারণ তাদের ইউনিভার্সিটিতে আবার একটু অনুষ্ঠান হবে। তারা এখানকার অনুষ্ঠান সম্পর্কে পরিচিত তাই তারা জানে এখানে অনুষ্ঠান হলে কেমন হতে পারে। আর যারা নতুন এসেছে তারা আগ্রহী এই ইউনিভার্সিটর অনুষ্ঠান দেখার জন্য। সবাই নিজের মতো গ্রুপ করে ড্রেস কোড ভাবতে লাগলো।
লিসা এই অ্যালাউন্সমেন্ট হবে আগে থেকে জানতো কারণ গত রাতে তাকে তার বাবা বলেছিল। অনেক আগেই নিজে কি পরবে ভেবে রেখেছিল। এখন শুধু নিজের দলবল নিয়ে বাকিদের কে শাসানো বাকি। যাতে কেউ তার মত ড্রেস না পরে এবং সেই এই সারপ্রাইজ গিফট পেয়ে যায়। আর তার প্রিয় ক্রাশ টিচারকে ইমপ্রেস করতে পারে।
নীলা আর ইকরা নিজেদের আ্যপার্টমেন্টে ফিরে এলো।
দুজন নিজ নিজ রুমে চলে গেল। রুমে গিয়ে যার যার পরিবারের সাথে ফোনে কথা বললো। এবং তারপর ফ্রেশ হয়ে খাবার রান্না করতে চলে এলো। এইটা না নিজের দেশ আর না নিজের বাড়ি যে কেউ মুখের সামনে এসে খাবার তুলে দিবেন। এখানে নিজের কাজ নিজেরই করতে হয়। সারাদিন অপরিচিত মানুষের ভিড়ে থেকে মানিয়ে নিতে হয়।আবার বাড়ি ফিরে নিজেকে নিজেরই সামলাতে হয়। খুব কম মানুষ বিদেশে এসে টিকতে পারে। সবাই সব জায়গায়, সব ভাবে সামলাতে পারে না।।
নীলা আর ইকরা মিলে রান্না করতে লাগলো।ভাত বসিয়েছে।ইকরা পেঁয়াজ, আলু কাটছে।আর নীলা ডাল বসিয়েছে।এতেই তাদের সুন্দর হয়ে যাবে।ইকরা নিজের কাজ করতে করতে বলল_____
তুই কি সত্যিই চিতই পিঠার ব্যবস্থা করবি?
নীলা মুচকি হেসে বলল ____
করলে মন্দ কোথায়?
ইকরা আমতা আমতা করে বলল ____
না মানে লোকে কি বলবে? আর বাংলাদেশের কেউ শুনলে তো হাসা হাসি করবে। বিশেষ করে আরশি আর ইরফান ভাইয়া।
নীলা হাসলো তারপর মোহমুক্ত ভঙ্গিতে বলল____
শোন যাদের মেন্টালিটি খুব চিফ তারাই এই কাজকে ছোট ভাববে। কিন্তু কোনো কাজই ছোট না।এখন আমাদের বাংলাদেশেই এই পিঠার প্রচলন বেশি। সেখানে গরিব রা রাস্তায় চুলা নিয়ে বসে পিঠা বানিয়ে রোজগার করছে। তাই এই কাজ সবার কাছে ছোট লোকের মনে হয়।অথচ এই ছোট লোকে দের হাত দিয়ে বানানো পিঠা খেতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এখন যদি কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে এই পিঠা বানানো হতো তাহলে সেটি ফেন্সি খাবার হতো।সবাই সে কাজ কে আ্যপোসিয়েট করতো। আসলেই সমস্যা কাজে না সমস্যা হলো মানুষের মস্তিষ্কে। উদাহরণ স্বরূপ দেখ ইদানিং একটা আপুর ভিডিও খুব ভাইরাল হচ্ছে। ফেসবুকে গেলেই তাকে দেখা যায়।মিম আপু।সে এখন নিজের বিজনেস নিয়ে বসেছে। কিন্তু এক লাফে কি সে এত দূরে পৌঁছে গিয়েছে? কখনোই না।সেও তো প্রথমে রাস্তায় খাবার নিয়ে নেমে বিক্রি করে তারপর এই পর্যন্ত আসতে পেরেছে। তোর কি মনে হয় সে কখনো কারো কথা শুনিনি? অবশ্যই শুনেছে। কিন্তু সে কাউকে পরোয়া না করে নিজের মত এগিয়ে গিয়েছে।
নীলা একটু থেমে আবার বলতে লাগলো
আচ্ছা আরেকটি উদাহরণ দেখাই___
কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে শীতকাল হলেই পিঠা উৎসব হয়।একটা কথা মাথায় রাখবি ইকরা আমরা যেই সমাজে বসবাস সেখানে কিন্তু স্টুডেন্টরাই পিঠা বানিয়ে স্টল নিয়ে বসে। সেটার মাধ্যমেই কিন্তু একটা শিক্ষা পাওয়া যায় যে কোন কাজই ছোট না। এইটার মাধ্যমে রোজগার করা যায়। কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে কেউ ভাবেই না কখনো। নিজেদের মতো আনন্দ ফুর্তি করে জিনিসগুলোকে সবাই উপেক্ষা করে চলে।
একটা কথা বলি শুনতে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই কিন্তু আমরা যেই সমাজে বসবাস করি সেইটা হি*জ*রা মার্কা সমাজ।হি*জ*রার সাথে তুলনা করলো হি*জ*রা দের অপমান করা হবে। অনেক সময় অনেক হি*জ*রা দের মানসিকতা ভালো পাওয়া যাবে কিন্তু সমাজে বসবাসরত কিছু মানুষের মানসিকতা অনেক ছোট থাকবে। তাই মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজের মতো এগিয়ে যেতে হবে এবং নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে হবে। একটা কথা তো শুনেছিস অবশ্যই
“ফেলিওর ইজ দা পিলার অফ সাকসেস” ব্যর্থতাই সাফল্যের স্তম্ভ।
তাই কে কি বলবে কে কি ভাববে এটা ভাবলে কখনোই নিজে খুশি থাকতে পারবো না। আর আমার কাছে নিজেকে খুশি থাকা সব থেকে বেশি ম্যাটার করে। অন্যের টাকার আশায় চাকরি না করে নিজ যোগ্যতায় কিছু করব। ১০ টাকার জায়গায় ৫ টাকা কামাবো। এতেই আমার চলবে। কিন্তু তবু ছোট মস্তিষ্ক বহনকারী মানুষদের কথা শুনে পিছপা হবো না।নীলা মির্জা একবার যা সিদ্ধান্ত নেয় সেখান থেকে পিছপা হয় না। আমার কাছে মোটামুটি অনেক টাকা জমানো আছে। সেই দিয়েই বিজনেস শুরু করতে পারবো।আশা করি তুই আছিস আমার সাথে?
ইকরা এতক্ষন যাবৎ মুগ্ধ হয়ে নীলার কথা শুনছিল। সে কখনো এভাবে ভেবে দেখেনি।সে নীলার চোখে চোখ রেখে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ভরসা দিয়ে বলল____
আইএম অলওয়েজ উইথ ইউ।
মিহাল নিজের রুমে বসে আছে। সামনে স্কেচবুক এবং হাতে তার ড্র পেন।আজ সকালে নাম না জানা সেই মেয়েটির চোখ আকলো সে মাত্র। সে নিজেও জানে না কেন এই কাজটি করেছে। কিন্তু ইচ্ছে করলো তাই এ কাজটি করে ফেলল। মেয়েটির উপর তার রাগ ওঠার কথা কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার তেমনভাবে কোন প্রকার রাগ উঠছে না। বরং বাড়ি ফিরেই চেঞ্জ না করে আগে চোখের ছবি আঁকতে বসে পড়ল। এবং মেয়েটির চোখ যেরকম হুবহু সেরকম ছবি আঁকতে সফল হল। খুব বেশি তো দেখেন এই মেয়েটিকে আজকেই তো দেখল তবু এত পারফেক্ট আঁকতে পারবে সে ভাবতে পারেনি। চোখের ছবিটির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল____
আসলেই কি আমি এত ভালো ছবি আঁকতে পারি?
পরক্ষণে আবার আনমনে বলে উঠলো____
নাকি এই চোখের মালিক আসলেই এমন পারফেক্ট চোখের অধিকারী?
তার মা নিচে বাংলা গান শুনছিল। তার দরজা খোলা থাকার কারণে সেখান থেকে গানের লাইন ভেসে এলো___
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১০
মন্দ করেছে আমাকে ঐ দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
পালাতে পারি নি আমি যে দিশাহারা
দুটি চোখ যেন আমায় দিচ্ছে পাহারা
পালাতে পারি নি আমি যে দিশাহারা
দুটি চোখ যেন আমায় দিচ্ছে পাহারা
