Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 15

Naar e Ishq part 15

Naar e Ishq part 15
তুরঙ্গনা

ফ্ল্যাশব্যাক
গতকাল সকাল দশটা নাগাদ হঠাৎ একজন মেড এসে সুহিনকে বলল, তালহা রিজভী তাকে ডেকেছে৷ হঠাৎ কেকের বন্ধু তালহা কেনো তাকে ডেকেছে,এটা সুহিনের বোধগম্য নয়। কারণ সে তখন ভীষণ এক মানসিক দ্বন্দ্বে ক্রমশই বিধ্বস্ত হচ্ছে। সকাল সকাল কেকের ওমন অদ্ভুত ব্যবহার এবং বিয়ের প্রস্তাবে সে পুরোপুরি স্তম্ভিত, হতভম্ব।
কিন্তু আপাতত নিজেকে সামলে নিয়ে, সে মেডের কথামতো রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। তালহা নাকি বাড়ির বাগানে তার জন্য অপেক্ষা করছে। যথারীতি সে যেভাবে ছিল,ওমনই এক সাদামাটা পোশাকেই রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
বাড়ির বাগানে এসে চারপাশে নজর বুলিয়েও তালহার দেখা পেলো না। তৎক্ষনাৎ বাড়ির একজন গার্ড তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, তালহা বাড়ির বাহিরে গাড়িতে অপেক্ষা করছে। সুহিন আর দ্বিধা না করে, বাড়ির বাহিরে চলে আসে।

কিনারায় দাঁড় করানো কালো রঙের গাড়িটার কাছেই যেতেই কিছুটা অবাক হয়। সবাই বলছিল তালহা তাকে ডেকেছে। অথচ এটা তো কেকের কালো রঙের ফেরারি। আর যতদূর সে জানে, কেকে তার নিজস্ব গাড়ি একা কাউকেই তেমন দেয়না।
সুহিন কিছুটা সন্দিহান ভঙ্গিতেই, ড্রাইভিং সিটের পাশে এসে দাঁড়ায়। ওমনিই তালহা জানালার গ্লাসটা নামিয়ে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার দিকে ফিরে তাকাল। সুহিন তালহাকে দেখে আশ্বস্ত হলেও, মনের মধ্যে কিছু একটা খচখচ করছে। তাহলা মানুষটা কেকের মতোই খানিকটা অদ্ভুত। সহজে তেমন কথাবার্তা বলে না। তাই সে নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল,
“ভাইয়া ডেকেছিলেন?”
—“হুম, ভেতরে এসে বসো।”
সুহিন খানিকটা হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“জ্বী?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—“গাড়িতে এসে বসো।”,তালহার সোজাসাপ্টা নির্বিকার অভিব্যক্তি। সুহিন কিছুটা সংকোচ বোধ করলেও, নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়ির ভেতর এসে তালহার পাশেই বসে পড়ে। এবং শুরুতেই অদ্ভুত এক সুগন্ধিতে তার চোখ-মুখ খানিকটা সন্দেহের বশে কুঁচকে যায়।
অদ্ভুত এক ‘কোরাল পারফিউমে’র সুগন্ধি বেশ তীব্রভাবেই নাকের ডগায় ধরা দিচ্ছে। এটি সাধারণত সফ্ট ফ্লোরাল (নেরোলি) এবং উডি (স্যান্ডালউড, ভেটিভার) নোটের সংমিশ্রণ, যা সতেজ ও উষ্ণ অনুভূতি দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পারফিউমের ফ্র্যাগ্র্যান্সটা তার বেশ পরিচিত। কেকের গা থেকেও এমন কিছু আগেও অনুভব করেছে সে। কিন্তু এখানে কেকে আসবে কোত্থেকে? নাকি গাড়িতেও এই একই পারফিউম মেখে রেখেছে দেখে তার এমন অনুভূতি হচ্ছে?

সুহিন আগ বাড়িয়ে কিছু একটা বলবে,তার আগেই হঠাৎ পেছন থেকে এক গুরুগম্ভীর শীতল কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“রিজভী! স্টার্ট দ্যা কার—নাউ।”
আচমকা কেকের কন্ঠস্বরে সুহিন ভড়কে গেল। পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখে,তালহা গাড়ি স্টার্ট দেবার প্রস্তুতি নিয়েই বসে আছে। সুহিন বিস্ময়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই হতভম্ব হলো। ব্যাকসিটে নির্বিকার ভঙ্গিতে গা এলিয়ে কেকে বসে আছে। হাতে ফোন নিয়ে খানিক ব্যস্ত ভঙ্গিতে স্ক্রল করছে।

—“আ…আপনি এখানে?”
সুহিনের ঘাবড়ে যাওয়া কন্ঠস্বরে, কেকে মুখ তুলে তাকায়। শান্ত-তীক্ষ্ণ চোখজোড়া দিয়ে তাকে একবার পরখ করে, হিমশীতল কন্ঠে নির্লিপ্তের সহিত আওড়াল,
“হু, এনি প্রবলেম?”
এই বলেই সে পুনরায় নিজের মতো ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগী হলো। এদিকে তালহাও বিনাবাক্য ব্যয়ে গাড়ি স্টার্ট করেছে। যেন তালহার এখানে কিচ্ছু বলার নেই।
—“আপনারা আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? গাড়ি থামান…এক্ষুনি গাড়ি থামান প্লিজ।”
তালহার নজর সম্মূখের রাস্তায়। পাশে ফিরে একবারও সে সুহিনকে দেখার প্রয়োজন মনে করল না। এরিমধ্যে পেছন হতে কেকে খানিকটা বিরক্তির স্বরে বলল,
“চেঁচামেচি না করে,চুপচাপ বসে থাক, স্টুপিড।”
সুহিন বাকহারা। এরা আদতে তার সাথে করতে চাইছেটা কি? সুহিন নিরূপায় হয়ে করুন স্বরে পাশে বসে থাকা তালহার উদ্দেশ্যে বলল,

“ভাইয়া, আমি অন্তত আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু আপনিও…”
সুহিনের অসম্পূর্ণ কথায় তালহা একপলকের জন্য পাশে ফিরে তাকে দেখল। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“সরি!”
তার এমন নির্লিপ্তায় সুহিন পারল না কেবল কেঁদে ফেলতে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দোয়া করতে লাগল যেন, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয়।কিন্তু নিয়তি বোধহয় আড়ালে বসে অন্য কোনো এক চিত্রনাট্য সাজিয়েছিল। আর যাই হোক, ভাগ্যের লিখন তো আর মিথ্যে হওয়ার নয়।

সুহিন যা আশংকা করেছিল তার চেয়েও ভয়ংকর কিছুর সম্মুখীন হতে হলো তাকে। তাকে কাজী অফিসে নিয়ে আসা মাত্রই সে সম্পূর্ণ রূপে হতবিহবল হয়ে পড়ল। চোখজোড়া ভিজে উঠল অচিরেই। বোঝা হয়ে গিয়েছে সে আজ কোন ফাঁদে পা দিয়েছে। সুহিন কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে একবার তালহাকে দেখল তো একবার কেকে’কে। অথচ সে ব্যতীত সকলেই নির্লিপ্ত।
কাজী ব্যস্ত কাগজপত্র গোছাতে। তালহাও এক যান্ত্রিক মানবের মতো নির্বাক হয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে রইল। সুহিন ততক্ষণে কেকের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বলল,
“এটা সম্ভব না, কখনোই না…”

কেকে সুহিনের দিকে ফিরে ক্ষীণ হাসল। তাকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে পাশের সোফায় গিয়ে পায়ে উপর পা তুলে গা এলিয়ে বসল। একটা সিগারেট ধরিয়ে,ঠোঁটে পুরে দিয়ে কালো লাইটারটা নিয়ে আঙুলের ডগায় খেলতে খেলতেই সুহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“এদিকে আয়।”
সুহিন নড়ল না। তার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেছে। কেকের ধৈর্য খুব কম। সিগারেটের ধোঁয়াটা সুহিনের মুখের দিকে উড়িয়ে দিয়ে এবার গলার স্বর আরও এক ধাপ খাদে নামিয়ে বলল সে,
“এদিকে আসতে বলেছি আমি!”
সুহিন একনজরে চারপাশটা দেখে নিয়ে, নিজের ঠোঁটজোড়া চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। কোনোরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে,বাধ্য মেয়ের মতোই কয়েক পা কেকের কাছে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে কেকে সুহিনের দিক থেকে নজর সরিয়ে, হাত উঁচিয়ে নিজের দামী ব্ল্যাকবেল্টের ঘরিটায় নজর বুলিয়ে সময়টা দেখে নেয়। বয়স্ক কাজীর উদ্দেশ্যে গুরুগম্ভীর স্বরে বলে,

“কাজী সাহেব, যা করার দ্রুত করুন। হাতে সময় কম।”
এই বলেই সে সুহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হুম,এখন বল কি বলতে চাচ্ছিস।”
সুহিন ইতস্তত ভঙ্গিতে একপলক তাকে দেখে। বলার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। কেকে ভ্রু উঁচিয়ে উত্তরের জন্য আবারও ইশারা করে। সুহিন নিজেকে তটস্থ করে চাপা ক্রন্দনরত স্বরে বলল,
“কেনো করছেন এসব? আপনি জানেন এটা ঠিক না, তবে কেনো…কেনো এই পাপ করতে চাচ্ছেন? আবার কোন অশান্তি বয়ে আনতে চাচ্ছেন?”
কেকে নির্লিপ্ত চাহুনিতে সুহিনকে একঝলক দেখে নিয়ে, ঝাঁকড়া ওল্ফে কাটের এলোমেলো চুলগুলো খানিক ঝাকিয়ে, সরাসরি উঠে দাঁড়াল। একহাতে সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছেড়ে, অন্যহাতে অনবরত লাইটারটাকে আঙুলের ডোগায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলা করতে লাগল। অন্যদিকে সুহিন পারছে না কেবল, নিজের চোখের ডগায় ছলছলে জলগুলো কান্নারূপে ঝড়াতে।

কপালে ছড়িয়ে থাকা এলেমেলো চুলগুলোর মাঝ হতে নিক্ষিপ্ত কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটুকু তার মাঝে সহসাই অজানা সংশয়কে আগ্রত করল। অন্যসময়ে কেকের গা হতে অনবরত ছড়ানো কোরালের সুগন্ধিতে মন গলে পড়লেও, আপাতত অদ্ভুত এক ঘৃণা জন্মালো কেকের প্রতি।
এরিমধ্যে কেকে ধীর স্বরে চাপা কন্ঠে আওড়ায়,

“কোনটাকে পাপ বলছিস,হানি? উঁহু,এখন আর কোনো পাপপুণ্যের হিসেব করিস না। শুভকাজটা হয়ে যাক,তারপর না হয় প্রয়োজনে আমিও তোর সাথে খাতা-কলম নিয়ে বসব—এই সো-কল্ড পাপপুণ্যের হিসেব কষতে।”
—“আপনি পাগল দেখে আমিও পাগল হইনি। আমি কখনোই এসব করব না, কক্ষণো না। হুঁশ আছে আপনার? একবার এসব কেউ জেনে গেলে ঠিক কি হবে? সমাজ-পরিবার কেউ মানবে না এসব। অতীত কি, সত্যি কি, তা আমরা জানলেও সমাজের কতজনকে আপনি ডেকে ডেকে তা জানাবেন? সমাজ কি মুখ বুঝে থাকবে? আবারও সবাই নোংরা নোংরা কথা তুলবে,আপনার আমার মৃত বাবা-মা’দের নিয়ে বাজে কথা বলতেও ওদের মুখে আটকাবে না। এরপরও কিভাবে এসব করতে চাচ্ছেন?”
কেকের তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা শক্ত হলো। সুহিনের অভিব্যক্তিতে ঘাড়টা খানিক বাকিয়ে, কপালের একপাশে আঙুল ঘষে, বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,

‘সমাজ,সমাজ,সমাজ…ফা”ক দিস।”
অথচ সুহিনের কথা শেষ হতে না হতেই, তার উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে অকপটে বলতে লাগল,
“এক সেকেন্ড,এক সেকেন্ড, ইউ নো হোয়াট হানি? ভার্সিটিতে আমি কেবল আমার চেহেরা দেখিয়ে,একদিনের মাঝেই সোশিওলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর হইনি! এই সমাজ,এই সমাজের ট্রিপিকাল মানুষজন কিংবা তাদের সো কল্ড নিয়মকানুন—সবটা নিয়েই আমার নূন্যতম ধারণা একটু হলেও আছে। কিন্তু সমস্যাটা কোথায় জানিস? আমি তো এসবের ধার ধরি না!আমি এসব তুচ্ছ নিয়মের তোয়াক্কাও করি না। আমার কাছে একমাত্র নিয়ম হলো—আমি যেটা চাই, সেটাই হবে। যা আমার চিন্তার সাথে মেলে, যা আমাকে আনন্দ দেয়, আমি ঠিক সেটাই করব। আর তুইও তাই করবি। গট ইট, সুইটহার্ট?

​সো, এই সমাজের ভয় আমাকে দেখাস না। বিশ্বাস কর, এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের ওই সস্তা বুদ্ধিজীবীদের বানানো নিয়মগুলো তোকে কিচ্ছু দেবে না। ওগুলো শুধু পারে তোর সাজানো জীবনটা তছনছ করে দিতে, তোর সবকিছু কেড়ে নিতে।কিন্তু আমি? আমি তোকে কেড়ে নেব না, আমি তোকে আমার করে রাখব। এখন মুখ বন্ধ কর আর সই কর।”
শেষ পঙক্তিটুকু কেকে বেশ চাপা ও রুক্ষ স্বরেই আওড়াল। সুহিন শেষ উপায়ন্তরও না পেয়ে, ঠোঁট জোড়া চেপে কেবল ছলছল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
—“প্লিজ,পাগলামি করবেন না৷ এখনোও সময় আছে। আমার না হোক, আপনাদের পুরো পরিবার, বিজনেস কিংবা সবকিছু…সবটাই এই সমাজে অনেক উঁচু পর্যায়ে অত্যন্ত সন্মানের সাথে বজায় আছে। এই ভুলটা করে সবকিছু আবার তছনছ করে দিবেন না প্লিজ।”

সুহিনের চোখজোড়া হতে অজান্তেই দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে৷ অথচ কাতর স্বরে এতো অনুনয়ের পরেও কেকের মন গলে না। উল্টো দম্ভ ও ক্রোধে চোয়াল সহ চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আসে। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে, জোরপূর্বক সামান্য ক্ষীণ হাসল। পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত পিষে নিরেট স্বরে আওড়াল,
“জাহান্নামে যাক এই সমাজ। আই জাস্ট ফা*কিং হেইট দিস সোসাইটি।”

—“প্লিজ,একটু বোঝার…চেষ্টা করুন। যত যাই হোক, নূন্যতম নিয়ম-কানুন বলেও তো…”
—“বেইবি,আই ক্রিয়েট মাই ওয়োন রুলস—এন্ড ব্রেক দেম ইন মাই ওয়োন ওয়ে।”
কেকের গা ছাড়া নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে সুহিনের আর বলার মতো কিছু রইল না। যেন আজ জেনে-বুঝে নরকে ঝাপ দিতে চলেছে। তবে কেকে তার নিঃশব্দে ফেলতে থাকা কান্নাজল দেখে, ভারী শ্বাস ফেলল।সুহিনের ঘাড়ের কাছ থেকে খসে পড়া ওড়নাটা কেকে নিজের হাতে টেনে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্ন করে, বড় আদুরে ভঙ্গিতে ওড়নাটা সুহিনের মাথায় তুলে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“কাঁদতে নেই হানি… অন্তত আজকের দিনে তো একদমই না। লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই বলেই সে সুহিনের চোখেরজল দুটুও বড় যত্নের সাথে আঙুলের ডগা দিয়ে মুছে দিল। নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটাও ঠিকঠাক করে দিল। অন্যহাতে তার এখনও অখণ্ড সিগারেটের অংশ জ্বলজ্বল করছে। সুহিন ঠোঁট চেপে কান্না থামিয়েছে বোঝামাত্রই, কেকে ক্ষীণ হেসে বলল,
“ভেরী গুড, দ্যাটস্ মাই গুড গার্ল!”

​কেকে-র এই আচমকা কোমলতা সুহিনকে আরও বেশি কুঁকড়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার রাগের চেয়েও তার এই ‘নমনীয়তা’ অনেক বেশি বিপজ্জনক।
কেকে সুহিনের হাতটা একহাতে শক্ত করে ধরতেই, সুহিন থমকে দাঁড়িয়ে না যাবার ভঙ্গিতে একপ্রকার বাঁধা দিল। যাতে কেকের ধৈর্যের সীমা একপ্রকার ক্ষীণ হয়ে আসায়, সে চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ব্লু-বেরি! ইউ নো হোয়াট,আই লাভ টু ডু হোয়াট এভার আই ওয়ান্ট।বাট যারা আমার কথা অমান্য করে জেদ দেখায়, আমি তাদের একদমই পছন্দ করিনা।”
এই বলেই সে পেছনে মুখ ফিরিয়ে কাজির উদ্দেশ্যে বলল,
“কাজী সাহেব, সব রেডি?”
—“জ্বী,জ্বী, আপনারা আসুন এবার।”

দুহাত ছড়িয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসেছে কেকে। হাতের ডগায় এখনো জলন্ত সিগারেট। তার পাশেই মাথা নুইয়ে বসে আছে বিধস্ত মূর্তির ন্যায় সুহিন।তার চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে চিবুকে এসে জমেছে। আর বাদবাকি সোফায় বসে আছে কাজী ও তালহা। কাজীর সাথে অবশ্য সাক্ষী হিসেবে আরো কিছু লোক আছে। কেকে কথায় টেবিল ছেড়ে সকলে সোফাতেই জড়োসড়ো হয়েছে।
কেকে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ছাই ঝাড়ল। তারপর কাজীর দিকে না তাকিয়েই শীতল গলায় বলল,
“শুরু করুন। দেরি হচ্ছে।”

টেবিলে রাখা নীল রেজিস্টার খাতাটার দিকে কেকে তাকাচ্ছেও না। কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে নিয়ে খসখস করে কয়েকটা ঘর পূরণ করলেন। এরপর অত্যন্ত গম্ভীর গলায় শুরু করলেন,
​”বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আজ এই মজলিসে, উপস্থিত সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে, জনাব মরহুম শাহমীর কাহসান চৌধুরীর পুত্র—জনাব কাশিফ কাহসান চৌধুরী, আপনি কি মরহুম রাফায় আমিনের কন্যা উম্মে হানি সুহিন-কে ৭ কোটি টাকা দেনমোহরানা ধার্য করিয়া, নিজের বিবাহিত স্ত্রী হিসেবে কবুল করিয়া নিচ্ছেন?”
কেকে-র চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। চোখের পলক না ফেলে সরাসরি কাজীর চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,

“কবুল।”
​কোনো আবেগ নেই, কোনো আনন্দ নেই। যেন সে কোনো সাম্রাজ্য জয় করে তার দলিলে সিলমোহর দিচ্ছে। কেকের পালা শেষ হলে, কাজী সাহেব এবার সুহিনের দিকে ফিরলেন। সুহিনের শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।তার বাবা নেই, মা নেই—আজ এই অন্ধকারে তাকে আগলে রাখার মতো কেউ বেঁচে নেই। অথচ কাজী সাহেব ততক্ষণে তার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন,
“মা উম্মে সুহিন, আপনার পিতা মরহুম রাফায় আমিনের অনুপস্থিতিতে এবং উপস্থিত সাক্ষীগণের সামনে, ৭ কোটি টাকা দেনমোহরানা বাকিতে রেখে জনাব কাশিফ কাহসান চৌধুরীর সাথে আপনার বিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে। আপনি কি রাজি? রাজি থাকলে বলুন— কবুল।”

​সুহিনের ঠোঁট দুটো কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার কান্নার শব্দটুকুও যেন গলার ভেতর আটকে গেছে। সে একবার তালহার দিকে তাকাল, কিন্তু তালহা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন তার কিচ্ছু করার নেই।
কেকে এবার সুহিনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এল। তার পারফিউমের উগ্র ঘ্রাণে সুহিনের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। কেকে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
​”হানি! তোকে বাঁচানোর মতো এখানে কেউ নেই। সো, সিন ক্রিয়েট করিস না। জাস্ট সে ইট… অর এলস,আশা করি তুই এতোটুকু বুঝেছি, আমি ঠিক কতটা নিচে নামতে পারি?”
সুহিন আঁড়চোখে ভেজা দৃষ্টিতে ঘৃন্যতার সহিত একপলক তাকে দেখে। কেকের ভাবগম্ভীর্যে মনে হলো যেন এক আস্ত পিশাচ তার সামনে বসে আছে। কেকে ভগ্ন স্বরে আবারও বলল,
“সময় নষ্ট করিস না হানি। আমাদের যেতে হবে…নাকি তুই চাস আমি সবাইকে বাইরে পাঠিয়ে অন্যভাবে তোকে রাজি করাই?”

​সুহিন নজর সরিয়ে নেয়। চোখ বন্ধ করতেই এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু তার কোল ঘেঁষে ঝরে পড়ল। তার মনে হলো তার মৃত বাবা-মা ওপর থেকে তার এই করুণ দশা নিশ্চয় দেখছেন। নিরুপায় হয়ে, জীবনের সবটুকু ঘৃণা আর অসহায়ত্ব মিশিয়ে সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“কবুল…!”,অত্যন্ত ক্ষীণ, ভাঙা গলায় সে বিড়বিড় করে বলল। কাজী সাহেব আবারও বললেন,
“শুনতে পাইনি মা। জোরে বলুন।”
​সুহিন এবার বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাসটা চেপে ধরে রুদ্ধস্বরে বলল,
“কবুল… কবুল… কবুল।”
—“আলহামদুলিল্লাহ!”
কেকে-র ঠোঁটের কোণে একটা বিস্তৃত বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কাজী সাহেব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দোয়া পড়া শুরু করলেন। কিন্তু দোয়া শেষ হওয়ার আগেই কেকে উঠে দাঁড়াল। সে রেজিস্টার খাতাটা টেনে নিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে নিজের কাটাকাটা সইটা বসিয়ে দিল। এরপর কলমটা সুহিনের সামনে একপ্রকার ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “সাইন কর।”
​সুহিন কাঁপা হাতে কলমটা তুলে সই করল। কেকে এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। কাজ শেষ হতেই সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

“তালহা, বাকি ফর্মালিটিস শেষ কর। আমি বাইরে গাড়িতে আছি।”
​কেকে সুহিনের হাতটা শক্ত করে ধরল। তার হাতের কবজিতে কেকের আঙুলের চাপ বসছে, কিন্তু কেকের সেদিকে খেয়াল নেই। সে সুহিনকে একপ্রকার টেনে দাঁড় করিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। একপ্রকার হিড়হিড় করে টেনে রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল। সুহিনের জোরাজুরিতে বিরক্ত হয়ে শেষমেশ কেকে হঠাৎ তাকে চমকে দিয়ে, বিনাবাক্য ব্যয়ে সোজা কাঁধে তুলে নিল। করিডোরের অন্ধকার চুঁইয়ে যখন তারা গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, সুহিনের মনে হতে লাগল—আজ থেকে তার নামের সাথে কেবল ‘কাহসান চৌধুরী’ পদবিটুকুই যোগ হয়নি, বরং তার নামের আগে বন্দী শব্দটিও চিরতরে খোদাই হয়ে গিয়েছে। সেটাও কিনা এক সাইকো পিশাচের নরকে।

কেকে ড্রাইভিং সিটে চুপচাপ বসে আছে। একহাতে সিগারেট, অন্যহাতে স্টিয়ারিং ধরা। সুহিন মাথা নুইয়ে অনবরত চোখের জল ফেলছে। কেকে আপাতত তালহার ফেরার অপেক্ষায়। সুহিনকে সে কাঁধে করে তুলেই,গাড়িতে এনে চড়িয়েছে। প্রায় বেশ অনেকক্ষণ হতেই দুজনের মাঝে এমন নীরবতা বিরাজ করছে। কেকে আঁড়চোখে একবার সুহিনকে পরখ করে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে, সুহিনের উদ্দেশ্যে ডাকে,
“হানি!”
সুহিন কোনো সাড়া দেয়না। তার হাত-পা অসার হয়ে আসছে। এখন শুধু বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। এরিমধ্যে কেকে আবারও তার উদ্দেশ্যে বলে,

“ব্লু-বেরি!”
কাজ হলো না। কেকে ভ্রু উঁচিয়ে, সিগারেটের শেষাংশটুকুও ফেলে দেয়। পকেট থেকে কালো শেলের লাইটারটা বের করে, মাথা ঝুঁকিয়ে দু’হাতের আঙুলের ডগায় লাইটারটা নিয়ে—খানিকক্ষণ সময় ধরে খেলতে লাগল। মনোযোগ ও দৃষ্টি দুটোই চলে গেল সেদিকে।
এভাবে মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হবার পর, কেকে গুরুগম্ভীর অদ্ভুত এক শীতল কণ্ঠে আওড়াল,
“মিসেস কাহসান চৌধুরী!”
সুহিন থমকালো। অচিরেই সে পাশে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। চোখজোড়ায় খানিকটা বিস্ময়ের রেশ। কেকেও ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে চেয়ে বলল,
“ইগনোর করিস না প্লিজ। মেজাজ ঠিক থাকে না।”
সুহিন এই পর্যায়ে না চেয়েও একপ্রকার কেঁদে ওঠে। কেকে আশ্চর্য হয়না। তার মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়াও ঘটেনা। কেবল ভারী শ্বাস ফেলে, আচমকা সুহিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সুহিনের সিটের একপাশে এবং তার ঘাড়ের কাছে হাত ঠেকিয়ে বলে,

“অযথা কাঁদছিস কেনো? আমার বিরক্ত লাগছে।”
—“আপনি কেনো করলেন এটা? ওরা সবাই আবার…ওরা… এমন তো নয় আপনি আমায় পছন্দ করেন। আর তার চেয়েও বড় কথা, আমি কখনোই আপনাকে এমন সম্পর্কের নজরে দেখিনি। আপনি… আপনি কেনো করলেন এটা? আমি আপনাকে…আমি আপনাকে চাই না৷ প্লিজ আমায় মুক্তি দিন। আমি চলে যাবো। আমি অনেক দূরে চলে যাবো। প্রয়োজনে একেবারে বাবা-মায়ের কাছেই চলে…”
সুহিনের কথা শেষ হয়না। তার পূর্বেই, কেকে তার ঠোঁট জোড়ায় বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে, হাস্কি স্বরে আওড়ায়,
“হুঁশ! আমি জানি তুই আমায় পছন্দ করিস না। কিন্তু কি করব বল? তুই তো শুধুই আমার,তাই না?”
কেকের এই কথার অর্থ সুহিনের বোধগম্য হয়না। সে নিজের অত্যন্ত নিকটে অবস্থানরত এই অদ্ভুত মানুষটার গ্রেইশ-ব্ল্যাক কিংবা ধূসর-কালো চোখজোড়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, অস্ফুটেই ঘৃণ্যতার সহিত হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,

“পাগল আপনি একটা! উ’গ্র,অ’সভ্য, উশৃং’খল, উন্মাদ আপনি!
কেকে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে ক্ষীণ তির্যক হাসে।
—“জানি তো। এন্ড আই ফাকিং লাভ মাই ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ পারসোনালিটি।”
সুহিন আর কথা বাড়াতে না চেয়ে, চাপা স্বরে আওড়ায়,
“সরে যান এখান থেকে। ভাববেন না বিয়ে করেই আপনি আমায় পেয়ে গিয়েছেন। আমি কখনোই নিজেকে আপনার কাছে অন্তত…”

—“ওহ রিয়েলি?”
সুহিনের কথা সমাপ্ত হবার পূর্বেই, কেকে বিস্ময়কর এক কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। সুহিনকে বিস্ময়ে চমকে দিয়ে, আচমকা তার গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে দেয়। বলা নেই কওয়া নেই, সোজা নিজের তীক্ষ্ণ দাঁত-কপাটি সকল বসিয়ে দেয় সুহিনের সরু কলার-বোনের উপর। অকস্মাৎ এহেন কান্ডে সুহিন হতবাক।
​”আহ!”—সুহিনের কণ্ঠ চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। ব্যথার তীব্রতায় সে চোখ-মুখ খিঁচে নিল, নিমেষেই দুচোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে আক্রোশে কেকের একঝাঁক চুল খামচে ধরল, চেষ্টা করল তাকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু পারল না।উন্মাদ কেকে তখন যেন কোনো মানুষ নয়, এক র’ক্তপিপাসু পি’শাচ।

সুহিন তাকে সরাতে আক্রোশে দুহাতে তার একঝাঁক চুল খামচে আঁকড়ে ধরেও কাজ হয়না। কেকে প্রথমে নিজের স্পেশাল সিগনেচার যুক্ত বড় স্ট্যাম্পটা বসিয়ে, অতঃপর তার আশেপাশে উন্মাদের মতো অচিরেই একের পর এক ছোট ও মাঝারি আকারের লালচে-কালচে দাগ বসাতে উদ্যত হয়ে পড়ে। একপ্রকার সুহিন ধস্তাধস্তি শুরু করলে, কেকে উল্টো ইস্পাতের ন্যায় দু’হাতে নিজের সুবিধামতো সুহিনের কোমড় ও পিঠ জড়িয়ে ধরে। যার ফলে সুহিনের নড়াচড়া করার ক্ষমতাটুকুও বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

বেশ কিছুক্ষণ পর কেকে তাকে ছেড়ে দিল। কোনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে তার শিকার শেষ করে যেভাবে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে, কেকে-র চোখেমুখে ঠিক সেই পৈশাচিক আনন্দ। সে হাতের কব্জি দিয়ে নিজের মুখটা একবার মুছে নিল। অতঃপর জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে গাল আর দাঁতের অভ্যন্তরীণ অংশটা স্পর্শ করে এক বিস্তৃত মুচকি হাসল।
​সুহিন তখন ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। তার গলার ক্ষতগুলো তখনো চিনচিন করে জ্বলছে। কেকে তার নিজের হাতে আঁকা সেই লালচে ক্ষতগুলোর দিকে তৃপ্তির চোখে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে বলল,

​”তো মিসেস সুহিন কাহসান চৌধুরী, আশা করি আপনার একান্তই ব্যক্তিগত এই গ্রেট আর্টিস্ট কেকে চৌধুরীর তৈরি করা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ মাস্টারপিসটি আপনার পছন্দ হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এই চমৎকার চিহ্নগুলোই আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে—আপনি এখন কার।”
কেকের ব্যঙ্গত্বক অভিব্যক্তিতে সুহিন অশ্রুমাখা দৃষ্টিতেই, তীব্র বিদ্বেষ নিক্ষিপ্ত করল। ততক্ষণে কেকেও তার নিজস্ব ভাবমূর্তি দৃঢ় করে, গুরুগম্ভীর স্বরে অকপটে বলতে লাগল,
“অধিকার আদায়ের চেয়েও অধিকার প্রতিষ্ঠা করাটা আমার কাছে বেশি জরুরি। তুই আমার কাছে আসবি কি আসবি না, সেই অপশনটা আমি কোনোদিন তোকে দেবো না। যতদিন আমি বেঁচে আছি, তোর সবকিছুতেই কেবল আমার অধিকার।

উঁহু, না এটা ভালোবাসা নয়, আর নয় কোনো মহামায়া। তুই আমার, তুই কেবলই আমার, তুই শুধুই আমার—এইটুকুই যথেষ্ট তোর প্রতিটি কোষে আমার নিজস্ব অন্ধকার অস্তিত্বের আধিপত্য বইয়ে দিতে।
তুই যতই চিৎকার করিস না কেন, আয়নার সামনে দাঁড়ালে এই দাগগুলোই তোকে মনে করিয়ে দেবে— তুই এখন স্বাধীন কোনো নারী নোস, তুই কেকে চৌধুরীর ব্যক্তিগত এক টুকরো সম্পদ। আর আমার সম্পত্তি আমি আগলে রাখতেও জানি, আবার প্রয়োজনে পুড়িয়ে ছাই করে দিতেও জানি।”

সুহিন একমনে গতকাল ঘটে যাওয়া জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটুকু এক ঝলকে মনে করতে লাগল। সবশেষে চোখের সামনে বসে থাকা মানুষটার জন্য ঘৃণা ব্যতীত আর কোনো কিছুই অনুভূত হচ্ছে না। সুহিন জানেনা তার এই অনিশ্চিত জীবন আর ভাগ্যের পরিণামই বা কি! কিন্তু কেকে নামক এই সমাজ-নিয়ম-কানুনকে অগ্রাহ্য, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা উগ্র,উশৃংখল, বেপরোয়া মানুষটা যেভাবে তার জীবনটাকে এক নরকের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তার পরিণাম কখনোই ভালো হতে পারে না।

—“হানি! আমার মতো মানুষটাকে বোধ-হয় বিশ্বাস করা যায় না। কারণ দিনশেষে আমি সকলের চোখে কেবল একজন খারাপ মানুষ হিসেবেই বিবেচিত। ইট’স ওকে, আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট ইট। পৃথিবীতে যতদিন মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে, ততদিন শয়তানেরও অস্তিত্বও এই মহাবিশ্বে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এই মুহূর্তে আমি শুধু তোকে এইটুকুই বলতে পারি, আমি যা করছি এতে তোর কোনো খারাপ নেই। উল্টো তোর জন্য ভালোকিছুও হতে পারে।”
কেকের নির্বকার অভিব্যক্তিতেও সুহিনের মন গলল না। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলো জোয়া ও দানিয়েলের এক্সিডেন্টের ঘটনাটুকু। যাতে সে পুরোপুরি নিশ্চিত, ঘটনাদুটো কেকে’র ইচ্ছেতেই ঘটেছে।এরপরও এই মানুষটা এসব কথা বলে কোন মুখে?

—“আপ…আপনি অসুস্থ, আপনি পুরোপুরি একটা সাইকো, আপনি নিজেও জানেন না, আপনি কতবড় একটা পাগল।”
—“আই নো, আই নো, আমি পাগল,আমি উম্মাদ,আমি বেপরোয়া, আমি সাইকো, আমি ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ—কিন্তু তাতে কি? তুই আছিস তো। একটু সামলে নিস, হাহ?”
—“আমি শুনব না আপনার কথা। আমি আর আপনার নোং”রা খেলায় কখনোই..”
—“তো ঠিক আছে। দানিয়েল আর জোয়ার পর কার কার নাম লিস্টে তুলতে হবে জানিয়ে দিস।”
সুহিন দাঁতে দাঁত পিষে তার দিকে চেয়ে রইল। কেকে ততক্ষণে পুনরায় নিস্পৃহে ক্ষীণ হাসল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিখানা গিয়ে ঠেকল সুহিনের লন-শার্টের কলারের পাশ গলিয়ে ক্ষতপূর্ণ সরু কলার-বোনে। কেকে আচমকাই নিজ অবস্থান হতে তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। সুহিন হকচকিয়ে বিছানার সাথে গা লেপ্টে বসে রইল। মনের মাঝে তীব্র সংশয়,কেকের হাবভাব, দৃষ্টি কোনটাই ভালো নয়। কোনো পাগলামি না করে বসে।
কিন্তু কেকে! সে তো থামবার নয়। সুহিনের মুখশ্রী হতে অচিরেই তার নজর গিয়ে আবারও ঠেকে গলার ভাঁজে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ ক্রুর হাসি ফুটিয়ে, ভগ্ন স্বরে বলল,

“ড্যাম…আ’ম রিয়েলি অ্যা গ্রেট আর্টিস্ট।”
তার এহেন কথায় সুহিন আক্রোশে চোখ-মুখ খিঁচে নিল। ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কেকে’র বিদ্রূপমাখা মুখটার দিকে। কেকে নজর সরিয়ে আবারও তার দিকে চেয়ে ক্ষীণ হাসল। শরীর হতে আগত কোরালের সুগন্ধি সুহিনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। অথচ এতেই সুহিনের ঘৃণাবোধ আরো তীব্রতার সহিত বেড়ে চলেছে।
এরিমধ্যে সুহিনকে একপ্রকার অপ্রত্যাশিত রূপে চমকে দিয়ে, কেকে সুহিনের অতি সন্নিকটে কাছ ঘেঁষে আঙুলের সাহায্যে তার কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো ও নাকের ডগায় নেমে আসা ভীতু সুহিনের চশমাটাকে ঠিক করে দিয়ে, হাস্কিস্বরে আওড়াল,
“মিসেস কাহসান চৌধুরী! আপনার দেনমোহরের টাকাটা বোধহয় এখনও পরিশোধ করা হয়নি। চেক্ রেডিই আছে, এখনই লাগবে কি?”

সুহিন ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ থেমে কেকে আবারও বলল,
“সাত কোটি কম হয়ে গেল কিনা জানিনা। যদিও তোর এর চেয়ে বেশি টাকায় কোনো কাজও নেই। যত যাই হোক, তুই আমার কাছে আজও সেই সাত বছরের গাধা চশমিশ হিসেবেই রয়ে গেছিস।শুধু সাইজটা খানিক বেড়েছে,এছাড়া বড় তো আর হসনি!”

Naar e Ishq part 14

শেষের কথাটুকু কেকে খানিক ব্যঙ্গ করেই বলল। একইসাথে সহসাই তার চোখেমুখে হঠাৎ কাঠিন্যের ছাপ পড়ল। সুহিন কাছ থেকে তৎক্ষনাৎ সরে এসে, বিছানা হতে উঠে দাঁড়াল। একইসাথে রুম হতে চলে যেতে উদ্যত—এমন অবস্থায় সে পুনরায় সুহিনের দিকে ফিরে বলল,
“গাধামি ছেড়ে স্বাভাবিক হো। আজকে লোকজন আসবে, কোনোপ্রকার ঝামেলা যেন না দেখি। আর হ্যাঁ, কারো সাথেই যেন কোনোপ্রকার আদিখ্যেতাও করতে না দেখি। সে ব্যক্তি যেই হোক না কেনো। বিষয়টা যেন মাথায় থাকে!”

Naar e Ishq part 16