Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৭ (২)

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৭ (২)

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৭ (২)
রাত্রি মনি

“আআআ… বাঁচাননন! বাঁচান আমাকে, আমি… আমি সাঁতার জানি না!”
পুলের ধারেই দাঁড়িয়ে ছিল জেইন। পরনে কেবল রাতের লাল থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, যা তার সুঠাম নাভির বেশ খানিকটা নিচে আলগা হয়ে ঝুলে আছে। তার উন্মুক্ত পেশিবহুল বুক আর সুগঠিত অবয়বে বিকেলের সোনলী আভা ঠিকরে পড়ছে।সে বুকে হাত ভাঁজ করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি।বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কিনারা ঘষতে ঘষতে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

“সাঁতার কাটার এত শখ ছিল? আমাকে আগে বললেই পারতে!”
রিমের গলা থেকে বিক্ষিপ্ত শব্দ বেরোলো, মুখ ভর্তি পানিতে কাশতে কাশতে হাঁপাচ্ছে,
“প্লিজ্… হাহ্… আমাকে বাঁচান…আমাহ্…. আমার শ্বাস কষ্ট হচ্ছে।”
জেইন মাথা কাত করল। কণ্ঠে নিস্পৃহ ভয়ঙ্কর সুর,
“কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে আমার লাভটা কী, বার্বিডল?”
রিমের চোখে আতঙ্ক জমাট বাঁধল। শরীর ছটফট করে ডুবে যাচ্ছিল।ঠিক সেই চরম মুহূর্তে, শিকারি চিতার মতো জেইন এক লাফে পুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জলের এক প্রবল ঝাপটায় চারপাশটা মুহূর্তের জন্য অস্পষ্ট হয়ে গেল। জেইন বিদ্যুৎবেগে রিমের কোমরে নিজের শক্ত হাত পেঁচিয়ে ধরে তাকে এক হেঁচকা টানে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিল।

জলের ওপরে মাথা তুলতেই রিম এক বুক বাতাস টেনে নিল।যেন এতক্ষনে একটু শ্বাস নিতে পারল। দম নেওয়ার সাথে সাথেই চোখ বুজে জেইনের চওড়া বুকে মাথা রেখে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
জেইনের ভেজা ওষ্ঠাধর রিমের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে উঠল
“তুমি ‘না’ বললেই ভালো হতো… এখন তো তুমি আমার কাছে আরও ঋণী হয়ে গেলে।”
তার গাঢ় কণ্ঠ, ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়া আর বরফ-ঠান্ডা পানির আলিঙ্গন সবকিছু মিলেমিশে রিমের শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। জেইনের দৃষ্টি তার শরীর গিলে খাচ্ছিল। সাদা নাইটড্রেস ভিজে গিয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। প্রতিটা ভাঁজ, প্রতিটা বাঁক যেন পানির নিচে আরও ন*গ্ন হয়ে উঠছে। ঠান্ডা জলে রিমের গরম নিঃশ্বাস আর উষ্ণ শরীর জেইনের রক্তে দাবানল ছড়িয়ে দিল।

জেইনের ঠোঁটদুটো নেশাগ্রস্তের মতো রিমের মসৃণ ঘাড় থেকে চিবুক বেয়ে গলার গভীরে নেমে যাচ্ছিল।নেশাগ্রস্থের মতো অস্থির চুম্বনে রিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল, যেন এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় তার অস্তিত্বকে ওলটপালট করে দিতে চাইছে।শরীরের ভেতর শিহরণ ঝড় তুলছে। শ্বাস নিতে গিয়েও সে বার বার খাবি খাচ্ছিল, চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।
জেইন গাঢ় হুইস্কির মতো মাদকতাময় কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে ভীষণ হট লাগছো এখন… ঠিক যেন ঠান্ডা ভদকা… মনে হচ্ছে চুমুক দিয়ে শেষ করে দিই।”
রিম চোখ কুঁচকে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে… অসভ্য লোক।”

পরক্ষণেই জেইন তার লোহার মতো শক্ত হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। রিম ভেসে উঠার বদলে আরও হাবুডুবু খেতে লাগল। বুক ফেটে যাওয়ার মতো দম বন্ধ হয়ে আসছে। আতঙ্কে তার কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“না! না! ছাড়বেন না, ছাড়বেন না… ধরুন আমাকে! আমি… আমি মরে যাবো!”
জেইনের ঠোঁটের কোণে এক বিকৃত হাসি ফুটল।সে আবারও রিমকে এক হেঁচকা টানে নিজের বিশাল বুকের সঙ্গে পিষে ফেলল। তার তপ্ত নিশ্বাস রিমের কানের লতি ছুঁয়ে গেল,
“দেখলে তো… বাঁচতে গেলেও শেষমেশ আমার বুকেই ফিরতে হয় তোমাকে।”
ক্লান্ত, বিধ্বস্ত রিম আর প্রতিরোধ করার শক্তি পেল না। সে জেইনের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। রিমের দু’পা জেইনের কোমরকে বেষ্টন করে ধরল, আর হাতদুটো ঝুলে রইল তার গলার ওপর। জেইনের হাত তখন এক শিকারির মতো রিমের ভিজে যাওয়া নাইটড্রেসের ভেতর দিয়ে ঢুকে শরীর জুড়ে অবাধ্যভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
রিমের শরীরে কাঁপুনি, শিহরণ আর অদ্ভুত যন্ত্রণা মিশে গেল একসাথে। ঠান্ডা পানির মধ্যে সেই স্পর্শগুলো আরও জ্বলন্ত, আরও অসহ্য হয়ে উঠল। জেইন ধীরে ধীরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশাক্ত কন্ঠে ফিসফিসি করে বললো,

“কিছু ফিল করতে পারছো?”
রিমের শরীর যেন জমে গেলো। কাঁপতে থাকা হাত দু’টো শক্ত করে জেইনের ন*গ্ন পিঠর চামড়া খামচে ধরলো। ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়, নিঃশ্বাস ভেঙে বেরোচ্ছে। বুক উথাল-পাথাল করছে, হৃদস্পন্দন যেন চোখে দেখা যায়। শরীর ভেতর থেকে অস্থির হয়ে ওঠে। তবুও কন্ঠ কেঁপে জোর করে গলা দিয়ে ফিসফিসিয়ে শব্দ বের করলো,
“নননা… না।”
জেইনের হাত আরও গভীরে ঢুকে যায়। রিমের কোমর, পিঠ, বুক প্রতিটি স্পর্শে তার দেহে অদ্ভুত শিহরণ ছড়ায়। ঠোঁটের স্পর্শ, হাতে আঁচড়, গলার কাছে নিঃশ্বাস সবকিছু একত্র হয়ে রিমকে এক অদ্ভুত দখলে রাখে।
“এখন ফিল হচ্ছে?”
রিমের চোখ অল্প ঝিমঝিম করছে। শরীর কেঁপে উঠছে। ঠোঁট ফাঁক, নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করছে, জেইনের স্পর্শ অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ। কিন্তু কণ্ঠ কেঁপে শুধু একটাই শব্দ বের হয়

“না…”
জেইন ঠোঁটের কোণে মৃদু, শয়তানি হাসি ছেড়ে দেয়। চোখে লালাভ কামনা, হাতে ছোঁয়া সব মিলিয়ে রিমের দেহকে পুরোপুরি জ্বালিয়ে তুলছে। তার হাত ধীরে ধীরে নাভির পাশে স্পর্শ করতে করতে একেবারে নিচের দিকে সেন্সিটিভ জায়গায় থমকে যায়। সেখানে প্রথম গভীর স্পর্শেই রিমের দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে। চোখে জল জমে যায়, কিন্তু সেটি সুখানুভূতি না কি অসহ্য দহন, তা বোঝার ক্ষমতাও সে হারিয়ে ফেলেছে। শুধু প্রতিটি স্পর্শে অস্থিরতা, উত্তেজনা আর অদ্ভুত জ্বালা অনুভব করছে।
জেইন নিষ্ঠুরভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে,
“এখন বলো… সত্যিই কিছু ফিল হচ্ছে না?”
রিম কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে, চোখ পিটপিট করে, ফিসফিস করে বলে,
“নাআ…”

জেইনের ঠোঁটের কোণে হালকা শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। রিমের শরীরের প্রতিক্রিয়া তার চোখ এড়ায় না। সে আরও কাছে ঝুঁকে কানে গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে
“তাহলে তোমার শরীরটা আমার সাথে মিথ্যে বলছে?”
তার হাত রিমের শরীরের নি*ম্নাঙ্গে আলতো স্পর্শ করতে করতে নড়াচড়া করে। রিম কাঁপতে কাঁপতে চোখ বন্ধ করে ফেলে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কানে বাজছে। গলার স্বর প্রায় ভেঙে আসে,
“আমি… আমি চাই না।”

রিমের হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।জেইনের হাত তার কোমর জাপটে শক্ত করে ধরে।আচমকা রিমের সরু আঙুল দুটো নিজের মুখে পুরে নেয়, চোখে চোখ রেখে ধীর শ্লেহন দিয়ে জিহ্বার উষ্ণ স্পর্শে ছুঁয়ে দেয়। সেই স্পর্শ রিমের প্রতিটি অঙ্গকে অচেতনভাবে জাগিয়ে তোলে। জেইনের চোখে অদম্য নেশা, কন্ঠে মাদকতা,
“তুমি জানো না সোনা…. আমার ছোঁয়ায় ঠিক কতটা সুখ লুকিয়ে আছে। একবার আমাকে কাছে আসতে দাও, তারপর দেখবে তোমার শরীর নিজেই গলে পড়তে চাইবে। আর তুমি শ্বাস কাঁপিয়ে বলবে, আরো চাই…. আরও চাই। Please… don’t stop baby….”

রিম মরিয়া হয়ে তার হাত সরাতে চেষ্টা করে। ঠোঁট কাঁপে, চোখে জল জমে ওঠে। কিন্তু জেইন তার প্রতিটি প্রতিরোধকে আরও গভীর করে তোলে, যেন তার আতঙ্ককেই উপভোগ করছে।
একসময় রিমের সহ্যসীমা অতিক্রম হয়ে যায়। শরীরের প্রতিটি শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, মন অবসাদে ভেসে যেতে চায়। সে ধপ করে জেইনের বুকে নেতিয়ে পড়ে, যেন একমাত্র আশ্রয় সেই কঠিন শরীর।
জেইন হালকা শয়তানি হাসি দিয়ে তাকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। রিমকে সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, ধীরে ধীরে পুলের পানি থেকে বেরিয়ে উঠে। রিম এখনও তার কোলে অচেতন, অস্থিরতা ও ক্লান্তির মিশ্রণে লতানো শরীরটি এখন পুরোপুরি জেইনের দখলে ।
শীতল হাওয়া রিমের ভেজা শরীরে ভেসে আসে, কিন্তু জেইনের উষ্ণ স্পর্শ যেন সেই শীতকে এক মুহূর্তের জন্যও হার মানিয়ে দেয়। রিমের নিঃশ্বাস ভারী, চোখ বন্ধ, অথচ শরীর তার ছোঁয়ায় থরথর করে এক অদ্ভুত, বিপজ্জনক মিলনের নীরব সাক্ষী হয়ে।

ফোন চাপতে চাপতে হঠাৎ ড্রয়িংরুমে মাত্তেওকে দেখে হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ইয়াশ। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে ক্ষোভ নিয়ে বলল,
“কোথায় মরেছিস তোরা সবাই? সেই দুপুর থেকে অপেক্ষা করছি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। একটু পর সন্ধ্যা হয়ে যাবে। হতচ্ছাড়াটা আমাকে বললেই পারত রাত্রে আসবি। তাহলে আমাকে এতক্ষণ এভাবে বসে থেকে বোর হতে হতো না। হতচ্ছাড়াটা কোথায়?”
মাত্তেও কপাল ভাঁজ করে, গাল ফুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়ায়।
“ভাই তো রুমেই।”
ইয়াশের চোখে আক্রমণাত্মক ঝলক, হাতের হাবভাব একটু চাপে ভরা।

“তাহলে যা, ওকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়।”
মাত্তেও এক মুহূর্তের জন্য নড়ে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে মনে যেন ভাবছে, কোথা থেকে শুরু করব! ওকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,ইয়াশের গলার স্বর ধীর-ধীরে ক্ষুব্ধ হয়,
“কি হলো, যাচ্ছিস না কেন?”
“ভাই, যদি বকে?”
“তুই যদি না যাস, তাহলে তোর ভাই কি করবে আমি জানি না, কিন্তু তোকে আমি কুচি কুচি করবো।”
ইয়াশের হুমকি স্পষ্ট, চোখে আগুন জ্বলছে।
মাত্তেও মুহূর্তে পড়ে যায় মহা বিপদে। বামদিকে বাঘের মতো জোর এবং ডানদিকে সিংহের মতো বিপদ। মধ্যখানে সে এক অবলা হরিণ।শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে, ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ে, কণ্ঠ কেঁপে উঠে,
“যাচ্ছি…”
ধীরে ধীরে সে সিঁড়ি বেয়ে হাঁটতে শুরু করে, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভয়ের প্রকাশ করছে। ভাই তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল আজকে যেন কেউ তাকে ডিস্টার্ব না করে!

জেইন রিমকে রুমের মধ্যে কোলে করে নিয়ে এসে আরামদায়কভাবে কাউচে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজে ওয়াশরুমে চলে যায়, গরম পানির গীজার অন করে দেয় এবং সবকিছু ঠিকঠাক করে রাখে।
ফিরে এসে রিমের কাছে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে রিমকে কোলে তুলে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যায়। রিম চোখ বড় করে তাকায়, ভয়ে সামান্য মিইয়ে যাচ্ছে। জেইন বিষয়টা বুঝতে পেরে তার গালে আলতো হাত ছুঁয়ে গলায় মৃদু আদরের স্বরে ফিসফিস করে বলে,

“তুমি আগে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসো, তারপর আমি শাওয়ার নেব, ঠিক আছে?”
জেইন ধীরে ধীরে পিছনে হটে, সে বেরিয়ে পড়লে রিম তখন ধীরে ধীরে শাওয়ার নেওয়া শুরু করে।
রুমে ঢুকেই জেইন ভেতরের দরজা খুলে সিক্রেট রুমে চলে যায়। সেখানে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আসে। ভেজা প্যান্টটা খুলে ফেলে, ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর আরামদায়ক ট্রাউজার পরেই ফিরে আসে।
তখন হঠাৎ রুমের ডোরে নক করার শব্দ শোনা যায়।
“ভাই, আমি মাত্তেও। নিচে ইয়াশ ভাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
জেইন শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
“ঠিক আছে, তুই যা। আমি আসছি।”
মাত্তেও একটু অবাক হয় তার ভাই এতো সহানুভূতিশীল হলো কবে থেকে? যাইহোক এযাত্রায় তো বেঁচে গেছে এটাই অনেক।
রিম ওয়াশরুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতেই, জেইন হঠাৎ করে তাকে কোলে তুলে নেয়। রিম ভড়কে ওঠে, চোখ বড় করে বলে,

“আরে, কি করছেন! পড়ে যাবো তো আমি!”
জেইন এক মুহূর্ত থেমে, রিমকে মনোযোগ দিয়ে নাড়িয়ে দেখে। সব ঠিকঠাক আছে কিনা, তার চোখে যেন অদ্ভুত খেয়ালি খেলে। রিমের শরীরের ওপর বড় ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর ট্রাউজার ঠিকমতো বসেছে, যেন কোনো ভাঁজ, কোনো স্পর্শ বোঝা না যায়। চোখে সন্তুষ্টির ঝিলিক নিয়ে জেইন ধীরে ধীরে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তোলে।তারপর রিমকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“আমি থাকতে তুমি কখনোই পড়বে না। চলো, নিচে যাই। আজ তোমাকে তোমার পছন্দের আইটেম বানিয়ে খাওয়াবো আমি।”
বলেই পকেট থেকে হ্যান্ডকাফ বের করে তার হাতের সাথে রিমের হাত বেঁধে দেয়। রিম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে, বুক ধড়ফড় করে কন্ঠ কেঁপে বলে,
“এটা কি হলো?”
জেইন নির্বিকার কন্ঠে উত্তর দেয়,
“এখন থেকে বাইরে বের হতে হলে এভাবেই বের হবে তুমি। আন্ডারস্ট্যুড?”

জেইন রিমকে কোলপাঁজা করে রাজকীয় ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে অপেক্ষারত মাত্তেও আর ইয়াশ হা করে তাকিয়ে থাকে, অবাক চোখে দুজনেই।জেইন তাদের উপস্থিতিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, তাদের দিকে এক মুহূর্তও না তাকিয়ে, অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে কাউচে গিয়ে বসল। রিমকে তার দুই উরুর ঠিক মাঝে বসিয়ে দিল। রিমের অবাধ্য চুলগুলো কানের লতির পেছনে গুঁজে দিয়ে নেশাক্ত, আদুরে গলায় শুধাল,
“Are you okay in this position? আরাম লাগছে?”
রিম জেইনের সেই গাঢ় প্রশ্নের গূঢ় অর্থ বুঝতে পেরে মুহূর্তেই লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠল।সে চাইলেও জেইনের শক্ত বাঁধন থেকে নড়তে পারে না। নিঃশব্দে তার বুকে নুইয়ে পড়েছে।
ইয়াশ খুক খুক করে কেশে ওঠে, মাত্তেও চোখ নামিয়ে ফেলে। কিন্তু জেইনের মধ্যে একটুও ভাবান্তর নেই। সে কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে কাউকে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা গলায় বললো,

“কাজটা শেষ হলে ২০ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।”
তারপর ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোকে আর্জেন্ট বিডিতে যেতে হবে।”
রিম কথাটা শোনা মাত্রই চোখ বড় করে চট করে মাথা তুলে তাকায়। জেইন তার মনোভাব বুঝতে পেরে কঠোর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
“উমম, ডোন্ট… ভুলেও এ কথা মাথায় আনবে না।”
রিম অসহায় গলায় ফিসফিস করে,
“আমি মাকে… রাহিকে দেখতে চাই…”
জেইন নির্বিকারে, হিমশীতল কণ্ঠে উত্তর দেয়,
“সেটা তুমি এখানে থেকেও দেখতে পাবে।”
রিমের চোখে জল জমে চকচকে হয়, কণ্ঠে কেঁপে ওঠা স্বর,
“প্লিইইজ…”
কিন্তু জেইন নিষ্ঠুর কণ্ঠে, এক মুহূর্তের নরম ভাবও ছাড়াই বলে,

“নো ওয়ে। এখান থেকে বের হওয়া মানেই তোমার জীবনের ঝুঁকি। And I can’t take any risks with your life.”
রিম তার বুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে অসহায়তার মিশ্রণে। কিন্তু জেইনের মাঝে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় না।
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে জেইনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“হঠাৎ বাংলাদেশ কেন যেতে হবে?”
জেইন শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
“দু’মাস আগে বাংলাদেশ থেকে যে খবরটা এসেছিল, মনে আছে তো? সেই কারণেই যেতে হবে।”
ইয়াশ আবার বলে ওঠে,
“কিন্তু তখন তো বলেছিলি হ্যান্ডেল করে নিতে পারবি।”
জেইন গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়,

“বলেছিলাম। কিন্তু এখন প্রোবলেমটা বড় হয়েছে। যেতে হবেই।”
ইয়াশ কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই জেইন ঠাণ্ডা কণ্ঠে জানায়,
“সাথে এলেনাও যাচ্ছে।”
এই কথাটা শুনে ইয়াশের চোখ খুশিতে জ্বলে ওঠে। উত্তেজিত হয়ে জেইনকে জড়িয়ে ধরতে চাইতেই,
“থ্যাঙ্ক ইউ ব্রো! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! তুই-ই আমার সত্যিকারের ভাই। তুই ছাড়া আমার কথা আর কেউ ভাবে না।”
জেইন বিরক্ত মুখে হাত তুলে ইশারা করে তাকে থামিয়ে দেয়।
“হয়েছে হয়েছে, ড্রামা করার দরকার নেই।”
তারপর ধীরে ঝুঁকে ইয়াশের কানে ফিসফিস করে বলে,
“প্রি-হানিমুনের ব্যবস্থা করে দিলাম, ইনজয়।”
বলেই এক চোখ টিপে দেয়। এই কথাটা রিমের কানে গিয়েও লাগে। সে বিরক্ত গলায় বিরবির করে ওঠে,
“সবাইকে নিজের মতো বানিয়ে নিচ্ছে। নির্লজ্জ কোথাকার!”
ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করে এলেনা। জেইন তার দিকে চোখ তুলে বলে,

“ইজ এভরিথিং রেডি?”
এলেনা শক্ত গলায় দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়,
“ইয়াহ্।”
জেইন শান্ত অথচ কড়া ভঙ্গিতে বলে,
“গুড। তাহলে তোরা তিনজন এখনই বেরিয়ে যাচ্ছিস।”
ইয়াশ এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে, কপালে ভাঁজ ফেলে বলে ওঠে,
“তিনজন মানে?”
জেইন ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“তুই, এলেনা আর মাত্তেও।”
ইয়াশের চোখ বড় বড় হয়ে যায়,
“ও আবার আমাদের সাথে যাবে কেন? আমরা দু’জনেই সামলাতে পারতাম।”
জেইন একটু আয়েশ করে কাউচে পিঠ হেলিয়ে রিমকে আরও কাছে টেনে নিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে উত্তর দেয়,
“মাত্তেও কোনোদিন এলেনাকে ছাড়া একা থাকে নি। তাই ও তোদের সাথেই যাবে।”
ইয়াশ দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে,

“ভাই, কেন কাবাব মে হাড্ডি ঢুকাচ্ছিস?”
জেইন বাঁকা হাসি দিয়ে কানে কানে বলে ওঠে,
“তুই কি ভেবেছিস আমি এখনো বিবাহিত হয়েও হানিমুন করতে পারলাম না, আর তুই বিয়ে ছাড়াই হানিমুন করে নেবি?”
ইয়াশ মুখ ফুলিয়ে বসে পড়ে,
“এটা কিন্তু ঠিক না।”
জেইন দু’পাশে ঘাড় কাত করে ফুটিয়ে হাই তুলে বলে
“এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। তোদের এখান থেকে পাঠাচ্ছি যেন আমি আমার হানিমুনটা ঠিক মতো সারতে পারি। এবার বুঝতে পেরেছিস?”
তাদের দুজনের কথার মাঝেই এলেনা আর মাত্তেও সবকিছু গোছগাছ করতে চলে যায়।
অন্যদিকে জেইনের কোলে বসা রিমের মাথা হঠাৎ ঘুরে ওঠে। শরীর কাঁপতে থাকে, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সে হঠাৎ জেইনের বুকের ওপর গড়গড় করে বমি করে দেয়। চাইলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে করতে পারতো। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই যেন তার উপর বমি ফেলে দিয়েছে। সারাদিন আঠার মতো লেগে থাকার শখ না? এবার বুঝবে। বমি করে হাঁপাতে থাকে সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে।
ইয়াশ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে চমকে বলে ওঠে,

“ড্যুড! এত বড় একটা কাজ কখন করলি তুই? তুই তো বললি এখনো হানিমুন হয়নি! তাহলে এসব কবে হলো?”
জেইন বিরক্ত— একদিকে তার ওপর বমি, অন্যদিকে ইয়াশের বোকামি! দাঁত চেপে গর্জে ওঠে,
“ইডিয়ট! আমি এখনো কিছুই করিনি।”
ইয়াশের ভ্রু কুঁচকে যায়, কপাল দ্বিগুণ বড় হয়ে উঠে বিস্ময়ে বলে,
“মানে… তোর মাল অন্য কেউ খেয়ে দিলো!”
এই কথা শেষ হতেই জেইনের হিংস্র দানবের মতো ঝাঁপিয়ে গিয়ে ইয়াশের গলা চেপে ধরে। তার কোলে তখনো রিম শক্ত করে আকড়ে ধরা। জেইনের চোখ থেকে আগুন ঝরে পড়ছে। গর্জে ওঠা কন্ঠে বলে,
“You Fu*cking bust*rd!!!! মুখ সামলে কথা বল!! ভুলে যাস না, কার সামনে কি বলছিস! কালকে ও একটু উল্টোপাল্টা খেয়ে ফেলেছিল, তাই এখন এই অবস্থা। আর কিছু না।”

ইয়াশ হাঁসফাঁস করতে করতে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কাঁপা গলায় বলে,
“আরে ভাই ছাড়! আমি তো মজা করছিলাম! আর কোনদিন বলব না… প্লিজ মাফ করে দে ভাই।”
ঠিক তখনই রিমের শরীর ঢলে পড়তে যায়। জেইন চোখ রাঙাতে রাঙাতে ইয়াশকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে রিমকে আগলে ধরে ফেলে। তার কণ্ঠ হিমশীতল,
“এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!, নইলে আজকেই আমার হাতে মারা পড়বি তুই।‌ ইয়াশ নামের আর কাউকেই এই দুনিয়ায় রাখব না আমি।”
ইয়াশ আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়। আপাতত এখান থেকে চলে যাওয়াটাই মঙ্গলজনক বলে মনে হচ্ছে তার।
জেইন এবার রিমের দিকে ফিরল। তার সেই হিংস্র চাহনি মুহূর্তেই এক গভীর উদ্বেগে রূপান্তরিত হলো। রিমের ফ্যাকাসে মুখটা দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে অস্থির কণ্ঠে শুধাল,

“সোনা…. তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?”
রিম ঢুলু মুলু চোখে তাকিয়ে না বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শারীরিক প্রতিক্রিয়া তাকে আড়াল করতে পারল না। জেইন দ্রুত তাকে কোলে নিয়ে কিচেনের বেসিনের কাছে চলে গেল।
জেইন ধীরে ধীরে ওয়াশ করার মাধ্যমে তাকে পরিষ্কার করল। তারপর রিমকে আস্তে করে কেবিনেটে বসিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবু জল বানাল।
সেই মুহূর্তে মাত্তেও কিচেনে প্রবেশ করে। রিমের অবস্থা দেখে অবাক হয়ে কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“ভাই, ভাবির কি হয়েছে? ইয়াশ ভাই বললো, ভাবি নাকি অসুস্থ!”
জেইন স্বাভাবিক, শান্ত কণ্ঠে তাকিয়ে বলল,
“তেমন কিছু না, তুই যা। তোদের তো বের হতে হবে। ফ্লাইটের লেট হয়ে যাবে। ও কাল যা করেছিল, তার প্রভাব হচ্ছে এখন। আমি সামলাতে পারবো।”
মাত্তেও হালকা নিঃশ্বাস ফেলে,
“ঠিক আছে ভাই, তাহলে আমি আসছি।”

গাড়ি এয়ারপোর্টের প্রবেশফলকে এসে থামতেই ইয়াশ, মাত্তেও আর এলেনা একসাথে নেমে পড়ল। তিনজনেই মাটিতে পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরটা টানটান হয়ে স্টাইলিশ ভঙ্গিতে দাঁড়ালো হাতে স্লিম জ্যাকেট, গলার কাছে শাল, চোখে-কানায় রোদ চশমা। এলেনার সিল্কি বাদামি চুলগুলো হালকা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। তারা তিনজনে একসাথে দাঁড়িয়ে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো গ্যাংয়ের গ্যাংস্টার আচরণে আত্মবিশ্বাস, বডি ল্যাংগুয়েজে ঝকঝকে একটা হট স্ট্রিট-রফ্‌নেস।
তিনজনই একই রিদমে এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকে পড়ল। ভিড়, চাকা-ঘর্ষণ আর উচ্চকন্ঠ্যে ঘোষণা সব মিলিয়ে ব্যস্ততা। মাত্তেও যাচ্ছিল চেক-ইন কাউন্টারের দিকে। ঠিক তখনই ইয়াশ অচেনা তৃপ্তির মতো এলেনার হাত ধরে টেনে সকলের আড়ালে নিয়ে পড়ল। ঘটনাটা এত দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে ঘটল যে এলেনা কিছুক্ষণ বুঝে উঠতেই পারল না, বস্ত্রের বাতাস, পায়ের শব্দ, পরিদর্শকের চঞ্চল চোখ সব মিশে গেছে এক সঙ্গে।
এলেনা ভ্রু কুঁচকে অবুঝচোখে তাকিয়ে রইল। ইয়াশ ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে পড়ল, চোখে নেশার অদেখা ঝিলিক। তার হাত এলেনার কলার-বোনের ওপরে রেখে, গভীর আবেশীত কণ্ঠে বলল,

“একটা কিস দাও না, ব্লাড প্রেসার লো হচ্ছে আমার।”
এলেনার চোখ দু’টো নিষ্প্রাণ রোবটের মত ইয়াশের দিকে স্থির হয়ে যায়। সে সোজা কটি পদক্ষেপে এগিয়েই ইয়াশকে কনুই করে বুকে ধাক্কা মেরে দিল এক আলগা, কিন্তু স্পষ্ট আঘাত। ইয়াশ অচিরেই বুকে হাত দিয়ে কুঁচকে ওঠে, ব্যথায় মুখ একটু বিকৃত হয়ে যায়,
“কিস চাইলাম, মাড়লে কেন?”
এলেনা কোনো মিষ্টি ফিরিস্তি দিল না। পুরো এটিট্যুড নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে, হাত ঝাড়তে ঝাড়তেই ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এরপর আর কিছু চাইলে বুকে না সোজা ঐ জায়গায় মেরে দেব।”
বলেই সে কাঁধ উঁচু করে হেঁটে চলে গেল পেছন একবার ফিরেও তাকায়নি। ইয়াশ কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ওপরের দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে বললো,
“কি ডেঞ্জারাস আনরোম্যান্টিক মেয়েরে বাবা! চুমু চাইলাম সে নাকি আমার ঐ জায়গায় মেরে দেবে! মনের মধ্যে কি একটুও ফিলিংস নেই? মনে হচ্ছে সারাজীবন ভার্জিন-ই থাকতে হবে আমায়। ওহ্ গড, এই ছিল কপালে!”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রাত ১০টা ১৭ মিনিট
ড্রয়িংরুমের বড়সড় কাউচে বসে ল্যাপটপে টাইপ করছে জেইন। অথচ তার কোলে গুটিশুটি মেরে বসে আছে রিম। মেয়েটা হাঁসফাঁস করছে। এই লোকটার কোলে বসে থাকতে তার একদমই ভালো লাগছে না। একটু আগেই জেইন তাকে জোর করে এত এত খাবার খাইয়েছে, এখনো ভারী লাগছে শরীরটা।
জেইন এলইডি টিভিটা অন করে “ডোরেমন” চালিয়ে দেয়। আগে কখনো তাদের হাউজে টিভি ছিল না।শুধু রিমের জন্যই আনা হয়েছে। রিম একদৃষ্টে টিভি দেখতে থাকে। যেন পুরো পৃথিবী ভুলে গিয়ে সে ওই স্ক্রিনেই ডুবে গেছে। চারপাশে কেউ নেই যেন, পৃথিবীর সব আনন্দ যেন গিয়ে লুকিয়েছে ওই অ্যানিমেটেড ছবিগুলোতে।
জেইন ল্যাপটপ বন্ধ করে তার দিকে মোহগ্ৰস্থের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত এক টান তাকে গ্রাস করে। রিমের ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি, মুখে অনাবিল এক আলো ছড়িয়ে আছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে জেইনের বুকের ভেতর জ্বলে ওঠে হিংসার আগুন। কেন টিভি দেখে ওর ঠোঁটে হাসি আসে? কেন সেই আলো তার জন্য নয়? ওর দৃষ্টি যদি আটকে থাকে, সেটা শুধু তার গায়েই আটকে থাকবে। হাসতে চাইলে শুধু তার জন্য হাসবে। কাঁদতে চাইলেও তার জন্য কাঁদবে। এই মেয়ের সমস্ত আলো, অশ্রু, নিশ্বাস সব শুধু তার অধিকারেই থাকবে।
এক ঝটকায় রিমের হাসি কেড়ে নিতে টিভি বন্ধ করে দেয় জেইন।
রিম বিরক্ত গলায় বলে,

“এটা কি করলেন! আমার ফেভারিট মুভি Steel Troops চলছিল।”
জেইন কাউচে হেলান দিয়ে বসে অলস স্বরে বলে,
“মাথা ব্যথা হচ্ছিল, তাই বন্ধ করেছি।”
রিম মুখ কুঁচকে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকায়,
“আপনার মাথা ব্যথা হলে আমি কি করবো?”
জেইন হঠাৎ তার মুখের কাছে ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“তোমার জন্মই মাথা ফাটছে, ইডিয়ট। সারারাত জেগে থেকেছি, চোখে একফোঁটা ঘুম নেই‌। শুধু তোমার জন্যেই।”
রিম চুপ করে মাথা নিচু করে, আবার হঠাৎ চঞ্চল হয়ে মুখ তোলে।
“আচ্ছা, আমি আপনার জন্য কফি বানিয়ে আনি? দেখবেন মাথা ব্যথা একদম গায়েব হয়ে যাবে।”
জেইন এক ভ্রু উঁচু করে সন্দেহমিশ্রিত দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয়।
“ওহ! এত কেয়ার, হঠাৎ? কী প্ল্যান করছো, বলো?”
রিম মুখে নির্দোষ ভাব এনে বলে,
“কিছু না তো…আমার জন্য আপনার কষ্ট হচ্ছে, তাই বললাম। যাই?”
জেইন অলস ভাবে কপালে হাত বুলিয়ে অচেতনেই বলে,

“হুম।”
রিম চটপট হাত নেড়ে বলে,
“ঠিক আছে, তাহলে এটা খুলে দিন।”
জেইন ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসে,
“আচ্ছা! ব্যাপারটা এটা ছিল? মাই ডেভিল কুইন… খুলে দেওয়ার দরকার কী? আমি নিজেই তোমাকে কিচেনে নিয়ে যাচ্ছি। I don’t think so.. তুমি জীবনে কখনো কফি বানিয়েছো। চলো আজ আমি তোমাকে নিজের হাতে ধরে শেখাবো।”
জেইন তাকে কোলে নিয়ে চাইলে, রিম তড়িঘড়ি ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
“আআআ না! আমি নিজেই বানাতে পারব।”

জেইন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা মনে মনে ভেবে ঠোঁটে হালকা শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। তারপর কোনো প্রশ্ন ছাড়াই চাবি বের করে, হ্যান্ডকাফ খুলে ফেলে। চোখে ইশারা করে তাকে যাওয়ার জন্য।
রিম দৌড়ে কিচেনে ঢুকে শ্বাস নেবার চেষ্টা করে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন বাইরে ফেটে বেরোতে চাইছে। সেলফ থেকে সব বের করে কফি বানায়। তারপর কাঁপা হাতে পকেট থেকে বের করে স্লিপিং পিলস। যেটা সে নিজেই মাঝে মাঝে খেত অনিদ্রায়। একে একে বারোটা পিলস গুঁড়ো করে কফিতে মিশিয়ে ফেলে।
কিছুক্ষণ পর ট্রে হাতে বসার ঘরে ফিরে এসে জেইনের সামনে কফি এগিয়ে দেয়। রিমের চোখে অনিশ্চয়তা, ভেতরে একটাই ভাবনা, সে কি বুঝতে পারবে? সন্দেহ করবে? না কি…?
জেইন একদৃষ্টে তার দিকে তাকায়। তারপর কোনো দ্বিধা ছাড়াই কাপ তুলে নেয়। এক চুমুক খায়। আবার খায়। যেন কফির ভেতর লুকিয়ে থাকা রহস্যের খোঁজ করছে না বরং সেই চুমুক দিয়েই রিমের ভেতরটা পড়ে নিচ্ছে।
রিম ভেবেছিল, অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও জেইন থেমে যাবে, প্রশ্ন করবে। কিন্তু না। নিঃসন্দেহে, একদম নির্ভয়ে কফিটা খেতে থাকে সে।রিম বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“কেমন হয়েছে?”
জেইন কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে,
“You added too much sugar.”
রিম হতভম্ব। সে তো চিনি একদমই দেয়নি! তাহলে এই মিষ্টি কোথা থেকে এলো? লোকটা কি তেতো আর মিষ্টি স্বাদের পার্থক্য টুকুও বুঝে না? নাকি ঘুমের ওষুধগুলোই মিষ্টি?
জেইন হুট করেই তাকে কোলে নিয়ে আঠালো গলায় বলে,
“চলো রুমে যাই। খুব টায়ার্ড। ঘুম পাচ্ছে। তোমার বুকের ভেতরে মুখ ডুবিয়ে ঘুমাবো।”
রিম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। চুপচাপ ভদ্র হয়ে থাকে। সে তো এটাই চায়! জেইন ঘুমিয়ে পড়লে সে রিশাবকে খুঁজে বের করবে। আর আজকে পুরো পেন্টহাউজই খালি। তাহলে রিশাবকে খুঁজে বের করা আরও সহজ হবে।
জেইন রুমে এসে রিমকে বিছানায় শুইয়ে ক্লান্তভাবে নিজের শরীরের সমস্ত ভর রিমের শরীরের ওপর ছেড়ে দেয়। রিম হাঁসফাঁস করে ওঠে। জেইন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,

“উমমম্ একটু আরাম করতে দাও না সোনা। একটু শান্ত হয়ে থাকো। তোমার দেহে আমার সব ক্লান্তি মিলিয়ে দিতে চাই।”
রিম শ্বাস আটকে ফেলে। কি ছিল সেই কণ্ঠে? যেন কোনো মাদক দ্রব্যের মতো তার শিরায় ঢুকে যাচ্ছে, টেনে নিচ্ছে অজান্তে। তার বুক হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে ওঠানামা করতে শুরু করে, প্রতিটা নিশ্বাস যেন ভেঙে পড়া দেয়ালের মতো ধসে আসছে।
জেইন একটুও দ্বিধা না করে বুকে মুখ ডুবিয়ে দিল। একটা দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত টান- মুহূর্তেই তার শরীর থরথর কেঁপে ওঠে, যেন এক দীর্ঘ অনাহার শেষে সে হঠাৎ রক্ত খুঁজে পেয়েছে।
সে একবারে, আবারও গভীরভাবে শ্বাস টেনে নেয়, এমনভাবে যেন এই ঘ্রাণ ছাড়া তার শরীরের ভেতর রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৭

আজকাল এই ঘ্রাণটাই তার সবচেয়ে ভয়ংকর নেশা। রিমকে ছাড়া তার শরীর অসাড় হয়ে যায়, মাথা পুড়ে যায়, ভেতরের অন্ধকার হাহাকার করে ওঠে। সে জানে, একবার এই আসক্তি ছিনিয়ে নিলে তার অস্তিত্ব ভেঙে যাবে। তাই আঁকড়ে ধরে, শ্বাস টেনে নেয়, যেন ভেতরে ঢুকিয়ে নিজেকে পূর্ণ করছে।
রিমের ভেতরে অস্বস্তি ছটফট করলেও সে শান্ত থেকে যায়। আর জেইন তার ঘ্রাণে মত্ত হয়ে, ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে সেই শান্তির ভেতরে, চোখের ভারে, নিশ্বাসের নেশায়, সে সম্পূর্ণভাবে ডুবে যায় অচেতন ঘুমের অতলে।
রিম নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে। আজকের রাতটাই তার সুযোগ………

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৮