Naar e Ishq part 14
তুরঙ্গনা
“কেনো বাঁচালেন? আমার সুখ আপনার সহ্য হয় না, তাই না? আম্মু নিজে আমায় নিতে এসেছিল, তবুও কেনো যেতে দিলেন না? মে’রে ফেলুন আমায়। আমাকেও আপনি চিরতরে শেষ করে দিন। ঐ দেখুন সুইমিংপুল, দেখছেন! এটাই সেই সুইমিংপুল, যেখানে আজ থেকে এগারো বছর আগে আমার মায়ের লা’শ ভেসে উঠেছিল। আর এই সুইমিংপুলেই ডুবিয়ে, আপনি নিজ হাতে আমায় মা’রতে চেয়েছিলেন। নিন, সুযোগ দিলাম। চিরতরে মুক্তি দিন আমায়। তবুও আমি আপনার নার’কীয়তা সহ্য করে বাঁচতে চাই না।”
কেকে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে,কিঞ্চিৎ ভ্রু-কুঁচকে সুহিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ততক্ষণে সুহিন নিস্তেজ দেহে হাঁপিয়ে উঠে, কেকের গায়েই ঢলে পড়েছে। কেকে তৎক্ষনাৎ নিজেকে তটস্থ করে, সুহিনকে দু’হাতে আগলে নিতে গিয়েও থেমে যায়। পাশে ফিরেই দেখে,তাদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে জাভিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।
যথারীতি সে কি যেন একটা ভেবে নিয়ে, গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ভেতর থেকে দু’জন ফিমেল মেডকে আসতে বলো। ওকে দ্রুত ওর রুমে নিয়ে যাও।”
এই বলেই কেকে আর কথা বাড়ায় না। ভেতর থেকে দুজন নারী মেড আসতেই সে সুহিনকে তাদের কাছে দিয়ে, উঠে দাঁড়ায়। এবং অকপটে আগে আগেই বাড়ির ভেতরে যেতে উদ্যত হয়। যাবার সময় অবশ্য আড়চোখে জাভিয়ানকে দেখতে গিয়ে, খানিকটা চোখা-চোখিও হয় দুজনের। কিন্তু এই দৃষ্টি ভঙ্গির বিশেষত্ব ঠিক আন্দাজ করা গেল না।
রাত বাজে দেড়টা। সুহিনের ক্লান্ত-নিস্তেজ শরীর বিছানা পেতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছে। রুমে সে ব্যতীত আপাতত আর কেউ নেই। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আলোর মাঝে, নিজের খাঁচায় অবুঝ মাফিন তখন খেলতে ব্যস্ত। বারান্দার পর্দা গলিয়ে শিরশিরে বাতাস রুমের সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে একজোড়া চোখ বেশ অনেকক্ষণ হতে তাকে আড়াল হতে দেখছে। রাতের আঁধারের এই আগুন্তকটি আদতে কে,তা নিশ্চিত হয়ে বলা মুশকিল। আবার তার উদ্দেশ্যও বা কি সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।
এরিমধ্যে হঠাৎ দরজাটা ক্ষীণ শব্দে খুলে যায়। তাতে মোটেও সুহিনের ঘুমের নূন্যতম ব্যাঘাত ঘটেনা। ঘরের ভেতর ধীর পায়ে প্রবেশ করে এক নিকষিত ছায়া মানব। ধীর পায়ে সে ক্রমাগত এগিয়ে আসে সুহিনের কাছে।
রাতের এই প্রহরে কেকের সুহিনের কাছে আসার বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই। জেগেছিল বিধায় এমনিতেই দেখতে এসেছে। তার মস্তিষ্কের ভাবনা-চিন্তায় বিষয়টা ঠিক এমনই। অথচ রুমে প্রবেশ করতেই সে ভিন্ন কিছু অনুভব করতে লাগল। ব্যাপারটা শুরুতে গুরুত্ব না দিলেও, সুহিনের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ছুঁতে গিয়েও হাতখানা থামিয়ে দিল। ভ্রুকুটি করে তৎক্ষনাৎ মুখ তুলে ফিরে তাকায় বারান্দার দিকে। সেখানে কি কেউ আছে? নাকি কেবলই তার মনের ভ্রান্তি।
কেকে নজর ফিরিয়ে পুনরায় সুহিনের দিকে তাকাল। সুক্ষ্ম-তীক্ষ্ণ শীতল চোখজোড়া দিয়ে একনাগাড়ে তাকে পরখ করতে লাগল। ঘুমন্তরূপে মেয়েটাকে বেশ অন্যরকম লাগে। একদম শান্ত, কোনো ছটফট-অশান্তি নেই,কোনো বোকামি কিংবা পাগলামিও নেই। কেকে তার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই ক্ষীণ মুচকি হাসল। কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা গাঢ় বাদামী চুলগুলো হাতের আঙুলের ডগার সাহায্যে আলগোছে সরিয়ে দিল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই, সুহিনের গালে আলতোভাবে আঙুল স্পর্শ করে, তা কয়েকবার ঘষতেই সুহিন সামান্য নড়েচড়ে একপাশ হয়ে নিজের আরামমতো পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ল।যা দেখে সহসাই কেকের শুষ্ক হাসিমাখা ঠোঁটজোড়া হতে নিঃসৃত হলো,
“গাধা!”
হঠাৎ তাকে এমন সম্মোধন করাটা নতুন কিছু নয়। এটা তার পুরোনো অভ্যাস। ছেলে-মেয়ে যাই হোক, তার ভাষায় সব প্রজাতির সবকিছুই গাধা।
তবে এই নিস্তব্ধতার নিগূঢ় অনুভূতিটুকু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বরং কেকের নজর সুহিন হতে সরে পুনরায় বারান্দায় পড়ল। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল সহসাই। সে কি যেন ভেবে পা বাড়িয়ে বারান্দায় যেতে উদ্যত হলেও, পরক্ষণেই নিজেকে থামিয়ে দিল। এবং আর কোনোপ্রকার ভণিতা না করে তৎক্ষনাৎ রুম থেকে আলগোছে বেরিয়ে পড়ল।
রাত সাড়ে তিনটা। সবাই এখনো যে যার মতো ঘুমে আচ্ছন্ন। অথচ কেকের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ঘুমের আভাস নেই। সুহিনের রুম থেকে বেরিয়ে সে নিজের রুমে গিয়েছিল। রাতের বেলায় হঠাৎ গিটার বাজানোর ইচ্ছে হলেও,সে বাজাল না। টমিকে নিয়ে খানিকক্ষণ বসে বসে একমনে নিজের মতো শিস বাজানোর পর,আবারও রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অকপটে এগিয়ে যায় দোতলার বামপাশটায়। সেখানে এই বাড়ির একটি পরিত্যক্ত গেস্টরুম রয়েছে। যেখানে বিশেষ ভাবে একসময় মূলত সুহিনের বাবা-মা’ই থাকতো। তাদের গত হবার পর হতে,এই রুমে আর সেভাবে কারো যাওয়া হয়না। এমনিতেও এই বাড়িতে গেস্ট রুম ব্যতীত আরো অসংখ্য ফাঁকা রুম পড়ে আছে।
কেকে নিস্পৃহে দরজা খুলে রুমের ভেতর প্রবেশ করে। অন্ধকার রুমের লাইটটা অন করতেই, তার কপালে কিঞ্চিৎ ভাজ পড়ে। জায়গাটা পরিষ্কার রইলেও, কোথাও কোথাও ময়লাও জমে আছে। রুমে একটা বিছানা আর আলমারি ছাড়া তেমন কিছুই নেই।
ভ্রুকুটি করে কেকে সবটা একঝলক দেখে নিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। আলমারিটা খুলতেই ভেপসা গন্ধ ও খানিকটা ধুলোয় কেশে ওঠে। মেজাজটা এখানেই খারাপ হয়ে গেল। সার্ভেন্টগুলো আসলেই কোনো কাজের না!
কেকে ভারী শ্বাস ফেলে আলমারির মাঝের তাকে ফিরে দেখল। একটা বড়সড় আকারের ছবির ফ্রেম বাঁধানো রয়েছে। কেকে সেটা বের করতেই দেখল,কাঁচের উপর একগাদা ধুলো জমে আছে।এটা কি দিয়ে পরিষ্কার করবে ভাবতে ভাবতেই, বিরক্তিতে ছবিটা নিয়ে বারান্দার পর্দার কাছে এগিয়ে যায়। পর্দার একটা পাশ দিয়ে ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করে নেয়।
ছবিতে একটি হাসিখুশি পরিবারের দেখা মিলছে। মাঝে চশমা পড়ুয়া ছোট্ট সুহিন,একপাশে রাফায় আমিন ও অন্যপাশে সুহিনের মা মেহের। কেকে খেয়াল করে দেখল,ছবির ফ্রেমটার একপাশে খানিকটা ফাটল ধরেছে। কাঁচের একপাশটা ভেঙেও গিয়েছে।
কেকে ভারী শ্বাস ফেলল। জিহ্বার অগ্রভাগ দ্বারা গালের অভ্যন্তরীণ একপাশ স্পর্শ করে,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের বারংবার পরখ করে দেখতে লাগল। তার বন্ধু সিআইডি অফিসার ফাওয়াদের সাথে অগোচরে তার বেশ ভালো কানেকশন চলছে। ফাওয়াদের পাওয়া কিছু তথ্য অনুযায়ী কিছু নতুন বিস্ময়কর ব্যাপারও জানতে পারা গিয়েছে।
সুহিনের মা আরশিয়া মেহেরের মৃত্যুর সাক্ষী সে নিজেও ছিল। অন্যকোনো সময় হলে সুহিনের দেওয়া চড়টার উত্তর বোধহয় সে ভয়ানক উপায়ে দিয়ে দিতো। অথচ সে এমনটা করেনি। কারণ পরিস্থিতিটাই ছিল ভিন্ন।
সুহিনের বলা কথাগুলো মিথ্যে ছিল না। সে যা যা বলেছে সবটাই সত্যি। তার মায়ের লাশটা এমনই এক নিকষিত অন্ধকার রাতে সুইমিংপুলে ভেসে উঠেছিল। তার পরনে ছিল সদ্য বিবাহিত নারীর ন্যায় তার বিয়ের লাল টুকটকে শাড়ি ও গহনা। এবং এরচেয়ে স্তম্ভিত বিষয় ছিল সে রাতে কেবল আরশিয়া মেহের একা এই পৃথিবীর মোহমায়া ত্যাগ করেনি,বরং তার সাথে আরো একটা প্রায় এই পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিঃশেষ হয়েছিল।অর্থাৎ সুহিনের মা মেহেরের মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা । অথচ এক দুর্বার ঝড় সবটা তোলপাড় করে দিয়ে গিয়েছে।
কিন্তু কেকের এটা জানা ছিল না যে, তার বাবা আর রাফায় আমিনের মৃত্যুর মতো আরশিয়া মেহেরের মৃত্যুটাও আজও এক ঘোলাটে রহস্য হয়ে আছে। যার টুকরো অংশগুলো বর্তমানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতেই, কেকে চৌধুরীর মতো ব্যক্তিকেও রীতিমতো আশ্চর্য করে দিচ্ছে। কিন্তু সবশেষে সে তো নিজের খেলাটাই সাজাতে ব্যস্ত। সময়ের সাথে সাথে যত ছোট ছোট রহস্য গুলো উন্মোচন হচ্ছে ততই সে নিজের খেলার ভয়াবহতাকে আরো ভয়ংকররূপে সাজিয়ে প্রস্তুত করছে।
কেকে আরো একবার ছবিটাকে পরখ করে তা আলমারিতে রেখে দেয়। পুনরায় বারান্দার কাছে এসে দাঁড়িয়ে, জ্যাকেটের দু’পকেটে হাতদুটো গুঁজে দেয়। শীতল হাওয়ার মাঝে শিরদাঁড়া সোজা করে সটানভাবে দাঁড়িয়ে, বিস্তৃত চাঁদের দিকে চেয়ে তীক্ষ্ণ চোয়াল শক্ত করে আওড়ায়,
“রক্তের ঋণ রক্তেই মেটাবো। খেলা তো কেবল শুরু…!”
কেকে থামল। ক্রমশই তার চোয়াল আরো বেশ খানিকটা দৃঢ় হলো। হুট করেই কোত্থেকে যেন সকল রাগ-ক্ষিপ্ততা উগ্রে এসেছে। চোখের সামনে ভাসছে একের পর মৃতদেহ। যাদের মৃত্যুতে সে সরাসরি সাক্ষী না রইলেও, তাদের সেই মৃত্যুর শেষ মূহুর্তের আর্তনাদ গুলো তার ভেতরের ক্ষিপ্ত নেকড়ের ন্যায় হিং”স্রতাকে আরো তীব্র ভাবে জাগিয়ে তুলছে। ফর্সা হাতের নীলচে শিরাগুচ্ছ ফুলে উঠছে দৃঢ়ভাবে। অথচ এমন হিমশীতল আবহের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই শক্ত-পোক্ত মানবের ঠোঁটের কোণে অচিরেই ক্ষীণ তির্যক হাসির দেখা মিলল। নিজ কন্ঠস্বর ভারী করে অশরীরির প্রগাঢ় ছায়ার ন্যায় হিসহিসিয়ে চাপা স্বরে আওড়াল,
“And now, it’s my turn. I don’t play games; I end them. Welcome to my dark hell!”
হুট করে তার এমন রূপ পরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেকে জানে নিজেকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সে এ-ও জানে,এই খেলায় জিততে হলে কেবল রাগ-ক্ষোভ কিংবা হিংস্রতা দিয়ে নয় বরং ঠান্ডা মাথায় খেলে যেতে হবে। আর এটা বোধ-হয় তার চেয়ে ভালো আর কেউ খেলতে পারবে না। কারণ শিকারগুলো তো সবই বড় মাপের। কেউ হয়তো কল্পনাতেও ভাবতে পারছে না, তিনটা মৃত্যুর পেছনে ঠিক কতবড় সাজানো গেইমটাই না খেলা হয়েছে। অথচ যা বছরের পর বছর মানুষের কাছে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছে। সবমিলিয়ে এইটুকু তো বলাই চলে,এই কাহসান কুঞ্জ কেবল শহরের একটি বিলাসবহুল আবাসস্থল নয় বরং এটি একটি মৃত্যু-কুঞ্জ। যাতে বহুপুরোনো মৃত্যু-রহস্যরা আজও অমীমাংসিত হয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সকাল সাড়ে নয়টা। আড়মোড়া ভেঙে সুহিনের ঘুম ভাঙল। তবে চোখদুটো যেন কোনোমতেই খুলতে পারছে না। বিছানা হাতড়ে মাথার কাছ থেকে চশমাটা তুলে নিয়ে চোখে ঠিকমতো পড়ে নিল। তবে শোয়া হতে বসা মাত্রই সে বিস্ময়ে চমকে উঠল।
—“গুড মর্নিং, ব্লু-বেরি!”
কেকে তার মাফিনের খাঁচার কাছে দাঁড়িয়ে। কি করছিল বলা মুশকিল, কেননা দিনের বেলায় স্বাভাবিকভাবেই মাফিন এখন ঘুমে। আর সে ওঠামাত্রই পেছন না ফিরেই, কেকে তাকে তার বিশেষিত এমন অদ্ভুতসব সম্বোধনে ডেকে বসল।
সুহিন কোনো জবাব না দেওয়ায়, কেকে পেছন ফিরে তাকায়। এলেমেলো গাঢ় বাদামী চুল,চশমাটাও বাঁকা ভাবে পড়েছে। তার উপর সুহিনের এমন ভীতু ভীতু ভাবভঙ্গিতে সহসাই সে ভ্রু উঁচিয়ে, শুষ্ক-ভগ্ন স্বরে বলল,
“আর ইউ ওকে,লিটিল হ্যামস্টার?”
আবারও! সুহিন শুষ্ক ঢোক গিলল। এই লোকের কি আর কোনো কাজ নেই। শুরুতে চশমিশ বলে ভার্সিটিতে পুরো ক্লাসের মধ্যে অপমান করল। এরপর আবার ঢং করে ব্লু-বেরি চিজ কেক দিতে এসে, তাকে ব্লু-বেরি বলে ডাকার নাম করে শাসিয়ে গেল। আবার বিশেষ ট্রিটমেন্ট সরূপ মাঝেমধ্যেই ‘গাধা’ বলে সম্বোধন করার ব্যাপারটা তো আছেই। এখন আবার লিটিল হ্যামস্টার! এই বান্দা কি তাকে ডাকার জন্য নামের পুরো ফ্যাক্টরি খুলে বসেছে?
সুহিন কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলেও, আপাতত ভাবছে ভিন্ন কিছু। কেকের নজর তার পাশাপাশি তার মাফিনের উপরও পড়েছে। হয়তো নিজের কুকুরের জন্যই। কখন না জানি,ঐ বজ্জাত কুকুরটার পেটে পুরে দেবার জন্য মাফিনকে নিয়ে কেটে পড়ে। সে যেটাই হোক, হাবভাব তো ভালো না। এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
—“গাধা, কানে শুনিস না? দুবার কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি,একবারও উত্তর দিসনি।”
সুহিন চমকে ওঠে। ধ্যান ভাঙ্গতেই দেখে কেকে তার নিকটে সম্মূখে দাঁড়িয়ে। এ্যাহ্,ইনি আবার কখন তার এতো কাছে এলো। সুহিন শুষ্ক ঢোক গিলে,মুখ তুলে রাগান্বিত কেকে’কে দেখল। বরাবরের মতোই শান্ত-তীক্ষ্ণ চাহুনি। তবুও তাতে অদ্ভুত এক শীতল হিং’স্রতা বিরাজমান। বলা চলে এই চোখদুটোই যেন সুহিনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এক’বারের চেয়ে দুবার তাকালেই, শ্বাস-প্রশ্বাস থমকে যায়। গলা শুঁকিয়ে কাঠ হয়, জানপাখিটাও যেন উড়ে পালাতে পারলেই বাঁচে।
—“হানি!! হয়েছে কি তোর?”
সুহিন পুনরায় চুপ দেখে, কেকের কপালে ভাজ পড়ে। একইসাথে আচমকা ভ্রুকুটি করে,নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়। সুহিনের কপালে হঠাৎ হাত ছুঁইয়ে কিছু একটা পরখ করে রুক্ষ স্বরে বলে,
“The temperature is okay. But why are you acting like a stupid!”
সুহিন থতমত খেয়ে, মিনমিনিয়ে আওড়াল,
“আ…আপনি এখানে…?”
—“হ্যাঁ,আমি এখানে…পারমিশন নিতে হতো?”
—“আ…না, মানে…”
সুহিন কথা শুরু হবার আগেই, কেকে ভারী শ্বাস ফেলে তার মুখোমুখি হয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সহসাই সুহিন চমকে উঠে,পিছিয়ে বেডের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মিশে গেল। কেকে বিরক্তিতে ভ্রু উঁচিয়ে চোখ ছোট ছোট করে, তীক্ষ্ণ নজরে তাকে একপলক দেখে নিয়ে,পুনরায় ভারী শ্বাস ফেলল। পকেট হতে কিছুটা বের করে, আচমকা সুহিনের বাম হাতটা টেনে নিল।
সুহিন এতে হকচকিয়ে গিয়ে বলে উঠল,
“আ…আ…এটা কি করছেন…!”
কেকে কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। সে আচমকা সুহিনের বাঁ হাতের অনামিকায় পরিয়ে দিল হীরাখচিত এক উজ্জ্বল প্লাটিনাম রিং। অভাবনীয় এই কাণ্ডে সুহিনের অবস্থা তখন নাজেহাল—বিস্ময়ের ঘোরে তার দম আটকে আসার উপক্রম! অথচ সেসবের দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কেকের। সে তখন নিবিষ্ট মনে পরখ করে দেখছে, আংটির মধ্যিখানে বসানো এই রহস্যময় কৃষ্ণহীরাটি সুহিনের আঙুলে ঠিক কতটা রাজকীয় আভিজাত্যের সহিত মানিয়েছে।
—“ডু ইউ লাইক ইট,হানি?”
সুহিন বিস্ময়ের নজরে একবার কেকে’কে দেখছে তো একবার নিজের হাতের রিংটাকে। সে খানিক শুষ্ক ঢোক গিলে,কেকের উদ্দেশ্যে বিস্ময়ের সাথে বলে,
“ব্ল্যাক ডায়মন্ড? এটা কি আসল?”
তার কথার ভঙ্গিতে কেকের দৃষ্টিজোড়া তীক্ষ্ণ হলো। খানিকটা রুক্ষ স্বরে জবাবে বলল,
“না, প্লাস্টিকের।”
তার কথায় সুহিন আশ্বস্ত হয়। ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিয়ে মিনমিনিয়ে আওড়ায়,
“এটা তো অনেক সুন্দর। কিন্তু… ”
—“কিন্তু কি?”
—“আ…মানে…”
সুহিন বারংবার নিজের নজর সরিয়ে নুইয়ে পড়ছে বিধায়, কেকে আচমকাই রুক্ষ-নিরেট কন্ঠে হিসহিসিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল,
“আইজ অন মি, ইউ ফাকিং লিটিল হ্যামস্টার!”
সুহিন চমকে মুখ তুলে সরাসরি কেকের দিকে তাকায়। সহসাই তার হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়। বারংবার উসখুস করলেও, নিজেকে শান্ত রাখার সর্বচ্চ চেষ্টা করে। এরিমধ্যে কেকে তার হাতটা আবারও টেনে নিয়ে, আংটিতে খোচিত বড় আকৃতির কালো হীরেটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কয়েকবার আলতোভাবে ঘষে বলতে লাগল,
“ইউ নো হোয়াট, ব্ল্যাক ডায়মন্ডকে ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে মিস্ট্রিয়াস ডায়মন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যাস্ট লাইক ইউ।”
কেকে সুহিনের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসে। হাসিটা স্বাভাবিক হলেও,সুহিনের কাছে কেন জানি এই হাসিটাই রহস্যময় ঠেকল। কেকে কিছুটা থেমে আবারও বলল,
“এই রিংটায় ব্ল্যাক ডায়মন্ডটি ব্যতীত তার আশেপাশে সবমিলিয়ে আরো বত্রিশটি সাদা হীরে খচিত আছে। এটা কেন জানিস?”
—“কে…কেনো?”
সুহিনের ফ্যালফ্যাল চাহুনি ও বোকার মতো হাবভাবে কেকে ক্ষীণ হেসে বলল,
“উমমম…বিকজ আই’ম নাউ থার্টি টু।এন্ড দিস ব্ল্যাক ডায়মন্ড ইজ ইউ।”
—“…..”
—“হানি!”
—“হু!”,সুহিন আনমনে আওড়ায়।
—“বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাম হাতের অনামিকায় আংটি পরার রেওয়াজ বেশি। এর পেছনে একটি প্রাচীন রোমান বিশ্বাস কাজ করে। প্রাচীনকালে ধারণা করা হতো যে, বাম হাতের অনামিকার একটি শিরা সরাসরি হৃদপিণ্ডের সাথে যুক্ত। একে ল্যাটিন ভাষায় ‘ভেনা আমোরিস’ বা ‘ভালোবাসার শিরা’ বলা হয়। যদিও বিজ্ঞানে এর কোনো ভিত্তি নেই, তবে মানুষ প্রাচীন কাল থেকেই আবেগের তাড়নায় এইকাজটা করে আসছে।…বাট ইউ নো হোয়াট? আই হ্যাভ নো ইমোশন।”
কেকের কথা তার ঠিক বোধগম্য হলো না। সুহিন চুপসে গিয়ে কেবল রিংটা দেখল। সারা গা উসখুস করছে। কেকের এমন নরম সরম ভাবভঙ্গি তাকে আরো বেশি ভড়কে দেয়। একইসাথে তার বাম গালে ও চিবুকের সদৃশ্য তিল দুটো অদ্ভুত এক অনুভূতি জাগায়। না চাইতেও অদ্ভুত এক দূর্বলতা সরূপ কালচে তিলক দুটিতে নজর পড়ে যায়।
সুহিনের এই উসখুসে ভাবনার মধ্যেই কেকে তার নিজস্ব গাম্ভীর্যে ফিরে এসে, তীক্ষ্ণ স্বরে হাস্কি কন্ঠে বলল,
“জানতে চাইবি না, এই রিংটা এই মূহুর্তে তোকে কেনো পড়ালাম?”
কেকের কন্ঠস্বরে সুহিন ভড়কে গিয়ে,চকিতেই মুখ তুলে তাকাল। কেকে পুনরায় রহস্যময় ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বলল,
“আজ তোকে দেখতে পাত্রপক্ষ আসবে। আশা রাখছি,বিশেষ কেউ-ই তোর জন্য সিলেক্টেড হবে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল তোর এনগেজমেন্ট। তখন অবশ্য রিংটা খুলে রাখতি পারিস। কিন্তু আমি চাইনি আমার আগে অন্য কেউ তোকে রিং পড়িয়ে যাক।”
সুহিন খানিকটা বিস্ময়ের সাথে ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“আপনি এসব কি করতে চাইছেন?”
—“কিছুই না, কাল এনগেজমেন্ট হয়ে গেলে পরশু তোর মেহেন্দী,গায়ে হলুদ ব্লা ব্লা…তারপর সোজা বিয়ে।”
—” দেখুন আমি জানি না আপনার মাথায় কি চলছে,কিন্তু বিশ্বাস করুন…আমি এই নোংরা খেলা খেলতে পারব না।”
সাহস করে এই বলেই সে কেকের দিকে ভীতু চাহুনিতে তাকিয়ে রইল। না জানি এবার কি বলে বসে। কেননা কেকের তীক্ষ্ণ শীতল চাহনি তার দিকেই বিচরণরত।
কেকে কিছুটা সময় নিয়ে, জিভের অগ্রভাগ দ্বারা গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করে কিছু একটা ভাবল। অচিরেই ক্ষীণ তির্যক হেসে, তাচ্ছিল্য সরূপ মাথা ঝাঁকিয়ে আওড়ায়,
“I see…!”
এই বলেই সে নিজের ফোনটা বের করল। সুহিন খানিক সংকোচিত হলো তার ভাবভঙ্গিতে। কেকে সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে নামহীন একটি অজ্ঞাত নাম্বারে কল দিয়ে,সুহিনের উদ্দেশ্যে ইশারা করল,
“হুম,কথা বল।”
সুহিন হকচকিয়ে গেল তার কথায়। কার সাথে কথা বলতে বলছে? সে ইতস্তত হয়ে ফোনটা হাতে নেয়। নাম না থাকায় চেয়েও বুঝল না ব্যক্তিটা কে! তবে তাকে চমকে দিয়ে সহসাই ফোনের অপর প্রান্ত হতে একটি পরিচিত রুগ্ন কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
” আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?”
সুহিন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে কেকের দিকে তাকায়। কেকে নির্বিকার ; তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শক্ত চোয়াল। ভাবগাম্ভীর্য বরাবরের মতোই নিগূঢ়-শীতল। ভেতরে হিংস্রতা নাকি চতুরতা একত্রে বিরাজিত—সেটাও বোঝা মুশকিল।
—“হ্যালো,শুনতে পারছেন…কে আপনি…”
—“আরহাম ভাই…! আপনি ঠিক আছেন?”
সুহিনের কন্ঠস্বরে দানিয়েল থমকে গেল। কিছুটা সময় নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
“বউপাখি! তুমি…আগে বলো তোমার ফোন কোথায়? আমি গতরাত থেকে তোমায় লাগাতার ফোন দিয়ে যাচ্ছি অথচ তোমার কোনো খোঁজই নেই। তুমি ঠিক আছো তো? এটা কার ফোন? এতো হেলাফেলা কেনো করো মেয়ে? এমনিতেই মরতে মরতে বেঁচে আছি। তুমি কি চাচ্ছো, আমি একবারেই মরে যাই?”
সুহিন ভীতু চাহনিতে একবার মুখ তুলে কেকে’কে দেখল। তার তীক্ষ্ণ চোয়াল খানা অজান্তেই দৃঢ় হয়ে গিয়েছে। ভাবভঙ্গি এমন যেন এখনই কাউকে চিবিয়ে খাবে। তবুও নিজেকে যথা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করছে।
সুহিন আর বেশিক্ষণ তার হিংস্র শীতল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে না পেরে,চোখ নামিয়ে নেয়। দানিয়েলের রূগ্ন কন্ঠস্বরে কিছুটা বিচলিত হয়ে আওড়ায়,
“আপনার কি হয়েছে? আপনার কন্ঠস্বর কেনো এমন শোনাচ্ছে? আপনি জানেন, আমি গতকাল সকালে আপনাকে কতবার কল করেছি৷ অথচ আপনি একবারের জন্যও ফোন তোলেননি। আর আপ…আপনি…আপনি ঠিক আছেন? একটু আগে কিসের কথা বলছিলেন? আপনাদের তো বাড়িতে ফেরার কথা ছিল।…নিমরা…নিমরা ঠিক আছে?”
সুহিনের বোধহয় আরো বিশেষ কিছু বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সম্মূখে এই গম্ভীর নেকড়ের ন্যায় বসে থাকা মানবটার ভয়েই আপাতত আর সেই বিষয়ে কিছু বলতে পারল না। উল্টো সব কথাই কেমন যেন গুলিয়ে গেল।
—“আ…নিমরা ভালো আছে। কিন্তু আমার…”
দানিয়েল দ্বিধাবোধে সুহিন হকচকিয়ে যায়। উদ্বিগ্ন স্বরে শুধায়,
“আপনার কি হয়েছে?”
—“তেমন কিছু তো না…বাড়ি ফেরার পথে একটা ছোট্ট এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। মাথার একপাশটা বেশ খানিকটা চোট লেগেছে। খানিকক্ষণ সেন্সলেস ছিলাম, এই যা। যাই হোক,এখন একদম ঠিকঠাক। তুমি চিন্তা করো না।”
সুহিন দানিয়েলের কথাগুলো শুনতে শুনতেই,মুখ তুলে কেকে’র দিকে তাকাল। বিস্ময়ের চাহনিতে তার ভাবগম্ভীর্য পরখ করল। ছোট্ট এক্সিডেন্ট,মাথায় চোট, সেন্সলেস হওয়া ; না, সবটা স্বাভাবিক নয়। এমন আরো একটা ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটেছে। আর তখনও কেকে’র ভাবগম্ভীর্য ছিল এমনটাই।
—“বউপাখি!…বউপাখি শুনতে পারছো…”
সুহিন স্তম্ভিত হয়ে কেকে’কে দেখছিল। তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দানিয়েল তখন তাকে নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্বোধনে ডেকে চলেছে। সুহিন হুঁশ ফিরে পেয়ে কিছু বলবে,তার আগেই কেকের তার কাছ থেকে ফোনটা আলগোছে কেঁড়ে নিল। দানিয়েলের ভেসে আসা কন্ঠস্বরের সমাপ্তি ঘটিয়ে কলটা কেটে দিল। একইসাথে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিস্তৃত এক রহস্যময় তির্যক হাসি। যা দেখে সহসাই সুহিন রাশভারি সন্দিহান কন্ঠে আওড়াল,
“তারমানে জোয়ার এক্সিডেন্টটাও…”
সুহিনের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, কেকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে অকপটে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আই অলসো ডোন্ট লাইক হার।”
সুহিনের চোখজোড়া বিস্ময়ে কোটর হতে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে স্তম্ভিত স্বরে আওড়াল,
“কেনো করছেন এসব?”
Naar e Ishq part 13
—“তো আর কি করব? টেকনিক্যালি, লাস্ট নাইট ওয়াজ সাপোজড্ টু বি আওয়ার ফার্স্ট নাইট। কিন্তু তুই কি তা হতে দিয়েছিস?”
সুহিন বলার মতো আর কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। ততক্ষণে কেকে আবারও ভগ্নস্বরে অকপটে বলতে লাগল,
“Baby girl, my fu*king darkness, I am not the villain of your story; I am the ending of it.”

Er por er part kobee asbe please bolben??