Home The Silent Manor The Silent Manor part 72

The Silent Manor part 72

The Silent Manor part 72
Dayna Imrose lucky

রাতের ঘন কালো অন্ধকার কেটে দিনের ছোঁয়া নেমে আসে ভুবন জুড়ে।আলোটা দিনের হলেও আহির এর ভেতরটা থমকে আছে গৌরীর জন্য।গত রাত থেকে সারা আলিমনগর জুড়েই তাঁকে খুঁজেছে। পায়নি। তাঁরা যখন মাস্টার বাড়ি ছিল ‘ঠিক সে-ই মুহূর্তে গৌরী কোথাও চলে গেছে। কিন্তু হঠাৎ সে কোথায় যাবে! কাউকে কিছু না বলে! গৌরীর কোন আত্মীয়-স্বজনও নেই।

রাত টা পেরিয়ে সকালের মৃদু শীতলতার সাথেও আহির তাঁকে খুঁজেছে। রেলস্টেশনে গিয়েছিল।একে ওকে গৌরীর বর্ননা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে!কেউ কিছু বলতে পারেনি।
আহির বসে আছে নিজের ঘরে। রাফিদ বাড়িতে নেই। মোহিনীর গতকাল খোঁজ পায়নি।আজ গেছে তাঁর খোঁজ নিতে।ফিরেনি এখনো। বুলবুল কে দিয়ে চা চেয়েছিল। নিয়ে আসছি বলে ও হারিয়ে গেছে।গৌরীর জন্য চিন্তা করতে করতে মাথা ধরেছে প্রচন্ড।ব্যথায়।চোখ দুটো লেগে আসছে। নিদ্রায়। আবার হারিয়ে যায় ঘুম।গৌরীর চেতনায়। কোথায় গেছে সে?কি হয়েছে হঠাৎ ওঁর? বুলবুল কে জিজ্ঞেস করেছিল – তাঁর অনুপস্থিতিতে গৌরীর সাথে কেউ খা’রাপ আচরণ করেছে কিনা! বুলবুল ভেবে জবাবে না বলেছিল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

যদি গৌরীর সাথে কেউ কোন রকম বা’জে আচরণ না করে! তাঁকে কিছু না বলে,তবে সে কোথায়!
রত্না বেগম আসেন তাঁর ঘরে। তৈরি হয়েছে। শহরে ফিরবেন।আহির চেয়ারে বসা ছিল। তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ান রত্না।আহির তাঁর মায়ের উপস্থিতি টের পায়। মুখের গম্ভীরতা কাটিয়ে তাঁর মায়ের দিকে তাকাল। রত্না বেগম ছেলের বিভৎস মুখখানি দেখলেন। স্বভাবসুলভ তাঁর এক ভ্রু উঁচিয়ে বললেন “তোর মন খারাপ কেন?

আহির কেটে কেটে বলল “কোথায়.. কোথায় মন খারাপ!” বিরতি নিয়ে ফের বলল “মন খারাপ থাকাটাই স্বাভাবিক নয় কি! একজন বন্ধু কে অতি কম সময়ে হারি ফেলেছি। বেঁচে থাকতে ও জীবনে কিছুই পেল না।কত সুন্দর হত ওর জীবনটা। ওঁর মৃত্যুটা কোনভাবেই মানতে পারছি না‌। মৃত্যুর সময়টায় না জানি কত ছটফট করেছে।ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।” চোখ জলে ভেসে উঠল আহির এর।হাতের উল্টোপাশ দিয়ে সেই জল মুছে ফেলল।
আহির এর কান্না রত্না বেগমের মোটেই ভালো লাগে না।তবু নিজেকে সামাল দিলেন। গতরাতের পর তাঁরও আর গৌরীর সাথে দেখা হয়নি। জিজ্ঞেস করা দরকার সে কোথায়!

“তুই যার জন্য আমাদের আনিয়েছিস ও কোথায়?
আহির জবাব দিতে একটু বিভ্রান্ত হল। গৌরী কে গতকাল রাত থেকেই পাচ্ছে না।একে যেন বলে নীরবে গা’য়েব। তাঁর মাকে এহেন কথা বলা যাবে না। ভেবে আহির মিথ্যা বলল “ও বোধহয় ওঁদের বাড়ি গেছে‌। কিছু দরকারি জিনিস ফেলে এসেছিল। সেগুলো আনবে বলেছিল।”
রত্না বেগম ঠিক বুঝতে পারলেন আহির মিথ্যা কথা বলছে।তা ঠিক কি! উনি তা আন্দাজ করতে পারলেন না। তিনি গতকাল গৌরী কে কোথাও চলে যেতে বলেছিল, সত্যি সত্যি কোথাও চলে যাক!উনিই তাই প্রার্থনা করছেন।
“আমরা চলে যাচ্ছি শহরে‌।তোর বাবার অনেক কাজ পড়ে আছে। জানিস তো!তুই আজ বা কাল গৌরী কে নিয়ে চলে আসিস।আমরা শহরে বসে তোদের বিয়ে দেব।”

“তোমরা যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে।”
রত্না বেগম চলে যান।
বুলবুল আসল ঘরে।হাতে চা।আহির মনমরা হয়ে বারান্দায় বসে আছে। কোথায় যাবে,কি করবে বুঝতে পারছে না। বুলবুল গরম চা’টা তুলে এগিয়ে দিল আহির এর দিকে।আহির ইশারায় বোঝাল লাগবে না। বুলবুল ব্যথিত কণ্ঠে বলল ‘কিছু ভাবছেন!’
‘গৌরী কে কোথাও পেলাম না।মেয়েটা হঠাৎ যাবে কোথায়!’
বুলবুল চা টেবিলে রাখে।গামছায় হাতটা মুছতে মুছতে বলল “তাঁর তো কেউ বেঁচে নেই। তবে সে কোথায় যাবেন!’ বুলবুল-কেও কিছুটা বিচলিত দেখাল।আহির ওঁর দিকে ঘুরে বলল “মনে করে বলতে পারবে! মায়া ব্যতীত ওঁর কোন বন্ধু আছে কিনা!এই গ্রামে?

বুলবুল গভীর চিন্তায় ডুব দিল। সেকেন্ড কয়েক ভাবনায় ছিল।ভাবনার জগত থেকে ফিরে এসে বলল “না!আমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে, যতবার গৌরী কে দেখেছি, তাঁকে অন্য কোন বন্ধুর সাথে মিশতে দেখিনি।মায়া আপা ছাড়া আর কারো সাথে মিশত না। কিন্তু…!’ এই অবধি এসে বুলবুল থেমে যায়।
“কিন্তু কি? আহির বুলবুল এর দিকে আর একটু এগিয়ে এল। বুলবুল উচ্চতায় আহির কে ছুঁতে পারল না।
বুলবুল ভ্রযুগল ভাঁজ করে বলল “গৌরী তো মায়া আপাকে ভীষণ ভালোবাসে। তাঁর বন্ধুর এই অবস্থায় তাঁকে না বলেই ফেলে যাবে! বিষয়টি আমার কাছে আশ্চর্যজনক।”
আহির বুলবুল এর কথায় সহমত পোষণ করে।সেও ভাবতে শুরু করে। বুলবুল ঠিক কথাই বলেছে। মায়াকে এমতাবস্থায় ফেলে রেখে কোথায় যাবে গৌরী!সে কি নিজের ইচ্ছায় চলে গেছে কোথাও! না -কি কেউ গায়েব করেছে!

একাধিক চিন্তাধারা কিলবিল কিলবিল করছে আহির এর মস্তিষ্কে।চোখ দুটো ছলছলিয়ে উঠল। গ্রামের কিছু ছেলেরা নেড়ি কুকুর এর মতন। ওঁরা ওত পেতে থাকে একটা মেয়ের নতুন শরীরের।আহির এরকম কাউকে স্বচোক্ষে দেখেছে, বিষয়টি এমন হয়।শুনেছে। তবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছু পুরুষ নিতান্তই হিং’স্র। যদি ওঁদের পাল্লায় গৌরী পড়ে থাকে!
আহির আর ভাবতে পারছে না। মায়া কথা বলতে পারে না। কিন্তু শুনতে পারে।মুখে বলে জবাব না দিক। অন্তত ইশারা করতে পারবে বলে আহির তাঁকে জিজ্ঞেস করবে ভেবে নিশ্চিত হল।

আহির মায়ার ঘরের দিকে আসল। দরজা খোলা ছিল।আহির প্রথমে গলা পরিষ্কার করে জানান দিল পুরুষের আগমন। এরপর ভেতরে প্রবেশ করল।মায়া ঘরের এমন দিকের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে মীর এর কবরখানা দেখা যায়। সারাদিন নিষ্পলক এ চেয়ে থাকে কবরটির দিকে। কখনো কখনো সে-ই কবরের পাশে কল্পনা করে নিজেকে।সেও মরে যাক। এরপর সেও এভাবে শুয়ে থাকবে।চোখ জোড়া ফোলা।নাকটা লাল। চোখের নিচে কালো দাগ।আজ থেকে তিনদিন আগের মায়া আর এখনকার মায়ার অনেক পার্থক্য। চেনা যাচ্ছে না মানুষটিকে।

আহির ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মায়ার দিকে। তাঁকে ছেড়ে সেও মীর এর কবরটির দিকে তাকাল। দীর্ঘশ্বাস চলে আসে।সে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তাঁর নিঃশ্বাস এর শব্দ পেল মায়া।ঘাড় ঘোরায় আহির এর দিকে। পুনরায় চোখ সরিয়ে জানালার গ্রিলে মাথা হেলিয়ে দেয়।আহির বলল “মায়া!”
থেমে পুনরায় বলল “গৌরী কোথায়? তোমার সাথে দেখছি না! তোমাকে একা ফেলে কোথায় গেল!’
মায়া চোখের পলক ফেলল।হালকা ভ্রু ভাঁজ করল। তাঁর অভিব্যক্তিকে বোঝা যায় সে কিছু ভাবছে।আহির দ্বিতীয়বার বলল “অসুবিধে হচ্ছে তোমার নিশ্চয়ই!থাক আমি চলে যাচ্ছি।” বলে সে যাওয়ার ভঙ্গিমা করতেই মায়া হাত বাড়িয়ে তাঁকে দাঁড় করালো। এরপর মাথা নাড়াল!সে জানে না গৌরী কোথায়। কিন্তু সেকেন্ড কয়েক আগের অভিব্যক্তি থেকে বোঝা গেছিল সে জানে গৌরী কোথায়! নতুবা কিছু বলতে চেয়েছে।আহির আর কিছু বলল না। ব্যর্থ ভঙ্গিতে চলে যায়।

মায়া শুধু তাকিয়ে থাকে চাতক পাখির মত মীর এর কবরটির দিকে।এক সময় সারাদিন মানুষটি কত বিরক্ত করত।আজ সেই বিরক্তিটুকুই সবচেয়ে বেশি অভাব হয়ে ধরা দিচ্ছে।একসময় যে ডাক এড়িয়ে যেত, এখন সেই ডাকের প্রতিধ্বনি কানের ভেতর ঘুরে ঘুরে বেড়ায় যেন।হাওয়া বয়ে যায়, কিন্তু তাতে আর মীরের ডাক নেই। তাঁর শব্দ নেই। তাঁর গায়ের উষ্ণ গন্ধ আর নেই।নীরবতা এতটাই ভারী যে শ্বাস নিতেও বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হচ্ছে।মায়ার মনে পড়ে, কত কথা না বলা রয়ে গেছে।কত অভিমান জমে ছিল, ভেবেছিল সময় হলেই বলা যাবে।কিন্তু সময় থেমে গেছে এই কবরের মাটির নিচে,আর কথাগুলো অনাথ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হৃদয়ের চারপাশে।
একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মেঝের উপর।

এটা কি চোখের জল, না দেরিতে বোঝা ভালোবাসার কান্না!মায়া নিজেও জানে না।
সে শুধু জানে, মীর আর বিরক্ত করবে না,আর এই না-বিরক্ত করাটাই আজ তার সবচেয়ে বড় শাস্তি। শুধু বলত – এই মেয়ে, অ’সভ্য বলছো না,এর সাজা তোমাকে ভোগ করতে হবে! শাস্তি পেতে হবে!মায়া শাস্তি পাচ্ছে। প্রচুর পরিমাণে সাজা পাচ্ছে। আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও এই শাস্তি যে বড্ড ভয়ানক।
চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে মায়া।যেন মাটির নিচ থেকে মীর একবার ডাক দিবে।কিন্তু কবর যে নীরব।আর এই নীরবতার মাঝেই সব সমাপ্তি।

শুধু মায়ার বুকের ভেতরটা প্রতিদিন নতুন করে শূন্য হয়ে যায়। কতশত স্বপ্ন বেঁধেছিল।মীর ছুটে এসেছিল বিদেশ থেকে!দেশে এসে মায়াকে বিয়ে করবে! তাঁকে অবাক করবে!আজ মায়া অবাক হয়েছে। উপহার পেয়েছে এক করুণ শূন্যতা।যে শূন্যতা ঘিরেই এক বিষাক্ত পোকা তাঁকে দমে দমে ঠুকরে খাচ্ছে ! তাঁর হৃদয়টা পুড়ছে। সে-ই পোড়া হৃদয়ের বিশ্রী গন্ধ তাঁর নাক অবধি পৌঁছাচ্ছে। নীরবে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে, নিজের মৃত্যু।নিজেই নিজের অজান্তে মীর কে বি’ষ তুলে খাইয়েছে! যখনি মনে পড়ে, তাঁর বুকটা ফেটে যায়।
এইতো!আজ থেকে ঠিক চারদিন আগে,মীর ও সে কথোপকথন এর একপর্যায়ে এসে মীর বলেছিল ‘চলে যাব তোমার বিয়ের পরের দিন।’

আর মায়া তখন বলেছিল ‘তারচে বলুন দুনিয়া থেকেই চলে যাবেন!’
আজ সত্যি সত্যি মানুষ টা চিরদিনের জন্য চলে গেছে।মায়ার আফসোস হচ্ছে!খুব! দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বাজে অনূভুতি হচ্ছে প্রিয় মানুষকে হারিয়ে সে-ই শূন্যতায় পোড়ার অনূভুতি।মায়া সে-ই যন্ত্রনা হারে হারে টের পাচ্ছে।
শালুক সকালের নাস্তাটা নিয়ে আসেন মায়ার জন্য।মেয়ে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।দেখছে তাঁর স্বামীর কবরখানা।শালুক হাত থেকে প্লেট রাখেন টেবিলে।মায়ার কাছে এগোয়।মায়ার মাথায় স্পর্শ করে।মায়া হঠাৎ স্পর্শে চমকে উঠল। তাঁর চমকানো দেখে শালুক বললেন “আমি যে মা! এখানে দাঁড়িয়ে আছিস!চোখ মুখের কি অবস্থা করেছিস!আয়,একটু খেয়ে নে!”

মায়া শালুকের কথাগুলো শুনল। তাঁকে বলছে তাঁর কি অবস্থা!অথচ শালুক নিজেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছেন।আর সে-ই ভাঙ্গার দৃশ্যটি মায়া স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।তবু শালুক মিছে মিছে হাসির নাটক করছেন!সে শোকে নেই বোঝাতে চাইছে মায়াকে।
মায়া মাথা নাড়ায়।খাবে না সে।
“একটু হলেও খেতে হবে।নয় শরীর খারাপ হবে।”

বললেন শালুক। মায়াকে ধরে জানালা থেকে খাটের উপর বসায়। শালুক রুটির একটি অংশ ছিঁড়ে ভাজির সাথে তুলে নিল।মায়া পুনরায় না বোধক মাথা নাড়ে। শালুক খেয়াল করলেন মায়ার চোখে জল ছলছল করছে।মীর কে হারিয়ে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন।এখন চোঁখের সামনে নিজের মেয়েকে তিলে তিলে মরতে দেখে হৃদয়টা আরো পুড়ে উঠছে।ডান হাত নামিয়ে বা হাত দিয়ে মায়ার ঝড়া জলগুলো মুছে দিলেন। বললেন “আমার ভেতরটা ভেঙ্গে গেছেরে মা। পুরোপুরি।আর তুই তো বিয়ের রাতে বিধবা হয়েছিস। তোকে বিধবা করেছে।তুই স্বামী হারিয়েছিস।তুই এতটাই আঘাত পেয়েছিস যে তোর কথা বলাই বন্ধ হয়ে গেছে।’

এতটুকু বলে শালুক থামেন। বড় করে একবার দম ছাড়লেন।ফের বললেন “তোকে শান্তনা দেব না। শান্তনা দিতে পারব কিছু শব্দের মাধ্যমে। কিন্তু সে-ই শব্দ তৈরি করতে পারব না,যা ভেসে আসত একমাত্র তোর স্বামীর থেকে। কিন্তু যে মানুষটা নেই, তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে হবে।আর তারজন্য তোকে তো বাঁচতে হবে। যদি পারিস, নামাজে আল্লাহর কাছে স্বামীর জন্য দোয়া কর।আমি দোয়া করি! এই জন্মে তোদের মিলন হয়েও হল না, আল্লাহ যেন তোদের পরপারে এক করেন।যেই ছোট্ট সংসারটা এখানে হল না,সেটা আল্লাহ ওপারে দিবেন।তখন আর কেউ তোদের আলাদা করতে পারবে না।এই যে, সম্রাট নিষাদ এর বংশধর যেটা করল,এর বিচার ঠিক উনি পাবেন।” শালুক কথাগুলো বলতে গিয়ে বার বার থেমে গিয়েছিল। আটকে যাচ্ছিল কণ্ঠস্বর।দম বন্ধ হয়ে আসছিল।তবু তাঁর মেয়েকে একটু বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা যেন তিনি করলেন।

মায়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।হাতটা কেঁপে উঠছিল। শালুক জলদি করে মায়ার হাত দুটো শক্ত করে ধরলেন।চুমু খেলেন ওই হাতে।মায়ার মাথাটা বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে নিল। বললেন “আমিত মরেই গেছি মা‌।যখন মীর আমার চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, তখনই আমি ম’রে গেছি।এখন বেঁচে আছি শুধুমাত্র তোর জন্য। সে-ই তুইও যদি এমন করিস তবে আমার কি হবে!”
মায়া কান্না থামাল।হাত দুটোর কাঁপুনি থামে। শালুক ভুলিয়েভালিয়ে মায়াকে একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করে। অবশেষে মায়া খেয়ে নেয়। শালুক খাওয়ানো শেষে বললেন “আমার সাথে নিচে যাবি!সবার সাথে বসলে তোর ভালো লাগবে।” মায়া নাকোচ করল।শালুক আর জোর করলেন না।ধীর পায়ে হেঁটে ঘরের বাইরে আসেন।কি যেন কি ভেবে ঘরপাশে আরেকবার প্রবেশ করলেন। দেখলেন,মায়া জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তিনি লম্বা আকারের ঘন দম ত্যাগ করলেন। এরপর চলে যান বৈঠকখানায়।

বেলা বেজে এগোরাটা। সূর্যের দেখা মিলেছে। শীতের শেষ মাস বিদায়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে।আর কিছুদিন গেলেই শীত পালাবে।আহির পুরানো চৌরঙ্গী হাটের মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। পাশেই ছিল টং দোকান। দু’জন গ্রামবাসী বসা ছিলেন। উনাদের অবধি গৌরীর কথা জিজ্ঞেস করেছে। তাঁরা বলেন, তাঁরাও জানে না। এরকম কাউকে গতকাল রাত থেকে দেখেনি।

আহির ভীষণ ভেঙ্গে পড়ছে। বন্ধুকে হারানোর শোক-টা অন্তরের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।হয়ত এই শোক,দাগ কখনো কেটে ওঠার নয়।আর এমতাবস্থায় কোথায় চলে গেল গৌরী!মায়া তখন গৌরীর খোঁজ দিতে পারল না বলে সে সেই সময় থেকে পুরো পাড়ায় আরেকবার টহল দিয়েছে।যেই যেই জায়গা সন্দেহজনক লেগেছে,সব জায়গায় গিয়েছে। গৌরীর চিহ্ন মিলেনি।
সিগারেট সচরাচর ছুঁয়ে দেখা হয়না তাঁর।আজ পরপর কয়েকটি খেয়েছে।হাটের মোড় থেকে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। সামনে পড়ল রাফিদ।সে দ্রুত পায়েই এগিয়ে আসছে।আহির ভ্রু জোড়া এক করে ফেলল। রাফিদ তাঁর সামনে দাড়িয়ে পড়ল।আহির বলল “কি হয়েছে! ছুটে এলি!”

“মোহিনীদের বাড়ি গিয়েছিলাম। ওঁর খোঁজ নিতে। গতকাল থেকেই তো ওঁর দেখা নেই। ভেবেছি কোথাও অভিমান করেই বোধহয় আছে।”
“পড়ে?
রাফিদ স্বাভাবিক হল। কপালের ঘাম মুছে ফেলল।বলল “কিন্তু ওঁরা কোথাও নেই।ঘর তালাবদ্ধ। ওদের খামারে গরু নেই। একজন প্রতিবেশী কে জিজ্ঞেস করলাম, উনি বললেন তাঁরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন।আর সেটাও গত রাতের দিকে।”
“কি!” আহির কিঞ্চিত বিষ্ময় প্রকাশ করল।হাত থেকে সিগারেট আপনাআপনি পড়ে যায়। “কি বলছিস এসব!এমন কি হয়েছে,যারজন্য এক রাতের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল!

“আমিও তো সেটাই ভাবছি।আর..আর মোহিনী কিভাবে পারল, আমাকে কোন কিছু না জানিয়ে এভাবে চলে যেতে! ওকে তো আমি ভালোবাসি।আর ও আমাকে ভালোবাসে!” থেমে আবার বলল “ভালোবাসে ভেবেছি!হয়ত বাসে না।নয়ত এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারত না।”
“আমার এখানে কোন গড়মিল মনে হচ্ছে। মোহিনী কি দিঘীর পাড়ে গত পরশু রাতে বিয়ের জন্য সত্যিই এসেছিল!আর যদি ও এসেই থাকে, তবে নিশ্চয়ই তোর জন্য অপেক্ষা করে তোকে পায়নি। এরপর ওঁর রাগ, অভিমান হয়েছে। তবে সেটা ক্ষণিকের জন্য। কেননা তোর আমার বন্ধু, ওরফে মীর কে ও ভালো ভাবে চিনত।আর মীর মা’রা গেছে সেটাও নিশ্চয়ই জেনেছে।এটা জানার পর ও তোর সাথে অভিমান করবে না। তাহলে হঠাৎ গ্রাম ছাড়ার পেছনে কারণ কি!”

আহির বিচলিত। রাফিদ নিঃশব্দে ভেবে যাচ্ছে। শতশত প্রশ্ন জমা হচ্ছে। উত্তর মিলছে না। রাফিদ শীতল কণ্ঠে বলল “আচ্ছা, গৌরী কে পেয়েছিস!”
“না।কেউই ওঁর খোঁজ দিতে পারছে না।কেউ নাকি গতকাল থেকে ওকে দেখেনি।!”
“তবে কোথায় যাবে!”
“আমি আহির জীবনে কত কেস সমাধান করেছি! জটিল জটিল! কিন্তু,এখন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব। ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে যেন সব।একটা চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি। গৌরী – মোহিনী,এরা কি সত্যিই কোথাও চলে গেছে!নাকি কেউ চলে যেতে বাধ্য করেছে!”
“যদি তাই হত তবে রেলস্টেশনে অবশ্যই খোঁজ পেতি।”

শালুক জয়ন্তন এর পাশে বসে আছেন। তাঁর পা টিপে দিচ্ছেন। জয়ন্তন এর পা ব্যথা করলে দাসীরা টিপে দেয়।আজ টিপে দিচ্ছে শালুক। তাঁকে অবশ্য বলেনি। একজন দাসী কে ডেকে বলেছিল ‘আমার পা খুব ব্যথা করতেছে। একটানা অনেকক্ষণ বইসা নামাজ পড়ছিতো তাই।একটু টিপা দে‌”
শালুক তখন নিজের উরুর উপর শালুকের পা রেখে টিপতে শুরু করলেন।দেমাগি,তেজি শালুক আজ স্তব্ধ। কঠিন মুখের আহভাস বদলে গেছে পুরোপুরি।নেই আর অহংকার।
জয়ন্তন দৃষ্টি সরিয়ে ফেললেন।একগাল পান মুখে ভরলেন।

বুলবুল হাতে চা নিয়ে আসে। সন্ধ্যায় চা খাওয়াটা শালুকের অভ্যাস। জয়ন্তন খাবেন না বলেছেন।চা খেলে উনার রাতে ঘুম হয় না। আজকাল এমনিতেই ঘুম নেই। বুলবুল চা শালুক এর দিকে এগিয়ে তাঁর চোখের দিকে একনজর কিছু বলার ইশারায় তাকায়।শালুকও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।চা টা নিয়ে পুনরায় টেবিলে রেখে দেন। বুলবুল পরপর কয়েকবার উনার দিকে চেয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। শালুক বুঝে যান, তাঁকে বুলবুল কিছু বলতে চায়।সেও জয়ন্তন এর থেকে বাহানা দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। বুলবুল গলার দুপাশ থেকে ফালানো গামছা ধরে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবছে। শালুক কে দেখে প্রস্তুত হল তাঁকে কিছু বলার জন্য। শালুক বললেন “কিছু হয়েছে?
বুলবুল প্রথমে মাথা নত করে ফেলল।মনে হল যেন ওঁর দুঃখ,নীরব ব্যথা জেগে উঠেছে। শালুক এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার বললেন “কি হয়েছে!চুপ করে আছিস কেন বল!”

“মালকিন,ওদিন আমি একটা কাজ করেছি।”
“ওদিন আমিই তো তোকে কাজ দিয়েছি। মোহিনী কে মারার। নতুন আর কি কাজ!”
“জ্বী, কিন্তু আমি ওদিন মোহিনী কে মারিনি।”
“কি বলছিস!” শালুক অবাক হলেন।
“হুঁ!আমি যখন দিঘীর পাড়ে যাই, সেখানে মোহিনী কে দেখিনি।আমরা অপেক্ষা করার পরেও সে আসেনি। কিন্তু,মীর দাদাবাবু কি তবে, মিথ্যা বলেছিল,যে তাঁরা বিয়ে করছে!”
শালুক দেহ ঘোরালেন পুব দিকে।দু পা সামনে এগিয়ে গেলেন।চোখ দুটো অপলক। বললেন “মীর কখনো মিথ্যা বলবে না।আর ওঁরা বিয়ে করত ওদিন রাতে এটাও সত্য। কারণ আমি রাফিদ আর আহির এর কথোপকথন শুনেছি আড়াল থেকে। কিন্তু, মোহিনী আসল না কেন বিয়ে করতে!..

The Silent Manor part 71

‘মালকিন, আমি আরো একটা কথা জানতে পেরেছি!’
“কি কথা?’ শালুক কাঁধের উপর থেকে চোখ ফেলে বললেন।
“মোহিনীরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু কেন তা জানি না।”
“কবে আর কখন?’
“গতকাল রাতের মধ্যে। কিন্তু হঠাৎ কি হলো তাঁদের!”
শালুক এবার যেন গোলক ধাঁধায় পড়ল।

The Silent Manor part 73