Home The Silent Manor The Silent Manor part 71

The Silent Manor part 71

The Silent Manor part 71
Dayna Imrose lucky

মীর জাফান শন এর দাফনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামের প্রায়ই প্রতিটি মানুষই অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁর জানাযায়। তাঁকে তাঁর মায়ের পাশে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সে-ই নিদ্রায় মগ্ন যে-ই যে নিদ্রা থেকে আর ফিরে আসবে না সে।

মায়া একটু স্বাভাবিক হয়েও পরক্ষনেই পূর্বের রুপে ফিরে যায়। গতকাল থেকে ঘরের মধ্যে দ’ ভঙ্গিতে বসে ছিল। না আছে,ঘুম, না আছে খাওয়া দাওয়া। থাকবে না এটাই কি স্বাভাবিক নয়! রাফিদ ও আহির মিলে খুব কষ্টে মায়ার দরজা তখন খুলেছিল। তাঁরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল ‘এই বুঝি মায়া কিছু করে বসল।’ মায়া ঠিক আছে। বেঁচে আছে।মরে যায়নি। শুধু ভেতরের আত্মাটা মৃত।
জয়ন্তন বেগম যোহরের সময় থেকে নামাজের ঘরেই বসে আছেন।চোখ বেয়ে জল পড়ছে মোনাজাতে। তাঁর সবটুকু দোয়া মীর ও মায়াকে ঘিরে।মায়ার আত্মচিৎকার, হাহা’কার!বিয়ে হতে না হতেই বিধবা হওয়াটা!সব যেন একটি দুঃস্বপ্ন এর মত হয়ে যায়। তিনি ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সবকিছু স্বপ্ন।মীর বেঁচে আছে। পুরো বাড়ি জুড়ে আনন্দ অটুট।চোখ দুটো ফুলে গেছে তাঁর। বন্ধ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তাঁর কান্না দেয়ালও শুনছে।দেখছে। ওদেরও যেন সহ্য হচ্ছে না এই কান্না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যেত! দুঃস্বপ্ন হয়ে যেত!ভাবেন শালুক।দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছেন মীর এর সমাধিখানা।মায়া সাথেই আছে। তাঁকে গৌরী,শাহানারা ধরে রেখেছেন।মীর এর কব’রে সমাধি ফলক তৈরি করা হচ্ছে। চারজন লোক সমাধির কাজে নিয়োজিত।মাথার দিকের সমাধির ফলকে এসে থামেন একজন রাজমিস্ত্রী।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান তাঁদের দিকে। জিজ্ঞেস করলেন “মৃত ব্যক্তির নাম? জন্মসাল – মৃত্যুর দিন- বাবার নাম জিজ্ঞেস করলেন।

মীর এর নামের সাথে আজ মৃত শব্দটি যুক্ত হয়েছে।মৃত মীর এর জন্মসাল জিজ্ঞেস করেছেন। প্রশ্নটা শুনেই থমাস কুঁকড়ে গেলেন যেন‌। বুকের চাপচাপ ব্যথাটাও বেড়ে গেছে।মনে পড়ে সে-ই দিনটির কথা – যেদিন মীর দুনিয়াতে আসে। তাঁর স্ত্রী রুম্পা বেগম মৃত্যুর আগে অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন বলতেন বারবার ‘আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমার সন্তান কে দেখে রাখবেন।আমি বেঁচে থাকব বলে মনটা সায় দিচ্ছে না। তবে আমি দোয়া করি আমার অনাগত সন্তানের জন্য। সৃষ্টিকর্তা যেন ওকে দুনিয়ার আলো দেখায়। জীবনটা ওঁর আলোতে আলোতে ভরে যাক।”
আলোতে ভরেই উঠেছিল তাঁর জীবন। কিন্তু হঠাৎ যেন মৃত্যুর ঘন্টা এসে তাঁর দুয়ারে থেমে ছিল। থমাসের মন কাঁদে। বলতে ইচ্ছে করছে ‘আমাকেও আমার সন্তানের সাথে কব’র দিন।’ বেঁচে থেকে আর কি হবে?সব ভুলে একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকার এক তীব্র ইচ্ছা জন্মেছিল তাঁর মনে। রুম্পা বেগম চলে যাওয়ার পর,কত কে বলেছিলেন ‘বিয়ে কর! নতুন করে জীবন শুরু কর’। গেলেন না সে-ই জীবনে। নতুন জীবন বলতে তো তিনি মীর- তাঁর একমাত্র সন্তানকেই খুঁজতেন।জানতেন।আজ সে-ই জীবন হারিয়ে গেছে।

মরহুম মীর জাফান শন।
পিতা : থমাস শন।
জন্ম :১ জানুয়ারি ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ।
মৃত্যু:১ জানুয়ারি ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে।
রাজমিস্ত্রী সমাধিফলকের কাজ সম্পন্ন করলেন।

শহর থেকে সন্ধ্যার দিকে আলিমনগর এসে পৌঁছেছেন সাইদ আলী মির্জা।ও তাঁর স্ত্রী রত্নাবতী বেগম।সাইদ সংক্ষেপে তাঁকে রত্না বলে ডাকেন। গতকাল ছেলের ফোন পেয়ে আজ চলে এসেছেন আলিমনগর। রত্না বেগম মোটেই গ্রাম পছন্দ করেন না।আসছে থেকে নাক কুঁচকে রেখেছিল।কখন শহরে পৌঁছেবেন সে-ই চিন্তা ছিল। কিন্তু ছেলেকে মর্মাহত দেখে কিছুটা ভেঙ্গে পড়েছিলেন রত্না। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি মানুষের মুখ গম্ভীর।উনি বিষন্ন মনে জিজ্ঞেস করলেন আহির কে। জানতে চান কি হয়েছে!আহির কোন জবাব না দিয়ে রত্নাকে জড়িয়ে কেঁদে উঠেছিল।রত্মা ঘাবড়ে যান। ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন বারবার!কি হয়েছে!যে মেয়ের জন্য তাঁদের আহির ডেকেছিল সে নিশ্চয়ই কিছু করেছে ভেবেছিলেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক তিনি মায়াকে দেখেছিলেন‌।সাদা শাড়িতে। থমকে যান তিনি।
বৈঠকখানার শোক সমাবেশে বসে আছেন সকলে। তাঁদের মাঝে নেই আহির ও রাফিদ। সারা সন্ধ্যে বসে ছিল মীর এর কবরের পাশে। গতকাল অবধি তিনজন বেশ আনন্দে,ওয়াদায় ছিল যেন।আজ তাঁদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।মীর- নামক মানুষটি মাটির ঘরে শায়িত। তাঁদের প্রাণপ্রিয় বন্ধু,ভাই ও যে,ঐ কবরেই শুয়ে আছে। রাফিদ এর কলিজা পু’ড়ে উঠল।চোখের জলকে সামাল দিতে পারল না। টইটুম্বর করে আস্তেধীরে গাল বেয়ে পড়ল।বোবা কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। মুহুর্তে বা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেলল।

‘আজকে মীর এর জায়গায় আমার থাকার কথা ছিল।” বলল রাফিদ।
আহির তাঁর কাঁধে হাত রাখে শুধু। কিছু বলল না।
“আমি সম্রাট নিষাদ এর বংশধর-দের ছাড়ব না।”
রাফিদের কণ্ঠে তেজ!রাগ! প্রতিশোধের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল।আহির বলল “ভুলটা আমাদের। সেদিন কাবির কে বাড়িতে আনাটা উচিত হয়নি।”
“উনার উদ্দেশ্যেই ছিল এ বাড়িতে আসার। লোকটি বুঝতেও পারেনি মীর এই বংশের সন্তান নয়।বুঝবেও বা কি করে! শয়তান লোকটা আসার পর থেকেই তাঁর ঘরটির মধ্যে বন্দি ছিল। খাবারটা অবধি তাঁর ঘরে দিয়ে আসতে হয়েছে। এতটা সম্মান,ও ভালোবাসা দেয়ার পর ও বেইমানি করল।”
আহির নিঃশ্বাস বন্ধ করে আবার ছাড়ল। “মীর যদি বিয়ের বিষয়টি গোপন না রাখত,তাহলেও হয়ত মীর বেঁচে থাকত। যদি পরিবার সহ আশেপাশের মানুষ ও জানত, বিয়েটা মীর এর সাথে, তবে কাবির বুঝে যেত,মীর আমজাদ আঙ্কেল এর সন্তান নয়।”

“সেদিন আমি যদি রত্নখচিত পেনডেট লকেট ওর গলায় পড়িয়ে না দিতাম!ওকে জমিদার এর ছেলে বলে পরিচয় না করাতাম, তবে হয়ত বেঁচে থাকত মীর।”
আহির শুধু তাকিয়ে দেখছে রাফিদ এর আফসোস এর প্রতিটি সুর।কত পদক্ষেপে ভুল দেখাচ্ছে।আজ সে ভুলগুলো না হলে হয়ত মীর বেঁচে থাকত! কিন্তু, তাঁর বদলে যে সে ম’রতো তা ভাবছে না।
“আমি অরুণ কে দিয়ে খোঁজ নিয়েছি। সম্রাট নিষাদ আলিমনগর নেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না।হয়ত উনার উদ্দেশ্য সফল হওয়াতে দূরে চলে গেছেন।বাকি রইল শেফালী।ওকে দিয়েই কাবির তাঁর উদ্দেশ্য হাসিল করেছে। ওঁরা জানে, ওঁদের ধরতে পারলে বেঁচে থাকবে না নিশ্চিত।তাই দূরে কোথাও চলে গেছে।”
“আজ হোক বা কাল এর ফলাফল ঠিক ওঁরা পাবে।” বলল রাফিদ।বসে গা’টা এলিয়ে রেলিঙ পাশে বেঞ্চে।আহির তখন মনে করাল মোহিনীর কথা। আচমকা যেন ওর কথা মনে পড়েছে।
আহির শান্ত গলায় বলল “রাফিদ,তোর না গতকাল মোহিনী কে বিয়ে করার কথা ছিল! দিঘীর পাড়ে অপেক্ষা করবে!তুই..তুই তো আর যাসনি! ওঁর খোঁজ নিয়েছিস!আজ সারাদিন পাড় হয়ে গেল। একটাবার খোঁজ নেয়ার দরকার ছিল”

রাফিদ ভাবে মোহিনীর কথা।মীর হারিয়ে যাওয়াতে সবকিছু ভুলে গেছে প্রায়ই। গতকাল মেয়েটা হয়ত অপেক্ষায় ছিল। নিশ্চয়ই এখন অভিমান করে আছে।
“তোর এখন যাওয়া দরকার ওঁর বাড়ি। কোনভাবে খোঁজ নেয়া দরকার।”
রাফিদ এর মন শীতল হয় হঠাৎ।কোন এক অজানা কারণে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে। অবস্থান ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল। তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে তাকায়‌।মীর কে যেন দেখতে পেল। দৃষ্টি তাৎক্ষণিক সরিয়ে ফেলল। পুনরায় চোখ কচলে তাকাল। নেই কোথাও মীর। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। মোহিনীর বাড়ি যাবে। ভেবে নিশ্চিত করল।

রত্নাবতী বেগম গৌরী কে ডেকে নিয়ে ছাদে এলেন সবার আড়ালে। গৌরী বুঝতে পারছে না তাঁকে চো’রের মত আড়ালে ডাকার কারণ।গোপনে খু’নের পরিকল্পনা করার জন্য যেভাবে ফিসফিস করতে হয়, তেমনি রত্নাও আজ সেরকম আচরণ করছে। গৌরী আদবের সাথে জিজ্ঞেস করল রত্নাকে “জরুরী ডাকলেন! কিছু হয়েছে?
রত্না প্রথমে গৌরী কে অসন্তোষ চোখে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন। এরপর পায়চারি করতে করতে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন “তুমি জানো আহির কে?’
‘আহির কে?’প্রশ্নটায় রিতিমত নির্বাক করল গৌরী কে। তিনি অসাধারণ কেউ কি?সে এখন পর্যন্ত তাঁকে একজন গোয়েন্দা রুপেই দেখছে। একজন প্রেমিক পুরুষ। একজন জ্ঞানী।আর কিছু কি জানার ছিল?’ গৌরী কোন জবাব দিল না।

রত্না বেগম পা স্থির করে দাঁড়ায়। ঘূর্ণনের মত শরীর ঘুরিয়ে গৌরীর দিকে তাকালেন। বললেন “সাইদ আলী মির্জার একমাত্র সন্তান।শহরে এক নামে সাইদ আলী খানকে সবাই চিনে। একজন বিজনেস-ম্যান। তাঁর একমাত্র ছেলে আহির মির্জাকেও সবাই চিনে। একজন গোয়েন্দা। তুমি জানো,কত মেয়ে ওঁর বউ হওয়ার জন্য লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে!”

আশ্চর্য! গৌরী এসব কিভাবে জানবে! তাঁকে এসব কথা কেন শোনাচ্ছে!সে থ’হয়ে যায়।নিস্তব্ধ চোখ দুটো ফেলে রেখেছে রত্নার দিকে।হয়ত উনি এখন এমন কিছু বলবে যার জন্য গৌরী প্রস্তুত নয়।তাঁর অভিব্যক্তির পূর্বাভাস তাই বলে দিচ্ছে। গৌরী কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া করছে না।রত্না বেগমের মূল কথা শোনার অপেক্ষায়।
রত্না বেগম বিরতি নিয়েছিলেন।ফের বললেন “আমি গতকাল আহির এর কল পেয়ে আশ্চর্য হয়েছি।সে উচ্চ বংশের ছেলে হয় কিভাবে এত নিচু পরিবারের মেয়েকে ভালোবাসতে পারে!যার নিজস্ব কোন ঠিকানা নেই। না আছে বাবার পরিচয়।কি যোগ্যতা আছে তোমার, আমার ছেলের বউ হওয়ার! শুধু রুপে থাকলেই হয় না।শুনেও থাকতে হয়। আমার ভোলাভালা ছেলেটাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছো‌।উন্মাদ হয়ে গেছে আমার ছেলে। নিশ্চয়ই জাদু করেছো!” এতটুকু বলে থামেন তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসেন একগাল।এ যেন তাচ্ছিল্যের হাঁসি।

গৌরীর ইন্দ্রিয় আবিষ্কার করল এক বিষাদ বয়ে যাওয়া বাতাসকে। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল।চোখ দুটো পলক ফেলতে ভুলে গেছে। শিহরণ জাগিয়ে ঢোক গিলল।জবাব দিতে পারল না কোন।
রত্না বেগম পায়চারি শুরু করেন।বা কাঁধ থেকে ফেলে রাখা শাল।শালটা বাতাসে দুলছে। পুনরায় ধীর কণ্ঠেই কঠিন এক স্বর আবিষ্কার করে বললেন “তোমরা গ্রামের মেয়ে,শহরের সহজ সরল ছেলেকে পেলেই কিভাবে গলায় ঝুলে পড়বে-পথ খুঁজে পাওনা। নিশ্চয়ই তুকতাক এর জল পড়েছে আমার ছেলের পেটে।নয় তোমার মত মেয়ের প্রেমে পড়াটা অবিশ্বাস্য।”

গৌরী বাকরুদ্ধ।আহির তাঁকে একবার বলেছিল গতকাল, তাঁর মা বাবা আসছে। গৌরী আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছিল বটে। নতুন জীবনে পা রাখবে ভেবেছিল। ছোট্ট একটা সংসার সাজাবে চেয়েছিল।আজ যেন সবটা ধুলোয় মিশে গেল। মিশিয়ে দিয়েছেন রত্না বেগম।
“আমি আজ এখানে এসেছি তোমাকে বউ করে নিয়ে যেতে নয়, সাবধান করতে। আগামীকাল আমরা চলে যাব। আহির কে বলব তুই তোর হবু বউকে নিয়ে শহরে চলে আয়। সেখানে বসেই তোদের বিয়ে দেব। কিন্তু তুমি,আজ এখুনি কোথাও চলে যাবে। অনেক দূরে।যাতে আহির তোমাকে আর খুঁজে না পায়। তুমি ঠিক কোথায় যাবে আমি জানি না। তবে তোমাকে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা দেব,চলে যাও সে-ই টাকা নিয়ে।”

“কি বলছেন আপনি এসব!মা হয়ে ছেলেকে আঘা’ত করতে চাইছেন।” অতঃপর তাঁর মুখ খুলল যেন।
“একদম মুখেমুখে কথা বলবে না। ওঁর বিয়ে আমরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সাথে ঠিক করে রেখেছি।”
গৌরী ফিক করে হেসে বলল ‘সিনেমার কাহিনীর মতন একটা গল্প সাজাচ্ছেন।টাকার লোভ দেখিয়ে দূরে ঠেলে দিতে চাইছেন।”

“তুমি যা মনে করো। কিন্তু আমি চাই না তুমি আমার ছেলের বউ হও। তুমি না আহির কে ভালোবাসো, তুমি কি চাও! তোমার মত মেয়েকে বউ করে ও সারাজীবন পস্তাক, বন্ধুদের সামনে অপমানিত হোক!”
গৌরী থেমে গেল। তাঁর নিঃশ্বাস বারেবারে ওঠানামা করছে। চোখের পাপড়ি গুলো খুব দ্রুত পড়ছিল। সে-ই সাথে রত্নার একটা প্রশ্ন বারবার চারপাশে ঘুরছে। প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ‘তুমি কি চাও তোমার জন্য সারাজীবন আহির পস্তাক! বন্ধুদের কাছে অপমানিত হোক!’ হ্যাঁ! ঠিকই তো! তাঁর তো বাবার পরিচয় নেই। তিনি থেকেও ছিলেন না। তাঁর বাবার বেশ নামডাক থাকা সত্ত্বেও সে তো বঞ্চিত ছিল তাঁর আদর থেকে।বড় হয়েছে যে কুঁড়ের ঘরে। রাজপ্রাসাদ যে তাঁর ঠাঁই হওয়ার নয়।

“কি ভাবছো?
গৌরী সেকেন্ড কয়েক কিছু ভেবে জবাব দিল “আপনার জন্য আমি আমার ভালোবাসা কে কোরবানি দেব না।এই কথা গুলো আপনার ছেলেকে বলবেন,সে যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে তবেই আমি তার থেকে দূরে চলে যাব।” বলে গৌরী চলে গেল ব্যস্ত পায়ে নিচে।
রত্না বেগম গৌরীর কঠিন স্বরে ক্ষিপ্ত হলেন।তবু খোলা আকাশের নিচে বসে তা প্রকাশ করলেন না।

আহির ও রাফিদ গেল মাস্টার বাড়ির দিকে। বাড়িটি যেন ঝিম মেরে আছে। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।পথের ধারে লন্ঠন জ্বলছে।বাড়ির ভেতর খানায় গরু বাঁধা। মাস্টার এর খামার থেকে বোধহয় কোন দরকারে নিয়ে আসা হয়েছে। রাফিদ উঁকিঝুঁকি মারল, কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
“গেল কোথায় সবাই?” বলল রাফিদ।বাম হাতের উল্টো দিক দিয়ে কোমর ধরে রেখেছে।ডান হাতটি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে।
“হয়ত ভেতরে আছে,চল ডেকে দেখি।”আহির বলল।
“কি বলব!কেন এসেছি যদি জিজ্ঞেস করে?”
“জিজ্ঞেস তো করবেই, কিছু একটা বলতে হবে।” বলে রাফিদ মাস্টার চাঁচা বলে ডাকে।ভেতর থেকে কারো সাড়া এল না। শুধু ভেসে আসে পশ্চিম থেকে হিমেল হাওয়া।

রাফিদ অপেক্ষা করে মিনিট দুয়েক।এমন সন্ধ্যায় ঘরের ভেতরে সবাই ঘাপটি মেরে কি করছে!ভাবছে। সচরাচর এমন সময় মোহিনী কে কুঠুরিতে দেখা যায়।আজ আর দেখা যাচ্ছে না।আহির বলল “পড়ে আসব।হয়ত এখন তাঁরা কোন কারণে ব্যস্ত আছে।”
রাফিদ আহির এর কথা মেনে নিল আপাতত।তবু তাঁর মনটা অস্থির হয়ে উঠছে কোন কারনে। বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল। যেতে যেতে পথে দেখা হয় মাস্টার এর। রাফিদ উনাকে দেখে লম্বা সুরে সালাম দিল। মাস্টার সালাম নিলেন তবে সময় করে। সালামের জবাব দিয়ে উনি চলে যান।সাথে ছিলেন একজন মৌলভী। রাফিদ কিঞ্চিত অবাক হল। মাস্টার এর যাওয়ার পানে দেখল।যেতে যেতে মৌলভী ও মাস্টার হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কোন বিষয় কথা বলছিল। রাফিদ সে-ই বিষয়ে কিছু বলার আগে,আহির তাঁকে বাঁধা দিয়ে বলল “মাস্টার কে তো সুবিধের মনে হল না। কিছু একটা তো নিশ্চয়ই হয়েছে। কেমন অস্বাভাবিক ভাবে সালামের জবাব দিল।মনে হল কেউ তাড়াচচ্ছে।”
“হলেও হয়ত ব্যক্তিগত।বাদ দে,চল যাই‌” বলল রাফিদ

মায়া তাঁর মায়ের ঘরের বারান্দায় দ’ভঙ্গিতে বসে আছে। শরীরটা হেলিয়ে রেখেছে রেলিঙের সাথে।শালুকের ঘরের বারান্দা থেকে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থান পরিষ্কার দেখা যায়।রাতের চাঁদটা উদিত হয়েছে সবেই‌। মৃদু আলোতে মীর এর কব’রটি দেখা যায়।মায়া ঠিক মীর কেই দেখছে যেন। হঠাৎ করে তাঁর পৃথিবীটা থমকে যাওয়াতে মানুষটি ভেতর থেকে ম’রে গেছে। দেহটা দুনিয়ার বুকে থেকে শুধু এখন ম’রছে।
কিছু বলতে পারছে না, শুধু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।জলটুকু মোছার মত শক্তি তাঁর নেই। সবটুকু শক্তি তো গতকালই বিসর্জন দিয়েছে সে। দিতে হয়েছে।একটু পরপর ডান হাতটির দিকে দেখে। যখনি মনে পড়ে,এই হাতটি দিয়ে তার স্বামীকে বি’ষ দিয়েছে, তাৎক্ষণিক সর্বাঙ্গতে খিঁচুনি উঠে যায়।দম ভারী হয়ে যায়।মাথার চুলগুলো টেনে ধরে দু হাত দিয়ে।আজ যখন মীর এর সমাধি ফলকে তাঁর নামটির আগে মরহুম যোগ করে- সে চেয়ে চেয়ে ঘাড়টা কাত করে দেখছিল।যদি কথা বলার শক্তি থাকত, যদি নিয়ম -নিতীতে মৃত মানুষটির সাথে কবরে শায়িত থাকা যেত, তবে আজ নিশ্চিত মীর কে জড়িয়ে ধরে সুন্দর একটা ঘুম দিত।হল না! সে-ই সৌভাগ্যটুকুও হল না। তাঁদের পথচলা দীর্ঘ হল না।ভাগ্য আজ ধ্বং’সের শেষ প্রান্তে এসে পুনরায় ধ্বং’স করল যেন মীর কে।কি পেল মানুষটি জীবনে?যদি না পাওয়ার খাতায় কারো নাম উল্লেখ করা হত!তবে মীর জাফান শন এর নামটি প্রথমেই থাকত।
মায়া ধীরে হাতটি বুকের সোজাসুজি করে তুলল। ‘যে হাতে মীর কে স্বামী হিসেবে বরণ করল মায়া, সেই হাতেই অজান্তে তুলে দিল নীল বি’ষ। মীর অচেতন, আর মায়ার পৃথিবী আজ চিরতরে স্তব্ধ!’

রাত দশটার দিকে বুলবুল কে দিয়ে সংবাদ পাঠাল আহির গৌরীর কাছে। তাঁকে ডাকছে।আহির অপেক্ষা করছে বাড়ির উঠোনে।মন তাঁর ভীষণ ব্যাকুল।মীর এর অশ্বটা একটু পরপর করুণ এক কণ্ঠে হ্রেষাধ্বনি তুলছে।আহির অগ্নীল এর কাছে এগোয়। ওঁর গায়ে আলগোছে হাতটি রেখে আদর করল। কিন্তু শান্ত হচ্ছে না অগ্নীল।ওর দুচোখ ভেজা জলে।আহির ওকে ছুঁয়েই বলল “কেঁদে কি হবে!তোর বন্ধু সাথে আমার বন্ধুও চিরতরে হারিয়ে গেছে।যদি পারিস তবে দোয়া করিস! তোর বন্ধু যাতে পরপারে ভালো থাকে। সৃষ্টিকর্তা চাইলে পরপারে আবার আমাদের দেখা হবে।”
বুলবুল দৌড়ে আসে আহির এর কাছে। হাঁটুতে ভর দিয়ে প্রথমে দম হালকা করল। এরপর বলল “বাবু, গৌরী আপা বাড়িতে নেই।আমি উনাদের বাড়িতেও গেছি। তালাবদ্ধ!”

আহির ভ্রু ভাঁজ করে জানতে চাইল “কি বলছো?ও হঠাৎ কোথায় যাবে!”
“জানি না বাবু! সন্ধ্যার সময় মালকিন তাঁকে বাইরে আসতে দেখেছিলেন।”
তাঁদের ক্ষুদ্র আলোচনায় হাজির হয় রাফিদ।সে বাড়ির বাইরে থেকেই সবে ফিরেছে। তাঁকে বেশ উত্তাপ দেখাল।আহির রাফিদ এর দিকে দু পা এগিয়ে বলল “এমন ভাবে দৌড়ে এলি যেন কেউ ধাওয়া করছে।”

The Silent Manor part 70

রাফিদ থেমে থেমে বলল “মীর এর কব’রের কাছে ছিলাম। চারদিক নির্জন। এত রাতে কেউ বাইরে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এহেন সময় আমি বাঁশির সুর পেলাম। দক্ষিণ থেকে সুরটা ভেসে আসছিল।আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম!বাঁশির সুর থেমে যাওয়ার পর অশ্ব দৌড়ের আওয়াজ পাই। আমার কেন যেন হচ্ছে মনে হচ্ছে এটাই সে-ই সুফিয়ান হায়দার এর বাঁশির সুর। বাঁশি।_

The Silent Manor part 72