The Silent Manor part 70
Dayna Imrose lucky
সকালটা নিতান্তই একা। প্রতি সকাল যেন একটি সোনালী আলোরেখা সূর্য নিয়ে হাজির হয়।যার সবটুকু উষ্ণতা গলে পড়ে ভুবনের মাঝে।সাড়া দেয় নতুন একটি দিন।আজ আর সে-ই সূর্য কিরণ নিয়ে হাজির হয়নি। সকালটা কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে।
গতকাল অবধি চৌধুরী বাড়িটি জুড়ে ছিল হইহুল্লোড় আমেজে উন্মাতাল।আজ তা কেবলই নিস্তব্ধ আঙ্গিকারে ঘেরা।এটাই কি হওয়ার কথা ছিল!শূন্যতা ঘেরা স্বপ্নগুলো হাতছানি দিচ্ছে চারপাশে। দেওয়ারই কথা। কিছু নিয়তি কেবল নির্মম পরিহাস নিয়ে উঁকি দেয়।যা সৃষ্টি করে অসহ্য তীব্র ব্যথা।আজ সে-ই ব্যথা উঁকি দিচ্ছে সবার মনে।
শহর থেকে ডাক্তার – গ্রামের অন্যতম হাকিম কে আনা হয়েছে।উনারা জানান মায়া আর কথা বলতে পারবে না।অতিরিক্ত আ’ঘাতজনিত ধাক্কা (শক)পেলে মানুষের শরীরে এমন কিছু গুরুতর পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে অনেক সময় সে কথা বলতে পারে না। শক- আসলে এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো-বিশেষ করে মস্তিষ্ক-পর্যাপ্ত র’ক্ত ও অক্সিজেন পায় না। এর প্রভাব সরাসরি মানুষের সচেতনতা, চিন্তা-ক্ষমতা ও কথা বলার সক্ষমতার ওপর পড়ে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শকের সময় র’ক্তচাপ হঠাৎ করে অনেক কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কে র’ক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ না করলে মানুষ অস্পষ্ট হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায় অথবা একেবারেই কথা বলতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগী শুধু চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম হয়।
এছাড়া শকের কারণে স্নায়ুতন্ত্র সাময়িকভাবে বিকল হয়ে যেতে পারে। কথা বলার জন্য জিহ্বা, গলা ও মুখের পেশি এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর সমন্বয় দরকার। শকের প্রভাবে এই সমন্বয় নষ্ট হলে মানুষ কথা বলার শক্তি হারায়।
কিছু ক্ষেত্রে শক মানসিক কারণেও হতে পারে। ভয়া’বহ দুর্ঘ’টনা, প্রিয়জনকে হারানো বা চরম মানসিক আ’ঘাতের পর কেউ কেউ গভীর মানসিক শকে পড়ে যায়। তখন শারীরিকভাবে সব ঠিক থাকলেও মানুষ কথা বলতে পারে না। একে মানসিক শকজনিত নীরবতা বলা হয়।
আবার গুরুতর আঘাত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাথায় আঘাত বা স্ট্রোকের মতো অবস্থাতেও শক তৈরি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কথা বলতে না পারা একটি বিপজ্জনক লক্ষণ, যা জীব’নহানির ইঙ্গিতও হতে পারে।
ডাক্তার এবং হাকিম এসব জানান। ডাক্তার কে গতকাল রাতেই কল করা হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য শুনে সবাই থমকে যায়। শালুক তখন বারেবারে বলছিল আমার মীর কে একটু দেখুন।ও হয়ত বেঁচে আছে। চিকিৎসা করালে হয়ত বাঁচবে। ডাক্তার বলেছে মীর আর বেঁচে নেই।শত চেষ্টা, ডাক্তার, কবিরাজ যা দেখান না কেন,সে আর বেঁচে উঠবে না।
তাঁর বক্তব্য শুনে পুরোপুরি সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। রাফিদ ও আহির পাশাপাশি বসা।মীর এর মৃ’ত দেহটা বৈঠকখানার মেঝেতে রাখা।সাদা চাদরে ঢাকা তাঁর দেহ খানি। গ্রামের মানুষজন উঠোনে এসে ভীর জমিয়েছে। গতকাল সদ্য বিবাহিত দম্পতির তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদে যেন সবাই কাতর।ভাবছে- বলাবলি করছে- কেউ কেউ মুখে শাড়ির আঁচলখানা চেপে ধরে চাপা কণ্ঠে কাঁদছে। গতকাল বিয়ে হল, নতুন জীবনে পা রাখল, তখনই যে মৃ’ত্যু এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে পড়ল।মীর কে সৃষ্টিকর্তার জিম্মায় নিতে হাজির হয়েছিল।নিয়েই নিল শেষমেশ।
রাফিদ বসা থেকে উঠল।মীর এর দেহের পাশে বসে।সাদা চাদরটা মুখের উপর থেকে সরিয়ে ফেলল।রত্নখচিত পেনডেট লকেটা খুলে নিয়ে মেঝেতে ধাপ করে বসে। আমজাদ তাকালেন সেদিকে। রাফিদ বলল “মীর কে সম্রাট নিষাদ এর বংশধর-দের মধ্যে কেউ মেরেছে।হয়ত তাঁর লক্ষ্য ছিলাম আমি। কিন্তু শেষমেশ তাঁর শিকার হল মীর।”
“হয়ত না!তুই ছিলিস তাঁর লক্ষ্য।আর এই খু’নটা করেছে কাবির হোসেন।উনিই ছিলেন ছদ্মবেশী সম্রাট নিষাদ এর বংশধর।আজ সকালে উনার ঘরে গিয়ে দেখি উনি নেই।একটা চিঠি ছিল শুধু। বালিশের নিচে। সেখানে সব সত্য বলে গেছেন।উনি ভীষণ চালাক।”
থেমে আহির ব্যতীত কণ্ঠে পুনরায় বলল “সেদিন আমরা সাথে করে যমদূতকে নিয়ে এসেছিলাম। দুধকলা দিয়ে সা’প পুশেছিলাম।”
আমজাদ একবার মীর, দ্বিতীয়বার তাকালেন থমাস শন এর দিকে। নিজেকে নিজের কাছে অপ’রাধী মনে হচ্ছে। তাঁর তীব্র কষ্ট হচ্ছে। থমাস শন এর জায়গায় নিজেকে বসালেন।মীর এর নিথর দেহটার স্থানে রাফিদ কে বসাল। হ্যাঁ! কল্পনায় উনার সন্তান মা’রা গেছেন ভাবতেই উনি ভেতরে ভেতরে ম’রে যাচ্ছেন। তাৎক্ষণিক সে কল্পনার জগত থেকে ফিরে আসেন।চোখ ফেলল মায়ার দিকে।এক রাতেই তাঁর চোখ মুখ,রুপ, সৌন্দর্য সব যেন বিসর্জন দিয়েছে। আমজাদ কম ম’রছেন না।মীর কে নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতেন।চলে গেছে সে, তাঁর একমাত্র কন্যাকে চিরশূন্য করে।বুকটা ফেটে যাচ্ছে তাঁর। আমজাদ চোখ থেকে বড় হলেন,এই অবধি বয়সসীমা পাড় করলেন, কখনো কষ্ট, যন্ত্রনায় সেভাবে ছট’ফট করেননি।দুঃখ ব্যতীত জীবন হয় না। তাঁর ও দুঃখকষ্ট ছিল, তাঁর বাবা,ভাই দুনিয়া থেকে যেদিন বিদায় নিয়েছে,সেদিন তিনি বুক থুবড়ে কেঁদেছিলেন ঠিকই। তবে আজকের দিনের মত করুণ, মাত্রারিক্ত কষ্ট তার হয়নি। কাঁদতে ইচ্ছে করছে তাঁর। বন্ধ ঘর দরকার।যেখানে বসে কাঁদলে তাঁর কান্না কেউ শুনতে পাবে না।গ্রাম বাসীরা দেখবেন না।সবার সামনে কাঁদলে বাঁচ্চাপা’গল বলবে যে। আমজাদ মাথাটা দুদিকে হাল্কা নাড়ান। চোখে অজস্র জল। একফোঁটা জল ছিটকে পড়ল ছড়ি ধরা হাতটির উপর। সচরাচর ছড়িতে ভর দিয়ে চলেন না তিনি।আজ ভর দিচ্ছেন। শরীরের শক্তি যে গতকাল রাতেই ফুরিয়ে গেছে।
বুলবুল দেখছে মীর কে।বাড়ি ফিরেছে বেশিক্ষণ হয়নি। বাড়ির চৌহদ্দি অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করতেই তখন বাড়িভর্তি মানুষ দেখে চোখ নড়বড়ে হয়ে যায়।ঘরে ঢুকেই সাদা চাদরে কাউকে ঢেকে রাখা দেখল।বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠেছিল ওঁর। শালুক এর পাশে এসে বসে। বুলবুল আস্তেধীরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল তাঁকে “কে মা’রা গেছে?
শালুক জবাবে শুধু নীরবে মীর এর লা’শটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।চোখ দুটো ফুলে গিয়ে ভ্রু ছুঁয়েছে তাঁর। বুলবুল কারো থেকে কোন জবাব না পেয়ে নিজেই চাদরটা তুলে মীর কে দেখল।মীর কে দেখেই ও দূরে ছিটকে সরে যায়। কান্না শুরু করেছিল।মীর এ বাড়িতে আসার পর থেকেই ও তাঁর পেছনে পড়ে থাকত।এটা ওটার ভয় দেখিয়ে টাকা চাইতো। সবসময় মীর এর উপর নজর রাখত,যা সবটাই ছিল ওঁর আর মীর এর খুনসুটির একটা অংশমাত্র।আজ সে-ই অংশটি যেন হারিয়ে গেছে ওঁর কাছ থেকে।
মসজিদ থেকে মৌলভী সাহেব এসেছেন। তিনি আমজাদ এর দিকে এগিয়ে যান।বলেন “লা’শ বেশিক্ষণ রাখা ঠিক না।যত দ্রুত দাফন দিবেন ততই উত্তম। আপনি বললে আমি কব’র খোঁড়ার ব্যবস্থা করি! বাঁশ কাটতে হবে। দু’জন অনুচর কে বলে বরই পাতা গ’রম জলের ব্যবস্থা করি।”
আমজাদ তাকান মৌলভীর দিকে। তাঁর চেহারাটা কেমন বিমর্ষ হয়ে গেছে।চোখ জোড়া টকটকে লাল। মেঝেতে পড়ে থাকা মীর এর দিকে তাকাল একবার। বললেন “আপনি ব্যবস্থা করুন।” কথাটা শুনলেন শালুক। মাথা তুলে তাকালেন আমজাদ এর দিকে। তার মীর কে মাটির ঘরে একা ফেলে রেখে আসবে,আর আসবে না তাঁর কাছে, ফিরবে না মীর।চলে গেছে চিরতরে মীর। ভাবতেই শালুক প্রতিবার ম’রে যান। কেবল তাঁর দেহটা পড়ে আছে সবার সম্মুখে। কেঁদে উঠেন বারবার।বাড়ির প্রতিটি মানুষের চোখেই জল, অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে আছেন গ্রাম বাসীরা। আলিমনগর গ্রামে যেন হট্টগোল লেগে আছে।দূর দূরান্ত থেকে যারা শুনছে তাঁরাও ছুটে আসছে মীর কে দেখতে।
বেলা গড়াচ্ছে।একদল কব’ব খোঁড়ার কাজ সম্পন্ন করছে। একদল বাঁশ কেটেকুটে সাজাচ্ছে। বুলবুল বাজার থেকে কাফনের কাপড় কিনে এনেছে।আতর! সুরমা! শেষ বিদায়ের সাজে যা দরকার।আজ যেন মীর কে আরেকবার পূর্বের দিনটির মতন সাজাতে হবে। বুলবুল কাঁদতে কাঁদতে তখন বাজার থেকে ফিরেছে।এইতো গত পরশু সন্ধ্যায় মীর ওর সাথে একটি দুঃস্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করছিল। ‘জানিস বুলবুল, আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।এই বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে,অথচ আমি কারো শেষ বিদায়ের আয়োজন দেখছি।’ কথাটা যেন বুলবুল এর চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করছিল।মীর এর সে-ই স্বপ্ন আজ সত্যি হয়েছে।
বুলবুল চোখের জল মুছে সামলে নিল নিজেকে।মীর কে গোসল করাবে।বরই পাতার জল গ’রম করা হয়েছে।একদল লোক মীর এর লা’শ নিতে ঘরে প্রবেশ করল। শালুক তা দেখে লাফিয়ে পড়ল মীর এর উপর। তাঁকে কিছুতেই নিতে দিবেন না। তাঁর কান্নার শব্দে চারপাশ দোলে উঠল। তৃষ্ণা, গৌরী, শাহানারা, তারা এসে সামলায় শালুক কে। শালুক মীর কে ছাড়তে চাইলেন না। তবু তাঁকে ছাড়তেই হল। গৌরী ওঁরা খুব কষ্টে শালুক কে সরাল।
মসজিদ থেকে নিয়ে আসা খাটিয়ায় করে মীর কে চিরতরে ঘর থেকে বের করল।এই যে সে বের হল আর কোনদিন ফিরবে না, ফিরতে পারবে না এই ঘরে। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন চলছে একান্তই তাঁর ঘরে।
কিছু লোক মিলে মীর কে পর্দাঘেরা স্থানে নিয়ে গেল। তাঁকে গোসল করানো হয়। উষ্ণ গরম জলে তাঁর পুরো শরীর ধুয়েমুছে সাফ করল। মৌলভী সাহেব গোসল শেষে খুব সুন্দর করে সাদা চকচকে কাপড়টি মুড়িয়ে দিল তাঁর শরীরে।
মীর এর শেষ আয়োজনটি দূর থেকে দেখছেন থমাস। একজন বাবার চোখের সামনে সন্তানের মৃ’ত্যু দেখা বড়ই অদ্ভুত কষ্টদায়ক ব্যাপার।
আমজাদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।আজ তাকে ছড়ি এবং বুলবুল এর সাহায্যে দাঁড়াতে হলে। শালুক এর কাছে যাবেন।সে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছেন।মীর বিদেশ ফিরে যাবে বলে শালুক কষ্ট পেতেন।খুব করে চাইতেন মীর যেন গ্রামে থেকে যায়। কাছছাড়া কোন মতেই করতে চাইতেন না।আজ তাঁর ছেলে তাঁর কোল থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল যে। তাঁর মুখটির দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আমজাদ কাঁপা কাঁপা পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন।গিয়ে হঠাৎ থম মেরে দাঁড়ালেন।
মায়াকে খুঁজল। এতক্ষণ মায়া এখানেই বসা ছিল।এখন দেখছেন না।শোকে কি করে বসে ভেবে আমজাদ বিস্ফারিত চোখে দোতলা,ছাদ, এদিক ওদিক তাকালেন। কোথাও নেই। রাফিদ কে লক্ষ্য করে বললেন “মায়া কোথায়!”
“এইতো এখানেই ছিল” বলে সেও তাকায়।দেখল না। আমজাদ পুনরায় বললেন “দ্রুত দেখ ও কোথায়, কিছু করে বসল না তো” আমজাদ থেমে যেতেই রাফিদ,আহির ছুটে দু’জন ঘরের বাইরে, একজন উপর তলার দিকে যেতেই চোখ পড়ে দোতলার দিকে। চোখের কর্ণিয়ারে সাদা রঙের কিছু একটা দেখে প্রথমে দাঁড়াল স্থির হয়ে রাফিদ।আহির ও দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে দোতলার দিকে দেখল।মায়া সাদা রঙের শাড়ি পরে রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো।সাজগাছ, গহনা, কিচ্ছুটি নেই শরীরে। রাফিদ দম ফেলে বাবা বলে নরম কণ্ঠে ডাকে মায়ার দিকে চেয়েই। আমজাদ তাকান। সে-ই সাথে সবাই তাকালেন।হঠাৎ সবার চোখে পড়ল,আজ মায়া অন্যরকম সাজে। অন্যরকম রুপে। রঙিন দিনের মেয়েটি যেন এক মুহূর্তে রঙহীন হয়ে গেছে। পরনে সেই বিধবার শাড়ি, সাদার ভেতর মিশে আছে নিঃশব্দ শোক।যে মানুষটির হাসিটা একদিন উঠোন ভরিয়ে দিত, আজ তার হাসিটা শুধুই আক্ষেপ।তার হাসির জায়গায় বসেছে গভীর, অচেনা শূন্যতা। চোখ দুটো অবশ এর মত তাকিয়ে আছে- কোথাও নয়, কারও দিকে নয়।কি-ই বা সে দেখবে ,সব দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে যে।
তার পরনের শুধু কাপড় বদলায়নি, বদলে গেছে জীবন। শব্দহীন কান্না গালের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে, কিন্তু ঝরে পড়ার অনুমতি পাচ্ছে না। চারপাশে আপনজনেরা আছে, তবু সে একা ভীড়ের মাঝেই তার নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাফিদ ফিসফিসিয়ে বলল ‘মায়া’।সে মায়া বলতেই মায়া উদ্ভ্রান্তের মতন দৌড়ে ছুটে গেল তাঁর ঘরে।ঘরে ঢুকেই দরজাটা কপাট করে আটকে দিল।ঘরের ভেতরের স্মৃতিঘেরা সে-ই ইট পাথরের দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়ল।মন খুলে কাঁদছে।মীর এর গায়ের গন্ধটা এখনো তাঁর হাতে মিশে আছে,অথচ মানুষটিই নেই।সে ভাবতে পারছে না। শরীর ধীরে খা’রাপ হচ্ছে তাঁর। উপলব্ধি করতে পেরেও পারছে না।
মীর আদ্রিয়ান এর নাম করে দুটো চিঠি পাঠিয়েছিল।একটা পড়েছিল।একটা এখনো পড়েনি।চিঠির কথা মনে পড়তেই বসা ছেড়ে উঠে খাটের দিকে গেল। বালিশের নিচে চিঠিটা। হাতটা কাঁপছে। কাঁপা হাতেই চিঠিটা খুলল। প্রথমে উল্টো করে ধরছিল।পড়ে ঠিক করে ধরল। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উচ্চারণ করতে পারছে না অক্ষর গুলো। চোখ বুলিয়ে মনে মনে পড়তে শুরু করল “
. প্রিয় মায়াবতী।
আমি আদ্রিয়ান ওরফে মীর জাফান শন।চিঠির শুরুতে অদ্ভুত শব্দ।তাই না?হুম! অদ্ভুত। আমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়গুলো এই বিস্ময়কর শব্দেই ঘেরা। আমার জীবনটা বড্ড অন্ধকার নির্বিঘ্ন। প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অন্ধকার কুঠুরিতে।ভাবছো, সেই অন্ধকার এর রহস্য কি? আমার মা।যবে থেকেই জানতে পেরেছি আমার মা নেই, সেদিন থেকেই আমি মীর বেলাগাম। কতরাত একাকী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করেছি জানবে না।কত কষ্ট রোজ পোহাই জানবে না। এতিম হওয়ার কষ্ট সেই বুঝে,যে এতিম। আমার সব আছে, বাড়িগাড়ি,টাকা পয়সা।বাবা আছেন। বড্ড ভালোবাসেন আমাকে।ছোট মা ভালোবাসেন।তবু যেন খামতি থেকেই যায়।আর সে-ই খামতিটাই না, আমাকে খুব জ্বালাতন করত।দিন-সময় এভাবেই পাড় হতে লাগল। তুমি আমি ছোট থাকতে,ছোট মা ঠিক করেন বড় হয়ে আমি যেন তোমাকে আমার বউ করি। ভালোবাসা উপলব্ধি সময়ে মায়া নামটি প্রথম উচ্চারণ করি। তোমাকে পেতে ছুটে আসি দেশের মাটিতে।আর সেদিনই আমি তোমাকে প্রথম দেখি।গহীন বনে আমার বাঁশির সুরে তোমার ছুটে আসা মুহুর্ত আমার শিহরণ জাগিয়ে তুলেছিল।ঢেউ তুলে দিয়েছিল আমার হৃদয়ে।
আমার অন্ধকার জীবনে তোমার আগমন ছিল চন্দ্র, সূর্যের মতই আলোকিত। যেই আলো ধরে বেরিয়ে আসি নিস্তব্ধ বিষাদ ভরা জীবনটা থেকে। তোমাকে দেখে ছুটে এসেছিলাম পা’গলের মতন। সেদিন আমি তোমাকে দেখে আবার, নতুন করে প্রেমে পড়েছিলাম। আমার মায়াবতী, তোমার মায়াতে জড়িয়ে থাকতে চাই চিরকাল। আমার ভালোবাসা। তোমার ভালোবাসা তেই ম’রতে চাই।যদি কখনো মৃ’ত্যু আসে, সেই মৃ’ত্যুও যেন তোমার হাতচেপেই আসে।আজ যখন তোমার চোখে জল দেখেছি, বিশ্বাস করো, সমুদ্র আঁচড়ে পড়েছিল মাথার উপর। মস্তিষ্কের নিউরন গুলো যেন ধীরে ধীরে ছিঁড়ে যাচ্ছিল।খুব কষ্ট পেয়েছি আমি। তোমার সাথে আমার বিয়ের বিষয়টি আমি সবাইকে বলতে বারণ করেছি।যেন তোমাকে অবাক করতে পারি। কিন্তু দেখো,আজ তোমার চোখের জলই আমাকে চমকে দিয়েছে। দরকার নেই আর অবাক করার।তোমার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা মীর এর নেই। চিঠিটা যখন তুমি পড়বে,হয়ত তখন তুমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। খুঁজবে আমাকে।জানো মায়াবতী,এই চিঠিটা লিখতে বসে বুঝলাম, কিছু অনুভূতি কাগজে ধরতে গেলে হাত কাঁপে। তবু লিখছি, কারণ তোমাকে না বললে আমার ভেতরের ভালোবাসা যেন অপূর্ণ থেকে যাবে। তুমি জানো,তোমার নামটা ভাবলেই আমার মনে এক ধরনের শান্তি নেমে আসে। যেন জীবনের সমস্ত কোলা’হলের ভেতরেও একটি নির্ভরতার ঠিকানা আছে।
তুমি আমার কাছে শুধু ভবিষ্যতের সঙ্গিনী নও, তুমি আমার বিশ্বাস।যে বিশ্বাসে ভর করে আমি আগামী পথের দিকে এগোতে চাই।আমি জানি, জীবন সব সময় সহজ হবে না। আমাদের পথে থাকবে দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি, হয়তো ভুল বোঝাবুঝিও। কিন্তু আমি এটুকু জানি,তোমার হাতটা ধরলে সেই সবকিছু পার হয়ে যাওয়ার সাহস আমি পাব। কারণ তুমি আছ বলেই আমি মীর এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি।তোমার হাসির ভেতর আমি আশ্রয় দেখি, তোমার নীরবতায় দেখি গভীরতা। তুমি কথা না বললেও আমি বুঝতে পারি,তোমার মন আমার জন্য কতটা যত্নশীল। তুমি আমার জীবনের এক শক্তি।সেই শক্তির পাশে দাঁড়াতে পারাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হবে।’মায়া,আমি শুধু সত্যিকারের সৎ, উত্তম জীবনসঙ্গী, হিসেবে তোমার পাশে থাকার অঙ্গীকার করতে চাই।যখন দিন ভালো যাবে, তখন আমরা সে-ই আনন্দটুকু ভাগ করে নেব, আর যখন দিন কঠিন হবে, তখন সে-ই কঠিন সময়টা দু’জনে একে অপরের পাশে থেকে ভালোবাসার শক্তিতে সহজ করে নেব।আমার অসম্ভব ভালোবাসা কোনো প্রদর্শনের জন্য নয়। এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নে, সম্মানে, আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকবে এই আমার বিশ্বাস। তুমি যেমন, ঠিক তেমন করেই তোমাকে গ্রহণ করতে চাই।আর মাত্র কয়েক ঘন্টা- এরপর তোমাকে সারাজীবনের জন্য আমার করে নেব। ছোট্ট একটা সংসার সাজাবো। তোমার কোলভরে ছোট্ট রাজকন্যা – রাজকুমারী আসবে। তাঁদের নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব।আজ তোমাকে কাঁদানোর জন্য ক্ষমা চাই মেয়ে। তোমার আজকের কষ্ট টুকু আমার হয়ে যাক।
The Silent Manor part 69
এই চিঠির শেষে শুধু এটুকুই বলব ‘জীবন যদি একটা দীর্ঘ পথ হয়, তবে সেই পথটা তোমার সঙ্গে হাঁটার সুযোগ পাওয়াই আমার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
সবটুকু আন্তরিকতা নিয়ে,
তোমার হবু স্বামী ..
মীর জাফান শন।
